Golpo কষ্টের গল্প রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬১


রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬১

নিলুফানাজমিননীলা

★★★
তৃণা বেলকনির দোলনায় বসে আয়েশ করে আচার খাচ্ছে। তার চোখের সামনে মিহু আর লিলি মহা উৎসাহে খাবার নিয়ে ব্যস্ত। এই দুই পোষ্য প্রাণীর মাঝে ইদানীং বেশ ভাব জমেছে। সারাক্ষণ ছায়ার মতো একে অপরের সাথে লেগে থাকে। কখনো খুনসুটি, কখনো মান-অভিমান, আবার পরক্ষণেই গভীর ভালোবাসা, ওদের এই সখ্যতা দেখে তৃণা না হেসে পারে না। মানুষের ভালোবাসায় হাজারটা জটিলতা আর স্বার্থ থাকলেও এই অবলা পশুদের ভালোবাসা কত সহজ আর স্বচ্ছ! পাহাড়ের ঝরনার মতো পরিষ্কার, যেখানে নেই কোনো প্রতারণা বা মিথ্যে অভিনয়ের ভয়। ​হঠাৎ ঘরের দরজা খোলার সজোরে শব্দে তৃণার ভাবনায় ছেদ পড়ল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল আরিয়ান হন্তদন্ত হয়ে রুমে ঢুকছে। অফিস ফেলে এই অসময়ে আরিয়ানকে বাড়িতে দেখে তৃণা বেশ অবাক হলো। সে দোলনা থেকে ওঠার উপক্রম করতেই আরিয়ান গটগট করে বেলকনিতে এসে দাঁড়াল।
​আরিয়ানের কপালে চিন্তার ভাঁজ, ভ্রু দুটো কুঁচকে আছে। সে তার স্বভাবজাত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মাথাটা খানিকটা বাঁকা করে তৃণার দিকে তাকিয়ে রইল। আরিয়ানের এমন শক্ত চোয়াল আর থমথমে মুখচ্ছবি দেখে তৃণা প্রথমে কারণ বুঝতে পারল না। সেও দুষ্টুমি করে আরিয়ানের মতো মাথাটা একটু কাত করল এবং ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল, ​“কী ব্যাপার রাগী সাহেব? এই অসময় বাড়িতে?”
​আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলল, “তুমি কি আমাকে একটুও শান্তিতে থাকতে দেবে না শ্যামলিনী? চব্বিশ ঘণ্টা আমাকে জ্বালানো আর দুশ্চিন্তায় রাখাই কি তোমার প্রধান কাজ?”
“আমি আবার কী করলাম?”
“আম্মু কল করে বলল তুমি নাকি দুপুর থেকে কিছুই খেতে চাইছো না? সমস্যাটা কী তোমার? আর এই যে সামনে আচারের পাহাড় নিয়ে বসে আছো, এসব কী? ডক্টর আর আমি দুজনই তো তোমাকে বলেছিলাম সীমিত পরিমাণে আচার খেতে।”
​তৃণা আচারের বাটিটা একটু আড়াল করে ধীর গলায় বলল, “আচার খেতে ভালো লাগে, অন্য কোনো খাবার তো মুখে রুচছে না।”
​আরিয়ান এবার তৃণার খুব কাছে বসে ওর একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তার কণ্ঠস্বর আগের চেয়ে কিছুটা নরম হলেও তাতে শাসনের সুর স্পষ্ট, “তোমার নিজের জন্য খেতে কে বলেছে? নিজের জন্য না হলেও অন্তত আমার জন্য খাবে, আমাদের অনাগত সন্তানের স্বাস্থ্যের কথা ভেবে খাবে। ও তো তোমার অবহেলার ভাগীদার হতে পারে না, তাই না?”
​তৃণা আরিয়ানের চোখের দিকে অপলক তাকিয়ে রইল। আরিয়ান এবার নিজের কণ্ঠে কৃত্রিম রাগ মিশিয়ে গম্ভীর হয়ে বলল, “ফরদার যদি আর একবার শুনি যে তুমি বলেছো খাবে না, বা খেতে মন চাচ্ছে না, তাহলে সত্যি সত্যি মেরে একদম পা ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখবো। তখন আর দোলনায় বসে আচার খাওয়া হবে না, বুঝতে পেরেছ তুমি?”
আরিয়ানের এই শাসনে তৃণা হেসে উঠল। আরিয়ান নিজের ঠোঁটের কোণে আসা হাসিটা অতি কষ্টে লুকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলল, “আবার হাসছো? আমি কি এখানে কৌতুক করছি?”
​তৃণা হাসতে হাসতেই বলল, “তো কী করব? আপনি এমন সব কথা বলছেন, হাসবো না?”
​“না, হাসবে না। এই মায়াবী হাসি দিয়েই তো এক অসহায় পুরুষকে পুরোপুরি বশ করে ফেলেছ,” আরিয়ান কিছুটা নরম হয়ে আবার বলল, “এখন চলো, নিচে গিয়ে লক্ষ্মী মেয়ের মতো খাবার খাবে।”
​তৃণা তবুও আলসেমি করে উঠতে চাইল না। আরিয়ান এবার আর কোনো বাকবিতণ্ডায় গেল না। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে দ্রুত নিচু হয়ে তৃণাকে পাঁজা কোলে তুলে নিল। হঠাৎ এভাবে হাওয়ায় ভেসে ওঠায় তৃণা আঁতকে উঠে আরিয়ানের গলা জড়িয়ে ধরল। সে অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “আরে! নামান আমাকে, করছেন কী? এভাবে কোলে করে নিচে নিয়ে যাবেন? বড়রা দেখলে কী ভাববে! সবাই খুব খারাপ ভাববে তো!”
​আরিয়ান সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল, “কেউ খারাপ ভাববে না। সবাই বড়জোর এটাই ভাববে যে, ছেলেটা একদম বউ-পাগল হয়ে গেছে।”

​তৃণা আর কথা বাড়াল না। সে মুগ্ধ হয়ে এই মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষটা তাকে এত ভালোবাসে কেন? এতটুকু ভালোবাসা যে তার ভাগ্যে ছিল, তা তো সে কোনোদিন কল্পনাও করেনি।
‘ভালোবাসি শুনার চেয়ে বেশি আনন্দ হয়, যখন মানুষটার ব্যবহারে ভালোবাসা প্রকাশ পায়।’
আরিয়ান যখন সতর্ক পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিল, তৃণা তার কানের কাছে মুখ নিয়ে অতি মৃদুস্বরে বলল, “এত ভালোবাসবেন না আমায়। আমার খুব ভয় হয়, ভীষণ ভয় হয় আপনাকে হারানোর। বেশি সুখ তো আমার কপালে সয় না, তাই মাঝেমধ্যে বুকটা কেঁপে ওঠে।”
​আরিয়ান নামতে নামতেই ধীরস্থির কণ্ঠে উত্তর দিল, “এবার সেই অবাধ্য সুখকে আমি খাঁচায় বন্দি করে রাখব, যাতে সে আমার শ্যামলিনীকে ছেড়ে একচুলও নড়তে না পারে। আর তোমার জীবনের সবটুকু দুঃখ না হয় আমি নিজের কপালে টেনে নেব।”
​আরিয়ান ড্রয়িংরুমে পৌঁছাতেই দেখল বাড়ির প্রায় সব সদস্য সেখানে বসে গল্প করছেন। সবার উৎসুক দৃষ্টি এক নিমেষে তাদের দিকে এসে স্থির হলো। বাড়ির বড়দের সামনে এভাবে আরিয়ানের কোলে চড়ে আসতে দেখে তৃণা লজ্জায় একদম লাল হয়ে গেল। সে দ্রুত নিজের মুখটা আরিয়ানের কাঁধে লুকিয়ে নিল। আরিয়ান অবশ্য সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেঁটে গিয়ে একদম ডাইনিং টেবিলের কাছে নিয়ে তৃণাকে নামাল।
★★★
রিনি সেই কখন থেকে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অবিরাম বেল বাজাচ্ছে, কিন্তু ভেতর থেকে দরজা খোলার কোনো নামগন্ধ নেই। আজ তিনটে দিন হয়ে গেল সে তূর্ণাকে দেখেনি। ওইদিন কফিশপে মেহরাব তাকে ওভাবে অপমান করে আসার পরদিন যখন রিনি আর তূর্ণা একসাথে স্কুলে বসে ছিল, তখন মেহরাব হঠাৎ সেখানে উপস্থিত হয়ে কোনো কথা না বলে তূর্ণাকে একরকম জোর করেই নিয়ে চলে আসেন। সেই থেকে তূর্ণা স্কুলেও আসছে না।
​তূর্ণার বিরহে রিনির মনটা ছটফট করছে, তাই আজ বাধ্য হয়েই সে মেহরাবের বাড়িতে এসেছে কথা বলতে। ঠিক তখনই হঠাৎ কপাট খুলে গেল। সামনে এসে দাঁড়ালেন মেহরাব দেওয়ান। পরনে তার সাধারণ একটি টি-শার্ট, যার ওপর দিয়ে তার নিয়মিত ব্যায়াম করা সুগঠিত শরীরের অবয়ব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। রিনি মুখ খোলার আগেই মেহরাব ভ্রু কুঁচকে কর্কশ স্বরে বলে উঠলেন,
​“আপনি আবার আজ এখানে কেন এসেছেন?”
​রিনি নিজের উৎকণ্ঠা চেপে রেখে জিজ্ঞেস করল, “তূর্ণা কোথায়? ও কি অসুস্থ? তিন দিন ধরে ও স্কুলে যাচ্ছে না কেন?”
​মেহরাব নির্লিপ্তভাবে উত্তর দিলেন, “তূর্ণা একদম সুস্থ আছে। ও এখন ঘুমাচ্ছে। আর একটা কথা জেনে রাখুন, তূর্ণা আর ওই স্কুলে যাবে না।”

​রিনি যেন আকাশ থেকে পড়ল। বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করল, “যাবে না মানে? কী বলছেন এসব? ওর পড়ালেখার ক্ষতি হবে তো!”
​“ক্ষতি হবে না,” মেহরাব দেওয়ান শীতল চোখে রিনির দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমরা খুব তাড়াতাড়ি এই শহর ছেড়ে চিরতরে চলে যাচ্ছি। আপনার মতো মানুষের সংস্পর্শে তূর্ণাকে রাখা আমার পক্ষে আর সম্ভব না।”
​মেহরাবের কথাগুলো যেন রিনির বুকের ভেতর তপ্ত তীরের মতো বিঁধল। তার চারপাশের পৃথিবীটা এক মুহূর্তের জন্য দুলে উঠল। রিনি ব্যাকুল হয়ে মিনতি করল, “কী বলছেন এসব? শহর কেন ছাড়বেন? প্লিজ, আমার জন্য তূর্ণার শৈশবটা এভাবে নষ্ট করবেন না। ঠিক আছে, আমি কথা দিচ্ছি আমি আর কোনোদিন তূর্ণার আশেপাশে থাকব না। দূর থেকেই না হয় একনজর দেখব ওকে। প্রয়োজনে আমি ওই স্কুলের চাকরিটাই ছেড়ে দিচ্ছি, তবুও আপনারা শহর ছাড়বেন না।”

​মেহরাব দেওয়ানের চোখে এক বিন্দু করুণা দেখা গেল না। তিনি আরও কঠোর হয়ে বললেন, “আমি চাই না আপনি আমার মেয়েকে দূর থেকেও দেখুন। আপনার ছায়া যেন ওর ওপর আর না পড়ে।”
​রিনি মুহূর্তেই নিথর হয়ে গেল। তার মস্তিষ্ক যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। স্রেফ ভালোবাসার অপরাধে তাকে এভাবে নিজের প্রাণের চেয়েও প্রিয় বাচ্চাটার কাছ থেকে চিরতরে দূরে সরিয়ে দেওয়া হবে এটা সে মানতে পারছে না। রিনির গলার স্বর এবার একদম ভেঙে এল। সে শেষবারের মতো করুণ চোখে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
“আমাকে আপনার জীবনে রাখার দরকার নেই, শুধু তূর্ণার জন্য কোথাও একটু পড়ে থাকতে দিন। যেমন করে মানুষ না চাইতেও রাস্তার ধুলো নিজের পায়ে মাখিয়ে রাখে, তেমনি না হয় আমি অবহেলার এক কোণে পড়ে থাকব।”

​মেহরাব দেওয়ানের পাথুরে মনে এই আকুতি এক বিন্দুও নাড়া দিল না। তিনি যখন রিনির মুখের ওপর দরজাটা বন্ধ করে দিতে উদ্যত হলেন, তখন রিনি বলে উঠল,
“ঠিক আছে! আপনাদের এই শহর ছেড়ে যেতে হবে না। আমিই চলে যাব। অনেক দূরে কোথাও, যেখানে আমার ছায়াও তূর্ণার ওপর পড়বে না। আর কখনো আপনাদের বিরক্ত করব না আমি।”
​রিনির কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই সশব্দে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ হয়ে গেল। এক বুক শূন্যতা নিয়ে রিনির গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে ধীর পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে পেছন ফিরে হাঁটতে শুরু করল। ঠিক তখনই বাতাসের ঝাপটার মতো একটা অতি পরিচিত ডাক ভেসে এল,
​“আম্মু!”
​এক মুহূর্তের জন্য রিনির হৃদপিণ্ড যেন থমকে গিয়ে আবার সজোরে চলতে শুরু করল। ঠোঁটের কোণে ম্লান হাসি ফুটে উঠল তার। চোখের জল মুছে ডানে-বাঁয়ে তাকাতেই দেখল, দুইতলার করিডরে ছোট তূর্ণা দাঁড়িয়ে আছে। অগোছালো চুল দেখে বোঝা যাচ্ছে মেয়েটা এইমাত্র ঘুম থেকে উঠেছে। রিনিও বুকভরা তৃষ্ণা নিয়ে মিষ্টি সুরে ডাকল,
“মামনি!”
​কিন্তু সেই খুশির মুহূর্তটুকু স্থায়ী হলো না কয়েক সেকেন্ডও। পরক্ষণেই বারান্দায় মেহরাব দেওয়ান এসে দাঁড়ালেন। তার দৃষ্টি রিনির ওপর পড়তেই সেখানে ঘৃণা আর বিরক্তি খেলা করে গেল। তিনি এক মুহূর্ত দেরি না করে তূর্ণাকে একরকম জোর করেই কোলে তুলে নিলেন এবং ভেতরে ঢুকে গেলেন। করিডরটা আবার জনশূন্য হয়ে গেল। ​রিনি শুধু অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেই শূন্য বারান্দার দিকে। রিনি ভাবল, তার তো এতটা কষ্ট হওয়ার কথা ছিল না! তূর্ণা তো তার গর্ভজাত সন্তান নয়, মেহরাব তো তার কেউ নয়; তবে কেন বুকটা এভাবে ছিঁড়ে যাচ্ছে? ইচ্ছে করছিল দৌড়ে গিয়ে তূর্ণাকে একবার জাপটে ধরি, কিন্তু সামাজিক আর মানসিক দেয়ালটা আজ হিমালয়ের চেয়েও উঁচু।
​রিনি অনুভব করল, মায়ার বাঁধন ছিঁড়তে না পারলে এই যন্ত্রণা তাকে কুরে কুরে খাবে। সে আবার হাঁটতে শুরু করল। তার মনে পড়ে গেল কোথাও পড়া সেই অমোঘ সত্যটি,
​“শত প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তি নিয়েই এই ক্ষণিকের জীবন। এখানে এত মায়া করলে চলে না। জীবনের সব থেকে প্রিয় জিনিসটাকেও অবলীলায় ছুঁড়ে ফেলার সাহস রাখতে হয়।”
★★★
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত এখন গভীর। বাইরের নির্জনতা মির্জা বাড়ির এই বেলকনিতেও হানা দিয়েছে। মৃদু বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কোথাও কোনো শব্দ নেই। তৃণা দোলনার একপাশে পিঠ ঠেকিয়ে আধশোয়া হয়ে বসে আছে, আর তার পা দুটো আরিয়ানের কোলের ওপর রাখা। তৃণা অনেকক্ষণ বারণ করেছে, বলেছে এভাবে পা রাখাটা কেমন দেখায়, কিন্তু আরিয়ান তার কোনো কথাই কানে তোলেনি।
​আরিয়ান তৃণার এক পায়ের নূপুরটা নিজের আঙুলে আলতো করে ঘোরাচ্ছে। হঠাৎ আরিয়ান তৃণার মুখের দিকে নিবিড়ভাবে তাকিয়ে বলল,
​“তুমি কি খেয়াল করেছ শ্যামলিনী, তোমার কপালে ছোট একটা ব্রণ হয়েছে?”
​তৃণা আরিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে বলল, “হুম, সকালেই আয়নায় দেখলাম। বিশ্রী লাগছে দেখতে, তাই না?”
​আরিয়ান তার চিবুকটা সামান্য উঁচিয়ে ধরল। গভীর কন্ঠে বলল, “একদম না! বরং আগের চেয়েও তোমাকে এখন অনেক বেশি সুন্দর লাগছে। একটা আলাদা স্নিগ্ধতা কাজ করছে তোমার চেহারায়।”

​আরিয়ানের এই প্রশংসা শুনে তৃণা কিছুটা লজ্জা পেল। হঠাৎ নুপুরের শব্দে কিছু একটা মনে পড়ে যাওয়ায় সে জিজ্ঞেস করল, “আমার অন্য পায়ের নূপুরটা আবার কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। আপনি কি কোথাও দেখেছেন?”
​আরিয়ান মুহূর্তেই নিজের মুখভঙ্গি কঠোর করে ফেলল। গলায় রাশভারী ভাব এনে গম্ভীর স্বরে বলল,
​“না তো! আমি কীভাবে দেখব? নিজের জিনিস নিজেই সামলে রাখতে পারো না? সবসময় কি আমি তোমার জিনিসের পাহারাদার হয়ে থাকব?”
​আরিয়ানের হঠাৎ এমন কড়া কথা আর অহেতুক গাম্ভীর্য দেখে তৃণার মনটা নিমিষেই বিষিয়ে উঠল। সে ভাবল, কিছুক্ষণ আগেই লোকটা কত আদুরে কথা বলছিল, আর এখনই তুচ্ছ একটা নূপুরের জন্য এভাবে ধমক দিচ্ছে! অভিমানে তৃণার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। সে আরিয়ানের কোল থেকে পা সরিয়ে নিতে চাইল।
​তৃণাকে এভাবে তাকাতে দেখে আরিয়ান আর নিজের গাম্ভীর্য ধরে রাখতে পারল না। সে মুচকি হেসে তৃণার পা দুটো কোল থেকে নামিয়ে দিল ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই এক ঝটকায় ওকে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিল। আরিয়ান এক হাতে তৃণাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। খুব শান্ত গলায় সান্ত্বনা দেওয়ার সুরে বলল,
“থাক না শ্যামলিনী, একটা সাধারণ নূপুরই তো হারিয়েছে। এটার জন্য কি এত কষ্ট পেতে হয়? বাদ দাও তো ওসব।”
​আরিয়ানের এই উপদেশের মাঝেই তৃণার হাতটা অস্থিরতায় আরিয়ানের শার্টের পকেটের কাছে গিয়ে ঠেকল। শক্ত কিছু একটা অনুভব করতেই তৃণা অবাক হয়ে আরিয়ানের দিকে তাকালো। এক মুহূর্ত দেরি না করে সে চটজলদি আরিয়ানের পকেটে হাত ঢুকিয়ে ফেলল। আর হাত বের করতেই দেখা গেল হারিয়ে যাওয়া সেই রুপোর নূপুরটা আরিয়ানের পকেটে চিকচিক করছে!
​নিজের সাজানো মিথ্যা এভাবে হাতেনাতে ধরা পড়ে যাওয়ায় আরিয়ান অপ্রস্তুত হয়ে জিহ্বায় কামড় দিল। তৃণা নূপুরটা চোখের সামনে নাচিয়ে অভিমানী কণ্ঠে বলল,
“আমাকে এতক্ষণ কত কী শোনালেন, দায়িত্বজ্ঞানহীন বললেন। অথচ আমার নূপুর আপনার পকেটে কেন? এটা তো আপনিই লুকিয়ে রেখেছিলেন!”

​আরিয়ান এবার একদম শান্ত হয়ে গেল। তার চোখের সেই কৃত্রিম রাগ মুছে গিয়ে সেখানে এক গভীর মায়া ফুটে উঠল। সে তৃণার হাতের ওপর নিজের হাত রেখে খুব নরম স্বরে বলল, “পকেটেই রেখে দাও নূপুরখানা। আসলে যখন বাড়ির বাইরে যাই, তখন তোমাকে ছাড়া খুব একা লাগে। এই নূপুরের রুমঝুম শব্দটা শুনলে মনে হয় তুমি আশেপাশেই আছো। তাই ওটাকে বুকের বাঁ পাশের পকেটে খুব যত্ন করে রেখেছিলাম, যাতে তোমার অস্তিত্ব সবসময় হৃদয়ের কাছাকাছি থাকে।”
​আরিয়ানের এই অকপট স্বীকারোক্তি শুনে তৃণা নির্বাক হয়ে গেল। তার সমস্ত অভিমান মুহূর্তেই জল হয়ে চোখের কোণে জমা হলো। মানুষটা তাকে কতটা পাগলের মতো ভালোবাসলে তার সামান্য একটা স্মৃতিও এভাবে বুকের কাছে আগলে রাখতে পারে! তৃণা আর কোনো তর্ক করল না, নূপুরটা আবার আরিয়ানের সেই পকেটেই আলতো করে রেখে দিল।
তৃণা আবারও আরিয়ানের প্রশস্ত বুকে মুখ লুকালো। পরম শান্তিতে চোখ বুজে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে অস্ফুট স্বরে বলল,
“আচ্ছা, আমার মতো এক সাধারণ শ্যামবর্ণের মেয়েকে আপনি কেন এত ভালোবাসেন?”
​আরিয়ান এবার তৃণার মুখটা নিজের দুই হাতের অঞ্জলিতে আগলে ধরল। ওকে নিজের চোখের একদম সামনে এনে, মণির গভীরে মণি রেখে গভীর স্বরে বলল,
“আমার দেখা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রূপবতী নারী আমার শ্যামলিনী। জীবনে প্রথম পাথরের মতো শক্ত হৃদয়ে তাণ্ডব চালানো আগ্নেয়গিরি তুমি। তুমি ফুল নও; তবে ফুলের চেয়েও পবিত্র।”

​আরিয়ানের এই হৃদয়স্পর্শী কথাগুলো শুনে তৃণার চোখের কোণে আবার আনন্দাশ্রু চিকচিক করে উঠল। একই ভাবে দোলনায় বসে নিবিড় মুহূর্তের মাঝে অনেকটা সময় কেটে গেল। তৃণা নিজের অজান্তেই আরিয়ানের বুকের ওপর হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল, তার আঙুলগুলো অবাধ্যভাবে আরিয়ানের পেটের ওপর দিয়ে বিচরণ করছিল। ​হঠাৎ তৃণা লক্ষ্য করল আরিয়ানের নিশ্বাস অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত আর ভারী হয়ে আসছে। তার বুকের ধুকপুকানি যেন আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। তৃণা কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী হলো আপনার? এভাবে জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছেন কেন? শরীর খারাপ লাগছে?”

​ আরিয়ান এক ঝটকায় তার শরীরের ওপর বিচরণকারী তৃণার সেই অবাধ্য হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলল। তার কণ্ঠস্বর তখন একদম পাল্টে গেছে। আরিয়ান শুকনো ঢোক গিলে তৃণার চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ভারী গলায় বলল,
​“এভাবে হাত চালানো বন্ধ করো শ্যামলিনী। শান্ত হয়ে বসো। তা না হলে আমি এই মুহূর্তে ভুলে যাব যে তুমি প্রেগন্যান্ট।”
​আরিয়ানের কথার গভীর অর্থ বুঝতে পেরে সে বিদ্যুৎবেগে নিজের হাত সরিয়ে নিল এবং তড়িঘড়ি করে আরিয়ানের কোল থেকে সরে গিয়ে দোলনার অন্যপ্রান্তে একটু দূরত্ব রেখে বসল। লজ্জায় সে আরিয়ানের দিকে তাকাতে পারছে না, তার হার্টবিটও এখন আরিয়ানের মতোই দ্রুত ছুটছে।

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply