Golpo কষ্টের গল্প শেষ পাতায় সূচনা

শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫২.৩


শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫২.৩

#সাদিয়া_সুলতানা_মনি

একটু আগে রাফি নামক ছেলেটি যেই রুমে ঢুকেছিল, সেই রুম থেকেই হুট করেইআরিয়ান বের হয়ে আঞ্জুমানের গলায় ছু”রি ধরে। ঘটনার আকস্মিকতায় আঞ্জুমানের ভাড়াটে গুন্ডারা চেয়েও নিজের মনিবকে রক্ষা করতে পারে না। আরিয়ান আঞ্জুমানের গলায় ছুড়ি ধরে রেখে তাকে জিম্মি করে নেয়। এবং আঞ্জুমানের গু”ন্ডাদের বলে–

—”নিজের মালিকের জান বাঁচাতে চাইলে তোদের হাতের অস্ত্র গুলো ফেলে দে। নাহলে আমি কিন্তু এক সেকেন্ডও সময় নিবো না এই ডাইনীর গলায় ছুড়ি চালাতে।”

আরিয়ানের হুমকি শুনেও গুন্ডারা নিজেদের হাতের অস্ত্র ফেলাচ্ছে না দেখে, আরিয়ান একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলল–

—”ওকে, ফেলিস না। বয়েজ এই কুকুরছানাদের একটু শিক্ষা দাও তো।”

আরিয়ানের বলতে দেরি কিন্তু আশেপাশের অন্ধকার থেকে হুড়মুড়িয়ে গু”ন্ডাদের বের হতে দেরি হয় না। আঞ্জুমানরা অতি সাবধানতা বজায় রাখার জন্য তারা যেই ফ্লোরে অবস্থান করছে বর্তমানে শুধু সেখানে ও তাজওয়াদকে আটকে রাখা রুমটায় অতি নিন্মমানের লাইট ইউজ করেছে।

এছাড়া পূর্বেই বলা হয়েছিল, তাদের অবস্থানরত ভবনটি জঙ্গল সাইডে। এবং ভবনটি পুরাতন হওয়ায় গাছের ডাল-পালা অধিকাংশই বিল্ডিংয়ের ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। তাই আরিয়ানরা সদলবলে এতক্ষণ ঘাপটি মেরে বসেছিল কোন অন্ধকার গাছের ডালে বা পিলারের আড়ালে। তাদের মেইম টার্গেট ছিল তাজওয়াদ ও মিসেস শেখকে প্রথমে সুরক্ষিত করা এবং পরে শত্রুদের পাকড়াও করা।

যদিও তাদের সকলের পায়ের শব্দ বেশ কয়েকবারই শোনা গিয়েছিল, কিন্তু আঞ্জুমানের লোকেরা ভাবে জঙ্গলে এসব শব্দ কমন বিষয়। পশুপাখির বা রাতের বেলা বের হয়ে আসা পোকামাকড় শব্দ করছে হয়ত।

সেই টার্গেট অনুযায়ী, আরিয়ান ও তাদের পক্ষের কিছু গুন্ডা তাজওয়াদকে আটকে রাখা রুমটির একদম গা ঘেঁষে সামনে থাকা গাছে বসেছিল। আঞ্জুমান রাফিকে যখন ডেকেছিল তখনই আরিয়ানরা ক্ষীণ কাল বিলম্ব ব্যতীত রুমের উন্মুক্ত জানালা দিয়ে ঢুকে যায়। রাফি আঞ্জুমানের আদেশ পূরণ করতে যেই মাত্র রুমে ঢুকেছে একজন পেছন থেকে তার মুখ চেপে ধরে আর বাকিরা তার উপর হামলে পড়ে সেকেন্ডের ব্যবধানে রাফি ছেলেটিকে অজ্ঞান করে ফেলে বিনা শব্দেই। তারপর অজ্ঞান প্রায় তাজওয়াদকে আরেকটি আরিয়ানদের পক্ষের লোক কোলে তুলে নিতেই আরিয়ান ক্ষিপ্ত গতিতে বের হয়ে আসে কোন রূপ পূর্বাভাস ছাড়াই।

জাওয়াদদের লোকদের অতর্কিত আক্রমণে আঞ্জুমানের গু’ন্ডারা নিজেদের কোন প্রতিরক্ষাই করতে পারে বা এবং খুব সহজেই ধরাসই করা হয় তাদের। গোটা বিষয়টা যেন আঞ্জুমানের মস্তিষ্ক সাথে সাথেই বুঝে উঠতে পারে না। কিছুটা সময় নেয় বুঝতে। কিন্তু তার বুঝতে বুঝতে অনেক দেরি হয়ে যায়। ততক্ষণে সে তার শত্রু মানে জাওয়াদদের সামনে পুরোপুরি পরাস্ত হয়ে গিয়েছে।

শত্রুদের পরাস্ত করার পর এক সেকেন্ড সময় ব্যয় না করে পূর্ণতা ছুট লাগায় তার প্রাণভোমরা, তার বুকের মানিকের খোঁজে। আর জাওয়াদ ছুটে যায় তার জন্মদায়িনীকে মুক্ত করতে।

তাজওয়াদকে কোলে নিয়ে রাখা লোকটির থেকে একপ্রকার ছিনিয়ে নেয় সন্তানকে পূর্ণতা। তারপর পাগলের মতো ছেলের চোখ-মুখ উষ্ণ আদরে ভরিয়ে দেয়। বাচ্চাটার গা পুরো বরফ হয়ে রয়েছে। গায়ে কাপড় বলতে শুধু একটি প্যান্ট পরা তোতাপাখিটা।

জন্ম তার ঠান্ডা প্রধান দেশটির একটিতে হওয়ার কারণে ঠান্ডা সে ভালোই সয়ে নিতে পারে। কিন্তু পাঁচ বছরের ছোট একটি বাচ্চাকে বরফ ওয়ালা পানিতে কয়েক ঘন্টা চোবানো হলে সে কি ঠিক থাকতে পারবে? সে কেন কোন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সাথে এমনটা করা হলে সেই ব্যক্তিটিও অসুস্থ হয়ে পড়তো।

মূলত পূর্ণতার উপর দীর্ঘদিন জমে থাকা ক্ষোভ ঝেরেছে এই ছোট বাচ্চাটির উপর আঞ্জুমান। আঞ্জুমানের এমন পাগলামি পূর্ণ কাজ সইতে না পেরে ক্ষুদে প্রাণটি নুইয়ে পড়েছে।

ছেলেকে অজ্ঞান দেখে পূর্ণতা তাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয়। গায়ে থাকা ওড়নাটা শালের মতো করে নিয়ে ছেলেকে সহ মুড়িয়ে নেয়। মায়ের বুকের উম পেয়ে অচেতন তাজওয়াদ বোধহয় একটু স্বস্তিই পায়।

এদিকে বোনকে কাঁদতে দেখে আরিয়ানের মাথা খারাপ হয়ে যায়। এক মায়ের পেটের না হোক তারা, কিন্তু ছোট থেকে সে পূর্ণতাকে নিজের আপন বোনই ভেবে এসেছে । বুঝ হওয়ার পর থেকে মেয়েটাকে শুধু কাঁদতেই দেখেছে। মায়ের মৃত্যু, ভালোবাসার মানুষটির থেকে কষ্ট পাওয়া, বাবার মৃত্যু, আপনজনদের দেওয়া কষ্ট সইতে না পেরে দেশ ত্যাগ। সবকিছুতেই শুধু কান্না…কান্না… আর কান্না। পূর্ণতার নামটির বিপরীতমুখী হয়ে উঠেছে তার জীবন।

আরিয়ানের মস্তিষ্কে আগুন জ্বলে ওঠে পূর্ণতার কান্না দেখে। সে আঞ্জুমানের বাহু ধরে তাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে থাপ্পড়ের উপর থাপ্পড় দিতে থাকে। তিন নাম্বার থাপ্পড় মারার পর চার নাম্বারটি মারার আগেই আঞ্জুমান নিচে পড়ে যায়। মেয়েকে এমন উত্তম-মধ্যম খেতে দেখে রায়হানা বেগম হাউমাউ করে কেঁদে দিয়ে তার কাছে ছুটে যেতে চায়, কিন্তু পারে না। তাঁকে জিম্মি করে রাখা গুন্ডাটি তার পথরোধ করে দাঁড়ায়।

চটপটে, মিষ্টিভাষী, নিবেদিত প্রাণের অধিকারী আরিয়ানের মাথায় যেন আজ প্রতিশোধের নেশা চেপে বসেছে। প্রথমে তার বোনকে কষ্ট দেওয়া, তারপর তার প্রেয়সী। সে ভেবে পায় না, একটা মেয়ে মানুষ এতটা ভয়ংকর, নিকৃষ্ট, বিধ্বংসী কি করে হতে পারে? সে জানত, মেয়েরা মায়ের জাত। তারা কোমল, নরম, ভালোবাসায় পরিপূর্ণ এক আত্মা হয়ে থাকে। কিন্তু আঞ্জুমান তার জানাকে মিথ্যে প্রমাণ করেছে আঞ্জুমান নামক এই নিকৃষ্ট কিটটি।

আরিয়ান আঞ্জুমানের চুলের মুঠি ধরে তাকে নিচ থেকে ওঠায়, তারপর রাগে হিসহিসিয়ে বলল–

—”অ্যাঁই, তুই এত নিকৃষ্ট কেন রে? এত নিকৃষ্ট, নির্দয়, বিধ্বংসী কেন তোর মন? সমাজের নিন্মস্তরের কিট বললেও তো কম হবে রে তোকে। সাইকো, অমানুষ তুই একটা।

তোর রাগ বড়দের সাথে। জাওয়াদ ভাই আর বোনুর সাথে। তুই ওদের সাথে মিটাতি সেই রাগ। ঐ দুধের শিশুটাকে এমন কষ্ট দিলি কেন? তোর মনে কি একটুও মায়া-দয়া নেই?”

আঞ্জুমান আরিয়ানের মতো সুপুরুষের ধপাধপ থাপ্পড় খেয়ে আপাতত চোখে সর্ষেফুল দেখছে। জাওয়াদ এতক্ষণে তার মা’কে মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে বাঁধন থেকে। সে মিসেস শেখকে ধরে দাঁড় করিয়ে একহাত দিয়ে নিজের সাথেই আগলে রেখেছে।

কিন্তু আরিয়ানের একথা তার কানে যেতেই সে আর চুপ থাকতে পারে না। তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল–

—”আরে শালাবাবু, বুঝতে হবে গাছ যেমন বিষাক্ত ফলও তার থেকে দ্বিগুণ বিষাক্তই হবে। যার মা নিজের ভালোবাসাকে পূর্ণতা দিতে নিজের স্বামী-সন্তান ফেলে গিয়ে এক নিরীহ নারীর সংসার ভেঙেছে, সেই মেয়ে আর কতটা ভালো হতে পারে তুমি বুঝতে পারছো?”

জাওয়াদের এমন অপমানে আঞ্জুমানের মা রায়হানার মাথা নিচু হয়ে যায়। অন্যদিকে আঞ্জুমান রেগে গর্জন করে ওঠে–

—”মুখে লাগাম টানুন জাওয়াদ ভাইয়া। আমার মা সম্পর্কে আর একটাও বাজে কথা বলবেন না, যেটার মূল্য চুকাতে গিয়ে আপনার সারাজীবন আফসোস করতে হয়।”

আঞ্জুমানের হুমকিতে জাওয়াদ দুই পয়সার মূল্য দিলো না। বরং রায়হানা বেগমের দিকে তাকিয়ে কর্কশ গলায় বলল–

—”আপনার বিবেক একবারও বাঁধল না নিজের মেয়ের এমন কুকীর্তিতে সাথ দিতে?”

রায়হানা এবার মাথা তুলে নিচ থেকে। তারপর দৃঢ় গলায় বলল–

—”না, বাঁধে নি। কেন বাঁধবে? তোমাদের বিবেক কোথায় ছিলো যখন আমার মেয়েকে ঠকালে? আমার মেয়েকে তোমার বউ মেরে কি অবস্থা করেছে ওর। এসব করার সময় তোমাদের বিবেক না বাঁধলে আমারও বাঁধেনি ওকে সাথ দিতে।”

—”এখন যে এত “আমার মেয়ে”, ” আমার মেয়ে” করছেন যখন এই মেয়েকে ছেড়ে পুরান প্রেমিকের হাত ধরেছিলেন। তখন এই ভালোবাসা, টান কোথায় ছিলো?

কোথায় ছিলো এই বিবেক যখন আমার মামা আপনার পা পর্যন্ত ধরে বলেছিল আপনাকে, যাতে আপনি অন্তত আপনার এই মেয়েটার দিকে তাকিয়ে হলেও সংসারটা করেন? আপনাকে সে মন থেকেই ভালোবেসেছিলো, কিন্তু চৌদ্দ বছরের সংসারে আপনি একটা দিনের জন্যও তাকে ভালোবাসেন নি। আর নাই বা সংসারটাকে আপন করে নিয়েছিলেন। আমার মামাকে শুধু মাথার উপরের ছাদ হিসেবেই বেছে নিয়েছিলেন, ভালোবাসার স্বামী হিসেবে নয়। তাই তো প্রেমিকের এক ডাকেই চৌদ্দ বছরের সংসারকে লাথি দিয়ে চলে গিয়েছিলেন। নিজের মেয়ের কথাও ভাবেন নি। এখন আসছেন “আমার মেয়ে” নামক দুই পয়সার নাটক করতে?”

ক্ষিপ্ত গলায় কথাগুলো বলে জাওয়াদ। মুখের উপর এমন বিষাক্ত সত্যগুলো শুনে রায়হানা বেগম নিজের পক্ষে সাফাই দেওয়ার মতো কোন শব্দ খুঁজে পায় না।

জাওয়াদের আর কথা বাড়ানোর মতো রুচি হয় না এই কালনাগিনীদের সাথে। সে আরিয়ানকে বলে–

—”ওদের নিয়ে আমাদের পুরান গোডাউনে নিয়ে যাও। হুমায়ূন তোমাদের সাথে যাবে। এদের ব্যবস্থা এবার আমি নিজেই করব। আপনজন ভেবে ছাড় দিয়েছিলাম এতদিন, কিন্তু ওরা এসবের যোগ্যই না।”

আরিয়ান তার কথার সম্মতি জানায়। তারপর রায়হানাকে ধরে রাখা গু”ন্ডাটির দিকে তাকিয়ে বলল–

—”আমার এক্স শ্বাশুড়িকে সাবধানে গাড়িতে তুলিস। এই কালনাগিনী কিন্তু ভীষণ বিষধর, যখন-তখন তোকে ছোবল দিয়ে পালিয়ে যাবে।”

আরিয়ানের কথায় গু”ন্ডাটি হেঁসে দেয়। বসের কথা মতোই দু’জন পাহারা দিয়ে তাকে নিচে নিয়ে গিয়ে গাড়িতে তুলে। আরিয়ান গু”ন্ডাটির সাথে কথা বলার সময় তার অজান্তেই আঞ্জুমানের চুলের মুঠিতে থাকা তার হাতের বাঁধন ঢিলে হয়ে এসেছিল। আর তার এই বেখেয়ালির সুযোগ নিতে এবারও ভুল করে না আঞ্জুমান।

আঞ্জুমানের ডান হাতটি অকেজো প্রায় হলেও, বাম হাতটি বেশ ভালোই আছে। সে তার বাম হাতের কনুই দিয়ে আরিয়ানের চোখ বরাবর আঘা”ত করে। চোখের মতো এক নাজুক অঙ্গে আকস্মিক আঘাত”তে আরিয়ান কয়েক কদম দূরে সরে গিয়ে চোখে হাত দিয়ে বসে পড়ে।

আঞ্জুমানের আরিয়ানের হাতের বাধঁন থেকে মুক্ত হয়েই আরো কিছু পা দূরে সরে যায়। তারপর নিজের কোমড়ে কামিজের নিচে লুকিয়ে রাখা অস্ত্রটি বের করে সেটা তাক করে জাওয়াদের দিকে। উন্মাদের মতো হাসতে হাসতে বলল–

—”আপনি যে এই জনমে আমার হবেন না, সেটা আমি খুব ভালো করে বুঝে গিয়েছি। তাই বলে আপনাকে অন্যের হতে দেবার মতো ততটাও ভালো নয় আমি জানেন আশা করি। আপনি আমার না মানে আর কারো হতে দিবো না আপনাকে। বিদায় আমার না হওয়া প্রিয়তম।”

কথাগুলো শেষ করে চোখ বন্ধ করে পরপর তিনবার ট্রিগার প্রেস করে আঞ্জুমান। এরপর সব শান্ত। একটি সংসার পূর্ণতার মুখ দেখার আগে আরো একবার ধ্বংস হয়ে গেলো।

____________________________

মৃত্যু মানবজীবনের সবচাইতে কঠিন ও তিক্ত সত্যগুলোর একটি। মানবজীবনের একমাত্র নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি। যাকে মানুষ সবচেয়ে বেশি ভয় পায়, অথচ প্রতিদিন নিঃশব্দে তার দিকেই এগিয়ে যায়।

মৃত্যু কখনো কেবল একটি মানুষের সমাপ্তি নয়, কখনো কখনো এটি বহু স্বপ্ন, বহু অভ্যাস, বহু সম্পর্কেরও নীরব বিদায়। জীবন মানুষকে অহংকার শেখায়। কিন্তু মৃত্যু সেই অহংকারকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে মনে করিয়ে দেয়—শেষ পর্যন্ত মাটির তৈরি এই দেহ মাটির কাছেই ফিরে যেতে হয়।

আগরবাতি হালকা গন্ধ, আপনজন সাথে কাটানো সুন্দর স্মৃতিচারণ ও আহাজারিতে ভারী হয়ে আছে শেখ ভিলার উঠান। বাড়ির মেয়ে-বউয়েরা ওড়না বা শাড়ির আঁচল দিয়ে একটু পরপরই নিজেদের চোখ মুছছেন। কখনো বা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় লুটিয়ে পড়ছে।

পূর্ণতা আপনজন বিয়োগে এতটাই বিস্ময়াভূত যে, তার সবকিছু কেমন একটা বিষাদময় স্বপ্ন লাগছে। মাথায় ওড়নার অংশবিশেষ টেনে নিয়ে শেখ ভিলার ড্রয়িংরুমে রাখা লা”শটির দিকে একধ্যানে তাকিয়ে আছে। সে কেমন একটা ঘোরে চলে গিয়েছে।

তার সেই ঘোর ভঙ্গ হয় জিনিয়ার বুক ভাঙা আহাজারিতে। মেয়েটা পাগলের মতো করছে নিজের জন্মদায়িনীকে হারিয়ে। মায়ের মৃত্যু সে কিছুতেই মানতে পারছে না। বোনের মতো ননদকে স্নেহের পরশে আগলে নেয় পূর্ণতা। পূর্ণতার বুকে থেকেই ডুকরে কাঁদতে থাকে জিনিয়া।

মিসেস শেখের মলিন মুখটার দিকে তাকিয়ে থেকেই পূর্ণতা ডুব দেয় সেই শ্বাসরুদ্ধকর সময়টাতে……

~কয়েক ঘন্টা আগে~

আঞ্জুমান যখন জাওয়াদের উদ্দেশ্যে গু’লি ছুড়ে তখন তিনি জাওয়াদকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় ঠিকই। কিন্তু নিজে আর সরার সময়টুকু পান না আর। জাওয়াদের জন্য বরাদ্দকৃত গু’লি তিনটা পর্যায়ক্রমে তার বুক, পেট ও একপাশের চোয়াল ভেদ করে আরেকপাশের চোয়াল দিয়ে বের হয়ে যায়।

পূর্ণতা তখনই তাজওয়াদকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল, তবে জাওয়াদকে উদ্দেশ্য করে বলা আঞ্জুমানের কথাগুলো শুনে তার যেন শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে সেই ক্ষণে। কিন্তু পাশা যে এমন করে উল্টে যাবে সে কল্পনাও করতে পারেনি।

মিসেস শেখকে গু”লি খেতে দেখে পূর্ণতা পাঁচ বছর পর আবারও তাকে ডেকে উঠেছিল–

—আম্মাআআআ….

জাওয়াদ মিসেস শেখের ধাক্কা খেয়ে অন্য একটি পিলের উপর গিয়ে পড়লে মাথায় হালকা একটু চোট পায়। তবুও সে নিজের ব্যথাকে আগ্রাহ্য করে পেছনে ফিরে তাকালে দেখতে পায় তার মমতাময়ী মায়ের সারা শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে।

মায়ের এমন করুণ অবস্থা দেখে জাওয়াদ এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। তার মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দেয়। সে ভ্যাবলার মতো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মিসেস শেখের দিকে।

তবে মিসেস শেখ অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের জন্য যেই মা হাঁটু ভেঙে মাটিতে পড়ে যেতে নিবে, তখনই জাওয়াদ গিয়ে ধরে ফেলে তাঁকে। এবং তাঁকে নিজের সাথে জড়িয়ে রেখেই নিচে বসে পড়ে।

পূর্ণতা তাজওয়াদকে কোলে নিয়েই তার কাছে ছুটে যায়। পূর্বের সব কথা ভুলে গিয়ে একহাত দিয়ে ছেলেকে বুকে চেপে রেখেই অন্যহাত দিয়ে চেপে ধরে মিসেস শেখের একটি হাত। দ্বিতীয় বারের মতো প্রচন্ড কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। কাঁদতে কাঁদতেই বলল–

—”আম্মা… আপনার কিছু হবে না। আপনি শুধু চোখ বন্ধ করবেন না। আমরা এখনই আপনাকে হসপিটালে নিয়ে যাবো।

অ্যাঁই জাওয়াদ, বসে পড়লেন কেন? আম্মাকে তুলুন। দেখছেন না তার কত র/ক্ত/ক্ষ/রণ হচ্ছে। “

জাওয়াদের যেন তখনই সম্বিত ফিরে পায়। সে দুইহাত দিয়ে মাকে কোলে তুলে নিতে চায়, কিন্তু বাঁধ সাধেন খোদ মিসেস শেখই। সে যন্ত্র”ণামিশ্রিত কণ্ঠে কোন রকমে বললেন–

—”আ..আমায় কো..থাও নিতে হ..বে না। আ..আমার সময় যে আ…র নেই আ..মি এটা বু..ঝতে পার…ছিহ্। শেএ..ষ সময়টা আ..মার সন্তানের সাথেই কাটাতে চাই।”

তার কথা শুনে জাওয়াদ ভাঙা ভাঙা গলায় বলল–

—”এমনটা বলো না আম্মা। আমার কষ্ট হচ্ছে। তোমার কিচ্ছু হবে না। তুমি এভাবে আমার-পূর্ণতার সংসার না দেখে যেতে পারো না আম্মা।”

মিসেস শেখ একটা বেদনাবিধুর হাসি দেন। অনেকটা ফিসফিসিয়েই বলেন–

—”তো..মাদের সু..খের সং..সার দে..খার স্ব..প্ন আমার স্বপ্নই থে..কেই গেলো আ..ব্বা। ত..বে তু..মি কষ্ট পেও না এর জন্য। আ..আমি মন-প্রাণ ভরে দোয়া করি তো..মাদের সুখের জন্য।”

তারপর তিনি পূর্ণতার দিকে তাকিয়ে বললেন–

—”মা গো… এই অ..পরাধীকে মাফ করে দিও মা। আ..মার জন্য আ.মার ছেলে, তুমি, আ..মার নিষ্পাপ নাতিটা একসময় কতই না কষ্ট পেয়েছো। প্রত্যক্ষভাবে আ..মার কারণেই তোমার বাবাটাও মারা গিয়েছেন। আ.মার জন্য তুমি এ..তিম হয়েছো, সং..সার ছাড়া হয়েছো। আমার নাতিটা জন্মের এত বছর বাবার সানিধ্য পায়নি। এত এত পাপ নিয়ে মরতে হচ্ছে, কবরে না আমার জন্য কতই কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।

তুমি আমায় মন থেকে মাফ না করলে, আমার কবর জীবনটা যে বড়ই কষ্টে কাটবে মা। তুমি আমায় মা…ফ করে দিও।”

মিসেস শেখের কথা শুনে পূর্ণতা কাঁদতে কাঁদতে বলল–

—”এমন কথা বলবেন না আম্মা। মায়েদের ভুল মনে রাখতে নেই। এতে নিজেরই পাপ হয়। আপনি সবসময় আমাকে এমন দূরে করে দিতে পারেন না। নিজের মায়ের পর আমি আপনাকে মায়ের স্থানে বসিয়েছিলাম। কিন্তু আপনি বরাবরের মতো এবারও আমার আগমনের কারণে চলে যেতে চাইছেন, তাই না?”

মিসেস শেখের রক্ত অত্যধিক ক্ষরণ হচ্ছে। বুক ও পেট থেকে গলগলিয়ে র””ক্ত বের হচ্ছে, ইমিডিয়েটলি হসপিটালে নিয়ে তার চিকিৎসাও যদি শুরু করা হয় তাহলেও বাচানো যাবে কিনা সন্দেহ। কিন্তু সে নিজেই বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছেন। হয়ত প্রাণপ্রিয় পুত্রের সুখের সংসারে দ্বিতীয়বারের মতো কণ্টক হতে চান না তিনি।

মিসেস শেখ লম্বা করে একটা শ্বাস টানে। অনেকটা অ্যাজমার রোগীদের যখন অ্যাজমা অ্যাটাক আসে তখনকার মতোই। আজরাইল বোধহয় রুহ কবজ করতে এসে পড়েছে তার। শ্বাস গ্রহণের পরপরই হঠাৎই সে কাশতে থাকে। মিসেস শেখ যতবারই কাশি দিচ্ছে, ততবারই মুখ ভরে রক্ত বের হচ্ছে।

সে নিভু নিভু দৃষ্টি নিয়ে পূর্ণতার সিক্ত মুখের পানে তাকায়। ঠোঁটের কোণে একটা দুঃখের হাসি টেনে নিয়ে বললেন–

—”না রে মা! রাগ নেই তো তো..র উপর আমার। আসলে ভাগ্যই এবার আমার উপর নারাজ। প্রথমবার যেই জঘন্য পাপ করেছি, সেটার জন্য আমার এই শাস্তিই পাওনা।”

সে একটু থেমে নিজের শাড়ির আঁচলে বেঁধে রাখা চাবিটা ইশারায় জাওয়াদকে খুলে দিতে বলে। নিঃশ্বাস নিতেও তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। মনে মনে উপরওয়ালার কাছে আর দু’টো মিনিট সময় চাচ্ছেন তিনি, যাতে তার প্রিয় সংসার ও সন্তান উভয়কেই যোগ্য ব্যক্তির হাতে গুছিয়ে দিয়ে সে নিশ্চিন্তে চিরনিদ্রায় ঢলে পড়তে পারেন।

জাওয়াদ চাবির ছোড়াটি আঁচল থেকে খুলে মায়ের হাতে দিতেই, মিসেস শেখ চাবির ছোড়া ও জাওয়াদের ডান হাত উভয়ই পূর্ণতার হাতে তুলে দেয়। একদম বুঁজে আসা গলায় শেষ কয়েকটা কথা হিসেবে বলল–

—”আজ থেকে আমার সংসার আর আমার প্রাণপ্রিয় সন্তানকে তোমার হাতে তুলে দিলাম পূর্ণতা মা। জানোই তো, মেয়েদের কাছে সংসার আর সন্তান নিজেদের জীবনের থেকেও প্রিয় হয়ে থাকে। আজ আমি আমার জীবন দিয়ে আমার সন্তানকে বাঁচিয়ে দিয়ে তোমায় পূর্ণতা দিয়ে যাচ্ছি। তুমি এই দু’টো জিনিসকে আগলে রেখো।

আমার জিনিয়াটাকে দেখে রেখো মা। তোমাদের বাবার খেয়াল রেখো। আর আমাকে মাফ করে দিও। আলবিদা।”

কথাগুলো শেষ করার সাথে সাথে তার একটা শ্বাস টান উঠে। এরপরই সব আবারও শান্ত হয়ে যায়। পূর্ণতা মিসেস শেখের বুকে মাথা রেখে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। জাওয়াদ পাথর বনে গিয়ে মায়ের রুহ হীন মলিন মুখ টার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর আস্তে করে হাত উঠিয়ে মিসেস শেখের খুলে থাকা চোখের পাতা বন্ধ করে দেয়।

____________________________

বর্তমান~

ছেলেরা সবাই কবর খুঁড়ে বাসার ভেতরে আসে। মিসেস শেখকে শেখ ভিলার পেছনে বাগানে কবর দেওয়া হবে। এমনটাই করতে নাকি তিনি বলেছিলেন নিজের স্বামীকে। তার শেষ ইচ্ছে সম্মান জানিয়ে জাওয়াদ শেখ ভিলার বাগানে কর্ণারে কামিনী ফুলের গাছের নিচে তার জন্য কবর খুঁড়ে। কামিনী ফুল মিসেস শেখের ভীষণ পছন্দ ছিলো।

টনি, আরিয়ান, জাওয়াদ হুমায়ূন মিসেস শেখের খাটিয়ার চার কর্ণারে গিয়ে দাঁড়ায়। জিনিয়া আসন্ন ঘটনা বুঝতে পেরে পূর্ণতার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার হবে হুড়োহুড়ি করতে থাকে আর চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলে–

—”আমার আম্মুকে নিও না তোমরা…আম্মু….ও আম্মুইইই…আমি আর তোমার সাথে রাগ দেখাবো না। তোমার সব কথা শুনবো, তাও তুমি আমার উপর অভিমান করে চলে যেও না। মাআআআ…. ও মাআআআআ…আম্মুইইইইই… যেও না আমায় ছেড়ে….”

জিনিয়া ভীষণ পাগলামি করতে থাকে। টনি আড়চোখে প্রিয়তমার এমন করুণ দশা দেখে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে। মা হারানোর কতটা যে কষ্টের সেটা সে খুব ভালো করেই জানে।

পূর্ণতা নিজেও শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় তার একার পক্ষে জিনিয়াকে সামলানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। জাওয়াদদের মামী ও খালারা এগিয়ে আসে জিনিয়াকে সামলাতে।

মিসেস শেখের খাটিয়ে নিয়ে ছেলেরা বাহিরের দিকে হাঁটা দিলে জিনিয়া ফ্লোরে পা দাপিয়ে কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে একসময় সে অজ্ঞান হয়ে গেলে মহিলারা সবাই ধরাধরি করে তাকে রুমে নিয়ে গিয়ে শুয়ে দেয়।

[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন। ]

শব্দসংখ্যা~২৬৩৫

#চলবে?

[আজকের পর্বটায় অনেকের অনেক অবজেকশন থাকতে পারে। অনেকেই মিসেস শেখের মৃত্যুটা আন্দাজ করে, তাকে বাঁচিয়ে রাখতে বলেছিলেন। বাট সরি, আমার ভাবনাই ছিলো এমনটা।

আবার অনেকে বলেছিলেন, তাকে বাঁচিয়ে রেখে জাওয়াদদের সংসার আলাদা করে দিতে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে, এর চেয়ে মিসেস শেখের মৃত্যুই শ্রেয়।

গতকাল মাইগ্রেনের ব্যথা আর পেইজের কিছু সমস্যার কারণে গল্প দিতে পারি নি। তাই আজ এত বড় পর্ব দিলাম। নেক্সট পর্ব তাড়াতাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করবো ইনশা আল্লাহ। আপনারা একটু বেশি বেশি রেসপন্স করে ২কে+ রিয়াক্ট করে দিয়েন। আর আঞ্জুমানকে কি কি শাস্তি ভোগ করতে দেখতে চান বলে যান।😁

ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply