রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব_৫৬(বর্ধিতাংশ)
নিলুফানাজমিননীলা
★★★
সন্ধার দিকে আরিয়ান আর আদনান সেই কবিরাজের বৈঠকখানায় পৌঁছাল। চারদিকে লাল-নীল অস্পষ্ট আলোর ঝিকিমিকি, ধূপের কড়া গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে আছে। আরিয়ান হাঁটতে হাঁটতে নিচু স্বরে বলল,
“আদনান, এখনো ভেবে দেখ। এসব করতে গিয়ে পরে সমস্যায় পড়ব না তো?”
আদনান পুরো কনফিডেন্স নিয়ে বলল,
“আরে না ভাইয়া! কিসের সমস্যা হবে? আমার এক বন্ধু তার প্রেমিকাকে বশ করার জন্য এখান থেকেই ঔষধ নিয়েছিল। এখন তো সেই মেয়ে তাকে ছাড়া কিছুই বোঝে না।”
আরিয়ান আর দ্বিরুক্তি করল না। কিছুদূর এগোতেই দেখল এক বিশাল পুরোনো বটগাছের নিচে কবিরাজ বসে আছে। বটগাছের ঝুরিতে লাল কাপড়ের টুকরো ঝোলানো। লোকটির চেহারা কুচকুচে কালো। আদনান আর আরিয়ান গিয়ে সেই লোকের সামনে দাঁড়াল। আদনান একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“বাবা, আপনার সাথে একটু জরুরি কথা ছিল।”
কবিরাজ চোখ বন্ধ করেই গম্ভীর স্বরে বলল,
“বল, কী বলবি?”
“বাবা, আমাদের বউ… ইয়ে মানে আমার ভাইয়ের বউ আমার ভাইয়ের কথা একদম শোনে না। এমন কিছু একটা দিন যাতে ভাবি সবসময় আমার ভাইয়ের ইশারায় চলে।”
লোকটি হঠাৎ বিকট শব্দে হেসে উঠল। হাসি থামিয়ে লোকটি বলল,
“বউ বশ করা? এই সামান্য কথা! কোনো সমস্যা নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে, তবে টাকা লাগবে।”
“টাকা কোনো বড় সমস্যা না বাবা। আপনি শুধু মোক্ষম ঔষধটা দেন।”
এরপর আদনান একটু নিচু হয়ে কবিরাজের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “আমাকেও একই ঔষধ এক ফাইল দিয়েন কিন্তু!”
আরিয়ান পাশে দাঁড়িয়ে সবটা শুনছিল। আদনানের কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে বলল,
“তোর আবার ঔষধ লাগবে কেন? তুই না বললি তোর বউ তোকে মাথায় তুলে নাচে? সারাদিন তোর ইশারায় চলে?”
আদনান আমতা আমতা করে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“আসলে ভাইয়া, মনের তো কোনো বিশ্বাস নেই! এখন মাথায় তুলে নাচছে ঠিকই, কিন্তু যদি কোনোদিন অবাধ্য হয়ে যায়? তাই আগেভাগেই ব্যবস্থা রাখা আর কী!”
কবিরাজ তাদের দুজনের এই কাণ্ড দেখে হাতের তুড়ি বাজিয়ে বলল, “এত কথার দরকার নেই। দুজনের মিলিয়ে দশ হাজার টাকা লাগবে।”
দশ হাজারের কথা শুনে আরিয়ান আর আদনান যেন আকাশ থেকে পড়ল। দুজনে একযোগে চোখ বড় বড় করে বলে উঠল,
“কী! এত টাকা?”
কবিরাজ এবার নিজের দাড়িতে হাত বুলিয়ে বিজ্ঞের মতো বলল, “ভালো ফল পেতে গেলে তো একটু টাকা খরচ করতেই হবে বাবা। ভালোবাসা কি আর সস্তায় পাওয়া যায়?”
আদনান এবার আরিয়ানের কাঁধে ভর দিয়ে কানে কানে ফুসলানি দিয়ে বলল, “ভাই, দিয়ে দাও। তৃণা ভাবির যে রাগ, তাতে এই টাকা উসুল হয়ে যাবে। ভালো হবে কিন্তু!”
আরিয়ান একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল। ভেতরে হাতড়ে দেখল সেখানে ক্যাশ এত টাকা নেই। আরিয়ান কিছু বলার মুখ খোলার আগেই কবিরাজ দাঁত বের করে এক বিশ্রী হাসি দিয়ে বলল,
“টাকা নিয়ে চিন্তা কোরো না বাবা। ডিজিটাল যুগ, মোবাইলেই পেমেন্ট দিয়ে দাও।”
আদনান মনে মনে বিড়বিড় করল, “বাব্বাহ! এ তো দেখি মহাস্মার্ট কবিরাজ! বটের তলায় বসে ক্যাশলেস ট্রানজেকশন চালাচ্ছে!’’
আরিয়ান অনেকটা বাধ্য হয়েই পেমেন্টটা সেরে ফেলল। তবে মনে মনে নিজেকেই শোনাল, ‘কাজ যদি না হয়, তবে এই কবিরাজের কবি যোগ রাজ সব কটা আমি আজকেই ছুটিয়ে দেব।’
টাকা অ্যাকাউন্টে পৌঁছানোর মেসেজ বাজতেই কবিরাজ তার পাশে বসে থাকা এক চ্যালা বা কর্মচারীকে ইশারা করল। সে তৎক্ষণাৎ উঠে গিয়ে ভেতর থেকে একটা জরাজীর্ণ মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে আসল। প্যাকেটটা দেখে আদনান ভ্রু কুঁচকে বলে উঠল,
“মিষ্টি খাওয়াতে হবে না। আপনি বরং ওই ফাইল বা যা আছে ওসব দেন, আমরা চলে যাই।”
লোকটি প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“আরে পাগল! এটাই তো ঔষধ।”
আরিয়ান এবার সত্যি সন্দিহান হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“মিষ্টি আবার ঔষধ হয় কী করে?”
কবিরাজ গম্ভীর গলায় বলল, “
এতে স্পেশাল ঔষধ মেশানো আছে। সাধারণ মিষ্টি মনে করলে ভুল করবি।”
আদনান এবার প্যাকেটের দিকে তাকিয়ে উৎসুক হয়ে বলল, “আচ্ছা বাবা, তার মানে এই মিষ্টিগুলো আমাদের বউদের খাওয়াতে হবে?”
কবিরাজ মাথা নেড়ে বলল, “উঁহু! তোরা খাবি।”
আদনান আর আরিয়ান এবার একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। আদনান ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, “মানে? আমরা খেলে আমাদের বউ কীভাবে বশ হবে? সেটা তো মাথায় ঢুকছে না!”
“হবে হবে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অন্তরের টান আছে না? তোরা খেলে সেই ওষুধি গুণের টান তাদের কলিজায় গিয়ে লাগবে।”
আদনান সাথে সাথে গলে গিয়ে বলল, “হ হ, ঠিক ঠিক! একদম ঠিক বলেছেন বাবা। অন্তরের টানই তো আসল।”
আরিয়ান আদনানের এই গদগদ ভাব দেখে বিরক্ত হয়ে একটা ধমক দিল, “চুপ কর তো! আজব সব কথাবার্তা। চল এবার এখান থেকে।”
দুজনে সেই আজব মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে তড়িঘড়ি করে কবিরাজের ডেরা ত্যাগ করল।
★★★
আরিয়ানের গাড়িটা রাতের হাইওয়ে ধরে দ্রুতগতিতে মির্জা বাড়ির দিকে ছুটে চলছে। রাস্তার ধারের ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো জানলার কাঁচ দিয়ে আরিয়ানের গম্ভীর মুখে এসে পড়ছে। সে একমনে ড্রাইভ করছে। অন্যদিকে পাশে বসে থাকা আদনানের আনন্দ আর ধরে না! সে মনে মনে এক বিশাল কল্পনার জগত সাজিয়ে ফেলেছে যেখানে সে ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে আয়েশ করে পা তুলে বসে আছে আর নৌশি বিনম্রভাবে তার সামনে শরবতের গ্লাস ধরে দাঁড়িয়ে আছে। যাক, আজ থেকে অন্তত খাট থেকে পড়ে যাওয়ার ভয়টা থাকবে না!
আদনানকে এমন আপন মনে হাসতে দেখে আরিয়ান আড়চোখে তাকিয়ে বলল,
“কী হলো? কী ভাবছিস যে এত হি হি করছিস?”
আদনান গদগদ হয়ে বলল, “কী বলব ভাইয়া! আমার না খুশিতে এখনই নাচতে মন চাচ্ছে।”
আরিয়ান বলল, “নাচবি? দাঁড়া, এখনই মিউজিক প্লেয়ারে গান ছেড়ে দিচ্ছি, কমলা নাচে কোমর দুলাইয়া। তুইও নেচে নেচে কোমর দোলা গে।”
আদনান মুখটা একটু কাঁচুমাচু করে বলল,
“কিন্তু ভাইয়া, আমি তো আর কমলা না!”
“আরে ধরে নে তুই কমলার পুরুষ ভার্সন। এখন চুপ করে বোস তো!” আরিয়ানের ধমকে আদনান আর কথা বাড়াল না।
গাড়িটা একসময় মির্জা বাড়ির বিশাল গেটের সামনে এসে থামল। আরিয়ান গাড়ি থেকে নামার জন্য হ্যান্ডেলে হাত দিতেই আদনান খপ করে তার হাত চেপে ধরল। বাধা দিয়ে বলল,
“দাঁড়াও ভাইয়া! ওখানেই নামছ কেন? মিষ্টিগুলো কি গাড়িতে বসেই খেয়ে নেব না?”
আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল, “কেন? বাড়ির ভেতর গিয়ে আরাম করে খেলে কী সমস্যা?”
আদনান ফিসফিসিয়ে বলল, “আরে ভাইয়া, কী যে বলো! বাড়ির ভেতর গিয়ে যদি প্যাকেট খুলি তখন কেউ জিজ্ঞেস করেন কিসের মিষ্টি, তখন কী জবাব দেবে? বলবে যে বউ বশ করার ‘টনিক’ খাচ্ছি? ইজ্জত কি আর থাকবে?”
আরিয়ান কিছুক্ষণ ভেবে দেখল আদনানের কথায় যুক্তি আছে। সে মাথা নেড়ে বলল,
“তাও ঠিক। আচ্ছা চল, গাড়িতে বসেই খেয়ে নিই আগে।”
আদনান অনেক উৎসাহ নিয়ে মিষ্টির প্যাকেটটা খুলল। কিন্তু প্যাকেট খুলতেই তার মুখের হাসিটা মুহূর্তেই উবে গেল। প্যাকেটের ভেতর মাত্র চারটা ছোট ছোট গোল্লা আকৃতির মিষ্টি পড়ে আছে। আদনান হাহাকার করে উঠল,
“হায় খোদা! এই মাত্র চারটা মিষ্টির জন্য ওই বাটপার কবিরাজ দশ হাজার টাকা নিল? একেকটা মিষ্টির দাম কি আড়াই হাজার টাকা করে?”
আরিয়ান তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,
“এখন আর দাম হিসাব করে লাভ নেই। বেশি কথা না বলে দে, আগে খাই।”
দুজনে মিলে প্যাকেটে থাকা মিষ্টি খাওয়া শুরু করল। আরিয়ান প্রথম মিষ্টিতে একটা কামড় দিয়েই মুখটা কুঁচকে ফেলল। চিবোতে চিবোতে বলল, “কেমন একটা বিদঘুটে গন্ধ আসছে না মিষ্টি থেকে? কেমন যেন ভ্যাপসা ভ্যাপসা স্মেল!”
আদনান নিজেও সেই উটকো গন্ধটা পাচ্ছিল। মিষ্টির স্বাদটাও যেন একটু তিতকুটে। তবুও সে নিজেকে শান্ত রাখতে বলল, “আরে ভাইয়া, ওটা তো স্পেশাল ওষুধি ঘ্রাণ! অমৃতের কি আর সাধারণ মিষ্টির মতো গন্ধ হয়?”
দুজন মিলে কোনোমতে চারটা মিষ্টি সাবাড় করল। প্যাকেটের শেষ অবশেষটুকু বাইরে ফেলে দিয়ে তারা বেশ সাহস সঞ্চয় করে বাড়ির ভেতর ঢুকল।
★★★
রান্নাঘরে রান্ন করছে রিনি। মেয়েটা এই ক’দিনে নিজেকে যেন আমূল বদলে ফেলেছে। এক সময়ের চঞ্চল আর জেদি রিনি এখন বেশ গুছিয়ে রান্না করতে পারে। ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে পত্রিকা পড়ছিলেন ওমর হাওলাদার, তিনি গলা চড়িয়ে ডাক দিলেন,
“রিনি, চা টা দিয়ে যাস মা।”
রিনি ওপাশ থেকে সাড়া দিল,
“হ্যাঁ আব্বু, আসছি।”
রিনি এখন স্থায়ীভাবেই এই হাওলাদার বাড়িতে থাকছে। শুরুতে নিজের ফ্ল্যাটেই ছিল, কিন্তু ওমর হাওলাদার যখন দেখলেন রিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরে নিজেকে শুধরে নিচ্ছে, তখন বড় একা এই মানুষটাই তাকে অনুরোধ করেছিলেন এখানে চলে আসতে। রিনিও দ্বিমত করেনি, একে তো বাবার মতো এই মানুষটার সেবা করা যাবে, তার ওপর নিজের একাকিত্বও ঘুচবে।
রিনি ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ নিয়ে এসে ওমর হাওলাদারের হাতে দিল এবং নিজে গিয়ে পাশের সোফাটায় বসল। ওমর হাওলাদার চায়ে একটা চুমুক দিয়েই চোখ বন্ধ করে তৃপ্তির হাসি হাসলেন। বললেন,
“বাহ! তোর হাতের চা একদম তৃণার মতো। সত্যি বলতে কি, তার চেয়েও ভালো হয়েছে!”
রিনি একটু লাজুক হেসে বলল,
“আমায় পাম দিচ্ছো তাই না বলো আব্বু?”
ওমর হাওলাদার স্নেহে রিনির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “দূর পাগলি মেয়ে! পাম দিতে যাব কেন? যেটা সত্যি সেটাই বলছি। তোর হাতের চায়ে আলাদা একটা মমতা আছে।”
রিনি হাসল। ওমর হাওলাদার এবার একটু নিবিড় চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“একটা জিনিস খেয়াল করলাম, এই বাড়িতে আসছিস থেকে তুই আমাকে ‘আব্বু’ বলে ডাকছিস। আগে তো ‘পাপা’ বলে ডাকতি।”
রিনি কিছুক্ষণ উদাস হয়ে জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল। তারপর নিচু স্বরে বলল,
“তৃণা যখন তোমাকে আব্বু বলে ডাকে, তখন আমার মনে হতো এই ডাকটার ভেতরে বুঝি মধু বেশি। তাই আমিও ডাকতে শুরু করলাম। এখন রিয়েলাইজ করছি, ‘আব্বু’ ডাকের ওপর আর কোনো মধুর ডাক এই পৃথিবীতে নেই।”
ওমর হাওলাদার রিনির কথায় মুচকি হাসলেন। তাঁর চোখ দুটো ভিজে এল। ঠিক সেই মুহূর্তে রিনি আবেগপ্রবণ হয়ে বলল, “আব্বু, আমাকে আমার পূর্বের সব অপকর্মের জন্য ক্ষমা করে দিও। আমি অনেক ভুল করেছি তোমাদের সাথে।”
ওমর হাওলাদার পরম মমতায় রিনিকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিলেন। ধরা গলায় বললেন,
“বাবার কাছে মেয়ের কি কখনো ভুল থাকতে পারে?”
রিনির চোখ বেয়ে তখন শ্রাবণের ধারার মতো জল গড়িয়ে পড়ছে। যদিও ওমর হাওলাদারের সাথে রিনির কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই, তবুও এই মানুষটা তাকে বাবার ভালোবাসার কোনো কমতি রাখেননি। রিনি জীবনে প্রথমবার ‘বাবা’ নামক এক বিশাল বটবৃক্ষের ছায়ায় নিজের আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। তার ইচ্ছে করছে, এই নিরাপদ বুকেই যেন এক জনম পার করে দিতে পারে।
★★★
আরিয়ান আর আদনান যখন ড্রয়িংরুমে পা রাখল, তখন সেখানে মিতু, নৌশি আর তৃণা আড্ডায় মশগুল। সচরাচর এই দুই ভাইকে একসাথে কোথাও যেতে দেখা যায় না, তাই তাদের দুজনকে একসাথে দেখে তিনজনেই বেশ অবাক হলো। মিতু ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“কী ব্যাপার? আজ সূর্য কোন দিকে উঠেছে? দুই ভাই একসাথে কোথায় গিয়েছিলে?”
আদনান দাঁত বের করে একটা হাসি দিয়ে বলল,
“ এই তো একটু বাইরে হাওয়া খেতে গিয়েছিলাম।”
মিতু বিস্ময় নিয়ে বলল, “হাওয়া খেতে! তোমাদের হাওয়া খাওয়ার শখ হলো কবে থেকে?”
আরিয়ান ওসব কথায় কান না দিয়ে তৃণার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
“তৃণা, রুমে এসো। কথা আছে।”
তৃণা কোনো উত্তর না দিয়ে ঝট করে মুখ ফিরিয়ে নিল। তার মানে অভিমান এখনো এক বিন্দুও কমেনি। আরিয়ান আদনানের দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“কী রে আদনান? তোর ওই কবিরাজি মিষ্টির তো কোনো কাজ হচ্ছে না!”
আদনান অভয় দিয়ে বলল, “আরে ভাইয়া, ধৈর্য ধরো! মাত্র তো খেলে, রক্তে মিশতে দাও। কয়েক ঘণ্টা যাক, তারপর ম্যাজিক দেখবে।”
আরিয়ান আর কথা বাড়াল না, গটগট করে নিজের রুমে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর তৃণা রুমে ঢুকতেই আরিয়ান উঠে দাঁড়াল। তৃণা পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলে আরিয়ান পথ আটকে দাঁড়াল। তৃণা তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
“সরুন সামনে থেকে।”
” আরিয়ান আদুরে গলায় বলল।
“আমার শ্যামলিনীর রাগ কি এখনো জল হয়নি?তৃণা
নিরুত্তর। আরিয়ান আবারও বলল, “সরি তো বললাম। এবার মাফ করে দাও না!”
তৃণা তবুও পাথরের মতো অনড়, গালে সেই অভিমানের ফোলাভাব এখনো অটুট। আরিয়ান এবার পকেট থেকে ফোনটা বের করে সরাসরি মীরার নাম্বারে কল দিল। তৃণা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কাকে কল দিচ্ছেন আপনি?”
আরিয়ান কোনো জবাব দিল না। ওপাশ থেকে কলটা রিসিভ হতেই আরিয়ান লাউডস্পিকার অন করে বলতে লাগল,
“শোন মীরা, তুই তো আমার মায়ের মতো। একজন মা হয়ে নিজের ছেলের কাছে ‘বেবি-টেবি’ লিখে মেসেজ দিস না তো! তোর এসব মেসেজের কারণে আমার বউ ভীষণ রাগ করে, অভিমান করে অনেক কষ্ট পায়। আর আমার বউয়ের চোখে জল দেখলে আমার কলিজায় টান লাগে। তুই বরং চটপট একটা বিয়ে করে নে, তারপর ওই ভদ্রলোককে ‘আব্বা’ ডাকার সুযোগ করে দে। আর খবরদার! আমাকে আর কোনোদিন মেসেজ দিবি না, নইলে আমার বউ আমাকে মারবে।”
বলেই আরিয়ান কলটা কেটে দিল। তৃণা এতক্ষণ বড় বড় চোখ করে আরিয়ানের কাণ্ড দেখছিল, আরিয়ান এরকম কান্ড দেখে সে ফিক করে হেসে দিল। তৃণার মুখে হাসির রেখা দেখে আরিয়ানের বুকের পাথরটা যেন নেমে গেল। সে পরম মমতায় তৃণাকে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিল। তৃণার কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“তুমি রাগ করে থাকলে আমার ভালো লাগে না শ্যামলিনী।”
কিন্তু রোমান্টিক এই মুহূর্তটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হঠাৎ আরিয়ান অনুভব করল তার পেটের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠছে। একটা চিনচিন ব্যথা মুহূর্তেই সারা পেটে ছড়িয়ে পড়ল। আরিয়ান তৃণাকে সরিয়ে দিয়ে কুঁকড়ে গিয়ে বলল, “তুমি একটু বসো, আমি ওয়াশরুম থেকে আসছি।”
বলেই সে ঝড়ের বেগে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। তৃণা একটু অবাক হলো ঠিকই, তবে বিশেষ কিছু না ভেবে বিছানা গোছাতে শুরু করল। কয়েক মিনিট পর আরিয়ান ঘামতে ঘামতে বেরিয়ে আসল। কিন্তু দরজা বন্ধ করে বিছানার দিকে দু-কদম এগোতেই সে আবারও পেট চেপে ধরল। তার মুখভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে ভেতরে কোনো ওলটপালট চলছে।
তৃণা উদ্বিগ্ন হয়ে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে আপনার? মুখটা এমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে কেন?”
আরিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে কোনোমতে বলল, “কিছু না, বোধহয় গ্যাস্ট্রিক হয়েছে।” কিন্তু কথা শেষ করতে না করতেই সে আবারও দৌড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। এভাবে প্রায় ছয়-সাতবার আসা-যাওয়া চলল। সে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে। তৃণা এবার ভয় পেয়ে গেল। সে আরিয়ানের কপালে হাত দিয়ে বলল, “আপনার তো অনেক শরীর খারাপ লাগছে। আমি কি ডক্টরকে কল দেব?”
আরিয়ান ক্লান্ত গলায় জবাব দিল, “না… লাগবে না… উফ!” বলেই সে আবারও তিরের বেগে ওয়াশরুমের দিকে ছুটল।
আদনানের অবস্থাও তখন শোচনীয়। মনে হচ্ছে পেটের ভেতর কেউ বিশ্বযুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে। কয়েকবার ওয়াশরুম থেকে ম্যারাথন দৌড় দিয়ে এসে সে ধপাস করে বিছানায় বসল। মুখটা আমসির মতো শুকিয়ে গেছে। আদনানের এই করুণ দশা দেখে নৌশি বিছানার এক কোণে বসে ঠোঁট টিপে হাসছে।
আদনান দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“হাসিস না নৌশি। একদম হাসবি না, লাত্থি খাবি কিন্তু!”
নৌশি এবার কোমরে হাত দিয়ে রুখে দাঁড়াল। ভ্রু নাচিয়ে বলল, “দে লাত্থি, দেখি কত বড় সাহস তোর! সকালে একটা খেয়েও কি পেট ভরেনি যে আবার বায়না ধরছিস?”
আদনান আর পাল্টা যুক্তি দেওয়ার শক্তি পেল না। পেটের ভেতর তখন মোচড় দিয়ে উঠছে, মনে হচ্ছে নাড়িভুঁড়ি সব জট পাকিয়ে যাচ্ছে। নৌশি তার অবস্থা দেখে মায়া দেখানোর বদলে ফিক করে হেসে বলল, “একটা বুদ্ধি দিই তোকে?”
আদনান অসহায়ভাবে তাকিয়ে বলল, “কী?”
“পাছায় একটা কাগজ শক্ত করে বেঁধে নে। তাহলে অন্তত বারবার এই দৌড়টা দিতে হবে না।”
আদনান নৌশির দিকে হা করে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের কপাল চাপড়ে আর্তনাদ করে বলল, “হায় রে কপাল! আমার যদি ক্ষমতা থাকত, তাহলে তোর এই ঐতিহাসিক বুদ্ধির জন্য ডক্টর ইউনুসের নোবেল প্রাইজটা তোকে এনে দিতাম। দুনিয়া উদ্ধার হয়ে যেত!”
কথাটা শেষ করতে পারল না আদনান, আবারও পেটের ভেতর গুড়গুড় শব্দ শুরু হতেই সে তিরের বেগে ওয়াশরুমের দিকে ছুটল। কমোডে বসে বসে সে এখন যত রকমের গালি জানা আছে সব কবিরাজকে দিচ্ছে। বিড়বিড় করে বলছে,
“হারামজাদা বাটপার কবিরাজ! নির্ঘাত নষ্ট মিষ্টি খাইয়ে দিয়েছে। আমার জীবন এখন যায় যায় অবস্থা। ওরে যদি একবার হাতের নাগালে পাই, তবে একদম জ্যান্ত পুঁতে ফেলব! দশ হাজার টাকা দিয়ে আমি শেষমেশ ডায়রিয়া কিনলাম।”
আরিয়ান আর পারছিল না, রুমের চার দেয়ালের ভেতর থাকলে পেটের মোচড় যেন আরও বেড়ে যাচ্ছে। একটু স্বস্তির আশায় সে করিডোরে বেরিয়ে এল হাঁটাহাঁটি করতে। ঠিক সেই মুহূর্তেই তার নজরে পড়ল আদনানকে। আদনানও দেয়ালে হাত রেখে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে করিডোর দিয়ে হাঁটছে. আদনানকে দেখা মাত্রই আরিয়ানের চোখের মণি রাগে স্থির হয়ে গেল। আদনান বড় ভাইয়ের অগ্নিশর্মা চেহারা দেখেই বুঝে গেল যে আজ কপালে অশেষ দুর্গতি আছে। সে উল্টো দিকে দৌড় দেওয়ার চেষ্টা করতেই আরিয়ান ক্ষিপ্র হাতে পেছন থেকে আদনানের কলার আর ঘাড় চেপে ধরল।
আদনান আর্তনাদ করে উঠল,
“ভাইয়া ছাড়ো! উফ, লাগছে তো!”
আরিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে গরগর করে বলল,
“হারামজাদা বদমাইশ! খুব তো বলেছিলি কবিরাজের কাছে গেলে বউ বশ হয়ে যাবে। বশ হওয়া তো দূরে থাক, এখন তো বাথরুমে দৌড়াতে দৌড়াতে আমার জান বের হওয়ার উপক্রম!”
আদনান তখন ব্যথায় আর পেটের চাপে কুঁকড়ে গিয়ে বলল, “আমার কী দোষ বলো? আমি কি জানতাম নাকি ওই বুড়ো ভামটা আমাদের নষ্ট মিষ্টি খাওয়াবে? দেখো না, আমার নিজের অবস্থাও তো কেরোসিন! ছাড়ো ভাইয়া, দোহাই লাগে!”
আরিয়ান কিছুতেই ছাড়ল না। আদনান এবার নিরুপায় হয়ে মুখভঙ্গি খিঁচিয়ে দাঁত মুখ শক্ত করে বলল,
“ভাইয়া, হাগু পেয়েছে! এখন যদি না ছাড়ো, তবে এখানেই কিন্তু কাজ সেরে দেব! সামলাতে পারবে না কিন্তু!”
আদনানের এই কথা শুনে আরিয়ান সাথে সাথে হাত সরিয়ে এক হাত দূরে গিয়ে দাঁড়াল। আদনান এক সেকেন্ডও নষ্ট করল না, ওখান থেকেই
দৌড় দিয়ে নিজের রুমে ঢুকে সোজা ওয়াশরুমে সেঁধিয়ে গেল।
এদিকে আদনানকে ছেড়ে দিতেই আরিয়ানের পেটের ভেতরও মুচোর দিয়ে উ। সেও আর এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজের পেট চেপে ধরে পাগলের মতো নিজের রুমের ওয়াশরুমের দিকে দৌড় দিল।
চলবে…
(দিনদিন রেসপন্স কমছে সাথে আমি গল্প লেখার আগ্রহ হারাচ্ছি। প্লিজ সবাই রেসপন্স করবেন। চুরি করে গল্প পড়েই বিদায় হয়ে যাবেন না।)
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা, রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৮
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্রের পর্ব ৪৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫০ (প্রথমাংশ)