Golpo romantic golpo সীমান্তরেখা

সীমান্তরেখা পর্ব ৩২ [স্পেশাল পর্ব]


লেখনীতে— #ঝিলিক_মল্লিক

পর্ব_৩২ [স্পেশাল পর্ব]

[কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।]

“The haor sail”
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং সুন্দর হাউসবোট। এটি সচারাচর রাতে চলাচল করে না। তবে কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনার কারণে এবারের ট্রিপের শুরুয়াত হচ্ছে রাতের বেলা।

ঠিক রাত নয়টা নাগাদ যাত্রা শুরু করেছে হাউসবোটটি। এরইমধ্যে ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে কোথাও নোঙর ফেলবে বলে জানানো হয়েছে।

হাউসবোটের রুফটপ, অর্থাৎ যেটাকে ছাঁদ বা ডেকি বলা হয়; সেখানকার পরিবেশটা ভীষণ সুন্দর। লবিটাও বেশ মনোরম। সেখানে বসে নিরিবিলি গ্রুপ-আড্ডা দেওয়া যাবে।
আজ রাতের খাবারে ছিল ছোট মাছ ভূনা, হাঁসের মাংস ভূনা, গরম গরম ধোঁয়া ওঠা মিহিদানা চাউলের সাদা ভাত, ছয় পদের ভর্তা, ঘন ডাল, দুই রকমের সবজি, সালাদ, ফিরনি আর কোল্ড-ড্রিংকস।

রাতের খাবারের আয়োজন করা হলো দশটার দিকে। সেই জ্বরজারির পর থেকে আকসার মুখে রুচি নেই। তেমন কিছুই খেতে পারে না। তাই এক চামচ সাদা ভাতের সাথে চার পদের ভর্তা মিশিয়ে আর এক পিস হাঁসের মাংস নিয়ে খেলো ও। বাকি খাবারটুকু তাহসিনের পাতে উঠিয়ে দিলো৷ ছেলেটা আবার খেতে বড্ড ভালোবাসে।

আকসা তাহসিন আর মিহির সাথে এক টেবিলে বসে খাবারের পাট চুকিয়ে নিচ্ছে। পাশেরই আরেকটা টেবিলে মেজবাহ, জেমি, আফসান আর রিমু বসেছে খাবার খাওয়ার জন্য। মেজবাহ খেতে খেতে বোন-দুলাভাইয়ের সাথে কথা বলতে ব্যস্ত। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি। বোঝা যাচ্ছে, ট্যুরটা বেশ ভালোই উপভোগ করছে লোকটা। মেজবাহ বোধহয় ট্যুর অনেক পছন্দ করে। একথা আকসা সেদিনই বুঝেছে, যেদিন মেজবাহ ওকে বলেছিল, ‘তোমার জন্য যেই বয়সে আমার ট্যুর দেওয়ার কথা, সেই বয়সে মাইলের পর মাইল পথ দৌড়াতে হয়েছে।”

আকসা এই ভেবে নিজেকেই দোষী করলো যে, লোকটা ওকে আঘাত করে, ওকে কষ্ট দিয়ে দিব্যি ভ্রমণ উপভোগ করছে। এদিকে আকসা তার জন্য দুঃখে-কষ্টে জর্জরিত হয়ে ট্যুরটা মাটি করছে। এর কোনো মানে হয়! আকসা মনে মনে দৃঢ় প্রত্যয়ে ঠিক করলো, মেজবাহ’র জন্য এই সুন্দর মুহূর্তগুলো উপভোগ করা থেকে বিরত থাকবে না ও। মুখে রুচি ছিল না বলে ফিরনি আর কোল্ড ড্রিংকস খেতে ইচ্ছা করছিল না ওর। তবে এবার স্ব-উদ্যোগে বোটের সার্ভ করার দায়িত্বে থাকা ছেলেটাকে ডেকে ফিরনি আর কোল্ডড্রিংকস নিলো ও। সবার সাথে বেশ আমোদ-ফূর্তি করেই খাবারের পাট চুকালো। খাওয়ার মাঝে অবশ্য আড়ালে একবার মেজবাহ’র দিকে তাকিয়েছিল। মেজবাহ নিজের কাজে ব্যস্ত। একবারের জন্য ফিরেও তাকায়নি ওর দিকে৷
.
.
রাত তখন দশটা সাতচল্লিশ। রাত্রিবেলা বলে হাউসবোট বেশ ধীরে চলছে। হাওরের গভীরে প্রবেশ করেছে সবে। ডেকে আর লবিতে গান-বাজনার আয়োজন চলছে। এক গ্রুপে চারজন ছেলেবন্ধু এসেছে। তারা নিচের লবিতে গিটার বাজিয়ে গান গাইছে। নিরব-নির্ঝুম হাওরের মাঝে সেই গানের সুর তালে তাল মিলিয়ে চারিপাশে ছড়িয়ে পরছে৷ এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। ডেকেও তখন মোটামুটি ত্রিশ-চল্লিশের মতো মানুষ উপস্থিত রয়েছে। এখানে সবাই গল্প-আড্ডা দিচ্ছে। একটা ছেলে এসেছে তার ভাই-ভাবীর সাথে। বছর সতেরো বয়স হবে আনুমানিক। ছেলেটার হাতে গিটার। দেখে বোঝা যাচ্ছে, সদ্য শিখছে। বাজাতে পারে না সেভাবে। গিটার নিয়ে বসে তাঁরে টুংটাং অদ্ভুত এবং কর্কশ এক আওয়াজ তৈরি করছে।

আফসান হঠাৎ আড্ডার মাঝে বলে বসলো, “বর্তমানে লবির পরিবেশটা চমৎকার। আর এখানকার এনভায়রনমেন্ট খুবই বোরিং। তারওপর ওদিকে দেখো। বাচ্চা ছেলেটা গিটার বাজাতে পারে না। নিছক চেষ্টা করে বিকট আওয়াজ বাড়াচ্ছে।”

সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে ছেলেটাকে দেখতে ব্যস্ত হলো। আকসা পাশের টেবিলে বসে ছিল মিহির সাথে। ও দেখলো, ছেলেটা আসলে কাউকে বিরক্ত করার জন্য এমন করছে না। সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে ভালোভাবে গিটার বাজানোর। তবে পারছে না। বড্ড অসহায় মনে হচ্ছে ছেলেটাকে৷ চুপসে যাওয়া মুখ দেখলেই বোঝা যায়।

আফসান হঠাৎ কি মনে করে যেন বললো, “শালাবাবু তুমি তো মারাত্মক ভালো গিটার বাজাতে পারো। আর তোমার গানের গলাও দারুণ। দাঁড়াও আসছি!”

মেজবাহকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই উঠে গেল আফসান। সেই ছেলেটার কাছে এগিয়ে গিয়ে কি কি জানি বললো ওকে। বোটের অপর প্রান্ত থেকে স্পষ্ট বোঝা গেল না। পরক্ষণেই দেখা গেল, আফসান সেই ছেলেটার গিটার নিয়ে আসছে এদিকে। সাথে ছেলেটাও আছে। ওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি।
আফসান এগিয়ে এসে কোনোকিছু না বলেকয়ে সোজা গিটারখানা মেজবাহ’র হাতে ধরিয়ে দিলো৷ মেজবাহ কিছু মূহুর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলো। আফসান ওকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে বললো, “এভাবে তাকিয়ে না থেকে গিটার বাজাও শালাবাবু। একটা গান ধরো তো৷ এই বোরিং মোমেন্টে তোমার গান শুনে একটু মন ঠান্ডা করি।”

মেজবাহ গম্ভীর গলায় বললো, “এখন মুড নেই দুলাভাই। আপনার শুনতে মন চাইলে আপনি গান।”

মেজবাহ একপ্রকার উঠে চলেই যাচ্ছিল প্রায়। আফসান ওকে জোরপূর্বক আঁটকে দিয়ে বললো, “আরে আরে! কোথায় যাচ্ছো? এই সুন্দর মোমেন্টটা নষ্ট কোরো না। দেখো, সবাই তোমার গান শোনার জন্যই বসে আছে। কি তোমরা শুনতে চাও না?”

আফসান মিহিদের উদ্দেশ্যে প্রশ্নটা করে। মিহিরা সামনে-পেছনে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। অগত্যা মেজবাহকে গান গাওয়ার জন্য বসতে হলো। গিটারের মালিক ছেলেটার নাম নিবিড়৷ নিবিড় বসলো মেজবাহ’র গিটার বাজানোর ধরন লক্ষ্য করতে। দমকা হাওয়ার সাথে মেজবাহ গিটারে দক্ষ হাতের আঙুল চালিয়ে চোখ বুঁজে গাইতে শুরু করলো —

Jhuki Teri Palko Mein
Mil Jaaye Mujhe Panah
Palke Ghire Aansu Bhari
Reh Jaaye Mere Nishan’

Tute Dil Ki Mat Kar
Tu Fikar Mere Hamnawa
Pyaar Du Tujhko Is Kadar
Reh Jaaye Mere Nishaan

Mere Nishaan..Mere Nishaan
Mere Nishaan..Mere Nishaan
Mere Nishaan..aan..aaann…
mere nishaan.. mere nishaan..

khaak me mil jau mai
jaise ke ek lamhaa
Aa lagja seene se
banja mera rehnuma

Dekhta hu sapne tere
sunle meri jaane jaa..
khyaab ye sach hojaye
agar khuda ho meherbaa

Mere Nishaan..mere nishaan
Mere Nishaan..mere nishaan
Mere Nishaan.. mere nishaan
mere nishaan.. mere nishaan..

Na ra na ra ne ne ra na
na ra na ra na nana
nara nara nara nara
nare ne…

মেজবাহ থামলো। আর গাইবে না ও। সবকিছুই ওর মুডের ওপর ডিপেন্ট করে। এটুকু গাওয়ার মুড ছিল, শ্রেফ এতটুকুই গেয়েছে৷ আর কেউ জোর করে কোনোভাবেই ওকে দিয়ে গাওয়াতে পারবে না। গানটা মেজবাহ’র বেশ পছন্দের। ইন্ট্রোভার্ট মেজবাহ একথা আজ অবধি কাউকে বলেনি। তবে ক্যাডেট কলেজ লাইফ থেকে বেশ কয়েকবার গেয়েছে এই গান। প্রফেশনাল লাইফের পর এই প্রথম।

সবাই মেজবাহ’র গানের গলার বেশ প্রশংসা করলো। আকসা পাশের টেবিলে বসে আড়চোখে দেখছিল সবকিছু। ভেতরে ভেতরে আগ্নেয়গিরির আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে ওর। লোকটা কত আমোদে আছে! আর ও! হাউসবোটের অপর প্রান্তে কিছু মেয়েকে ‘ইনিবিনি টাপাটিনি’ গানে নৃত্য করতে দেখে হঠাৎ ওর একটা কাজ করার প্রবল ইচ্ছা জাগলো এই মুহূর্তে। মনে মনে কিছু একটা ভেবে পৈশাচিক আনন্দের হাসি হাসলো৷ মিহির কানে কানে কিছু একটা বলতেই মিহি রিমুকে নিয়ে ডেকের নিচে নেমে গেল৷
.
.
মিহি পাঁচ মিনিটের মধ্যে ছাঁদে আসলো আবার। ওর হাতে দু’টো ঘুঙুর। মেজবাহ ফোনে জরুরি কথা বলছিল সম্ভবত। মিহির হাত থেকে আকসাকে ঘুঙুর নিতে দেখে কথা থামিয়ে কঠোর দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে। আকসা না তাকিয়েও বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছে, মেজবাহ ওর দিকে কঠিন দৃষ্টি ফেলে তাকিয়ে আছে। তবে আকসা তোয়াক্কা করলো না৷ ও উঠে সবার মাঝখানে দাঁড়িয়ে একপ্রকার ঘোষণা দিলো, “আসুন আপনাদের এন্টারটেইন করি। আজ আমি এখানে নাচবো।”

‘এন্টারটেইন’ শব্দটা শুনতেই কান ঝাঁঝাঁ করে উঠলো মেজবাহ’র। হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো, এখানে বেশ ভালোই মানুষ। ওর বোন আর দুলাভাই কিছুক্ষণ আগেই ঘুমানোর উদ্দেশ্যে নিচে তাদের রুমে চলে গেছে। সবাই খোলা ডেকে বসে চারপাশে হাওরের দৃশ্য উপভোগ করতে ব্যস্ত ছিল এতোক্ষণ। আকসার জোরে গলায় বলা কথা শুনে এখন ওর দিকে মনোযোগ দিয়েছে। পুরুষের সংখ্যা নিছক কম নয়। পনেরো-বিশেক তো হবেই। সবার বয়স কমবেশি পনেরো থেকে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশের আশেপাশে। সবাই কেমন এক হাস্যোজ্জ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে আকসাকে। সকলে ওর নাচ দেখার জন্যই নড়েচড়ে বসলো। আকসা ঘুঙুর দু’টো পরলো দুই পায়ে। হঠাৎ কি মনে করে ঘুঙুর খুলে ফেললো। এরপর খোঁপা করে রাখা চুল খুলে পিঠে ছড়িয়ে দিয়ে বললো, “ট্রেডিশনাল নয়। আইটেম সং-এ নাচবো। আপনাদের কোনো আপত্তি নেই তো?”

আকসা ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে সবাইকে জিজ্ঞাসা করলো৷ সবাই আপত্তি করা তো দূর, আরো উৎসাহ দিলো৷ বিশেষত উপস্থিত ছেলেরা৷ ওদের আর পায় কে! ফ্রি-তে আইটেম গানে নাচ দেখবে, তা-ও আবার আকসার মতো একজন চোখ ধাঁধানো সুন্দরীর! কেউ কি আর হাতছাড়া করে?

আকসা আড়চোখে একবার মেজবাহকে দেখলো৷ মেজবাহ পায়ের ওপর পা তুলে টেবিলে মুষ্টিবদ্ধ হাত রেখে বসে ওর দিকেই কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে৷ আকসা পরনের আনারকলির ওড়না সবার সামনেই খুলে আড়াআড়ি বুক থেকে টেনে কোমরের কাছে গুঁজে সেখানে ঝুলিয়ে নিলো। ডেকে একটা ছোটখাটো বক্স ছিল। যেটাতে মধ্যম পর্যায়ের সাউন্ড হয়। তাহসিনকে ইশারা করে সেটা চালু করতে বললো। ভাবী-ভক্ত তাহসিন ভাবীর ইশারা পেয়ে চট করে বক্সে গান চালু করে দিলো। গান বাজতে শুরু করলো।

bicchu re ye naina
Badi zeherili aankh maare
Kamsi kamariya saali
Ik tumke se lakh maare..

মেজবাহ চোয়াল ক্রমশই শক্ত হয়ে আসছে। হাতের মুঠো আরো শক্তিশালী হচ্ছে। ও মুষ্টিবদ্ধ হাত টেবিলে চেপে ধরে রেখেছে। অপর হাত ঠোঁটের ওপরে। নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে৷ আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত লাভার ন্যায় দৃষ্টিতে আকসাকে দেখছে। কেমনভাবে নাচছে এমন ভরা সভায়! হাত দুলিয়ে, কোমর বাঁকিয়ে.. উফ! ভাবতে পারছে না মেজবাহ। মাথার রগ সব রাগে ছিঁড়ে-ফেরে যাবে বোধহয়! বহুকষ্টে নিজেকে কন্ট্রোল করছে।

Aaayi..chikni chameli
Chup ke akeli
Phawa chadhake aayi
Aaayi..chikni chameli
Chup ke akeli
Phawa chadhake aayi..h

আকসা গানের ঠিক এই সময়ে নাচতে নাচতে কয়েকজন গ্রুপ করে বসা ছেলেদের একেবারে সামনে গিয়ে কোমর দুলাতে লাগলো। মেজবাহ’র আর সহ্য হলো না৷ টেবিলে বা’রি মেরে উঠে দাঁড়ালো ও। এতোটাই জোরে শব্দ হলো যে, তাহসিন ভয় পেয়ে গান বন্ধ করে দিলো৷ আকসা শব্দ শুনে পেছনে ঘুরে তাকাতেই দেখলো, মেজবাহ এলোমেলো, বেপরোয়াভাবে এগিয়ে আসছে ওর দিকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেজবাহ ওকে একহাতে টান মেরে কাছে নিয়ে আসলো। এরপর বিনা কিছু বলেকয়ে সোজা কাঁধে তুলে নিলো৷
আকসা যে কিছু বলবে, সেই সুযোগও পেল না৷ বলা চলে, মেজবাহ ওকে সুযোগ দিলো না৷ কাঁধে উঠিয়ে ডেকের সিঁড়ির দিকে এগোলো। যাওয়ার সময়ে মিহি আর তাহসিনের উদ্দেশ্যে হুমকির সুরে বললো, “অতি ভাবী-ভক্তি নাহ? তোদের দু’টোকে পরে দেখছি।”

ওরা দু’জন ভয়ে গুটিসুটি মেরে গেল।
.
.
আকসা মেজবাহ’র কাঁধে পিঠে অনবরত কিল-ঘুষি মারছে। বারবার বলছে, “ছাড়ুন মেজবাহ! কি করছেন! মানুষ দেখবে।”

যতোই আকসার মুখের বুলি বাড়ছে, ততো যেন মেজবাহ’র হাতের বাঁধন শক্ত হচ্ছে। শরীরের হাড়-গোড়ে প্রচন্ড ব্যাথা পাচ্ছে আকসা৷ মেজবাহ’কে কিল-ঘুষি মেরেও কাজ হচ্ছে না। মেজবাহ বেপরোয়া পা চালিয়ে ওকে হাউসবোটে নিজেদের জন্য বরাদ্দকৃত রুমে জোরপূর্বক নিয়ে আসলো।

এনে সোজা বিছানার ওপরে একপ্রকার ছুঁড়ে ফেললো। আকসার হাতের মুঠোয় তখন ওর ঘুঙুর দু’টো ছিল। সেটা দেখে হাত থেকে নিয়ে এক টানে ছুঁড়ে নিচে ফেললো মেজবাহ। সব ঘুঙুরু ভেঙেচুরে চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পরলো। শব্দের তোড়ে আকসা চোখ বুঁজে দুই হাত কানে চেপে ধরে বসে রইলো।

মেজবাহ এখনো চেষ্টা চালাচ্ছে নিজের রাগটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার। কোনো অঘটন না ঘটুক। কিন্তু আকসা ওর রাগ আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে দিলো না। ও বিছানার ওপর থেকে বেশ আহ্লাদের সহিত বললো, “এভাবে টেনে নিয়ে আসলেন কেন? দেখলেন তো, নাচছিলাম। নাচটা শেষ করতে পারলাম না, ইশশ!”

কথাটা বলামাত্র মেজবাহ দরজার থামে একটা ঘুষি মারতেই লোহার সাথে হাতে আঘাত লেগে কেটে গিয়ে সেখান থেকে কলকলিয়ে রক্ত গড়িয়ে পরতে লাগলো। আকসা হতভম্ব হলো। ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে রইলো মেজবাহ’র রাগে লাল হয়ে যাওয়া মুখের দিকে। এত রাগ দেখেও আকসার ভেতরকার উচ্ছৃঙ্খল নারী-সত্ত্বা দমন হলো না। ও মেজবাহকে শুনিয়ে বিরবির করে গাইতে লাগলো— “হায়ে জাঙ্গাল মে আজ মাঙ্গাল করুঙ্গি ভূখে শেরোঁ সে খেলুঙ্গি ম্যায়
মকখন জ্যায়সি হাতেলি পে চলকে
আঙ্গারে লে লুঙ্গি ম্যায়। হ্যায় জান লেভা.. ”

আকসা আর বলতে পারলো না। তার আগেই মেজবাহ চট করে ঘুরে এগিয়ে এসে ওর টুঁটি চেপে ধরলো। দাঁতে দাঁত পিষে বললো, “খুন করে ফেলবো! একটা সাউন্ডও না! একদম চুপ!”

তবে আকসা তো চুপ হওয়ার পাত্রী নয়। ও চড়া গলায় বললো, “কেন চুপ করবো? আপনি আমাকে ওখান থেকে কিডন্যাপারের মতো তুলে নিয়ে আসলেন কেন? নাচটাও শেষ করতে দিলেন না। আমার শখটা..”

“ভরা সভায়, অতগুলো ছেলের মধ্যে কোমর দুলিয়ে, শরীর দেখিয়ে নাচ আবার শখ?”

আকসার হাতের দুই পাশে হাত ঠেকিয়ে চোয়াল শক্ত কোরে প্রশ্ন করে মেজবাহ। আকসা খুব সরল হওয়ার ভান ধরে বলে, “নিজে ফূর্তি করবেন৷ অথচ আমি নাচলেই সমস্যা?”

“হ্যাঁ সমস্যা। খুব বেশি সমস্যা। কেমন সমস্যা জানিস? এইযে দেখ, এখানে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে৷ রক্ত গরম হয়ে যায়। এরপর থেকে কখনো, এক সেকেন্ডের জন্যও বাইরে কোথাও এভাবে নাচ-গান করতে দেখলে জাস্ট খুন করে ফেলবো!”

আকসা জেদ ধরে বললো, “এখনই করুন! সমস্যা কোথায়? আপনার ইচ্ছামাফিক চলতে পারবো না আমি। আগেই বলেছি, আমার ওপর কোনো অধিকার খাটানোর চেষ্টা করবেন না। সরুন তো৷ আমার নাচটা কমপ্লিট হলো না৷ যাই গিয়ে কমপ্লিট করে আসি।”

মেজবাহকে পাশ কাটিয়ে বিছানা থেকে ওঠার চেষ্টা করতেই মেজবাহ ওকে এবার চেপে ধরলো বিছানার সাথে। একেবারে দাবিয়ে ফেলে পারলে৷
.
.
বাইরে তখন মেঘলা ঘুটঘুটে আকাশ। গুড়ুম গুড়ুম মেঘের আওয়াজ। বেশ ভালোই বৃষ্টি পরছে। রুমের ব্যালকনির সফেদ পর্দা দমকা হাওয়ায় দুলছে। ঘরটা অন্ধকার বলা চলে। আবছা আলো আছে। মেজবাহ পরনের শার্ট খুলে ফেলেছে এক টানে। বোতামগুলো বোধহয় ছিঁড়েই গেছে। মেজবাহ’র এমন রাগ দেখে আকসা ঢোক গিললো। মেজবাহ ওর হাতের বাহু দুই হাতে শক্ত করে চেপে ধরে ওর মুখের দিকে অগ্নিস্নাত দৃষ্টিতে চেয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বললো, “তোকে ডিভোর্স দেবো আমি। তোর মতো মেয়ের সাথে কোনো সম্পর্ক রাখবো না।”

“সম্পর্ক ছিল কবে মেজবাহ?”

আকসাও দমে গেল না। পাল্টা প্রশ্ন করলো জেদের বশে। মেজবাহ পুনরায় একই উত্তপ্ত আওয়াজে বললো, “নামমাত্র যেটুকু ছিল, সেটুকুও রাখবো না। এখান থেকে ফিরেই ডিভোর্স। আই ডোন্ট ওয়ান্ট আ গার্ল লাইক ইউ ইন মাই লাইফ।”

আকসা মনে মনে ভীষণ খুশি-ই হলো বৈকি। ও তো এটাই চাইছিল। চাইছিল, মেজবাহ স্বেচ্ছায় ওকে ডিভোর্স দিক। আকসা চরম উৎসাহের সহিত বললো, “ঠিক আছে। তাহলে তালাক-ই সই।”

আবছা আঁধারেও আকসার উচ্ছ্বসিত মুখটা দেখতে পেল মেজবাহ। হঠাৎ ওর মুখের রঙ বদলে গেল৷ যেন রাগটা কমার বদলে আরো বেশি বাড়লো এই মুহূর্তে। আকসা বললো, “তবে আপনার কিন্তু আমার ঘুঙুর ভেঙে ফেলা উচিত হয়নি। এতোগুলো টাকার জিনিস।”

“কিনে দেবো আবার।”

“হুঁ?”

আকসা যেন চমকালো। মেজবাহ’র হাবভাব বুঝতে ও পুনরায় বললো, “আমার নাচটা কেমন ছিল?”

“দারুণ।”

মেজবাহ’র মুখ থেকে এমন জবাব ঘুণাক্ষরেও আশা করেনি আকসা৷ অবাক না হয়ে পারছে না ও। আবারও বলে, “আর কোমর দোলানো?”

“ধনুকের মতো। ধনুক ছুঁড়লে যেমন লাগে, এক্সাক্টলি লাইক দ্যাট।”

সোজাসাপ্টা শান্ত জবাব৷ তবে আকসার মন অশান্ত হলো। মেজবাহ’র কথার সুর হঠাৎ বদলে গেছে৷ আকসার নিকট সুবিধের ঠেকলো না৷ ও দ্রুত মেজবাহ’র কাছ থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করতেই মেজবাহ ওকে জোরপূর্বক নিজের শরীরের নিচে চেপে ধরে রাখলো। হাত বাড়িয়ে একটা বালিশ টেনে এনে আকসার মাথার নিচে রাখতে রাখতে গম্ভীর স্বরে বললো, “এটা থাকলে খুব বেশি হার্ড মনে হবে না৷ কষ্ট কম হবে।”

“হুঁ?!”

আকসা চমকে উঠলো। এবার আতঙ্কিত হয়ে ওঠার চেষ্টা করতেই মেজবাহ ওর কোমর পেঁচিয়ে ধরে কানের নিকট মুখ এগিয়ে সফট ভয়েসে বললো, “শুধু বাইরের মানুষদের নেচে কোমর দেখালে হবে? আমিও একটু দেখি, পার্সোনালি।”

‘পার্সোনালি’ শব্দটা শুনে আকসার গায়ে কাঁটা দিলো। ও ভড়কে গিয়ে বললো, “নাহ৷ কোনো প্রয়োজন নেই। কিছু দেখাতে চাই না৷ কিছুই না।”

“তুমি না দেখালেও আমি তো দেখবো৷ ক্যান ইউ স্টপ মি? হুহ?”

মেজবাহ’র হাস্কি ভয়েস শুনে আকসা যেন শরীরে শক্তি পেল না আর। মেজবাহ তৎক্ষনাৎ ওর গ্রীবায় খোঁচা দাঁড়িযুক্ত মুখ গুঁজলো৷ নরম, ভেজা ঠোঁটের স্পর্শে আকসার কাঁধ স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেল। ওর কাঁধের তিলগুলোকে কামড়ে লাল করে ফেললো মেজবাহ। বাইরের দমকা হাওয়ার সাথে সাথে আকসার বুকের মাঝে প্রবল ঝড় উঠলো৷ ঝিরিঝিরি বৃষ্টির শব্দের সাথে ওর মুখের ব্যাথাতুর আওয়াজ মিলিয়ে গেল। মেজবাহ’র পিঠে একের পর এক খামচি বসাতে লাগলো৷ ও কোনোরকমে ঢোক গিলে আওয়াজ বের করলো, “মেজবাহ, ডিভোর্স।”

“হুঁ দেবো।”

গলা থেকে মুখ না সরিয়েই নিজ কাজে ব্যস্ত থেকে জবাবটা দিলো মেজবাহ৷ কিছু সময় পর মুখ উঠিয়ে আচনক আকসাকে জিজ্ঞাসা করলো, ”ক্যান আই গিভ ইউ আ হান্ড্রেড জেন্টল কিস অন ইয়োর লিপস?”

আকসা সম্মোহিত। মেজবাহ’র এই রূপ ওকে জাদু করে প্রতিবার৷ ও মাথা না নাড়িয়েও সম্মতি দিলো যেন। মেজবাহ বোধহয় অপেক্ষাও করতো না৷ এটা শুধুই ফর্মালিটির জন্য ছিল৷ ও ধীরে এগোলো আকসার ঠোঁটের দিকে। আকসার গলায় এক হাত, আর অপর হাত মুখে চেপে ধরে একের পর এক চুমু খেতে লাগলো। প্রথম দিকের চুমুগুলো হালকা ছিল। আকসাও মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় কিঞ্চিৎ সায় দিয়ে যাচ্ছিল৷ হঠাৎ চুমুগুলো গাঢ় হলো৷ কামুকতায় ভরপুর। আকসার ঠোঁটে চুমু না খেয়ে বরং যেন ওর ঠোঁট খেতে ব্যস্ত হলো মেজবাহ। চুমুর গতি ধীরে ধীরে বাড়লো। সাথে গাঢ়ত্বও। আকসা ব্যাথায় কুঁকিয়ে উঠলো। তবু মেজবাহ ছাড়লো না ওকে৷ একবার শুধু মুখ উঠিয়ে ঠোঁটের কোণে এক চমৎকার শয়তানিতে ভরপুর ভদ্র-শয়তানের ন্যায় হাসি ফুটিয়ে তুলে বললো, “উপস! স্যরি সুইটহার্ট! অল অব দিজ ওয়ার ডিপ কিসেস। ‘ডিপ লিপ কিস।’ ডু ইউ ওয়ান্ট মোর?”

শেষোক্ত প্রশ্নটা কর্ণকুহরে প্রবেশ করামাত্র আকসা সিটিয়ে গেল। বিছানার চাদর খামচে ধরলো৷ অপরদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। বাইরে মুষুলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। সেই বৃষ্টির ঝাঁঝ ব্যালকনি হতে ঘরের মধ্যে টুকটাক প্রবেশ করছে৷ আকসা আর মেজবাহকেও ছুঁয়ে দিয়ে যাচ্ছে। মেজবাহ আকসার সাথে ঘাড় ঘুরিয়ে ব্যালকনির দিকে তাকালো। বৃষ্টি দেখিয়ে আকসাকে উদ্দেশ্য করে বললো, “দিস রেইন ইজ আ উইথনেস টু আওয়ার ইন্টিমেসি। আই ডোন্ট ওয়ান্ট ইভেন দ্য রেইন টু সি এভরি কার্ভ অব ইয়োর বডি।”

চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply