Golpo কষ্টের গল্প রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬২(প্রথমাংশ)


#রোদ্দুরের_ছেঁড়া_মানচিত্র

#পর্ব_৬২(প্রথমাংশ)

#নিলুফা_নাজমিন_নীলা

★★★

তৃণা আর মিতু ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে বেশ আয়েশ করে গল্প করছিল। মিতু ইদানীং তৃণার প্রতিটি বিষয়ের ওপর কড়া নজর রাখে, ছোট বোনের মতো ওর যত্ন নেওয়ার কোনো কমতি রাখে না। কথা বলতে বলতে তৃণা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা ভাবি, গতকাল তো চেকআপের জন্য ডক্টরের কাছে গিয়েছিলে। ডক্টর নতুন করে কিছু বললেন?”

তৃণার প্রশ্নটা শোনামাত্রই মিতুর হাসিখুশি মুখটা কেমন থমথমে হয়ে গেল। একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ও বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলল, “সবার সব ইচ্ছে কি আর পূরণ হয় তৃণা? জানো তো, বান্দা যখন কোনো জিনিস পাওয়ার জন্য বেশি দেওয়ানা হয়ে যায়, তখন হয়তো ওপরওয়ালা তার ওপর কিছুটা রুষ্ট হন। তাই তো সেই প্রার্থিত জিনিসটা আর কপালে জোটে না।”

​মিতুর গলার স্বর কেমন ভারী হয়ে এল। তৃণা তৎক্ষণাৎ মিতুর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আশ্বাসের সুরে বলল,

“না ভাবি, এমনটা ভেবো না। ওপরওয়ালার কাছে মন থেকে কিছু চাইলে তিনি অবশ্যই দেন। শুধু একটু সঠিক সময়ের অপেক্ষা মাত্র। দেখে নিও, খুব শীঘ্রই তোমার কোল আলো করেও ফুটফুটে সন্তান আসবে।”

​তৃণার কথায় মিতু একটু শান্ত হলো, ঠোঁটের কোণে ম্লান একটা হাসির রেখা ফুটে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তে কলিংবেল বেজে ওঠার শব্দে দুজনের নজর গেল দরজার দিকে। দেখল রিনি ভেতরে প্রবেশ করছে। এই অসময়ে রিনিকে দেখে তৃণা বেশ অবাক হলেও ওর মুখে চওড়া হাসি ফুটল। তৃণা আনন্দিত হয়ে সোফা ছেড়ে উঠতে চাইল, কিন্তু রিনি দ্রুত এগিয়ে এসে ওর কাঁধ চেপে ধরে থামিয়ে দিল। শাসনের সুরে রিনি বলল,

​“কী করছিস? একদম নড়বি না! এই অবস্থায় ঘন ঘন উঠা-বসা করা একদম ঠিক না। চুপচাপ বসে থাক।”

​রিনি এরপর মিতুর সাথে কুশল বিনিময় করল। মিতু হাসি মুখে বলল, “তোমরা বসে গল্প করো, আমি তোমাদের জন্য কিছু নাস্তা রেডি করে নিয়ে আসি।” রিনি বারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও মিতু শুনল না, সে সোজা রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।

রিনি তৃণার পাশে বসে তৃণাকে জিজ্ঞেস করল, “এখন শরীর কেমন আছে?”

​“হুম, ভালো।”

তৃণা লক্ষ্য করল রিনির চোখেমুখে এক অস্থিরতা আর চাপা হাহাকার খেলা করছে। চোখের নিচে কালচে ছোপ বলে দিচ্ছে বেশ কয়েক রাত ঠিকঠাক ঘুম হয়নি মেয়েটার।

​তৃণা এবার বেশ সিরিয়াস হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কী হয়েছে আপু? তোমাকে এমন বিমর্ষ দেখাচ্ছে কেন?”

রিনি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন ভেতরে ভেতরে কোনো এক বিশাল ঝড়ের সাথে লড়াই করছে সে। তারপর খুব ধীর আর অস্ফুট কণ্ঠে বলল,

​“আমি ফ্রান্স চলে যাচ্ছি তৃণা। সব গুছিয়ে নিয়েছি।”

তৃণার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না, কেবল বিস্ময় আর বিষাদভরা চোখে রিনির দিক তাকিয়ে রইল সে।

তৃণার মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে শুধু একটা শব্দই বেরিয়ে এল, “হোয়াট? কী বলছো এসব? হঠাৎ কেন দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলে?”

​রিনি জানলার বাইরের আকাশটার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “এই দেশের মাটি আমাকে খুব পুড়ায় রে বোন। এখানে নিঃশ্বাস নিতে গেলে বুকটা ফেটে যায়, আমার দম বন্ধ হয়ে আসে।”

​“কবে ফ্লাইট তোমার?” তৃণা ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল। ​“আজ সন্ধ্যায়।”

তৃণা দ্বিতীয়বারের মতো চমকে উঠল। চিৎকার করে বলল, “তুমি কি পাগল হয়ে গেছো আপু? আজ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছো আর আমাকে জানাচ্ছো মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে?”

রিনি ম্লান হেসে বলল, “আগে জানালে তোরা কোনো না কোনোভাবে আমাকে আটকে দিতিস, তাই বলিনি।”

​“বাবা জানে?”

“হুম, বাবাকেও আজই জানালাম। প্রথমে কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। কিন্তু অনেক কষ্টে উনাকে বুঝিয়ে রাজি করিয়েছি।”

রিনির চোখের কোণে জল চিকচিক করছে। তৃণা রিনির খুব কাছে এসে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠল, “এভাবে হুট করে দেশ ছেড়ে পালানোর আসল কারণ কি তূর্ণা?”

তৃণার মুখ থেকে নামটা শোনামাত্রই রিনির এতক্ষণের ধরে রাখা বাঁধ যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। মেয়েটা হু হু করে কেঁদে উঠে তৃণাকে জাপটে ধরল। রিনিকে এমন বিধ্বস্ত অবস্থায় জীবনে প্রথমবার দেখছে তৃণা। তার সেই জেদি, সাহসী বড় বোনটা আজ একটা খড়কুটোর মতো কাঁপছে। তৃণা কী বলে ওকে সান্ত্বনা দেবে ভেবে পেল না।

​রিনি কান্নার চোটে হেঁচকি তুলে বলতে লাগল, “আমার কপালে কেন খোদা একটুও ভালোবাসা রাখল না রে? আমি ওই তূর্ণা বাচ্চাটাকে ছাড়া থাকতে পারছি না। মেয়েটার সাথে তো আমার কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই, তবুও কেন ওর জন্য আমার এত হাহাকার হয়? আমি তো মেহরাব দেওয়ানের কাছে বেশি কিছু চাইনি, শুধু তূর্ণার ‘মা’ হতে চেয়েছিলাম। আমি দেখিয়ে দিতে চেয়েছিলাম যে সব সৎ মা খারাপ হয় না, সব সন্তান তার মায়ের চরিত্রের ছাঁচে তৈরি হয় না। কিন্তু ওরা তো আমাকে সেই সুযোগটাই দিল না!”

রিনি হঠাৎ তৃণার গলা ছেড়ে দিয়ে নিজের চোখের জল মুছল। সে জোর করে হাসার চেষ্টা করল। কান্নারত অবস্থায় সেই শব্দ করে হাসাটা কেমন এক ভয়ংকর সুর তৈরি করল ড্রয়িংরুমে। রিনি করুণ হাসিতে বলল,

“ এই পৃথিবীতে আমাকে কেউ কোনোদিন ভালোবাসেনি। তুইও তো আমাকে কোনোদিন ভালোবাসিসনি, তৃণা!”

​তৃণা স্তব্ধ হয়ে রিনির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। রিনির এই শেষ কথাটা তীরের মতো তার বুকে বিঁধল। রিনি তো ভুল বলেনি! রিনি আবারও করুণভাবে হাসল। তার সেই হাসিতে না ছিল সুখ, না ছিল স্বস্তি; ছিল কেবল এক বুক হাহাকার। রিনি হুট করে বলল, “একটা জিনিস দেখবি তৃণা?”

​তৃণা অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কী?”

​রিনি কোনো কথা না বলে হঠাৎ তৃণার দিকে পিঠ ঘুরে বসল। নিজের পিঠের কাছের চুলগুলো একপাশে সরিয়ে দিয়ে বলল, “কিছু কি দেখতে পাচ্ছিস?”

​তৃণার চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল। রিনির ফর্সা পিঠজুড়ে কালচে কালচে অসংখ্য দাগ। যেন কাঁচা কঞ্চি দিয়ে কেউ পৈশাচিক আক্রোশে পিটিয়ে চামড়া নীল করে দিয়েছে। দাগগুলো এখনো কত স্পষ্ট! তৃণা শিউরে উঠে কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বলল,

“এসব কী আপু? এই ভয়ংকর দাগগুলো কোত্থেকে এল? কে করেছে এমন?”

রিনি আবারও হাসল। আজ যেন হাসির কোনো এক উৎস খুঁজে পেয়েছে সে। শান্ত গলায় বলল,

“মনে আছে তৃণা, যখন মা আর মামা তোকে অমানবিক অত্যাচার করে ওই ঝোড়ো বৃষ্টির রাতে ছাদে ফেলে রেখে এসেছিল? আমি তখন লুকিয়ে তোকে নিজের রুমে নিয়ে এসেছিলাম। সেদিন তোর খুব জ্বর উঠেছিল। সারারাত তোর শিয়রে বসে মাথায় জলপট্টি দিয়েছি, তোকে আগলে রেখেছি। তুই তো জ্বরের ঘোরে অচেতন ছিলি, জানতিস না তোর পাশে কে জেগে আছে।”

রিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলতে শুরু করল, “পরদিন সকালে যখন মাম্মি জানতে পারল যে আমি তোকে সেবা করেছি, সেদিন তাঁর সমস্ত ক্রোধ আমার ওপর গিয়ে পড়েছিল। মা আমাকে সেদিন পশুর মতো পিটিয়েছিল। তৃণা, সেদিন তোর ওপর যে আঘাতটা আসার কথা ছিল, সেটা আমি নিজের পিঠে তুলে নিয়েছিলাম। আজ সেই দাগগুলোই আমার সারা জীবনের সঙ্গী হয়ে আছে।”

তৃণার পৃথিবীটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তার ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে। তৃণার মনে এই প্রশ্নটা অনেকক্ষণ ধরেই ঘুরপাক খাচ্ছিল। সে রিনির চোখের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“আপু, সত্যি করে একটা কথা বলবে? তুমি কি মেহরাব দেওয়ানকে ভালোবাসো? নাকি সবটাই শুধু ছোট্ট তূর্ণার জন্য ওই অদম্য স্নেহ?”

রিনি হুট করেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ড্রয়িংরুমের দেয়াল ঘড়িটার টিকটিক শব্দ যেন আচমকা খুব জোরালো হয়ে উঠল। রিনি বিড়বিড় করে উচ্চারণ করল,

“ভালোবাসা!”

শব্দটা তার কাছে যেন এক গোলকধাঁধা। যার উত্তর রিনির নিজের কাছেও নেই, নাকি সে উত্তরটা দিতে ভয় পাচ্ছে? তৃণা উত্তরের আশায় অপলক তাকিয়ে রইল, কিন্তু রিনি এই অস্বস্তিকর প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য খুব তাড়াহুড়ো করে বলল,

“সন্ধ্যায় ফ্লাইট তৃণা, আমাকে এখন বেরোতে হবে। অনেক কাজ বাকি।”

তৃণা এবার রিনির দুহাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। তার কণ্ঠে মিনতি ঝরে পড়ল, “থেকে যাও না আপু! সব ভুল বুঝিয়ে আমরা কি মেহরাবকে রাজি করাতে পারি না? প্লিজ, যেও না!”

​বলতে বলতেই তৃণার গাল বেয়ে এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। রিনি আলতো করে সেই জল মুছে দিল। তারপর হঠাৎ করেই ঝুঁকে তৃণার গালে পরম মমতায় একটা স্নেহের চুমু খেল। তৃণা পাথর হয়ে গেল। সারা শরীরে যেন এক আশ্চর্য বিদ্যুৎ খেলে গেল তার। জীবনে এই প্রথম রিনি তাকে এভাবে চুমু খেল। ​তৃণাকে এভাবে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে রিনি ম্লান হেসে বলল,

“কী ভাবছিস? এটাই বুঝি প্রথম চুমু? উঁহু, এটা দ্বিতীয়। প্রথমটা দিয়েছিলাম সেই রাতে, যেদিন তুই জ্বরে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছিলি আর যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলি।”

​তৃণা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ডুকরে কেঁদে উঠে রিনিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। রিনিও ওকে অনেকক্ষণ বুকের সাথে চেপে ধরে রাখল। রিনি খুব শান্ত গলায় বলল,

“এভাবে কাঁদিস না বনু। শরীরের ওপর চাপ পড়বে। তোর ভেতরে যে নতুন প্রাণ বড় হচ্ছে, ওকে বলিস তার একটা মামণি আছে, যে অনেক দূরে থেকেও তাকে প্রচুর ভালোবাসবে। আব্বুকে দেখে রাখিস। আর শোন, একদম অনিয়ম করবি না। সময়মতো খাবার খাবি, ঠিক আছে?”

​রিনি আর কথা বাড়ানোর সুযোগ দিল না। মিতু আর বাড়ির অন্যদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দ্রুত কদমে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেল।

★★★

​অপ্রিয় পুরুষ,

​জানি না কেন আপনাকে অপ্রিয় বলে সম্বোধন করতে ইচ্ছে হলো। অপ্রিয় তো মানুষ তখন হয় যখন মানুষটা পছন্দের থেকে অপছন্দে পরিণত হয়! কিন্তু আপনি তো আমার কোনোকালেই পছন্দের ছিলেন না? তবে কেন এরকম নামে সম্বোধন করতে ইচ্ছে হলো। যাক বাদ দিই, আজকাল নিজের অজান্তেই অনেক কিছু ভিন্ন ঘটছে।

​আপনি যখন এই চিঠিটা হাতে পাবেন ততক্ষণে আমি হয়তো নিজের মাতৃভূমি ছেড়ে প্লেনের জানালার কাছে মুখ রেখে বিশাল আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। আপনার প্রতি আমার এক বিন্দুও ক্ষোভ নেই। আপনি নিঃসন্দেহে একজন শ্রেষ্ঠ স্বামী, একজন শ্রেষ্ঠ পিতা। তবে আমার বেলায় আপনি চাইলেই একটু মহানুভবতা দেখাতেই পারতেন। আমি তো আপনার কাছে ভালোবাসা চাইনি। শুধু চেয়েছিলাম প্রমাণ করতে যে পৃথিবীর সকল সৎ মা খারাপ হয় না। কোনো সৎমা আপন মায়ের চেয়েও আপন হতে পারে। কিন্তু হায় আফসোস! আপনি আমাকে প্রমাণ করতে দিলেন না। ​

অপ্রিয় মেহরাব দেওয়ান, আপনি যদি একবার ঘৃণাভরা সুরেও বলতেন থেকে যাও—তাহলে আমি সকল আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে, পথহারা পথিকের মতো থেকে যেতাম। কিন্তু আপনি বলেননি।আপনি একটিবার পেছন ফিরেও তাকাননি। ছোট্ট তূর্ণাকে বলবেন না আমি আপনার প্রতি অভিমান করে হারিয়ে গেছি; আমি চাই না তূর্ণা তার বাবার প্রতি রাগ করুক। তূর্ণা ওইদিন আমাকে বলছিল ওর খুব ইচ্ছে সমুদ্রে হাঁটবে, এক পাশে থাকব আমি এবং অন্য পাশে আপনি, আর মাঝে তূর্ণা। আমি তো আর থাকতে পারলাম না, একদিন সময় করে তূর্ণাকে নিয়ে সমুদ্র থেকে ঘুরে আসবেন। কয়েকদিন হয়তো আমাকে না পেয়ে মেয়েটা দুঃখী থাকবে, তারপর নিশ্চয়ই ভুলে যাবে আমাকে। মেয়েটা যখন আমাকে না দেখে কাঁদবে তখন বকা দিয়েন না, সুন্দর করে বুঝিয়ে বলবেন।

​হাতে সময় নেই, কিছুক্ষণের মাঝেই ফ্লাইট ছেড়ে দিবে। তা না হলে আরেকটু লিখতাম। আমার জীবনে বড় আফসোস—আমি কোনোদিন কারো ভালোবাসা পাইনি। এই পৃথিবীর কেউ আমাকে ভালোবাসেনি।

​ইতি,

“কেউ না”

মেহরাব দেওয়ান চিঠির অক্ষরগুলোর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। অদ্ভুত এক নীরবতা ছেয়ে আছে ঘরে। নুসরাত যখন বিকেলের দিকে ফোন করে বলেছিল আজ রিনির ফ্লাইট, মেহরাব তখন নিজেকে খুব নির্লিপ্ত দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন। সন্ধার সময়ই পিউন এসে চিঠিটা দিয়ে গেল। কিন্তু এখন, এই মাঝরাতে চিঠির প্রতিটি শব্দ যেন বিষাক্ত তীরের মতো তার হৃদপিণ্ডকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিচ্ছে। বুকের ভেতরটা কেন জানি পাথরের মতো ভারি হয়ে আসছে। রিনির জন্য? না, মেহরাব দেওয়ান তা হতে দিতে পারেন না। তিনি তো শুধু রাধিকাকেই ভালোবাসতেন!

​চিঠিটা ড্রয়ারে রেখে দিয়ে মেহরাব দেওয়া ধীরপায়ে তূর্ণার রুমের দিকে এগিয়ে গেলেন। রাত তখন সাড়ে এগারোটা। দরজা খুলে লাইট অন করতেই তিনি থমকে দাঁড়ালেন। তূর্ণা এই গভীর রাতে অন্ধকার ঘরে একা বসে আছে। মেহরাব জলদি এগিয়ে গিয়ে মেয়ের সামনে বসে ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

“কী হয়েছে মামণি? এখনো জেগে আছো কেন? শরীর খারাপ লাগছে?”

​তূর্ণা খুব নিচু স্বরে উত্তর দিল, “ভালো লাগছে না পাপা।”

​“কেন পাপা? কোনো সমস্যা?”

​“তুমি আমাকে স্কুলে যেতে দিচ্ছ না। সারাদিন এই বাসায় একা বন্দি হয়ে থাকতে একদম ভালো লাগে না পাপা।”

​মেহরাব মেয়ের বিষণ্ণ মুখ দেখে নিজের অপরাধবোধ ঢাকতে একটু হাসার চেষ্টা করলেন। ওর কপালে চুমু খেয়ে বললেন,

“আচ্ছা বাবা, সরি। আগামীকাল থেকে তুমি আবার নিয়মিত স্কুলে যেও, কেমন?”

​বাবার মুখে স্কুলের কথা শোনামাত্রই তূর্ণার মুখটা এক নিমেষে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে এক ঝটকায় মেহরাবকে জড়িয়ে ধরল। খুশিতে গদগদ হয়ে হাততালি দিয়ে বলে উঠল, “কী মজা! কী মজা! কালকে সকালে আবার আম্মু… না মানে, রিনি ম্যাডামের সাথে দেখা হবে!”

মেহরাব স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তার কণ্ঠস্বর যেন কোথাও হারিয়ে গেল। তূর্ণা মেহরাবের গলা জড়িয়ে ধরে কচি হাতে বাবার মুখে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলতে লাগল, “জানো পাপা, তুমি শুধু শুধু রিনি ম্যাডামকে অপছন্দ করো। ও যে কত ভালো! আমাকে ঠিক আম্মুর মতো আদর করে। আমি ওকে অনেক অনেক বেশি ভালোবাসি পাপা, অনেক বেশি!”

​মেহরাবের চোখের মণি দুটো হঠাৎ ভিজে উঠল। চারপাশ ঝাপসা হয়ে আসছে। তিনি বলতে পারলেন না যে, আগামীকাল স্কুলে রিনি ম্যাডামকে পাওয়া যাবে না। কোনোদিন হয়তো আর সেই হাসিভরা মুখটা তূর্ণার ক্লাসের সামনে এসে দাঁড়াবে না। মেহরাব নিজের চোখের কোণ আলতো করে মুছে বললেন, “ঠিক আছে মামণি, অনেক রাত হয়েছে। এবার শুয়ে পড়ো তো।”

​তূর্ণা লক্ষ্মী মেয়ের মতো শুয়ে পড়ল। তার চোখেমুখে এখন কালকের সকালে প্রিয় ম্যাডামের সাথে দেখা হওয়ার স্বপ্ন। মেহরাব মেয়ের মাথায় হাত বোলাতে লাগলেন। তার কানে বারবার রিনির চিঠির সেই শেষ লাইনটা বাজতে লাগল “আমার জীবনে বড় আফসোস, আমি কোনোদিন কারো ভালোবাসা পাইনি। পৃথীবির কেউ আমাকে ভালোবাসেনি।”

​মেহরাব মনে মনে অস্ফুট স্বরে বললেন, “রিনি, আপনি ভুল লিখেছেন। আপনাকে অন্তত একজন ভালোবাসত। এই ছোট্ট তূর্ণা আপনাকে পাগলের মতো ভালোবেসেছে।”

#চলবে..

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply