Golpo romantic golpo অবাধ্য হৃৎস্পন্দন

অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৬৯


অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৬৯)

সোফিয়া_সাফা

ফিরে দেখা অতীত <৭>

সন্ধ্যাবেলা, অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। জানালার ওপাশে গোধূলির শেষ রেশটুকু মুছে গিয়ে অদ্ভুত এক ধূসরতা চারপাশটা গিলে নিচ্ছে। উদ্যান কোথাও যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল। অনি নিঃশব্দে এগিয়ে এসে তার দিকে একটা মাস্ক আর টুপি বাড়িয়ে দিল। তার চোখে এক অব্যক্ত উৎকণ্ঠা। মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “আমিও যাই সাথে?”

উদ্যান টুপিটা মাথায় দিয়ে একটু সময় নিল। তারপর মাথা নেড়ে শান্ত গলায় বলল, “আজ আমি একাই গিয়ে পরিস্থিতি দেখে আসি। সবকিছু নিরাপদ মনে হলে পরেরবার তোকে নিয়ে যাবো। এখন যদি দুজনে গিয়ে ঝামেলায় পড়ি, তবে তুই-ই বল—আমি তোকে নিয়ে ভাববো নাকি নিজে পালানোর পথ খুঁজবো?”

“আচ্ছা, নিজের খেয়াল রাখিস।”

বাইরে বেরোনোর আগে উদ্যান একবার ম্যাপে চোখ বুলিয়ে নিল। সে মেসেজ টা ট্রান্সলেট করে জানতে পেরেছে পার্সেল টা কনফার্ম করে কোনো এক নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে ২৪ ঘন্টার মধ্যেই পেমেন্ট মিটিয়ে আসতে হবে। মেসেজের সাথে থাকা লিংকের মধ্যে টাকার পরিমাণ আর লোকেশনও দেওয়া ছিল। সে এখন টাকার ব্রিফকেস নিয়ে সেখানেই যাচ্ছে।

প্রায় আধঘণ্টা হাঁটার পর উদ্যান এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছাল যেখানে বাতাসের শব্দও ভয়ংকর শোনায়। জনমানবহীন নির্জন সেই প্রান্তরে হঠাৎ অন্ধকার ফুঁড়ে একটা অবয়ব ওর দিকে এগিয়ে এল। লোকটার চলনবলন বলে দিচ্ছে সে ভীষণই দক্ষ একজন মানুষ।
উদ্যান বুঝে গেল এটাই সেই লোক, যার মাধ্যমে পেমেন্ট করতে হবে। লোকটা টাকা বুঝে পেয়ে হালকা বিরক্তি ঝেড়ে বলল, “টাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলি কেন, নতুন নাকি? ডেড ড্রপ বুঝিস না?”

উদ্যান কিছু বলতে যাবে তার আগেই লোকটা বিদ্যুতের গতিতে অন্ধকারের মাঝেই মিলিয়ে গেল। উদ্যান চেয়েছিল লোকটার থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে। এই যেমন: তারা কোথা থেকে এই জিনিস গুলো সাপ্লাই দেয় বা তাদের পেছনে কোন কোন পর্যায়ের লোকেদের হাত আছে। তবে লোকটা উধাও হয়ে যাওয়ায় কোনো কিছুই সে জানার সুযোগ পেল না।

বাড়িতে ফিরে উদ্যানের চেহারায় ক্লান্তির ছাপ। হাতমুখ ধুয়ে ডাইনিং টেবিলে বসতেই অনি সামনে এসে দাঁড়াল। উদ্বেগের গলায় প্রশ্ন ছুঁড়ল, “সব ঠিক ছিল তো?”

​“হুম, কোনো ঝামেলা হয়নি।” ছোট করে উত্তর দিয়ে উদ্যান ফোনের স্ক্রিনে মন দিল। ফোনের কন্টাক্ট লিস্টে অজস্র নম্বর থাকলেও সেভ করা নেই।

হয়তো লোকটা ইচ্ছে করেই সেভ করে রাখেনি। উদ্যান কিছুক্ষণ পর বলল, “এভাবে বসে থাকলে চলবে না অনি। কিনে আনা ড্রাগস গুলো বিক্রি করতে হবে নইলে এভাবে বেশিদিন খরচ চালাতে পারব না।”

অনির চোখে সংশয়, “কিন্তু পুরনো কাস্টমারদের তো চিনে বের করতে পারব না। উল্টো নতুন করে নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে।”

“হ্যাঁ, আমরা আগামীকাল থেকেই কাজে লেগে পড়বো।”

অনি মাথা নেড়ে ডিনার গোছাতে চলে গেল। প্যানে চিকেনের টুকরো ভাজতে ভাজতেই গরম তেলের সঁসঁ শব্দ আর ম ম গন্ধে চারপাশ ভরে উঠল। আগুনের আভায় অনির মুখটা তখন একটু অন্যরকম দেখাচ্ছিল। উদ্যানও সাহায্য করতে লাগল তাকে। কাজের ফাঁকে সে অনিকে ডাকল, “অনি শোন।”

অনি ঘাড় না ঘুরিয়েই উত্তর দিল, “হু?”

“আমার সাথে এখন থেকে স্প্যানিশে কথা বলবি। এতে আমি তাড়াতাড়ি শিখতে পারবো।”

অনি মৃদু হাসল। জবাবে শুধু বলল, “বালে, বালে (ঠিক আছে।)”

​উদ্যান ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই অনি হালকা হেসে স্প্যানিশেই বলল, “পোর কে মে মিরাস আসি? (ওভাবে তাকাচ্ছিস কেন?)”

উদ্যান ছোট্ট করে শ্বাস ফেলল। মাথা নিচু করে কাজে মনোযোগী হয়ে বাংলায় বলল, “আমি তোর কথা বুঝতে পেরেছি, কিন্তু বলতে গেলেই জিভ আড়ষ্ট হয়ে আসবে।”

“আস্তে আস্তে শিখে যাবি। আর তোকেও কিন্তু আমাকে ইংরেজি শেখাতে হবে, বলে দিলাম।”

“শুধু ইংরেজি শিখলেই হবে? লেখাপড়া করার ইচ্ছে নেই?”

অনি একটা তপ্তশ্বাস ছেড়ে প্যানের দিকে তাকিয়ে রইল। “খুব ইচ্ছে ছিল রে স্কুলে ভর্তি হওয়ার কিন্তু পারলাম না।”

উদ্যান বিড়বিড় করে বলল, “কিন্তু আমাকে পারতেই হবে।”

“কিছু বললি?” অনির প্রশ্নে উদ্যান নীরব রইল।

খাওয়া দাওয়া শেষে উদ্যান ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, “পার্সেল বোধহয় আজকেও দেরিতে আসবে।”

অনি হতভম্ব হয়ে গেল, “আজ আবার কিসের পার্সেল আসবে? আমরা তো কিছুই অর্ডার করিনি।”

“একমাসের টা একদিনেই অর্ডার করে দিয়েছিল লোকটা।”

অনির হাতের তালু ঘামতে শুরু করল। আতঙ্কে ওর পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে যেন। “কী বলছিস! এত ড্রাগস দিয়ে আমরা কী করব? কোনোভাবে ক্যান্সাল করে দেওয়া যাবে না?”

“ক্যান্সেল করার অপশন নেই, বিক্রি করতে হবে আমাদেরকে।”

অনি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। কাঁপা স্বরে বলল, “তেহ চল আমরা পালিয়ে যাই। টাকা দিতে না পারলে বিপদে পড়ে যাবো।”

“পালিয়ে কোথায় যাবো? আমাদের মতো মানুষদের জন্য দুনিয়াটা যে খুব ছোট। কাজ না করলে কোথাও গিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও পাব না। তাই পালিয়ে যাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে এই সুযোগটাকেই কাজে লাগাতে হবে।”

অনি তৎক্ষনাৎ সায় জানাল, “ঠিক আছে। তুই যখন সাহস দেখাচ্ছিস, আমি আর পিছিয়ে যাবো না। যা হয় হবে, আমি তোর সাথেই আছি।”
,
,
,
রাত তখন সাড়ে বারোটা। চারপাশটা নিশুতি, শুধু দূরে কোথাও নদীর স্রোতের একঘেয়ে শব্দ শোনা যাচ্ছে। উদ্যান নদীর পাড়ে পাথরের ওপর একা বসে ছিল। আগুনের ছোট স্ফুলিঙ্গ তুলে ওর আঙুলের ফাঁকে জ্বলছে সিগারেট। ধোঁয়াগুলো কুয়াশার মতো মিলিয়ে যাচ্ছে বাতাসে। মূলত সে আর অনি পার্সেল আসার অপেক্ষাতে আছে।
যখনই কাঙ্ক্ষিত লোকটার দেখা মিলল তখনই উদ্যান পা টিপে টিপে বাড়ির পেছনে এসে দাঁড়াল। লোকটা কলিং বেল টিপে যেই না পিছু ঘুরবে, অমনি উদ্যান পেছন থেকে বাজপাখির মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে তার মুখ চেপে ধরল। ঠিক তখনই ভেতর থেকে বিদ্যুৎবেগে বেরিয়ে এল অনি। দুজনের মুখেই মাস্ক। লোকটাকে কার্যত হিড়হিড় করে টেনে ঘরের ভেতর নিয়ে এসে হাত-পা বেঁধে ফেলল তারা।

​“দেখে তো বাচ্চা ছেলে মনে হচ্ছে,” অনির গলায় বিস্ময়।

​উদ্যান এক পলক ছেলেটার দিকে তাকাল। ছেলেটাও ভয়ার্ত চোখে তাদের দিকেই চেয়ে আছে। হুট করেই একটা খটকা লাগল—ছেলেটার চোখ দুটো চেনা চেনা ঠেকছে। উদ্যান ঝটকা টানে ছেলেটার মুখ থেকে মাস্কটা সরিয়ে দিতেই অনি চমকে পিছিয়ে গেল।

“আরে এটা তো সেই সকালের ছেলেটা।”

ছেলেটার চোখেও তখন বিস্ময় আর আতঙ্কের সংমিশ্রণ। অনির কথা শুনে সেও চিনে ফেলল ওদের। উদ্যান তীক্ষ্ণ চোখে তাকাতেই অনি মাস্কের ওপর দিয়েই নিজের মুখ চেপে ধরল। ছেলেটা প্রথমে ধস্তাধস্তি করলেও এবার হাল ছেড়ে দিয়েছে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “তোরা কিডন্যাপ করার জন্য আর কাউকে পেলি না? আরে আমার কাছে একটা পয়সাও নেই। চাইলে চেক করে দেখ। ছেড়ে দে আমাকে।”

উদ্যান ওর খুব কাছে ঝুঁকে এল। বরফশীতল গলায় বাংলাতেই প্রশ্ন করল, “তোকে কিডন্যাপ করার শখ নেই আমাদের। শুধু বল, এই ড্রাগসগুলো তুই কোত্থেকে সাপ্লাই দিচ্ছিস?”

