সোফিয়া_সাফা
ফিরে দেখা অতীত <৬>
নদীর তীর ঘেঁষে উদ্যান হাঁটছিল কতক্ষণ ধরে তার কোনো হিসেব নেই। দুপুরের কড়া রোদ ম্লান হয়ে বিকেল গড়িয়েছে। হঠাৎ খাড়া ঢালের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটা ঘর তার চোখে পড়ল। উদ্যান বিশেষ খেয়াল দিতো না যদি না সে একটা ছেলেকে জানালা দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখতো। তারা বেশ কিছুক্ষণ একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। উদ্যান বুঝতে পারল ছেলেটা কোনো গভীর ভাবনায় ডুবে আছে। কৌতূহল দমাতে না পেরে উদ্যান ঢাল বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করল। তাকে এগিয়ে আসতে দেখে ছেলেটা যেন চমকে উঠল; দ্রুত জানালার পর্দা টেনে দিয়ে আড়ালে চলে গেল সে।
উদ্যান জানালার সামনে এসে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে পর্দাটা হালকা সরিয়ে বলল, “ভাবলাম তুইও বাঙালি আর আমিও বাঙালি তাই একটু কথা বলে নেবো কিন্তু তুই ওভাবে লুকিয়ে পড়লি কেন? আমাকে দেখে কি মানুষখেকো বলে মনে হচ্ছে নাকি?”
উদ্যানের মুখ থেকে বাংলা শুনে ছেলেটা একটু সাহস জুগিয়ে জানালার কাছে এল। নিজেকে সাহসী দেখানোর প্রয়াসে উদ্যানের ভঙ্গিতেই বলল, “তুই কীভাবে বুঝলি যে আমি বাঙালি?”
“বুঝি নি, আন্দাজে ঢিল মেরেছি। বাঙালি না হলে আমার কথাও বুঝতে পারতি না আর জবাবও দিতে পারতি না।”
উদ্যানের কথা শুনে ছেলেটা জিজ্ঞেসু দৃষ্টে তাকাল। উদ্যান প্রশ্ন করল, “বাড়িতে তোর বাপ-মা আছে?”
ছেলেটা যেন কুঁকড়ে গেল। একটা শুকনো ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলল, “আছে… ক-কেন?”
“থাকলেই ভালো, আচ্ছা বল তো তোর বাপ-মা কেমন? বলতে চাইছি তারা কি বিপদগ্রস্ত লোকেদের সাহায্য করে নাকি উল্টো আরও ক্ষতি করে?”
ছেলেটা একটু হকচকিয়ে গিয়ে পালটা প্রশ্ন করল, “কেন এসব জিজ্ঞেস করছিস?”
উদ্যান একবার চারপাশটা পরখ করে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “বুঝতে পারছিস না? আরে আমার সাহায্যের প্রয়োজন। কোনোভাবে তোর বাবা-মা যদি আমাকে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করে দিত, খুব উপকার হতো। টাকা-পয়সা নিয়ে ভাবতে হবেনা। দেশে ফিরতে পারলে আমি সব শোধ করে দেবো।”
কথাগুলো শেষ হতে না হতেই উদ্যান দেখল ছেলেটার চোখ টলমল করছে। নিমেষেই নোনা জল বাঁধ ভেঙে গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। উদ্যান অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। “আরে! কাঁদছিস কেন? আমি তো এখনো তোকে তেমন কিছুই বললাম না।”
ছেলেটা হিক্কা তুলে ধরা গলায় বলল, “আমার বাবা-মা নেই।”
উদ্যান জানালার গ্রিলটা শক্ত হাতে আঁকড়ে ধরল। চাপা গলায় বলল, “এই না বললি আছে? আর যেই সাহায্যের কথা তুললাম অমনি ভোজবাজির মতো বাপ-মা হাওয়া হয়ে গেল?”
ছেলেটা ডুকরে কেঁদে উঠল। “সত্যিই নেই, আমি ভেবেছি তুই হয়তো খারাপ লোক। বাবা-মা নেই শুনলে বুলি করবি। তাই আরকি বলতে চাইছিলাম না।”
উদ্যান এবার জানালার ওপরেই হেলে পড়ল। আশার আলোটা যেন দপ করে নিভে গেল তার। বিরক্ত গলায় বলল, “ধ্যাৎ! এক মিনিট, তাহলে এই ঘরে তুই থাকিস কার সাথে?”
“মালিকের সাথে। সে কাজে গেছে।”
উদ্যান আর সময় নষ্ট করতে চাইল না। পা বাড়িয়ে চলে যেতে উদ্যত হতেই পেছন থেকে ছেলেটা ডেকে উঠল, “তুই খারাপ লোক নোস, তাই না? আমাকে একটু সাহায্য করবি?”
উদ্যান ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাল তার দিকে। শুষ্ক গলায় আওড়াল, “আমি নিজেই সাহায্যের জন্য এদিক সেদিক ধাক্কা খাচ্ছি। আর তুই কিনা উল্টো আমার কাছেই সাহায্য চাইছিস?”
“তুই তো তাও খোলা আকাশের নিচে আছিস। এই চার দেয়ালের ভেতরে আমি যে কী বিপদে আছি, তুই জানিস না।”
উদ্যান কিছুই বলল না। ছেলেটা নিজেই বলল, “আচ্ছা সাহায্য করতে হবে না। একটু কথা বলি? অনেকদিন হলো বাংলা ভাষায় কারো সাথে কথা বলি না।”
“হুম বল, কী বলবি।”
“আমার নাম অনি, তোর নাম?”
“তেহজিব।”
উদ্যানের ফ্যাকাশে মুখটা লক্ষ্য করে অনি নরম স্বরে বলল, “তোর ক্ষুধা পেয়েছে? কিছু খেতে দেবো?”
উদ্যান সরু চোখে তাকাল, “সাহায্য করবো না জেনেও খেতে দিবি?”
প্রত্যুত্তরে অনি হাসল শুধু। উদ্যান জানালার কাছে ফিরে এসে খানিক দূরে বসে থাকা কুকুরছানাটাকে দেখিয়ে বলল, “ক্ষুধা নেই আমার। ও কিছুক্ষণ আগেও খাবার এনে দিয়েছে।”
অনি অবাক হয়ে কুকুরছানাটার দিকে তাকাল। “ওহ তোর পোষা কুকুর বুঝি? নাম কী?”
উদ্যান একটু থমকে গেল। সেও তো কুকুরটার নাম জানে না! সে গম্ভীর মুখে কুকুরছানাটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এই তোর নাম কী?”
ছানাটা উত্তরের বদলে কেবল লেজ নাড়ল। অনি তাজ্জব বনে গেল, “ও কি নাম বলতে পারবে নাকি?”
উদ্যান অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে চট করে বলল, “হ্যাঁ, ও বলতে পারে তো। মাত্রই তো বলল, ওর নাম তান।”
অনি ভ্যাবাচেকা খেলো, “কখন বলল? কই আমি তো শুনলাম না।”
উদ্যান বিড়বিড় করল, “তোর কানে বোধহয় সমস্যা আছে। আমি তো পরিষ্কার শুনলাম।”
অনি বড় বড় চোখ করে দাঁড়িয়ে রইল। সে সত্যিই গভীর ভাবনায় পড়ে গেল; এত কাছে থেকেও সে কিছুই শুনতে পেল না? তবে কি আসলেই তার কানে সমস্যা আছে?
উদ্যান প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলল, “আমার খুব বেশি অপ্রয়োজনীয় কথা বলতে ভালো লাগে না। কাজের কথা বল। তোর মালিক কি খারাপ নাকি?”
অনি উপরনিচ মাথা নেড়ে বলল, “আমি ৮ বছর বয়সে পাচারকারীদের খপ্পরে পড়েছিলাম তারা আমাকে মেক্সিকোতে এনে বিক্রি করে দিয়েছিল এক ছিনতাইকারী দলের কাছে। বাংলাদেশে থাকাকালীনও আমি এগুলোই করতাম। দুবছর আগে ছিনতাই করতে গিয়ে এই মালিকের কাছে ধরা পড়ে যাই। সে চেয়েছিল আমাকে জিম্মি করে আমার বাপ-মায়ের কাছ থেকে মুক্তিপণ দাবি করবে কিন্তু মুক্তিপণ দেওয়ার মতো কেউ নেই জানতে পেরে আমাকে তুলে এনে এখানে আটকে রেখেছে।”
“ভালো তো! আর কিসের অভিযোগ তোর? এমনিতেও বাইরে খাটাখাটুনি করে পেট ভরতে হতো, এখন বিনা পরিশ্রমে খেতে পাচ্ছিস। তোর তো খুশি থাকার কথা। জানিসই তো বাইরে একবেলা খাবার জোগাড় করাটাও কতোটা কঠিন।”
অনি এবার মাথা নিচু করে ফেলল। তার নীরবতা যেন কোনো গভীর ক্ষতের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। উদ্যানের মনে খটকা লাগল, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “সে কি অকারণেই তোর গায়ে হাত তোলে?”
অনি কাঁপা স্বরে বলল, “শুধু মারেই না, আরও অনেক কিছু করে…”
অনির না বলা কথাগুলো যেন বাতাসে আর্দ্রতা বাড়িয়ে দিল। উদ্যান স্থির চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর চোয়াল শক্ত করে প্রশ্ন করল, “কখন আসবে মাদার ফা`কার টা?”
অনি চমকে তাকাল। উদ্যানের গলার স্বরে এমন কিছু ছিল যা বুঝিয়ে দিচ্ছিল; উদ্যান তাকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। সে একটু নড়েচড়ে দাঁড়িয়ে বলল, “একটু পরেই ফিরবে সে। তোর এবার যাওয়া উচিত।”
উদ্যান ঘাড় কাত করে জানতে চাইল, “সাহায্য চাই না?”
অনি ভয় পেয়ে মাথা নাড়ল, “আমি শুধু একটু কথা বলতেই চেয়েছিলাম।”
“ভয় পাস না। আমি সাহায্য করবো তোকে।”
“ওনার কাছে বন্দুক আছে।”
উদ্যানের মাঝে ভাবান্তর ঘটল না। অনি কপালের ঘাম মুছে ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী করতে চাইছিস তুই?”
“মে`রে ফেলবো।”
উদ্যানের মুখ থেকে কথাটি এমনভাবে বের হলো যেন কাউকে মে`রে ফেলা তার বাঁ হাতের কাজ। অনি আবারও মনে করিয়ে দিল, “শুনতে পাসনি? ওনার কাছে বন্দুক আছে!”
উদ্যান আর কোনো উত্তর দিল না। ভাবলেশহীন মুখে সে দৃষ্টিসীমার বাইরে মিলিয়ে যেতে লাগল। অনি ভাবল, ছেলেটা হয়তো বিপদ বুঝতে পেরে কেটে পড়েছে, সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে কিচেনে চলে গেল রাতের খাবার রেডি করতে।
রাত তখন প্রায় দশটা। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে পরিবেশটা শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে উঠেছে।
উদ্যান আবার ফিসে এসেছে সেখানে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দেখল এখনো বাইরে তালা ঝুলছে। সে আবারও চলে গেল জানালার সামনে।
“অনি!” উদ্যানের ফিসফিসানি ডাক শুনে অনি ধড়ফড়িয়ে বিছানায় উঠে বসল। ঘুমানোর চেষ্টা করছিল সে। উদ্যানকে দেখে তার বুক ধুকপুক করে উঠল, “তুই আবার কেন এসেছিস?”
“তোর মালিক কোথায়? এখনো আসেনি?”
“এসেছিল। আবার বাইরে গেছে।”
“এই সময়? আচ্ছা, সে কী কাজ করে?” উদ্যানের কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল।
“সে একজন পুশার।”
উদ্যান শব্দটা আগে শোনেনি। “পুশার মানে?”
অনি অবাক হলো, “তুই ড্রাগ ট্রাফিকিং সম্পর্কে কিছুই জানিস না?”
উদ্যান মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ মাদক পাচারের কথা বলছিস তো? কিন্তু পুশার মানে বুঝলাম না।”
অনি একটু এগিয়ে এল জানালার গ্রিলের কাছে। “পুশার মানে রাস্তার লেভেলের ডিলার। যারা সরাসরি মানুষদের হাতে ড্রাগ তুলে দেয়।”
উদ্যান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। অনি এবার আরেকটু বিস্তারিত বলতে শুরু করল, “দেখ, এসবের আড়ালে বড় বড় লোকেরা থাকে। তারা নিজেরা সামনে আসে না। তাদের হয়ে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করে এই পুশাররা। তারা নতুন মানুষ খুঁজে বের করে, ধীরে ধীরে আসক্ত বানায়। তারপর নিয়মিত ড্রাগ সাপ্লাই দেয়।”
অনি একটু থেমে গিয়ে গলার স্বর আরও নিচে নামিয়ে বলল, “সহজ ভাষায় বললে, তারা মানুষকে প্রলুব্ধ করে। যারা পরবর্তীতে তাদের রেগুলার কাস্টমারে পরিনত হয়।”
“তুই দেখছি অনেক কিছু জানিস।”
“এই দুবছর ওনার কাছে থেকেই এতোকিছু জেনেছি।”
হঠাৎ উদ্যান ঘাড় ঘুরিয়ে রাস্তার বাঁকের দিকে তাকাল। দূরে একটা টর্চের আলো এদিক-ওদিক দুলতে দুলতে এগিয়ে আসছে। অন্ধকারের স্তব্ধতা ভেঙে কারো পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। উদ্যান অনির দিকে তাকিয়ে বলল, “কাল আমি আবারও আসবো। এখন যাচ্ছি।”
অনি কিছু বলার আগেই উদ্যান দ্রুত পায়ে অন্ধকারের ভাঁজে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল। কয়েক মুহূর্ত পর দরজার তালা খোলার শব্দ পাওয়া গেল। অনি দ্রুত জানালার পর্দা টেনে দিয়ে গভীর ঘুমের ভান করে বিছানায় শুয়ে পড়ল।
পরদিন রাত।
ঘরের ভেতর গুমোট নিস্তব্ধতা। টেবিলের ওপর বসে আয়েশ করে খাবার খাচ্ছে অনির মালিক। বছর পঁয়ত্রিশের শক্তপোক্ত গড়নের লোকটার চোখেমুখে এক ধরণের পৈশাচিক তৃপ্তি। অনি মেঝেতে গুটিসুটি মেরে বসে কাঁদছিল। তার ফোঁপানির শব্দে লোকটা বিরক্ত হয়ে স্প্যানিশ ভাষায় শাসিয়ে উঠল, “আমাকে ডিস্টার্ব করলে আরও কয়েকটা লাগিয়ে দেবো।”
অনি হাত দিয়ে চোখ মুছে নিল। তার বাম চোখের পাশটা ফেটে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। কিছুক্ষণ আগেই রান্নার নুন-ঝাল নিয়ে খুতখুঁত করে লোকটা তাকে বেধড়ক পিটিয়েছে। মালিক খাওয়া শেষ করে যেই না উঠে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই দরজায় সজোরে তিনটে কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
লোকটা তড়িৎ বেগে দরজার দিকে ঘুরল। সাধারণত মাঝরাতের আগে তাদের দরজায় কেউ কড়া নাড়ে না—একমাত্র ড্রাগ ডেলিভারির সময় ছাড়া। সে ঘড়ির দিকে তাকাল; রাত নটা। সময়টা বড্ড অসময়। লোকটা সতর্ক হয়ে কোমরে গোঁজা পিস্তলটা বের করে গুলি চেক করে নিল। তারপর ধীরপায়ে দরজার দিকে এগোল। মেঝেতে বসে থাকা অনি রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে রইল সেদিকে।
দরজা খুলে মালামালের বদলে অপরিচিত এক ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লোকটা পিস্তলের বাঁটে হাত রেখে সন্দেহভরা গলায় বলল, “কে তুই? কী চায়?”
কথাটা স্প্যানিশে বললেও লোকটার দেহভঙ্গি দেখে উদ্যান এটুকু বুঝে নিল। দরজার বাইরে থাকা উদ্যান ইংরেজিতে বলল, “আমি কাজের সন্ধানে এসেছি। আপনি যেকোনো কাজে আমাকে রাখতে পারেন।”
লোকটা ইংরেজি বুঝতে না পেরে বিরক্তিতে কপালে ভাঁজ ফেলল। “কি আবলতাবল বকছিস! আমি তোর কথা বুঝতে পারছি না। ভাগ এখান থেকে।”
উদ্যান একচুলও নড়ল না। বরং শান্ত চোখে তাকিয়ে রইল লোকটার দিকে। লোকটার কেন যেন উদ্যানের চোখের চাউনি আশঙ্কাজনক ঠেকলো। সে পিস্তলটা বের করার জন্য যেই নিচের দিকে নজর দিল, অমনি হিংস্র গতিতে উদ্যান তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
মুহূর্তের মধ্যে লোকটাকে মেঝেতে আছড়ে ফেলে তার পেটের ওপর চেপে বসল উদ্যান। পকেট থেকে বিদ্যুৎবেগে ছুরিটা বের করে লোকটার গলায় বসিয়ে দিল সে। সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে লোকটা আর্তনাদ করার সুযোগটুকুও পেল না। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছিটকে এসে উদ্যানের মুখের ওপর আছড়ে পড়ল।
উদ্যান তখনও লোকটার হাতটা চেপে ধরে ছিল। অনি এগিয়ে এসে তার মুখের সামনে এক টুকরো কাপড় ধরতেই উদ্যানের সম্বিৎ ফিরল। সে পাশ ফিরে দেখল, অনি হাঁটু ভাঁজ করে বসে আছে। ঠোঁটের কোণে লেগে আছে বেদনা মিশ্রিত হাসি। পরক্ষণেই কাপড়টা দেখে ভ্রু কুচকে গেল তার। অনি হালকা গলায় বলল, “এটা দিয়ে মুখ মুছে নে। সেদিন মনে না হলেও এইমুহূর্তে তোকে মানুষখেকো বলেই মনে হচ্ছে।”
উদ্যান প্রথমেই লোকটার ঘাড়ের ধমনিতে আঙুল চেপে ধরল। প্রাণের স্পন্দন নেই। সে উঠে দাঁড়িয়ে কাপড়টা দিয়ে আগে নিজের ছুরিটা পরিষ্কার করল, তারপর মুখ মুছতে মুছতে বলল, “ওর বডিটা বাড়ির পাশে পুঁতে ফেলি। চল।”
অনি সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ল, “কিন্তু ঘরে এমন কোনো ধারালো বস্তু নেই যা দিয়ে মাটি খোড়া যাবে।”
উদ্যান অবাক হলো, “মানে? রান্না করার সময় ছুরি, বঁটি এসবও ব্যবহার করিস না নাকি?”
“ছুরি আছে একটা কিন্তু মাটি খোড়ার মতো ধারালো নয়। মালিক ভীষণ সচেতন ছিলেন। তাই ঘরে তেমন কিছুই রাখেননি।”
উদ্যান ভাবনায় পড়ে গেল। ঠিক তখনই ‘তান’ কোথা থেকে যেন এক টুকরো আধা-খাওয়া আপেল মুখে করে এনে উদ্যানের পায়ের কাছে রাখল। উদ্যান প্রতিউত্তরে কুকুরটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে সেই নোংরা আপেলটাই নির্দ্বিধায় খেতে শুরু করল।
যা দেখে অনির মুখটা আরও শুকিয়ে গেল। সে উঠে গিয়ে একবাটি সাদা ভাত এনে উদ্যানের সামনে ধরল। উদ্যান আপেল চিবোনো থামিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকাতেই অনি বলল, “এটা খেয়ে নে।”
উদ্যান কথাটা এড়িয়ে গিয়ে বলল, “যতদ্রুত সম্ভব লাশটাকে গুম করতে হবে।”
“সেই জন্য খেয়েদেয়ে শক্তি বাড়াতে হবে আগে। খেয়ে নে।”
“নিজের খাবার আমাকে দিয়ে দিলে তুই কী খাবি?” উদ্যান প্রশ্ন করল।
অনি থতমত খেয়ে গেল, “তুই জানলি কীভাবে এটা আমার খাবার?”
“জানিনি, আন্দাজে বলেছি।” উদ্যান আবারও সেই পুরনো উত্তর দিল।
অনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরেকটা বাটি এনে ভাতটুকু সমান ভাগে ভাগ করে নিল। “নে, এবার দুজনেই খাই।”
উদ্যান নিজের হাতের দিকে তাকাল। অনি বিষয়টা বুঝতে পেরে আঙুল দিয়ে ইশারা করে বলল, “ওয়াশরুম ওইদিকে। হাত ধুয়ে আয়।”
উদ্যান ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াতেই লক্ষ্য করল অনির রুমের বিপরীত পাশে আরও একটা রুম আছে। রুমটার দরজায় একটা বড়সড় তালা ঝুলছে। সে থমকে দাঁড়াল।
“অনি, এদিকে আয় তো।” উদ্যানের ডাকে অনি এগিয়ে আসতেই উদ্যান তাকে প্রশ্ন করল, “এটা কার রুম?”
“মালিকের। সে যখন ভেতরে ঢোকেন তখনই শুধু তালা খোলেন। বাকিটা সময় এভাবেই লক করা থাকে।”
উদ্যান ভারী তালাটা নেড়েচেড়ে দেখল। তারপর পাশে পড়ে থাকা নিথর দেহটার পকেটে চাবির সন্ধান করল, কিন্তু ব্যর্থ হলো। ফিরে এসে নিজের কোমরে গোঁজা বন্দুকটা বের করে দরজার দিকে তাক করল সে। অনির দুচোখ বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল, “তোর কাছেও বন্দুক আছে?”
“হ্যাঁ, কিন্তু আমি এটা চালাতে জানি না। তুই জানিস?”
অনি মাথা নেড়ে ‘না’ জানাল। উদ্যান কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তালাটার দিকে তাকিয়ে থেকে খটখট শব্দে বন্দুকটা লোড করে নিল। অনি হকচকিয়ে গেল, “তুই তো বললি জানিস না। তাহলে ঝুঁকি কেন নিচ্ছিস?”
উদ্যান দাঁত চেপে বলল, “কী করবো তাহলে? হাত গুটিয়ে বসে থাকলে বিপদে পড়তে হবে।”
উদ্যান ট্রিগার টানতে গিয়েও থেমে গেল। অনির উদ্দেশ্যে বলল, “তুই কোনো সেফ জায়গায় গিয়ে দাঁড়া। গুলিটা ছিটকে তোর দিকে চলে যেতে পারে।”
অনি একটা শুকনো ঢোক গিলে খাবার টেবিলের নিচে গিয়ে আশ্রয় নিল। পরক্ষণেই এক বিকট শব্দে রাতের নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে গেল। অনি টেবিলের নিচ থেকে মাথা বের করে দেখল, উদ্যান সফল। তালাটা ভেঙে ঝুলে আছে। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন দরজার পাল্লাটা অতি সন্তর্পণে ঠেলে ভেতরে উঁকি দিল সে। রুমের ভেতরে একটা নীল রঙের ডিম লাইট জ্বলছে, যা চারপাশটা রহস্যময় করে রেখেছে।
কিছুক্ষণ পর!
পুরো রুমটা তন্নতন্ন করে খুঁজে তারা এমন কিছু জিনিসের সন্ধান পেল যা তাদের কল্পনার বাইরে ছিল। খাটের নিচে আর আলমারির তাকে সাজানো আরও একটা বন্দুক, অসংখ্য সিগারেটের প্যাকেট, নাম না জানা নেশাজাতীয় তরল আর কতগুলো টাকার বান্ডেল। সেই সাথে পেল ছোট ছোট প্যাকেটে ভরা সাদা পাউডার আর রঙিন কিছু ট্যাবলেট।
সেসব আপাতত একদিকে সরিয়ে রেখে তারা খুঁজে পেল তাদের কাঙ্ক্ষিত সরঞ্জাম—কোদাল, শাবল আর বেলচা।
ড্রয়িংরুমে ফিরে এসে ভাগ করে নেওয়া সেই ভাতটুকু খেয়ে; তারা কাজে লেগে পড়ল। দীর্ঘ তিন ঘণ্টার নিরলস পরিশ্রমের পর বাড়ির বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝেই লাশটাকে মাটিচাপা দিতে সক্ষম হলো তারা।
ঘরে ফিরে মেঝে পরিষ্কার করা শেষে অনি শাওয়ার নিতে চলে গেল।
উদ্যান বসে ছিল ড্রয়িংরুমে। তার পায়ের কাছেই তান নির্বিঘ্নে ঘুমাচ্ছে। উদ্যান নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে রইল আনমনে। নখের কোণে আর আঙুলের ফাঁকে এখনো চটচটে কাদা লেগে আছে। সে সোফায় মাথা এলিয়ে দিয়ে শূন্যে তাকিয়ে বিড়বিড় করল, ‘মা, আপনার ছেলে পাঁচটা খু`ন করে ফেলেছে। আপনি কি বিশ্বাস করতে পারছেন?’
বলতে বলতে উদ্যান চোখ বুজে ফেলল। কিন্তু পরক্ষণেই এক তীব্র আতঙ্কে সে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। চারদিকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকাতে তাকাতে তার কণ্ঠস্বর বুজে এল, “আমি আপনাকে কল্পনা করতে পারছি না কেন মা?”
সে প্রাণপণে তার বাবা আর বোনের মুখটা মনের পর্দায় আঁকতে চাইল, কিন্তু সবকিছু যেন কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে গেছে। হঠাৎ তার বুকের ভেতর এক অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হলো। মনে হলো কেউ হৃৎপিণ্ডটা মুঠো করে চেপে ধরেছে। সে বুক চেপে ধরে উঠে দাঁড়াল। আর্তস্বরে বলল, “কাউকে আসতে হবে না আমার কল্পনায়। ভুলে যান সবাই… ভুলে যান উদ্যান নামে কেউ ছিল।”
কিছুক্ষণ পর শাওয়ার নিয়ে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে ড্রয়িংরুমে এল অনি। “আমার হয়ে গেছে ভাই, এবার তুই—”
কথাটুকু শেষ করতে পারল না অনি। তার আগেই এমন কিছু দেখল যা দেখার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না। মেঝেতে গা এলিয়ে দিয়ে সিগারেট ফুঁকছে উদ্যান। অনি ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে উদ্যানের পাশাপাশি শুয়ে পড়ল। তখনই উদ্যান সিলিংয়ের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে নিস্তরঙ্গ কণ্ঠে বলল, “আমাকে কখনও ভাই বলে ডাকবি না।”
অনি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। পাল্টা কোনো প্রশ্ন করল না। পরিস্থিতি হালকা করতে সে সুর পাল্টে বলল, “কী যেন বলেছিস তোর নাম? ওহ হ্যাঁ তেহ! যা শাওয়ার নিয়ে আয়।”
উদ্যান জবাব দিল না। চোখ বন্ধ করে ফের সিগারেটে টান দিল। অনি সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করে শুধাল, “প্রথমবার?”
উদ্যান সরু চোখে তাকাতেই অনি হেসে ফেলল। “ঠিক ভাবে ধোঁয়াটা নিতে পারছিস না। সেই জন্যই আন্দাজে বললাম আরকি।”
অনি উঠে বসে পাশে পড়ে থাকা প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট ধরিয়ে নিল। তারপর উদ্যানকে দেখিয়ে দেখিয়ে গভীর টানে বিষাক্ত ধোঁয়া ভরে নিয়ে আলতো করে নাক-মুখ দিয়ে ছেড়ে দিল।
একবার দেখেই উদ্যান কৌশলটা আয়ত্ত করে নিল।
তন্মধ্যেই বাইরের দরজায় ‘ঠক-ঠক-ঠক’ শব্দ হলো। উদ্যান জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই অনি নিচু স্বরে বলল, “প্রত্যেক রাতে কেউ না কেউ ঠিক এই সময়েই আসে এ বাড়িতে।”
“তুই জানিস না কে আসে?”
“না, আমি কাউকে দেখিনি। শুধু দেখেছি মালিককে দরজার সামনে রেখে যাওয়া বাক্স উঠিয়ে নিয়ে রুমে চলে যেতে।”
“ওহ তাহলে আমাদেরও বের হয়ে দেখা উচিত। কেউ না গেলে লোকটা সন্দেহ করবে।”
অনি মাথা নেড়ে দরজার দিকে পা বাড়াতেই উদ্যান তার হাত চেপে ধরল। “তুই কোথায় যাচ্ছিস? এখানেই থাক, আমি গিয়ে দেখছি।”
অনি শুকিয়ে যাওয়া গলায় বলল, “মালিকের বদলে তোকে দেখে যদি আক্রমণ করে বসে?”
“আক্রমণ করার হলে তোকে দেখেও তো করবে।”
অনিকে সরিয়ে দিয়ে উদ্যান এগিয়ে যেতে যেতে বলল, “আমি যাচ্ছি, চিন্তা করিস না।”
হাতের ছুরিটা কৌশলে আড়ালে লুকিয়ে সে অতি সাবধানে দরজাটা খুলে ফেলল। কিন্তু দরজার ওপাশে কেউ ছিলোই না। জনমানবহীন অন্ধকার ঘেরা দাওয়ায় শুধু একটা মাঝারি সাইজের পার্সেল পড়ে আছে। অনিও ততক্ষণে উদ্যানের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
“অদ্ভুত! কে রেখে গেল এটা?” উদ্যানের প্রশ্নের জবাবে অনি ধন্দে পড়ে গেল। “হতে পারে এভাবেই এগুলোর ডেলিভারি দেওয়া হয়।”
বাক্সটা তুলে নিয়ে তারা ভেতরে ফিরে এল। বাক্স খুলে দেখার খুব একটা প্রয়োজন ছিল না, কারণ ভেতরে কী থাকতে পারে তা নিয়ে তাদের দুজনেরই স্পষ্ট ধারণা আছে। তবুও নিশ্চিত হওয়ার জন্য আনপ্যাক করতেই দেখা গেল থরে থরে সাজানো শত শত ড্রাগসের প্যাকেট। তখনই হঠাৎ করে ফোনে কতগুলো মেসেজ আসার শব্দ হলো।
“অনি, ফোনের শব্দ পেলি?”
অনি তড়িঘড়ি করে ফোনটা খুঁজে আনল। উদ্যান স্ক্রিন অন করতেই স্প্যানিশ ভাষায় একটা মেসেজ ভেসে উঠল: “Confirme la recepción y realice el pago dentro de las 24 horas.”
“তুই স্প্যানিশ বুঝিস?” উদ্যান প্রশ্ন করতেই অনি মাথা ওপর-নিচ করল। যার মানে সে বোঝে। বোঝাটাই স্বাভাবিক সে ৮ বছর ধরে এই দেশে আছে। উদ্যান ফোনটা অনির চোখের সামনে ধরে জিজ্ঞেস করল, “কী লেখা এখানে?”
অনি এবার মাথা নিচু করল। লাজুক অথচ বিষণ্ণ গলায় বলল, “আমি লেখাপড়া জানি না তেহ। শুধু স্প্যানিশে কথা বলতে আর বুঝতে পারি।”
উদ্যান ফোনটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে অনুমান করার চেষ্টা করতে লাগল। স্প্যানিশ না জানলেও ‘২৪ আওয়ার্স’ কথাটার মানে সে বুঝতে পারছে। নির্ঘাত চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কোনো একটা কিছু কনফার্ম করতে বলছে। কিন্তু জিনিসটা কী সেটা বুঝতে পারল না। সে মেসেজটা ট্রান্সলেট করতে চাইল, কিন্তু স্ক্রিন লক থাকায় তা আর সম্ভব হলো না।
“এখন কী করব আমরা?” অনি চিন্তিত মুখে জানতে চাইল।
উদ্যান উঠে দাঁড়িয়ে হাই তুলল। “এখন ঘুমিয়ে পড়। কাল সকালে ফোনের লক খোলার ব্যবস্থা করব।”
অনি একটু ইতস্তত করে বলল, “কিছু মনে করিস না তেহ, আমার মনে হয় হাতের কাছে যা টাকা-পয়সা আছে তা নিয়ে আমাদের এখান থেকে পালিয়ে যাওয়া উচিত।”
“তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিলে হিতে বিপরীত হতে পারে। আগে পরিস্থিতিটা একটু খতিয়ে দেখি।”
পরেরদিন সকালে…
অনির অনবরত ডাকে উদ্যানের ঘুম ভেঙে গেল। দুচোখে রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে তাকাতেই সে দেখল অনি তার শার্টের দিকে তাকিয়ে আতঙ্কিত হয়ে আছে। “তোর বুকে কী হয়েছে তেহ?
উদ্যান ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। গতরাতে তাকে নিজের রুমটা দিয়ে অনি তার মালিকের রুমে ঘুমিয়ে পড়েছিল। রাতে গোসল করে উদ্যান অনির একটা নীল শার্ট পরেছিল। সকালে অনি তাকে ডাকতে এসে দেখল শার্টের বুকের কাছটা কালচে হয়ে ভিজে আছে। উদ্যান নির্লিপ্ত গলায় বিড়বিড় করল, “সমস্যা নেই, রক্তের দাগ। ধুয়ে দিলেই উঠে যাবে।”
অনির কপালে ভাঁজ পড়ল, “আমি কি শার্টের কথা বলেছি? তোর বুকে কী হয়েছে সেটা বল।”
উদ্যান মেক্সিকোতে আসার পর থেকে এপর্যন্ত তার সাথে যা যা হয়েছে পুরো ঘটনাটাই অনিকে সংক্ষেপে শুনিয়ে দিল। সবটা শুনে অনি তটস্থ হয়ে গেল।
“দেখি, কতোটা কেটেছে।”
উদ্যান অনিচ্ছাসত্ত্বেও শার্টের বোতাম খুলল। ক্ষতটার বিভৎস অবস্থা, বড়সড় একটা ঘায়ে পরিনত হয়েছে সেটা। ক্ষতের ওপর সাদাটে পুঁজ আর মৃত চামড়ার স্তর জমেছে। রাতে শোয়ার সময় ঘষ লেগে কিছু জায়গা ফেটে গিয়ে চ্যাটচ্যাটে রক্ত বের হচ্ছে। অনি স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল সেই দগদগে ক্ষতের দিকে।
“তুই এতোবড় ক্ষত নিয়ে বসে আছিস?”
উদ্যান নিষ্প্রভ চিত্তে আড়মোড়া ভেঙে খাটের বাইরে পা রাখল। “শুধু বসে নেই শুয়েও ছিলাম; হাঁটাচলাও করছি। তাতে কী হয়েছে?”
“উফ তেহ! চল, এখনই ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।”
“হুম যাবো কিন্তু কোনো টেকনিশিয়ানের দোকানে। ফোনের লকটা খুলে নিয়ে আসতে হবে।”
“ডাক্তারের কাছে যাবি না?”
“নো।”
অনি হাড়ে হাড়ে টের পেল উদ্যান ভীষণই একগুঁয়ে আর উদাস প্রকৃতির। নিজের শরীরী যন্ত্রণার চেয়েও তার কাছে এখন জরুরি সেই মৃত মালিকের ফোনের ভেতরকার রহস্য উদ্ঘাটন করা।
উদ্যান ফ্রেশ হয়ে রক্তমাখা শার্টটা বদলে নিল। তারপর অনিকে সাথে নিয়ে বাড়ির বাইরে পা রাখল সে। দীর্ঘ দুই বছর পর বাইরের মুক্ত বাতাস আর সূর্যের আলো গায়ে মেখে অনি যেন বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। তার চোখেমুখে এক অবর্ণনীয় বিস্ময়। তবে আনন্দের পাশাপাশি ক্ষুধার তীব্র টানটাও সে অনুভব করল। সামনের একটা মুদির দোকান দেখিয়ে সে উজ্জ্বল মুখে বলল, “চল তেহ, কিছু খেয়ে নিই। দুপুরের আর রাতের জন্যও কিছু বাজার নিয়ে যেতে হবে।”
উদ্যান আশেপাশে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল, “হুম, তবে গিয়ে কিন্তু তোকেই কথা বলতে হবে। আমি ইংরেজিতে বললে বুঝবে বলে মনে হয় না।”
“আচ্ছা, আমি সামলে নেব।” অনি আত্মবিশ্বাসের সাথে মাথা নাড়ল।
দোকানের সামনে এসে অনি কিছু বলতেই যাবে তার আগেই সে হতভম্ব হয়ে গেল। ভেতরে দোকানদার এক কিশোর বয়সী ছেলের সাথে অত্যন্ত কর্কশ ভাষায় চিল্লাপাল্লা করছে।
“তোকে বলেছি না, আমি প্রতি সপ্তাহে সপ্তাহে টাকা দেই। আর তুই কিনা একদিন কাজ করেই টাকা চাইছিস?”
ছেলেটা থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। সে অবদমিত রাগে ফিসফিস করে বলল, “আপনি এই কথাটা আগে বলেন নি কেন? আমি কি এই এক সপ্তাহ না খেয়ে থাকবো নাকি? টাকা না হয় না দিলেন, কিছু অন্তত খেতে দিন। সপ্তাহ শেষে টাকাটা কেটে রেখে দেবেন।”
দোকানদার আবার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চিৎকার করে উঠল, “আমার দোকানে এমন কোনো নিয়ম নেই। যা এখান থেকে। একসপ্তাহ ঠিকমতো কাজ করতে পারলে তবেই টাকা পাবি, নয়তো একটা কানাকড়িও পাবি না।”
কথাটা শুনে ছেলেটার শরীর রাগে কাঁপতে লাগল। ক্ষুধার জ্বালায় সে কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে সামনে ঝুলে থাকা একটা বিস্কুটের প্যাকেটের দিকে হাত বাড়াতেই দোকানদার চিল্কার করে উঠল। সজোরে কয়েকটা থাপ্পড় আর কিল বসিয়ে দিল ছেলেটার পিঠে। তারপর ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তাকে রাস্তার ধুলোবালির ওপর ছুড়ে ফেলে দিল।
দৃশ্যটা দেখে অনি স্থির থাকতে পারল না। সে দৌড়ে গিয়ে ছেলেটাকে মাটি থেকে উঠতে সাহায্য করতে চাইল। প্রত্যুত্তরে ছেলেটা আরও ক্ষুব্ধ হলো। অনির হাতটা ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিয়ে জ্বলন্ত চোখে তাকাল তার দিকে। অনি ফাঁকা ঢোক গিলে বলল, “দুঃখীত।”
অনি কেন যে দুঃখীত বলেছে সে নিজেও জানেনা। ছেলেটা নিজে নিজেই উঠে দাঁড়িয়ে গায়ের ধুলো ঝাড়ল। তারপর একবার তাকাল অনির পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা উদ্যানের দিকে। দেখল উদ্যান তার দিকেই তাকিয়ে আছে। ছেলেটা বিশেষ পাত্তা না দিয়ে পরনের হুডিটা মাথায় টেনে নিয়ে চলে গেল উদ্দেশ্যহীন ভাবে।
চলবে,,,
শব্দসংখ্যা: ৩৫০০+
(আপনারা যদি পর্যাপ্ত রেসপন্স করেন তাহলে আগামী পর্বটা আগামীকালকেই দিয়ে দেবো)
Share On:
TAGS: অবাধ্য হৃৎস্পন্দন, সোফিয়া সাফা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৭
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৫
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৯
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৫(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৭১
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৫
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪০
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৩
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৭
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৮