Golpo কষ্টের গল্প শেষ পাতায় সূচনা

শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫২.১


#শেষ_পাতায়_সূচনা [৫২.১]

#সাদিয়া_সুলতানা_মনি

নিজের কাজ শেষ করে গুনগুন করতে করতে জাওয়াদ হোটেলের রুমে প্রবেশ করে। ডোর লক করে চাবিটা পকেটে ভরে সামনে তাকাতে সে থমকে যায়। মেরুন রঙের চুরিদার পরিহিত সদ্য স্নান শেষ করে বের হওয়া পূর্ণতাকে দেখে জাওয়াদ যেন শ্বাস নিতেও ভুলে যায়। স্বামীর ভালোবাসা গায়ে মাখার পর তার জেল্লা আরো বেড়েছে বোধ করি। নাহয় জাওয়াদ মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাকিয়ে থাকবে কেন তার দিকে?

জাওয়াদ ঘোরের মাঝেই ডুবে এক পা এক পা করে এগিয়ে যেতে থাকে পূর্ণতার দিকে। সে যতই পূর্ণতার দিকে এগোচ্ছে, ততই তার মধ্যে অশান্তি বেড়েই চলেছে। পূর্ণতা শরীর থেকে ভেসে আসা এক মনোমুগ্ধকর ঘ্রাণ তাকে আরো বেশি সম্মোহন করে তুলছে পূর্ণতার প্রতি।

জাওয়াদ যখন পূর্ণতার পেছনে এসে উপস্থিত হয়, তখনও পূর্ণতা বেখবর জাওয়াদের আগমন সম্পর্কে। কারণ সে বর্তমানে নিজের কামিজের পেছনের চেইন লাগাতে একপ্রকার যুদ্ধ করছে। পিঠের মাঝামাঝি পর্যন্ত লাগানোর পর তার হাত আর নাগাল পাচ্ছে না চেইনটার, যার কারণে তার এই যুদ্ধ।

জাওয়াদ হা করে চোখ দিয়েই গিলতে থাকে পূর্ণতার শুভ্র পিঠের সৌন্দর্য। চুল গুলো সামনে নিয়ে রাখার কারণে, বাম পাশের কাঁধের লাল লাল গোল দাগ গুলো খুব সহজেই তার চক্ষুগোচর হয়। সেই দাগগুলো দেখে জাওয়াদ আরো হাসফাস করতে থাকে। পূর্ণতাকে নিয়ে আবারও ডুব দিতে ইচ্ছে করে প্রণয়ের সাগরে। মেয়েটাকে আদরে আদরে নাজেহাল করে দিতে ইচ্ছে হয় কাল রাতের মতোই।

কিন্তু না! জাওয়াদ তা মোটেই করে না। নিজের অবাধ্য, নির্লজ্জ, লুচু মনটাকে কড়া গলায় ধমক দিয়ে চুপ করায় তাকে এসব লুচু কাজ না করার প্ররোচনা না দিতে এখন। তারপর হাত বাড়িয়ে সন্তর্পণে পূর্ণতার জামার চেইনটা লাগিয়ে দেয়। পিঠে কারো স্পর্শ পেয়ে পূর্ণতা হকচকিয়ে গিয়ে দ্রুত আয়নার দিকে তাকালে জাওয়াদকে দেখতে পায় সে। জাওয়াদও তখনই নিজের কাজ শেষ করে আয়নায় দৃষ্টি স্থাপন করেছিল। যার কারণে দু’জনের চোখাচোখি হয়ে যায়।

পূর্ণতা সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকালে তার কাছে ধরা পড়ে যায় জাওয়াদের ঘোরলাগা দৃষ্টি। এতেই যেন মেয়েটা লজ্জায় আরো নুইয়ে যায়। ঝটপট নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নেয় জাওয়াদের থেকে। সে নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে,

—”আজ কেন এত লজ্জা পাচ্ছি আমি? জাওয়াদকে দেখলেই আমার চিবুক জোড়া কেন লজ্জার লালিমা ছড়িয়ে পড়ছে? “

প্রশ্ন থাকলেও, উত্তর পূর্ণতার জানা নেই। তার ভাবনার মাঝেই জাওয়াদ তাদের নৈকট্য বাড়ায়। নিজের বলিষ্ঠ হাত দ্বয় দ্বারা পূর্ণতার কোমড় পেঁচিয়ে ধরে তার বুকের সাথে পূর্ণতার পিঠ লাগিয়ে দেয়। তারপর পূর্ণতার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করে–

—”কোথাও ব্যথা হচ্ছে? বা অস্বস্তি?”