মেক্সিকোর মাটিতে আচমকা নিজের মাতৃভাষা শুনে ছেলেটা পাথরের মতো জমে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর নিজেকে সামলে নিয়ে সেও বাংলায় তোতলাতে তোতলাতে বলল, “ক… কী বলছিস তুই? ড্রাগস পাবো কোথায়? ওগুলো তো বিস্কুটের বাক্স!”

উদ্যান কোনো কথা না বলে মেঝের ওপর রাখা বাক্সটা টেনে হিঁচড়ে খুলে ফেলল। থরে থরে সাজানো প্যাকেটগুলো দেখে ছেলেটা একটা শুকনো ঢোক গিলল। তার যদিও সন্দেহ ছিল এগুলোর মধ্যে নেশাদ্রব্য থাকতে পারে; কিন্তু পুরোপুরি নিশ্চিত ছিল না।

“এখন কী বলবি?” উদ্যানের কণ্ঠে বিদ্রূপ।

​ছেলেটা আমতা-আমতা করে বলল, “আমি জানিনা এগুলো কোত্থেকে আসে। তোরা সকালে যেই দোকানে গিয়েছিলি, সেই দোকান থেকেই ডেলিভারি দেওয়া হয়েছে।”

অনি ওর পকেট আর শরীর তল্লাশি করে কিছুই পেল না।

“ছেড়ে দে আমাকে। আমি কিচ্ছু জানিনা।” ছেলেটার অসহায়ত্ব দেখে অনির মায়া হলো। ও এক গ্লাস পানি এনে ওর ঠোঁটের কাছে ধরল। মাথায় আলতো করে হাত রেখে শান্ত গলায় বলল, “ভয় পাস না। আমরাও বাঙালি। তোর কোনো ক্ষতি করব না।”

ছেলের কাঁপুনিটা একটু কমল। উদ্যান তার হাত পায়ের বাঁধন খুলে দিতে দিতে বলল, “ডেলিভারিম্যান তুই জানলে এতো খাটাখাটুনি করে ধরে আনতাম না।”

অবশেষে মুক্ত হয়ে ছেলেটা একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। উদ্যান জানতে চাইল, “কতোদিন ধরে এখানে ডেলিভারি দিচ্ছিস?”

ছেলেটা হাঁটু মুড়ে বসে বলল, “গতকাল আর আজই দিয়েছি। আসলে আমি এই এলাকায় নতুন। দুদিন আগেই এসেছি।”

“তোর বাসা কোথায়?” অনির প্রশ্নের জবাবে ছেলেটা বলল, “বাসা ছিল দুদিন আগেও কিন্তু পরপর তিনমাস ভাড়া দিতে না পারার কারণে বাড়িওয়ালা হুমকি দিয়েছিল, সেই জন্যই পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি।”

উদ্যান এবার অনাগ্রহের সাথে বলল, “ঠিক আছে। তুই চাইলে এখন চলে যেতে পারিস।”

​ছেলেটা একটু সময় নিল। মেঝের দিকে তাকিয়ে ধীর স্বরে বলল, “আর যদি যেতে না চাই?”

উদ্যান অবাক হয়ে তাকাল। “যেতে চাইবি না কেন? তোর বাপ-মাও কি নেই?”

ছেলেটার মুখের গড়ন শক্ত হয়ে এল, “না নেই, আমার বাপ আমার মাকে মে’রে ফেলেছিল। তাই আমিও আমার বাপকে মে’রে পালিয়ে এসেছিলাম। তখন আমার বয়স ছিল মাত্র দশ, পালাতে পালাতে একসময় এই দেশে চলে এসেছি। পাঁচ বছর ধরে এই দেশেই আছি।”

অনির বুকটা কেঁপে উঠল। “কী বলছিস তুই!”

উদ্যানের মাঝে ভাবান্তর হলো না। বরং অবিচল কণ্ঠে বলল, “ভালো করেছিস। এই দুনিয়ায় নিজের প্রতি হওয়া অন্যায়ের বিচার নিজেকেই করতে হয়।”

ঘর জুড়ে নিরবতা নেমে এল। অনি পরিবেশ হালকা করতে হঠাৎ বলে উঠল, “আরে, তোর নামটাই তো জানা হলো না!”

​“সোহম। তোদের নাম?”

“আমি অনি। আর ও তেহ।”

উদ্যান সঙ্গে সঙ্গেই বলল, “আমার নাম তেহজিব।”

অনি হাঁ হয়ে গেল। “আমি তো ভেবেছিলাম শুধু ‘তেহ’। যাক, তেহ বলেই ডাকব।”

সোহম আশেপাশে চোখ বুলিয়ে শুধাল, “এটা কি তোদের বাড়ি?”

অনি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। সোহম একটু ইতস্তত করে বলল, “তোদের আপত্তি না থাকলে আমিও কিছুদিন এখানে থাকতে চাই।”

অনিকে উদ্যানের দিকে তাকাতে দেখে সোহম আশ্বস্ত করে বলল, “ওই দোকানদার এক সপ্তাহ পর টাকা দিয়ে দিলেই আমি নিজের ব্যবস্থা করে নেবো। তোদের কোনো অসুবিধা হবে না। আমি শুধু থাকতেই চেয়েছি, খাওয়া দাওয়া নিয়ে তোদের ভাবতে হবে না।”

উদ্যান সম্মতি জানিয়ে বলল, “তুই যতদিন খুশি থাকতে পারিস বিনিময়ে আমাদের কাজে সাহায্য করতে হবে।”

“কী কাজ?”

