প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৩৮ (অন্তিম পর্ব)
মুন্নিআক্তারপ্রিয়া
সময়কে কীভাবে ব্যাখা করা যায়? কোন শব্দ দিয়ে? এর সঠিক উত্তর প্রণয়ের কাছে নেই। গত দেড়টা বছর তার কাছে সময়ের আরেক নাম ছিল দুঃখ, কষ্ট ও অপেক্ষা। কিন্তু আজ তার কাছে সময়ের আরেক নাম আনন্দ ও অপেক্ষার ফল। এই দেড়টা বছর প্রণয় নিজের সাথে যু’দ্ধ করেছে, মনকে নানান রকমভাবে বুঝিয়েছে, নিজেকে গুনগুনের জন্য প্রস্তুত করেছে। বেশি বেশি কোর্স নিয়ে অনার্স শেষ করেছে। এর পাশাপাশি সে আরেকটা কাজ করেছে। ওদের রেস্টুরেন্টের বিজনেসটাও আরো বড়ো করেছে। এখন এই রেস্টুরেন্টের পুরো দায়িত্ব মাসুদ ও কুলসুমের ওপর। প্রণয় দুজনকেই সব বুঝিয়ে দিয়েছে।
মাসুদ বসে আছে প্রণয়ের ঘরের একটা চেয়ারে। জানালার পাশে বসেছে বিধায় হালকা অকৃত্রিম বাতাসও টের পাচ্ছে। কুলসুম প্রণয়ের লাগেজগুলো শেষবারের মতো চেক করে দেখছে সব ঠিকঠাক আছে কিনা। সব লাগেজ চেক করা শেষ হলে কুলসুম বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“প্রণয়, সব চেক দিয়ে দিয়েছি আমি। সব ঠিকঠাক আছে।”
প্রণয়ের সেদিকে কোনো হেলদোল নেই। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শার্টের কলার ঠিক করে জিজ্ঞেস করল,
“আগে দেখ তো, আমাকে ঠিকঠাক লাগছে কিনা?”
কুলসুম প্রণয়কে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পরখ করে বলল,
“হ্যাঁ, একদম পার্ফেক্ট।”
“শার্ট ঠিক আছে?”
“হ্যাঁ।”
“গুনগুন বলেছিল, সাদা শার্টে নাকি আমাকে বেশি সুন্দর লাগে, হ্যান্ডসাম লাগে।”
“এজন্য আজ সাদা শার্ট পরেছিস?”
“একদম ঠিক ধরেছিস।”
“ওর কি আজ আর তোর শার্ট দেখার সময় থাকবে?”
“কেন থাকবে না?”
“তোকে দেখেই তো কুল পাবে না।”
প্রণয় একটু লজ্জা পেয়ে গেল। মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বলল,
“যাহ্!”
কুলসুম শব্দ করে হেসে উঠল। বিপ্লব এলো তখন বাসায়। সে গিয়েছিল গাড়ি ঠিক করতে। এসে জিজ্ঞেস করল,
“রেডি?”
প্রণয় শার্টের হাতা গুটিয়ে বলল,
“অলমোস্ট ডান।”
বিপ্লব এরপর কুলসুমের সাথে কথা বলায় ব্যস্ত হয়ে গেলে, প্রণয় আয়নায় মাসুদের দিকে তাকাল। প্রণয়ের ফ্লাইটের ডেট জানার পর থেকেই মাসুদ বেশিরভাগ সময় এমন মনমরা হয়ে থাকে। অবশ্য এটাই তো খুব স্বাভাবিক। ওর প্রাণপ্রিয় বন্ধু একেবারের জন্য দেশ ছাড়ছে বলে কথা। আবার কবে আসবে, কবে দেখা হবে তার তো কোনো ঠিক নেই।
প্রণয়ের আজ ফ্লাইট বলে পমিলা বেগম গতকাল রাতেই ছেলের বাসায় চলে এসেছিলেন। এখন তিনি নাস্তা বানাচ্ছেন। প্রণয়কে জলদি রেডি হতে বলে কুলসুম রান্নাঘরে গেল পমিলা বেগমের কাছে। বিপ্লব গেল ওয়াশরুমে ফ্রেশ হওয়ার জন্য।
গায়ের পারফিউম স্প্রে করতে করতে মাসুদকে প্রণয় জিজ্ঞেস করল,
“এমন দেবদাসের মতো বসে আছিস কেন?”
মাসুদ নিরুত্তর। প্রণয় দীর্ঘশ্বাস নিল। পারফিউমের বোতলটা ড্রেসিংটেবিলের ওপর রেখে, আরেকটা চেয়ার নিয়ে মাসুদের পাশে বসল। বলল,
“এভাবে মন খারাপ করে থাকলে হবে?”
“আমার মন খারাপ না। আমি ঠিক আছি। আমারে নিয়া তোর এত চিন্তা করা লাগব না।” উদাস ও ভারী কণ্ঠে বলল মাসুদ।
“তা বললে কি হয়? তুই আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। তোর মন খারাপ দেখলে তো আমারও খারাপ লাগে।”
মাসুদ আরেকটু নরম হলো। প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুই গুনগুনের জন্য এই পর্যন্ত যত কিছু স্যাক্রিফাইজ করলি তা কি কোনো স্বামী করে? গুনগুন তোর জন্য করছে?”
প্রণয় হেসে বলল,
“ধুর, বোকা! হিসাব করে কি ভালোবাসা পরিমাপ করা যায় নাকি? আমি ওর জন্য কী কী করেছি, ও আমার জন্য কী কী করেছে এসব হিসাব যদি মেলাতে যাই তাহলে সম্পর্কটা আর শুধু ভালোবাসার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটা কখনো ভালোবাসা হতে পারে না।”
“তাইলে ভালোবাসা কী?”
“ভালোবাসা হলো, আশাহীনভাবে ভালোবেসে যাওয়া। ঐপাশের মানুষটা আমার জন্য কী করতেছে, কতটুকু করতেছে তা আমার দেখার প্রয়োজন নেই। আমার মনে ওর জন্য যতটা ভালোবাসা জমা আছে, আমি ততটাই ভালোবেসে যাব পাগলের মতো, কোনো রকম আশা ছাড়াই। ওর মুখের হাসির জন্য আমার যতকিছু ছাড়তে হয়, আমি ছাড়ব। এরজন্য না কখনো ওকে প্রশ্ন করব, আর না নিজেকে। আমার ভালোবাসায় কোনো স্বার্থ নেই। আমি স্বার্থহীনভাবে ভালোবাসি। গুনগুন যদি কখনো আমাকে ছেড়েও যেত, তবুও আমি ওকে কোনো প্রশ্ন করতাম না। ওকে প্রশ্ন করা মানে আমার অস্ত্বিত্বকে প্রশ্ন করা। তাছাড়া যে থাকতে চাইবে না তাকে কখনো জোর করেও রাখা উচিত নয়।”
মাসুদ তাকিয়ে আছে। প্রণয় হেসে বলল,
“তাছাড়া গুনগুনও কিন্তু আমার জন্য কম স্যাক্রিফাইজ করেনি মাসুদ। ওর মধ্যে কী কমতি ছিল? চাইলেই তো আমার থেকে বেটার কাউকে বিয়ে করতে পারত। আমাকে ভালো না বেসেও ও ওর পরিবার ছেড়েছে। আমার মতো বখাটে ছেলেকে ভালোবেসেছে। এক জীবনে আমার মতো ছন্নছাড়া আর ছেলের জন্য এরচেয়ে বেশি আর কী-ই বা দরকার ছিল বল তো? গুনগুন যদি আমার জীবনে না আসত, কখনো আমার মাথায় হয়তো ফ্যামিলি টাইপ চিন্তা-ভাবনা আসতো না, জীবনকে গুছানোর তাগিদ থাকত না, আমার যে ক্যারিয়ার গড়তে হবে এই চিন্তাও কখনো মাথায় আসতো না। একমাত্র ওর জন্যই আমি গ্রাজুয়েশন শেষ করার ইচ্ছে শক্তি খুঁজে পেয়েছি। তাছাড়া তোরা যা না দেখেছিস, তা আমি দেখেছি। আমি দেখেছি, আমার গুনগুন কীভাবে চোখের নিচে কালি পড়া মুখটা নিয়ে আমার সাথে হেসে হেসে কথা বলে। আমি দেখেছি, আমার গুনগুন কথা বলার মাঝেই কান্না লুকাতে কাজের বাহানা, মামি ডাকার বাহানা দিয়ে ক্যামেরার সামনে থেকে সরে যেত। ওর চোখের পানি, ভাষা আমি বুঝি মাসুদ, যেটা তোরা বুঝিস না। আমি তো এটুকুও কখনো আশা করিনি। কিন্তু আল্লাহ্ তাও আমাকে দুহাত ভরে দিয়েছে। গুনগুনকে দিয়েছে।”
মাসুদ মুচকি হাসল। প্রণয়ের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“তোর ভালোবাসা পরিমাপ করার সাধ্য আমার নাই। সারাজীবন এমন কইরাই দুইজন দুইজনরে ভালোবাইসা যা দোয়া করি।”
প্রণয় হেসে মাসুদকে জড়িয়ে ধরল। বলল,
“তুইও সারাজীবন আমার বেষ্টফ্রেন্ড হয়ে আমার জীবনে থেকে যা।”
“আমি তো থাকমুই! তুই ছাড়া আমার আর বন্ধু আছে কে?”
“কেউ যেন না-ও হয়।”
কুলসুম ওদেরকে খেতে যাওয়ার জন্য ডাক দিতে এসে বলল,
“বাহ্, বাহ্ কত ভালোবাসা দুজনের! আগে আয় খেয়ে নিবি। পরে আবার ফ্লাইটের জন্য আবার দেরি হয়ে যাবে।”
.
.
গুনগুনের কয়েকদিন ধরে খুব পড়াশোনার চাপ যাচ্ছে। রাত জেগে অ্যাসাইনমেন্ট করা, প্রজেক্টের কাজ, দিনে ক্লাস সব মিলিয়ে সে দারুণ রকম ব্যস্ত। এই ব্যস্ততাও গিয়ে হার মানে প্রণয়ের কাছে। হাজার ব্যস্ততা থাকলেও মনটা হঠাৎ হঠাৎ উতলা হয়ে যায় প্রণয়কে একটু দেখার জন্য, কণ্ঠ শোনার জন্য। তখন তার মন ছুটে যাওয়াকে আর সে আটকে রাখতে পারে না। প্রণয়কে কল করে, দুই তিন মিনিট কথা বলে মনের তৃষ্ণা মেটায়। ক্লান্ত শরীর বিশ্রাম না পেলেও, ক্লান্ত মন ঠিকই বিশ্রাম পায়।
আজও তার শরীর ক্লান্ত, কিন্তু মনের আনন্দ সেই ক্লান্তির কাছে তুচ্ছ। কারণ প্রণয় আসছে বলে কথা! গুনগুন গোসল করে রেডি হচ্ছে। প্রণয়ের জন্য আজ সে শাড়ি পরেছে। পার্পেল কালার শাড়ির সাথে, সাদা ব্লাউজ। খুব হালকা সাজ। সিয়া তখন কফি নিয়ে এলো রুমে। গুনগুনের অর্ধেক সাজ দেখেই বলল,
“কী সুন্দর লাগছে তোমাকে!”
সলজ্জিত হেসে গুনগুন জবাব দিল,
“এখনো তো সাজ শেষই হলো না ভাবি!”
“তবুও সুন্দর লাগছে। পরির মতো।”
গুনগুন এবারও হাসল। সিয়া কফির মগ এগিয়ে দিয়ে বলল,
“নাও।”
“এখন আবার কফি কেন?”
“শরীর ঝরঝরে লাগবে, মন হালকা হবে।”
“মন হালকা হবে না ভাবি। মনটা খুব অস্থির হয়ে আছে। খুশিতে, উত্তেজনায় প্রণয়কে দেখার আগেই আমি হার্টঅ্যাটাক না করে বসি!”
“বালাইষাট! এসব আবার কী ধরণের কথা গুনগুন? এমন কিছুই হবে না। অপেক্ষার ফল পেতে যাচ্ছ অবশেষে।”
“হ্যাঁ, ভাবি। আমার এটা ভেবেই আনন্দ হচ্ছে যে, এখন থেকে আমরা একসাথে থাকব। ওকে দেখে ঘুমাতে যাব আবার ওকে দেখেই আমার ঘুম ভাঙবে সকালে। হাহাকার করা শূন্য বুকটায় পূর্ণতা পাবে। এরচেয়ে আনন্দের এরচেয়ে সুখের আর কী হতে পারে, ভাবি?”
কথাগুলো বলতে বলতে গুনগুনের চোখে পানি চলে আসে। সিয়ার চোখদুটোও আর্দ্র হয়ে এলো। সে গুনগুনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“তুমি খুব মিষ্টি! মানতেই হবে যে প্রণয় খুব ভাগ্য করেই তোমাকে পেয়েছে। এতদিন তো সেই ভাগ্যবান ব্যক্তিটাকে শুধু ছবিতে আর ভিডিয়ো কলেই দেখে এসেছি, আজ বাস্তবে দেখব।”
গুনগুন আঙুলের ডগা দিয়ে চোখ মুছল। সাথে মুচকি হাসলও সে।
বিমানটা রানওয়েতে নামার সাথে সাথে প্রণয়ের বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধকধক করতে লাগল। দেড় বছর সময়টা খুব বড়ো না। কিন্তু গুনগুনকে ছাড়া কাটানো প্রতিটা দিন যেন আলাদা করে ভারী ছিল।
এয়ারপোর্টের ভিড় পেরিয়ে যখন সে বের হওয়ার গেটের কাছে এলো, তখন তার চোখ শুধু একজনকেই খুঁজছিল। অজস্র অচেনা মুখের ভিড়ে হঠাৎ-ই সে থেমে গেল। সামনেই দাঁড়িয়ে আছে গুনগুন।
পার্পেল শাড়ি, চুলগুলো কাঁধে ছড়িয়ে আছে, চোখে অদ্ভুত এক আলো! কিন্তু সবচেয়ে বেশি বদলে গেছে মেয়েটার চোখের গভীরতা। যেন দেড় বছরের সব অপেক্ষা সেখানে জমে আছে দুচোখের মায়ায়!
এক মুহূর্ত দুজনই দুজনকে দেখে চুপ করে রইল। এত উত্তেজনা যেন মুহূর্তেই দমে গিয়েছে। স্থির হয়ে গেছে দুজনের পা। অথচ দুজনের বুকেই টালমাটাল করা হাহাকার ঢেউ, কাছে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। গুনগুনের হাতে সূর্যমুখী ফুলের সুন্দর একটা বুকে। দুহাতে খুব যত্ন করে মেয়েটা আঁকড়ে ধরে আছে। স্থির সময়টুকু কেটে গেল মুহূর্তেই। গুনগুন এক দৌঁড়ে ঝড়ের গতিতে আছড়ে পড়ল প্রণয়ের বুকে। দুহাতে শক্ত করে প্রণয় আঁকড়ে ধরেছে গুনগুনকে। ওর বুকে মাথা রেখেই হুহু করে কাঁদছে গুনগুন। তৃষ্ণার্ত মনটা তৃষ্ণা মেটাচ্ছে। প্রণয় গুনগুনের মাথাটা বুক থেকে তুলে দুগালে, চোখে, কপালে, নাকে চুমু খেল। এরপর ফের জড়িয়ে নিল বুকে।
প্রণয়ের চোখ টলমল করছে। কিন্তু সে গুনগুনের মতো করে হাউমাউ করে কাঁদতে পারছে না। সে আস্তে করে ডাকল,
“গুনগুন!”
গুনগুনের ঠোঁট কেঁপে উঠল। এতদিন ধরে কতবার এই মুহূর্তটা কল্পনা করেছে সে! কিন্তু বাস্তবে এসে সব শব্দ যেন হারিয়ে গেছে।
“আপনি… আপনি সত্যিই এসেছেন!”
কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে এই কথাটা বলতেই গুনগুনের চোখদুটো আবার ভিজে উঠল।
প্রণয় আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সেও এবার কিছুটা শব্দ করেই ফু্ঁপিয়ে উঠল। গুনগুন আরো শক্ত করে প্রণয়কে জড়িয়ে ধরল যেন এতদিনের সব অপেক্ষা, অভিমান, কষ্ট সব একসাথে মিশে যাচ্ছে সেই আলিঙ্গনে।
চারপাশে মানুষজন হাঁটছে, কেউ খেয়ালই করছে না ওদের। কিন্তু ওদের জন্য এই মুহূর্তটাই যেন পুরো পৃথিবী হয়ে গেছে।
গুনগুন কাঁপা গলায় বলল,
“আমি ভেবেছিলাম, এই অপেক্ষা বোধ হয় আর ফুরাবে না। আপনার আসার সব ব্যবস্থা হওয়ার পরও আপনি আসছিলেন না দেখে আমার ভয় হতো খুব। রোজ ভাবতাম, আপনি সত্যিই আসবেন তো আমার কাছে?”
প্রণয় গুনগুনের মাথায় হাত রেখে আদুরে গলায় বলল,
“আমি না এসে পারতাম? তোমায় ছাড়া প্রতিটা সেকেন্ড নিজের সাথে কতটা যু’দ্ধ করে থেকেছি জানো?”
গুনগুনের দুচোখ অশ্রুতে বারবার ভরে আসছে। প্রণয় ওর দুগালে হাত রেখে, কপালের সাথে কপাল ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলতে লাগল,
“দেড় বছর পর তোমায় দেখার অনুভূতি ছিল সংকীর্ণ, অপেক্ষার ও জরাজীর্ণ। অপেক্ষার প্রহর ফুরিয়ে যখন তোমার সামনে দাঁড়ালাম, পড়তে পেরেছিলে আমার চোখের ভাষা? বুঝতে পেরেছিলে আমার হৃদয়ের কথা? তোমায় অপলক দেখে মনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বল তো মন, ভালোবাসা কী?’
মন বলল, ‘এইযে তোর দেখার অপেক্ষা ফুরাল, তৃষ্ণা মিটল, হৃদয়ের উথালপাতাল ঢেউগুলো থামল এটাই তো ভালোবাসা।’
আমিও তখন বুঝলাম, তোমাকে ভালোবাসার নামই হলো ভালোবাসা। তোমার অপর নামটাই ভালোবাসা। আমার ভালোবাসা।”
গুনগুন আরও একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল প্রণয়কে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল,
“আমি খুব মিস করেছি আপনাকে।”
প্রণয় চোখ বন্ধ করে বলল,
“আমিও। প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্ত, প্রতিটা সেকেন্ড।”
দুজনেই কিছুক্ষণ এভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। সময় যেন থেমে গেছে। দেড় বছরের দূরত্ব, হাজারো না বলা কথা সবকিছু মিলেমিশে এক নিঃশ্বাসে ফিরে এসেছে।
কিছুক্ষণ পর প্রণয় একটু দূরে সরে গুনগুনের মুখের দিকে তাকাল। চোখে জল, কিন্তু ঠোঁটে হাসিও আছে। প্রণয় মৃদু হেসে বলল,
“তুমি একদম বদলাওনি।”
গুনগুনও মৃদু হেসে বলল,
“আপনি কিছুটা বদলে গেছেন, কিন্তু আমার কাছে একই আছেন।”
প্রণয় মুচকি হেসে গুনগুনের হাত ধরে বলল,
“চলো। এইযে হাত ধরলাম, এবার আর ছাড়ব না তোমাকে।”
“সত্যি তো?”
“তিন সত্যি।”
গুনগুন আর কিছু বলল না। শুধু প্রণয়ের হাতটা শক্ত করে ধরে রইল। এয়ারপোর্টের দরজা পেরিয়ে বাইরে বের হতেই ঠান্ডা হাওয়া ওদের ছুঁয়ে গেল। নতুন দেশ, নতুন শুরু।
কিন্তু ওদের জন্য সবচেয়ে বড়ো সত্য তো একটাই, ওরা আবার একসাথে!
পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে প্রণয় মজা করে বলল,
“ফুল কি নিজের কাছে রাখবে বলেই এনেছিলে?”
ফুলের কথা মনে পড়তেই গুনগুনের হুঁশ এলো। ফুলের তোড়াটা প্রণয়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“আপনার জন্য।”
প্রণয় হাঁটা থামিয়ে ফুলের তোড়াটা নিল। এক হাত বুকের বামপাশে রেখে, মাথা নুইয়ে বলল,
“থ্যাঙ্কিউ, বউ।”
সেই পুরনো প্রণয়কে ফিরে পেয়ে, এত কাছ থেকে এতদিন পর দেখতে পেয়ে গুনগুন বারবার আবেগপ্রবণ হয়ে যাচ্ছে। আবারও দুচোখে জায়গা করে নিয়েছে অবাধ্য অশ্রুধারা।
আদুরে হাতে প্রণয় গুনগুনের চোখদুটি মুছিয়ে দিল। এরপর ঠোঁটে আলতো করে চুমু খেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে, উপল নীলাঞ্জনের গাওয়া গানের দুটি লাইন গেয়ে বলল,
“সারা বছর ধরে বৃষ্টি হোক,
শুধু না ভিজে যেন তোমার চোখ।”
(সমাপ্ত)
[দীর্ঘ সময় লেখালেখি থেকে দূরে থাকার পর নতুন কোনো উপন্যাস শুরু করার থেকেও শেষ করাটা খুব বড়ো চ্যালেঞ্জ ছিল আমার কাছে। এরজন্য অবশ্য আমার সাথে সাথে আপনাদেরও কিছুটা সাফার করতে হয়েছে, আই মিন শেষের দিকে বেশ অপেক্ষা করতে হয়েছে। এজন্য আমি সত্যিই আন্তরিকভাবে ভীষণ দুঃখিত। এতদিন যারা সাথে থেকেছেন, সাপোর্ট করেছেন, ভালোবাসা দিয়েছেন তাদের জন্য অফুরন্ত ভালোবাসা রইল। আমার জন্য দোয়া করবেন, খুব শীঘ্রই যেন নতুন কোনো গল্প নিয়ে আপনাদের মাঝে ফিরে আসতে পারি। হ্যাপি রিডিং।]
Share On:
TAGS: প্রণয়ে গুনগুন, মুন্নি আক্তার প্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২৫
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২৩
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৪
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৪
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৫
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৩
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৩৩
-
তুষারিণী পর্ব ৭
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৭