জাওয়াদের প্রশ্ন শুনে পূর্ণতা পারে না মাটি ফাঁক করে ভেতরে চলে যেতে। আরে ভাই! তার কোন ব্যথা বা অস্বস্তি হলে সে কি নিজের খেয়াল রাখতে পারবে না? নাকি পূর্ণতাকে লজ্জা দেওয়ার জন্যই এই পুরুষ এমন অদ্ভুত প্রশ্নটি করলো? পূর্ণতার জানা নেই। কিন্তু প্রশ্নের উত্তরখানাও দিল না।

জাওয়াদ নিজেই আবার বলে ওঠে–

—”না মানে, কাল পাগলামিটা একটু বেশিই হয়ে গিয়েছিল আমার। তোমার জন্য কষ্টকর হয়ে গিয়েছিল কালকের রাতটা। সরি ফর দ্যাট। কিন্তু আমি আমার ছেলের বোন আনার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, তাই…….”

পূর্ণতা পেছনে ঘুরে জাওয়াদের মুখ চেপে ধরে। লজ্জায় বেচারি লাল টমেটো হয়ে গিয়েছে। সে চোখেমুখে একরাশ লজ্জা নিয়ে মেকি রাগ দেখিয়ে বলল–

—”চুপ করবেন? নাকি আমি সুচ-সুতা দিয়ে আপনার মুখ সেলাই করে দিবো? কিছু বলছি না দেখে তখন থেকে লজ্জা দিয়েই যাচ্ছেন। এর বেশি কিছু বললে, আজ আপনার একদিন কি আমার যতদিন লাগে।”

জাওয়াদ পূর্ণতার রাগ দেখে হেঁসে দেয়। নিজের ব্যান্ডজ করা বাম হাত উঠিয়ে ঠোঁটের উপর পূর্ণতার হাতটা চেপে ধরে পরপর কয়েকটা চুমু খায়। পূর্ণতা জাওয়াদের মুখ দেখে দৃষ্টি ঘুরিয়ে অন্যদিকে নেওয়ার সময় তার নজরে পড়ে ব্যান্ডেজকৃত হাতটির দিকে। হাতটি পুরোটা ব্যান্ডেজ করা। আঙ্গুল গুলো সহ। এবং ব্যান্ডেজটার দুয়েক জায়গায় লালও হয়ে আছে।

পূর্ণতা ভয়াবহ রকমের চমকে যায় জাওয়াদের হাতটা দেখে। কাল রাত অব্দিও ভালো ছিল, তার স্পষ্ট মনে আছে এটা। কত অবাধ্য আদর, দুষ্টুমি, যত্ন নিলো হাতটা। কিন্তু আজ দিনের আলো ফুটতে না ফুটতেই এমন বিশ্রীভাবে আহত হলো কিভাবে হাতটা?

পূর্ণতাকে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে থমকে যেতে দেখে জাওয়াদ তড়িঘড়ি করে তাকে ছেড়ে দিয়ে অন্যদিকে চলে যেতে চায়। কিন্তু পূর্ণতা তা হতে দেয় না। সে ঐ আঘাত প্রাপ্ত হাতটাই আলতো হাতে ধরে শীতল গলায় বলে–

—”একটাই প্রশ্ন করবো, আর একটাই উত্তর শুনতে চাই। মাঝের মানে, ইয়ে, আসলে এসব না। হাতটা কিভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হলো?”

জাওয়াদ কি ব্যাখ্যা দিবে ভেবে পায় না। ইতিউতি করে পালানোর পথ খুঁজতে থাকে, কিন্তু সেটাও রুদ্ধ দেখে জাওয়াদ সিদ্ধান্ত নেয় সত্যিটাই বলে দিবে। সে পূর্ণতার কপালের উপর এলোমেলো হয়ে থাকা খুচরো চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিতে দিতে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল–

—”অন্যায় করেছিলো হাতটা, তাই শাস্তি দিয়েছি।”

পূর্ণতা তার কথা শুনে খানিক ভরকে যায়। ত্যাছড়া গলায় জিজ্ঞেস করে–

—”আর সেই অন্যায়টা কি ছিলো, যার জন্য হাতটাকে এমন বাজে ভাবে আহত করলেন?”