উদ্যান বুঝিয়ে বলল, “আমাদের কাছে অনেকগুলো ড্রাগস আছে, সেগুলো বিক্রি করতে সাহায্য করতে হবে।”

সোহম এক মুহূর্তও না ভেবে তৎক্ষনাৎ মাথা নেড়ে রাজি হয়ে গেল।
,
,
,
দেখতে দেখতেই জীবন নামক গাছ থেকে ছ’টি মাস ঝরে গেল। এই দিনগুলোতে উদ্যান অনেক বিষয় সম্পর্কে জানতে পেরেছে। সে এখন আর কেবল অলিগলিই চেনে না, বরং অন্ধকার জগতের ওপরতলার মানুষগুলোর ড্রয়িংরুম পর্যন্ত নিজের সুতোর জাল বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। এক সপ্তাহ পর সোহমের চলে যাওয়ার কথা থাকলেও সে তাদের সাথেই থাকতে চেয়েছিল।

আজ উদ্যান এসেছে অনি আর সোহমকে হাইস্কুলে ভর্তি করাতে। কাজটা হিমালয় জয়ের চেয়ে কম ছিল না। তবে টাকার জোর আর সঠিক জায়গায় ঘুষের দৌলতে উদ্যান এক নামী অরফানেজ থেকে তাদের জন্য বার্থ সার্টিফিকেট ম্যানেজ করেছে। শুধু তাই নয়, বয়স অনুযায়ী ওপরের ক্লাসে ওঠার জন্য আগের সব ক্লাসের ভুয়া মার্কশিটও তৈরি।
এসব করা মোটেই সহজ ছিল না উদ্যানের পক্ষে। এর জন্য তাদেরকে বিগত কয়েক মাস নিরলস পরিশ্রম করতে হয়েছে। মাঝখানে সোহমের পা ভেঙে যাওয়ায় সে একমাস বিছানায় পড়ে ছিল। সেই সময়টাতে সোহম বুঝে গিয়েছিল অনি আর উদ্যানকে পাওয়া তার জীবনে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে বড় মিরাক্কেল।

বর্তমানে সোহম, অনি আর উদ্যান যথাক্রমে হাইস্কুলের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। স্কুলের করিডোরে তারা সাধারণ ছাত্র, কিন্তু সূর্যের আলো নিভে গেলেই শুরু হয় তাদের অন্য এক পরিচয়।

আরও দেড় বছর পর!
উদ্যান এখন আর কোনো সাধারণ ‘রানার’ নেই। সাপ্লায়ারদের কাছে সে এখন এক বিশ্বস্ত নাম। আজকের এই জাঁকজমকপূর্ণ পার্টিতে তারা তিনজনেই আমন্ত্রিত। গায়ে ফর্মাল স্যুট, চোখে আত্মবিশ্বাস; তাদের দেখে বোঝার উপায় নেই যে তাদের বয়স আঠারোর কোঠায়। অনি মুহূর্তের মধ্যে ভিড়ের সাথে মিশে গেল, তার চঞ্চলতা তাকে সবার মধ্যমণি করে তুলেছে।
কিন্তু সোহমের একটু অসুবিধা হয় এমন ধরনের পার্টিতে অংশগ্রহণ করতে। উদ্যান অবশ্য বরাবরের মতোই ভাবলেশহীন। মেয়েরা তার গায়ে এসে ঢলে পড়লেও সে ভ্রুক্ষেপ করেনা। অতিরিক্ত বিরক্ত করলে জাস্ট দূরে সরিয়ে দিয়ে এমন ভাবে তাকায়, সেই তাকানোতেই মেয়েরা দৌড়ে পালায়।

অনি আশেপাশে না থাকলেও সোহম উদ্যানের সাথে আঠার মতো চিপকে থাকে সবসময়। এখনও তেমনটাই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উদ্যান ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিয়ে নিচু স্বরে বলল, “অনির সাথে গিয়ে এনজয় কর। বসে বসে বোর হচ্ছিস না?”

সোহম হেসেই উড়িয়ে দিল, “ও মেয়েদের সাথে ফ্লার্ট করতে গেছে৷ ওসব আমার ধাতে সয় না। ওভাবে এনজয় করার চেয়ে তোর সাথে বসে থেকে বোর হওয়া ঢের ভালো।”

উদ্যান ভিড়ের মাঝে থাকা অনির দিকে একবার তাকাল। “প্রথম প্রথম আমি ভেবেছিলাম ও কারো সাথে কথাই বলতে পারবে না কিন্তু ও যে বছর ঘুরতেই এমন এক্সট্রোভার্টে পরিনত হবে অনুমান করতে পারিনি।”

“এক হিসেবে ভালোই হয়েছে, ও অনেক তথ্যাদি সংগ্রহ করে এনে দেয় আমাদেরকে।”

“হুম। পড়ালেখাতেও ও চমক দেখাচ্ছে।”

সোহমের একটু খারাপ লাগল। সে আসলে খুব বেশি পড়ুয়া নয়। অনি যেখানে সবসময় টপ টেনের মধ্যে থাকে সেখানে সে কোনোমতে টেনেটুনে পাশ করতে পারে। আর উদ্যানের কথা সে কিইবা বলবে ছেলেটা তো ইতোমধ্যেই কলেজের টপার।

“আমার মনে হয় ও নকল করেছে নইলে একেবারে উপরের ক্লাসে উঠে কীভাবে এতো ভালো রেজাল্ট করলো?”

উদ্যান গম্ভীর চোখে তাকাতেই সোহম মাথা নিচু করে নিল। উদ্যান বলল, “ওর মাঝে ভালো করার ইচ্ছে আছে সোহম। এই দুই বছরে ও কতোটা স্ট্রাগল করেছে তা তুইও দেখেছিস। সবকিছু একদিকে সরিয়ে রেখে আরেকদিকে পড়াশোনাকে রেখেছে।”

সোহম অপরাধীর মতো বলল, “সরি ওভাবে বলার জন্য।”

“ইটস ফাইন।”

সোহম দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “আমার মায়েরও স্বপ্ন ছিল আমাকে লেখাপড়া করানোর। তোর জন্য সেটা সম্ভবও হয়েছে কিন্তু যখনই স্টাডিতে মন দিতে যাই তখনই তার শূন্যতা অনুভব করি। সে যদি আমার পাশে থাকতো আমি তাকে প্রাউড ফিল করানোর জন্য হলেও মন দিয়ে পড়তাম বাট সেটাও পারছিনা।”

উদ্যান টেবিল থেকে একটা ওয়াইনের গ্লাস তুলে সোহমের দিকে বাড়িয়ে দিল, “বেশি খাবিনা, তোর আঠারো হয়নি এখনো।”

সোহম খুশি হয়ে গ্লাসটা নিয়ে চুমুক দিল। উদ্যান বলল, “তুই ততোটাও খারাপ রেজাল্ট করিসনি যে আপসেট হতে হবে।”

সোহম অবাক চোখে তাকাল। উদ্যান ওর প্রশংসা করেছে? সত্যিই করেছে? আহ! ওর পেটের ভেতর যেন হাজারটা প্রজাপতি ডানা ঝাপটাতে লাগল।

তখনই হঠাৎ তাদের টেবিলের সামনে একজন যুবক এসে দাঁড়াল। উদ্যান তার দিকে তাকিয়ে রইল শুধু, কোনো প্রশ্ন করল না। যুবকটা এসে স্প্যানিশে বলল, “হাই আমি লুহান, আপনি হার্দিন?”

সোহম উদ্যানের হয়ে স্প্যানিশে জবাব দিল, “হ্যাঁ, উনিই হার্দিন। বলুন কী বলবেন।”

লুহান চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আমি খুব ভালো ফাইটিং জানি। আপনি আমাকে কাজে রাখবেন?”

সোহম হতবুদ্ধি হয়ে গেল। তারা এতোটাও বড় কোনো গ্যাং হয়ে যায়নি যে সিকিউরিটি নিয়ে ঘুরবে। সোহম কিছু বলতে যাবে তার আগেই উদ্যান স্প্যানিশে বলল, “আপনি কেন আমাদের সাথে কাজ করতে চাইছেন?”

লুহান একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল, “আমার মনে হলো আপনার সিকিউরিটি প্রয়োজন।”

উদ্যান পালটা প্রশ্ন করল, “কেন মনে হলো এমনটা?”

লুহান একটু ঝুঁকে এসে বলল, “কারণ আপনার প্রতি ইন্টারেস্ট মানুষের দিনকে দিন বেড়েই চলেছে।”

“অন্য মানুষের কথা বলছেন নাকি নিজের কথা বলছেন?” উদ্যানের ঠান্ডা কথায় লুহান ভড়কে গেল। হ্যাঁ সেই একটু বেশিই ইন্টারেস্ট হয়ে পড়েছিল। কারণ সে শুনেছে উদ্যান খুব দ্রুতই উন্নতি করছে; তার সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যত।

লুহান এবার নিজেকে সামলে নিয়ে একটু প্রফেশনাল ঢঙে কথা বলতে শুরু করল। “অনেক বড় বড় লোকেরাও আমাকে কাজে রাখতে চেয়েছিল। তবুও আমি আপনার হয়ে কাজ করতে চাইছি। কারণ…”

সোহম মাঝখানে বাগড়া দিয়ে বলে উঠল, “হয়েছে হয়েছে। আর ঢপ মারতে হবেনা। হার্দিন এমন লোকেদের পছন্দ করেন না যারা নিজেকে অন্যদের সামনে বড় দেখাতে চায়। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, কথায় নয় কাজেই মানুষের যোগ্যতা প্রকাশ পায়।”

লুহান কিছুটা থমকে গিয়ে সোহমের দিকে তাকাল। তারপর আঙুল উঁচিয়ে প্রশ্ন করল, “আপনি সল, রাইট?”

সোহম মাথা দোলাল। “আমাদের সম্পর্কে বেশ ভালোই খোঁজখবর নিয়েছেন দেখছি।”

উদ্যান এতক্ষণ চুপচাপ ওয়াইনের গ্লাসের দিকে তাকিয়ে থাকলেও এবার সে গম্ভীর গলায় বলল, “আপনি কারণটা বলুন।”

সোহম একটু অবাক হলো। একই সাথে বুঝতে পারল উদ্যান কিছুটা হলেও আগ্রহী। লুহান সোজা হয়ে বসল, “কারণ আমি সফল লোকের সাথে নয়। সঠিক লোকের সাথে কাজ করতে চাইছি। আপনিই সেই সঠিক লোক।”

উদ্যান জিজ্ঞেস করল, “আপনি এর আগেও কোথাও কাজ করেছেন?”

লুহান মাথা নেড়ে না বলল, “আমি ফাইটার হতে চেয়েছিলাম। কিছু কারণ বশত আমার ইচ্ছাটা বদলে গেছে।”

“কী সেই কারণ?”

লুহান অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। উদ্যান ফের বলল, “দেখুন, আমাদের সাথে কাজ করতে হলে আপনাকে প্রথমে স্বচ্ছতার প্রমাণ দিতে হবে।”

লুহান জড়তা কাটিয়ে বলতে শুরু করল, “বছর কয়েক আগে বাবা মায়ের বিবাহবিচ্ছেদের পর আমার দায়িত্ব পড়েছিল মায়ের কাঁধে। কয়েক মাস আগে আমি জানতে পারি আমার মায়ের একজনের সাথে সম্পর্ক আছে। কিন্তু সেই লোকটা আমাকে মেনে নিতে পারবে না। আর আমিও মায়ের ওপর বোঝা হয়ে থাকতে চাইনি। তাই তাকে মুক্তি দিয়ে বেরিয়ে এসেছি।”

কথাটা শেষ হতেই ভিড় ঠেলে অনি এসে উদ্যানের সামনে দাঁড়াল। উদ্যানের উদ্দেশ্যে বাংলায় বলল, “বাড়িতে চল, আগামীকাল ভার্সিটিতে আমার প্রথম দিন। একদমই লেট করলে চলবে না।”

উদ্যান আর সোহম উঠে দাঁড়াল। লুহান কিছুটা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পথ আগলে দাঁড়াল। “আপনি কি কাজে রাখবেন না আমাকে?”

উদ্যান চোখের পলক না ফেলে সোজাসুজি বলল, “না।”

উদ্যান লম্বা পায়ে দরজার দিকে হেঁটে গেল। সোহম পেছনে তাকিয়ে দেখল লুহানের মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। সে একটু ভাব নিয়ে আলতো হেসে বলল, “দেখলেন তো? আমি তো বললামই হার্দিন আত্মঅহংকারী লোক একদম পছন্দ করেন না।” এই বলেই সে-ও উদ্যানের পিছু নিল।

বিল্ডিং থেকে বাইরে বেরোতেই রাতের ঠান্ডা বাতাস চোখেমুখে ঝাপটা দিল। আচমকা লুহান আবার তাদের সামনে এসে পথ রোধ করল। উদ্যান এবার বিরক্ত হয়ে শূন্য চোখে তাকাতেই লুহান মাথা নিচু করে ধরা গলায় বলল, “কাজটা আমার খুব প্রয়োজন। আমি তখন মিথ্যা বলেছিলাম,আমাকে কেউই কাজে রাখতে চায়নি। আর সত্যিটা হলো, আমাকে কেউ চেনেও না এখানে। আমার এক মাদকাসক্ত বন্ধু বলেছিল এখানে আজ পার্টি আছে। এই ওয়ার্ল্ড সম্পর্কে তার ধারণাও আছে, সেই আমাকে আপনার নামটা বলেছে। এও জানিয়েছে আপনি নতুন হয়েও কতো তাড়াতাড়ি পরিচিতি পেয়েছেন। প্লিজ, আমাকে একটা সুযোগ দিন।”

উদ্যান অনির দিকে তাকাতেই অনি পরিস্থিতি সামলাতে বলল, “আমি কয়েকজন ডিলারের নম্বর দিয়ে দিচ্ছি আপনি তাদের সাথে যোগাযোগ করলেই তারা আপনাকে কাজ দিয়ে দেবে।”

লুহান একরোখা ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। “আমি শুধু হার্দিনের সাথেই কাজ করতে চাই।”

উদ্যানের কপালে ভাঁজ পড়ল। “আমরা এখনো অত বড় গ্যাং হয়ে যাইনি যে আমাদের পার্সোনাল সিকিউরিটি লাগবে।”

​সোহম এবার সন্দিহান চোখে লুহানের দিকে এগিয়ে এল। “আপনার আসল উদ্দেশ্যটা কী বলুন তো?”

লুহান নিরুপায় হয়ে সত্যটা উগরে দিল। “মায়ের কাছ থেকে চলে এসে ছোটোখাটো টিউশনি করিয়ে পড়াশোনা সহ নিজের খরচ কোনোমতে চালাচ্ছিলাম আমি। তখনই খবর পেলাম আমার ছোট বোনটা হসপিটালে ভর্তি। আসলে বাবা-মা আলাদা হয়ে যাওয়ার পর আমার বোনটার দায়িত্ব বাবার ওপর পড়েছিল। তার নতুন বউ আমার বোনকে কাজের মেয়ের মতো খাটাতেন। কিছুদিন আগে রান্না করার সময় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আমার বোন মারাত্মক আহত হয়েছে। ওকে হসপিটালে ভর্তি করিয়ে দিয়ে আমার বাবা সেই বউ আর সন্তানকে নিয়ে দেশের বাইরে চলে গেছেন। বোনের চিকিৎসা করানোর জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন। আমি জানি বৈধ ভাবে অতো টাকা উপার্জন করতে পারব না। সেই জন্যই এই পথ বেছে নিয়েছি।”

সোহম আর অনির বোন নেই, তাই তারা খুব একটা আবেগপ্রবণ হলো না। কিন্তু উদ্যান স্থির দাঁড়িয়ে রইল। কিছুক্ষণ নীরবতা পালনের পর সে আচমকা নিচু স্বরে বলল, “ঠিক আছে, তোকে একটা সুযোগ দেওয়া হলো।”

উদ্যান কথাটি বাংলায় বলায় অনি সাথে সাথে সেটা স্প্যানিশে অনুবাদ করে দিল। লুহানের নিভে যাওয়া চোখ দুটো মুহূর্তেই জ্বলজ্বল করে উঠল।

উদ্যানদের বাড়িতে এসে লুহান অনেক অবাক হলো। উদ্যান বাড়ি চেঞ্জ করে নিয়েছে ঠিকই কিন্তু অতোটাও বিলাসবহুল লাগছে না। চারদিকের সবকিছুই খুব ছিমছাম। তার মনে এবার সন্দেহ উঁকি দিল—উদ্যানের সাথে কাজ করে কি সে আদৌ বোনের চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে পারবে? ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে এই চিন্তার অতলেই কখন যে সে ঘুমিয়ে পড়ল, নিজেই টের পেল না।

সকালবেলা!
সোহমের ডাকে লুহানের তন্দ্রা ভাঙল। চোখ কচলিয়ে সামনে তাকাতেই সে হকচকিয়ে গেল। উদ্যান, অনি আর সোহম; তিনজনই পরিপাটি পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছে। স্কুল-কলেজের এই ইউনিফর্মে তাদের চেনা দায়। বিশেষ করে উদ্যানকে দেখে লুহান নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। কপালের ওপর ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো রাতে জেল দিয়ে উল্টে রাখা ছিল। তার চোখের চাউনি আর শান্ত ভঙ্গি তাকে এতটাই নির্দোষ করে তুলেছে যে, মনে হচ্ছে পৃথিবীর কোনো কলুষতাই তাকে ছুঁতে পারেনি।

“ওভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? আমরা ভার্সিটিতে যাচ্ছি, তুই আমাদের না ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা কর।” উদ্যান লুহানের সাথে বারবার কেন বাংলায় কথা বলছে, সোহম ঠিক বুঝতে পারল না। অনি আবারও সেটা লুহানকে অনুবাদ করে বুঝিয়ে দিল।

লুহান তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “এমা! আমি বাড়িতে বসে থাকলে আপনার সিকিউরিটির কী হবে?”

সোহম দাঁত চেপে হেসে বলল, “তাহলে কি তুই আমাদের ব্যাগে ঢুকে আমাদের সাথে যেতে চাইছিস নাকি?”

লুহান ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “না না আমি সেটা বলতে চাইনি। কিন্তু হার্দিনের সিকিউরিটি নিশ্চিত করতে হলে তো আমাকেও…”

উদ্যান কথা না বাড়িয়ে চলে গেল। অনি আর সোহমও অনুসরণ করল তাকে। লুহান ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে রইল তাদের যাওয়ার পানে। সে ভীষণই হতাশ, বুঝে উঠতে পারছে না, এখানে বসে থাকাটা কাজে দেবে কিনা। যেই লোকের বাড়ির এই হাল, এমনকি নিজেদের একটা পার্সোনাল গাড়িও নেই। সেই লোকটা কোত্থেকে তাকে বোনের চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত স্যালারি দেবে?

বিকেলবেলা!
বাড়ি ফিরেই সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তবে আজ উদ্যানের সাথে লুহানও বের হলো। ফিরতে ফিরতে রাত গভীর। ডিনার টেবিলে বসার পর উদ্যান লক্ষ্য করল, লুহান খাবারের দিকে তাকিয়ে স্থবির হয়ে বসে আছে।

​“কী হলো, খাচ্ছিস না কেন?” উদ্যান এবার স্পষ্ট স্প্যানিশে প্রশ্ন করল।

লুহান মুখ তুলে চাইল, তার চোখদুটো ছলছল করছে। মৃদুস্বরে বলল, “আমার বোনটা খেতে পারে না, ওর কথা মনে পড়তেই গলা দিয়ে খাবার নামছে না হার্দিন।”

টেবিল জুড়ে নিস্তব্ধতা নেমে এল। তখনই লুহানের ফোনটা বেজে উঠল। কলটা রিসিভ করে একটু দূরে গিয়ে কথা বলে ফিরল সে। তার চেহারা তখন বিবর্ণ। হন্তদন্ত হয়ে এসে বলল, “আমাকে এখনই বেরোতে হবে!”

তাকে অস্থির হয়ে পড়তে দেখে অনি প্রশ্ন করল, “কী হয়েছে?”

লুহান রুদ্ধকণ্ঠে বলল, “হসপিটাল থেকে ফোন করেছিল। ওনারা বললেন, আমার বোনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। ইমার্জেন্সি অপারেশন করতে হবে।”

সোহম উঠে এসে লুহানের কাঁধে হাত রাখল, “আচ্ছা, তুই যা তাড়াতাড়ি।”

লুহান টালমাটাল পায়ে উল্টো ঘুরে হাঁটা শুরু করল। কয়েক কদম গিয়ে থমকে দাঁড়াল সে। পেছনে ফিরে উদ্যানের দিকে তাকিয়ে ইতস্তত করে বলল, “হার্দিন, একটা কথা বলব?”

​উদ্যান নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিল। এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বলল, “হু?”

লুহান ভাঙা গলায় কোনোমতে উচ্চারণ করল, “আসলে অপারেশনের জন্য অনেক টাকা লাগবে। আমার কাছে কিছু টাকা আছে। আপনি কি… কিছু টাকা দিয়ে সাহায্য করতে পারবেন?”

উদ্যান নিষ্প্রভ দৃষ্টে তাকাতেই লুহান দৃষ্টি সরিয়ে বিড়বিড় করল, “আমি বুঝতে পারছি হুট করে—”

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই উদ্যান বলল, “আমরাও যেতে চাইছি তোর সাথে। নিয়ে যাবি?”

অনি আর সোহম অবাক হলেও উদ্যানকে কিছু বলার সাহস পেল না। তারা সবাই মিলে পৌঁছাল হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। চারপাশ থেকে ভেসে আসা রোগীদের গোঙানি আর আর্তনাদ রাতের বাতাসকে ভারী করে তুলেছে। স্ট্রেচারে করে রক্তাক্ত আর পোড়া রোগীদের আইসিইউতে নেওয়া হচ্ছে। সেই বিভীষিকা পেরিয়ে তারা নির্দিষ্ট আইসিইউর সামনে দাঁড়াল। কাঁচের ওপাশে শুভ্র বিছানায় শুয়ে আছে ব্যান্ডেজ মোড়ানো একটা শরীর। খুব সম্ভবত রক্ত দেওয়া হচ্ছে মেয়েটাকে।

উদ্যান আনমনেই কাঁচের ওপর হাত রাখল। অনেক গুলো দিন পর চোখের সামনে ভেসে উঠল ছোট্ট বোনটার মুখশ্রী। ঠিক এভাবেই তো সাদা কাপড়ে মোড়ানো ছিল সেই ক্ষুদ্র অস্তিত্বটা। অদ্ভুত এক সাদৃশ্য! লুহানের বোনেরও সারা শরীর, এমনকি মুখটাও ব্যান্ডেজের আবরণে ঢাকা। বেশ কিছুক্ষণ একধ্যানে তাকিয়ে রইল উদ্যান। ঘোর কাটতেই পেছনে তাকিয়ে দেখল লুহান নেই।

“লুহান কোথায়?”

সোহম বলল, “ডাক্তারের সাথে কথা বলতে গেছে।”

উদ্যান অনির দিকে ঘুরে দৃঢ় গলায় বলল, “অনি, লুহানের কাছে যা। গিয়ে বল, টাকার চিন্তা করতে হবে না।”

​অনি থতমত খেয়ে বলল, “কিন্তু…?”

“আমার জমিয়ে রাখা টাকা থেকে যতো টাকা লাগে দিয়ে দে ওকে।”

সোহম চিন্তায় পড়ে গেল। সে জানে উদ্যান কতো পরিশ্রম করে টাকা জমাচ্ছে। যদিও কারণটা তাদের জানা নেই। তবুও তারা সিওর উদ্যান কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্যই জমাচ্ছিল টাকা গুলো।

টাকার ব্যবস্থা হয়ে যেতেই নার্সরা স্ট্রেচারে করে লুহানের বোনকে ওটিতে নেওয়ার জন্য বের করে আনলেন। লুহানের বুক ফেটে কান্না আসছিল। যখন স্ট্রেচারটা সামনে দিয়ে যাচ্ছিল, লুহান কাতর গলায় ডাকল, “এঞ্জেল… বোন আমার!”

সেই ডাকে এঞ্জেল অতি কষ্টে চোখ মেলল। তার সেই চোখদুটো দেখে লুহান কান্না আটকে রাখতে পারল না। মেয়েটাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে অনেক কথা বলতে চাইছে। লুহান কাঁদতে কাঁদতেই বোনের পিছু নিল। ওটির দরজার মুখে পৌঁছে এঞ্জেল খুব ক্ষীণ স্বরে বলল, “ভাইয়া… আমি কি ম`রে যাব?”

কথাটা শুনে লুহানের পাশাপাশি উদ্যানও বিমর্ষিত হলো। উদ্যানের মনে হলো কথাটা এঞ্জেল তাকে বলেছে। মুহূর্তেই গলাটা শুকিয়ে এল তার। লুহান দ্রুত হাতে চোখ মুছে বলল, “না এঞ্জেল, তুই সুস্থ হয়ে যাবি। তোর কিচ্ছু হবে না।”

এঞ্জেল নিষ্পলক চোখে চেয়ে রইল। ওটির ভেতরে ঢোকার শেষ মুহূর্তে ফিসফিস করে বলল, “তাই যেন হয় ভাইয়া। আ… আমি অনেক বছর বাঁচতে চাই।”

চলবে,,,

শব্দসংখ্যা: ৩৬০০+

(গুরুত্বপূর্ণ বার্তা: রেসপন্স পর্যাপ্ত পেলে খুব শীঘ্রই পরবর্তী পর্ব দিয়ে দেবো। আর মাত্র একটা পর্বেই অতীত শেষ হয়ে যাবে।

শুনুন!

আবেশ, মেহেক আর লামহাকে নিয়ে লেখা #একলামহাআবেশ_মেহেক ই-বুকটি পড়ে ফেলুন এখনই। সেখানে উদ্যান আর ফুলকেও দেখানো হয়েছে। সেই সাথে একটা বড়সড় স্পয়লারও পেয়ে যাবেন। ই-বুকটির মূল্য আপনাদের সুবিধার কথা ভেবে মাত্র ৩০ টাকা রাখা হয়েছে। দুদিন পরেই দাম বেড়ে যাবে। তাই দ্রুতই সংগ্রহ করে ফেলুন।
লিংক কমেন্টে!)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply