#শেষ_পাতায়_সূচনা [৬৩.১]
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
আগত গেস্টদের নিজের কোম্পানির ড্রেসগুলো নিয়ে একটা লম্বা ভাষণ শেষ করে জাওয়াদ তখন মাত্রই বসেছিল নিজের চেয়ারে, ঠিক তখনই কোর্টের পকেটে থাকা ফোনটা ভাইব্রেট হয়ে ওঠে মেসেজ আসায়। জাওয়াদ রয়েসয়ে ফোনটা কোর্টের ভেতর থেকে বের করে পাওয়ারঅন বাটন প্রেস করে। স্ক্রিনে পূর্ণতার টেক্সট দেখে আনমনেই তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি দেখা যায়। এবার আর রয়েসয়ে নয়, বেশ তাড়াহুড়ো করেই ফোনের লক খুলে পূর্ণতার ইনবক্সে ঢুকে মেসেজটি পড়ার জন্য।
কিয়ৎকাল পর জাওয়াদ ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ তুলে এদিক-সেদিক তাকায়। ঠোঁটে কোণে থাকা সেই এক চিলতে হাসি প্রসারিত হতে থাকে ক্ষণে ক্ষণে। জাওয়াদের হৃদয়ে যে সুপ্ত প্রেমেরা হট্টগোল চালাচ্ছে সেটা বুঝতে আর বাকি থাকে না। মনটা বড্ড অস্থির হয়ে যায় পূর্ণতার মেসেজটি পড়ার পর থেকেই। কতগুলো দিন হলো বউটাকে আদরে ডুবিয়ে দেওয়া হয় না।
জাওয়াদ সেখান থেকে সরে আসে কিছুটা দূরে। একটা নিরিবিলি করিডরে এসে চট করে ফোন লাগায় নিজের প্রাণভোমরার কাছে। পূর্ণতা কলমটা রিসিভ করতেই তাঁকে কিছু বলতে না দিয়ে জাওয়াদই আগে বলে–
—দূরে রয়েছি বলে আমার হৃদয়ের পীড়া বাড়িয়ে দেওয়ার জন্যই বুঝি এই পন্থা মিসেস?
পূর্ণতা তখনও ঘুমোয়নি। গ্যালিরি ঘাঁটছিল। জাওয়াদের ছবিগুলো দেখে নিজের অশান্ত মন শান্ত করার প্রচেষ্টা করছিল। তখনই জাওয়াদের কল আসতে দেখে পূর্ণতা চমকে যায়। সেই সাথে ভীষণ খুশিও হয়। ডেকে চটজলদি ফোনটা রিসিভ করতেই জাওয়াদ ঐ কথাটি বলে ওঠে।
জাওয়াদের কথা শুনে পূর্ণতার মন চায় জনাবকে আরেকটু উত্যক্ত করতে। সে ক্ষীণ গলায় বলে–
— “আপনার অনুপস্থিতিতে আমার মনটা শূন্যতা ছেয়ে গিয়েছে, অপেক্ষা করাটা দিনকে দিন কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছে সেটা জানাতে পারব না বুঝি মিস্টার?”
—তাই বলে এমন মিষ্টি মিষ্টি কথার বাণে? আপনি রাগ ঝাড়বেন আমি নির্দ্বিধায় সইবো। আপনি অভিমান করবেন, আমি আদুরে বুলিতে আওড়িয়ে মানাবো আপনাকে। কিন্তু এমন প্রেমময় উক্তিতে আমি নিজেই তো মুষড়ে পড়েছি, এখন আপনাকে সামলাই কি করে মিসেস?
পূর্ণতা ঠোঁট কামড়ে হেঁসে দেয়। লোকটার যে ব্যাপক প্রেম প্রেম পাচ্ছে তা তার ঘোর লাগা কণ্ঠস্বর শুনেই বুঝে গিয়েছে পূর্ণতা।
পূর্ণতা একবার ঘুমন্ত ছেলেকে দেখে নিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে বেলকনির দিকে হাঁটা দেয়। বেলকনিতে গিয়ে কাউচে আধশোয়া হয়ে বলে–
—চলে আসুন তাহলে, নিজেকে সহ আপনাকেও বেশ সামলাতে পারব আমি।
জাওয়াদ কথাটি শুনে কাতর গলায় বলে–
—আমি পারলে এখনই উড়াল দেই তোমার কাছে, এত দূরত্ব ভালো লাগে না আর। মাহবুবটাও কয়েকদিন পর আসবে, ভাবী ওকে ছাড়ছেই না। প্রেগ্ন্যাসির শেষ সময় তো, তাই পাগলামিও বেশি করছে ভাবী।
“প্রেগ্ন্যাসি” কথাটা শুনে পূর্ণতা নড়েচড়ে ওঠে। মাহবুবের বউ তৃতীয়বারের মতো মা হতে চলেছে খুব শীঘ্রই। জন্য সে প্রথম জাওয়াদদের সাথে গেলেও, বউয়ের পাগলামিতে দু’দিন ওর আবারও বাংলাদেশে ফিরতে হয়েছে। মাহবুবের বউয়ের ডেলিভারির সময় এই সপ্তাতেই দিয়েছে ডাক্তার, তাই মাহবুব চেয়েও যেতে পারছে না। মাহবুব না থাকায় জাওয়াদের উপরই সকল দায়িত্ব এসে বর্তিয়েছে।
পূর্ণতা নিজের বাম হাতটা পেটে রেখে হাত বুলাতে বুলাতে বলে–
—বুঝলাম। এখন বলুন, খেয়েছেন? লোকজনের আওয়াজ পাচ্ছি।
—স্পিচ শেষ করলাম। কিছুক্ষণ পর লাঞ্চ টাইম হবে, তখন সবাই একসাথে খেতে বসব। তুমি খেয়েছো জান?
—হুম।
—আমার কলিজা আর বাকি সবাই কেমন আছে?
—সবাই ভালো আছে।
—আর তুমি?
—টেক্সটে তো বললামই হালচাল।
—আর কিছুদিন সোনা। ভাবীর ডেলিভারির পর মাহবুব আসবে, তখন আমি চেষ্টা করব যাওয়ার।
—আচ্ছা। আপনি চিন্তা করবে না আমাদের জন্য। আপনাকে ছাড়া ভালো লাগে না তাই পাগলামি করি, বোঝেনই তো। কাজ করুন মন দিয়ে, এদিকের সব সামলানোর জন্য আমি আছি তো।
জাওয়াদ স্বস্তির শ্বাস ফেলে বলে–
—তুমি আছো জেনেই তো স্বস্তিতে আসতে পেরেছি।
—খাওয়াদাওয়া করবেন ঠিক মতো, একটুও অযথা টেনশন করবেন না আর ঘুমাবেন সময় মতো। ফেরার পর যদি দেখেছি আপনি শুকিয়ে গিয়েছেন, আপনার একদিন কি আমার একদিন।
ঠান্ডা হুমকি দিয়ে কথাগুলো বলে পূর্ণতা। জাওয়াদ নিঃশব্দে গা দুলিয়ে হাসতে থাকে প্রিয়তমার কথা শুনে।
—আচ্ছা ম্যাম মনে থাকবে। আপনারাও নিজেদের খেয়াল রাখবেন। দৈত্যপুরীর রাক্ষসের প্রাণ যেমন ছোট কচ্ছপের মধ্যে বাস করত, তেমনি তোমাদের ভালো থাকার মাঝেই আমার সকল সুখ, স্বস্তি নিহিত।
জাওয়াদের কথা শুনে পূর্ণতার কেমন সুখ সুখ অনুভব হতে থাকে। ছোট থেকেই সে এমনই একজন বিশ্বস্ত ও ভালোবাসার মানুষ এবং একটা সংসারের কথা ভাবত। মাঝের ঘটনায় সোজা ভেবেছিল, তার ভাবনা হয়ত ভাবনাতেই থেকে যাবে। তবে বর্তমানে সে তার কল্পনার চেয়েও সুখী।
জাওয়াদের ডাক পড়ায় সে পূর্ণতার থেকে বিদায় নিয়ে আবারও স্টেজের কাছে চলে যায়। পূর্ণতাও রুমে এসে ছেলেকে বুকে টেনে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
কেটে যায় আরো কয়েকটা দিন। আজ আরিয়ান অফিস থেকে তাড়াতাড়িই ফিরে আসে। তেমন একটা কাজ নেই বলে চলে এসেছে। গুনগুন করতে করতে রুমে এসে দেখে, তার বউ কোথাও নেই। অফিস ব্যাগটা স্টাডি টেবিলের উপর রেখে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে সে বেলকনির দিকে হাটা দেয়।
বেলকনিতে বসে পড়ন্ত বিকালের সোনালী আলো গায়ে মেখে আরওয়া কুশি কাটার কাজ করছে। যদিও সে তেমন একটা পারে না কাজটা, সামনে মোবাইলে ইউটিউবে টিউটোরিয়াল দেখে দেখে কাজটা করছে আজ দু’দিন ধরে। কিছুটা শিখি গিয়েছে ইতিমধ্যে কাজটা।
পূর্ণতা বেবি হওয়ার কথা শুনেই মেয়েটা ঠিক করেছে সে সর্বপ্রথম বেবিদেরকে তার হাতের তৈরি জামাকাপড় দিবে। যেই ভাবা সেই অনুযায়ী কাজ শুরু করে দিয়েছে। আরিয়ান বেলকনির দরজার সাথে হেলান দিয়ে একধ্যানে তাকিয়ে আছে ব্যস্ত প্রিয়তমার দিকে। আরওয়া নিজের কাজে এতটাই মশগুল যে আরিয়ানের উপস্থিতি সে টেরই পায়নি।
আরিয়ান খেয়াল করে নটগুলো থেকে একটু পরপরই সুতো বের হয়ে যাচ্ছে। আরওয়ার এতটা দক্ষ নয় বলেই এমনটা হচ্ছে, তবুও সে ধৈর্য ধারণ করে আবারও কাজটা করছে। কাজটা করার সময় তার চোখে মুখে এক আলাদা উচ্ছ্বাস ফুটে উঠেছে।
আরিয়ান তাকে বিরক্ত না করে নিঃশব্দে রুমে এসে ফ্রেশ হতে চলে যায়। ফ্রেশ হয়ে এসে দেখে আরওয়া তার এলোমেলো করে রাখা কাপড়গুলো গোছাচ্ছে। আরিয়ানকে ওয়াশরুম থেকে বের হতে দেখে আরওয়া হাতের কাপড়টা রেখে তার কাছে চলে আসে। তারপর তার হাত থেকে টাওয়ালটা নিয়ে মাথা মুছে দিতে দিতে বলে–
—তুমি এসে আমায় ডাক দিলে না কেন?
—মনোযোগ দিয়ে কাজ করছিলে, তাই ডিস্টার্ব করতে চাই নি।
—তুমি ডাকলে ডিস্টার্ব হই না এতদিনেও বুঝলে না।
আরিয়ান আরওয়ার কোমড় দু’হাতে চেপে ধরে তাঁকে নিজের সর্বোচ্চ নিকটে টেনে আনে। তারপর আরওয়ার নাকে নাক ঘষে বলে–
—বুঝি তো।
—কচুর মাথা বুঝো। ছাড়ো কিছু বানিয়ে নিয়ে আসি তোমার জন্য।
—উঁহু। থাকো কিছুক্ষণ আমার কাছে। পরে যেও।
আরওয়া মানে স্বামীর কথা। আরিয়ান তার হাত ধরে আবারও বেলকনিতে নিয়ে আসলে দু’জনেই পাশাপাশি দু’টো বেতের চেয়ারে বসে পড়ে। আরওয়া তার সুতোর ঝুড়ি থেকে তৈরি হতে থাকা ছোট সোয়েটারটা হাতে নিয়ে আরিয়ানকে উচ্ছ্বাস নিয়ে দেখাতে থাকে–
—দেখো আমি শিখে যাচ্ছি কাজটা। কেমন হচ্ছে বলো?
—ভীষণ সুন্দর হচ্ছে।
আরওয়া খুশি হয় প্রশংসা শুনে। তারপর আবারও কাজ শুরু করে দেয়। আরওয়ার খুশি খুশি মুখ দেখে আরিয়ান হঠাৎই বলে ওঠে–
— তা ম্যাম ননদের বাবুদের জন্যই শুধু বানালে হবে? নিজেরটার জন্য কবে থেকে বানাতে শুরু করবেন?
—মানে?
আরওয়া বলে আরিয়ানের কথাটা সহসাই তার কথাটা বুঝতে পারে না। আরিয়ান চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে মাথাটা আরওয়ার দিকে কাত করে দিয়ে বলে–
—বয়স তো কম হচ্ছে না আমার, আর কয়েকদিন পর বাচ্চারা ল্যান্ড করলে বাবার জায়গায় নানা ডাকবে। তা বলছিলাম কি, আপনার সম্মতি থাকলে আমরাও প্যারেন্টস হওয়ার প্রস্তুতি নিতে পারি। কি বলেন মিসেস?
আরিয়ানের কথাটা মস্তিষ্কে অনুধাবন করতেই আরওয়া চট কর তার দিকে তাকায়। এতে করে দু’জনের চোখে সন্ধি হলে আরওয়া খেয়াল করে আরিয়ানের চোখেমুখে ফুটে উঠেছে বাবা হওয়ার প্রবল আকাঙ্খা।
আরিয়ান আরওয়া দিকে একটু এগিয়ে এসে তার ডান হাতটা ধরে নিজের মুখের কাছে এনে তাতে আলতো করে ঠোঁটের স্পর্শ দেয়। তারপর কিছুটা মলিন তবে আকুতি মিশ্রিত গলাতেই বলে–
—আরু, চলো না আমরাও বাবা-মা হই। জানো, আমি যখন তাজকে কোলে নেই মনে চায় ওকে বুকের ভেতর ঢুকিয়ে ফেলি। কি নরম, তুলতুলে একটা শরীর ওর! ও যখন জাওয়াদ ভাইয়াকে পাপা বলে ডাকে, আমার মনটাও আদো আদো গলায় পাপা ডাক শুনতে মন চায়।
আরওয়া একধ্যানে তাকিয়ে থাকে আরিয়ানের দিকে। লোকটা বিয়ের এতদিনে একটা বারের জন্যও তার সম্মতি না নিয়ে কিছু করেনি, তার উপর জোর করে কিছু চাপিয়ে দেয়নি। সে আজ এতটা আকুতি নিয়ে তার কাছে কিছু চাইছে, সেটা আরওয়া না দিয়ে পারে বুঝি?
আরওয়া আরিয়ানের হাতের উপর নিজের অন্য হাতটি রেখে নরম গলায় বলল–
—আল্লাহ পাক চাইলে আমরাও বাবা-মা হবো। আর এমনভাবে বলছেন যেন, আমি চাই না সন্তান। একজন নারী হিসেবে আমার পরিপূর্ণতা আসবে তো সন্তান জন্মদানের মাঝেই।
—আমি তোমার উপর কিছু চাপিয়ে দিতে চাই না। এমনিতেই আমি নামক বোঝাকে চাপিয়ে দিয়েছি সারাজীবনের জন্য। তাই আর কোন বোঝা বাড়াতে চাই না।
সুন্দর একটা মূহুর্ত হুট করেই খারাপ হয়ে যায় আরিয়ানের কথাটিতে। সে সবসময় এটাই ভাবে, আরওয়ার অগাদ ও অকৃত্রিম ভালোবাসার ফয়দা নিয়ে সে হয়ত নিজেকে চাপিয়ে দিয়েছে। আরওয়া তাঁকে নানান সময় নানা ভাবে বিষয়টা নিয়ে বুঝিয়েছে, কিন্তু আরিয়ানের অবচেতন মন এই ভাবনা থেকে বের হতে পারে না।
আরওয়া রেগে যায় আরিয়ানের এহেন কথা শুনে। সে আলগোছে নিজের হাত সরিয়ে আনে আরিয়ানের উপর থেকে। সে আরিয়ানকে রাগ দেখা না পারলেও, রেগে গেলে একদম নিশ্চুপ হয়ে যায়। মুখটা গম্ভীর থাকে তার তখন।
আরওয়ার হাত সরিয়ে নিয়ে মুখ কালো করে ফেলায় আরিয়ান থতমত খেয়ে যায়। সে কিছু বলতে নিবে, তার আগেই আরওয়া বলে–
—আপনাকে আমি একটা বিষয় বুঝাতে বুঝাতে ক্লান্ত এখন আরিয়ান। আপনি সেই আগের কথা ধরেই বসে আছেন। আল্লাহ পাকের পর আমি না চাইলে কস্মিনকালেও কেউ আপনার সাথে আমাকে বাঁধতে পারত না।
উপরে আল্লাহ পাক চেয়েছেন আমরা এক হই, আর নিচে আমি চেয়েছি আমার ভালোবাসা পূর্ণতা পাক। তাই আজ আমরা এক সুতোয় বাঁধা পড়েছি। আপনি দাবী করেন আমায় বুঝেন, চিনে, জানেন। অথচ আপনি দাবী ভুল।
আরিয়ান নিজের ভুল বুঝতে সরি চাইতে নিলে আরওয়া সেখান থেকে উঠে চলে যায় নিচে। আরিয়ানও তার পেছন পেছন ছুটতে থাকে।
টনির পা বর্তমানে মোটামুটি ভালো হয়েছে অনেকটাই। স্টিকে ভর করে হাঁটতে হয়। ডাক্তার চেক করে জানিয়েছে, কয়েকদিন পর থেকে হয়ত স্টিকও লাগবে না হাঁটার জন্য। তবে সে একটা লম্বা সময় পর্যন্ত ভারী ওজন তুলতে পারবে না, জোরে হাঁটতে বা দৌড়াতে পারবে না, একটানা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েও থাকতে পারবে না। এতে করে পায়ের লিগামেন্ট গুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে আবারও।
পায়ের অবস্থা আগের থেকে ভালো থাকায় সে আজ থেকে কলেজে ক্লাস নেওয়া শুরু করবে আবারও। এই ভাবনা থেকেই সাতসকালেই ফ্রেশ হয়ে একদম রেডি হয়ে নিচে নামে। তবে ব্রেকফাস্ট করার জন্য ডাইনিং টেবিলে যেতেই টনির মেজাজ চটে যায়। আজও সকাল হতে না হতেই মুখ উঠিয়ে চলে এসেছে তার বাবার নির্লজ্জ ভাতিজি রুশা।
রুশাকে দেখেই টনির খাওয়ার মন-মানসিকতা নষ্ট হয়ে যায়। সে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়ে নিলে বিষয়টি নজরে আসে সামান্তার। সে গলা বাড়িয়ে তাঁকে ডেকে ওঠে–
—ভাইয়া কোথায় যাচ্ছো ব্রেকফাস্ট না করে?
সামান্তার কথার পরিপ্রেক্ষিতে সবাই পেছন ফিরে তাকালে টনিকে ফর্মাল ড্রেসে দেখে সকলেই নিজেদের ভ্রু কুঁচকে নেয়। জাফর সাহেব তাঁকে প্রশ্ন করেন–
—রেডি হয়ে কোথায় যাচ্ছো?
—কলেজে।
তাদের বাবা-ছেলের দূরত্বটা এখনও কমেনি। মূলত টনি সহজ হতে পারছে না জাফর সাহেবের সাথে। হওয়ার কথাও না। একজন পুরুষ যতই খারাপ হোক না কেন, সে কখনোই একজন খারাপ বাবা নয়। কিন্তু জাফর সাহেব এই কথাটিকে মিথ্যে প্রমাণ করে দিয়েছেন নিজের কর্মের মাধ্যমে।
জাফর সাহেব উদ্বিগ্ন গলায় সুধায়–
—তোমার শরীর তো এখনও ভালো হয়নি। আর কিছুদিন পর থেকে নাহয় জয়েন করো।
—আ’ম টোটালি ফাইন। বাসায় বসে থাকতে থাকতে বোর হচ্ছিলাম, তাই ভাবলাম ক্লাস নেওয়া শুরু করে।
তার কথা শুনে পাশ দিয়ে রুশা ন্যাকা গলায় বলে ওঠে–
—বোর হচ্ছিল আমায় বলতে, সব বোরিংনেস কাটিয়ে দিতাম।
রুশার কথাটা শুনে টনির ভারিক্কি চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। কপালের দুই পাশের রগগুলো স্পষ্ট ভাবে ফুলে উঠে। তার ফর্সা মুখশ্রী লাল বর্ণ ধারণ করতে থাকে অত্যাধিক ক্রোধে।
অন্যদিকে জাফর সাহেবও বেশ বিব্রত হয়ে পড়েন ভাগ্নির কথা শুনে। রুশার মুখভঙ্গি আর কথার টোনেই বুঝা যায় সে কীসের ইঙ্গিত করছে।
টনি পকেট থেকে ফোন বের করে ওয়ালপেপারে জিনিয়ার
হাস্যোজ্জ্বল মুখের ছবিটা দেখিয়ে বলে–
—আমার রুচি ও সময়ে এতও দুর্ভিক্ষ লাগেনি যে, আমার পবিত্র হুরকে রেখে স্লা”টদের কাছে গিয়ে বোরিংনেস কাটাব। আমার হবু বউ যেই রাস্তা দিয়ে যায়, তার ধুলো হওয়ারও যোগ্যতা নেই তোমার।
টনির রাগ তীব্রতা এতটাই যে সে তা কন্ট্রোল করার জন্য দাঁতে দাঁত চেপে রেখেছে, যার কারণে তার চোখ-মুখ আরও লাল হয়ে উঠেছে। সে জাফর সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলে–
—”আপনার ভাগ্নিকে সতর্ক করে দিন আমার সামনে যেন আর কোনদিন না পড়ে। আর পড়লেও যেন এসব কথা না বলে। যদি বলেও, সেদিন আপনারা সকলে আমার নিকৃষ্ট রূপের সাথে পরিচিত হবেন। আমি এখন সেই বেকার, অসহায়, পরনির্ভর টনি নেই। আর নাই বা আবেগী।
আমার মায়ের শেষ আদেশের পালনের জন্য আমি এই বাড়িতে আবারও পা রেখেছি। নাহলে আপনার মৃত্যুও আমাকে এই বাড়িতে আনত পারত না মি. ইসলাম।”
কথাটা শেষ করেই টনি স্টিকের সাহায্যে হেঁটে সেখান থেকে চলে যায় বাড়ির বাহিরে। যেই বাড়িটা এককালে তার জন্য স্বস্তির কারণ ছিল, সেটাই এখন তার কাছে দমবন্ধের আরেকটি কারণ হয়ে দাড়িয়েছে।
❝ব্রেকিং নিউজ❞
“ভয়াবহ ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল টরন্টো, ব্যাপক হতাহতের আশঙ্কা”
টরন্টো, কানাডা:
—”হঠাৎ শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে কানাডার অন্যতম ব্যস্ত শহর টরন্টো। স্থানীয় সময় ভোরের দিকে আঘাত হানা ভূমিকম্পটির তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো শহরজুড়ে।
প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল টরন্টো শহরের কাছাকাছি হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে শহরের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়। বহু বহুতল ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও ভবনের অংশবিশেষ ধসে পড়েছে। বেশ কয়েকটি সড়কে সৃষ্টি হয়েছে বড় ধরনের ফাটল, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা।
ভূমিকম্পের পরপরই বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। ধসে পড়া ভবনের নিচে বহু মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আহতদের উদ্ধারে ঘটনাস্থলে কাজ করছে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল।
হতাহতের সঠিক সংখ্যা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। তবে স্থানীয় প্রশাসনের আশঙ্কা, মৃত ও আহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। ভূমিকম্পের পর টরন্টোর বিভিন্ন হাসপাতালকে জরুরি অবস্থার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আহতদের চিকিৎসায় অতিরিক্ত চিকিৎসক ও নার্সদের হাসপাতালে ডাকা হয়েছে।
এদিকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করে তুলেছে একাধিক আফটারশক। আতঙ্কিত মানুষজন ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে রাস্তায় নেমে এসেছেন। শহরের বেশ কিছু এলাকায় যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।”
বাংলাদেশে বিভিন্ন চ্যানেলের বর্তমান হট টপিক এখন কানাডায় সংঘটিত হওয়া ভূমিকম্পের নিউজটি। স্ক্রিনজুড়ে ভেসে উঠছিল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া টরন্টোর বিভিন্ন দৃশ্য। কোথাও ভেঙে পড়েছে ভবনের একাংশ। কোথাও অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন। কোথাও স্বজনদের আহাজারি।
মি.শেখ এমন একটা নিউজ দেখে নিমিষেই স্তব্ধ হয়ে যান। জিনিয়াও থমকে যায় খবরটা শুনে। হঠাৎই তাদের হুঁশ ফিরে তীক্ষ্ণ কাঁচের আওয়াজে। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালে তারা দেখতে পায়, পূর্ণতার হাত থেকে চায়ের ট্রেটা পরে গিয়ে সবগুলো কাপ ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে। বুঝতে বাকি থাকে না, সেও ইতিমধ্যে শুনে ফেলেছে খবরটি।
টিভির পর্দায় ভেসে ওঠা প্রতিটি দৃশ্যের সঙ্গে পূর্ণতার বুকের ভেতরটা যেন আরও শক্ত করে চেপে ধরছিল অদৃশ্য কোনো হাত।
তার মস্তিস্ক একটা কথাই বলে, জাওয়াদও তো টরন্টোতেই আছে। কেমন আছে তার শ্যাম পুরুষটি? ঠিক আছে তো?
চোখের সামনে ভেসে উঠল মানুষটার মুখ। এক মুহূর্তের জন্যও আর কিছু ভাবতে পারল না পূর্ণতা।
কাঁপতে থাকা ঠোঁট দিয়ে শুধু একটি কথাই বেরিয়ে এলো—
—“জাওয়াদ…”
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন। ]
শব্দসংখ্যা~২২৪০
#চলবে?
[প্রথমে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি এত দেরি করে দেওয়ার জন্য। আমার পরীক্ষা চলছে, তাই চেয়েও আমি তাড়াতাড়ি দিতে পারছি না। গল্পটার হয়ত ২/৩ টা পর্ব রয়েছে। শীঘ্রই শেষ হতে চলেছে। তাই লাস্টের এই কয়েকটা পর্বে আমার পাশে থাকবেন আশা করি।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স। ] See less
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৭.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৯.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪২.৩
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫০.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৬.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৯.১