—”আমরা নিজের অজান্তে যেই কাজগুলো করি সেগুলো ভুল বলে অ্যাখ্যায়িত করা হয়। কিন্তু একই ভুল বারবার করলে সেটা আর অজান্তে হয় না, আর নাই বা সেই কাজটাকে ভুল বলা যেতে পারে। তখন সেটার নাম হয়ে যায় অন্যায়। আর অন্যায় করলে তৎক্ষনাৎ শাস্তি দিয়ে দিতে হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সেই কাজটা করার আর সাহস হয়ে ওঠে না। ইউ নো হোয়াইট আই মিন টু সে।”

পূর্ণতা হৃদয় দোল দিয়ে ওঠে জাওয়াদের কথাগুলো শুনে। ভালোলাগারা তাকে প্রশ্রয় দিয়ে বলে–

—”লোকটা দিনদিন জেন্টলম্যান হয়ে যাচ্ছে। তোর একান্ত জেন্টলম্যান পূর্ণতা।”

পূর্ণতা ও জাওয়াদ একে অপরের দৃষ্টি দৃষ্টি স্থাপন করে রাখে অগণিত সময়। যেনো বহুবছরের চোখের তৃষ্ণা মিটিয়ে নিচ্ছে তারা। যদিও নিজের অতিনিকটে দাড়িয়ে থাকা নারীটিকে জাওয়াদ পূর্বেও অসংখ্য বার দেখেছে, কিন্তু আজ যতই দেখছে ততই যেন নতুন ভাবে আবিষ্কার করছে নারী টিকে।

আজ ভোরে পূর্ণতাকে অসম্ভবরমকের জ্বালানোর পর তারা দু’জনেই ক্লান্তদেহ নিয়ে নিদ্রায় ডুবে যাওয়ার আগে জাওয়াদ বেডসাইড ড্রয়ার থেকে একটা ছোট বক্স বের করে। অতিরিক্ত ক্লান্তি, অনাহার ও দূর্বলতার কারণে পূর্ণতা যখন প্রায় ঘুমিয়ে পড়বে পড়বে ভাব তখনই সে নিজের নাকে জাওয়াদের হাতের স্পর্শ অনুভব করে। জনাব তার নাকে কিছু একটা করছে। মৃদু ব্যথায় পূর্ণতা ককিয়ে উঠতেই জাওয়াদ তটস্থ ভঙ্গিমায় বারবার তার কাছে মাফ চাইতে থাকে এত জ্বালানোর জন্য।

—”সরি জান, অনেক অনেক সরি। আজ রাতের মতো আর জ্বালাবো না, দুইটা সেকেন্ড অপেক্ষা করো শুধু। হয়ে গিয়েছে আমার কাজটা।”

পূর্ণতা তখন চোখ বন্ধ রেখেই দূর্বল হয়ে যাওয়া গলায় জিজ্ঞেস করে–

—”কি করছেন আপনি আমার নাকের সাথে?”

—”কিছু না জান, জাস্ট তুমি যে একজন বিবাহিত মহিলা ও এক বাচ্চার মা সেটার একটা ক্ষুদ্র চিহ্ন দিলাম। হয়ে গিয়েছে। নাও এখন তুমি ঘুমাতে পারো।”

কথাটা বলে জাওয়াদ পূর্ণতার নাকে ঠোঁট দাবিয়ে একটা চুমু খায়। জায়গাটা এই অল্প আলোতেও নিজের দ্যুতি ছড়াচ্ছে বেশ। পূর্ণতাকে ডায়মন্ডের নাক ফুলটা পরিয়ে জাওয়াদ নিজেও তৃপ্ত দেহ-মন নিয়ে তন্দ্রায় ঢলে পড়েছিল।

আজ দিনের আলোতে নিজের অর্ধাঙ্গিনীকে তারই সত্ত্বার একটা ক্ষুদ্র পরিচয় বহন করতে দেখে জাওয়াদের মনটা ভালো লাগায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়। পূর্ণতার সুশ্রী মুখের দিকে একধ্যানে তাকিয়ে থাকে।

বিশেষ করে তার নাকের দিকে। নিজের দিকে এমন একধ্যানে জাওয়াদকে তাকিয়ে থাকতে দেখে পূর্ণতা ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসির ঝলক নিয়ে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে–

—”কি দেখছেন এমন হা করে? রূপ বেড়ে গিয়েছে আমার?”

জাওয়াদ ঘোর লাগা কণ্ঠে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বলল–

—”তা তো বেড়ে গিয়েছেই। একদম নতুন বউ লাগছে তোমাকে। আমার আমার লাগছে তোমাকে। পরিপূর্ণ লাগছে।

এন্ড অল ক্রেডিট গোজ টু মি। কারণ, এসবই তো আমার আদরের কারণেই হয়েছে।”

শেষোক্ত কথাটি জাওয়াদ দুষ্টুমিপূর্ণ গলায় বলে। পূর্ণতা তার কথা শুনে লজ্জা পেয়ে যায়, তাই সে তাঁকে আস্তে করে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে সোফার দিকে হেঁটে যেতে যেতে বলে–

—”যত্তসব আজাইরা আলাপ। সারারাত জাগিয়ে রেখে দিনের বেলা বলছে আমার রূপ বেড়ে গিয়েছে। খাবার অর্ডার করুন, খেয়ে বাসা যাবো। ছেলেটাকে কাল থেকে দেখতে পারছি না শুধুমাত্র আপনার জন্য। আপনাকে তো আমিইইই……”

পূর্ণতা রেগে কথাটা শেষ করার আগেই তাদের দরজায় নক করে কেউ। জাওয়াদ আপাত বিপদ থেকে বাঁচার জন্য তড়িঘড়ি করে দরজা খুলে দেখে ওয়েটার এসেছে তার অর্ডারকৃত খাবার দিতে। জাওয়াদ খাবারের ট্রলিটা নিয়ে ওয়েটারকে বিদায় দিয়ে দরজা লাগিয়ে পূর্ণতার কাছে চলে আসে। তারপর একে একে সব খাবারগুলো দু’জনে টি-টেবিলের উপর রেখে হাত ধুয়ে আসে।

পূর্ণতা খেতে খেতে খেয়াল করে জাওয়াদ একহাত দিয়ে খেতে পারছে না তেমন একটা। বাম হাতটার অবস্থা এতটাই খারাপ যে, সেটা দিয়ে কিছু ধরার কথা ভাবাও পাপ হবে। তাই সে মুখের খাবারটা শেষ করে জাওয়াদকে জিজ্ঞেস করে–

—”হেল্প লাগবে খেতে?”

—”করলে তো সোনায় সোহাগা।”

পূর্ণতা জাওয়াদের প্লেট নিজের দিকে টেনে নিয়ে ভাত মাখতে মাখতে বলল–

—”আপনাকে সাহায্য করাই উচিত নয়, নেহাৎ আমার দয়ার শরীর আর আপনার হাত টাও আমার জন্যই আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। তাই বরাবরের মতোই বেশি কঠোর হতে পারলাম না।”

আহা! দয়ার শরীর! বরাবরের মতো নাকি বেশি কঠোর হতে পারলো না! চমৎকার সব কথা শুনে জাওয়াদ খালি মুখেই বিষম খায়। অল্প একটু পানি খেয়ে গলাটা ভিজিয়ে নিয়ে পূর্ণতা দিকে ফিরে বসলে, পূর্ণতা তাকে খাইয়ে দিতে থাকে ও নিজেও খেতে থাকে।

খাওয়াদাওয়া শেষ করে মুখহাত ধুয়ে জাওয়াদ কি মনে করে তার পকেট থেকে ফোনটা বের করে। দেখে কাল রাতে বন্ধ করা ফোনটা এখন অব্দি খুলেনি সে। মনে মনে জিভ দাত দিয়ে কেটে ফোনটা অন করলে একের পর এক কল, মেসেজের নোটিফিকেশন আসতে থাকে। সবগুলোই জিনিয়া, টনি, তার বাবার নাম্বার থেকে করা। বাসা থেকে এতগুলো কল আসতে দেখে স্বভাবতই জাওয়াদের মনটা কেমন খচখচ করে ওঠে। তাই সে জিনিয়াকে তৎক্ষনাৎ ফোন দেয়।

দুটো রিং হওয়ার পরপরই জিনিয়া কলটা রিসিভ করলে, জাওয়াদই প্রথমে প্রশ্ন করে–

—”জিনি, এতবার কল দিয়েছিস কেন? বাসার সবাই ঠিক আছে তো? আম্মা, আব্বা, তাজওয়াদ ওরা ঠিক আছে তো?”

—”কিচ্ছু ঠিক নেই ভাইয়া। তুমি যেখানেই আছো তাড়াতাড়ি বাসায় আসো। অনেক বড় বিপদ হয়ে গিয়েছে।”

কথাটা বলে জিনিয়া হাউমাউ করে কাদঁতে থাকে। জিনিয়া এই কয়েক বছরে একজন শক্তচিত্তরে মেয়েতে পরিণত হয়েছে। নিজেকে সে তার প্রিয় ভাবীপুর প্রতিচ্ছবি হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে এই বিগত বছরগুলোয়। এবং অনেকটা সফলও হয়েছে।

বোনকে এমন করে কাঁদতে জাওয়াদ সম্ভবত সেই পাঁচ বছর আগেই দেখেছে। তাই আজ এতগুলো বছর পর জিনিয়াকে এমন পাগলের মতো কাঁদতে দেখে তার বুকে চাপ লাগে। বিভিন্ন নেগিটিভ চিন্তা ভাবনা এসে নিমিষেই ভর করে তার মস্তিষ্কে। সে অস্থির হয়ে আবারও সুধায়–

—”কি হয়েছে বোন? এমনভাবে কাঁদছিস কেন?”

জিনিয়া এখনই ভাইকে কিছু বলে না। বললে ভাই বাসায় আসতে তাড়াহুড়ো করে গাড়ি চালাবে, তখন আল্লাহ না করুন তাদেরও যদি ভালো-মন্দ কিছু একটা হয়ে যায় তাহলে তো তারা সকলেই মাঝ সমুদ্রে পরবে। এসব ভেবেই জিনিয়া নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে ভাঙা ভাঙা গলায় বলে–

—”ভাইয়া তোমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাসায় আসো। ফোন বলতে পারছি না আমি। প্লিজ ভাই তাড়াতাড়ি আসো নাহলে অনেক বড় বিপদ হয়ে যাবে।”

কথাটা বলেই জিনিয়া ফোনটা কেটে দেয়। জাওয়াদ স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে থাকে ফোনটা হাতে নিয়ে। ইতিমধ্যে সে দুঃশ্চিতার দরুন ঘেমে ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। পূর্ণতাও রুমেই উপস্থিত থাকায় সে অস্থির ভঙ্গিমায় জাওয়া দের কাছে এসে তার বাহু ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল–

—”অ্যাঁই, কি হয়েছে? জিনু কি বললো? সবকিছু ঠিক আছে তো? কি হলো বলছেন না কেনো?”

জাওয়াদ পূর্ণতার দিকে তাকিয়ে শুধু এইটুকুই বলে–

—”কিচ্ছু ঠিক নেই সম্ভবত। জিনিয়া ভীষণ কাঁদছিল আর যতদ্রুত সম্ভব আমাদের বাসায় যেতে বলছিল। “

পূর্ণতার বুকে চাপ লাগে জাওয়াদের থেকে এসব শুনে। কি হয়েছে বাসায়? সবাই ঠিক আছে তো? আচ্ছা তার যক্ষের ধনের কিছু হয়নি তো? কথাটা মনে হতেই পূর্ণতার বুকের বাম পাশ কেমন একটা করে ওঠে। তারা আর এক মুহূর্ত দেরি না করে বাসার উদ্দেশ্য রওনা হয়ে যায়।

_________________________________

ক্লান্ত-শ্রান্ত পায়ে টলতে টলতে জাওয়াদ বাসায় ফিরে আসে। সদর দরজা হা করে খোলা ছিলো বলেই সে বাসায় প্রবেশ করতেই তার উপর নজর এসে পড়ে কয়েক জোড়া চোখের। সবাই ভীষণ আশা নিয়ে এগিয়ে যায় তার দিকে। বিশেষ করে জাওয়াদের সবচাইতে প্রিয় নারীটি, যে কিনা গত বিশ ঘন্টা ধরে নিজের সন্তানকে হারিয়ে পাগলপ্রায় দশা।

পূর্ণতা দূর্বল পায়েই ছুট লাগায় জাওয়াদের দিকে। তার হাতে যে স্যালাইনের নল লাগানো সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। তার ভাবনা জুড়ে শুধুমাত্র তার সন্তানের চিন্তা। বিশ ঘন্টা ধরে শুধু মাত্র স্যালাইনের উপর টিকে থাকা নারীটির শরীর ভেঙে আসতে চায় দূর্বলতায়। পা ভেঙে ফ্লোরে পড়ে যেতে নিলেই তার প্রিয় পুরুষটি দৌড়ে এসে আগলে নেয় তাকে নিজের সাথে। হাহাকার করে বলে ওঠে পুরুষটি–

—”পূর্ণ, অ্যাঁই জান! তুমি ঠিক আছো?”

পূর্ণতা নিজের ভেঙে আসা শরীর জাওয়াদের বুকে এলিয়ে দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে–

—”না আমি ঠিক নেই। আমার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ, আমার যক্ষের ধন আমার বুকে নেই আজ। আমি কি করে ভালো থাকতে পারি? জাওয়াদ, অ্যাঁই জাওয়াদ আমার ছেলেকে এনে দিন না। আমার মানিক কই জাওয়াদ? আমার বুক খা খা করছে আমার ছেলেকে জড়িয়ে ধরার জন্য।

আল্লাহ! আমি তো চলেই গিয়েছিলাম সকলের জীবন থেকে অনেক দূরে। নিজের ছোট একটা দুনিয়া সাজিয়েছিলাম আমার সন্তানকে নিয়ে। তুমিই তো আবার আমায় নিয়ে আসলে সকলের মাঝে, আবারও সকলের মায়ায় পড়তে বাধ্য করলে। আমি তো সব করলাম তোমার নির্দেশনা মতো, তাহলে আজ আমার বুক খালি করে দিলে কেন মাবুদ? আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দাও আমার বুকে। আমার কোল ভরিয়ে দাও।”

পূর্ণতার আহাজারিতে উপস্থিত সকলের চোখের কোল ভিজে উঠে। জাওয়াদ পূর্ণতাকে বুকে নিয়েই বাড়ির সদর দরজার সামনেই বসে পড়ে।

পুরো একটা দিন ও রাত পেরিয়ে আবারও নতুন আরেকটি দিনের আগমন ঘটতে চলেছে। অথচ এই দুটো পরিবারের সবচাইতে ক্ষুদে মানুষটির খোঁজ এখনও পাওয়া যায়নি। গতকাল জাওয়াদরা বাসায় এসে জানতে পারে, কাল তাজওয়াদকে স্কুল থেকে আনতে গিয়েছিলো মিসেস শেখ। মি.শেখকে নিয়ে জিনিয়া ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল বলে মিসেস শেখ একপ্রকার জোর করেই যান নাতিকে আনতে।

ফেরার পথে একদল গুন্ডা মিসেস শেখ ও তাজওয়াদকে কিডন্যাপ করে নেয়। তাদের গাড়ির ড্রাইভার বাঁধা দিতে চাইলে লোকটাকে গু/লির মাধ্যমে আহত করে রেখে যায় গুন্ডা গুলো। জাওয়াদের এক ফ্রেন্ড পুলিশ হওয়ায় ও জাওয়াদ-পূর্ণতার মতো দু’জন নামকরা বিজনেসম্যানের একমাত্র সন্তান কিডন্যাপ হওয়ায় আইনী কার্যক্রম সাথে সাথেই শুরু করা হয়। কিন্তু তাজওয়াদদের কিডন্যাপিংয়ের বিশ ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও তাদের কোন খোঁজ খবর পাওয়া যায়নি।

তাজওয়াদের নিখোঁজের খবর শুনে পূর্ণতা এ অব্দি চার বার জ্ঞান হারিয়েছে। একদিকে তাজওয়াদদের টেনশন, অন্যদিকে পূর্ণতার। তার এমন বারবার জ্ঞান হারানো মোটেই ভালো লক্ষ্মণ নয় বলে ডাক্তার হুশিয়ারি দিয়ে গিয়েছেন। এমনটা হতে থাকলে পূর্ণতা যখন-তখন আবারও স্টোক করতে পারে। যা এবার তাকে মৃত্যুর সাক্ষাতও করাতে পারে।

জাওয়াদ বহু কষ্টে নিজেকে সামলায়। নিজের চোখের পানি মুছে নিয়ে পূর্ণতার চোখের পানিও মুছিয়ে দেয়। তারপর তাকে নিজের বুক থেকে একটু সরিয়ে নিজের মুখোমুখি এনে বসায়। স্বামীর আদর-ভালোবাসায় যেটুকু রূপ বেড়েছিল মেয়েটির, সন্তান নিখোঁজে তার বহুগুণ যেন হারিয়েছে।

জাওয়াদ পূর্ণতার মুখটা নিজের দুই হাতের আজলায় নিয়ে শক্ত গলায় বলে–

—”এভাবে ভেঙে পড়লে চলবে? তুমি এত ভেঙে পড়ে কান্নাকাটি করলে যেকোন সমন স্টোক করবে। তখন আমরা তাজওয়াদ আর আম্মাকে খুঁজবো? নাকি তোমাকে নিয়ে হসপিটালে দৌড়াবো?”

পূর্ণতা আজ কোন বুঝই বুঝে না। বুঝতে চায় না। সে শুধু মাত্র তার ছেলেকে চায়। সে কাঁদতে কাঁদতে বলে–

—”আপনি আমার ছেলেকে এনে দিন শুধু। আমি অনেক দূরে চলে যাবো। পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে চলে যাবো। যেখানে আমার আর আমার সন্তানের ক্ষতি করার মতো কেউ থাকবে না। আমরা মা-ছেলে দিব্যি একটা পুরো জীবন কাটিয়ে দিতে পারব। এই দেশে এসে শুধু কষ্টই পাচ্ছি আমরা।”

জাওয়াদের বুকটা ব্যথা করে ওঠে পূর্ণতার কান্না ও কথা শুনে। তবুও সে কাঁদে না। নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে ধরা গলায় বলে–

—”তাহলে আমার কি হবে? এই পুরো সংসারের কথা হবে? আমি কাদের নিয়ে বাঁচবো?”

পূর্ণতা তার মাথা জাওয়াদের বুকে এলিয়ে দেয়। পুত্র শোকে সে বর্তমানে দিশেহারা।

—”আমি কি করবো বলুন আপনি? আমার নিঃষ্পাপ ছেলেটার দিকে সবার কালো থাবা পড়ে কেন? আমার ছেলেটা সেইদিন হলো মা বলতে শিখেছে, সেই বাচ্চাটার প্রতি এত ক্ষোভ কেন সবার?

আঞ্জুমানের শত্রুতা আমার সাথে, তাহলে আমার মাসুম বাচ্চাটাকে কষ্ট দিচ্ছে কেন? আমার ছেলেকে আমার বুকে ফিরিয়ে এনে দিন জাওয়াদ, আমি আর কিচ্ছু চাই না।”

—”দিবো জান। একটু ধৈর্য ধরো। একটা ক্লু পাই শুধু। ঐ আঞ্জুমানকে এমন কঠিন শাস্তি দিবো যে, মৃত্যুর জন্য ও তড়পাতে থাকবে। কিন্তু মৃত্যু ওর সাথে দেখা দিবে না।”

ইস্পাতের ন্যায় কঠোর গলায় জাওয়াদ কথাটি বলে। তার চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। তাদের সকলের ধারণা আঞ্জুমানই এই নিকৃষ্ট কাজটি করেছে। নাহলে তাদের তো এমন কোন শত্রু নেই যে কিনা তাজওয়াদকে কিডন্যাপ করার মতো একটি কাজ করবে।

[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্পপ্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন।]

শব্দসংখ্যা~২৪১০

#চলবে?

[আঞ্জুমানের কি শাস্তি দেখতে চান, একে একে বলে যান সবাই। লিস্ট নেওয়া হচ্ছে শাস্তির।🤭📝

পারলে সবাই বেশি বেশি কমেন্ট করিয়েন। স্টিকার বা গল্প সম্পর্কে মন্তব্য। পেইজের রিচ হুট করে ডাউন হয়ে গিয়েছে। আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ২কে রিয়াক্ট পূরণ করে দেন। তাহলেই গল্প পেয়ে যাবেন।

ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স। 🤍]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply