যেখানেপ্রেমনিষিদ্ধ
ইশরাতজাহানজেরিন
পর্ব_১৪
রাত স্টুডিওর কাঁচঘেরা ঘরটায় বসে আছে। মাইক্রোফোনটা তার সামনে ঝুলছে, হেডফোন কানে, কিন্তু তার গলায় আজ সেই পরিচিত সুরটা আসছে না। বাইরে সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার হাত তুলে ইশারা করল,
“রেডি? টেক ওয়ান।”
মিউজিক বাজতে শুরু করল। রাত চোখ বন্ধ করে গাইতে শুরু করল, কিন্তু প্রথম লাইনেই সুর কেঁপে গেল।
তারপর আর কি? ওইতো আবার “কাট!” কাঁচের ওপাশ থেকে ভেসে এল শব্দটা। সে বিরক্ত হয়ে হেডফোনটা একটু ঠিক করল। “আবার দাও,” সে বলল।
টেক টু শুরু হলো। এইবার লিরিক্স ঠিক ছিল, কিন্তু শেষ লাইনে এসে তার গলা ভেঙে গেল। আবার “কাট!”
রাত এবার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। “কি হচ্ছে আজ?” সে নিজের সাথেই বিড়বিড় করল।
টেক থ্রি, টেক ফোর… একাধারে চলতে লাগল। প্রতিবারই কোনো না কোনো ভুল। কখনো সুর ফসকে যাচ্ছে, কখনো শব্দ আটকে যাচ্ছে গলায়। যে গানটা সে গত রাতেও অনায়াসে গেয়েছে, আজ সেটাই তার সাথে যুদ্ধ করছে! শেষে সে হেডফোন খুলে টেবিলের ওপর ছুঁড়ে রাখল। “আজ হচ্ছে না,” তার গলায় স্পষ্ট বিরক্তি।
কাঁচের ওপাশে সবাই চুপ। রাত কপালে হাত বুলিয়ে গভীর একটা শ্বাস নিল। এটা রাতের নিজের স্টুডিও। শহরের নামী গায়কদের অনেকেই এখানে গান রেকর্ড করে। রাত দেয়ালের দিকে তাকাল। দেয়ালে ঝুলছে তার পুরনো অ্যালবামের কাভার, পুরস্কারের ফ্রেম।বারো বছরের গানের ক্যারিয়ারের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সবকিছু। রাত মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে এখন আর নতুন গায়ক নয়। দীর্ঘ এক যুগ ধরে স্টেজ, লাইভ শো আর অসংখ্য হিট গানের অভিজ্ঞতা তার কণ্ঠে জমে আছে।
“টেক সেভেন।” সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ক্লান্ত গলায় বলল। এটা এই বারো ১২ বছরে প্রথম দেখছে সে। কাঁচের ওপাশে বসে থাকা লোকজনের মধ্যে ফিসফাস শুরু হলো। কেউ চোখ নামিয়ে নিল, কেউ মনিটরের দিকে তাকিয়ে রইল। রাতের সামনে মুখ খোলারও সাহস নেই। এত বড় একজন মানুষের সাথে যে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে এটাই অনেক। হঠাৎই কাঁচের ওপাশ থেকে এক ব্যক্তি চেয়ার ঠেলে সামনে ঝুঁকে এলো। “একটা মেয়ের জন্য এত বড় গায়কের গলা দিয়ে গান বের হচ্ছে না?”
রাত প্রথমে কিছু বলল না। সে স্থির চোখে কাঁচের ওপাশের মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে, হাতে ধরা লিরিক্স পেপারটা মুঠোয় কুঁচকে যাচ্ছে। কয়েক সেকেন্ড পর সে ধীরে ধীরে মাইক্রোফোন থেকে সরে এল। হেডফোন খুলে টেবিলে রাখল, তারপর ইন্টারকমের বোতাম চাপল। “সবাই একটু ব্রেক নাও,” তার কণ্ঠ ঠাণ্ডা একেবারে। “পনেরো মিনিট পর দেখা হচ্ছে।” কেউ কোনো কথা বলল না। একে একে সবাই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। কাঁচের ওপাশের লোকটাও বুঝতে পারল, সে সীমা ছুঁয়ে ফেলেছে। স্টুডিও খালি হয়ে গেলে রাত দরজার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওই লোকটিও যেতে দিলে রাত তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “এমন লাগছে কেন? রিদম তুই থাক একটু।”
রিদম রাতের পিএ। সে থমকে দাঁড়াতেই রাত জিজ্ঞেস করল, “মেয়েটার খোঁজ বের করা হয়েছে?”
“কি মনে হয়?”
“যতটুকু জানতে চেয়েছি কেবল তার উত্তর চাই।
রিদম দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনে থাকা চেয়ারটা টেনে বসল। “লোক লাগানো হয়েছে,” রিদম নিচু গলায় বলল।
“কনসার্টের ভিডিও ফুটেজ থেকে কয়েকটা ফ্রেম বের করা গেছে। কিন্তু মেয়েটা ক্যামেরার দিকে পুরো মুখ ফেরায়নি। পরিষ্কার কিছু পাওয়া যায়নি।” রাত চুপচাপ শুনছে, কিন্তু তার আঙুলের গিঁটগুলো শক্ত হয়ে আছে।
“তুই নিশ্চিত তো?”
“হু। ওকে খুঁজে বের কর , রিদম।” রাত ধীরে বলল।
“যেভাবেই হোক ওকে লাগবে আমার।”
রিদম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। “রাত, আপনি জানেন না মেয়েটা কে, কোথা থেকে এসেছে, এমনকি নামও না… শুধু একবার দেখেছেন।”
“তবু তাকে চাই।” রিদম চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রইল। সে রাতকে বহু বছর ধরে চেনে। স্টেজের রাত, মিডিয়ার সামনে থাকা রাত, আর এই ব্যক্তিগত, একগুঁয়ে রাত সবই তার পরিচিত। তাই সে আর তর্ক করল না।
“আমি খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছি। কিছু জানতে পারলে অবশ্যই জানাব।” সে শুধু এটুকুই বলল। রাত আবার মাথা নিচু করল। তার মাথার ভেতর এখনো বাজছে তবে কোনো সুর নয়—একটা মুখ। রিদম ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে কিছু নোট যাচাই করছিল।
হঠাৎই রিদমের ফোনটা কাঁপতে শুরু করল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল অচেনা একটি নম্বর। রিদম ভ্রু কুঁচকে ফোনটা তুলে নিল। “হ্যালো… হ্যাঁ, বলুন।” ওপাশের কথা শুনতে শুনতে তার মুখের ভাব ধীরে ধীরে বদলাতে লাগল। অবাক থেকে সতর্ক। রাত সেটা খেয়াল করল।
সে মাথা তুলে তাকাল, চোখে তীক্ষ্ণ প্রশ্ন। “হ্যাঁ… ঠিক আছে, তুমি লোকেশনটা পাঠাও,” রিদম দ্রুত বলল।
“আমি এখনই জানাচ্ছি।” কল কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘরটা আবার চুপ হয়ে গেল। রিদম কয়েক সেকেন্ড ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। “কি হয়েছে?” রাত আর অপেক্ষা করতে পারল না।
রিদম ধীরে মাথা তুলল। “মেয়েটার খোঁজ পাওয়া গেছে।” রাত প্রায় লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল।
“কোথায়?”
“জলদি বলো।”
রিদম ফোনটা শক্ত করে ধরে বলল, “লোকেশান দিচ্ছি।”
রাতের খুশি হলো। “গাড়ি বের করো,” সে আর এক সেকেন্ডও নষ্ট করল না। “আমি এখনই যেতে চাই।”
রিদম একবার তার দিকে তাকাল। এই প্রথম সে রাতের চোখে এমন উজ্জ্বল, প্রায় অস্থির আনন্দ দেখল।
“রাত, আপনি কি ভেবে দেখেছেন? হঠাৎ এভাবে আপনার মতো একজন শিল্পী একটা সাধারণ মেয়ের কাছে গেলে কতকিছু হয়ে যেতে পারে…? আপনার ফ্যান ফলোয়ার, নেটিজেনটা কি ভাববে? রাত দরজার দিকে হেটে গেল। থামল না। “বারো বছর ধরে আমি মঞ্চে হাজার মানুষের সামনে দাঁড়িয়েছি।” সে শান্ত গলায় বলল, “আজ প্রথমবার একজন মানুষের সামনে দাঁড়াতে চাই।”
রিদম একটা শ্বাস ছেড়ে মনে মনে বলল, “আপনার প্রেমে আমার ভয় হয়। আগের বারের কথা আজও বুলতে পারিনি।”
মাঝরাত। রাস্তা প্রায় ফাঁকা। সেই ফাঁকা রাস্তায় এমন অসময়ে ট্রাকে চেপে সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে বক্স বাজিয়ে শহর ঘুরে বেড়াচ্ছে আব্রাজ। মানুষের মাঝ রাতে ভালোবাসা কিংবা খাওয়ার ক্রেভিংস যাবে আর তার কি জেগেছে? এমন রাতের বেলায় ট্রাক ভাড়া করে, ফুল ভলিউমে সাউন্ড বক্স বাজিয়ে নাচানাচি করার? বড় অদ্ভুত শখ তার। তাদের গাড়ি এগিয়ে চলছে নৈশি সরকারের বাড়ি। নিচে একা বিনোদন পেলে কি চলে? পারা প্রতিবেশীকে নিয়ে উৎসব পালন করলে আল্লাহ বরকত দান করে। এটা আব্রাজের কথা না, মাওলানা জন্টু মিয়ার কথা। আব্রাজ আবার হুজুর সাহেবের কথা সেই মানা মানে। একবার তো এমন মানা মেনে ছিল, হুজুরের থেকে থেলাপাতি ফুঁ নেওয়ার জন্য পা ধরে টানতে গিয়ে লুঙ্গি ধরে টেনে ভুল করে হুজুরের ইন্টুপিন্টু সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছিল। সে কি লজ্জার বিষয়! মসজিদে তখন মুসল্লীদের অভাব নেই। পরদিন যদিও নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য হুজুরের জন্য পারার ভ্যানের ওপর থেকে ১০০ টাকায় তিনপিস ইন্টুপিন্টুকে আবৃত করার বিশেষ বস্ত্র এনে দিয়েছিল। এত ভালো করেও মানুষ ভালো হতে পারে না। হুজুর গেল আরো ক্ষেপে তার অভিশাপ লেগে শেষে ভোট চুরি করে এমপি হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় রইল না। নাচতে নাচতে আব্রাজের পায়জামা খুলে যাওয়ার উপক্রম। তাও সে থামার নাম নেই। নৈশি সরকারের বাসার সামনে এসে ট্রাক থামানো হলো। হঠাৎ আব্রাজ সবাইকে বলল, ‘আরে গেন্ডারির রস! আমরা তো একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস করতেই ভুলে গেছি।”
ছেলে-পেলেরা সবাই তখন আব্রাজের দিকে তাকিয়ে বলল, “কি বস?”
“আরে জানিস না, কালচারাল প্রোগামের শুরুটা জাতীয় সংগীত দিয়ে করতে হয়? এই সব দাঁড়িয়ে বুকে হাত দে। আমি জাতীয় সঙ্গীত গাইব আর তোরা…”
সামির পাশ থেকে বলল, “আর আমরা আপনার পেছনে হাত দিবো।”
“হোপ! একেবারে তোমার পেছনে ভরে দিবো মানুষ চিনো? বলেছিলাম মদ একটু কম করে গিল। তোরা একাই এত মদ গিলল দেশে তো মদের সংকট হবে। তখন যারা ডিপ্রেশনে আছে, ছ্যাকা খেয়েছে ওরা দুঃখের রেশ কাটানোর জন্য মদ পাবে কই থেকে?”
“তাহলে এখন কি করব ভাই?”
“সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বুকে হাত দে। আর আমি জাতীয় সংগীত গাইব তোরা আমার সাথে সাথে রিপিট করবি।”
সবাই সমস্বরে জি বলে উঠল। আব্রাজ বুক ফুলিয়ে বুকে হাত দিয়ে বলল, “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি। চিরদিন আকাশ-বাতাস নদীর নালা, বন্ধুর বুকে প্রেম জ্বালা।” পুরোটা গাওয়ার আগেই হঠাৎ মেয়েলি একটা গলার স্বরে থমকে গেল আব্রাজ। “এই কোন শালারে জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় বাঁধা দেয়। শালা দেশদ্রোহী, ঢেড়শের বিচি, লাউয়ের ছিলকা!” আব্রাজ পেছন ফিরতেই দেখল হঠাৎ নৈশি দাঁড়িয়ে। তাকে দেখে আব্রাজের মুখে হাসি ফুটল।
“ওমা আমার বিরোধে দলের চান্দাবাজ দেখি। আরে নৈশি আপা, সকালে এক ছেলে অভিযোগ নিয়ে এসেছিল আমার কাছে। বলল সে নাকি তার চাঁদা পাচ্ছে না। ওই বাচ্চার থেকেও চাঁদা নিতে পারলেন আপনি। চ্যাহ বড় দুঃখের সাবজেক্ট।”
নৈশির রাগ তখন আকাশচুম্বী। “মাঝ রাতে এমপি প্রার্থী হয়ে মহল্লায় বক্স বাজিয়ে মাতলামি করছেন? আপনার লজ্জা করে না?” দাঁত চেপে বলল নৈশি।
আব্রাজ একদম থামল না। বরং বুকের হাতটা নামিয়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল, “লজ্জাবোধ তো করছি আপা… দেশের জন্য করছি। লজ্জা আছে দেখেই তো সংস্কৃতি রক্ষা করছি।”
“এইটাকে আপনি সংস্কৃতি বলেন?”
“অবশ্যই। জাতীয় সংগীত দিয়েই তো শুরু করতে যাচ্ছিলাম। আপনি এসে ডিস্টার্ব করলেন, এটা কিন্তু আইনের দৃষ্টিতে অপরাধও হতে পারে।”
নৈশি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, “আপনি আমাকে আইন শেখাচ্ছেন?”
আব্রাজ মাথা নেড়ে বলল, “না না, শেখাচ্ছি না। আপনি তো নিজেই অনেক কিছু শেখান… চাঁদা তোলার স্কিল কিন্তু সবার থাকে না।”
পাশ থেকে ছেলেরা “ওফফফ” বলে উঠল। নৈশি এক পা এগিয়ে এল, গলা নামিয়ে বলল, “আপনার এসব সস্তা কথা দিয়ে আমাকে ইমপ্রেস করা যাবে না।”
আব্রাজ চোখ টিপে বলল, “ইমপ্রেস? আপা, আমি তো ভয় পাচ্ছি—আপনি যদি ইমপ্রেস হয়ে যান, কালকে আবার আমার কাছ থেকেও চাঁদা দাবি করে বসেন!”
“আপনি একটা সার্কাস!”
“আপনি দর্শক হয়ে গেছেন তো? টিকিট কেটে বসে যান।”
ছেলেরা আবার চেঁচিয়ে উঠল। আব্রাজ হঠাৎ হাত তুলে ছেলেদের থামাল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
“আচ্ছা, একটা প্রশ্ন করি?”
নৈশি ভ্রু কুঁচকাল, “কি?” আব্রাজ একটু ঝুঁকে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি রাগ করছেন কেন? শব্দের জন্য… না আমি এসেছি বলে?”
চারপাশ হঠাৎ একটু চুপ হয়ে গেল। নৈশি থমকে গেল এক সেকেন্ড। তারপর বলল, “দুটোর জন্যই।”
আব্রাজ ধীরে ধীরে হাসল, “ভালো। মানে আমার উপস্থিতি ইগনোর করা যাচ্ছে না—এইটা পজিটিভ সাইন।”
নৈশি বিরক্ত হয়ে বলল, “নিজেকে নিয়ে এত ভুল ধারণা কোথা থেকে পান?” নৈশি দাঁত চেপে বলল,
“আমি নিচে নেমেছি আপনাকে থামাতে।”
আব্রাজ ভ্রু তুলে তাকাল, তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“ওহ, জনগণের প্রতিনিধি হয়ে জনগণের ঘুম বাঁচাতে নেমেছেন? বাহ, আপা! নির্বাচনের আগেই কাজ শুরু করে দিয়েছেন দেখছি।”
নৈশি তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “আপনার এই সস্তা শো-অফ বন্ধ করাই আমার কাজ।”
আব্রাজ হাত তুলে বলল, “না না, এটাকে শো-অফ বলবেন না। এটাকে বলে গ্রাউন্ড কানেকশন। আমি জনগণের মাঝে আসি, আর আপনি… জনগণের পকেটে।” পাশ থেকে ছেলেরা দম চেপে হাসল।
নৈশি এগিয়ে এসে বলল, “আপনার মতো ভাঁড়দের কারণেই রাজনীতি এত নিচে নেমেছে।”
আব্রাজ একটুও দমল না,
“আর আপনাদের মতো লোকদের কারণেই রাজনীতি এত লাভজনক হয়েছে। উপরে আদর্শ, নিচে ক্যাশ ফ্লো। দারুণ কম্বিনেশন।”
“আপনি আমাকে দুর্নীতিবাজ বলছেন?”
“ না না, আপনাদের মতো এত টেলেন্ডেড মানুষকে আমি আর কি বলব?”
নৈশি ঠান্ডা গলায় বলল, “আপনার এসব নাটক দিয়ে ভোট পাওয়া যায় না।”
আব্রাজ হেসে মাথা নেড়ে বলল, “ভোট পাওয়ার জন্য নাটক লাগে না, আপা। লাগে টাইমিং। আপনি যখন রাগ দেখাচ্ছেন, আমি তখন হাসি দিচ্ছি। মানুষ কার পাশে দাঁড়াবে, আন্দাজ করতে পারছেন?”
নৈশি চোখ সরু করে তাকাল, “মানুষ বোকা না।”
আব্রাজ সাথে সাথে জবাব দিল, “একদম ঠিক। তাই তো পুরনো মুখ দেখে তারা বিরক্ত হয়ে নতুন ঝামেলা ট্রাই করতে চায়।” চারপাশে আবার চাপা হাসি।
সে থামল না, “আর একটা কথা… আপনি যদি সত্যি আমাকে থামাতে নামতেন, তাহলে পুলিশ নিয়ে নামতেন। একা নামলেন কেন? নাকি ভোটারদের সামনে একটু ইমেজ বিল্ডআপ?”
নৈশি থমকে গেল এক সেকেন্ড। আব্রাজ কাঁধ ঝাঁকিয়ে হেসে বলল, “রাজনীতি করছেন তো আপা, একটু স্ট্র্যাটেজি আমরাও বুঝি।”
নৈশি এখনো দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে তার বাবা আর ছোট ভাই। বাবা তাকে ভেতরে আসতে বললেও সে রাজি নয়। সে আজকের শেষ দেখে ছাড়বে। হঠাৎ আব্রাজ হাত তুলে চিৎকার করল, “ডিজে, ভলিউম বাড়াও শালা!” মুহূর্তেই বক্স কাঁপিয়ে আওয়াজ দ্বিগুণ হয়ে গেল। ঢং ঢং শব্দে পুরো মহল্লা দুলে উঠল।
সামির চিৎকার দিল, “বস, শুরু হোক দ্বিতীয় পর্ব!”
বাকিরা তালে তালে নাচ শুরু করে দিল। সাউন্ডবক্সে বেলতলি সুলেমান লেংটা বাজছে। আব্রাজ নিজেও কোমর দুলিয়ে বলল, “আরে আপাগো আমাদের সাথে জয়েন না হয়ে কি যে মিস করলেন। নাচানাচি করলে শরীর ভালো থাকে। কোমর ভালো থাকে। ঝুঁকে চাঁদা তুলতে তুলতে তো আপনার কোমর ব্যথা হয়ে গেছে তাই না? আচ্ছা সমস্যা নেই আমার কাছে মাজা ব্যাথা দূর করার টোটকা আছে।”
নৈশি দাঁত চেপে ফোন বের করল। থানায় কল করে বড় অফিসারকে বলল, “হ্যালো? পুলিশ স্টেশন? এখানে অবিলম্বে আসেন। অবৈধ সমাবেশ, সাউন্ড পলিউশন সব চলছে!” ওপাশে কি বলল শোনা গেল না, কিন্তু নৈশির চোখের রাগ দেখে বোঝা গেল। আজ সে থামবে না। এদিকে আব্রাজ সবই দেখছে। মুচকি হেসে বলল,
“ওই, তাড়াতাড়ি কর! অতিথি আসতেছে!”
“কিসের অতিথি বস?”
“আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। খালি নাচ দেখালে হবে?
আপ্যায়ন লাগে!”
দশ মিনিটের মধ্যে দৃশ্যটাই বদলে গেল। ট্রাকের পাশে বড় একটা চুলা বসানো হলো। কেউ পেঁয়াজ কাটছে, কেউ মাংস নেড়েচেড়ে দেখছে, কেউ আবার হাতা নিয়ে দাড়িয়ে আছে। বক্স এখনো বাজছে। রাতের বেলার বিরিয়ানি পিকনিকের মজাই আলাদা। সামির হাঁক দিল, “বস, লবণ কই?”
আব্রাজ চেঁচিয়ে বলল, “তোমার নানির পেছন সই। খুঁজে নেও ছ্যালা।”
নৈশি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে বলল, “এগুলো কি হচ্ছে?!”
আব্রাজ খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, “পাবলিক এনগেজমেন্ট আপা। জনগণকে খাওয়ানো আমার ম্যানিফেস্টোর অংশ।” নৈশির ভাই হঠাৎ নৈশিকে বলল, “আপা তুমি ঘরে যাও আমি দেখছি।”
“না তুই থাম। বাদ দে। যা করার পুলিশ করবে আজ।”
দেড় ঘন্টা পর পুলিশের গাড়ির সাইরেন নৈশিট কানে এলো। গাড়ি এসে রাস্তার সামনে থামতেই নৈশির মুখে একরাশ স্বস্তি ফুটল। সে আব্রাজের দিকে তাকিয়ে বলল, “এবার বুঝবেন…কত ধানে কত চাল।”
“জি বুঝতে পেরেছি জয় বাংলা ধানের শিষের পেছনে মারি বোমা হামলা।”
নৈশি জবাব দিলো না। দুইটা পুলিশ ভ্যান এসে থামল। দরজা খুলে কয়েকজন পুলিশ নামল। নৈশি এগিয়ে গেল দ্রুত, “স্যার, এরা” কথা শেষ হওয়ার আগেই একজন সাব-ইন্সপেক্টর আব্রাজের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ থমকে গেল। তারপর চোখ বড় বড় করে বলল, “আরে… স্যার?!”
আব্রাজ ঘাড় কাত করে হাসল,
“কী অবস্থা?” মুহূর্তেই দৃশ্য বদলে গেল।
যে পুলিশগুলো কয়েক সেকেন্ড আগেও গম্ভীর ছিল, তারা হঠাৎ একসাথে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
“স্যার সালাম!”
আরেকজন দৌড়ে এসে বলল,
“স্যার, আগে জানালে আমরা আগেই এসে ব্যবস্থা করে দিতাম!”
নৈশি একদম জমে গেল।
“মানে… আপনারা—?”
সাব-ইন্সপেক্টর মাথা নিচু করে হেসে বলল,
“ম্যাডাম, উনি তো আমাদের… মানে… এলাকার গর্ব।”
আব্রাজ হাত তুলে থামাল,
“এইসব বাদ দেন। আজকে জনগণের সাথে একটু… সাংস্কৃতিক প্রোগ্রাম করছি।” একজন কনস্টেবল তৎক্ষণাৎ বলল,
“জি স্যার, একদম ঠিক কাজ করছেন!”
আরেকজন ইতিমধ্যে বক্সের তালে মাথা দোলাতে শুরু করে দিয়েছে। নৈশি অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে বলল, “আমি অভিযোগ করেছি আপনারা কিছু বলবেন না?”
সাব-ইন্সপেক্টর গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “দেখেন ম্যাডাম… কোনো অশান্তি তো হচ্ছে না। বরং… পরিবেশটা বেশ ফ্রেন্ডলি।”
ঠিক তখনই সামির চেঁচিয়ে উঠল, “স্যার, একটু নাচেন না! মুড জমে যাবে!”
কনস্টেবল হেসে বলল, “স্যার, একটু হলে ক্ষতি কি?”
সাব-ইন্সপেক্টর একবার আব্রাজের দিকে তাকাল।
আব্রাজ শুধু মাথা নাড়ল। ব্যস পরের মুহূর্তেই কনস্টেবলটা কোমর দুলিয়ে নাচ শুরু করে দিল!
আরেকজন হাত তুলে তালি দিচ্ছে,
“ওই গানটা বাড়ান!”
সাব-ইন্সপেক্টরও শেষমেশ হেসে বলল, “ঠিক আছে, পাঁচ মিনিট…” নৈশি দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখে হতবাক। যে পুলিশকে ডেকেছিল, তারাই এখন “স্যার স্যার” করে আব্রাজের পাশে বানরের মতো নাচানাচি করছে? আব্রাজ ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল।
মুচকি হেসে বলল,
“দেখলেন আপা?”
নৈশি চুপ।
আব্রাজ নিচু গলায় বলল,
“রাজনীতিতে শুধু অভিযোগ করলে হয় না… একটু ‘ম্যানেজ’ করতেও জানতে হয়।”
তারপর হঠাৎ জোরে বলল,
“এই যে, স্যারদের জন্য স্পেশাল চা দে! আর গানটা বাড়া সামির!”
নৈশি এবার রাগে ফুঁসতে থাকল। এরই মাঝে তার বাবা হঠাৎ ফিসফিস করে তাকে বলল, “এই নৈশি দেখ না কি জবরদস্ত বিরিয়ানি রান্না করেছে। আমাকে এক প্লেট দিতে বলনা।”
নৈশি রেগে বাবার দিকে তাকাতেই সে চুপসে গেল। এক মুহূর্ত দাঁড়াল না আর সে। বাবাকে নিয়ে গেটের ভিতর ঢুকে হঠাৎ গেল। ওমা তার ভাই কই? সে ভাইকে খুঁজতে গেটের কাছে আসতেই হঠাৎ নজর গেল ট্রাকের সামনে। তার ভাই স্টিলের গামলায় বিরিয়ানি নিয়ে খাচ্ছে আর নাচানাচি করছে। নৈশির রাগ তখন হনহন করে আরো বেড়ে গেল। সে ঝড়ের বেগে সেখানে গিয়ে ট্রাকের সামনে। “এই তুই!” সে চিৎকার করল, “এখানে সার্কাস বসিয়েছিস নাকি?!”
তার ভাই গামলা হাতে বলল, “আপু, লাইফে একটু ফান থাকা দরকার। তুমি বুঝবা না।” ঠিক তখন পাশ থেকে আব্রাজ ঢুকে পড়ল, “আরে আরে থামেন,” সে হাত তুলে বলল, “এত রাগ করে লাভ কী? বিরিয়ানির গন্ধে তো আপনার রাগও নরম হইয়া যাওয়ার কথা!”
নৈশি চোখ রাঙাল, “আপনি চুপ করবেন?”
আব্রাজ ভান করে অবাক, “আমি চুপ করব কেন? আমি তো পরিস্থিতি সামলাচ্ছি। দেখেন না, আপনার ভাই খেতে খেতে নাচছে—মাল্টিটাস্কিং! এই ট্যালেন্ট কিন্তু সবার থাকে না।”
তার ভাই হেসে বলল, “দেখেছো আপু? অন্তত কেউ তো আমার ভ্যালু বুঝে!”
নৈশি দাঁত চেপে, “তোকে বাসায় গিয়ে বুঝাবো ভ্যালু কী জিনিস!”
আব্রাজ সাথে সাথে বলল, “না না, বাসায় যাবেন না। আপনার বেহুদা কথা না শুনতে পারলে এন্টারটেইনমেন্ট পাবো না আমরা। আচ্ছা, আপনার ভাই তো অন্তত সৎ। সে যা, তাই। কিন্তু আপনি… নিজেকে কী ভাবেন মাবুদ জানে? খুব হাই-স্ট্যান্ডার্ড কিছু?”
নৈশি দাঁত চেপে বলল, “আপনার মতো লোকের কাছ থেকে স্ট্যান্ডার্ড শেখার দরকার নেই।”
আব্রাজ হেসে ফেলল, “ভালোই বলেছেন। কারণ আমার স্ট্যান্ডার্ডে উঠতে গেলে আপনাকে আগে নিজের এই অকারণ অ্যাটিটিউডটা ডাস্টবিনে ফেলতে হবে।”
নৈশি হাত কোমড়ে রেখে বলল, “আপনার এই ফালতু জোকস বন্ধ করবেন?”
আব্রাজ ভুরু নাচাল, “ফালতু? আরে এগুলা প্রিমিয়াম জোকস! আপনার জন্য ফ্রি সার্ভিস দিচ্ছি, তাও কৃতজ্ঞতা নেই!”
নৈশির ভাই গামলা তুলে বলল,“আপু, লাস্ট অফার খাবে নাকি আমি তোমার ভাগেরটাও শেষ করব?”
নৈশি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, “সব খা! গামলা সহ খা! আমারে আর ডাকবি না!”
আব্রাজ হেসে হাত নেড়ে বলল, “বেশি রাগ করলে ওজন বেড়ে যায় নৈশি আপা। পরে আপনি রেগে ফুলে হাতির সাইজ হলে তো আরেকজন নাগরিকের জায়গা মেরে খাবেন। নো আপা নো, দিস ইজ নট ফেয়ার। তারচেয়ে ভালো অন্যের জায়গা মেরে খাওয়ার থেকে হবু মন্ত্রী আব্রাজের হাতের স্পেশাল বিরিয়ানি খান,অন্তত বুদ্ধি সুদ্ধি বাড়বে।”
চলবে?
সবাই কমেন্ট করবেন, রেসপন্স করবেন।
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমতৃষা পর্ব ২৩+২৪
-
প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ৪
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৬(১ম অর্ধেক)
-
প্রেমতৃষা পর্ব ২৭
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৯
-
প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ৩
-
প্রেমতৃষা পর্ব ১৫+১৬
-
প্রেমতৃষা পর্ব ২+৩
-
প্রেমতৃষা পর্ব ২৮
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৬+৭