শেষপাতায়সূচনা [৫৮.২]
সাদিয়াসুলতানামনি
পূর্ণতা ছেলেকে টানতে টানতে আরিয়ানের ঘরে থেকে নিয়ে যায় নিজের সাথে। অসভ্য লোকটা ছেলেটাকে অকালেই পাকিয়ে দিচ্ছে। জাওয়াদ বউয়ের রাগ দেখে হাতের ফুলগুলো বিছানায় ফেলেই ছুট লাগায় বউ-ছেলের পেছন পেছন। বেচারা যবে থেকে বউ-বাচ্চার খোঁজ পেয়েছে তবে থেকেই দৌড়াচ্ছে। এই দৌড় যে সহজে থামবার নয় তা সে বেশ ভালোই বুঝতে পারছে।
জাওয়াদকে ছুটতে দেখে টনি-জিনিয়া কিছুক্ষণ থম মেরে দাড়িয়ে থাকে। তারপর একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে হুট করেই দু’জনে একসাথে হেঁসে দেয়।
জিনিয়া হাতের থাকা ফুলের পাপড়িগুলো টনির দিকে ছুঁড়ে দিয়ে দুষ্ট হেঁসে গেয়ে ওঠে–
—তুমি দিও না গো,
বাসর ঘরের বাত্তি নিভাইয়া।
আমি বন্ধ ঘরে,
অন্ধকারে যাবো মরিয়া।
টনি জিনিয়া হঠাৎ এমন অদ্ভুত গান শুনে থতমত খেয়ে যায়। তবে সে যখন খেয়াল করে জিনিয়ার হাসিতে দুষ্টমির আভাস রয়েছে, সে তৎক্ষণাৎ নিজেকে সামলে নেয়। তারপর একপা একপা করে জিনিয়ার দিকে এগোতে এগোতে নিজের নিচের ঠোঁট কামড়ে গাইতে থাকে–
—তুমি ভয় কেনো পাও?
প্রাণ সজনী আমায় দেখিয়া।
তোমায় প্রেম সোহাগে রাখবো,
আমার বুকে জড়াইয়া।
টনির কাজে জিনিয়ার চোয়াল যেন আধা হাত পর্যন্ত ঝুলে পড়ে। সে সবসময় টনিকে নাস্তানাবুদ করলেও, টনি আজ প্রথমবারের মতো জিনিয়াকে ঘোল খাওয়ালো।
—ও বউ! শোনো না। সরি তো আমি। আর কখনো ছেলের সামনে বেফাঁস কথা বলবো না।
—মাম্মা, আমি ফুতবল কেলবো তো বাসল ঘলে। তুমি আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছো কেনো।
জাওয়াদ-তাজওয়াদ দুই বাপ-বেটাই পূর্ণতার পেছন পেছন ছুটতে ছুটতে কথাগুলো বলে। পূর্ণতা এবার আর নিজের রাগ সংবরণ করতে পারে না। তাজওয়াদের হাত ছেড়ে দিয়ে তাদের দু’জনের দিকে ফিরে রাগী গলায় বলল–
—আজ রাতে তোমাদের দু’জনকে যদি আমার রুমের আশেপাশেও দেখি, পিটিয়ে সুন্দরবন পাঠিয়ে দিবো। যেমন অসভ্য বাপ, তেমনই বানাচ্ছে ছেলেটাকে।
—সরি বউ।
—সলি মাম্মা।
পূর্ণতার দুই পুরুষই অপরাধীর ন্যায় মাথা নিচু করে ক্ষমা চায় তার কাছে। পূর্ণতা তাদের পাত্তাই দেয় না। সে জাওয়াদের কাছে তাজওয়াদকে ছেড়েই চলে যায় নিচে। দুই বাপ-বেটা গোবেচারার মতো মুখ করে তার প্রস্থান দেখে।
পূর্ণতা তাদের দৃষ্টি সীমার বাহিরে চলে যেতেই তাজওয়াদ নাক ফুলিয়ে তার পাপাকে বলে–
—সব তুমাল জন্য হয়েচে পাপা। তুমি আমাকে কেন বললে, বাসল ঘলে ফুতবল কেলে? তুমি যদি না বলতে তাহলে আমিও বাসলঘলে ফুতবল খেলাল বায়না ধলতাম না। আর মাম্মাও রাগ করত না। মাম্মা বুকে নিয়ে না গুম পালালে আমাল ঘুমই আসে না। একন কি হবে?
জাওয়াদ হা হয়ে যায় ছেলের কথা শুনে। বাহ রে! ভাই বাহ! এখন মা-ছেলে দুই জনই তার উপর রাগ ঝাড়ছে। জাওয়াদ মুখটা কিছুটা গম্ভীর করে নিয়ে বলল–
—পাপা তো পঁচা, তাহলে পাপা চলে যাই এখান থেকে। তাহলে তোমার মাম্মা আর তোমার সাথে রাগ করে থাকবে না।
তাজওয়াদ থমকে যায় তার পাপার কথা শুনে। তার তো মায়ের বুকে মাথা রেখে পাপার থেকে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমানোর বাজে অভ্যাস হয়ে গিয়েছে এই কয়েকটা মাসে। পাপা যদি চলে যায়, তাহলে তাঁকে গল্প শোনাবে কে? মাম্মার গল্প ইদানীং ভালো লাগে না তার। তাজওয়াদের পাপা ভীষণ সুন্দর সুন্দর গল্প শোনায় তাঁকে।
তাজওয়াদ ছুটে গিয়ে তার পাপার ডান হাঁটু জড়িয়ে ধরে, তারপর কাঁদো কাঁদো গলায় বলে–
—একন তুমিও তাজেল সাথে লাগ কলবে? তুমি জানো না, মাম্মাল বুকে মাথা দিয়ে তোমাল থেকে গল্প শুনতে শুনতে আমি গুমাই? মাম্মাও তাজেল সাথে লাগ কলে আছে, একন পাপাও লাগ কলছে। তাহলে কি তাজই পঁচা?
জাওয়াদ ছেলের সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসতেই, তাজওয়াদ দুই হাত দিয়ে ঝাপটে ধরে নিজের পাপাকে। জাওয়াদ ছেলেকে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরে বলে–
—কে বলেছে আমার তাজ পঁচা? আমার তাজ তো অনেক গুডবয়। বেস্ট সে।
—তুমিও বেস্ট পাপা। ইত্তুও পঁচা না তাজেল পাপা।
বাবা-ছেলেট মান অভিমান নিমিষেই মিটে যায়। তাজওয়াদ এবার তার পাপাকে বলে–
—পাপা, মাম্মা তো লাগ কলেছে আমাদেল সাতে। একন কি কলে লাগ ভাঙাবো তাল? আজ কি তাহলে মাম্মাল সাতে গুমাতে পালব না?
তারা দু’জনই টেনশনে পড়ে যায়, কিভাবে পূর্ণতার রাগ ভাঙিয়ে নিজেদের স্বস্তি ফেরাবে। বহু ভাবনা চিন্তার পর জাওয়াদ হঠাৎই বলে–
—পেয়েছি একটা আইডিয়া।
পাপার কথা শুনে তাজওয়াদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে খুশিতে। তারপর তারা দু’জন আলোচনা করতে থাকে কি করে নিজেদের সবচাইতে প্রিয় নারীটির রাগ ভাঙাবে।
—বাসরঘরে ঢোকার আগে চটপট টাকার লেনদেন শেষ করো তো ভাইয়া। অন্যথায় নো মানি, নো হানি। কম করে পঞ্চাশ হাজার দিবে। আমরা কতগুলো মানুষ, ভাগ বাটোয়ারায় নাহলে কম পড়বে।
আরিয়ানের একমাত্র আদরের বোন পূর্ণতাই কথাটি বলে তাঁকে। তার পেছনে অবশ্য অন্যান্য কাজিনরাও রয়েছে। কিন্তু সে সকলের নেতৃত্ব দিচ্ছে।
পূর্ণতার কথা শুনে আরিয়ানের তো মাথায় হাত। পঞ্চাশ হাজার টাকা এখন কোথা থেকে দিবে সে? এমনটা হবে জানলে সে আগেই টাকার ব্যবস্থা করে রাখত। আরিয়ান কিছুটা অনুনয় করে বলল–
—তুই আমার বোন হয়ে এমন বাঁশ দিতে পারলি? আমি এত রাতে পঞ্চাশ হাজার টাকা কি পাবো?
—কেন তুমি জানো না বুঝি, বাসর ঘরে ঢুকতে গেলে পকেট ঢিলা করতে হয়?
—জানি।কিন্তু আজ পরিস্থিতি তো ভিন্ন। আচ্ছা, আমি টাকাটা কাল দেই?
—তাহলে বাসরটাও তুমি কালই করো। আমি আজ ভাবীর সাথে থাকছি।
—এত জালিম হোস না বোন, একটু তো রহম কর ভাইয়া টার প্রতি।
গোবেচারার ন্যায় মুখ করে বলে আরিয়ান। পূর্ণতার এবার একটু দয়ামায়া হয় ভাইয়ের প্রতি। তাই সে টাকার এমাউন্ট কমিয়ে বলে–
—আচ্ছা যাও, ২৫ হাজার দাও। এর কম করতে বললে, আমার মেজাজ গরম হয়ে যাবে। তখন ৫০ দিলেও আজ তোমায় রুমে ঢুকতে দিবো না কিন্তু।
কি আর করার! বউ ছাড়া বাসর রাত, অকল্পনীয় বিষয়। আরিয়ান তার ওয়ালেট, পকেট কেচে-কুচে পঁচিশ হাজার টাকা দিয়ে ভাই-বোনদের বিদায় করে। টাকা নিয়ে পূর্ণতা প্রফুল্লচিত্তে জিনিয়ার জন্য বরাদ্দকৃত রুমটির দিকে যেতে থাকে সকলকে নিয়ে, কারণ সেখানেই আজ সে থাকবে বলে ঠিক করেছে। কিন্তু মাঝ পথে আরিয়ানের এক মামাতো বোন রূপা ছুটতে ছুটতে পূর্ণতার কাছে এসে বলে–
—পূর্ণতা আপু, শিগগির রুমে যাও। তাজওয়াদ পড়ে গিয়ে চোট পেয়েছে, এখন কাঁদছে তোমার জন্য।
ছেলে ব্যথা পেয়েছে শুনে পূর্ণতার দিনদুনিয়া ঘুরে ওঠে। সে একহাত দিয়ে শাড়ির কুঁচি চেপে ধরে ছুট লাগায় রুমের উদ্দেশ্যে। ছেলেটাকে বুকে না নেওয়া অব্দি তার শান্তি মিলবে না।
পূর্ণতা যেতেই রূপা তার ওড়নার নিচে লুকানো ফোনটা কানে চেপে ফিসফিসিয়ে বলে–
—জিজু, পূর্ণতা আপু রুমের দিকে ছুট লাগিয়েছে। আপনারা যে যার মতো পজিশন নিয়ে নেন।
—ওকে শালিকা। ধন্যবাদ তোমার সাহায্যের জন্য।
রূপা মুখ ভেঙচি দিয়ে বলে–
—শুকনো ধন্যবাদে পোষাবে না, ট্রিট লাগবে।
—আচ্ছা দিবো ইনশা আল্লাহ।
জাওয়াদ কলটা কেটে হুরতুর করে তাজওয়াদকে বেডের শুয়ে দিয়ে কাঁদতে বলে। তাজওয়াদও নিজের কাজে লেগে পড়ে।
পূর্ণতা রুমে এসে দেখে তাজওয়াদ বেডে শুয়ে শুয়ে কাঁদছে, আর জাওয়াদ তাকে শান্ত করানো প্রচেষ্টা করছে। পূর্ণতার বুকটা ধক করে ওঠে। সে ছুটে বেডে গিয়ে ছেলেকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে অস্থির গলায় বলল–
—আব্বু, কি হয়েছে বাবা? কোথায় ব্যথা পেয়েছো মা’কে বলো।
—পুক্কিতে ব্যতা পেয়েছি মাম্মা।
—এ্য্য্য্য্য?? কোথায় পেয়েছে বললে?
—পুক্কি মানে বাম্পে। আমি লাফাচ্ছিলাম, তখন হুত কলে পলে গিয়ে বাম্পে ব্যতা পেয়েছি।
অসহায়ের মতো মুখ বানিয়ে কথাটা বলে তাজওয়াদ। পূর্ণতা তাঁকে উপুড় করে তাজওয়াদের প্যান্টের রাবারে হাত দিয়ে বলে–
—দেখি বেশি ব্যথা পেয়েছো কিনা।
তাজওয়াদ হকচকিয়ে গিয়ে মায়ের কোল থেকে লাফ দিয়ে সরে যায়। তারপর আমতাআমতা করে বলে–
—আমি বলো হয়েছি না এখন, আমাল শলম কলে তো মাম্মা।
তাজওয়াদের লাফ দেওয়া দেখে পূর্ণতা অবাক হয়ে যায়। সেই সাথে তার সন্দেহ হতে থাকে, সে আসলেই ব্যথা পেয়েছে কিনা এই বিষয়ে। পূর্ণতা চোখ ছোট ছোট করে বলে–
—আজ সকালে নিজ হাতে ঘষে ঘষে গোসল করিয়ে দিলাম তোমাকে, তখন তোমার লজ্জা কই ছিলো? নাটক করা হচ্ছে আমার সাথে? অ্যাঁই ছেলে, সত্যি করে বলো তো, তুমি আসলেই ব্যথা পেয়েছো পড়ে গিয়ে? নাকি মিথ্যা বলছো?
তাজওয়াদ আজ অব্দি তার মা’কে কখনোই মিথ্যা বলেনি, পরিস্থিতির চাপে পড়ে আজই প্রথম বলছে। তাই ছেলেটা একটু ঘাবড়ে গিয়েছে। তারউপর পূর্ণতার এমন জেরায় আরো থতমত খেয়ে যায়। সে আমতাআমতা করতে করতে তার পাপার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চাহনিতে স্পষ্ট বুঝা যায়, পাপা আমাকে বাঁচাও।
জাওয়াদ এবার এগিয়ে এসে গম্ভীরমুখ বানিয়ে বলে–
—ছেলেটা ব্যথা পেয়েছে সেখানেও তোমার সন্দেহ হচ্ছে?
—হ্যাঁ, হচ্ছে। কারণ আপনার আর ওর হাবভাব একদম পাড়ার ছিঁচকে চোরদের মতো লাগছে বর্তমানে আমার।
কিহ্হ্হ্হ? শেষ অব্দি পাড়ার ছিঁচকে চোর? জাওয়াদের মন জাওয়াদকেই প্রশ্ন করে,
—তোর বউ তোকে আর কি কি উপাধি দিতে বাদ রেখেছে একটু বল তো আমায়?
জাওয়াদ এবার সত্যিকার্থে মুখটা গম্ভীর করে নেয়। মেয়েটা তার ও ছেলেটার একমাত্র দূর্বলতা দেখে এত ভাব নিচ্ছে। সে পূর্ণতার কোল থেকে আস্তে করে ছেলেকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে বেডের একপাশে গিয়ে শুয়ে পড়ে। তারপর সেভাবে থেকেই বলে–
—যাওয়ার সময় দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে যেও। আমি আর আমার ছেলে থাকতে পারব তোমাকে ছাড়া।
জাওয়াদের কথা শেষ হওয়ার আগেই তাজওয়াদ ছটফটিয়ে বলে–
—কিন্তু আমি তো মাম্মালে ছালা থাকতে পালব না পাপা।
জাওয়াদ ছেলেকে পূর্ণতার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে নিজে উল্টো পিঠ হয়ে শুয়ে বলে–
—তাহলে তুমিও চলে যাও তোমার মাম্মার কাছে। আমার কাউকে লাগবে না। আমি একাই থাকব।
পাপার কথা শুনে তাজওয়াদের এমনটা খারাপ হয়ে যায়। সে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল–
—মাম্মা, পাপাল মনতা স্যাড হয়ে গিয়েছে। একন কি কলবো?
পূর্ণতার বুক চিড়ে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। ছেলেটা আগে থেকেই নাটুকে ছিলো। তাজওয়াদ হওয়ার পূর্বে জাওয়াদের সাথে মাত্র তিনমাস সংসার করেছিল পূর্ণতা। তখন লোকটা এতটা নাটক বাজ ছিল না। কিন্তু ইদানীং সে টের পাচ্ছে, তার ছেলেটা এতটা নাটক বাজ কেন হয়েছে। একদম দেখতে তার মতো হলেও, তাজওয়াদের কথাবার্তা, চালচলন, স্বভাব ইত্যাদির বেশিরভাগই তার বাবার সাথে মিলে যায়।
পূর্ণতা উঠে গিয়ে দরজাটা আটকে দিয়ে আসে। তারপর কাবার্ড থেকে নাইট ড্রেস বের করে ওয়াশরুমে চলে যায় ফ্রেশ হতে। ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ শুনে জাওয়াদ চট করে পিঠ ঘুরিয়ে তাজওয়াদের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করে–
—তোমার মাম্মার হাবভাব দেখে কি মনে হলো? রাগ পড়েছে?
—পাপা, তুমি না মন খালাপ কলে একা একাই ঘুমাচ্চিলে?
—হ্যাঁ, কারণ যাতে তোমার মাম্মা আমাদের সাথে থাকতে রাজি হয়।
তাজওয়াদ চোখ ছোট ছোট করে বলে–
—নাতুকবাজ পাপা।
মাঝরাতে নিজের পাশের জায়গায় হাত রেখে জায়গাটা খালি পেলে জাওয়াদের ঘুমটা হালকা হয়ে যায়। ঘুমের ঘোরেই সে ভাবে, পূর্ণতা হয়ত ওয়াশরুমে গিয়েছে। তাই সে অর্ধচেতনায় থাকে, যাতে পূর্ণতা ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এসে শুতেই সে তাকে কোলবালিশের মতো জড়িয়ে ধরতে পারে।
কিন্তু অপেক্ষা করতে করতে সে আবারও ঘুমিয়ে পড়ে। তার ঘুমটা একাকীই ভেঙে যায় ভোর চারটার দিকে। তখনও নিজের পাশের জায়গা হাতড়িয়ে পূর্ণতাকে না পেলে, এবার সে শোয়া থেকে উঠেই বসে। বেডে বসেই ওয়াশরুমের দিকে তাকালে ওয়াশরুমের লাইট অফ দেখতে পায়। মনটা কেমন কেমন করে উঠলে সে দ্রুত বেড থেকে নেমে চপল পায়ে বেলকনির দিকে হাঁটে।
হ্যাঁ, এখানেই পায় সে তার প্রাণের একটি অংশকে। যেই অংশ টিকে ছাড়া সে নিজেকে কল্পনাও করতে ভয় পায়। পূর্ণতা বেলকনিতে থাকা কাউচের উপর বসে আছে। দৃষ্টি তার নিস্তব্ধ ও আলোহীন আকাশের দিকে। জাওয়াদ আস্তে করে হেঁটে গিয়ে তার সামনে ফ্লোরে গিয়ে বসে। তারপর নিজের মাথাটা তার কোলের উপর রাখে।
পূর্ণতা হঠাৎ এমনটা হওয়ায় একটুও চমকায় না। কারণ সে জাওয়াদের পায়ের শব্দ পেয়েছিল। জাওয়াদ হালকা স্বরে সুধায়–
—এতরাতে এখানে কি করছো জান? মন খারাপ?
পূর্ণতা জাওয়াদের ঘন চুলের ভাঁজে নিজের আঙুল গুঁজে দিয়ে আলতো হাতে বিলি কেটে দিতে থাকে। আরাম পেয়ে জাওয়াদের চোখ মুদে আসে। পূর্ণতা তার দৃষ্টি সামনে রেখেই স্বাভাবিকভাবেই বলে–
—উহুঁ। রাত্রি বিলাশ করছিলাম বলতে পারেন।
—একা একা? আমায় ডাকতে।
—টায়ার্ড ছিলেন আপনি। আর আমিও কিছুটা সময় একাকী কাটাতে চাচ্ছিলাম। একটা কথা জানেন, মাঝে মধ্যে নিজেকে কিছুটা সময় দেওয়া লাগে। নিজের পছন্দ-অপছন্দের মূল্যায়ন করা লাগে।
নিজের অনুভূতির দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত নিজেকেই নিতে হয়। মানুষ কষ্ট দিতেই পারে, কিন্তু সেই কষ্টকে কীভাবে সামলাব, কীভাবে আবার নিজেকে দাঁড় করাব সেই সিদ্ধান্তটা আমারই। কিছু বোঝাপড়া একা একাই করতে হয়। তাহলে আমরা নিজেকে ভালোবাসার আরো অনেক কারণ পাই। আমি নিজেই যদি নিজেকে ভালোবাসতে না পারি, তাহলে আপনাদের সকলের মাঝে নিজের ভালোবাসা বিলাবো কিভাবে? আমার কানাডার সাইকিয়াট্রিস্ট বলেছে এমনটা করতে। সপ্তাহে একদিন হলেও, নিজের জন্য যেন একটা সময় বের নিজের মতো ব্যয় করি।
জাওয়াদ মন দিয়ে পূর্ণতার কথাগুলো শুনে। এই সম্পর্কে সেও জানে। পূর্ণতাকে হারিয়ে একটা সময় সে ভয়াবহ ডিপ্রেশনে ভুগেছিল। তখন জিনিয়া আর মাহবুবের পীড়াপীড়িতে তাকেও একজনের থেকে কাউন্সিলিং নিতে হয়েছিল।
—আমার প্রেগ্ন্যাসির সাড়ে চার মাসের সময় আমি তাজের মুভমেন্ট হালকা হালকা করে টের পেয়েছিলাম। পাঁচ মাস শেষের দিকে ও রীতিমতো পেটে ঘুর্ণিঝড় তুলত। আমি যখন ওর নড়াচড়া আভাস পেয়েছিলাম, আমি চাইছিলাম আমার এই অনুভব টাকে আরো কারো সাথে শেয়ার করতে। এদিক-সেদিক কাউকে খুঁজতাম নিজের অনুভূতিটার কথা বলতে। কিন্তু… কিন্তু যেদিকেই তাকাতে নিজেকে সম্পূর্ণ একা পেতাম।
নিজেকে একা পেয়ে ভীষণ কষ্ট লাগল। মাঝে মধ্যে কষ্ট চেপে রাখতে না পেরে হাউমাউ করে কাঁদতাম। তখন আমার ছেলেটা মায়ের সঙ্গী হওয়ার চেষ্টা করত। হালকা করে লাথি দিয়ে যেন বুঝাতে চাইত, মা তুমি একা নও। আমি আছি তোমার জন্য।
নিজের একাকিত্বের জন্য আমি কখনো আপনাকে দোষী ভাবতাম না। কারণ আমি তো তখন জানতাম, আপনার জীবনে আমি ছিলাম এক অনাকাঙ্ক্ষিত মেহমান। আমার সেসব দিনগুলোর একাকিত্বের কারণ আমি। শুধুই আমি।
না আক্ষেপ, না বিষাদ। কোন প্রকার খারাপ লাগা ছাড়াই আর পাঁচটা সাধারণ কথার মতোই কথাগুলো বলে পূর্ণতা। তার মূলত পূর্বের দিনগুলো ভীষণ মনে পরছে আজ। আজ জাওয়াদ তার কাছে রয়েছে। জাওয়াদকে নিজের জন্য যতটা পাগল প্রেমিক হিসেবে কল্পনা করত পূর্ণতা, তার চেয়েও বহুগুণ পাগল আজ সে পূর্ণতার জন্য। পূর্ণতার কাছাকাছি থাকার জন্য, বা নিজেকে পূর্ণতার পাশে রাখার জন্য লোকটার কতই না প্রচেষ্টা।
আজ পূর্ণতার ভীষণ সুখ সুখ অনুভব হচ্ছে। সবসময় শুধু হারানো মেয়েটারও প্রাপ্তির ঝুলি ভারী হয়েছে। সংসার হয়েছে তার। সন্তান হয়েছে। প্রিয় পুরুষটির চোখে নিজের জন্য পাগলের মতো ভালোবাসা দেখে। আর কি চাই তার? ব্যস এইটুকুই তো ছিল তার চাওয়া। যা সে পেয়ে গিয়েছে।
—তাজের পাপা, শুনছেন? নাকি ঘুমিয়ে গিয়েছেন?
—ঘুমাই নি, বলো।
জাওয়াদের গলাটা কেমন ভারী ভারী ঠেকল পূর্ণতার কাছে।
—একটা শেষ জিনিস চাইব আপনার কাছে। দিবেন?
—শেষ বলছো কেনো? কি চাই শুধু একবার বলো। দুনিয়া ওলট-পালট করে হলেও তোমার পায়ের সামনে এনে রাখব।
—ফিল্মি ডায়লগ কম ছাড়েন বুড়ো। আমি অলরেডি বহু আগে থেকে আপনার উপর পটে বসে আছি। এসব ফ্লার্টিং আমার সামনে না করলেও চলবে।
— ফিল্মি ডায়লগ লাগছে না? জাওয়াদ শেখ তার কথা পূরণ করতে জানে। বলো কি লাগবে?
—একটা ওয়াদা লাগবে।
—কিসের ওয়াদা?
—মনে করেন, আমার যদি কখনো কিছু হয়ে যায় বা বড় কোন অসুখ ধরা পড়ে যার শেষ পরিণতি মৃত্যু, তাহলে আপনি ভেঙে পড়বেন না। নিজেকে শক্ত রেখে আমাদের সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করবেন। কথা দিন আমায়।
পূর্ণতার এহেন কথায় জাওয়াদ প্রচন্ড ক্ষেপে যায়। মাত্রই তারা সুখের দেখা পেলো। ভালো মতো সংসার শুরু করেছে শুক্রতে শুক্রতে আটদিন, এরই মাঝে আবারও ছেড়ে যাওয়ার কথা তুলছে এই নিষ্ঠুর রমণী। এবার যেন-তেন ছেড়ে যাওয়া না, চিরকালের জন্য বিদায় নেওয়ার কথা বলছে। সহ্য হয় এমন কথা? মেজাজ খারাপ হওয়া কি খুব বেশি অযৌক্তিক?
জাওয়াদ রেগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে বলল–
—পারব না আজাইরা কথা দিতে। তোমার রাত্রি বিলাশ তুমিই করো।
কথাটা বলেই সে রেগেমেগে সেখান থেকে চলে আসার জন্য উদ্যত হয় কিন্তু সে উঠে দাঁড়াতেই পূর্ণতা আবার তার হাত ধরে টান দিয়ে তাকে নিজের পাশে বসিয়ে দেয়। এরপর সে নিজে তার কোলে চড়ে বসে জাওয়াদের বুকে মাথা ঠেকায়। জাওয়াদকে আলিঙ্গন করার পরের মূহুর্তে পূর্ণতা টের পায়, লোকটা কাঁপছে ভীষণ ভাবে।
জাওয়াদ যে মাত্রাতিরিক্ত রেগে গিয়েছে তা বুঝতে সময় লাগে না পূর্ণতার। পূর্ণতা তাই তাকে আর না রাগিয়ে শান্ত করার প্রচেষ্টা করে। সে নিজ থেকে শক্ত করে জাওয়াদকে জড়িয়ে ধরে নিজের মাথাটা জাওয়াদের বুকের বাম পাশে ঠেসে ধরে রাখে। আর তার পিঠে আলতোভাবে হাত বুলাতে থাকে। প্রথম কিছু মিনিট জাওয়াদ রাগের কারণে না পূর্ণতাকে জড়িয়ে ধরে, আর নাই বা তাকে সরিয়ে দেয়।
জাওয়াদ নিতান্তই ঠান্ডা মাথার এক সাধাসিধা ভদ্রলোক। সে নিজের প্রিয় নারীদের কথায় যেমন নিজেকে শেষ করে দিতে পারে, আবার রাগ উঠলে কষ্ট দিতেও ভুলে না। পাঁচ বছর আগে মায়ের প্ররোচনায় জাওয়াদ এমনই বিশ্রীভাবে রেগে গিয়েছিল। যার ফল ভুগতে হয়েছে দীর্ঘ পাঁচটি বছর। আজও পূর্ণতার মুখে মৃত্যুর কথা শুনে ভীষণ রেগে গিয়েছে। কিন্তু পাঁচ বছর আগের মতো ভুল করেনি। হ্যাঁ, সে জানে একদিন সবাইকে বিদায় নিতে হবে। দেখা গেলো, সবার আগে তাঁকেই চলে যেতে হলো। তাই বলে সেই বিদায়ের তোরজোড় এখন থেকেই নিতে হবে এমন ঘটা করে? জাওয়াদ নিজের রাগকে কন্ট্রোল করতে চুপ করে বেশ কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকে।
আস্তে আস্তে জাওয়াদের শরীরের কাঁপুনি থেমে যেতে পূর্ণতা তার বুক থেকে মাথা তুলে তাকায়। আবছায়া সে দেখতে পায়, জাওয়াদের চোয়াল তখনও শক্ত হয়ে রয়েছে। এবার সে নিজের মুখটা এগিয়ে এনে জাওয়াদের একগালে হাত রেখে বিপরীত গালে আলতো করে নিজের ঠোঁট স্পর্শ দেয়। স্পর্শ দিয়েই সাথে সাথে সরে আসে না, বরং সেখানেই কিছু নিজের ঠোঁট চেপে ধরে রাখে। একটু পর অপর গালেও সেম কাজটি করে। সময় নিয়ে জাওয়াদের পুরো মুখ সিক্ত হয় পূর্ণতার ঠোঁটের উষ্ণ আর্দ্র স্পর্শে।
জাওয়াদের রাগ কমানোর জন্য পূর্ণতার এহেন প্রচেষ্টা সফল হয় খুব সহজেই। প্রিয়তমার আদরে লোক পুরুষই বা রাগ ধরে রাখতে পারে? জাওয়াদও বাকিদের মতোই। আমতাআমতা করতে করতে জাওয়াদ নিজের দুটো হাত এগিয়ে এনে জড়িয়ে ধরে পূর্ণতার কিঞ্চিত মেদপূর্ণ কোমড়ে। সময়ের ব্যবধানে তার হাতের বাঁধন আরো দৃঢ় হয়।
নিজের কোমড়ে জাওয়াদের হাতের দৃঢ় স্পর্শ পেতেই পূর্ণতা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে। অবশেষে জনাবের রাগ পড়ল। সে নিজের ঠোঁট জাওয়াদের গালে রেখেই মৃদু গলায় প্রশ্ন করে–
—রাগ ভাঙল তাহলে জনাবের?
—রাগ ভাঙানোর এসব অভিনব কায়দা প্রয়োগ করলে না ভেঙে উপায় আছে? দিন দিন ভীষণ সেয়ানা হয়ে যাচ্ছো তুমি। আমার রাগও আমার উপর আজকাল উপহাস করে। বউ পাগল ডেকে মজা নেয়।
পূর্ণতা আবারও জাওয়াদের বুকে এসে মাথা রাখে। জাওয়াদ তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে আগলে নিয়ে বসে বসে রাত্রি বিলাশ করতে থাকে। কিছুক্ষণ পর ফজরের আজান দিয়ে দিলে তারা নামাজ আদায়ের জন্য উঠে পড়ে। জাওয়াদ আজ বাসাতেই পূর্ণতার সাথে নামাজ আদায় করে। পূর্ণতা নামাজ শেষ করে জাওয়াদের পাশে বসে অপেক্ষা করতে থাকে, জাওয়াদের মোনাজাত শেষ হওয়ার।
দীর্ঘ সময় নিয়ে মোনাজাত শেষ করে। তার মোনাজাত শেষ হতেই পূর্ণতা তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে। তারপর ঘুম ঘুম গলায় জিজ্ঞেস করে–
—কি এত চাইলেন মোনাজাতে?
—মায়ের কবরের আজাব যেন আল্লাহ পাক মাফ করে দেন। বাবাকে সুস্থতা দান করেন। বোনটা যেন সুখী হয় জীবনে। আমার সন্তানের সুস্থতা ও সফলতা।
—আর নিজের জন্য কি চাইলেন?
—আমার আর আমার বউটার দীর্ঘায়ু। কারণ আমি একটা লম্বা সময় তার সাথে কাটাতে চাই। তার সাথে বৃদ্ধ হতে চাই। আমার জীবনে অপূর্ণ সব ইচ্ছে তাকে সাথে নিয়ে পূরণ করতে চাই। অদেখা সব জায়গাগুলোতে তাঁকে নিয়ে ঘুরতে যেতে চাই। আর তাঁকে অনেক ভালোবাসা সুযোগ চাই।
পূর্ণতা চোখ বন্ধ রেখেই ঠোঁট এলিয়ে হেঁসে দেয়। জাওয়াদ পূর্ণতার মুখে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে–
—উঠো, বেডে গিয়ে শোও।
বলতে গেলে পূর্ণতা প্রায় পুরোটা রাতই জেগে ছিল। তাই এখন তার চোখ ঘুমের কারণে আপনাআপনিই বন্ধ হয়ে আসছে। পূর্ণতা জায়নামাজ আর নামাজের হিজাব গুছিয়ে বেডের মাঝে গিয়ে শুয়ে পড়ে। তার ডান পাশে জাওয়াদ শোয় আর বামপাশে তাজওয়াদ। ঘুমানোর সময় তাজওয়াদকে মাঝে শোয়ানো হলেও, সে ঘুমিয়ে যাওয়ার পর জাওয়াদ পূর্ণতাকে ঠেলে মাঝে আনায়।
ছেলেকে বুকে নিয়ে চোখ বন্ধ করে পূর্ণতা। খানিক বাদে নিজের বুকের অন্যপাশেও ভারী অনুভব হয়। একজোড়া শক্ত-পোক্ত হাত তার কোমড় জড়িয়ে বুকে মাথা রাখে।
—একদিন লুকিয়ে তোমায় আর তাজকে দেখতে এসে এমনভাবে ঘুমিয়েছিলাম। সেদিন নিজেকেই নিজে চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলাম, একদিন তোমার সম্মতিতে আবারও তোমার বুকে মাথা রাখব। আমি আমার চ্যালেঞ্জ পূরণ করে দেখিয়েছি। নিজের কাছেই নিজেকে জিতিয়ে দিয়েছি।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন। ]
শব্দসংখ্যা~২৯০০
চলবে?
[ছোট বলে অভিযোগ করবেন? ওদের নিয়ে আর বেশিদিন লেখবো না ভেবেই, মনটা খারাপ হয়ে যায় আর লিখতে পারছি না।
অনেক বড় করে দিয়েছি, সকলের থেকে রেসপন্স আশা করছি। অন্তত একটা কমেন্ট হলেও করেন।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স। ] See less
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৮.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৬.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৭
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪০.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৯
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৫.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৭