ডাকপ্রিয়র চিঠি
লেখিকা:রিক্তাইসলাম মায়া
৩০
রাতের শেষ প্রহর কাটিয়ে ভোর হতে চলল।
সৈয়দ বাড়িতে হাহাকার করে চিৎকার করছে শান্তা। শাহ সৈয়দ সাহেব এতক্ষণ মেয়ের নিকট বসে থেকে মাত্রই রুমে ফিরে গেছেন তিনি। বয়স্ক মানুষ রাত জাগতে পারে না। কিন্তু যখন রাত দেড়টার দিকে উত্তরা থানা থেকে পুলিশ কল করে জানায়, রিফাত খন্দকার অনৈতিক কাজের জন্য মেয়েসহ ধরা পড়েছে উনাদের কাছে। তারপর থেকেই সৈয়দ বাড়িতে অশান্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মারিদের মেজো চাচা সৈয়দ রবিউল আলম বাসায় না থাকায়, মারিদের বাবা মাহবুব আলম ও তার ছোট ভাই মকবুল আলম ঘুম থেকে হন্তদন্ত হয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। রিফাতের বাবা খালেদ খন্দকার নিজ বাড়ি থেকেই গাড়ি নিয়ে থানায় পৌঁছায়। শান্তার দুই সন্তান। রিফাত আর তাপস। তাপস সুখের চেয়ে দুই বছরের বড়। সে এই বছর ২০১৫ সালে এইচএসসি পরীক্ষার্থী। আর সুখ ২০১৫ সালের রানিং এসএসসি পরীক্ষার্থী। রিফাতের অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার কথা শুনেই তাপসকে নিয়ে স্বামীঘর ছাড়ে শান্তা। মধ্যরাতে নিজ বাড়িতে এসেই সেকি আহাজারির চিৎকার! শান্তর আহাজারিতে পুরো সৈয়দ বাড়ির মধ্যরাতে ড্রয়িংরুমে চিন্তিত মুখে উপস্থিত হন। রাত জেগে অপেক্ষাও করেন। সালমা সৈয়দ স্বামী-দেবরকে থানায় পাঠিয়ে মারিদ ও রাদিলকে কল করছে রিফাতের কথাটা জানানোর জন্য। মারিদ ও রাদিল দুজনের ফোন বন্ধ থাকায় উনাদের টেনশন আরও বাড়ে। রাদিলের মাকে কল করার সঙ্গে সঙ্গে খবর পেয়ে হীরা চৌধুরীও মধ্যরাতে ড্রাইভারকে নিয়ে সৈয়দ বাড়িতে উপস্থিত হন। পরিস্থিতি সামলাতে শান্তাকে বারবার সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। রাদিলের খবর রাত থেকে হীরা চৌধুরীর কাছেও নেই। রিফাতের টেনশনে বারবার নিজের সন্তানের কথাও মনে পড়ছে উনার। টানা চার ঘণ্টার পর ভোররাতের দিকে ক্লান্তিতে সৈয়দ বাড়িতে একে একে ফিরে আসেন বাড়ির পুরুষরা। খালেদ খন্দকারও মাহবুব আর মকবুলের সঙ্গে থানা থেকে সোজা সৈয়দ বাড়িতে এসেছেন। রিফাত বিয়ে করে থানা থেকে কোথায় গেছে কেউ জানে না। রিফাতকে অনেক কল করা হয়েছে কিন্তু ফোনটা বন্ধ বলছে। বাড়িতে ঢুকে বোনের কান্নাকাটি দেখে মাহবুব আলম সোফায় বসতে বসতে ক্লান্ত গলায় বলল—
‘যা হবার তা হয়ে গেছে শান্তা। তুই এসব নিয়ে এখন কান্নাকাটি করলে সবকি আবার ঠিক হয়ে যাবে?
‘সবকিছু ঠিক হবে না বলে কি আমি এখন কান্নাকাটিও করতে পারব না ভাই? আমি মা, আমার কি কষ্ট লাগবে না পেটের সন্তান এমন করলে! আমি কতবার করে বললাম ওকে বিয়েটা করে ফেল, আমরা মেয়ে দেখি, অথচ আমার সাথে সবসময় না করে চলেছে, বিয়ে এখন করবে না, আগে মারিদ, রাদিল করবে তারপর ওহ বিয়ে করবে। আমাকে মিথ্যা বুঝিয়ে-বাজিয়ে এখন ও নিজের ছাত্রীকে নিয়ে হোটেলে ধরা পড়ল। ওর পছন্দ আছে জানলে আমরা কি না করতাম ভাই? আমরা তো খুশি খুশি মেনে নিতাম। আমার ভালো ছেলেটাকে কীভাবে এমন করল ভাই। ওর নিজের ছাত্রীকে পছন্দ করে জানলে আমরা এটাও মেনে নিতাম। সম্মানের সহিত দুজনের বিয়ে দিতাম। এখন লোকে জানাজানি হলে আমাদের মানসম্মান কিচ্ছু থাকবে না ভাই। সব শেষ হয়ে যাবে। মানুষ আমাদের উপর থুথু ছিটাবে…
শান্তা আহাজারি করে কাঁদছে। হীরা চৌধুরী পাশে বসে সান্ত্বনা দিচ্ছে। মাহবুব আলম বলল—
‘যা হবার হয়ে গেছে। আপাতত শান্ত হ তুই। রিফাত আগে বাড়িতে ফিরুক তারপর কথা বলে সবকিছু জানা যাবে। ফাতেমা, শান্তাকে ঘরে নিয়ে যাও।
‘জি ভাই।
ফাতেমা সৈয়দ শান্তাকে ধরে উপরে ঘরের নিয়ে গেল। তাপস এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল, সেও মায়ের পিছন পিছন গেস্টরুমে গেল ঘুমাতে। এই বাড়ির ভদ্র একটা নিয়ম আছে সেটা হলো যখন বাড়ির বড়রা কথা বলে তখন ছোটরা চুপ থাকবে। মাঝে কথা বলবে না। সেক্ষেত্রে তাপস একা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল না, সঙ্গে তার মেজো মামাতো ভাইবোন আফিয়া, সুফিয়া, তামিম দাঁড়িয়ে ছিল। সুখ ঘুমপটু মানুষ। একবার ঘুমাতে পারলে সহজে ওকে টেনে তোলাও যায় না। সুখের রুমটা মারিদের রুমের পাশাপাশি হওয়ায় নিচের কোলাহলের শব্দ সুখের রুমে পৌঁছায় না। রিফাতকে নিয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোও সুখ শোনেনি। রাতুল, রাদ ছোট মানুষ হওয়ায় ওরাও মায়ের রুমে ঘুমায়। আজকের ঘটনা তাদেরও অজানা। মাহবুব আলম ফের ভারী গলায় বলেন…
‘ বাকিরা সবাই যার যার ঘরে গিয়ে ঘুমাও। এসব বিষয়ে কেউ আপাতত কোনো কথা ঘরে তোলার দরকার নেই। পরিস্থিতি আগে শীতল হোক। রিফাত বাড়ি ফিরলে মারিদ-রাদিলকে দিয়ে ওরা সাথে কথা বলিয়ে নেওয়া যাবে। রিফাতের বিয়ে যেহেতু হয়ে গেছে তোমরা একদিন গিয়ে মেয়েটাকে দেখে এসো। মেয়েটার ভরণপোষণের খরচও দিয়ে এসো। এটা আমাদের দায়িত্ব। তারপর সবাই মিলে আনুষ্ঠানিক বিয়ের একটা ডেট বের করা যাবে।
সকলে নিরব সম্মতি জানালো মাহবুব আলমের কথায়। সালমা কাজের মেয়ে রেণুকে দিয়ে মাহবুব, মকবুল, খালেদের জন্য ঠান্ডা পানি আনায়। ক্লান্তিতে সকলেই পানি পান করে। মাহবুব হাতের গ্লাসটা ট্রে-তে রাখার সময় হীরা চৌধুরী মারিদ ও রাদিলের খোঁজ করে বলল—
‘ভাই, আপনি মারিদ ও রাদিলের কোনো খোঁজ জানেন? রাতের পর থেকে ওদের কোনো খবর পাচ্ছি না। আমি অনেকবার কল দিয়েছিলাম ওদের কিন্তু খোঁজ পাইনি। ফোনটাও বন্ধ সবার। আপনি কিছু জানেন?
মারিদের কথা আসতেই মাহবুব আলমের মাঝে নমনীয়তা দেখা যায়। চিন্তিত বলিরেখা কপালে ফুটে ওঠে। তিনি হীরা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললেন—
‘সন্ধ্যায় মারিদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল, বলেছিল ওরা আজ রাতেই ঢাকা পৌঁছাবে। রিফাতের ঘটনার জন্য মারিদ, রাদিল, হাসিব—তিনজনকেই কল দিয়েছিলাম, মারিদের ফোন বন্ধ। রাদিল ও হাসিবের ফোনে প্রথম কয়েকবার কল গিয়েছে, পরে দুটো ফোনই বন্ধ বলছে। রিফাতকে নিয়ে দৌড়াদৌড়িতে মারিদের কথা মাথা থেকে ছুটে গিয়েছিল। কখনো তো এমন হয় না, তিনজনের ফোন একত্রে কীভাবে বন্ধ হবে? ওদের কোনো সমস্যা হয়নি তো আবার?
বিপদের কথা শুনে কলিজা ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো একেকজনের। স্বামী ছাড়া একমাত্র রাদিলকে নিয়েই অ্যাডভোকেট হীরা চৌধুরীর সংসার। রাদিলের কিছু হয়ে গেলে জগৎ-সংসার অন্ধকার হীরা চৌধুরীর। সালমা বেগম হাইহাই করে উঠল। স্বামীর কথায় প্রতিক্রিয়া জানাল তৎক্ষণাৎ—
‘আমার ছেলেদের ফোন রাত থেকে বন্ধ আর আপনি এটা এখন জানাচ্ছেন? কেমন বাবা আপনি? আমার সন্তানদের কোনো খোঁজ জানার চেষ্টা করছেন না? ওদের কোনো বিপদও তো হতে পারে!
কথাগুলো বলতে বলতে সালমা সৈয়দ ঝরঝরে করে কাঁদতে শুরু করলেন। মুনিয়া দ্রুত এগিয়ে এসে সালমার পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছে। আজকের রাতটা যেন কালরাত মনে হচ্ছে সৈয়দ বাড়ির একেকজনের। এই বাড়ির প্রত্যেকটা ছেলের উপর দিয়ে যেন কালশনি যাচ্ছে। সালমার কান্নাকাটি দেখে শক্তপোক্ত হীরা চৌধুরীর চোখেও জল চকচক করছে। পরিস্থিতি বুঝে খালেদ মাহবুবকে প্রশ্ন করে বলল—
‘মারিদ, রাদিল ওরা কোথায় আছে আপনি কি সেই ঠিকানার কিছু জানেন ভাই? জানলে লোক পাঠান, ছেলেদের খোঁজ নেওয়া জরুরি। এভাবে চুপ করে থাকা তো যায় না।
মাহবুব আলম চিন্তিত মুখে বলেন…
‘মারিদ কিসের হসপিটালের প্রজেক্ট করছে থানচিতে। এক সপ্তাহ ধরে রাদিলকে নিয়ে সেখানেই আছে। হাসপাতালের প্রজেক্টের সঠিক তথ্য আমি জানি না। তবে মারিদের ম্যানেজারের কাছে এসব বিষয়ে সব তথ্য পাওয়া যাবে খালেদ।
‘তাহলে দ্রুত মারিদের ম্যানেজারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মারিদের খোঁজ নেন ভাই। এভাবে চুপ করে থাকাটা বিপদজনক হবে।
খালেদের কথা যুক্তিসঙ্গত মনে করে মাহবুব আলম সাদা পাঞ্জাবির পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করতে গিয়ে তৎক্ষণাৎ ফোনটা বেজে উঠল। রাত তখন ৪:১৫ বাজে। এইরাত মারিদের কল হবে সেই আশায় মাহবুব মাত্রই ফোনটা হাতে নিলেন, কিন্তু দেখলেন একটি অপরিচিত নাম্বার থেকে উনার ফোনে কল এসেছেন। মারিদের কোনো বিপদ হয়েছে কি না সেই আশঙ্কায় মাহবুব আলম ফোনটা দ্রুত রিসিভ করে কানে নিয়ে ‘হ্যালো’ বলতে ফোনের ওপাশ থেকে মারিদের উচ্চস্বরে সালামের ধ্বনি শোনা যায়। মারিদের গলা পেয়ে আবেগাপ্লুত মাহবুব আলম বলতে লাগল—
‘আব্বা? ওহ আব্বা? আপনারা এখন কই আছেন? সবাই সুস্থ আছেন তো? আপনাদের সবার ফোন একত্রে বন্ধ কেন? আপনি জানেন না আপনাদের ফোন বন্ধ থাকলে আপনাদের বাবা-মা টেনশনে থাকে?
মারিদ ফোনের ওপাশে কী বলল কেউ শুনেনি। মাহবুব আলমের নমনীয় মুখটা ক্রমশই টেনশনে আর ক্রোধে লাল হয়ে গেল মারিদের সঙ্গে ফোনালাপের পরপরই, অথচ মুখে তিনি টুঁ-শব্দটিও করলেন না। মারিদ বেশ সময় নিয়ে অনেক কিছুই বলেছে মাহবুব আলমকে। তিনি চুপ করে সবটা শুনেছেন এবং হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে মারিদকে শুধু এতটুকুই বলতে শোনা গেল—
‘আপনার বাবা এখনো জীবিত আছে আব্বা। আপনি সৈয়দ মাহবুব আলমের একমাত্র ছেলে মারিদ আলতাফ। আপনার জন্য জান কুরবান। আপনার বাবা সকালের মধ্যেই আপনার কাছে পৌঁছে যাবে। আপনি চিন্তা করবেন না আব্বা।
অতঃপর মারিদের কল কেটে যায়। বাপ-ছেলের মধ্যে কী কথা হয়েছে উপস্থিত কেউ জানে না। সকলে মাহবুব আলমের কথা শুনেছে, কেউ মারিদের কথা শুনতে পায়নি। মাহবুব আলম যতটুকু কথা বলেছে, তা থেকে সকলেই বুঝতে পেরেছে মারিদরা কোনো বিপদে আছে। সে জন্যই মাহবুব আলম এই রাতে বেরিয়ে যাচ্ছে ছেলের জন্য। সঙ্গে মকবুল ও খালেদকে নিয়ে যাচ্ছে। যাওয়ার আগে মাহবুব আলম এতটুকুই সকলের উদ্দেশ্যে বলল—
‘কারও কোনো টেনশন করার দরকার নেই। বাড়ির পরিস্থিতি ভালো না। সবাই বাবা আর শান্তার খেয়াল রেখো। হীরা, তুমি আজকে আর বাড়িতে যাওয়ার দরকার নেই। আমরা না ফেরা পর্যন্ত এই বাড়িতে সবার সাথে থাকো। আমি খালেদ ও মকবুলকে নিয়ে যাচ্ছি থানচিতে। রবিউলকে বলব যশোর থেকে সরাসরি থানচিতে পৌঁছাতে। আমরা আজকে ফিরতে না পারলে কাল চলে আসব ইনশাআল্লাহ। তোমরা বাড়ির মহিলারা কেউ টেনশন করো না। আসছি…
স্বামীর কথায় কান্নাকাটি শুরু করে দেন সালমা। নিশ্চয়ই মারিদের কোনো বিপদ হয়েছে, সে জন্যই মাহবুব হন্তদন্ত হয়ে খালেদ ও মকবুলকে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। হীরা চৌধুরী বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মাহবুব আলমকে পিছন ডেকে বলেন—
‘কী হয়েছে ভাই? কোনো বিপদ হয়েছে ছেলেদের? আমি আসব?
হীরা চৌধুরীকে না করতে গিয়েও কী মনে করে মাহবুব আলম হীরা চৌধুরীকেও সঙ্গে নিয়ে নিলেন। হীরা চৌধুরী শক্ত ব্যক্তিত্বের মানুষ। মেয়ে মানুষ হয়েও ঐখানকার পরিবেশটা বাকিদের থেকে দ্রুত বুঝে উঠতে পারবে। থানচিতে দ্রুত পৌঁছাবার লক্ষ্যে দুটো হেলিকপ্টার ভাড়া নেন মাহবুব আলম। হেলিকপ্টার আসার সময়টুকুর মাঝে থানচিতে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা মাহবুব সবাইকে বলে বুঝায়। পাঁচ মিনিট সময়ে মারিদ যতটুকু মাহবুব আলমকে বলেছিল, সেটুকু মাহবুবও খালেদ, মকবুল আর হীরাকে বলে। সবটা শুনে বাকহারা সকলেই। হেলিকপ্টার উড়ার আগমুহূর্তে রবিউল আলমকেও যেকোনো মূল্যে থানচিতে উপস্থিত হতে বলেন মাহবুব আলম।
~~
চারদিকে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। একটা দীর্ঘ কালো রাতের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ধরণীর বুকে সূর্যের দেখা মিলবে। সারারাত ঝড়-বৃষ্টির শেষে ধরণী যেন গোসল করে সতেজ হয়েছে, শীতল দক্ষিণা হাওয়া বইছে চারপাশে। কালিঘাটি থেকে ফেরার পরপরই নূরজাহান আশনূরের হাত ছাড়িয়ে মায়ের কবর জড়িয়ে আর্তনাদের চিৎকার করে। নূরজাহানের প্রতিটা চিৎকার মনে হচ্ছিল মারিদের কলিজা ছিঁড়েখুঁড়ে হাজারো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। মস্তিষ্কের প্রতিটা নিউরনে তপ্ত শিখার আগুন জ্বলছিল। মনে হচ্ছিল যে বা যারা মারিদের অপরিচিতাকে এভাবে কাঁদাচ্ছে, তাদের নাম দুনিয়ার মাটি থেকে মুছে ফেলতে। মারিদ কাউকে ছাড়বে না। একটা অন্ধকার রাতের ঘনত্ব কেটে গেছে। ভোর হয়েছে, এখন সূর্য উঠবে। সেই সূর্যের আলোয় মারিদ সেসব মানুষদের ধ্বংস করবে যারা রাতের অন্ধকারে অপরিচিতাকে কষ্ট দিয়েছে, অপরিচিতার সম্মান নিয়ে খেলা করেছে। মারিদ কাউকে ছাড়বে না। মারিদ নিজের পরিবার থেকে শুরু করে নিজের সর্বোচ্চ ক্ষমতা খাটিয়ে ফেলেছে এতক্ষণে। সকালের সূর্য কয়েকজন মানুষের জন্য কাল হয়ে উঠবে। বর্তমান সময়ের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের নেতৃত্বাধীন নোটিশনামায় কয়েকজনকে আইনের আওতায় আনা হবে। সবার আগে ক্ষমতার টান পড়বে সওদাগর পরিবারের লোকজনের। যারা এতদিন ক্ষমতা বলে গ্রামে দাপট দেখিয়ে চলত, আজ তাদের সঙ্গে মারিদ ক্ষমতার খেলা খেলবে দিনের আলোতে।
মারিদের শরীরে রাতের ছেঁড়া কাদামাখা শার্টটা এখনো জড়িয়ে। রাদিল ও হাসিব গোসল করে ফ্রেশ হয়ে গেছে। মারিদ নূরজাহানকে নিয়ে পুকুরে নামার পর থেকে সেই ভেজা শরীরেই দাঁড়িয়ে আছে। দক্ষিণা বাতাসে ভেজা শরীর শুকিয়ে গেছে, তারপরও মারিদ ফ্রেশ হতে ঘরে যায়নি। নূরজাহানকে নূরজাহানের ঘরে মারিদই কোলে করে দিয়ে এসেছিল। রাদিল নূরজাহানকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছে। নূরজাহানের ক্ষত পা-টা এই কয়েক দিনে শুকিয়ে উঠেছিল কিন্তু আজকের ঘটনায় আবারও নূরজাহানের আহত পা-টার ক্ষতস্থান তাজা হয়েছে। আপাতত নূরজাহান বেহুঁশ নাকি হুঁশে ফিরেছে মারিদ জানে না। নূরজাহানের ঘরে সে যায়নি। যদিও দুজন ধর্মীয় মতে স্বামী-স্ত্রী, তারপরও মারিদ জানে না এই বিয়ের শেষটা কী হবে? বিয়ের রেজিস্ট্রার, কাবিননামা কিছুই হয়নি। মৌখিক জবানে পাঁচ লাখ টাকার মতো একটা দেনমোহর ধরা হয়েছিল দুজনের।
রাদিল মারিদের খোঁজে ঘর ছেড়ে বের হতে মারিদকে নূরজাহানের মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে মারিদের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বলল—
‘এভাবে নিস্তব্ধ না থেকে গিয়ে ফ্রেশ হ মারিদ। কিছুক্ষণ রেস্ট নে তারপর যা করার সুস্থ মস্তিষ্কে ভেবেচিন্তে কর। আমি জানি তুই খুব ডিস্টার্ব। কিন্তু এভাবে নিজেকে নিস্তব্ধ রেখে কোনো কিছুর সমাধান পাবি না তুই।
নূরজাহানের মায়ের কবরটার দিকে তাকিয়ে মারিদ বলল…
‘আমার বুকে ভীষণ রক্তক্ষরণ হচ্ছে রাদিল। মনে হচ্ছে প্রতিনিয়ত কেউ আমার বুকে ছুরি চালাচ্ছে। যখন মনে পড়ে আমার অপরিচিতার অসহায়ত্ব, হাউমাউ চিৎকার—তখন আমি অশান্ত, এলোমেলো, পাগল হয়ে যাই। সবকিছু ধ্বংস করে দেওয়ার তীব্র স্পৃহা জাগে মনে।
মারিদের কথায় রাদিল প্রসঙ্গে পাল্টে বলল…
‘তুই এই বিয়েটাকে কীভাবে দেখছিস মারিদ? নূরজাহানের সঙ্গে বিয়েটা মানছিস নাকি অন্য কিছু?
‘বাসায় আমার বিয়ের বিষয়টা বাবাকে জানিয়েছি। বাবা তোর আম্মা, ফুফা আর কাকাদের নিয়ে এখানে আসছে।
মায়ের কথা শুনে রাদিল অবাক হয়ে বলল—
‘আম্মু আসছে এখানে সত্যি?
‘হুম। ফুফু একজন অ্যাডভোকেট। আমার প্রয়োজনে পড়বে উনাকে। উনি অপরিচিতার সঙ্গে কথা বললে হয়তো অপরিচিতার এ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে মনোবল পাবে।
‘হাসান আঙ্কেল মানবে এই বিয়েটা? যদি উনি ঝামেলা করেন?
‘করবে না।
‘কীভাবে বুঝলি?
মারিদ তীক্ষ্ণতা জবান দিয়ে বলল…
‘ হাসান আঙ্কেল নূরজাহানকে হেফাজতেখতে চান, যেটা উনার একার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আমি পাশে থাকলে উনার জন্য বিষয়টা আরও সহজ হবে। এতদিন উনি শুধু আমাকে হাসপাতালের কাজের সূত্রে একজন শুভাকাঙ্ক্ষী মতোই চিনত, সেজন্য আমাকে এখনো ভরসা করতে পারেননি। আজ আমি উনার মেয়ের জামাতা। যেভাবে হোক বিয়েটা হয়ে গেছে। উনার ভরসার জায়গাটা আমাকেই অর্জন করতে হবে। সেজন্য আমি আমার পরিবারকে ডেকেছি এখানে। আমার পরিবারের সঙ্গে হাসান আঙ্কেল কথা বললে হয়তো আমার উপর উনার আস্থা, বিশ্বাস ও ভরসা করা সহজ হবে।
মারিদ রাত থেকে বাইরে দাঁড়িয়ে। বিশ্রাম নেয়নি। নূরজাহানের ঘরে আশনূর, হাসান, তারানূর, ফুলবানু সকলেই বসে ছিল। তারানূর ফুলবানুকে নিয়ে নিজের ঘরে গিয়েছেন, সারারাত জেগে থাকায় বয়স্ক মানুষগুলো অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। মাজিদ সবে নিজের ঘরে গিয়েছে। সাজিদ, শাহানা এত হাঙ্গামার, চিৎকার-চেঁচামেচি পরও ঘর থেকে বেরোয়নি কেউ। আশনূর নীরবে চোখের জল ফেলছে। কালিঘাটিতে ঘটে যাওয়া বিশ্রী ঘটনার শিকার শুধু নূরজাহান নয়, আশনূরও হয়েছে। মনের কোণে যতবার নোংরা ছোঁয়াগুলো মনে পড়ছে, ততবারই দরদর করে চোখের জল পড়ছে। হাসান নূরজাহানের পায়ের দিকটায় ফ্লোরে বসে। বেহুঁশ নূরজাহান দীর্ঘ কালো রাত্রির ছায়া কাটিয়ে এখন ঘুমে। হাসান আশনূরকে বারবার চোখ মুছতে দেখে হাত বাড়িয়ে আশনূরকে নিজের কাছে ডেকে বলল—
‘আমার কাছে আইসা বসেন আম্মা।
হাসান সচরাচর আশনূরকে আম্মা বলে ডাকে না। আশনূর বলেই ডাকে। আজকে ডেকেছে। আশনূর গুটি পায়ে হাসানের পায়ের কাছাকাছি বসতে, হাসান আশনূরের মাথায় ভরসার হাত রেখে আশনূরের মাথায় চুমু খেয়ে বলল—
‘আমার কলিজার টুকরো মাইয়াগোরে কষ্ট দেওয়ার একটা পাপীও ছাড় পাইব না আম্মা। আমার মাইয়াগোর শরীরের কলঙ্কের দাগ আমি তাগো রক্তের শোধ করমু। ওয়াদা দিলাম।
আশনূর ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, হাসানকে জড়িয়ে ধরল। বাবার কাঁধে মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে আশনূর বলল—
‘আমাদের জীবনটা এতো এলোমেলো কেন আব্বা? আমাদের কি কোথাও এক টুকরো শান্তি নেই? এতো দুর্বিষহ জীবন কেন আমাদের? এই জীবনে কি আমরা আর সুখের দেখা পাব না আব্বা?’
চলিত…
[ ঘুমঘুম চোখে পর্বটা কোনো রকমের লিখে দিলাম। জানি ছোট হয়েছে পরবর্তী পর্ব খুব দ্রুত দেওয়ার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ ]
Share On:
TAGS: ডাকপ্রিয়র চিঠি, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৮১(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৬৯
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৬
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৬২
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা) সিজন ২ পর্ব ২৬
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৮ শেষাংশ
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৩৩
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১১
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৮৪