নূরএসাহাবাদ
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ১৫
আয়নাখানার সেই অপার্থিব মুহূর্ত বিদ্যমান।
মেহেরুন্নেসা আর বাইজিদ পাশাপাশি বসে আছে। মাঝখানে রাখা ফুলে মোড়ানো আয়না। যেখানে একসাথে ভেসে উঠছে দু’জনের মুখ। চারপাশে ফুলের ঘ্রাণ, মৃদু আতরের সুবাস, আর সোনালি প্রদীপের আলোয় যেন সময়টাই থমকে গেছে।
মেহেরুন্নেসার লাজুক দৃষ্টি বারবার নিচু হয়ে আসছে, আর বাইজিদ আয়নায় তার প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে আছে। যেন এই আয়নার ভেতরেই সে নিজের ভবিষ্যৎ খুঁজে পাচ্ছে। এই মেয়েটাকে নিয়ে, এই শান্ত মুখটা নিয়ে।
হঠাৎ দূরে কোথাও একটা ভারী দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ।
সকলেই চমকে তাকালো সেদিকে।
“ধরো! পালাতে দিও না!” “ওইদিকে গেছে!” “রক্ষীরা! সবাই ছুটে যাও!”
মুহূর্তের মধ্যেই সেই শান্ত পরিবেশ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। চারদিকে হুরোহুরি, চিৎকার, দৌড়াদৌড়ি। রাজপ্রাসাদের ভেতর যেন হঠাৎ ঝড় নেমে আসে। দাসীরা আতঙ্কে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে, কেউ কেউ মেহেরুন্নেসার পাশে ছুটে আসে। মেহেরুন্নেসা চমকে উঠে বাইজিদের দিকে তাকায়
“কী হচ্ছে?”
বাইজিদের মুখের সেই মুগ্ধতা এক ঝটকায় মিলিয়ে যায়। চোখে নেমে আসে তীক্ষ্ণ সতর্কতা। সে ধীরে দাঁড়িয়ে পড়ে, চারপাশে একবার দৃষ্টি বুলায়। ঠিক তখনই ভিড় ঠেলে দ্রুত এগিয়ে আসে এক খাস লোক শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত, মুখে ভয় আর উত্তেজনার ছাপ।
“হুজুর!”
সে নিচু হয়ে সালাম জানায়
“কারাগার থেকে একজন বন্দি পালিয়েছে!”
বাইজিদের চোখ সংকুচিত হয়
“কে?”
লোকটা গিলতে গিলতে বলে
“মিরান, দুঃসাহসী নারী বন্দি, হুজুর সে পালিয়ে গেছে!”
এক মুহূর্তের জন্য চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
মিরান নামটা যেন বাতাসে এক অশুভ স্রোত বয়ে আনে। বাইজিদের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। তার চোখে ফুটে ওঠে অদ্ভুত এক কঠোরতা যেন এই নাম তার ভেতরের কোনো পুরনো ক্ষতকে আবার জাগিয়ে দিয়েছে। সে ধীরে মেহেরুন্নেসার দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। মেহেরুন্নেসার মুখে স্পষ্ট ভয় সে কিছুই বুঝতে পারছে না, কিন্তু পরিস্থিতির ভয়াবহতা টের পাচ্ছে।
বাইজিদ এক পা এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বলে “তুমি এখনই আমার কক্ষে চলে যাও।”
মেহেরুন্নেসা হতবাক
“কিন্তু”
“কোনো কিন্তু না”
কণ্ঠ কঠোর হয়ে ওঠে
“এই জায়গা টা মোটোও নিরাপদ নয়।”
একটু থেমে, কণ্ঠ নরম করে যোগ করে
“দাসীদের সাথে যাও। দরজা বন্ধ করে ভেতরে থাকবে। আমি না আসা পর্যন্ত বাইরে বের হবে না।”
তার চোখে এবার স্পষ্ট উদ্বেগ শুধু জমিদার পুত্রের দায়িত্ব নয়, যেন ব্যক্তিগত কোনো ভয়ও কাজ করছে। মেহেরুন্নেসা আর প্রশ্ন করে না। নিঃশব্দে মাথা নাড়ে। দাসীরা তাকে ঘিরে দ্রুত সরে যেতে থাকে।
যাওয়ার আগে একবার পেছনে তাকায় সে
বাইজিদ তখন পুরোপুরি বদলে গেছে।
মুহূর্ত আগেও যে মানুষটা আয়নায় তার মুখ দেখে মুগ্ধ হচ্ছিল, এখন সে যেন এক কঠোর যোদ্ধা চোখে আগুন, মুখে দৃঢ়তা।
খাস লোকটির দিকে ঘুরে বাইজিদ গর্জে ওঠে
“সব দরজা বন্ধ করে দাও! প্রাসাদের এক ইঞ্চি জায়গাও খুঁজে দেখতে হবে। মিরান বাইরে যেতে পারবে না যেভাবেই হোক তাকে ধরতে হবে!”
পাগড়ী টা ফেলেই ছুটে চলল বাইজিদ। সুনেহেরা এসে মেহেরুন্নেসা কে টেনে তুলল। তার পরণে ভাড়ি পোশাক। আতঙ্কে চোখ মুখ শুকিয়ে গেছে। সব রক্ষীরা বেরিয়ে যেতেই অন্দরের বিশাল দরজা বন্ধ করে দেওয়া হলো। ভিতরের নারীরা যেন হাপ ছেড়ে বাচলো তখন।
মারজান নির্দেশ দিলো সকলকে যে যার ঘরে যেতে। মেহেরুন্নেসা কে তো পারে না চিবিয়ে খেতে। সে অশুভ বলেই আজকের মতো এত আলোকঝলমলে দিনটায় এত বড় দুর্ঘটনা ঘটে গেল। সুনেহেরা মেহেরুন্নেসা কে নিয়ে বাইজিদ এর ঘরে যায়। সাথে যায় সিমরান ও। ঘরটা ফুলে ফুলে সাজানো।
দরজা খুলতেই যেন স্বপ্নের ভেতর ঢুকে পড়ার মতো অনুভূতি। এটাই বাইজিদের কক্ষ। কিন্তু আজ সে শুধু কক্ষ নয়, এক অপার্থিব বাসরঘর।
ঘরের মাঝখানে বিশাল খাট, চারপাশে সাদা ঝরনার মতো নেমে আসা পর্দা। সেই পর্দাগুলোর গায়ে গায়ে জড়িয়ে আছে তাজা ফুল। সাদা জুঁই, লাল গোলাপ, রজনীগন্ধার লম্বা মালা। যেন ফুলগুলো নিজেরাই ভালোবাসার গল্প বলতে চায়।
খাটের ওপর গাঢ় লাল রেশমি বিছানা, তার ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা গোলাপের পাপড়ি। মোমের আলোয় পাপড়িগুলো এমনভাবে ঝলমল করছে, যেন প্রতিটা পাপড়ির ভেতর লুকিয়ে আছে কোনো না বলা অনুভূতি।
চারদিকে দেয়ালজুড়ে রাজকীয় কারুকাজ। বড় বড় আয়না আর সোনালি নকশা করা ফ্রেমে আলো প্রতিফলিত হয়ে পুরো ঘরটাকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। জানালার লম্বা পর্দাগুলো হালকা বাতাসে দুলছে, আর বাইরে থেকে চাঁদের আলো ঢুকে মিশে যাচ্ছে মোমবাতির নরম আলোয়।
মেঝেতে বিছানো কারুকাজ করা গালিচা, তার ওপর ছড়িয়ে আছে কয়েকটা গোলাপের পাপড়ি। যেন কেউ খুব যত্ন করে সাজিয়েছে প্রতিটা ইঞ্চি।
এক কোণে রাখা নরম লাল ভেলভেটের সোফা, পাশে ছোট টেবিলে আতরের কাঁচের শিশি আর রুপোর পেয়ালা। বাতাসে মিশে আছে আতরের মিষ্টি ঘ্রাণ গভীর, মোহময়, মাতাল করা।
ছাদ থেকে ঝুলছে ঝাড়বাতি তাতে জ্বলছে অসংখ্য মোম, আর সেই আলো ফুলের ওপর পড়ে যেন সোনালি আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে।
এই ঘরটা অপেক্ষা করছে একটি রাতের জন্য, একটি মিলনের জন্য। একটি নতুন সম্পর্কের প্রথম মুহূর্তের জন্য।
মেহেরুন্নেসা গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এসে খাটের কাছে দাঁড়ালো। সুনেহেরা চুল গুলো ঝাড়তে ঝাড়তে মেহেরুন্নেসার বাহু ধরে বসালো পালঙ্কে। কেমন লজ্জায় মিইয়ে যাচ্ছে মেহেরুন্নেসা। সুনেহেরা ঘরের চারিদিকে চোখ বুলিয়ে বলল
“বেশ ভালো লাগছে কিন্তু, বলো”
হঠাৎ কি মনে করে সুনেহেরার চোখ সিমরান এর ওপর পড়তেই চোখ মুখ কঠিন হয়ে পড়লো। এত সৌন্দর্য যে ওই মেয়েটার সহ্য হচ্ছে না তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। সিমরান আড় চোখে একবার মেহেরুন্নেসা কে দেখে বলল
“আমি বাদাম দেওয়া দুধটা নিয়ে আসছি”
সুনেহেরা কিছু বলল না। সিমরান যাওয়ার আগে আবার একবার তাকালো ঘরটার দিকে। সিমরান যেতেই সুনেহেরা গিয়ে বন্ধ করে দিলো কক্ষের বিশাল দরজা খানা। তার ধরাম করে ওঠা শব্দে মৃদু চমকালো মেহেরুন্নেসা। সুনেহেরার দিকে তাকাতেই তার চমক দ্বিগুণ হলো। কেমন রহস্য জনক ভাবে তাকিয়ে আছে সে মেহেরুন্নেসার দিকে। মেহেরুন্নেসা উঠে দাড়ালো। তার চোখ ও হয়ে উঠলো দ্বিগুণ রহস্যময়।
সুনেহেরা মেহেরুন্নেসার সামনাসামনি দাড়াতেই মেহেরুন্নেসা বলল
“আপনার বড্ড সাহস তাই না?”
সুনেহেরা ফিচেল হাসলো
“বলতে পারো। কিন্তু কেন বলোতো?”
মেহেরুন্নেসার চিবুক শক্ত হয়ে ওঠে। দৃঢ় কন্ঠে বলল
“যদিও আপনি টের পাননি, গতরাতে উত্তরের জঙ্গলের পথে আমি আপনার পিছু নিই। তখনই দেখেছি আমি”
মেহেরুন্নেসা ভেবেছিল সুনেহেরা অবাক হবে। কিন্তু মোটেও তা হলো না। বদৌলতে হাসলো সুনেহেরা। হাসতে হাসতে সোফার ওপর ঢলে পড়ে বলল
“আচ্ছা? আমি টের না পেলে তোমায় প্রাসাদে আনলো কে শুনি?”
মেহেরুন্নেসার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে গেলো তৎক্ষনাৎ। আমতা আমতা করে বলল
“আ….আমাকে, আপনি?”
“হ্যা প্রিয়তমা আমার। আমিই, আমিই তোমাকে অতটা পথ ঘাড়ে করে বয়ে এনেছি।”
অট্টহাসি তে ফেটে পড়লো সুনেহেরা। মেহেরুন্নেসা দ্রুত গিয়ে ওর পাশে বসলো। কৌতূহলি হয়ে জিজ্ঞেস করলো
“কী হচ্ছে এই প্রাসাদে? বলুন না। আপনি একটা মেয়ে মানুষ হয়ে, এই রাতের বেলা একা একা জঙ্গলে যান। আপনার ভয় করে না? আর কেনোই বা যান?”
সুনেহেরা হাসি বন্ধ করলো। মেহের এর থুতনি তে আঙুল ছুঁইয়ে বলল
“আমাকে অনুসরণ করতে এসো না সুন্দরী। আমি মৃত্যু নিয়ে খেলি। এ খেলা সবার জন্য নয়। আজকের রাতটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। তোমার জন্যও, আমার জন্যও। তুমি আদরে ভালোবাসায় তোমার স্বামীকে খুশি করো। আর আমি ছুটে যাই আমার গন্তব্যে। খবরদার মেয়ে, বাধা হওয়ার চেষ্টাও করো না”
মেহেরুন্নেসা কিছু বলবে তার আগেই দরজায় খটখট শব্দ হয়। সুনেহেরা উঠে যায় দরজা খুলতে। দরজার ওপারে দাঁড়ানো সিমরান। হাতে একখানা পিতলের নকশা করা গ্লাস। তাতে বাদাম দেওয়া দুধ। বাসর রাতের নিয়ম পালনের জন্য আনা। সুনেহেরা ঢুকতে দেয় না সিমরান কে। গ্লাস টা নিজেই নিয়ে পালঙ্কের পাশের টেবিল টাতে রাখলো। ফের গিয়ে বসলো মেহের এর পাশে। আয়েশি ভঙ্গিতে সোফায় হেলান দিয়ে বলল
“রাত বিরেতে এদিক ওদিক চোখ দেওয়া বন্ধ করো। যদি খবরদারি করতেই হয়, আমার মত করো। অযথাই নজর দিয়ে লাভ আছে?”
হঠাৎ মেহেরুন্নেসা খপ করে ধরলো সুনেহেরার হাত।
“আমিও জানতে চাই সবটা, দয়া করে বলুন আমায়”
“এগুলো জানার বিষয় নয়, সব টা স্বচক্ষে দেখে বুঝে নিতে হয়”
মেহেরুন্নেসার হাতের চাপ আরো দৃঢ় হয়
“তবে আমি দেখতেই চাই”
সুনেহেরার চোখ জোড়া হেসে ওঠে। উঠে যেতে যেতে বলে
“ওই গ্লাসের দুধে নিদ্রাবিষ মেশানো আছে। যদি মতের পরিবর্তন না হয়, তবে চলে এসো। আস্তাবলের বা দিকে তোমার অপেক্ষায় থাকবো”
সুনেহেরা চলে যেতে নিলে মেহেরুন্নেসা ডাকলো
“শুনুন, উনিও কি আপনার সঙ্গে আছে?”
সুনেহেরার বুঝতে বাকি রইলো না মেহেরুন্নেসা সিমরান এর কথা বলেছে। কারণ দুধটা সিমরানই এনেছে। সে ফিরে এলো মেহেরুন্নেসার দিকে। সরু চোখে তাকিয়ে বলল
“এই প্রাসাদের প্রত্যেকের গতিবিধি, নাড়ি-নক্ষত্র আমার জানা। নিজের শত্রুকে চিনতে শিখো।”
মেহের এর গোল গোল চোখে তাকিয়ে থাকা দেখে সুনেহেরা দুই হাত বুকে ভাজ করে বলল
“তুমি জানো গত তিনদিনে কত বার তোমাকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে?”
মেহের এর চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। সুনেহেরা তাকে আশ্বস্ত করে বলে
“আপাতত আমি আছি, চিন্তা করো না”
মেহেরুন্নেসা কে রেখে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায় সুনেহেরা।
সন্ধ্যা নামতে চলেছে। চাঁদের আলো ভেঙে ভেঙে পড়ছে জঙ্গলের ভেতর। ছায়া আর আলো মিশে পথটাকে করে তুলেছে আরও অনিশ্চিত।
দ্রুত ছুটে চলেছে কয়েকটি ঘোড়া। সামনে রত্নপ্রভা দেহ সামান্য ঝুঁকে, লাগাম শক্ত করে ধরা, চোখ সামনে স্থির। তার চলার ভঙ্গিতে একটুও দ্বিধা নেই। যেন শিকার ঠিক কোথায় আছে, সে জানে।
পেছনে বাইজিদ সমান গতিতে ছুটছে। তার দৃষ্টি বারবার চারপাশে ঘুরছে, প্রতিটা নড়াচড়া খেয়াল করছে। হঠাৎ রত্নপ্রভা লাগাম টেনে ধরে। ঘোড়া থামে। সে ঝট করে নিচে নামে।
ভেজা মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। আঙুল ছুঁয়ে দেখে দাগ পায়ের ছাপ, কাদায় হালকা চাপ, ছেঁড়া ঘাস।
তার দৃষ্টি সোজা চলে যায় বাম দিকের ঘন ঝোপে। সে উঠে দাঁড়ায়, হাত তুলে ইশারা করে। রক্ষীরা শব্দ না করে ছড়িয়ে পড়ে। কেউ ডানে, কেউ বাঁয়ে। ধীরে, কিন্তু নিশ্চিত গতিতে।
রত্নপ্রভা আবার ঘোড়ায় ওঠে।
এইবার পথ সরাসরি না, বাঁক নিয়ে, ঘুরে, অর্ধবৃত্ত করে এগোতে থাকে তারা।
জঙ্গলের ভেতর দৌড়াচ্ছে মিরান। তার নিঃশ্বাস দ্রুত, কিন্তু পা থামে না। মাঝে মাঝে সে পিছনে তাকায় তার চোখে আতঙ্ক নেই, প্রতিটি পদক্ষেপে হিসাব।
সে হঠাৎ দিক বদলায়। ডানদিকে ঢুকে পড়ে ঝোপ ভেঙে। শুকনো ডাল ভাঙার শব্দ রাতকে চিরে দেয়। তারপর আবার বাঁক, তারপর হঠাৎ থামে।
সামনে ফাঁকা জায়গা। জঙ্গলের শেষ, আর সামনে নদী। চাঁদের আলোয় নদীর জল ঝলমল করছে। স্রোত খুব তীব্র না, কিন্তু গভীর।
মিরান এক মুহূর্ত থামে। চারপাশে তাকায়।
পেছন থেকে ভেসে আসে খুরের শব্দ, ক্রমশ কাছে। সে দৌড়ে নদীর পাড়ে পৌঁছে যায়।
ঠিক তখনই দু’পাশের ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসে রক্ষীরা। নিঃশব্দে, কিন্তু দ্রুত। পথ বন্ধ। মিরান ঘুরে দাঁড়ায়। সামনে দাড়ায় রত্নপ্রভা।
ঘোড়া থামতেই সে লাফ দিয়ে নিচে নামে। পায়ের ভর এত স্থির, যেন বহু যুদ্ধের অভিজ্ঞতা। মিরান প্রথম আঘাত করে বসে। দ্রুত, নিচু হয়ে সোজা সামনে।
রত্নপ্রভা একপাশে সরে যায়। তার তলোয়ার এক ঝলকে উঠে আসে, ঠক করে আঘাত ঠেকায়।
দুই শরীর ঘুরে যায় একই সঙ্গে।
মিরান আবার আক্রমণ করে এইবার উপর থেকে।
রত্নপ্রভা পিছিয়ে না গিয়ে সামনে এগিয়ে আসে। তলোয়ারের ফলায় ফলার ঘর্ষণ চিঁহ্ করে শব্দ ওঠে।
পেছন থেকে বাইজিদ এগিয়ে আসে, কিন্তু থামে।
চোখ স্থির সে অপেক্ষা করছে সঠিক মুহূর্তের।
মিরান হঠাৎ দিক বদলায়, রত্নপ্রভার পাশ কাটিয়ে নদীর দিকে ছুটতে যায়। ঠিক তখনই রত্নপ্রভা ঘুরে দাঁড়িয়ে তার পায়ের দিকে নিচু কোণে তলোয়ার চালায়।
মিরানের পা কেটে যায় না, কিন্তু ভারসাম্য নষ্ট হয়। সে হোঁচট খেয়ে সামনে পড়ে যায়, হাঁটু মাটিতে ঠেকে। উঠে দাঁড়াতে যাবে তার আগেই রত্নপ্রভা পেছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এক হাতে তার কাঁধ চেপে ধরে, আরেক হাতে তলোয়ারের ঠান্ডা ফলা তার গলায় ঠেকিয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে সব থেমে যায়। চারপাশে রক্ষীরা ঘিরে ফেলে। মিরান স্থির হয়ে যায়। শ্বাস দ্রুত, কিন্তু শরীর আর নড়ে না।
বাইজিদ ধীরে সামনে এসে দাঁড়ায়। তার ছায়া পড়ে মাটিতে, চাঁদের আলোয় দীর্ঘ হয়ে।
রত্নপ্রভার হাত শক্ত একটুও কাঁপে না।
নদীর জল ধীরে বয়ে যাচ্ছে পাশে।
আর সেই পাড়েই থেমে গেল মিরানের দৌড়।
শেষ পর্যন্ত একটি নিখুঁত আঘাতেই তাকে থামিয়ে দিল রত্নপ্রভা।
মিরানকে শক্ত করে বেঁধে ঘোড়ার পেছনে বসানো হয়েছে। দু’পাশে রক্ষীরা। তার দৃষ্টি স্থির, মুখে কোনো ভয় নেই তবু সে আর স্বাধীন না।
প্রাসাদের পিছনের ফটক খুলে যায় ভারী শব্দে।
ভেতরে ঢুকেই বাইজিদ নির্দেশে কারাগারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। লোহার দরজা, শিকল, আর অন্ধকারে গিলে ফেলে তাকে আবার। এইবার আরও কড়া পাহারা।
সব শেষ হলে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে সবাই।
রত্নপ্রভা নিজের পথে সরে যায়। তার চোখে এখনো যুদ্ধের আগুনের ছাপ, কিন্তু পায়ের চলায় ক্লান্তির ভার। জোর বাঁচা বেঁচেছে আজ। সন্ধ্যার পর প্রাসাদে প্রাণ নিয়ে ফিরতে পেরেছে ভেবেই তারা সন্তুষ্ট।
বাইজিদ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে প্রাসাদের প্রাঙ্গণে। বুক ওঠানামা করছে ধীরে ধীরে। হাতে এখনো তলোয়ার, তাতে শুকনো কাদা লেগে আছে।
হঠাৎ ই তার মনে পড়ে, বাসর ঘরে নববিবাহিতা স্ত্রী অপেক্ষায়। এতক্ষণের ব্যাস্ততায় যেন তা ভুলতে বসেছিল। এক মুহূর্তের জন্য সে স্থির হয়ে থাকে। যেন নিজের ভুলটা উপলব্ধি করছে। এতক্ষণ ধরে মিরানকে ধরার তাড়নায় সে পুরোপুরি ভুলেই গিয়েছিল।
সে ধীরে শ্বাস নেয়। তারপর আর দেরি করে না।
নিজ কক্ষে যাওয়ার আগে পাশের ঝরনাধারার কাছে থামে। হাত, মুখ, গলা ঠান্ডা পানিতে ধুয়ে নেয়। মাটির দাগ, ক্লান্তির ছাপ কিছুটা মুছে যায়।
কিন্তু চোখে এখনো রয়ে গেছে ক্লান্তি, আর সাথে এক অদ্ভুত কোমলতা।
সে ভেতরের পথে হাঁটা দেয়। করিডোর পেরিয়ে, অন্দরমহলের নিস্তব্ধতা ভেঙে, ধীরে ধীরে এগোয় নিজের কক্ষের দিকে। দরজার সামনে এসে এক মুহূর্ত থামে। ভেতরে নিস্তব্ধতা। তার হাত দরজায় ওঠে ধীরে ঠেলে খোলে।
দরজা খুলতেই এক ঝলক ফুলের গন্ধ এসে লাগে তার মুখে। ঘরটা আগের মতোই,তবে সাজানো মোমের আলো নরম হয়ে জ্বলছে, ফুলের মালা ঝুলে আছে চারপাশে, বিছানায় ছড়িয়ে আছে লাল গোলাপের পাপড়ি।
আর সেই ফুলের মাঝখানে বসে আছে মেহেরুন্নেসা। মাথা নিচু, দু’হাত একসাথে জড়ানো। গায়ের গয়না মোমের আলোয় ঝলমল করছে। মুখে লাজুক শান্ত ছায়া। বাইজিদ দরজার কাছেই থেমে যায়। কয়েক মুহূর্ত শুধু তাকিয়ে থাকে। যুদ্ধ, তাড়া, রক্ত, অস্থিরতা সব যেন দরজার বাইরে রয়ে গেছে।
এই ঘরের ভেতর শুধু এক অন্যরকম নীরবতা।
ধীরে দরজা বন্ধ করে সে ভেতরে পা রাখে।
তার পদচারণায় মেহেরুন্নেসা মুখ তুলে তাকায়।
চোখে চোখ পড়তেই, চোখ নামিয়ে ফেলে।
সময়টা আবার ধীরে যেতে শুরু করে।
বাইজিদের ঠোঁটের কোণে অচেতন এক মৃদু হাসি ফুটে ওঠে। বাইজিদ ধীর পায়ে এগোয়। মেহেরুন্নেসার বুকের ধুকপুকানি ক্রমশ বাড়ছে। বাইজিদ পালঙ্কের পাশ এসে থামলো। মেহেরুন্নেসা মাথাও তুলছে না। বাইজিদ বসতে নিয়েও হুট করে উঠে দাঁড়ালো। আলমারি থেকে পোষাক বের করে স্নানাগারে গিয়ে পাল্টে আসলো। কিছুসময় এর ব্যাবধানে ফিরে এলো ছাই রঙা পাতলা পাঞ্জাবির হাতা গোটাতে গোটাতে। এলোমেলো চুল গুলো দু হাতে ওপর দিকে ঠেলে দিয়ে বসলো মেহেরুন্নেসার পাশে।
চোখে এক অদ্ভুত ঘোর। মেহেরুন্নেসার কাছাকাছি বসে পায়ে হাত রাখতেই মেহেরুন্নেসা হাতে পায়ে খামচে ধরলো নরম চাদর। কোমল ফর্সা পায়ে আলতো হাত বুলিয়ে বাইজিদ ঝুকলো। পায়ের পাতা মুঠো করে ধরে চুমু খেলো পায়ের ওপরের অংশে। মেহেরুন্নেসা আরো গুটিয়ে নিলো নিজেকে। বাইজিদ মাথা তুলে হাত রাখলো মেহেরুন্নেসার হাটুতে। স্পর্শ ক্রমশ উপরে রওনা করেছে। ধীরে ধীরে হাত গিয়ে ঠেকলো মেহেরুন্নেসার ফর্সা উদরে। তারপর দুহাতে আগলে নিলো প্রিয়তমা স্ত্রীর গাল।
যেন নিশ্বাস নিতে ভুলে গেছে মেয়েটা। শক্ত হয়ে বসে আছে। তার সুদর্শন স্বামীর সেই সবুজাভ দৃষ্টিতে কতখানি কামুকতা আছে আজ, তাকিয়ে দেখলো না মেহেরুন্নেসা। বাইজিদ ধীরে ধীরে নিজের মুখ আগায় মেহেরুন্নেসার দিকে। কিন্তু স্ত্রীর এমন জড়তা ভাবালো বাইজিদ কে। একটু বেশিই চাপ দেওয়া হচ্ছে কি?
এমন ভাবনা আসতেই ছেড়ে দিলো মেহেরুন্নেসা কে। তার ব্যাবহারে কোনো সারা পাচ্ছে না বাইজিদ। মনে হচ্ছে মেহেরুন্নেসা কে জোর করা হচ্ছে। বাইজিদ এর খুশি মুহূর্তেই বিলীন হয়ে গেল। তার স্ত্রী কি তাকে গ্রহণ করতে পারছে না? যতটা ভালোবাসা আর আগ্রহ নিয়ে সে মেহেরুন্নেসার কাছে এসেছে, তেমন কিছু কি মেহেরুন্নেসার মধ্যে হচ্ছে না? সুন্দর মুখশ্রী ঢেকে গেলো বিষন্নতায়। মুখ কালো করে বলল
“আজ আমাদের প্রথম রাত। তুমি কী অপ্রস্তুত অনুভব করছো? আমাকে গ্রহণ করতে অমত আছে তোমার?”
মেহেরুন্নেসার দিক থেকে কোনো উত্তর আসলো না। বাইজিদ আরো আশাহত হলো যেন। মিনমিনে গলায় বলল
“তুমি অস্বস্তি অনুভব করলে আমি অন্য কক্ষে যাচ্ছি”
কথাটা কেবল মানবিকতা থেকে বলল বাইজিদ। কিন্তু মনে মনে সৃষ্টিকর্তা কে বহু স্মরণ করছে যেন মেহেরুন্নেসা মত না দেয়। সে যেন একটি বার বলে না আপনার যেতে হবে না কোথাও, এখানেই থাকুন। কিন্তু এতেও কোনো উত্তর করলো না মেহেরুন্নেসা। বাইজিদ এর সত্তা ছেয়ে গেলো বিষন্নতায়। তবে কি বহুল কামনা কৃত এই রাতটি তাকে মেহেরুন্নেসা কে ছাড়াই কাটাতে হবে? এত গুলো দিন ধরে যে স্বপ্ন দেখলো আজকের রাত নিয়ে, এত এত অধৈর্য থেকে যা আজ পেয়েছে, তা এভাবে শেষ হয়ে যাবে? চুপ থাকা নারীদের সম্মতির লক্ষণ। বাইজিদ এর হৃদয় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার এক পর্যায়ে উঠে দাড়ালো পালঙ্ক ছেড়ে। প্রথমেই বোধহয় বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে ফেলেছিলো, তা না হলে হয়তো মেহেরুন্নেসা এভাবে দূরে ঠেলে দিত না।
বাইজিদ এর মুখটা দেখে মেহেরুন্নেসা পারে না হাসি চেপে রাখতে। মৃদু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল
“আমার মোহরানা পরিশোধ হয় নি কিন্তু জমিদার সাহেব”
বাইজিদ এক মূহুর্তের জন্য চমকে উঠলো মেহেরুন্নেসার কথায়। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে আছে এখনো। ক্ষুন্ন মন চনমনে হয়ে উঠলো এক নিমেষে। চট করে বসে পড়লো পালঙ্কে। উৎসুক হয়ে বলল
“বলুন বিবিজান, মোহরানা কি হিসেবে কি চান?”
বাইজিদ মেহেরুন্নেসার হাত জোড়া মুঠো করে ধরে তাতে একটা চুমু খেয়ে বলল
“মোহরানা তো পাবেন, তারপর আমার অধিকার টা আমি পাবো তো?”
বাইজিদ এর চোখ যায় পাশে রাখা দুধের গ্লাসের দিকে। বাকা হেসে উঠে গিয়ে ঢকঢক করে খেয়ে ফেলল দুধটা। মুখ মুছলো মেহেরুন্নেসার আচলে। কোমর জড়িয়ে ধরে আরো ঘনিষ্ঠ হলো তার সাথে। বাইজিদ এর স্পর্শে যেন মোমের মতন গলে যেতে লাগলো মেহেরুন্নেসা।
অনুভব করলো পিঠ ঠেকেছে বিছানায়। খোঁচা খোঁচা দাড়ি ঘাড় ছুয়ে গেলো গভীর ভাবে। সুঠাম দেহের তলায় চাপা পড়লো তার মেদহীন চিকন দেহ। বাইজিদ এর বেসামাল স্পর্শ ছুঁয়ে যায় মেহেরুন্নেসার শরীরের ভাজ। হঠাৎ কেমন চোখ জোড়া বুজে আসে বাইজিদ এর। মেহেরুন্নেসার চুলের ঘ্রাণ গাঢ় করে নিয়ে বলল
“বললে না তো, মোহরানা কি চাই”
“উত্তরের প্রাসাদের দখলদারি চাই, দেবেন?”
বাইজিদ তখন স্ত্রীর ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে উষ্ণ নিশ্বাস ছড়াতে ব্যাস্ত। হুট করে থেমে গেলো সে। মাথাটাও কেমন ঘুরছে। আদৌ সত্যি শুনলো নাকি ভুল শুনলো টের পায় না। হাতে ভর করে মেহেরুন্নেসার মুখ বরাবর তাকায়। মেহেরুন্নেসার মুখটাও কেমন ঝাপসা লাগছে। আলগোছে অধরে অধর মেলালো আবার।
ঈদ কাটানো শেষ হলে আবার নিয়মিত হইও কেমন 😌
আর লেখাটা কেমন হলো বলিও ☺️🫶। এটাতে কিন্তু ৩k পূরণ করতেই হবে। আমি অসুস্থ হয়েও লিখি তোমাদের জন্য। রিয়্যাক্ট পূরণ করে দাও, কালই দিশে দিব পরবর্তী পর্ব।
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৬ এর প্রথমাংশ
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৯
-
নূর এ সাহাবাদ গল্পের লিংক
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৬(প্রথমাংশ +শেষাংশ)
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৯
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩
-
খাঁচায় বন্দী ফুল ৪০ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১১