কাজরী-৩৪
সাবিকুননাহারনিপা
সকাল সাড়ে নয়টা বাজে। চৌধুরী প্যালেসের ব্রেকফাস্ট টেবিলে পরিবারের সকলে উপস্থিত। শিরিন নয়টা পঁচিশে এসে উপস্থিত হয়েছেন। অন্যান্য দিন ব্রেকফাস্টের টেবিলে সবাই সাড়ে আটটার মধ্যে উপস্থিত থাকে। গতকাল ডিনার পার্টি শেষ করে ঘুমাতে দেরি হবার কারণে সকলের ঘুম ভেঙেছে দেরি করে।
শিরিন এশনাকে জিজ্ঞেস করলেন,
“ওদের কী ব্যাপার? ঘুম ভাঙে নি?”
এশনা ঠোঁট উল্টে মুখের যে অভিব্যক্তি করলো সেটার অর্থ দাঁড়ায় ও কিছু জানে না।
রোদেলা হঠাৎ বলে উঠলো,
“আমি ডাকব? “
শিরিন কপাল কুঁচকে ফেলল বিরক্তিতে। গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন,
“না। তোমরা খেতে শুরু করো। “
রোদেলা সদ্য মা হয়েছে। পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছে। সেই খুশিতে গদগদ হয়ে একটু বেশীই উড়ছে। আশা করছে খালামনি তার আর ছেলের জন্য গ্র্যান্ড সেলিব্রেশন পার্টি রাখবেন। তাই তার চোখে আরেকটু ভালো হবার জন্য কাজরীর নামে একটু নি*ন্দা শুরু করলো,
“ইশানের কথা আলাদা, কাজরীর দেরি কেন হচ্ছে? আমি তো বাবুকে সামলেও ঠিক সময়ে ব্রেকফাস্ট টেবিলে আসলাম। “
শিরিন চোখ গরম করলেন। বললেন,
“তুমি এতো বাড়তি কথা বলছ কেন? কেউ তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করেছে?”
রোদেলা থতমত খায়। নিজের সাফাই গাইতে কিছু বলতে যাবে তখনই এশনার দিক থেকে প্রশ্ন এলো।
“তুমি নিজেকে ভাবীর মতো ভাবছ? হোয়াই?”
রোদেলার মুখ ভোতা হয়ে যায়৷ শিরিনের মেজাজ মর্জি বোঝা মুশকিল৷ আজকাল তিনি সহজেই মেজাজ হারিয়ে ফেলছেন। রোদেলার শাশুড়ী ইশারায় থামতে বললেন। রোদেলা ভোতা মুখ নিয়েই খাওয়া শুরু করলো।
কাজরী ইশানের দিকে তাকাচ্ছে না। ঘৃনা নয় লজ্জায়ই। ইশান যখন পাশ কাটিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল তখন কাজরী চোখ তুলে তাকায় নি। ইশান হাসিমুখে তাকিয়েই ছিলো। ইশান ওয়াশরুম থেকেই চিৎকার করে ডেকে বলল,
“কাজরী, আমার ব্রেকফাস্ট টা ঘরে দিতে বলো। “
কাজরী মৃদুস্বরে আচ্ছা শব্দটা উচ্চারণ করলো। ইশানের কাছে অস্পষ্ট ঠেকালো। শেষ রাতে ইশানের আহবান ও অস্বীকার করতে পারে নি। দ্বিধা দ্বন্দ ভুলে গিয়ে ইশানের হাতে সপে দিয়েছিল নিজেকে। ঠিক হলো নাকি ভুল হলো সেই হিসাব নিকাশের মধ্যে যেতে চায় নি।
ইশান ভেজা শরীরেই দরজা খুলে ডাকলো,
“কাজরী শোনো। “
কাজরী অস্বস্তি নিয়ে তাকালো। ইশান গম্ভীর গলায় বলল,
“ব্রেকফাস্ট ঘরে দিতে হবে না। আমি নিচে আসছি। “
“ঘুম হয়েছে ঠিকঠাক? “
শিরিন চৌধুরীর কোমল গলায় প্রশ্নটা শুনে কাজরী মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।
“ইশান ঠিক আছে? “
“হ্যাঁ আসছে। “
কাজরী বিরক্ত হলো। একদিন নিয়মের ব্যতিক্রম হতেই পারে, তাতে প্রশ্ন করার কী আছে!
ইশান এসে ওর পাশের চেয়ারে বসলো। দুজনের কেউই একজন আরেকজনের দিকে তাকাচ্ছে না। ইশান মায়ের সঙ্গে হালকা গলায় কথা বলল। কাজরী মাথানিচু করে খেতে লাগলো।
“এই রোদেলা এদিকে আসো। “
রোদেলা অনামিকার মায়ের দিকে তাকালো। ভদ্রমহিলা নিচু স্বরে কথা বলছেন। রোদেলা ঘরে ঢুকে বলল,
“কিছু বলবেন?”
“আরে আসো একটু গল্প করি। তোমার ছেলে কার কাছে এখন?”
“ওর দাদিমনির কাছে। “
“তাহলে বসো। তোমার ছেলেকে একটা গিফট দেব ভাবছি৷ তুমি ঠিক করো তো কী দেয়া যায়! তোমাকেও গোল্ডের কিছু দেব। “
রোদেলা গোল্ডের কথা শুনে মুখ বাঁকা করলো। বলল,
“আপনি যা বলতে চান বলেন। “
অনিতা মনে মনে বিরক্ত হলেন। রোদেলা মেয়েটা বে*য়াদব। পরগাছা হয়েও সেকি ভাব।
“শিরিনের কী হইছে জানো কিছু? “
রোদেলা সেয়ানা আছে। সে জানলেও মুখ খুলবে না। বলল,
“কিছু হয় নি। আঙ্কেল মারা যাবার পর খালামনি আপসেট। সব তো তাকে সামলাতে হচ্ছে। “
“নিশানের ব্যাপার টা কী? ও এমন ঠান্ডা কেন?”
রোদেলা বিশেষ কিছু জানে না। চৌধুরী গ্রুপের সমস্ত অফিশিয়াল ব্যাপার ইশান সামলাবে আর নিশান মায়ের সঙ্গে থেকে পলিটিকাল ব্যাপার গুলো দেখবে এমন কথা প্যালেসের অন্য সবার মতো ওর কানেও এসেছে। তবে নিশানের হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, দেশের বাইরে সাইকিয়াট্রিস্ট এর আন্ডারে ট্রিটমেন্ট নেয়া এসব ঠিক কী কারণে সেটা ওরও জানার আগ্রহ। শাশুড়ী তার বোনের পিছু পিছু ঘুরেও কিছু জানতে পারলো না। উল্টো শিরিন বলে দিয়েছেন প্যালেসে অসুবিধা হলে তোমরা রাজশাহীর অফিসে শিফট হয়ে যাও। তাই আগ্রহ থাকা স্বত্তেও এই ব্যাপারে কাউকে জিজ্ঞেস করে কিছু জানার উপায় বন্ধ। রোদেলা শক্ত গলায় বলল,
“আপনি খালামনিকে জিজ্ঞেস করুন কোনো কনফিউশান থাকলে। আমি তো স্পাইগিরি করি না। “
অনিতা জোর করে হাসার চেষ্টা করে বললেন,
“আরে না আমি এমনিই জানতে চাইলাম। তোমার ছেলেরে কী দেয়া যায় সেটার ব্যাপারে তোমার কাছে যেতাম। “
“আচ্ছা। এখন উঠি। এসব কথা চালাচালি আমি করি না। “
অনিতা হতভম্ব হয়ে গেলেন। কিছু বলারও খুঁজে পেলেন না। তবে রোদেলা তার সকালের দোষটুকু কাটানোর সুযোগ পেয়ে গেল। শিরিনের কানে কথাটা পৌছে দিলেন।
নিশান নিজের ঘরে আছে। ওর কোনো কাজ নেই। সাইক্রিয়াটিস্ট এর আন্ডারে থাকলেও তার কোনো এডভাইজ ফলো করছে না। এশনা আর কাজরী ছাড়া কারোর সঙ্গে কথাও বলছে না ভালো করে। ইশানকে এখন ও প্রচন্ড ভয় পায়। এমন ভয় ও বাবাকে পেত। নিজের বাবা না জেনেও মিস্টার চৌধুরীকে যখন ভাবে তখন বাবা হিসেবেই ভাবে। কাজরী ও’কে এক্সপ্লেইন করেছে। প্রচন্ড শকড হয়েছিল সব শুনে। সুইসাইড করতে যে সাহস লাগে তাও হারিয়ে ফেলেছে। ও যদি ছোট থেকে ব্যাপার টা জানতো তাহলে কী ওর জন্য ভালো হতো! বোধহয় হতো না, শৈশব নষ্ট হয়ে যেত। কাজরী ও’কে বলেছিল,
“নিশান তুমি যদি শুরু থেকে ব্যাপার টা জানতে তাহলে একটা ট্রমা নিয়ে বড় হতে। এটা তোমার জন্য খারাপ হতো৷ এখন যে খারাপ লাগাটা আছে সেটা কাটিয়ে ওঠো। নিজের কনফিডেন্স গ্রো করো। “
নিশান কাজরীর সামনে নিজের মানসিক অবস্থা প্রকাশ করে নি। ও পুরো ব্যাপার একসেপ্ট করতে পারছে না এখনো। প্রচন্ডরকম অস্বস্তি অস্থিরতা শুরু হয়ে যায় যখন ভাবে ও এই প্যালেসের একজন আশ্রিত। ইশান হলো মালিক, ইশানের বাবা ও’কে করুনা করেছিলেন বলে ওর একটা আইডেন্টিটি আছে। নাহলে ওর জায়গা হতো দেশের কোনো একটা এতিমখানা।
ত্রিশ বছর পর্যন্ত যা কিছু অর্জন করেছে, যত ডিগ্রি অর্জন করেছে সেসবও তুচ্ছ। প্রতিটি সাকসেস এর পর ও ভাইয়ের মুখোমুখি হয়ে জানান দেবার চেষ্টা করতো যে ও কতটা যোগ্য৷ কিন্তু সময় প্রমাণ করে দিয়েছে যে যোগ্য হলেও ও আসলে বিগ জিরো। ইশান হিরো ছিলো, আছে এবং থাকবে।
মায়ের মুখোমুখি নিশান হতে চায় না। তিনি আসেন, কিন্তু ও এখনো অবধি তার সঙ্গে কথা বলে নি। ভদ্রমহিলাকে মা ডাকার রুচিও হারিয়ে ফেলেছে। এই ভদ্রমহিলা ও’কে জন্ম না দিলেও পারতেন। দিয়েছিল যখন তখন তিনি কেন ওর জন্মপরিচয় গোপন রাখার জন্য আরও সচেতন হন নি।
নিশানের কাছে একটা অফার আছে। ইশান ও’কে বিজনেসের অফার করেছে। প্রচুর টাকা ইনভেস্ট করবে বিনিময়ে কিছু এক্সপেক্টও করবে না। নিজের লাইফ নিশান গুছিয়ে নিক এমন অপরচুনিটি ও’কে দেয়া হয়েছে। নিশান সময় নিয়েছে ভাবার। ভেবে ঠিক করেছে যে ইশানের অফার ও গ্রহণ করবে না। আর এই প্যালেস ছেড়ে কোথাও যাবে না৷ ও’কে মিস্টার চৌধুরী ডুবিয়ে দিয়ে গেছেন। হাত, পা বেঁধে মাঝ নদীতে ফেলে দিয়ে গেছেন। সেখান থেকে ফেরার পথ থাকলেও ও ফিরবে না। ডুবে যাবে, তবে ডোবার আগে শিরিন চৌধুরী, ইশান চৌধুরীকেও সঙ্গে নিয়ে ডুববে।
“ভাইয়া?”
নিশান চমকে উঠলো। এশনা ওর কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। দরজা খুলে কখন ঘরে ঢুকলো টের পায় নি।
“তুমি ঠিক আছ?”
নিশান এশনার দিকে তাকালো। আদুরে গলায় প্রশ্নটা করেছে। নিশান জবাব দিলো না।
“অনামিকাকে ইগ্নোর করছ। বিষয় টা ভালো দেখাচ্ছে না। “
নিশান রাগী গলায় বলল,
“তোর মা এটা বলতে পাঠিয়েছেন?”
এশনা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। নিশান ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে গেল। এশনাও গেল পিছু পিছু।
শিরিনের ঘরের দরজা বন্ধ ছিলো। নিশান ধুমধাম আওয়াজ করে দরজা খুলিয়ে ভেতরে ঢুকে বলল,
“আপনি দয়া করে আমার ব্যাপারে ভাবা বন্ধ করুন। “
শিরিন অশান্ত হলেন না। ক্লান্ত গলায় বললেন,
“এভাবে রিয়েক্ট করছ কেন? তোমার শরীর ভালো যাচ্ছে না। “
নিশান হো হো করে হাসলো। অস্বাভাবিক সেই হাসি দেখে এশনা ভয় পায়। শিরিন এগিয়ে এসে হাত ধরতে এলে নিশান দূরে সরে যায়।
“আপনি আমার সঙ্গে অনেক খারাপ করেছেন…. এখন আমাকে এই দেশ থেকে দূরে সরানোর চিন্তায় আছেন তাই তো? বেশ, আমি কোথাও যাব না, অন্তত আপনার অধ:পতন না দেখা পর্যন্ত। সরি মিসেস শিরিন চৌধুরী, আপনার মুখোশ টা আমার হাতেই খুলবে। “
শিরিন শান্ত চোখে সবটা দেখলেন। নতুন কিছু না, এমন অপমান তিনি তার অন্য ছেলের কাছেও পেয়েছেন। সেই ছেলের অকাট্য যুক্তি মানতে রাজি না হলেও অসভ্য আচরণ তিনি হজম করেছেন। কিন্তু নিশানের আচরণ তিনি হজম করলেন না। ঠাস করে থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন গালে। নিশান ভারী অবাক হলো। অপমানে দগ্ধ হয়েও এক বিন্দু ঘৃনা কম হলো না মায়ের জন্য। এশনা এগিয়ে এসে জোর করে টেনে নিয়ে গেল। শিরিন অনেক দিন আগেই টায়ার্ড হয়ে গেছেন। প্যালেসভর্তি সব মানুষজন। সবার চোখে পড়েছে এই ছেলের অস্বাভাবিকতা। অন্তত দূরে গিয়ে নিজেকে সামলাক। এই বয়সে এসে তিনি তার জীবনের লজ্জাজনক অধ্যায় টা সবার সামনে উন্মোচিত করতে চান না। কিছুতেই না..
ইশান আজ ইচ্ছে করেই বাইরের কাজগুলো স্কিপ করলো। প্যালেসে থাকতে চাইলো, কাজরী ও’কে এড়িয়ে যেতে চাইলেও পারলো না। মন্যুজান খাতুনের ঘরে গেলেও সেখানে পৌছে গিয়েছিল ইশান। পাশাপাশি গা ঘেঁষে বসে ফিসফিস করে প্রশ্ন করলো,
“তুমি আমাকে ইগ্নোর করছ কেন? লজ্জায়?”
কাজরী নিজের গালে আবারও সেই গরম ভাপ অনুভব করলো। বুকের ভেতরে অনুভব করলো নতুন সেই বিদ্যুৎ চমকানো অনুভূতি। ইশান আবারও বলল,
“নিজের ফিলিংস কে ইগ্নোর কোরো না কাজরী। আই নো ইউ। তুমিও আমার জন্য স্পেশাল কিছু ফিল করছ। “
কাজরী চকিতে ইশানের দিকে ফিরে তাকায়। মন্যুজান খাতুন তখন তার শৈশবের গল্প বলছেন একমনে।
কাজরী কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যায়। ইশান আবারও বলে,
“একটা হানিমুন ট্রিপ প্ল্যান করে ফেলি? তোমার পছন্দের কোনো দেশ। ইতালি? রোম?”
কাজরী জবাব দেয় না। শুধু ঠোঁটে মৃদু হাসির রেখা ফুটে ওঠে। ইশানের বলা কথাগুলো এতো আদুরে ছিলো যে চাইলেও নিজের এক্সপ্রেশন কে কঠিন করতে পারলো না।
চলবে…..
Share On:
TAGS: কাজরী, সাবিকুন নাহার নিপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাজরী পর্ব (৩০+৩১)
-
কাজরী পর্ব ২৭
-
কাজরী পর্ব ২০
-
কাজরী পর্ব ১৬
-
কাজরী পর্ব ১৫
-
কাজরী পর্ব ৫
-
কাজরী পর্ব ৬
-
কাজরী পর্ব ১০
-
কাজরী পর্ব ৩২
-
কাজরী পর্ব ৩