#শেষ_পাতায়_সূচনা [৫২.২]
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
একেকটি ঘণ্টা, মিনিট, সেকেন্ড যেন কাটতেই চাচ্ছে না শেখ পরিবারের লোকদের। সকলের মাঝেই শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা বিরাজ করছে। সবাই চোখের পানি ফেলে উপরওয়ালার কাছে দোয়া চাইছে, তাদের পরিবারের ছোট্ট সদস্যটি ও মুরব্বি যেন ভালো থাকে। সুস্থ থাকে। এবং তাড়াতাড়িই যেন তাদের কাছে ফিরে আসে।
তাদের অপেক্ষা যেন ফুরোয় না। আসে না কিডন্যাপকারীদের পক্ষ থেকে কোন হুমকির কল বা বার্তা। আস্তে আস্তে দিনের আলো ফুরিয়ে যেতে থাকে। সূর্য্যি মামা পশ্চিম দিকে হেলে পড়বে পড়বে ভাব ঠিক তখনই জাওয়াদের ফোন বেজে ওঠে। সকলকে তটস্থ হয়ে তার দিকে তাকায়।
জাওয়াদ কালবিলম্ব না করে ফোনটা রিসিভ করে কানে চাপে। এই বুঝি তার জন্মদায়িনী ও তার সন্তানের কোন খোঁজ এলো? সত্যিই এসেছে। ফোনটি করেছে খোদ কিডন্যাপের মাস্টারমাইন্ড ব্যক্তিটি।
—”হ্যালো, জাওয়াদ শেখ স্পিকিং। কে বলছেন?”
অপর পাশ থেকে কোন সাড়াশব্দ আসে না। নিস্তব্ধ, শান্ত। জাওয়াদ আরো দুয়েকবার হ্যালো হ্যালো করে। কান থেকে ফোন সরিয়ে নেটওয়ার্কও চেক করে। কিন্তু নেটওয়ার্ক ঠিকই আছে দেখা যায়।
হঠাৎই জাওয়াদের পাশে বসে থাকা মানসিকভাবে ভেঙে পরা পূর্ণতা ফোনটা কেড়ে নিয়ে নিজের কানে চেপে ধরে অস্থির হয়ে বলে–
—”আমি জানি এটা তুমি আঞ্জুমান। তোমার কি চাই আমাকে বলো? টাকা? বাড়ি? গাড়ি? কি চাই একবার আমাকে বলো। আমি পৃথিবী ওলটপালট করে হলেও সেই জিনিসটি তোমার সামনে এনে রাখব। তাও তুমি আমার সন্তানকে আমার কাছে ফিরিয়ে দাও। তোমাকে আমি কথা দিচ্ছি, আমি অনেক দূরে চলে যাবে আমার সন্তানকে নিয়ে। কেউ জানবে না কোথায় যাবো, প্লিজ আমার সন্তানকে আমার কাছে ফিরিয়ে দাও। প্লিজ….প্লিজ…. “
কথাগুলো বলতে বলতে পূর্ণতা কান্নায় ভেঙে পড়ে। জাওয়াদ পাশ থেকে স্ত্রীকে আগলে নেয় নিজের সাথে। অন্যদিকে পূর্ণতার এমন হাহাকার ফোনের অপর পাশের ব্যক্তিটিকে স্বর্গীয় সুখ দেয় যেন। সে নিজের সুখী মনোভাব বুঝাতে উচ্চস্বরে হাসতে থাকে। হাসার ধরণ অনেকটা উন্মাদের মতো।
জাওয়াদ ফোনটা আবারও নিজের হাতে তুলে নিয়ে লাউডস্পিকার অন করে। তারপর নিজেই বলে–
— “আঞ্জুমান তোমার সব শত্রুতা, রাগ আমাদের উপর। তাজওয়াদ তো কিছু করেনি। সে তো এসব বিষয়ের দূরদূরান্ত পর্যন্ত নেই। তাহলে শুধু শুধু আম্মা আর ওকে কিডন্যাপ করে তুমি কি করতে চাইছো?”
—”শান্তি পেতে চাইছি আর পাচ্ছিও।”
হাড়হীম করা ঠান্ডা গলায় আঞ্জুমান বলে ওঠে। হেয়ালি করে বলে আঞ্জুমান–
—”এই যে শহরের সবচাইতে রিচেস্ট, ইয়াংগেস্ট, বিউটিফুল বিজনেস ওমেনকে কাঁদাচ্ছি, এটা কি কম বড় প্রাপ্তি নাকি?”
সে একটু থেমে আবারও বলল–
—”এই পূর্ণতার জন্য আমি কম কাঁদিনি। ও আমার থেকে আপনাকে কেড়ে নিয়েছে, আমার ফুপিমণিকে কেড়েছে, আমার পরিবারের ভালোবাসা কেড়েছে। আমাকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। শেষে, আমার সৌন্দর্য কেড়েছে। ও শুধু আমার থেকে কেড়েইছে। আজ আমার পালা।”
ভয়ংকর প্রতিহিংসা নিয়ে বলে আঞ্জুমান। সে থামতেই ফোনের অপর পাশ থেকে ছোট তাজওয়াদের চিৎকারের আওয়াজ ভেসে ওঠে–
—”মাম্মা…পাপা… আমাল বিচন তান্ডা লাগছে…তুমলা কুতায়? মামণি আমাকে আইস ওয়াটার দিয়ে গুচুল কলাচ্ছে….মাম্মা… ও মাম্মা…”
ধীরে ধীরে তাজওয়াদের চিৎকার আসা বন্ধ হয়ে গিয়ে তার কান্নার আওয়াজ শোনা যেতে থাকে। ছেলের এমন আর্তনাদে পূর্ণতা পাগল হয়ে যায় যেন। ফোনটা আবারও নিজের কানে চেপে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলল–
—”তাজ…সোনা…আব্বু… কেঁদো না সোনা…আঞ্জুমান তোমার দু’টো পায়ে ধরি, আমার ছেলেকে আর কষ্ট দিও না। তোমার যা করার আমার সাথে করো। যত শোধ নেওয়ার আমার থেকে নাও, কিন্তু আমার ছেলেটাকে ছেড়ে দাও।”
তাজওয়াদের কান্না শুনে উপস্থিত সবাইও কাঁদতে থাকে। পাঁচ বছরের ছোট একটা জান, আদো আদো বুলিতে সবার মন জয় করে নিয়েছে প্রথম দিনই। সেই ছোট বাচ্চাটার সাথে কেউ কি করে এমন নিষ্ঠুর আচরণ করতে পারে? কীভাবে পারে নিজের ক্ষোভ মেটাতে?
পূর্ণতার কান্না শুনে আঞ্জুমান আরেক চোট হেঁসে নেয়। এমনভাবে হাসতে থাকে যেন পৃথিবীর সবচাইতে ফানি কিছু শুনেছে। হাসতে হাসতেই বলে–
—”কাঁদো পূর্ণতা বেবি, আরো কাঁদো। তোমার কান্নার আওয়াজ আমাকে শান্তি দিচ্ছে। আরো জোরে জোরে চিৎকার করে কাঁদো….”
পূর্ণতা সত্যি সত্যিই আরো জোরে কাঁদতে থাকে। নিজের নিঃষ্পাপ সন্তানটা তারই কারণে যন্ত্রণা ভোগ করছে কথাটা মনে পরতেই তার কান্নার আওয়াজ আরো বেড়ে যায়।
আঞ্জুমানের হাসি ও পূর্ণতার কান্নার মাঝেই কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পর, আঞ্জুমান নিজের হাসি থামিয়ে বলল–
—”একটা শর্তে আমি তোমার ছেলে আর আমার প্রিয় ফুপিমণিকে ছেড়ে দিতে পারি। বলো রাজি আছো আমার শর্তে?”
পূর্ণতা তার কথা শুনে তড়িঘড়ি করে বলে–
—”হ্যাঁ, হ্যাঁ তো..তোমার সব শর্তে রাজি আছি। কি… কি করতে হবে বলো? স..সবব…কথা শুনবো তোমার। তুমি প্লিজ আমার ছেলেটাকে আর কষ্ট দিও না। বলো কি করতে হবে?”
—”প্রথমে, তোমরা জামাই-বউ শহরে পুলিশের যেই কাহিনি শুরু করেছো সেটা বন্ধ করো আগে। এক্ষুনিই। আমি পরিস্থিতি স্বাভাবিক বুঝলে তারপর আবারও ফোন দিবো। আর হ্যাঁ, যদি আমার সাথে চালাকি করে পুলিশের সাথে হাত মেলাও, তাহলে নিজের ছেলের মু/ন্ডুবিহীন লা//শ দেখার জন্য প্রস্তুত থেকো। বায় বায় ডিয়ার না হওয়া সতীন।”
—”হ্যালো…হ্যালো…না.. না এমন কিছু করো না প্লিজ…”
আঞ্জুমান পূর্ণতার কথা শোনার আগেই কলটা কেটে দিয়েছে।সে কল কাটার পরপরই পূর্ণতা উন্মাদের মতো জাওয়াদকে বলে–
—”জাওয়াদ… পুলিশদের মানা করে দিন খোঁজ চালাতে। এখনই,, আপনি শুনতে পারছেন?নাহয়, আমি আমার ছেলেকে হারিয়ে ফেলবো….হারিয়ে ফেলবো…”
পূর্ণতা আবারও কান্নায় ভেঙে পড়ে। তার সাথে সাথে আরিয়ান, আরওয়া, টনি, জিনিয়া, মি.শেখ, আহনাফ সাহেবও কান্না করতে শুরু করে। তারা সবাই এতক্ষণ পূর্ণতা আর আঞ্জুমানের সব কথোপকথন শুনেছে।
জাওয়াদ পুলিশকে তাজওয়াদদের খোজ চালাতে মানা করলে তার পুলিশ বন্ধু এ নিয়ে তাকে জেরা করা শুরু করলে সে বানিয়ে বানিয়ে বলে,
—”পুলিশরা এত জানান দিয়ে খোঁজ চালালে কিডন্যাপার্সরা সতর্ক হয়ে যাবে। তাই তারা যেন গোপনে অনুসন্ধান চালায়।”
এসব বলার পরও জাওয়াদ আজকে আঞ্জুমানের ফোন করার বিষয়টি জানায় না তাঁকে। পিতা হিসেবে তার মনেও ভয় ঢুকে গিয়েছে সন্তান হারানোর। কিন্তু সে পূর্ণতার এতটা ভেঙে পড়েনি। বরংচ, মনে মনে ভিন্ন কিছু প্ল্যান করতে থাকে। আঞ্জুমানকে এবার সে নিজের হাতে শাস্তি দিবে।
রাত বারো টার দিকে আঞ্জুমান আবারও তাদের ফোন করে, কিন্তু ভিন্ন আরেকটি নাম্বার দিয়ে। আগের নাম্বার দিয়ে নয়। সে তাদেরকে ফোন দিয়ে শহরের বাহিরে একটা আন্ডার কনস্ট্রাকশন সাইটে যেতে বলে তখনই। শুধু পূর্ণতা ও জাওয়াদকে। তাদের দু’জন ব্যতীত আর কেউ না।
জাওয়াদ ও পূর্ণতা তখনই রওনা দেয় আঞ্জুমানের বলা সেই জায়গার উদ্দেশ্যে। তাদের পৌঁছাতে পৌঁছাতে ভোর চারটা বেজে যায়। বহুদিনের পরিত্যক্ত অর্ধনির্মিত ভবনটি মাত্র তিন তলা পর্যন্তই হতে পেরেছিল। এরপর কোন একটি কারণে সেটি তৈরি হওয়া বন্ধ করে দিতে হয়।
পূর্ণতা আর জাওয়াদ সেই বাড়িটির সামনে এসে হর্ণ দিতেই দু’জন গুন্ডা বাড়ির পেছন সাইড থেকে। তাদের দু’জনের হাতেই দেশীয় অস্ত্র রয়েছে। তারা পূর্ণতাদের নিয়ে যায় তিন তলায়।
তারা তিন তলায় এসে দেখে, অর্ধনির্মিত বিশাল ফ্লোরটাকে আলোকিত করা হয়েছে খুব নিন্মমানের লাইট দ্বারা। আর সেই আলোতেই জাওয়াদ ও পূর্ণতা দেখতে পায়, একপাশে মিসেস শেখকে চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার মাথার একসাইড কালচে হয়ে রয়েছে। মনে হচ্ছে, সেখান থেকে দীর্ঘসময় পর্যন্ত রক্ত পড়ে পড়ে একসময় শুকিয়ে জায়গাটা কালো হয়ে গিয়েছে।
জাওয়াদের বুকটা হুহু করে ওঠে মা’কে আহত অবস্থায় দেখে। সে “আম্মা” বলে ডাক দিয়ে ছুটে মিসেস শেখের কাছে যেতে চায়, কিন্তু তার পথরোধ করে দাঁড়ায় দু’জন মোটাসোটা গুন্ডা। জাওয়াদ জোরজবরদস্তি করে যেতে চাইলে তারা তাকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়। পূর্ণতা তড়িঘড়ি করে গিয়ে স্বামীর পাশে বসে তাকে মাটি থেকে তুলে।
—”ওয়েলকাম.. ওয়েলকাম মি. এন্ড মিসেস জাওয়াদ শেখ। আজ অনেকদিন পর আপনাদের সাথে দেখা হয়ে ভীষণ ভালো লাগছে। তা আসতে এত দেরি হলো যে? এতক্ষণ তো লাগার কথা নয়।”
শেষের কথাটি কিছুটা সন্দেহজনক মনে জিজ্ঞেস করে।
জাওয়াদ ও পূর্ণতা আঞ্জুমানের দিকে নিজেদের পূর্ণ দৃষ্টি স্থাপন করলে তারা দেখতে পায়, বিকৃত মুখাবয়বের আঞ্জুমান ও তার পাশেই একজন সুশ্রী ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে আছে।
জাওয়াদ তার মনের সন্দেহ দূর করতে বলল–
—”এই আঁধারে বাড়িটা খুজে পেতে বেগ হয়েছে আমাদের। তাই আসতে দেরি হয়ে গিয়েছে।”
তারপর আঞ্জুমানের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তা মহিলাটির দিকে রাখলে সে যেন সাত আসমানের উপর থেকে পড়ে। সে কখনো কল্পনাও করতে পারেনি এই মহিলা আঞ্জুমানের সাথে জড়িত।
—”ছোট মামাণি, আপনি?”
অসুস্ফট স্বরে বলে ওঠে জাওয়াদ। আঞ্জুমানের মা তার ডাক শুনে ঠোঁট এলিয়ে হেঁসে বলল–
—”হ্যাঁ জাওয়াদ বাবা, আমি, তোমার প্রিয় ছোট মামানি।”
—”আপনি এখানে কি করে? তার মানে আপনিও ওর সাথে জড়িত?”
—”হ্যাঁ, তোমরা সবাই যখন আমার মেয়েটার সাথ দেওয়া ছেড়ে দিলে তখন আমাকেই ওর ভরসা যোগ্য সাথী হতে হলো।”
জাওয়াদ তার কথা শুনে প্রচণ্ড রেগে যায়। তারা সাথ দেওয়া ছেড়ে দিয়েছে আঞ্জুমানের? নাকি আঞ্জুমান নিজের কৃতকর্মের জন্য আজ সকলকে হারিয়েছে?
—”আমরা ওর সাথ দেওয়া ছেড়ে দেই নি মামানি, বরং ও নিজের কারণে সবাইকে হারিয়েছে।”
জাওয়াদের কথা শুনে আঞ্জুমান ক্ষেপে যায়। সে ক্ষিপ্ত গলায় বলল–
—”আমি হারাতাম না, যদি না পূর্ণতা আমার লাইফে, আমাদের মাঝে ইন্টারফেয়ার করত। ও জিনিয়াকে কিডন্যাপ করে আপনাকে কেন বিয়ে করলো? ভালোবাসলেই কি বিয়ে করতে হবে? ও শুধু নিজের জেদ বজায় রাখার জন্য আপনাকে বিয়ে করেছে। আর আমার স্বপ্ন চুরমার করে দিয়েছে। ওর জন্য আমি আজ নিঃস্ব।”
পূর্ণতার দিকে তাকিয়ে হিংস্র বাঘিনীর ন্যায় ফুঁসতে ফুঁসতে কথাগুলো বলে আঞ্জুমান। তার কথার পৃষ্ঠা জাওয়াদ মনে মনে আফসোস বোধই করে। কিন্তু এবার আগের মতো রেগে না গিয়ে শান্ত গলায় বলল–
—”ওরও কোন দোষ নেই। তোমরা শুধু সেটুকুই জানো, যেটুকু দেখেছো বা আমি জানিয়েছি। এর পেছনেও কিছু কারণ আছে যার জন্য পূর্ণতা আমাকে জোর করে বিয়ে করেছে।”
জাওয়াদের কথা শুনে অর্ধ অচেতন মিসেস শেখ, জিনিয়া ও তার মা অবাক হয়ে যায়। এত বছর পর তারা এসব কি শুনছে? তারা এতদিন জেনে এসেছে পূর্ণতা বিয়েটা শুরুতে নিজের জেদ পূরণ করার জন্যই করেছিল। বিয়ের পর হয়ত সে জাওয়াদকে ভালোবেসেছে। কিন্তু আজ জাওয়াদের কথা শুনে বুঝতে পারছে তাদের জানা ও ভাবনায় বড়সড় একটা ভুল রয়েছে।
জাওয়াদ আঞ্জুমানের বিস্মায়াবিষ্ট মুখখানা দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর বলতে শুরু করে –
—”পূর্ণতা আমাকে প্রথমবার প্রপোজ করার পর, আমি ওকে আমার এনগেজমেন্টের কথা জানিয়ে রিজেক্ট করে দেই। ও সেই রিজেকশন নিতে পারে না এবং দিনকে দিন ডিপ্রেশনে ডুবে যায়। ও ওর বাবার একমাত্র সন্তান হওয়ায় ওর বাবা নিজের সন্তানের মানসিক কষ্ট না দেখতে পেয়ে আমার সাথে কথা বলে। এবং আমাকে প্রস্তাব দেয়, আমি যদি পূর্ণকে বিয়ে করি তাহলে উনি উনার সকল সম্পত্তি আমার নামে লিখে দিবেন। উনার এই প্রস্তাবের কথা পূর্ণতা জানত না, তবুও ওকেই আমি শাস্তি দিয়েছিলাম।
আমার মতো একজন মানুষের কাছে এমন একটা প্রস্তাব ভীষণই অসম্মানজনক ছিল। বিধায় আমি উনাকে কিছু না বললেও, সেদিনই পূর্ণতাকে একা ডেকে অনেক অপমান করি ওকে আর ওর ভালোবাসাকে। প্রশ্নবিদ্ধ করে বলি, ও কি আদৌও আমাকে ভালোবাসে নাকি নিজের জেদ বজায় রাখা জন্য আমাকে বিয়ে করে নিজের দাস বানাতে চায়? এসব বলে চলে আসি।
পূর্বের রিজেকশনের বিষয়টা পূর্ণতা মেনে নিলেও, নিজের ভালোবাসাকে অপমান ও প্রশ্নবিদ্ধ হওয়াটা মানতে পারে না। তখন গিয়ে ও আমায় জেদ করে বিয়ে করেছে। পূর্ণতা শুরু থেকেই আমায় ভালোবাসত। সেই ভালোবাসাটাকে প্রমাণ করতেই, ওর সম্পর্কে আমার ভাবনাগুলো ভুল প্রমাণ করতেই ও আমায় বিয়ে করে এবং আমার বাসাতে এসেই সংসার করতে শুরু করে। আম্মাকে জিজ্ঞেস করো তুমি, পূর্ণতা একটা দিনের জন্যও এমন কোন আচরণ করেছে কিনা যেটা আমায় কষ্ট দিবে বা ছোট করেছে? আমি বলছি, ও করেনি। ওর ভালোবাসার গ্যারান্টি আমি জাওয়াদ নিজে।
আর তুমিই তো বললে আঞ্জুমান, ভালোবাসলেই পেতে হবে কিনা? তাহলে তুমি কেন আমাদের পিছ ছাড়ছো না? তুমি যদি আমায় সত্যিই ভালোবেসে থাকতে, তাহলে যখন দেখলে আমি পূর্ণতাকে মেনে নিচ্ছিলাম তখনই তুমি আমার সুখের কথা ভেবে দূরে সরে যেতে আমাদের সম্পর্কের মাঝ থেকে। কিন্তু তুমি সেটা করলে না। কি করলে তুমি? আমার মায়ের সাথে মিলে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলে। আমরা দু’জন ভালোবাসার মানুষ কতগুলো বছরের জন্য আলাদা হয়ে গেলাম, পূর্ণতা তার একমাত্র আপনজন হারালো তোমাদের কারণে।
সত্যি বলতে তুমি যা কিছু হারিয়েছো সেটা তোমার নিজের জন্য। আম্মাকে এবং তোমার বাকি আপনজনদের। পূর্ণতার জন্য নয়। কিন্তু পূর্ণতা আর আমি আমাদের জীবনের থেকে যেসব সুন্দর মুহূর্ত গুলো হারিয়েছি সব তোমার জন্য। তুমি আমাকে কোনদিন ভালোই বাসো নি, আজও না। আমি শুধু তোমার একটা নোংরা জেদ। তুমি আমায় নিয়ে পূর্ণতার কাছে হারতে চাও না, তাই এত ষড়যন্ত্র, কষ্ট দিচ্ছো আমাদের।”
জাওয়াদের থেকে সত্য নামক তিক্ত কথাগুলো শুনে আঞ্জুমান বিবেকশূন্য হয়ে পড়ে। তার মস্তিষ্ক কিছুতেই এসব সত্য মেনে নিতে চায় না। তাই সে চেঁচিয়ে বলে ওঠে–
—”এসব মিথ্যে, সব মিথ্যে। পূর্ণতার আগে আমি আপনাকে ভালোবেসেছি। আপনি আমার ভালোবাসাকে এভাবে অপমান করতে পারেন না।”
জাওয়াদ এবার তাচ্ছিল্য করে বলল–
—”তাই? তাহলে আমার সুখের কথা ভেবে আমার সন্তান ও মাকে ছেড়ে দিয়ে প্রমাণ করো তোমার ভালোবাসা খাঁটি।”
জাওয়াদ মূলত আঞ্জুমানের সাথে ব্রেন গেইম খেলে অযথা সময় নষ্ট করছে। যাতে এই ফাঁকে আরিয়ানরা নিজেদের কাজে সফল হতে পারে। হ্যাঁ, জাওয়াদদের সাথে আরিয়ানর, টনি ও তার ভাড়াটে কিছু গুন্ডা রয়েছে।
তারা পৌঁছেছে তিনটার দিকেই, গাড়িটি নির্দিষ্ট জায়গা থেকে খানিকটা দূরে থামায়। তারপর এই একঘন্টা ধরে নিজেদের মতো প্ল্যান করে কিভাবে তারা আঞ্জুমানকে ধরবে।
জাওয়াদ আঞ্জুমানকে এবার পুলিশের হাতে তুলে দিবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পূর্বে একবার তো পূর্ণতা দিয়েছিল তাকে আইনের হাতে, কিন্তু সে কোন একভাবে ঠিকই পালিয়ে গিয়েছে। এবার দেওয়ার পরও যে পালাবে না, তার কি গ্যারান্টি রয়েছে। তাই এবার সে নিজেই আঞ্জুমানকে শাস্তি দিবে।
তাদের প্ল্যান হলো, তাদের অবস্থানরত বাড়িটি যেহেতু অর্ধ নির্মিত তাই এটার পেছন দিক দিয়ে আরিয়ানরা সদলবলে ঢুকে তাদের উপর অতর্কিত হামলা করবে আঞ্জুমানের ভাড়াটে গু”ন্ডাদের উপর। এছাড়া এই অর্ধনির্মিত বাড়িটি একটু জঙ্গল সাইডে করায় পেছনের দিকে অসংখ্য গাছপালার মাঝ দিয়ে আসলে তারা টেরও পাবে না।
আঞ্জুমান জাওয়াদের কথা শুনে কিছুক্ষণের জন্য পাজেলড হয়ে যায়। তার মস্তিষ্ক সাথে সাথেই কাজ করে না। সে দ্বিধান্বিত হয়ে নিজের মায়ের দিকে তাকালে তার মা তাকে টেনে একটু দূরে নিয়ে যায়। আর বলে–
—”দেখ মা, আমার মনে হচ্ছে ও তোকে কথার জালে ফাঁসাতে চাচ্ছে। তুই ওকে বল পূর্ণতাকে আজই মৌখিক তালাক দিয়ে তোকে বিয়ে করতে তাহলেই তুই ওর মা ও ছেলেকে ছাড়বি। কিছু সময় ছেড়ে দেওয়ায় নয়, ছিনিয়ে নেওয়াতেই প্রকৃত সুখ থাকে।”
আঞ্জুমান তার মায়ের কথাই মেনে নেয়। সে জাওয়াদদের সামনে ফিরে এসে বলল–
—”আমি আমার ভালোবাসার প্রমাণ দিবো, কিন্তু আপনারও আমার হয়েই থাকতে হবে। আপনাকে এখন, এই মুহূর্তে পূর্ণতাকে মৌখিক তালাক দিতে হবে এবং আমায় বিয়ে করতে হবে। তাহলেই আমি আপনার মা ও ছেলেকে ছেড়ে দিবো। আপনি যদি তা না করেন, তাহলে আজ আপনার সামনেই আপনার মা-ছেলেকে মেরে ফেলবো।”
আঞ্জুমানের শর্তটি শুনে জাওয়াদ-পূর্ণতা দু’জনই স্তব্ধ, হতভম্ব হয়ে যায়। আপনজনদের প্রাণের বিনিময়ে বিচ্ছেদ?
আঞ্জুমান ওদের থমকে যেতে দেখে বাঁকা হাসে। তারপর গলা উঁচিয়ে বলে–
—”রাফি…”
আঞ্জুমানের পেছনে একটা রুম ছিলো, সেই রুম থেকে একটা মাঝবয়সী ছেলে বের হয়ে আসে আঞ্জুমানের ডাক শুনে। ছেলে এসে তার কাছে এসে বলল–
—”জি ম্যাডাম।”
—”আমি এক থেকে পাঁচ গুনবো। এর মধ্যে যদি আমার তরফ থেকে কোন আদেশ না পাস, তাহলে ঐ ঘরে থাকা পিচ্চিটার ধর থেকে মুন্ডুটা আলাদা করে দিবি।”
—”ওকে ম্যাডাম।”
রাফি নামক ছেলেটি তার মনিবের আদেশ পালনে নেমে পড়ে। এদিকে পূর্ণতার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে আঞ্জুমানের কথা শুনে। জাওয়াদ ভাবনায় পড়ে যায়, আরিয়ানরা এখনও কেন আসছে না?
—”এক….”
আঞ্জুমান গণনা শুরু করতেই জাওয়াদ ঘাবড়ে যায়। সে তড়িঘড়ি করে বলে–
—”এসব কি বলছো তুমি? আমার ভালোবাসার মানুষ, আমার স্ত্রী , আমার সন্তানের মা পূর্ণ। ওকে আমি কোন মূল্যেই তালাক দিবো না।”
—”তাহলে সন্তান আর মায়ের লাশ দেখার জন্য প্রস্তুত হয়ে যান। দুই….”
—তিন….
—”শালি তোর এত বউ সাজার সখ কেন? একবার আমার বউ, আরেকবার জাওয়াদ ভাইয়ের। আজ তোর সব সখ জন্মের মতো ঘুচিয়ে দিবো।”
হঠাৎই অনেকদিন পর অতিপরিচিত একটা কণ্ঠস্বর শুনে আঞ্জুমান ঘাবড়ে যায়। উক্ত কথাটি বলা ব্যক্তিটি আর কেউ না বরং আরিয়ানই। তাও আঞ্জুমান ঘাড় ঘুরিয়ে সিউর হওয়ার জন্য একবার দেখতে চায় তাকে, কিন্তু নিজের গলার কাছে কিছু একটা অস্তিত্বের আভাস পেয়ে তার আর পেছনে ফিরে তাকানো হয় না। সে চোখ নিচের দিকে নামালে দেখতে পায় তার গলায় একটা ঝা চকচকে ছু”ড়ি ধরে রাখা হয়েছে। একটু এদিক-ওদিক হলেই তার ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যাবে।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন।]
শব্দসংখ্যা~২৪০০+
[আঞ্জুমানকে জাওয়াদ-পূর্ণতা যেন নিজেদের হাতে শাস্তি দিতে পারে তাই পর্বটা এমনভাবে সাজানো হয়েছে। কিছুটা এলোমেলো লাগতে পারে। আমি এই পর্বটা নিয়ে একটু ভীত বোধ করছি। অসংগতি পেলে কমেন্ট করে জানাবেন।
বিশাল বড় একটি পর্ব দিয়েছি। সবাই বেশি বেশি রেসপন্স করে ২কে রিয়াক্ট করে দিয়েন।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স।
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৫.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৪.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৩.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১০
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৭
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৮.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৭