Golpo romantic golpo অবাধ্য হৃৎস্পন্দন

অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৯


অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৫৯)

সোফিয়া_সাফা

ফিরে দেখা অতীত <১>

পেটাল এস্টেটে ফুলের আজ পঞ্চম দিন। সে জানালার ধারে মাথা ঠেকিয়ে নির্লিপ্ত চোখে বাইরে তাকিয়ে ছিল। হয়তো কারো আশায়; নয়তো কাউকে নিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন।
সে গতকাল থেকে সোলার এস্টেটে ফিরে যেতে চাইছে কিন্তু গার্ডেরা বলেছে উদ্যান যতক্ষণ না অনুমতি দেবে ততক্ষণ পর্যন্ত ফুলকে নিয়ে যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা আরোপিত আছে।

“আপনি ঠিক কতোটা বদলে যাবেন উদ্যান?” প্রশ্নটা সে তার কল্পনায় ভেসে ওঠা উদ্যানের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে করল। কিন্তু সহসাই কোনো উত্তর পেল না।

ফুল নিশ্চল পায়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তার প্রতিবিম্ব ভেসে উঠল সেখানে। উদ্যানের বানানো প্রত্যেকটা দখলদারিত্বের চিহ্ন যেন ক্রমশই গাঢ় কালচে হয়ে উঠছে তার ফর্সা ত্বকে। গলায় হাত বুলিয়ে ফুল মলিন হাসল।

“দাগও যে এতো সুন্দর হয় তা আগে জানা ছিল না। আমার নিজেরই হয়তো নজর লেগে যাবে।”

তার ভাবনার মাঝেই একজন মেইড দৌড়ে এসে দাঁড়াল দরজার সামনে। ব্যস্ত গলায় বলল, “মাস্টার, আপনাকে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দিয়েছেন মিস্ট্রেসা। দ্রুত তৈরি হয়ে নিন।”

ফুলের চোখে পানি জমে উঠল। সে ফিরে যেতে চায় সোলার এস্টেটে। এখানে তার ভালো লাগছে না। সে যতদ্রুত সম্ভব রেডি হয়ে রওনা দিল।
,
,
,
সোলার এস্টেটের পরিবেশ আজ একদম অন্যরকম। যেন পুরো বাড়িটাও ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে নিঃশ্বাস আটকে রেখেছে। ফুল সহজাত হাসি বজায় রেখে ড্রইংরুমে পা রাখতেই সোহম নজরে এল। ফুল লক্ষ্য করল, তার মুখে সেই চিরাচরিত হাসির রেখা আজ নেই। লোকটা মাথা নিচু করে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। ফুলের হাসিটাও মিলিয়ে গেল তার ফ্যাকাশে মুখটা দেখে।

“সব ঠিকঠাক আছে তো সোহম স্যার?” বলতে বলতেই ফুল ভেতরে ঢুকল। আশা করল সোহম হয়তো এগিয়ে এসে তার ব্যাগপত্র নিয়ে ওপরে উঠতে সাহায্য করবে। কিন্তু তেমন কিছুই হলো না।

“বাড়িতে আর কেউ নেই?”

সোহমের যেন কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছিল। সে মৃদু গলায় বলল, “হুম, যার যার ঘরে আছে।”

ফুল অতো ভাবনা চিন্তা না করে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যেতেই সোহম চাপা গলায় বলল, “তেহ তোমাকে ওপরে যেতে নিষেধ করেছে।”

ফুলের গলা শুকিয়ে এলেও সে জোরপূর্বক হাসল; তার কেমন যেন অদ্ভুত ফিলিংস হচ্ছে। একটু ইতস্তত করে বলল, “নিষেধ করেছে মানে? তাহলে কোথায় যাবো আমি?”

ফুল পর্যাপ্ত পরিমাণে চমকে না যাওয়ায় সোহম মুখ তুলে চাইল। তার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি উপেক্ষা করে ফুল অন্যদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। সোহম একদিকে হাঁটা ধরে বলল, “চলো আমি দেখিয়ে দিচ্ছি।”

সোহম ফুলকে নিয়ে সেই রুমে এল যেখানে এস্টেটে প্রথমবার আসার পর তার ঠাই হয়েছিল। রুমটায় মূলত নাদিয়া আর রুমা থাকতো। তাদের অবর্তমানে অন্য মেইডরা ছিল এতোদিন। তাদের ভিন্ন রুমে শিফট করা হয়েছে। রুমে এসেও ফুল প্রতিক্রিয়া দেখাল না। শুধু বলল, “ঠিক আছে সোহম স্যার। ধন্যবাদ আপনাকে।”

ফুলকে এতোটা ভাবলেশহীন দেখে সোহম আরও জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়াল। কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলল, “তেহ তোমাকে হেড মেইড বানিয়েছে। আজ থেকে তুমি এস্টেটের যাবতীয় কাজ পরিচালনা করবে।”

একথা শুনে ফুলের শরীর অসার হয়ে এল। নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর সব প্রয়াস ব্যর্থ হলো তার। লুটিয়ে পড়ল ফ্লোরে। চোখের বাধ ভেঙে নোনাজল গড়িয়ে পড়তে লাগল অঝোর ধারায়।

“তাকে গিয়ে বলে দিন, আমি সব কাজ এমনিতেই করে দেবো। শুধু সে যেন আমাকে মেইড না বানায়।”

ফুলের কান্নার শব্দে সোহমের চোখদুটো রক্তাভ হয়ে উঠল। সে খানিকক্ষণ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থেকে উল্টো ঘুরে প্রস্তান করল।

পরপরই ফুলও ত্রস্ত পায়ে উদ্যানের রুমের সামনে এসে দাঁড়াল। বারবার কড়া নেড়ে আর্তনাদ করে বলল, “বাইরে আসুন, আমিও দেখি কতোটা বদলে গেছেন আপনি।”

দীর্ঘক্ষণ ডাকাডাকির পরেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া মিলল না। সে দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল। লুহান, মেলো আর সোহম অদূরে দন্ডায়মান থেকে দেখল ফুলকে কান্না করতে। লুহান ফোন বের করে কল দিল উদ্যানকে কিন্তু উদ্যান কল রিসিভ করল না।
,
,
,
রাত এগারোটা। উদ্যান যখন ডিনারের উদ্দেশ্যে রুমের দরজা খুলল, করিডরের আবছা আলোয় তাকে এক পাথুরে মূর্তির মতো মনে হলো। সে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ফোনে মেসেজ করে বাকিদের নিচে আসার নির্দেশ দিল। ঠিক তখনই লুহানের ফোন এল। কলটা রিসিভ করতেই লুহান উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল, “ফুল খুব কান্নাকাটি করছে রে। তোর কি একবার ওর সাথে কথা বলা উচিত নয়?”

কথাটা উদ্যানের শ্রবণগোচর হলেও তার মাঝে ভাবাবেগ ঘটল না। সে করিডরের দিকে পা বাড়াতেই দেখল, ঠিক তার দরজার পাশেই গুটিসুটি মেরে বসে আছে ফুল। হাঁটুতে মুখ গুজে গুমরে গুমরে কাঁদছে মেয়েটা।

উদ্যান ধীরপায়ে ফুলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। হালকা ঝুকে ফুলের কাছাকাছি যেতেই ফুল অকস্মাৎ মুখ তুলে চাইল তার দিকে।
খুবই বাজেভাবে চোখাচোখি হয়ে গেল তাদের। ফুলের চোখ লাল টকটকে। কাঁদতে কাঁদতে ফুলে গেছে মুখশ্রী। কিন্তু সেই শোকাতুর চোখেও এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় খেলে গেল; উদ্যানকে যেন সে চিনেই উঠতে পারল না, লোকটার মুখ ক্লিন সেভ করা। চোখ ছুঁইছুঁই চুল গুলো কপালের ওপর ছড়িয়ে রাখা।

উদ্যান কিছুই বলল না তবুও ফুল এক অবুঝ আকুলতায় তাকে জড়িয়ে ধরল। লোকটার হাত দুটো নিজের কোমরে টেনে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল সে, “আমার না… নিঃশ্বাস ফুরিয়ে আসছে। মনে হচ্ছে, মনে হচ্ছে বুকটা কেউ পিষে ধরেছে। ফেটে যাচ্ছে বুকটা। একটু… একটু জড়িয়ে ধরুন না শক্ত করে।”

উদ্যান তৎক্ষনাৎ এক ধাক্কায় ফুলকে সরিয়ে দিল। ধাক্কাটা নিতান্তই তাকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ছিল না; আঘাত করার জন্যেও ছিল। ফুল ফ্লোরে ছিটকে পড়েও দমে গেল না। টলটলায়মান পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে আপনার? আমি তো ভেবেছিলাম ফিরে এসে আমরা এক রুমে থাকবো… তবে কেন আপনি আমাকে সার্ভেন্ট রুমে থাকতে বলেছেন?”

উদ্যান আচমকাই ফুলের জামার বুকের অংশটা খাবলে ধরল। তাকে নিজের মুখের কাছাকাছি টেনে এনে হিসহিসিয়ে বলল, “কারণ তেহজিব অভিনয় করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তোর সাথে ভালোমানুষির নাটক করার প্রয়োজন ফুরিয়েছে তার।”

ফুলের রূহ কেঁপে উঠল। অস্ফুট স্বরে সে কেবল বলতে পারল, “কী বললেন আপনি? অভিনয়… আমার সাথে আপনি অভিনয় করেছেন?”

“হুম, তেহজিব নিজের সন্তুষ্টির জন্য অভিনয় করেছে তোর সাথে।”

ফুলের মনটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল যেন চোখেরই পলকে। হৃৎযন্ত্র স্বাভাবিক তাল হারিয়ে উগ্র হয়ে উঠল। তাকে কষ্ট পেতে দেখে উদ্যান ঠোঁট বাঁকাল।

“সব নাটক ছিল? শুধুমাত্র আমার দেহটা পাওয়ার জন্য আপনি এতোবড় নাটক করলেন তেহজিব?”

উদ্যান এক ঝটকায় ফুলের হাতটা পেছনে নিয়ে মুচড়ে ধরল। তার কানে ঠোঁট ঠেকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, “আমাকে নাম ধরে ডাকার অধিকার ফিরিয়ে নিচ্ছি আমি। আগের মতো মাস্টার বলে ডাকবি আমায়। আর রইল তোর বডির কথা…”

উদ্যান একবার পুরো দস্তুর দেখে নিল তাকে, “এমন বডি তেহজিব তুড়ি মারলেই মিনিটে মিনিটে হাজির হয়ে যাবে।”

ফুল পাগলের মতো হেসে উঠল। চিৎকার করে বলল, “তাহলে কেন অভিনয় করলেন আমার সাথে?”

“তোকে আমাকে ভালোবাসতে বাধ্য করতে। তুই বলেছিলি না ‘ভালোবাসার মতো পবিত্র অনূভুতি গুলো আমার মতো রাক্ষস কেন্দ্রিক হওয়াটা তোর কাছে মৃত্যুসম।’ এও বলেছিস, ‘আমার মতো মানুষ রূপে থাকা দানবকে নিজের মনে জায়গা দেওয়ার পূর্বে তুই নিজের মৃত্যু কামনা করিস।’ আমি জানতে পেরেছিলাম তুই আমাকে ভালোবাসতে চাস না সেই জন্যই আমি তোর মনের সকল ভয়কে সত্যি করলাম।”

উদ্যান একটু থেমে ফুলের অশ্রুসিক্ত চোখে চোখ রেখে বলল, “তোর সাথে ইন্টিমেন্ট হওয়ার কোনো ইচ্ছা ছিল না আমার কিন্তু তুই একসময় বলেছিলি ‘নিজেকে প্রোটেক্ট করতে না পারলে শেষ করে ফেলবি তবুও শেষ নিশ্বাস অবধি কলঙ্ক মুক্ত থাকবি।’ তোর এই অহংকার আমি তেহজিব সফলভাবে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছি মিস্টেক। তোর কলঙ্ক মুক্ত থাকার ইচ্ছাটা এই জন্মে আর পূরণ হবেনা। আমার নামের কলঙ্ক নিয়েই তোকে ম*রতে হবে।”

ফুল এবার হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে ফেলল। মুক্ত হাতটা দিয়ে এলোপাথাড়ি আঘাত করতে লাগল উদ্যানের পাথুরে বুকে, “কেন করলি? কেন করলি আমার সাথে এমন? কী ক্ষতি করেছিলাম আমি তোর? কেন আমার অনুভূতি নিয়ে খেললি? এতো আয়োজন করে কেন আমার মনটা ভেঙে দিলি। আমি মানতে পারছি না… আমি সইতে পারছি না।”

ফুলের আচরণে উদ্যান ক্ষিপ্ত হয়ে সজোরে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল ফুলের নরম গালে। দ্বিতীয়বারের মতো ফুল ফ্লোরে ছিটকে পড়ল। কান্নার দমকে তার শরীরটা কম্পিত হতে লাগল মারাত্মকভাবে।

“ভুলেও আমার সাথে এই টোনে কথা বলবি না। আদারওয়াইস আমার সবচেয়ে খারাপ রূপটাও দেখিয়ে দেবো তোকে।”

ফুলের মাথায় জেদ চেপে বসল। আবারও টলতে টলতে উদ্যানের সামনে এসে দাঁড়াল, বুক চিতিয়ে বলল, “আরও কতো খারাপ রূপ আছে তোর? আর কী করার বাকি আছে?”

উদ্যান রক্তচোখে তাকাল তার দিকে। এতোদিন নিজেকে সামলে নিতে নিতে সে হয়তো অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল তবে আজ সে নিজেকে আর সামলাতে চাইল না। উদ্যান ফুলের চুলের মুঠি চেপে ধরে গর্জে উঠল, “লোবো! গেট দ্য রড!”
,
,
,
পানিশমেন্ট রুমের স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে নিথর হয়ে পড়ে আছে ফুল। তার ঝলমলে কালো চুলগুলো ধুলোবালি মেখে ধূসর বর্ণ ধারণ করেছে। হাতদুটো যেন সে অনুভবই করতে পারছে না। মনে হচ্ছে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে। বাহুদ্বয়ের অবস্থা নাজেহাল; চামড়া ফেটে রক্তিম হয়ে গেছে কামিজটা।

ফুলের মাঝে চেতনা আছে, কিন্তু আর্তনাদ করার শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই। ওর চোখের সামনে ধোঁয়াটে অবয়বে দাঁড়িয়ে আছে উদ্যান। হাতে সেই পুরনো লাঠি, যা এখন ফুলের রক্তে রঞ্জিত। পাশেই ফুলের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে দাঁড়িয়ে আছে লুহান, সোহম আর মেলো। দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে লুহান একসময় আর্তস্বরে বলল, “কেন করলি এমন তেহ, কী পেলি এমনটা করে?”

উদ্যান শক্ত চোখে তাকাতেই লুহান কুঁকড়ে গিয়ে মাথা নিচু করে নিল। লাঠিটা সশব্দে ফেলে দিয়ে উদ্যান ঝাঁপিয়ে পড়ল ফুলের ওপর। তার চুলের মুঠি টেনে ধরে বসতে বাধ্য করল। দাঁত খিঁচে হিসহিসিয়ে বলল, “এটা শুধু ট্রেলার ছিল। সবচেয়ে খারাপ রূপটা তোকে আমি এরপর দেখাবো কিন্তু তার আগে তোকে ঘুরিয়ে আনবো অতীত থেকে।”

ফুল ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে রইল উদ্যানের দিকে। বাকিরা ভাবল উদ্যান হয়তো চলে যেতে বলবে তাদের কিন্তু তেমন কিছুই হলো না।
ফুলকে টেনেটুনে দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে বসিয়ে দিল উদ্যান। তারপর ঠিক সামনেই আসন গেড়ে বসল। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার পর তারা সবাই চলে গেল…

অতীত!

খানজাদা নিবাস—নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আভিজাত্য আর ঐতিহ্যে মোড়ানো এক প্রাসাদসম বাড়ির প্রতিচ্ছবি। সেই বাড়ির একমাত্র উত্তরসূরি তাশরিফ খানজাদার জীবনসঙ্গিনী হিসেবে বাড়ির চৌকাঠে পা রাখল বর্ণপ্রিয়া। তাশরিফ ছিল উচ্চশিক্ষিত এবং প্রচণ্ড অহংকারী। বাবার প্রতি অসীম শ্রদ্ধার খাতিরে সে এই বিয়েতে অমত করতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু বর্ণপ্রিয়াকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে মেনে নেওয়ার মানসিকতাও তার মধ্যে ছিল না।

বিয়ের রাতে তাশরিফ নিজের সব রাগ ঢেলে দিয়েছিল বর্ণপ্রিয়ার ওপর। নববধূ রূপে ঘোমটা টেনে বসে থাকা বর্ণপ্রিয়ার মুখচ্ছবি না দেখেই সে ঘোষণা করল:

“বাবা চেয়েছেন বিধায় তোমাকে বিয়ে করেছি। নইলে আমার কোনো ইচ্ছা ছিল না তোমার মতো মূর্খ মেয়েকে বিয়ে করার। তোমার কোনো যোগ্যতাই নেই আমার পাশে দাঁড়ানোর। বিয়ে করেছি বলেই ভেবো না আমার মনে জায়গা পেয়ে যাবে। তুমি এই বাড়ির বউ হতে পারলেও কখনো আমার মনের নাগাল পাবেনা। খবরদার, এই কথা যেন বাবার কানে না যায়। ওহ, আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম তুমি তো কথা বলতেই পারো না। খামোখাই ভয় পাচ্ছি!”

তাশরিফের এই বিষাক্ত বাক্যগুলোর প্রত্যুত্তরে বর্ণপ্রিয়া কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে পারল না। ডাগর দুটো চোখ তুলে শুধু একবার ঘোমটার আড়াল থেকে তাকাল স্বামীর দিকে।
ভিজে উঠল তার চোখজোড়া। সে ভেবেছিল এবার বুঝি স্বামীর ঘরে এসে তার সব দুঃখ ঘুচবে কিন্তু তা আর হলোনা।

বর্ণপ্রিয়ার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল তার বাকহীনতা। উপরন্তু তার গরীব বাবার ক্ষমতা ছিল না তাকে পাঠশালায় পাঠানোর। তাই মনের কথা লিখে প্রকাশ করার মতো অক্ষরজ্ঞানও তার ছিল না।
কিন্তু এসবের মাঝেও বর্ণপ্রিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার অসামান্য রূপ। তার সেই সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েই তাশরিফের বাবা তাকে পুত্রবধূ বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। শুধু রূপ নয়, ঘরকন্নার কাজেও বর্ণপ্রিয়া ছিল অদ্বিতীয়া।

দিন কাটতে লাগল অবহেলা আর তাচ্ছিল্যের মাঝে। বর্ণপ্রিয়া বুঝতে পেরেছিল, তাশরিফের মতো উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তির যোগ্য সে কোনোভাবেই নয়। তাই সে কোনো অভিযোগ বা উচ্চাশা করেনি। যা পাচ্ছে, সেটুকুই পরম প্রাপ্তি বলে ধরে নিয়েছে।

তাশরিফের সব অবহেলা উপেক্ষা করে বর্ণপ্রিয়া স্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে শুরু করল অক্ষরে অক্ষরে। যেমন: তাশরিফের চা এগিয়ে দেওয়া, তার জামাকাপড় গুছিয়ে রাখা। বাকিটা সময় শান্ত ভঙ্গিতে বাড়ির কাজ সামলে নেওয়া। তার এই মৌনতা একসময় তাশরিফকে ভাবিয়ে তুলল। সে বর্ণপ্রিয়ার দিকে তাকাতে শুরু করল। তাকে মনের অজান্তেই গুরুত্ব দিতে লাগল।
বর্ণপ্রিয়া হয়ে উঠল তার শান্তির নীড়। যে অভিযোগ করতে জানে না। অবহেলা, তুচ্ছতাচ্ছিল্যের বিপরীতেও ভালোবাসা বিলিয়ে দেয়।

সেদিন ছিল এক চাঁদনী রাত। জানালার গ্রিল গলে আসা রুপালি জোছনা বর্ণপ্রিয়ার অবিন্যস্ত কালো চুলে এসে পড়েছিল। তার দুগ্ধশুভ্র ত্বকে সেই আলো পড়ে এক অপার্থিব স্নিগ্ধতা তৈরি করেছিল, যেন কোনো স্বর্গের পরি মর্ত্যে নেমে এসেছে। তাশরিফ খাটে বসে অফিসের নথিপত্রে ডুবে ছিল, কিন্তু হঠাৎই তার চোখ আটকে গেল বর্ণপ্রিয়ার ওপর। সম্মোহিতের মতো সে এগিয়ে গেল নিজের অর্ধাঙ্গিনীর দিকে। তার খুব কাছে দাঁড়িয়ে গাঢ় স্বরে বলল:

“আমি যদি নিজের মনে জায়গা না দিয়েও তোমার কাছে স্বামীর অধিকার চাই, তুমি কি ফিরিয়ে দেবে আমায়?”

বর্ণপ্রিয়া লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে গেল, তার ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তেই রক্তিম আভা ধারণ করল। তাশরিফ তার হাতদুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আবারও বলল, “তোমার এই নীরবতা আমার মনে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে। তোমাকে সেখানে জায়গা না দেওয়ার কারণে তীব্র দহন হচ্ছে। মস্তিষ্ক শুধু খুঁজে ফিরছে কোন উপায়ে তোমার মতো শান্তির প্রতিমাকে এড়িয়ে চলা যায়।”

বর্ণপ্রিয়া চোখ তুলে তাকাতে পারল না। শুধু আলগোছে নিজের মাথাটা স্বামীর চওড়া বক্ষপটে এলিয়ে দিয়ে এক নীরব সম্মতি জানিয়ে দিল। বর্ণপ্রিয়ার শ্বাশত নারীত্বের কাছে তাশরিফের অহংকার সেদিন হার মানল। সেই রাতের পূর্ণতা পেল যখন তাদের কোলে এলো পুত্রসন্তান।
তাশরিফের বাবা নাতির নাম রাখলেন তেহজিব। উদ্যান নামটা পেল তেহজিব তার একমাত্র ফুপুর বদৌলতে। পরবর্তীতে সবাই তাকে উদ্যান বলেই ডাকতে অভ্যস্ত হলো।

দিন পালটায় রঙ বদলায়। আর সেই সাথে বদলাতে শুরু করে সম্পর্কের সমীকরণ গুলোও। তাশরিফের বন্ধু ফারহান আমহৃত যেন সহ্যই করতে পারছিল না এসব। সে শুরু থেকেই চাইতো তাশরিফের সাথে নিজের ছোট বোনের বিয়ে দিতে। তা তো হলোই না উল্টো তাশরিফ ক্রমশই বর্ণপ্রিয়ার মোহে আটকা পড়ছিল। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে খানজাদা নিবাসে ফারহানের যাতায়াত হতো হরমাশেই।

একদিন বিকেলের নাস্তার টেবিলে ফারহান তাশরিফকে খোঁচা দিয়ে বলল, “কিরে তাশরিফ, তুই তো বলেছিলি শুধুমাত্র আঙ্কেলের জন্যই বিয়েটা করেছিস। নইলে অতো তাড়াতাড়ি বিয়ে করার ইচ্ছে ছিল না তোর। এও বলেছিলি বিয়ে করলেও মেয়েটাকে কোনো দিন মেনে নিতি পারবি না। এখন তো দেখছি বাপ হয়ে বসে আছিস। এই তোর মেনে না নেওয়ার নমুনা? কোথায় আমি ভাবলাম আমার বোনের সাথে তোর বিয়েটা হবে তাতো হলোই না উল্টো তুই এভাবে পল্টি খেলি!”

তাশরিফ অস্বস্তি চেপে হাসল। তখনই তার বোন পারভীন উদ্যানকে কোলে নিয়ে এগিয়ে এল।

“ভাইয়া জানো তোমার ছেলে একটু আগে আমাকে পিপি বলে ডেকেছে।”

তাশরিফ হালকা হাসল, “আমার একবছরের ছেলে তোকে ডেকেছে? আর এটাও আমাকে বিশ্বাস করতে বলছিস?”

পারভীন আঁড়চোখে একবার ফারহানের দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙিয়ে বলল, “জানতাম তোমরা বিশ্বাস করবে না। না করো গিয়ে তাতে আমার কী? মিলিয়ে নিও ও সবার প্রথম আমাকেই পিপি বলে ডাকবে।”

পারভীনের সেই কথা মিলল না। কেটে গেল কয়েক বছর কিন্তু উদ্যান তখনও কথা বলতে পারতো না। সবাই ধরেই নিয়েছিল সে তার মায়ের মতোই বাকপ্রতিবন্ধী হবে। ব্যাপারটা নিয়ে তাশরিফ ভেতরে ভেতরে অত্যন্ত অখুশি থাকতো। যা তার আচরণেও প্রকাশ পেতো। সে উদ্যানের দেখভালের দায়িত্ব নিজের পালিতা বোন রেহানার ওপর ছেড়ে দিল। বর্ণপ্রিয়াকে নিজের ছেলের সাথে সময় কাটানোর জন্যেও তাশরিফের অনুমতির অপেক্ষায় থাকতে হতো। তাশরিফ ভেবেছিল, যেহেতু সন্তানেরা মায়ের থেকেই কথা বলতে শেখে সেহেতু বর্ণপ্রিয়ার অক্ষমতার জন্যই তার ছেলে কথা বলতে পারছে না।
বর্ণপ্রিয়াও ছেলের ভালোর কথা বিবেচনা করে বুকে পাথর চেপে নিজের নাড়িছেঁড়া ধন থেকে দুরত্ব বাড়িয়ে দিল।

অন্যদিকে ফারহান বুঝতে পারল তাশরিফের মনোযোগ সে আর বর্ণপ্রিয়া থেকে সরাতে পারবে না। কারণ তাশরিফ ছেলে বলতেই অজ্ঞান।
তাই এবার সে ভিন্ন পথ ধরল। সে প্রায়ই বর্ণপ্রিয়ার কানে তাশরিফের নামে বিষ ঢালার চেষ্টা করেই যেতো। নানা-ভাবে বোঝাতো, তাশরিফ তার বোনের সাথে পরকীয়ায় লিপ্ত আছে।

একদিন ফারহান বর্ণপ্রিয়াকে একা পেয়ে বলল,
“ভাবী, আপনি নাহয় কথা বলতে পারেন না কিন্তু চোখেও কি দেখেন না? বুঝতে পারেন না, তাশরিফ এখনও আমার বোনকেই ভালোবাসে, এই তো দুদিন আগেও তাশরিফ ওর সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। হাহ! শুধু ছেলের জন্য আপনার সাথে সংসার করছে। নইলে কবেই আপনাকে ছুড়ে ফেলে আমার বোনকে বিয়ে করে নিতো।”

বর্ণপ্রিয়া সবসময়ের মতো এবারও চুপচাপ শুনে গেল তার কথা। বুক ফেটে কান্না এলেও সে স্বামীর কাছে গিয়ে ইশারায় কোনো অভিযোগ করলো না। কারণ সে ছিল ভীষণ ধৈর্যশীল।
কিন্তু ফারহানও হাল ছাড়ল না। সে জানত, একটা পাথরকেও বারবার আঘাত করলে একসময় তাতে ফাটল ধরবেই।

সময় কারোর জন্য থেমে থাকে না। উদ্যানের বয়স যখন ছয়, তখন খানজাদা নিবাসের দেয়ালে দেয়ালে এক নতুন আশার আলো ফুটে উঠল, সে টুকটাক কথা বলতে শুরু করল সবার সাথে। কিন্তু সেই আনন্দের ছোঁয়া বর্ণপ্রিয়ার কপালে জুটল না। কেউ শিখিয়ে দিল না উদ্যানকে তাকে মা বলে ডাকতে। উপরন্তু তাশরিফের সাথেও তার দূরত্ব আগের চেয়ে বেড়েছে।

সেদিন ছিল এক গুমোট দুপুর। বাড়ির সবাই যখন দুপুরের ঘুমে আচ্ছন্ন, বর্ণপ্রিয়া তখন রান্নাঘর থেকে পানি নিয়ে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিল। হঠাৎ সিঁড়ির নিচ থেকে আসা ফিসফিসানির শব্দে তার পা দুটো থমকে গেল।
সে দেখল, ফারহান আর এই বাড়ির পালিতা মেয়ে রেহানা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।
ফারহান নিচু স্বরে বলছে, “রেহানা, তুমি ভেবো না আমি ওই পারভীনকে ভালোবাসি। ও তো শুধু আমার সাফল্যের চূড়ায় ওঠার একটা সিঁড়ি মাত্র। ওকে বিয়ে করে আমি সফল হবো। তারপর তোমাকে নিজের করে নেবো। তখন আর কেউ তোমাকে কষ্ট দিতে পারবে না।”

“কিন্তু আমি যে আর পারছি না; তোমাকে ওর সাথে সহ্য করতে।”

“তাহলে কি আমি পিছিয়ে যাবো?”

রেহানা মাথা নাড়ল, “একদম না, আমি সব সহ্য করে নেবো। তুমি শুধু নিজের কাজে সফল হও। সবসময় আমাকেই পারভীনের উচ্ছিষ্ট খেয়েপড়ে বাঁচতে হয়। যখন আমাকে এই বাড়িতে আনা হয়েছিল তখন পারভীনের জন্ম হয়নি। বাবা-মায়ের খুব শখ ছিল একটা মেয়ের। তাই আমাকে খুব আদর যত্ন করতেন তারা। কিন্তু ওর জন্মের পর সব পালটে গেল। এবার ওকেও বুঝিয়ে দেবো, উচ্ছিষ্ট খেতে কেমন লাগে।”

তাদের পরিকল্পনার কথা জানতে পেরে বর্ণপ্রিয়া ছটফট করতে লাগল। সে তৎক্ষনাৎ পারভীনের কাছে ছুটে গেল। ইশারায় বোঝানোর চেষ্টা করল; ফারহান খারাপ, সে রেহানার সাথে মেলামেশা করে। কিন্তু পারভীন বিরক্ত হয়ে তার হাত সরিয়ে দিয়ে বলল, “ওহহো ভাবী, আপনার কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। বিরক্ত করবেন নাতো।”

বর্ণপ্রিয়া একরকম জোর করেই পারভীনকে টেনে নিয়ে ঘটনাস্থলে এল কিন্তু ততক্ষণে ফারহান রেহানার সাথে দেখা করে চলেও গেছে। বর্ণপ্রিয়া বোঝাতে ব্যর্থ হলো ঠিকই কিন্তু রেহানা আড়াল থেকে দেখে ফেলল যে বর্ণপ্রিয়া সব জেনে গেছে।
রেহানার মনে এবার আশঙ্কা জন্মালো, “এই বোবা মেয়েটা যদি কোনোভাবে ভাইয়াকে কিছু বোঝাতে পারে, তবে আমাদের সব পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে।”

রেহানা যতদ্রুত সম্ভব এই কথা ফারহানকে জানালো। ফারহান মনে মনে একটা ঘৃণ্য পরিকল্পনা এঁটে সুযোগের অপেক্ষা করতে লাগল। সেই সুযোগটা পেয়েও গেল তাশরিফ এক ব্যবসায়িক কাজে শহরের বাইরে যাওয়ার পর।
ফারহান একজন ভাড়াটে লোককে কৌশলে বর্ণপ্রিয়ার ঘরে পাঠিয়ে দিল।

অন্ধকারের মধ্যে এক অতর্কিত আক্রমণে বর্ণপ্রিয়া চিৎকার করতে চেয়েছিল, কিন্তু তার অবরুদ্ধ কণ্ঠস্বর কেবল বোবা কান্নায় পরিণত হলো। সে লোকটাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করছিল, কিন্তু বাইরে থেকে আধখোলা দরজা দিয়ে দেখে মনে হচ্ছিল তারা একে অপরের ঘনিষ্ঠ হচ্ছে।

এমন সময় দরজা ঠেলে রেহানা প্রবেশ করল। সে একা ছিল না তার সাথে পারভীন, তাদের বাবা এবং উদ্যানও ছিল। চোর ঢুকেছে এই সন্দেহে রেহানা তাদেরকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে এনেছে। ভেতরে ঢুকে বর্ণপ্রিয়াকে এমন অবস্থায় দেখে রেহানা ন্যাকা কান্না জুড়ে দিল, “এ আমি কী দেখছি! ভাইয়ার অবর্তমানে ভাবী আপনি এসব করে বেড়ান? ছি ছি ছি আপনার চরিত্র এতো খারাপ?”

ভাড়াটে লোকটা সুযোগ পেয়ে চলে যেতেই বর্ণপ্রিয়া কাঁদতে কাঁদতে নিজের শাড়ি গোছাতে লাগল। তাশরিফের বাবা এই ঘটনা চোখে দেখে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। পারভীন স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইল। বর্ণপ্রিয়া পাগলের মতো সবার পা জড়িয়ে ধরে বোঝাতে চাইল তারা যা দেখেছে তা সঠিক নয় কিন্তু এবারও সে বোঝাতে ব্যর্থ হলো। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খেল তখন যখন দেখল রেহানা উদ্যানকে তাকে নিয়ে উল্টো পালটা বোঝাচ্ছে। সেদিন ছেলের বিস্ময় ভরা চোখজোড়া দেখাটা তার জীবনের সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক মুহূর্ত ছিল।

পরদিন সকালে তাশরিফ ফিরলে ফারহান তার কানে বিষ ঢেলে দিল, “বন্ধু, আমি আগেও তোকে বোঝাতে চেয়েছিলাম, এই মেয়েটার চরিত্রের ঠিক নেই। আমার সাথেও আড়ালে নোংরামি করার চেষ্টা করেছে বহুবার। কিন্তু তুই তো আমাকে কখনো বলতেই দিসনি।”

তার কথা শুনে তাশরিফ পায়ের ওপর লুটিয়ে পড়ে থাকা বর্ণপ্রিয়াকে লাথি মেরে সরিয়ে দিয়ে গটগট পায়ে নিজের রুমে চলে গেল। পরের কয়েকদিন তাশরিফ এই ঘটনাটা নিয়ে বেশ দজ্ঞযজ্ঞ করল। এমনকি সে তালাকও দিতে চাইলো বর্ণপ্রিয়াকে৷ সবশেষে শুধু মাত্র ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে সে তা করতে পারলো না।
,
,
,
কেটে যায় আরও কয়েক বছর। উদ্যানের বয়স এখন দশ। বর্ণপ্রিয়া বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ছেলের মুখোমুখি হওয়া বন্ধ করে দিয়েছে বহু আগেই। কোন মুখেই বা ছেলের সামনে যাবে সে? ছেলের চোখে ঘৃণা দেখলে সে যে সহ্য করতে পারবে না।

এমনই একদিন পারভীন তার বাবাকে গিয়ে জানাল, “বাবা, আমি ফারহান ভাইকে ভালোবাসি। আমি তাকে বিয়ে করতে চাই।”

মেয়ের মুখ থেকে এমন কথা শুনে রেগে গেলেন উদ্যানের দাদাভাই। তবুও নিজেকে সংযত রেখে বললেন, “তোমার বিয়ে তার সাথেই হবে যার সাথে আমি ঠিক করে রেখেছি।”

পারভীন অবাক হলেন, “কার সাথে?”

“সেটা সময় এলেই জানতে পারবে। গ্রাজুয়েশন শেষ করো আগে। তাশরিফের মতো অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে একই ভুল করতে চাইনা আমি।”

পারভীন মন খারাপ করে উঠে দাঁড়াল। বিড়বিড়িয়ে বলল, “আমি অপেক্ষা করতে পারব কিন্তু বিয়ে আমি তাকেই করব বাবা। আশা করি আপনি নিজের পছন্দে ভাইয়াকে বিয়ে করিয়ে যেই ভুল করেছেন একই ভুল আমার সাথেও করতে চাইবেন না।”

উদ্যানের দাদাভাই গম্ভীর গলায় বললেন, “আমি তোমার বিয়ে অনেক আগেই ঠিক করে রেখেছি। চিন্তা কোরো না, তোমার জীবনসঙ্গী নির্ণয়ে আমি ভুল করবো না।”

“কিন্তু বাবা আমি ফারহান ভাইকে ভালোবাসি। আপনি কেন বুঝতে পারছেন না?”

“চুপ করো, বাবার সামনে এভাবে বলতে লজ্জা করছে না? আমি তোমাকে পর্যাপ্ত স্বাধীনতা দিয়েছি তাই বলে এই নয় যে জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটাও তুমি নেবে।”

পারভীন ভয় পেয়ে গেল। এর আগে কখনো তার বাবা উঁচু গলায় কথা বলেনি তার সাথে। সে ভেবেই নিয়েছিল তার বাবা খুব সহজেই তার আর ফারহানের সম্পর্ক মেনে নেবে কিন্তু তা হলো না।
পারভীন বাবার সামনে আর কিছুই বলল না। বরং এক গভীর রাতে সে ফারহানের হাত ধরে পালিয়ে গেল। খানজাদা নিবাসের সম্মান ধুলোয় মিশে গেল। রেহানা তো একবার কথায় কথায় বলেই ফেলল, “এসবই ওই অলক্ষ্মী বোবা মেয়েটার পাপের জন্যেই হয়েছে। ও আসার পর থেকেই এই বাড়ির সুখ ম’রে গেছে।”

বর্ণপ্রিয়া নির্বাক হয়ে শুনল তার কথা। আশেপাশে তাকাল এই আশায় যে হয়তো কেউ তার হয়ে উত্তর দিয়ে দেবে কিন্তু আফসোস কেউ তার পক্ষে ছিল না।
পারভীন চলে যাওয়ার পর খানজাদা নিবাস যেন প্রাণহীন হয়ে গেল। উদ্যানের দাদাভাই বিছানায় পড়লেন। তাশরিফ বাবা আর বোনের শোকে কাতর থাকত বেশিরভাগ সময়। তার মধ্যে তৈরি হয়েছিল এক বিশাল শূন্যতা। যা ঢাকতে তাশরিফ নিজেকে সর্বদাই কাজের মধ্যে ডুবিয়ে রাখতো।

এমনই এক বিষণ্ণ আর অসংলগ্ন রাতে, হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে তাশরিফ বর্ণপ্রিয়ার ঘরে এসে উপস্থিত হলো। কোনো অনুভূতির তাড়নায় নয়, বরং শুধুমাত্র নিজের একাকীত্ব কাটাতেই সে বর্ণপ্রিয়াকে এক ‘বস্তু’ হিসেবে ব্যবহার করল।

সেই রাতের অনাকাঙ্ক্ষিত ছোঁয়ায় বর্ণপ্রিয়া আবারও গর্ভবতী হলো। কিন্তু নিয়তির পরিহাস, এই খবর তাশরিফের মনে কোনো আনন্দের দোলা দিল না। বরং তার শিক্ষিত মস্তিষ্কেও এক কুৎসিত সন্দেহ দানা বাঁধল। সে ভাবল, এ সন্তান কি সত্যিই তার? যদিও এই সন্দেহ সে নিজের মনেই পুষে রেখেছিল। সে চায় নি খানজাদা নিবাসের শেষ সম্মানটুকু মাটিতে মিশিয়ে দিতে।

এই সব পঙ্কিলতার মাঝে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল উদ্যান। প্রতিনিয়ত পারিবারিক কলহে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছিল তার শৈশব। খুব বেশি প্রয়োজন না হলে সে কথা বলত না কারো সাথে। স্কুল, প্রাইভেটের ফাঁকে অবসর সময়ে নিজের ঘরেই বসে থাকতো।

আজ উদ্যানের বারোতম জন্মদিন। তাশরিফ খানজাদা ব্যবসার কাজে দেশের বাইরে। বাড়ির কেউ উদ্যানের জন্মদিনের কথা মনে রাখেনি। বড়রা যার যার অশান্তি নিয়ে ব্যস্ত।

চলবে,,,

শব্দসংখ্যা: ৩৪৫০+

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply