Golpo কাজরী

কাজরী পর্ব ৩৫


কাজরী-৩৫

সাবিকুননাহারনিপা

“আল্পনা আপনার সমস্যাটি ধরা পড়ে কখন থেকে? তখন আপনার কতবছর বয়স ছিলো।”

“যখন আমার মা মারা যায় তখন থেকেই এই সমস্যা। কারণ আমি তাকে চোখের সামনে মরে যেতে দেখেছি। “

“কী হয়েছিল তার?”

“না। আমার সম্ভবত আগে থেকেই… খুব সম্ভবত…. এক মিনিট….

আল্পনা রিলাক্স। ব্রেনে বাড়তি চাপ নেয়ার প্রয়োজন নেই। আপনি রিলাক্স হয়ে ভাবুন। ছোটবেলা কেমন ছিলো! কোথায় কেটেছে? চোখ বন্ধ করে শান্ত হয়ে ভাবুন।

আল্পনা চোখ বন্ধ করে ফেলে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে কিছু স্মৃতি। তখন ওদের বাড়ি ছিলো গাজীপুরের দিকে। মায়ের শরীর খারাপ তাই জনমানব, কোলাহল থেকে নিরিবিলিতে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন ডাক্তার। গাজীপুর শহর সেই অর্থে নিরিবিলি না হলেও ওর বাবা আখতারউজ্জামান সুন্দর একটা বাড়ি করেছিলেন। বাড়িটি মনোরম নিরিবিলি পরিবেশে। বিশাল জায়গা জুড়ে গাছপালার মধ্যে বাড়িটি। মেইন শহর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরের বাড়িটি দেখে অনেকে এটাকে রিসোর্ট ভেবেও ভুল করতো। এর আগে ওরা থাকতো সিঙ্গাপুরে। সেখানে ওর নানা, নানুও ছিলেন। প্রথমে নানু মারা যায়, তারপর নানা। তারপর ওরা ফিরে আসে দেশে। কিন্তু তারও অনেক আগে বাবা দেশে ফিরে এসেছিলেন। আল্পনার স্মৃতিতে ভেসে ওঠে নানা আর বাবার মধ্যে তুমুল ঝগড়া। কী কারণে তাদের মনোমালিন্য হয় সেটা মনে পড়ে না, তবে ধারণা করতে পারে যে সুবর্ননগরে ফিরে বাবার রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া নিয়ে ঝামেলা হতে পারে।

গাজিপুরের নিরিবিলি বাড়িতে নেই নেই করেও লোকসংখ্যা ছিলো আট, দশজন। দুজন ড্রাইভার, বাড়ির কেয়ারটেকার, তার স্ত্রী ও এক মেয়ে। মায়ের সঙ্গে সার্বক্ষণিক একজন ট্রেনিংপ্রাপ্ত নার্স। আর ছিলেন মরিয়ম খালা। তখন আল্পনার বয়স কতো! সঠিক মনে করতে পারছে না, দশ কিংবা বারো হবে। কাজরী ওদের সঙ্গে আছে। দুই বোনের মিল নেই একদম। মা কিছুতেই ও’কে পছন্দ করে না। আল্পনা যদি কাজরীর সঙ্গে কথা বলতো তবে মা রেগে যেতেন। পাগলের মতো আচরণ করতেন। মা একবার ওর গলা টিপে ধরেছিল। মরিয়ম খালা জোর করে ছাড়িয়ে নেন, তিনি যখন কাজরীকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন তখন ওর জ্ঞান ছিলো না। ড্রাইভার ছিলেন আজিজ চাচা বলে একজন। তিনি গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে যান! কাজরী সুস্থ হয়ে ফিরে আসে। গলা ফুলে যায়, করুন চেহারায় ছলছলে চোখে আল্পনার দিকে তাকায়। বাবার কোলে ছিলো। আল্পনার ভীষণ খারাপ লাগে।

“আল্পনা… আল্পনা? “

আল্পনা হাত দিয়ে ইশারা করে। চোখ খুলে বলে,

“আমি ভুল বলেছি। আমি আরও আগে থেকে অসুস্থ….! “

“এক্সাক্টলি। আপনার ফাইলে লেখা আছে ক্লাশ নাইনে পড়া অবস্থায় আপনি মাত্র উনিশ দিন স্কুলে এটেন্ড করেছিলেন। “

“হ্যাঁ, আমি টেনশন নিতে পারতাম না। সিলেবাস কমপ্লিট করেও টেনশনে পরীক্ষার দিন সকালে অসুস্থ হয়ে যেতাম। “

“তখন সাইকিয়াট্রিস্ট এর আন্ডারে ছিলেন না?”

“না তো। তখন তো ডিপ্রেসড ছিলাম না। ভয়ও পেতাম না। শুধু… টেনশন….

আল্পনা থেমে যায়। মনে করার চেষ্টা করে। ওর স্মৃতি দূর্বল। অবশ্য দূর্বল হওয়ার কারণ আছে! লাস্ট কয়েক বছরের স্মৃতি ঘুরেফিরে মাথায় কিলবিল করতে থাকে। পুরোনো অনেক কিছুই মনে নেই। মায়ের সঙ্গে ভালো কোনো স্মৃতি মনে পড়ে না, বাবার সঙ্গেও না। বাবা চিরকাল অমনই দূর থেকে কথা বলতেন! ছোটবেলার ছবিগুলোতে ও বাবার কোলে আছে এমন কিছু মেমোরিজ ছাড়া আর কিছু নেইও যেগুলো দেখে ওর কিছু মনে পড়বে।

আল্পনা বড় করে নি:শ্বাস ছেড়ে দেয়। বলে,

“আমি এখন উঠব। আজ আর কথা বলতে ভালো লাগছে না। “

“কিন্তু আপনার রোগের ব্যাপারে ডিটেইল কিছু জানা হলো না। “

আল্পনার গলার স্বর রুক্ষ হয়ে যায়। বলে,

“আমার মা চোখের সামনে মারা যান। দৃশ্যটা ভয়ংকর। ত্রিশ সেকেন্ড আগেও তিনি চিৎকার করে কথা বলছিলেন। ত্রিশ সেকেন্ড পর রক্তে ভেসে যাচ্ছিলেন। হাত থেতলে গেছিলো… মুখ…. কতো রক্ত…. আমি আমি অতো রক্ত…. “

আল্পনার সামনে পানির বোতল এগিয়ে দেয়া হয়। ও পানি খায় না। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। বিভৎস সেই দৃশ্য মনে পড়ে গেলেই আল্পনার বুক ধরফর করে। হার্ট বন্ধ হবার উপক্রম হয়। ও কী কখনো সুস্থ হবে না? যতদিন ওই স্মৃতি মাথায় থাকবে ততদিন কী ও স্বাভাবিক হবে না!

আল্পনার মাঝখানে কিছু সময় ভালো গেছে। একজন এসেছিল জীবনে। দুর্জয়! ভালোবেসে আসে নি, একটা ট্র‍্যাপ ছিলো। কাজরীকে ফাঁসাতে আল্পনাকে গুটি হিসেবে ইউজ করেছে। সেও জানতো আল্পনা একটা লুজার। তাকে বোকা বানানো যায়। আল্পনার কানে কিছু শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়। তোমার একজন পার্টনার প্রয়োজন আল্পনা। কেন, কীজন্য এই কথাটা মনে পড়লো এই মুহুর্তে ও জানে না।

“আল্পনা? “

আল্পনা চমকে ওঠে। দূর্বল গলায় বলে,

“আপনার ওয়াশরুম টা ইউজ করা যাবে? “

“শিওর। “

আল্পনা এতোদিন যে সাইকিয়াট্রিস্ট এর আন্ডারে ছিলো তিনি হার্ট অ্যাটাকে মারা যান কয়েকদিন আগে। সেই কারণে নতুন সাইকিয়াট্রিস্ট এর আন্ডারে ট্রিটমেন্ট নিতে হচ্ছে। তিনি ওর হিস্ট্রি চেক করে নিয়েও প্রশ্নগুলো করছেন চিকিৎসার সুবিধার্থে। তার প্রশ্নের কারণেই আল্পনার বোধোদয় হয়। ওর অস্বাভাবিকতা তো আরও আগের। মা বেঁচে থাকতেও ছিলো। মায়ের মানসিক রোগের কারণেই সম্ভবত ছিলো। এখন তো ও জানে ঠিক কী কারণে মা জীবনের অর্ধেক সময় কঠিন জীবন যাপন করেছিলেন।


ইশান ও কাজরীর মিষ্টি অন্তরঙ্গতার আভাস শিরিনও পেলেন। বেশ অনেকটা সময় দুজনের মধ্যের দূরত্ব টের পেতে তার আলাদা চোখের প্রয়োজন হয় নি। পাশাপাশি থেকেও দুজনের মধ্যে অন্তরঙ্গতা আসেনি বলে তিনিও বিশ্বাস করতেন যে কাজরী ইশানের জীবনে কয়েকদিনের মেহমান মাত্র। স্বার্থের কারণেই ইশান ও’কে সহ্য করছেন। এখন এদের সম্পর্কের মিষ্টতা তাকে বিশেষ কিছু ভাবায় নি। এই মুহুর্তে তার ভাবনার বেশীরভাগ অংশ জুড়ে নিশান আছে। ইশান তো আছেই তবে ওর দাম্পত্য জীবন নিয়ে কিছু নেই।

কাজরীকে তিনি পছন্দ করেন না, একই কথা কাজরীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তার দেবরের মেয়ে যে কাজরী এটা নিয়ে আলাদা কোনো প্রমাণ পত্রের প্রয়োজন নেই। আখতারউজ্জামান এর ঘরে এই মেয়ে বেড়ে উঠছে এটা তিনি শুনেছিলেন বোধহয়। সেই সময়ে বিশেষ মাথা ঘামান নি, ঘামানোর প্রয়োজনও মনে করেন নি। আখতারউজ্জামান ধু*রন্ধর হলেও তিনি ওয়াজেদ চৌধুরীর সমকক্ষ নন। খুব বেশী হলে কোমলের মেয়ের জন্য বড় অংক, কিছু প্রোপার্টি চেয়ে নিবেন। কিন্তু তার প্যালেসে তার ই ছেলের বউ হয়ে আসবে এই ভাবনা তো ভুলেও আসে নি।

শিরিন তার দেবরের বউকে পছন্দ করতেন না। খুব বেশী সময় এক ছাদের নিচে তারা থাকেন নি বটে, তবুও যতটুকু দেখেছেন, শুনেছেন তাতে পছন্দ করার চেয়ে ঈর্ষান্বিত হয়েছেন বেশী৷ চৌধুরী খানদানের বিপুল সম্পত্তি মন্যুজান খাতুন এর ভাই ও কোমলের বাবার দান করা। একাত্তরের যুদ্ধের সময় তিনি বোনপুত্রের নামে সিংহভাগ সম্পত্তি লিখে দিয়েছিলেন সজ্ঞানে। তার ছেলে নেই এবং তাকে বোনের ছেলেরা ঠকাবেন না এটা ভেবেই কাজটা করেছিলেন। কোমল শান্ত স্বভাবের মেয়ে। আগুন সুন্দরী বলে যে কথাটা লোকে বলে সেটা কোমলের জন্য প্রযোজ্য ছিলো। কিন্তু তার দেবর! আস্ত মাকাল ফল!

শিরিন হাসে। ইশানের সঙ্গে বিয়ে হয়ে কাজরী যখন এই বাড়িতে পা রাখে সেদিনও তিনি ভেবেছিলেন মেয়েটির জীবন তার মায়ের চেয়ে ব্যতিক্রম হবে না। নিজের ছেলেকে তিনি চিনতেন তখন উচ্ছন্নে যাওয়া বেপরোয়া, মায়াদয়া হীন একজন হিসেবে। তিনি ভুল ছিলেন। ইশানকেও তিনি চিনতে পারে নি, কাজরীকেও না৷ দুজনেই তাকে বোকা প্রমাণ করে দিয়েছে। আর তার স্বামী! শিরিন মনে মনে প্রায় ই বলেন, চৌধুরী সাহেব বুদ্ধিতে, চিন্তায় বাজিমাৎ করার মতো তোমার সমকক্ষ কেউ নয়৷ কাজরীকে তিনি অস্বীকার করলে নিজের বিবেকের কাছে পরাজিত হতেন, আবার স্বীকার করলে নিজের বংশ মর্যাদা ক্ষুন্ন করতেন। তাই আখতারউজ্জামান এর টোপটাও গিলে ফেললেন। কিন্তু আখতারউজ্জামান এর লাভ টা কী হলো! তার উদ্দেশ্য টা ঠিক কী? পুরোনো ঘটনার সূত্র ধরে কিছু করতে চাইছিলেন! তাহলে তো বেচারা আশাহত হলেন। আহত বাঘের ন্যায় ক্ষত নিয়ে নীরবে আর্তনাদ করছেন।

শিরিন স্বামীর ছবিটির দিকে তাকান। এই মানুষটি ভালোবাসার অযোগ্য যেমন ছিলেন, তেমনি ঘৃনারও অযোগ্য। আজ তাকে সর্বশান্ত করে গেছেন। দুই ছেলে এখন তাকে সমান চোখে দেখেন। প্রবল ঘৃনার চোখে। ইশান তো আগে উপেক্ষা করতো, এখন করছে উপহাস, করুনা৷ তার ঠুনকো ইমেজ বাঁচানোর জন্য করুনা করছেন। আর নিশান! তার ধ্বংস দেখতে চায়। বাকী থাকে এশনা! মেয়ের নীরব চোখের চাহনী তাকে বুঝিয়ে দেয় অব্যক্ত সকল অভিযোগ। অথচ বাবাকে তারা শ্রদ্ধার চোখে দেখে। বাবার কথা ভেবে হয়তো আফসোসও করে যে তার মতো একটা খারাপ মানুষের সঙ্গে সংসার চালিয়ে গিয়েছেন দাঁতে দাঁত চেপে।

শিরিন পরাজিত এক সৈনিক। তবে সৈনিকরা কখনো লড়াই ভুলে যায় না। ঢাল, তলোয়ার পেলে যুদ্ধের ময়দানে ঝাপিয়ে পড়তে একটুও পিছপা হয় না৷

শিরিনের সকল ঠাট, বাট অহংকার ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে ভাঙা আয়নার মতো। মন্যুজান খাতুন এর বলা কথাগুলোও মিলে গেছে। শিরিনের দিন শেষ। তোমার পরিনতি হবে ভ*য়ানক। হয়েছেও তাই। গোটা প্যালেস জুড়ে মানুষজন সত্যি জেনে গেছে। তার অর্ধ উন্মাদ ছেলে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে শিরিনের কৃতকর্মের ফল। শাশুড়ীর মুখোমুখি হন নি তারপর। তিনি বেশ আনন্দে আছেন নাতি, নাতবউ, নাতনিকে নিয়ে। সাদরে আমন্ত্রিত অতিথিরাও বিদায় নেবার আগে শিরিনের দিকে তাকিয়েছিলেন ঘৃনার চোখে। অপমান, লোক জানাজানির ভয় কেটে যেতেই শিরিনি নতুন দিশা পেলেন। সব শেষ মানেই তো একেবারে শেষ হয়ে যাওয়া নয়। কিছু শেষ থেকে আবার নতুন শুরুও হতে পারে। ছেলে বউয়ের মিষ্টি, অন্তরঙ্গ সম্পর্কের আভাস পেয়েই নতুন করে তার মাথায় চিন্তা খেলে গেল। কাজরীকে একটু নরম গলায় বললেন,

“সংসারে খুব অশান্তি কাজরী, তোমার শ্বশুর চলে গেলেন, চারদিক থেকে এতো অশান্তি এসে ভর করলো! ভেবেছিলাম নিশানের বিয়ে দিয়ে পরিবেশ টা একটু শান্ত করব। কিন্তু…
যাইহোক তুমি তো কিছু ভাবতে পারো। আইমিন তোমরা। ইশান বাবা হলে আরও দায়িত্ববান হবে আশা করি। আর চৌধুরী খানদান যে সামলাচ্ছে তার তো আরও দায়িত্ববান, আরও ধৈর্য্যশীল, শান্ত হতে হবে। বিষয়টা ভেবো কেমন। ইশানের জন্য ভালো, তোমার জন্যও ভালো। সম্পর্ক মজবুত হবে। “

কাজরী কিছু বলল না। শিরিন দেখলেই কাজরীর চোখের দৃষ্টি নরম হওয়া। দাম্পত্য যখন শুরু হয়, তখন সময়টা থাকে ফুলের মতন। পাপড়ি গুলো ঝরে যাবার আগ পর্যন্ত কতো স্নিগ্ধ লাগে। দাম্পত্যের শুরুটাও তেমন। মিষ্টি মুহুর্ত যতক্ষন স্থায়ী থাকে ততক্ষন একজন আরেকজনকে খুশি করতে আপ্রাণ চেষ্টা করে। তিনি কাজরীর নরম দৃষ্টি দেখে টের পেয়েছেন যে এটা ওদের গোল্ডেন পিরিয়ড।

তবে শিরিন জানে না যে কাজরী দুর্দান্ত অভিনয় জানে। ইশান সেই অভিনয় বুঝতে পারলেও তিনি পারেন নি। কাজরী স্পষ্ট বুঝেছে শিরিন চৌধুরীর মতো স্বার্থপর মা চাইছেন তার ছেলে সংসারের মায়ায় আটকে থাকুক৷ তাই তার উপদেশটা ঠিক হজম না হলেও ভান করলো যে হজম করে ফেলেছে।

চলবে….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply