Golpo কষ্টের গল্প শেষ পাতায় সূচনা

শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৮.১


শেষপাতায়সূচনা [৫৮.১]

সাদিয়াসুলতানামনি [বিয়ে স্পেশাল

]
হসপিটালের ডাক্তার, নার্স, এমনকি কেবিনের বাহিরে পাহারায় থাকা পুলিশদের সাক্ষী রেখে সকালের প্রথম প্রহরে আরিয়ান চিরকালের জন্য আরওয়াকে নিজের নামে করে নেয়। কবুল বলে মোনাজাত শেষ করেই আরিয়ান সকলের সামনে বেডে আধশোয়া হয়ে থাকা অসুস্থ আরওয়ার কপালে চুমু দিয়ে তাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে দেয়। এই কান্নায় কোন দুঃখের লেশ নেই। আছে শুধু কঠিন চড়াই-উতরাই পার হওয়ার পর পাওয়া এক সুখময় প্রাপ্তির কথা।
আরওয়ার যদিও গুরুজনদের সামনে এমনভাবে জড়িয়ে ধরায় একটু লজ্জা লাগছিল, কিন্তু সে বুঝে আরিয়ানের বর্তমান অনুভূতি। কারণ সেও যে একই পথের পথিক। সকলে তাদের স্পেস দিতে আস্তে আস্তে কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়। আরওয়া আপাততের জন্য নিজের সকল লজ্জা, অস্বস্তি, সংকোচ ভুলে গিয়ে নিজেও হাত বাড়িয়ে আগলে নেয় প্রিয় পুরুষটিকে। তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে দুর্বল গলায় বলে–
—”আরিয়ান, কান্না থামান প্লিজ। আমি ঠিক আছি এখন। আপনার কাছেই আছি। আপনার হয়ে আছি। একটু শান্ত হোন। নাহয় আপনার শরীর আরো খারাপ করবে।”
আরিয়ান আরওয়ার ঘাড়ে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ওঠে বলে–
—”আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আরু। ভেবেছিলাম এই জীবনে তোমায় আর আপন করে পাওয়া হবে না। পূর্ণতা পাবে না আমাদের ভালোবাসা।”
আরিয়ানের কথা শুনে আরওয়া ঠোঁটের কোণে একটুকরো প্রাপ্তির হাসি নিয়ে কোমল গলায় বলল–
—”কিন্তু দেখেন, আমাদের অপেক্ষা আজ শেষ হয়েছে। আমরা পেয়েছি একে-অপরকে নিজেদের করে। একটা কথা কি জানেন, আল্লাহ পাক সকল ঘটনার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে রাখেন। এতদিন হয়ত সেই সময়টি আসেনি, তাই আমাদের হৃদয়ে একে-অপরকে জন্য আকাশসম ভালোবাসা থাকার পরও এক হতে পারিনি। কিন্তু আজ সেই উপযুক্ত সময়টা এসেছে বলেই, দেখুন কতবড় বিপদ অতিক্রম করে আমরা এক হয়েছি।
অতীতে কি হয়েছে তা আমরা ভুলে যাবো আজ, এখন থেকেই। এখন থেকে আমরা ভাববো কীভাবে আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎটা সুন্দর করা যায় একে অপরের পাশে থেকে। ঠিক আছে?”
—”তুমি যেমনটা বলবে, তেমনটাই হবে জান।”
—”তাহলে এখন কান্নাকাটি থামান। চোখ মেলে আপনার বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে আমিই থমকেই গিয়েছিলাম। কি হাল করেছেন এই দেড় দিনের মাঝে নিজের, সেটা দেখেছেন একবারও? এলোমেলো চুল, ফোলা লাল চোখ, ক্লান্ত মুখশ্রী। আপনার বয়স মনে হচ্ছে কয়েক বছর বেড়ে গিয়েছে। কিছু খেয়েছেন?”
আরিয়ান আরওয়ার কথা শুনে তার কাঁধ থেকে নিজেকে সরিয়ে আনে। আরওয়া কোমল আদর মাখা হাতে আরিয়ানের ভেজা চোখ দু’টো মুছে দেয়। আরিয়ান তারপর বলল–
—”তোমাকে পাওয়া যাচ্ছিল না, আর আমি কিনা খাবো? খাবার নামত আমার গলা দিয়ে?”
আরিয়ানের প্রশ্নেই আরওয়ার উত্তর লুকানো ছিল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরিয়ানকে খানিক জোর গলায় বলল–
—”মুখ-হাত ধুয়ে আমাদের জন্য খাবার নিয়ে আসেন যান। ক্ষুধা পেয়েছে আমার।”
আরিয়ান নিজের পূর্ণ দৃষ্টি স্থাপন করে আরওয়ার গোলগাল মুখশ্রীর পানে। আরওয়ার গায়ের গড়ন
বেশ ভালোই ফর্সা। ছোটোখাটো একটা মুখ, তাতে হালকা খয়েরী রঙের পাতলা ঠোঁট, মুখের সাথে মানানসই নাক আর পটলচেরা চোখ। আরওয়া মেয়েটা অতিব সাধারণ একটি মেয়ে। কিন্তু তার এই সাধারণত্বই আরিয়ানের কাছে তাকে বানিয়েছে অসাধারণ একজন।
এই ছোটখাটো গড়নের মানুষটা আজ প্রচন্ড বাজেভাবে আহত হয়েছে। আরওয়ার গাল দু’টো অতিরিক্ত মার খাওয়ার কারণে রক্তিম হয়ে ফুলে আছে। নিচের ঠোঁটটা কেটেছে তার। ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাওয়ার কারণে পা মোচকে গিয়েছে। কপালের একপাশ ফুলে কালো হয়ে আছে। এত এত আঘাত সয়েও মেয়েটা কি সুন্দর তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে শান্ত করল। অথচ আরিয়ান তার জীবনে উপস্থিত থাকার পরও, আরিয়ান ওকে ঠিকভাবে প্রটেক্ট করতে পারে নি।
এই পর্যায়ে আরিয়ানের নিজেকে অনেক বড় লুজার মনে হতে থাকে। শুধু ভালোবাসলেই হয় না, ভালোবাসাকে আগলে রাখতে হয়। তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। কিন্তু আরিয়ান এক্ষেত্রে বরাবরই ফেইল করেছে।
—”কি হলো? কোথায় হারিয়ে গেলেন আবার আমার মুখের দিকে তাকিয়ে?”
আরওয়ার কথায় আরিয়ানের হুঁশ ফিরে। আরিয়ান চুপচাপ মাথাটা নামিয়ে নিয়ে কেবিনের এটার্চ ওয়াশরুমে চলে যায় ফ্রেশ হতে। আরিয়ানকে হঠাৎই এতটা মনমরা হয়ে যেতে আরওয়ার মনটা কেমন কেমন করে ওঠে। আরিয়ান মিনিট খানেকের মাঝেই মুখ-হাত ধুয়ে বের হয়। তারপর পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছে আরওয়ার কাছে এসে বলে–
—”তুমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করো। আমি আসছি খাবার নিয়ে।”
—”আচ্ছা।”
আরিয়ান বাহিরে আসতেই রাসেল, আরওয়ার মা আরওয়ার কেবিনে ঢুকে যায়। সকলের মন-মেজাজ ভালো না থাকায় ও আরওয়ার জন্য প্রচন্ড দুঃশ্চিন্তায় থাকায় বাসায় তেমন কিছু রান্নাও করা হয়নি। অগত্যা আরিয়ানকে আরওয়ার ও বাকিদের জন্য হসপিটালের কেন্টিন থেকেই খাবার কিনে নিয়ে আসতে হয়।
পূর্ণতা-জাওয়াদ গাজীপুর থানার ইন্সপেক্টর করিম ব্যাপারীর সাথে কথা বলতে থানায় গিয়েছে। আরিয়ান খাবার নিয়ে এসে দেখে পূর্ণতা-জাওয়াদ ফিরে এসেছে থানা থেকে। আরিয়ান জাওয়াদের কাছে থানায় কি কথা হলো জানতে চাইলে, জাওয়াদ বলে–
—”ইন্সপেক্টর করিম কিছুক্ষণ পর আসবেন আরওয়ার জবানবন্দি নিতে। চেয়ারম্যান সাহেবের বিরুদ্ধে নারীপাচার সহ আরওয়াকে কিড/ন্যাপিং ও টর্চা/রিংয়ের কেসও করা হবে, এজন্য আরওয়ার জবানবন্দি প্রয়োজন। চেয়ারম্যান সাহেবকে পুলিশ কাস্টাডিতে খাতিরদারি করা হচ্ছে। উনি কিডন্যাপিংয়ের বিষয়টা চেয়ারম্যান থেকে আমাদের জানাবেন বলেছে।”
এরপর জাওয়াদ-পূর্ণতা ফ্রেশ আসলে তারা সকলেই খেতে বসে। আরওয়ার মায়ের শরীর খারাপ থাকায় আরিয়ানই আরওয়াকে খাইয়ে দেয়। ভদ্রমহিলাকে মেয়ের সন্ধান দেওয়ার পর এক মিনিটও আটকে রাখা যায়নি। সে আর আরিয়ান একপ্রকার পাগলের মতো ছুটে এসেছে হসপিটালে খবরটা শোনা মাত্র।
আরওয়ার মা মেয়েকে দেখে একটু শান্ত হলেও, আরিয়ান তখনও শান্ত হয়নি। সে চিৎকার-চেচামেচি করে সকলকে তখনই বাধ্য করে তাদের দু’জনের বিয়ে দিতে। আহনাফ সাহেব যদিও ছেলেকে শান্ত গলায় বুঝানোর চেষ্টা করেছিলে, কিন্তু আরিয়ান না মানলে তখন সে ধমকে-ধামকে থামানোর চেষ্টা করে আরিয়ানের পাগলামি। কিন্তু আরিয়ানের এক কথা, সে আরওয়াকে আজ সেই মূহুর্তেই বিয়ে করবে। করবেই করবে। তার পাগলামিতে অতিষ্ঠ হয়ে সকাল আটটায় হসপিটালের পাশের মসজিদের ইমাম সাহেবের মাধ্যমে আরিয়ান-আরওয়ার বিয়ে পড়ানো হয়।
তাদের সকলের খাওয়া শেষ হয়ে গেলেও আরওয়ার গাল ও চোয়ালে অত্যাধিক ব্যথা থাকার কারণে, তার খাওয়া শেষ হয়নি এখন। দাঁতের মাড়ি ফুলে ব্যথায় টনটন হয়ে আছে। তাই তাকে ডাক্তারের কথা মতো, স্যুপ খাওয়াচ্ছে আরিয়ান। আরওয়া ব্যথার জন্য খেতে চাইছে না, কিন্তু আরিয়ান তাঁকে নানান ভাবে বুঝিয়-ভুলিয়ে খাওয়াচ্ছে।
আরওয়ার খাওয়ার মাঝেই সেখানে গাজীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি সহ আরো কয়েকজন পুলিশ অফিসার আসেন। আরওয়া খেতে খেতেই কেবিনের দরজার দিকে তাকালে একটা পরিচিত চোখের মানবকে দেখা পায়, যে কিনা ঘন্টা কয়েক আগে আরওয়াকে চেয়ারম্যান সাহেবের লোকদের থেকে বাঁচিয়েছিল। কিন্তু কিছু ঘন্টার আগের সেই এলোমেলো পুরুষটির সাথে বর্তমানের পুরুষটির কোন মিলই পাচ্ছে না শুধু মাত্র তার নীল চোখ ছাড়া। পুরুষটিকে আরওয়া সেই গুন্ডাদের ডেরায় ভীষণ অগোছালো, অপরিচ্ছন্ন এক মানব হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু বর্তমানে তার পরিপাটি, গোছানো অবস্থা বেশ ভাবাচ্ছে আরওয়াকে।
ওসি সাহেব এসেই নিজের সহ তার সাথে আসা বাকি অফিসারদের প্রাথমিক পরিচয় প্রদান করেন। ওসি রফিকুজ্জামান সাহেবের থেকে আরওয়া জানতে পারে, সেই নীল চোখের পুরুষটি একজন আন্ডার কাভার পুলিশ অফিসার। তার নাম আরসালান সায়র নীলাদ্রি। যে কিনা, বহুদিন ধরে আরওয়াদের চেয়ারম্যান মোতালেবের হিউম্যান ট্র্যাফিকিংয়ের গ্যাংটিকে ধরার জন্য ছদ্মবেশে তাদের গ্রুপে ছিলেন। চেয়ারম্যান মোতালেব টাকার জোরে সরকারের বিভিন্ন উঁচুপদের লোকদের সাথে তার সম্পর্ক ভালো রেখেছিল। যার কারণে তার বিরুদ্ধে শক্ত-পোক্ত প্রমাণের অভাবে এতদিন তাকে ও তার গ্যাংকে আইনের আওতায় আনা যাচ্ছিল না।
আরওয়া নিজের ভাবনা থেকে বের হয়ে নীলাদ্রির দিকে তাকালে দেখতে পায়, নীল চোখের পুরুষটি এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তার চাহনিতে স্পষ্ট ধরা পড়ছে, আরওয়ার প্রতি একরাশ মুগ্ধতা। এক অচেনা পুরুষের এমন মুগ্ধ করা দৃষ্টি দেখে আরওয়া সংকোচ ও অস্বস্তি উভয়ই হতে থাকে। তাই সে নিজের পাশে দাড়িয়ে থাকা আরিয়ানের কোমড়ের কাছের শার্ট চেপে ধরে নিজেকে তার পেছন একটু আড়াল করে নেয়। যেন সে নিজের অস্বস্তির কারণটাকে স্বামীর নামক রক্ষাকবচ দ্বারা ঢেকে ফেলতে চাইছে।
আরওয়ার এমন কান্ডে নীলাদ্রির কপালে ভাজ পড়ে। তার বক্ষে সূক্ষ্ম একধরণের ব্যথার উদ্ভব হয়। সে জানে না হঠাৎ এমন ব্যথার কারণ কি। কিন্তু সে অনুভব করতে পারছে, তার থেকে কয়েক হাত দূরে অবস্থিত বেডটার উপর শুয়ে থাকা বিধস্ত নারীটিকে অন্য এক পুরুষের সান্নিধ্য নেওয়াটা সে সইতে পারছে না। বুকের খুব গভীরে এক অদ্ভুত জ্বলন হচ্ছে।
আরওয়ার অস্বস্তিবোধ নিয়ে নিজেকে আরিয়ানের আড়াল করে নেওয়া, নীলাদ্রির আরওয়ার দিকে একধ্যানে তাকিয়ে থাকা উভয় ঘটনাই আরিয়ান প্রত্যক্ষ করে। নিজের ব্যক্তিগত নারীর উপর অন্য এক পুরুষের প্রেমময় দৃষ্টি আরিয়ানের একদমই সহ্য হয় না। কোন প্রেমিক পুরুষেরই সহ্য হওয়ার কথা না। আরিয়ান তাই আরওয়াকে আরেকটু আড়াল করতে সোজা তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে যায়। এর ফলে আরওয়ার কোমল অবয়বটা আরিয়ানের সুস্বাস্থ্যবান, লম্বাটে দেহের সামনে আড়াল হয়ে যায়। নীলাদ্রিও আর আরওয়াকে দেখতে পায় না।
ওসি সাহেব এই কয়েক ঘন্টায় চেয়ারম্যানের পেট থেকে যতটুকু তথ্য জানতে পেরেছে, তার সবটুকুই সে জাওয়াদদের জানায়–
—”আমরা মোতালেবের থেকে জানতে পেরেছি, রিসেন্টলি আপনারা মিস আরওয়ার সাথে মি.আরিয়ানের বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে সিলেটে গিয়েছিলেন। ইতিপূর্বে মিস আরওয়া নিজের ইজ্জত চেয়ারম্যানের পুত্র রাকিবের হাত থেকে বাচানোর জন্য তাকে ভীষণ বাজেভাবে আঘাত করে, রাকিবকে অন্ধ ও নপুংসক করে দিয়েছে। একমাত্র ছেলের অসুস্থতার প্রতিশোধ নিতে চেয়ারম্যান মোতালেব আরওয়াকে টার্গেট করলে, আরওয়া ঢাকায় চলে আসে।
মি.আরিয়ানের সাথে তার বিয়ে ঠিক হলেও, সে সিলেট ব্যাক না করে ঢাকাতেই বিয়ের প্রিপারেশন নিতে থাকে। এতদিন মিস আরওয়া সম্পর্কে মোতালেব কিছু জানতে না পারলেও, বিয়ে সম্বন্ধ নিয়ে মি.আরিয়ানদের তার বাড়িতে যাওয়াটা মিস আরওয়ার একজন প্রতিবেশীর চোখে পড়ে। সেই মহিলাটি মোতালেবের বাসায় কাজ করে। পরবর্তীতে সেই মহিলাটি মিস আরওয়ার ভাবীর থেকে কৌশলে মিস আরওয়া ও মি.আরিয়ানের বিয়ের কথাটি জানতে পারে এবং তার বর্তমান অবস্থান যে ঢাকা সেটাও জানতে পারে। এই তথ্যটি সে গিয়ে মোতালেবের কাছে দেয়। এবং মিস আরওয়ার পরিবার বিয়ের জন্য ঢাকায় আসলে মোতালেবও লুকিয়ে তাদের ফলো করতে করতে ঢাকায় চলে আসে। এবং বিয়ের দিন তাকে পার্লার থেকে কিডন্যাপ করে। তার উদ্দেশ্য ছিল, মিস আরওয়াকে বিদেশে পাচার করে দেওয়ার।
কিন্তু কিডন্যাপ থাকা অবস্থা মিস আরওয়া আরেকজন কিডন্যাপ মেয়ের ফোন থেকে লুকিয়ে আরিয়ান সাহবকে কল করলে পুলিশ তার লাস্ট লোকেশন ট্র্যাক করে ফেলে। যদিও বনানীর থানার এই কেসটির বহু পূর্ব থেকেই আমরা চেষ্টা করে রয়েছি মোতালেব ও তার গ্যাং-কে ধরার। এবং বলা বাহুল্য, আমাদের সুযোগ্য আন্ডার কাভার অফিসার আরসালান সায়র নীলাদ্রির কারণেই মিস আরওয়াকে এত দ্রুত সহিহ-সালামত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।”
সকলেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নীলাদ্রির প্রতি। বিশেষ করে আরিয়ান এগিয়ে এসে তাঁকে হুট করেই জড়িয়ে ধরে বলল–
—আ”পনাকে ধন্যবাদ দিলে ছোট করা হবে। আজ ওকে বাঁচিয়ে আমাকে চিরকৃতজ্ঞ করে দিলেন। আমি সারাজীবন আপনার কাছে ঋণী হয়ে থাকব। আপনি জানেন না, ও আমার কত রাত জাগা অপেক্ষার ফল। আপনি নিজের অজান্তেই আমার বেঁচে থাকার কারণটিকে আমায় অব্দি পৌঁছে দিয়েছেন।”
নীলাদ্রিও আরিয়ানের পিঠে হাত রেখে বলে–
—”এটা আমার দায়িত্ব ছিল।”
নীলাদ্রির কণ্ঠে ছিল এক ধরণের বিষাদের আভাস। তারপর একজন অফিসার আরওয়ার জবানবন্দি নেয়। জবানবন্দি নেওয়ার পর অফিসাররা বিদায় নেয় সকলের থেকে। নীলাদ্রিও বাকি অফিসারদের মতোই ক্যাজুয়ালি তার থেকে বিদায় নিতে বলল–
—”আসছি মিস আরওয়া। ভালো থাকবেন।”
আরওয়া তার দৃষ্টি নিচের দিকে রেখেই স্মিত আওয়াজে বলে–
—”মিস নই আমি আর, মিসেস আরিয়ান হয়েছি আজ সকালেই। আর আপনাকে ধন্যবাদ দিলেও কম হবে। দোয়া করবো, আপনার সকল ইচ্ছে আল্লাহ পাক পূরণ করুন।”
আরওয়ার কথা শুনে নীলাদ্রির চোখে যেন বিষাদেরা নিজেদের দোকানপাট মেলে বসতে শুরু করে। সে খুবই ক্ষীণ স্বরে বিরবিরায়–
—”জীবনে প্রথমবার যাকে মন চাইলো, তাকেই পেলো না।”
নীলাদ্রি পরিস্থিতি বুঝতে পেরে চট করে নিজেকে সামলে নেয়। ফর্মাল শার্টের গলায় ঝুলিয়ে রাখা সানগ্লাসটি সে দ্রুত চোখে পরে নিয়ে বলল–
—”অভিনন্দন আপনাদের দু’জনকে। আপনাদের নতুন জীবন সুখ-শান্তিতে পরিপূর্ণ হোক। আজ আসছি, আল্লাহ হাফেজ।”
কথাটা শেষ করেই সে কেবিন থেকে হনহনিয়ে বেরিয়ে যায় অন্য অফিসারদের ফেলে রেখেই।


আরওয়াকে পরেরদিন হসপিটাল থেকে ডিসচার্জ করে দেয়। আরিয়ানের গাড়িটা এসে শেখ ভিলার সামনে দাঁড়াতেই, আরিয়ান আগে বের হয়ে যায়। তারপর আরওয়ার পাশের দরজা খুলে তাঁকে আলতো হাতে কোলে তুলে নেয়। আরিয়ানের এহেন কান্ডে আরওয়া ভীষণ লজ্জা পেতে থাকে। কত ময়-মুরুব্বি রয়েছে, তাদের সামনে স্বামীর কোলে চড়তে যেকোন মেয়েরই লজ্জা লাগবে।
আরওয়া আরিয়ানের বুকের কাছের শার্ট খামচে ধরে নিচু গলায় বলল–
—”আমায় নামিয়ে দিন আরিয়ান, আমি হেঁটেই বাসায় ঢুকব। সামনে কত মানুষ আছেন, আমার ভীষণ লজ্জা লাগছে এভাবে তাদের সামনে যেতে।”
আরিয়ান তার কথা শুনেও তেমন একটা পাত্তা দেয় না। সে আরওয়াকে নিজের সাথে আগলে নিয়েই বাড়ির দিকে হাটা শুরু করে। এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে, বাড়ির সদর দরজায় সকলে অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। আজ এখানে তাদের আসার কারণ হলো, তাদের ম্যারেজ রেজিষ্ট্রি ও আবারও কাবিন পড়ানো হবে। এখানে সন্ধ্যা অব্দি থেকে তারপর আহমেদ বাড়ির বউ রওনা দিবে তার শ্বশুর বাড়ির উদ্দেশ্যে।
আরিয়ান সামনের দিকে দৃষ্টি রেখে হাঁটতে হাটঁতে বলল–
—”আমার বউ পায়ে মারাত্মক আঘাত পেয়েছে। এমতাবস্থায় তাঁকে নিজের পায়ে হাঁটতে দিয়ে, আমি নিজেকে আরো একবার লুজার প্রমাণ করতে চাই না। এমনিতেই আমি তোমার জীবনে থাকা অবস্থাতেই তোমাকে বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা না করতে পারার গ্লানি রয়েছেই আমার বুকে। এরপরও যদি তুমি আমায় এইটুকু যত্নও না নিতে দাও, তাহলে আমি সত্যিই নিজেকে একজন ফেইলিয়র, লুজার ভেবে যাবো সারাটা জীবন।”
আরিয়ানের কণ্ঠে ছিল একরাশ হতাশা, মন খারাপীর উপস্থিতি। আরওয়া এখন বুঝতে পারে দু’দিন ধরে আরিয়ানের মুড কেন অফ। ছেলেটা মনে মনেই নিজেকে এসব ভেবে কষ্ট পাচ্ছে।
আরওয়ার নিজের দুই হাত দিয়ে আরিয়ানের কাঁধ জড়িয়ে ধরে তার বুকে মাথা রাখে পরম ভালোবাসা, আস্থা, তৃপ্তির সহিত। এই তো পাখি নিজের আপন নীড়ের সন্ধান পেয়েছে।
আরিয়ান-আরওয়া সদর দরজার সামনে আসতেই সকলে তাদের ফুল ছিটিয়ে স্বাগতম জানায়। তারপর সবাই একসাথে বাসার ভেতরে প্রবেশ করে। হঠাৎই নতুন এই দম্পতির উপর নজর পড়ে বাড়ির সবচাইতে ক্ষুদে সদস্যের। সে তার হাতে থাকা বলটা মাটিতে ফেলে দিয়ে কপালে এক ভাজ নিয়ে তাকিয়ে ভাবতে থাকে, তার এঞ্জেল আন্টি আলু মামার কোলে কেন? এঞ্জেল আন্টি কি আলু মামার সাথে রাগ করেছে? যেমনটা তার মাম্মা তার পাপার সাথে করে, আর তার পাপা তার মাম্মামের রাগ ভাঙানোর জন্য কোলে এভাবে কোলে নিয়ে রাগ ভাঙায়।
তাজওয়াদ ছোট ছোট কদম ফেলে ড্রয়িংরুমে আসে, যখন কিনা আরিয়ান আরওয়াকে সোফায় বসিয়ে দিচ্ছিল। সে আদো আদো গলায় তার এঞ্জেল আন্টিকে প্রশ্ন করে–
—” এঞ্জেল আন্টি, তুমি কি মামুল সাথে লাগ কলেছো?”
আরওয়া স্মিত হেঁসে আদুরে বাচ্চাটিকে নিজের কাছে টেনে নেয় সযত্নে। তারপর তার তুলতুলে গালে কয়েকটা আদর দিয়ে বলে–
—”না তো আদর সোনা। তোমার এটা কেন মনে হলো, আমি তোমার মামুর সাথে রাগ করেছি?
—”তাহলে মামু যে তোমালে কুলে নিয়ে আসলো তাই আমি ভেবেছি, তুমি মামুল সাথে লাগ কলে আছো। কালণ, এমনতা তো পাপা মাম্মাল সাতে কলে। যখন মাম্মা পাপাল সাতে লাগ কলে, তখন পাপা মাম্মাকে কুলে নিয়ে কত আদল কলে কলে মাম্মাল লাগ ভাঙায়। “
এই রে! নিজের অজান্তেই বাচ্চাটা বাপ-মায়ের হাঁটে হাড়ি ভেঙে দিলো। পূর্ণতা ছেলের কথা শুনে এক মূহুর্তও সেখানে দাঁড়ায় না। ছেলের বাপের দিকে একবার কড়া দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে সেখান থেকে চলে যায় কিচেনে সকলের অগোচরেই। লোকটাকে সে বারবার করে মানা করেছে, ছেলের সামনে এত পিরিত না দেখাতে। কিন্তু তার শখের বেডার মন্তব্য, ছেলে এখনও ছোট। সে বুঝবে না, বাবা-মায়ের এসব প্রেম-ভালোবাসা। আজ হলো তো? ছেলেটা সবার সামনে হাটের হাঁড়ি ভেঙেই দিলো।
আহনাফ সাহেব আর মি.শেখ গুরুত্বপূর্ণ কথার ভান করে তৎক্ষনাৎ সেখান থেকে কেটে পড়েন। আরওয়ার মা ও অজান্ত বেগম লজ্জা পেয়ে অন্যদিকে চলে যায়। ড্রয়িংরুমে রয়ে যায় শুধু জাওয়াদ, আরিয়ান, আরওয়া, টনি ও জিনিয়া। টনি আর জিনিয়া ঠোঁট টিপে হাসতে থাকে। আরিয়ান-আরওয়া কি রিয়াকশন দিবে তাজের কথা শুনে তা ভেবে পাচ্ছে না। আর বেচারা জাওয়াদ!
জাওয়াদ বেচারা বেআক্কেলের ন্যায় ছেলের দিকে তাকিয়ে আছে। আর সে ভাবছে, ছেলে তার কত বড় একটা উপকার করে দিলো, বউয়ের ঝাড়ি খেতে। আগামী সাতদিন তার পেয়ারের বউ তাঁকে নিজের কাছে ঘেঁষতে দিলে জাওয়াদ খুশিতে তিনটা ডিক বাজি দিবে।


আসরের নামাজের পর উকিল ও কাজী সাহেব উভয়ই আবারও শেখ ভিলাতে আসেন। প্ল্যান মোতাবেক জাওয়াদের পেইন্ট হাউজেই ম্যারিজ রেজিস্ট্রি ও কাবিন হয়। তাদের কাবিন শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরই টনি, জিনিয়া আর জাওয়াদ চলে যায় আহমেদ বাড়িতে। আরিয়ান-আরওয়ার বাসর সাজাতে। পূর্ণতা তাদের সাথে তাজওয়াদকেও পাঠিয়ে দেয়। বাপ-বেটাকে বর্তমানে ইচ্ছা মতো বকতে মন চাচ্ছে তার। ছেলের তখনকার বেফাঁস কথার কারণে বড়দের সামনে যেতেই কেমন লজ্জা লজ্জা লাগছে বেচারীর।
সন্ধ্যায় নতুন বর-বউকে নিয়ে সকলেই রওনা দেয় আহমেদ বাড়ির উদ্দেশ্যে। সেখানেই রাতের খাবার সাড়বে তারা সকলে আর আজকের রাতটা থেকে কাল সকালে চলে আসবে।
নতুন বউকে পূর্ণ মর্যাদার সহিত বাড়িতে প্রবেশ করানো হয়। আরিয়ানের মায়ের সাইডের আত্মীয়-স্বজনরা এসে আরওয়াকে দেখে যায় এবং উপহার ও দোয়া দিয়ে যায়। নিচে অজান্তা বেগম সবার খাতিরদারিতে সরব ভূমিকা পালন করছে বলে, পূর্ণতা উপরে চলে যায় বাসর ঘর কেমন সাজিয়েছে মক্কেল গুলো সেটা দেখতে।
আরিয়ানের ঘরে এসে পূর্ণতার মনটা ভালো হয়ে যায়। যেই তিনজনকে পাঠানো হয়েছিল বাসর ঘর সাজাতে তারা বেশ সুন্দর করে সাধারণ ঘরটাকে অসাধারণ করে তুলেছে। রং-বেরঙের ফুল, ক্যান্ডেলস, বেলুন কি বাকি রাখেনি ঘরটাকে মোহনীয় করে তুলতে। পূর্ণতা মনে মনে প্রশংসা করলেও, মুখে হায় হায় করে বলে ওঠে–
—”তিন মক্কেল মিলে এটা কেমন বাসরঘর সাজিয়েছো আমার ভাইয়ের? হায় রে! আমার ভাইয়ের বাসরটাই মাটি!”
জাওয়াদ, জিনিয়া আর টনি পূর্ণতার কথা শুনে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। ফুল বাবু হয়ে বসে থাকা তাজওয়াদ সোফা থেকে উঠে এসে, মায়ের আঁচল চেপে ধরে বলে–
—”আমি চবাইকে বলেচিলাম, মাম্মাকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস কলে নাও কীভাবে সাজাবে বাসল ঘল। কিন্তু আমি চুটো মানুষ বলে, কেউ পাত্তাই দেয় নি আমাল কতাল। হলো তো, আমাল মামুল বাসল নস্ত কলে?
বাই দ্য ওয়ে, মাম্মা বাসল ঘল কি? আর বাসল ঘলে কি কলে?”
জাওয়াদ ফট করে বলে বসে–
—”ফুটবল খেলে।”
কথাটা বলেই সে হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরে। পূর্ণতা এমন কড়া দৃষ্টি নিয়ে জাওয়াদের দিকে তাকায় যে, মনে হচ্ছে সে চোখ দিয়েই জাওয়াদকে ভস্ম করে দিবে।
অন্যদিকে তাজওয়াদ তার পাপার কথা শুনে অবাক হয় প্রচণ্ড। এই রাতের বেলা, এত সুন্দর করে ফুল দিয়ে ঘর সাজিয়ে ফুটবল খেলবে আলু মামা আর এঞ্জেল আন্টি। ঘরটা সাজানো তার বেশ পছন্দই হয়েছে। এই ফুলেল ঘরে ফুটবল খেলতে তারও বেশ ভালোই লাগবে। সে বেশ উচ্ছ্বাস ও আগ্রহ নিয়ে বলল–
—”পাপা, আমিও তাহুলে ফুটবল কেলবো।(
)”
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন। ]
শব্দসংখ্যা~২৬৩৮

চলবে?

জাওয়াদ, পূর্ণতা ও তাদের ছোট ছানাকে নিয়ে লেখা আমার তৃতীয় ই-বুক “পূর্ণতার সংসার”
পড়ুন ই-বই “পূর্ণতার সংসার”
https://link.boitoi.com.bd/hMuN3
[যখন-তখন গল্পটার সমাপ্তি এসে পরতে পারে। মেন্টালি প্রিপেয়ার্ড হয়ে থাকুন আপনারা।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স।
] See less

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply