নবরূপা
পর্ব_২৯
কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা
ইরফান কলেজে গিয়েও আজ অন্যমনস্ক থেকেছে। সে সকাল থেকে হিসেব মেলানোর চেষ্টা করছে যে কেনো নীহারিকা এমন অদ্ভুত আচরণ করছে। নিজের মধ্যে দোষ খুঁজে বের করার চেষ্টা করল সে, তবুও পারলো না। সে তো কোনো বাজে আচরণ করেনি নীহারিকার সাথে। তবে হলো টা কি? সত্যি বলতে মানতে কষ্ট হলেও ইরফানের মন কয়েক ঘন্টার মধ্যে নিজের জায়গা বদলেছে। রাগের বদলে চিন্তা ভর করেছে তার মনে। ভাবনা জেগেছে নীহারিকা কে নিয়ে। আজ পর্যন্ত কখনো সে এমন করেনি। হুট করে যখন তার বউ অভিমান করেছে তাহলে নিশ্চয়ই কোনো কারন আছে, এই ভেবেই নিজের দিকগুলোকে আড়ালে রেখে তার কথা ভেবেছে ইরফান। আজ সকালে সে খেতেও পারেনি। এখন পর্যন্ত খিদেও পাচ্ছে না। কি একটা অস্বস্তিকর অবস্থা।
টিচার্স রুমে বসে বসে কপালে আঙুল ঘষছে ইরফান। দুহাত ডেস্কে ভর দেয়া এবং মাথা হেলানো। গভীর চিন্তায় মগ্ন সে। একটু পরে কলেজের ব্রেক টাইম শেষ হবে। যদিও আজ কোনো ক্লাসেই ঠিকমত পারফর্ম করতে পারছে না সে। মনটা ঠিক নেই। হুট করে একটা চিন্তা মাথায় আসলো ইরফানের। নিজেদের মধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো মনে করল, এবং নীহারিকার সাথে তার স্বামী-স্ত্রী রূপে যত্নে গড়ে তোলা মুহুর্ত গুলোও মনে করলো। কিছু একটা খামতি রয়েছে সে নিজেও জানে। কিন্তু নীহারিকা তো নিজেই এই বিষয় নিয়ে কথা বলেছে। এসব নিয়েও তো এমন করার প্রশ্ন ওঠে না। ইরফান বিরক্তিতে চেয়ারে গা এলিয়ে দিল। প্রচন্ড অস্থিরতা জেঁকে বসেছে মাথায়, শরীরও কাঁপছে। তখনই টিচার্স রুমে ইংরেজি ডিপার্টমেন্টের আরেক শিক্ষক রাশেদ প্রবেশ করল। তাড়াহুড়োর সাথে তার দু হাতে থাকা গরম গরম চায়ের কাপ ইরফানের ডেস্কে রেখে নিজেও চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল,
—” নে দোস্ত। গরম গরম দুধ চা খা। চাঙ্গা হয়ে যাবি একদম।”
ইরফান ক্লান্ত চোখে তাকালো,
—” খাব না।”
—” আবে খালা বানিয়েছে। ক্যান্টিন থেকে নিয়ে এলাম। তোর পছন্দের তো।”
—” বিরক্ত করিস না তো। ভালো লাগছে না।”
রাশেদ ইরফানের কলেজ লাইফেরই ফ্রেন্ড। সেই সময়ে জিগড়ি দোস্ত থাকলেও সময়ের সাথে সাথে আলাদা হয়ে গিয়েছিল তারা। কিন্তু ভাগ্যের খেলায় এবং সময়ের পরিক্রমায় তারা দুজনে একই কলেজেই শিক্ষক হিসেবে যোগদান করার সুযোগ পায়। তারপর থেকে আবারো নতুন করে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাদের মাঝে। বেশ ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ায় একে অপরের বিষয়ে প্রায় সবকিছুই জানে। যেমন, এই মুহুর্তে ইরফানের এত হতাশার কারনটা জানে রাশেদ।
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বেশ স্বাভাবিক কন্ঠে রাশেদ বলল,
—” এত স্ট্রেস নিস কেনো দোস্ত? অল উইল বি ওকে! তুই চিলে থাক। জাস্ট চিল!”
ইরফান রাশেদের দিকে তাকিয়ে বিরক্তিকর ভঙ্গিতে বলল,
—” কীসের চিল ভাই? তুই বুঝতে পারছিস না কেনো, ও আগে এমন করেনি। কখনোই না। আরে আমি তো ওকে চিনি। একটু হলেও তো ওর সাইকোলজি জানা আছে আমার তাই না? ও অনেক ম্যাচিইউর্ড এবং বুঝদার একটা মেয়ে। অকারনে তো এমন করবে না। তার উপর আবার আমিও এসব খুব একটা বুঝতে পারিনা!”
রাশেদ সিরিয়াস হয়ে শুনছিল, কিন্তু শেষ কথাটা শুনেই ফিক করে হেসে ফেলল। বলল,
—” এইজন্য বলেছিলাম কলেজ লাইফে একটু প্রেমটেম কর! তাহলে জীবনে মেয়েদের সাইকোলজিটা আরো বুঝতে পারতি। কথা তো শোনো নি, ডিরেক্ট আলহামদুলিল্লাহ কবুলে গেছো।”
ইরফান তীক্ষ্ণ নজর দিয়ে দাঁত চেপে বলল,
—” শাটাপ।”
একটু থেমে আবারো গর্ব করে বলল
—” সব মেয়েদের সাইকোলজি জানতে হবেনা আমার। আমার বউয়ের সাইকোলজি জানতে পারলেই হবে। তোর মত খেলোয়াড় না আমি!”
কাতর চোখে তাকালো রাশেদ। হ্যাঁ সে একটু মেয়েবাজ ছিল, তাই বলে ইরফান তাকে এভাবে পার্সোনাল অ্যাটাক করে দেবে? সহ্য করতে পারলো না বেচারা। চায়ের কাপটা রেখে ডুব দিল গভীর চিন্তায়। তার তেরো নাম্বার গার্লফ্রেন্ড সারা কে কল করে এই দুঃখের কথা জানানোর সিদ্ধান্ত নিতেই তার মনে পড়ে গেলো সেও এখন বিবাহিত। দুঃখের কথা সব বউকেই বলতে হবে। কিন্তু এই দুঃখের কথা বউকে বললে তো তার বংশের বাতি নিভে যাওয়ার তীব্র সম্ভাবনা রয়েছে। ভবিষ্যত সাদা কালো দেখে হতাশ হয়ে আবারো চায়ের কাপ তুলে নিল রাশেদ। জিজ্ঞেস করল,
—” তুই শিওর ভাবিকে কিছুই বলিস নি? এমন কিছুই করিস নি যেন ভাবি কষ্ট পায়?”
ইরফান দুদিকে মাথা নাড়লো,
—” না ভাই। সব ঠিকই ছিল।”
দুই সেকেন্ড ভেবে রাশেদ চট করে বলল,
—” আই লাভ ইউ বলে দিতি। সিম্পল! আমার ঘরেরটা তো আই লাভ ইউ শুনলেই গলে গিয়ে পারলে জানটুকুও দিয়ে দেয়।”
বলেই বুকে হাত রেখে মনে মনে শুকরিয়া আদায় করল রাশেদ। বউ তার আসলেই বেশ ভালো আর মিষ্টি।
ইরফান কথাটা শুনে একটু থমকালো। এরপর বলল,
—” ওসব বলি না আমি ওকে।”
রাশেদ সোজা হয়ে বসল। গুরুতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো,
—” মানে?”
—” মানে কখনো বলিনি।”
—” কোন দুঃখে? আই মিন, কেনো?”
ইরফান চুপ রইলো। সামনে খোলা ল্যাপটপ টার দিকে তাকিয়ে টেবিলে নখ দিয়ে শব্দ করল তিনবার। কেনো বলেনা সে? নিজেও এর উত্তর জানে না? সেই রাতে ইরফান ঘুরিয়ে পেচিয়ে বলেছিল এইসব ভালোবাসা নেই তার। কিন্তু… এখনও কি একই কারনে সে বলেনি?
রাশেদ ধাক্কা দিয়ে হুঁশ ফেরালো ইরফানের,
—” কী রে শালা? কখনো বলিস নি ক্যান? পেটে কি সাইলেন্সার লাগানো তোর?”
ইরফান কিছুক্ষন আবারো চুপ রইলো। তার হাঁটু কাঁপতে থাকলো এবার। যথাসম্ভব শক্ত থেকে সে অন্যদিকে তাকিয়ে অপরাধীর মত কন্ঠ করে বলল,
—” জীবনে শুধু একজনকেই কয়েকবার বলেছিলাম। ইনায়ার মা কে।”
রাশেদের উজ্জ্বল হাসিমাখা মুখটা স্তব্ধ হলো। ইরফান শুকনো ঢোক গিলে আবারো বলল,
—” তাহিয়ার পরে আর কখনো কাওকে বলতে পারবনা -এটাই ভেবেছি। তুই তো জানিসই তাহিয়ার সাথেও আমার তেমন ঘনিষ্ঠতা খুব একটা ছিল না। ভালোবাসতাম না- তেমন না। কিন্তু সেরকম ভাবে তো পাগলও ছিলাম না ওর জন্য। যতটুকু ছিল, স্ত্রী হিসেবে আমার সন্তানের মা হিসেবেই ছিল। তবুও আমি চাইনি ওর জায়গাটা অন্য কাওকে দিতে। যতই হোক একটা মায়া তো ছিল। আমি…নীহাকে বিয়ে করার আগেই তো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে শুধু ইনায়ার জন্য মা আনব, আমার জন্য স্ত্রী না।”
রাশেদ অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। এরপর বাঁকা হেসে চোখমুখ শক্ত করে সবচেয়ে কঠিন কথাটা বলেই ফেলল,
—” তাই নাকি? শুধু মা এনেছিস? তাহলে ভাবির সাথে রাত কাটিয়েছিস কেনো? টাচ করিস নি ভাবিকে? এতটা সন্ন্যাসী তো হওয়ার কথা না পুরুষের।”
ইরফান চোখ গরম করে তাকিয়ে ধমক দিল,
—” শাটাপ রাশেদ। এরকম নোংরা কথা বলতে জ্বিভ আটকালো না তোর? এগুলো কেমন কথা বলছিস তুই? তাও আবার আমার স্ত্রীকে নিয়ে!”
রাশেদ চায়ের কাপ টা ঠাস করে টেবিলে রেখে বলল,
—” ভাবিকে নিয়ে কিছু বলছি না আমি। আমি বোনের মত রেসপেক্ট করি উনাকে। আমি তোকে নিয়ে বলছি। তুই আমাকে এটার জবাব দে। স্ত্রী আনিস নি, অথচ ফরজ কাজ তো ঠিকই করেছিস! কেনো? তখন মনে ছিল না? এসব কি ধরনের ফাজলামো!”
ইরফান বিরক্তিতে চ শব্দ করে বলল,
—” এগুলোর মধ্যে এসব আসছে কেন ভাই? তুই কি বলতে চাইছিস যে আমি “আই লাভ ইউ” বলিনি বলে নীহা চলে গেছে? সিরিয়াসলি? চাইল্ডিশ!”
রাশেদ হেসে আঙুল তুলে বলল
—” এক্সাক্টলি! ঠিক ধরেছিস। সরাসরি এই কারনে না হলেও এমনই কিছু। “
ইরফান ভ্রু কুঁচকে বোঝার চেষ্টা করল। রাশেদ নিজে থেকেই বলতে থাকলো,
— ভাই দেখ, আমি তো অনেক মেয়েবাজ তাইনা? আমার তো জীবনে অনেক গার্লফ্রেন্ড ছিল। আমি যে মেয়েদের পটাতে পারি এটা বিশ্বাস করিস তো? মেয়েরা তো এমনি এমনি আমাকে সায় দিত না। এবার আমি বলি তুই শোন, নীহারিকা ইসলাম, তোর স্ত্রী, প্রাকটিকালি দ্বিতীয় স্ত্রী। তুই তাকে বিয়ে করেছিস তোর মেয়ের জন্য। সেও নিজের অপারগতা ও পারিবারিক সমস্যার কারনে এবং নিজের ইনসিকিউরিটির জন্য তোকে বিয়ে করেছে। তখন তার কোনো ইচ্ছে ছিল না। পরিবারের অবস্থা দেখে সে তখন শুধুই চেয়েছে জাস্ট একটা বিয়ে হোক, একটা সংসার হোক। তাই সে নিজেও চেয়েছে শুধুই মায়ের রোল প্লে করতে। কিন্তু ভাই, সে একজন নারী, একজন মেয়ে। তারও কিছু চাহিদা আছে। পুরুষের যেমন চাহিদা, তেমন না। নারীদের চাহিদা ভিন্ন। সবচেয়ে বড় চাহিদা হলো ভালোবাসা ও প্রায়োরিটি। তুই তাকে এনেছিস। সে নিঃস্বার্থ ভাবে তোর সন্তানকে লালনপালন করবে এটা তুই কীভাবে আশা করিস হ্যাঁ? ভাই কেও কারো জন্য নিঃস্বার্থ হয়ে করে না। কেও না। তুই তাকে সম্মান দিবিনা, প্রায়োরিটি দিবি না, ভালোবাসা দিবি না, আর আশা করবি সে মাদার তেরেসার মত তোর ফ্যামিলির সেবা করে যাবে? তাও আবার তোর কাছে স্ত্রীর অধিকার না পেয়ে? কলুর বলদ নাকি? ভাবির সাইকোলজি তুই জানিস বলেছিলি, তাহলে নিশ্চয়ই এটাও এতোদিনে বুঝেছিস যে তার কী চাই? কীসে লোভ তার! নিশ্চয়ই তোর টাকাপয়সা দেখে না ভাবি। তাহলে কী চাই তার? কী চাচ্ছে সে? এটা কখনো বোঝার চেষ্টা করেছিস?”
ইরফান অনুভূতিশূন্য দৃষ্টি ফেলে তাকিয়েই রয়েছে। রাশেদ এবার আর থামলো না। চেয়ারের পেছনে হেলান দিয়ে বসে, একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ইরফানের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে প্রতিটা শব্দ গেঁথে দিতে দিতে বলল,
—”শোন, একটা একটা করে বোঝাই তোকে। তুই ঠান্ডা মাথায় শোন।”
ইরফান কিছু বললো না। শুধু চুপচাপ তাকিয়ে রইলো।
রাশেদ আঙুল গুনে শুরু করল,
—”প্রথম কথা, ইনায়া। তুই কি খেয়াল করেছিস, ভাবি কেমন করে ইনায়াকে আগলে রাখে? নিজের পেটের সন্তান না, তাও এমন করে মানুষ করছে, যেন নিজের শরীরের অংশ। এটা কোনো সাধারণ ব্যাপার না দোস্ত। এটা আসে ভালোবাসা থেকে। খাঁটি ভালোবাসা। তুই তাকে তেমন আহামরি ভালোবাসা দিস না, তবুও ভাবি ইনায়াকে নিজের সন্তানই মনে করে। তোর কি মনে হয়, অন্য কোনো মেয়ে হলে এমন থাকতো? হয় তোর সম্পত্তির লোভ করতো, নইলে ইনায়াকে অ”মানবিক নির্যাতন করতো। আর এটাই এখনকার অপ্রিয় বাস্তব।”
একটু থেমে আবারো সে বলল,
—”দ্বিতীয় কথা, তুই নিজে। তুই খেয়াল করেছিস কিনা জানি না, কিন্তু আমি করেছি। কলেজে যেদিন তোর শরীর খারাপ ছিল মনে আছে? সেদিন তিনবার ফোন দিয়েছিল ভাবি। তুই ধরিস নি, পরে আমায় কল করে জিজ্ঞেস করেছিল তুই ঠিক আছিস কিনা। এটা কি শুধু দায়িত্ব?”
—”তৃতীয় কথা, কালকের ঘটনা। তুই বলছিস ভাবি অযৌক্তিক আচরণ করছে। কিন্তু কখনো ভেবে দেখছিস, সে কেনো এমন করল? একটা মেয়ে হুট করে নিজের সংসার, নিজের বাচ্চা রেখে চলে যায়, এটা কি সহজ? না দোস্ত, এটা রাগ না, এটা ভাঙা মনের কারসাজি!”
ইরফানের বুকের ভেতরটা কেমন যেন চেপে ধরলো।
রাশেদ এবার একটু ঝুঁকে এলো সামনে,
—” ভেবে দেখ, ভাবি তোকে সবকিছু দিয়েই এসেছে। প্রথমে নিজের জীবন দিয়েছে। সর্বোচ্চটা দিয়ে তোকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছে। তোর সন্তানকে মায়ের আদর দিচ্ছে। আর…তুই তাকে কী দিয়েছিস? আশ্রয়? হ্যাঁ। ভরনপোষণ? হ্যাঁ? নিরাপত্তা? হ্যাঁ। সম্মান? কিছুটা হয়তো৷ কিন্তু ভালোবাসা?….না। আর এটা না দিতে পারলে তোর কিছুই দেয়ার দরকার নেই। তার কাছে এমনিতেও তুই ব্যতিত সব মূল্যহীন।”
ইরফান চোখ সরিয়ে নিল। নীরবতা নেমে এলো। তার চোখেমুখে কোনো পরিবর্তন না এলেও কাঁপতে থাকা হাতটা মুঠো হয়ে গেলো। ইরফানকে চুপ থাকতে দেখে রাশেদ এবারে বাঁকা হেসে টিজ করে বলল
—” এতকিছুর পরেও যদি না বুঝিস, তাহলে ভেবেই নে যে ভাবি তোর সম্পত্তির লোভেই এসব করছে। টাকার উপর লোভ আছে। চট করে কিছু টাকা পাঠিয়ে, দেখবি বিকেলের মধ্যে ফিরে আসতেও পারে।”
তৎক্ষনাৎ বাজ পড়ার মত রাশেদের গালে চড় পড়লো ইরফানের শক্ত হাতের। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেকেন্ডের মধ্যে ইরফান রাশেদের বুকে ধাক্কা দিয়ে বলল,
—” জাস্ট শাটাপ রাশেদ। এনাফ! হাউ ডেয়ার ইউ! কাকে নিয়ে কী বলছিস তুই? মাথা ঠিক আছে? শী ইজ মাই ওয়াইফ। আরে আমি ওকে সামান্য উপহার দিতে গেলেও সেটা নিতে হাজারবার ইতস্তত বোধ করে ও। টাকা পয়সা চাওয়া দুরে থাক, কিছু প্রয়োজন হলেও মুখ ফুটে কখনো বলে না। আজ পর্যন্ত শপিং করতে যায়নি আমার সাথে। খবরদার ওকে নিয়ে এগুলো বাজে কথা বলবি না ননসেন্স! “
রাশেদ আগে থেকেই জানতো একটা চড় গালে পড়বে, তাই বলে এত জোরে সে ভাবেনি। পিছু সরে যাওয়া রাশেদ আবারো চেয়ার টেনে কাছে আসলো। গাল ঘষে বলল,
—” এত জোরে কেও মারে? শালা জল্লাদ! “
—” আর একটা বাজে কথা বললে আবার মারব।”
ইরফান চিন্তায় পড়ল। চায়ে চুমুক দিয়ে রাশেদের দিকে তাকিয়ে রইলো। রাশেদ ভ্রু নাচিয়ে জানতে চাইলো,
—” কী?”
ইরফান ইতস্তত বোধ করে বলল,
—” ও কি এসবের কারনে অভিমান করেছে? তুই শিওর?”
রাশেদ মুখ কুঁচকে বলল,
—” আমি কি তোর বেডরুমে গিয়ে বসে ছিলাম যে বুঝবো? তোকে হিন্ট দিয়েছি, এখন হিসেব কর।”
ইরফান দীর্ঘশ্বাস ফেললে রাশেদ আবারো বলল,
—”তুই ভাবিকে কখনো উপলব্ধি করাস নি যে সে তোর কাছে স্পেশাল। তুই তাকে কখনো নিজের জায়গাটা দিস নি। সে জানে, তোর জীবনে একটা জায়গা এখনো ফাঁকা আছে, যেখানে সে ঢুকতে পারছে না।”
ইরফান এবার নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো। রাশেদ থামলো না, গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
—” শুধু শুধু একজনের হক নষ্ট করছিস তুই। তাহিয়া কে একেবারে ভুলে যেতে বলছি না, তবে পরিস্থিতি ও সময়ের সাথে জীবনের কিছু কিছু অংশ অতীতের স্মৃতিতেই বাঁধাই করে রাখা উচিত। বর্তমানের সাথে জড়িয়ে শুধু শুধু ভবিষ্যত নষ্ট করা উচিত না। এমন ভাবে চলতে থাকলে আস্তেধীরে কেওই ভাবি কে সম্মান করবে না। একটা সময় সবাই তাকে নিয়ে কটাক্ষ করবে। এমনকি হয়তো একদিন ইনায়াও নীহারিকা কে তখন সৎ মা হিসেবেই দেখবে। এমন হলে, আমিও বলব তুই ভাবিকে প্রয়োজনে ব্যবহার করেছিস শুধু। “
ইরফান চোখ বুঁজলো। তার চোখের গভীরে ভেসে উঠলো চাঁদের মত জ্বলতে থাকা নীহারিকার মুখ, তার না বলা কথা, তার অদ্ভুত দৃষ্টি। পুরো রুমটা নিস্তব্ধ। ইরফানের বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছে। তার মনে হঠাৎ করে একটার পর একটা দৃশ্য ভেসে উঠতে লাগল, নীহারিকার হাসি, ইনায়াকে জড়িয়ে ধরা,রাতে চুপচাপ অপেক্ষা করা, তার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে গিয়ে থেমে যাওয়া, আর আজ, চলে যাওয়া। ইরফান শুকনো গলায় বলল,
—” ও আমাকে সরাসরি কিছু বলল না কেনো?”
রাশেদ হতাশ হয়ে বলল,
—” বাঙালী মেয়ে। তুই আশা করিস যে সে তোকে এসে বলবে, অমুক তমুক কারনে আমি রাগ করেছি, এখন রাগ ভাঙাও। হাহ! স্বপ্নেও না। নিজে খুঁজে বের করো, নিজে সমাধান করো। কস্মিনকালেও বাঙালি বেডিরা মুখ ফুটে বলবেনা।”
ইরফান এবারে ডেস্কের উপর রাখা ফোনের স্ক্রিন অন করে বলল,
—” দুটো বেজে গেছে। খেয়ে আসি।”
কিন্তু রাশেদ সতর্ক হলো। তার চোখ ইরফানের ফোনে আটকাতেই ও জিজ্ঞেস করল,
—” এটা কার ছবি?”
ইরফান আবারো স্ক্রিন অন করলো। লক ওয়ালপেপারে তাহিয়ার এই ছবি গত এক বছর ধরেই রয়েছে।
—” চিনতে পারছিস না? তাহিয়া।”
রাশেদ আবারো চা মুখে নিয়েছিল। ইরফানের কথা শুনে বিষম খেলো বেচারা। টান মেরে ফোনটা কেড়ে নিয়ে রাশেদ অবাক হয়ে বলল,
—” এখনো রেখেছিস কেনো?”
—” কেনো রাখব না। ছিলই তো।”
—” চেন্জ করিস নি কেনো?”
—” চেন্জ করবো কেনো?”
ইরফানের কথা শুনে মনে হবে ছেলেটা কিছুই জানে না, উপলব্ধি করতেও পারে না। রাশেদ চোখ পিটপিট করে বলল,
—” সিভিক সেন্স কই তোর ভাই? তোর কোনো ধারনা আছে, এটা যদি ভাবি দেখে তাহলে কতটা কষ্ট পাবে।”
ইরফান একটু ভাবলেও তৎক্ষনাৎ বলল,
—” কষ্ট পাওয়ার কি আছে?”
রাশেদ কিছুক্ষন হা হয়ে তাকিয়ে রইলো। এরপর গলা ফাটিয়ে হেসে তালি বাজিয়ে বলল,
—” বাহ সাবাশ। তুই যে এত বড় ইডিয়ট এটা তো আমি জানতাম না দোস্ত। বিশ্বাস কর, জানলে তোকে বিয়েই করতে দিতাম না!”
ইরফান ভ্রু কুঁচকে তাকালো,
—” বাট কী হয়েছে? “
রাশেদ এবারে উঠে দাঁড়ালো। দুহাত নেড়ে হাসতে হাসতে বলল,
—” কিছু না কিছু না। তুমি চালিয়ে যাও। আর এই সংসার যে বেশিদিন টিকবেনা এটাও লিখে নিয়ে যাও। আরো জেনে রাখো, হাশরের ময়দানে আল্লাহ তোমার সুষ্ঠু বিচার করবে। গুড লাক।”
বলেই টিচার্স রুম থেকে বেরিয়ে গেলো রাশেদ। সে আসলেই হতাশ। চরম ভাবে হতাশ! এতক্ষণ যে দেয়ালের সামনে গিয়ে জ্ঞান দেয়ার মত অবস্থা করে এসেছে সে, তা মাত্র উপলব্ধি করল।
কিছুক্ষণ আহাম্মকের মত বসে থাকার পর ইরফান ফোনটা হাতে নিল। লক ওয়ালপেপার থেকে Swipe করে হোম ওয়ালপেপার টা দেখলো- চকচক করে ভেসে উঠেছে নীহারিকা ও ইনায়ার একটা ছবি। লুকিয়ে তোলা হয়েছে ছবিটা। একদিন সুযোগ বুঝে ইরফান তাদের ছবি তুলেছে। কেনো যেন বারবার দেখেও মন ভরছিল না, তাই হোম ওয়ালপেপারে সেট করে ফেলেছে। ইরফান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবল, রাশেদ আস্ত একটা বোকা। শুধু উপরের আবরণ দেখেই Judge করলো। অথচ ভেতরে যে নীহারিকারও একটা জায়গা রয়েছে তা তো দেখলোই না। তার আগেই ভয়ানক প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে গুড লাক বলে চলে গেলো। কি আশ্চর্য!
হুট করে ইরফানের মাথায় একটা দৃশ্য ঠোক্কর খেলো। গতকাল দুপুরে ওয়াশরুম থেকে বের হওয়ার পর ফোনটা বিছানায় পেয়েছে সে। ঠিক জায়গায় ছিল না ফোনটা। ইরফান নিশ্চিত ইনায়া ফোন নিয়েছিল। কিন্তু ইনায়া একবার ফোন হাতে পেলে কোনোভাবেই ছাড়ে না। তাহলে নিশ্চয়ই নীহারিকা ছাড়িয়ে দিয়েছে। ইরফানের আঙুলগুলো কাঁপতে লাগলো। সে আস্তে করে চেয়ারে হেলান দিল। মাথা পেছনে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করল। রাশেদ মাত্র যা দেখলো, তা কি কোনোভাবে নীহারিকাও দেখেছে? হঠাৎ করেই নিজের উপর ভীষণ রাগ হলো ইরফানের। বুকের ভেতর চাপা কষ্টটা যেন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। ইরফান চোখ খুললো। চোখ দুটো আগের মত নেই। এবার সেখানে স্পষ্ট একটা ভয়। আর তার থেকেও বড় কিছু—হারিয়ে ফেলার ভয়।
চলবে…
Share On:
TAGS: অনামিকা তাহসিন রোজা, নবরূপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নবরূপা পর্ব ৯
-
নবরূপা পর্ব ১৪
-
নবরূপা পর্ব ১২
-
নবরূপা পর্ব ১৬ ( রহস্যে পদার্পণ 🔥)
-
নবরূপা পর্ব ১
-
নবরূপা গল্পের লিংক
-
নবরূপা পর্ব ২
-
নবরূপা পর্ব ১১
-
নবরূপা পর্ব ২০
-
নবরূপা পর্ব ২৪