২৯ বছর বয়সী রাহাত ভাইকে চাচিমনি এখনো খোকা বলে ডাকে। আমার হাসি পায়। কখনো কখনো আমি চাচিমনির সামনেই হেসে ফেলি। রাহাত ভাইও টের পায় কিন্তু কিছু বলে না। তাছাড়া চাচিমনি যখনই তাকে খোকা বলে ডাকে তখনই আমার মাথায় দেবের গান বাজে। ঐযে ঐ গানটা ‘খোকাবাবু যায়, লাল জুতা পায়।’ অবশ্য রাহাত ভাইকে আমি কখনো লাল জুতা পরতে দেখিনি।
আমি পড়তে বসেছিলাম। চাচিমনি তখন আমায় ডেকে পাঠালেন রান্নাঘরে। হাতে কফির মগ দিয়ে বললেন,
“রাহাতকে দিয়ে আয়।”
আমি মাথা নাড়িয়ে সায় দিলাম। কফি নিয়ে গেলাম রাহাত ভাইয়ের রুমে। দরজায় নক করে বললাম,
“আসব?”
রাহাত ভাই ল্যাপটপের স্ক্রিনে গভীর মনোযোগ দিয়ে কোনো কাজ করছিলেন। সম্ভবত আমি দরজায় নক করায় তিনি বিরক্ত হয়েছে। তার চোখ-মুখের অভিব্যক্তি অন্তত এটাই বলছে। তিনি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,
“কী চাই?”
আমি স্বভাবে খুব চঞ্চল ও ছন্নছাড়া স্বভাবের। কাউকে পরোয়া করি না। করতে ইচ্ছেও করে না। কিন্তু কেন জানিনা, উনি আমাকে রাগীকণ্ঠে কিছু জিজ্ঞেস করলে আমি থতমত খেয়ে যাই। কথা বলতে পারি না। তার হয়তো একটা বিশেষ কারণও আছে। আমি যতটুকু জানি ও বুঝি তিনি আমাকে পছন্দ করেন না।
তিনি ফের ধমকে বললেন,
“সঙের মতো এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন?”
আমি থতমত খেয়ে বললাম,
“আপনার কফি! কফি দিতে এসেছি।”
“টেবিলের ওপর রেখে যাও।”
কফির মগটা টেবিলের ওপর রেখেই আমি দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে এলাম। নিজের রুমে এসে বুক ভরে শ্বাস নিলাম। এই জল্লাদটার সামনে গেলেই আমার গলা শুকিয়ে আসে।
আমি প্রিয়তা। বয়স ১৯। সবে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছি। আমার নিজের কোনো পরিবার নেই। এই পরিবারটাও আমার নয়। রাহাত ভাইয়ার বাবা রহিম শিকদারের বন্ধুর মেয়ে আমি। আমার বাবা-মা দুজনই বেঁচে আছেন। কিন্তু তারা সেপারেট। আলাদা হওয়ার পর মা আমাকে নিতে চাইলেও বাবা তখন আমাকে দেয়নি। এরপর মা আবার বিয়ে করল। কিছুদিন পর বাবাও বিয়ে করল। কিন্তু নতুন মা আমাকে মেনে নিতে পারেননি। বাবা তখন মায়ের কাছে আমাকে দিতে চাইলে, আমার সৎ বাবা রাজি হননি নিতে। আমি তখন হয়ে গেলাম দুজনের জন্যই বোঝা। বাবা যাকে বিয়ে করেছেন সেই মহিলা ইউকে তে সেটেলড্। বাবাও সেখানে চলে গিয়েছেন। যাওয়ার আগে আমার একটা বিহিত করা প্রয়োজন ছিল। তিনি চেয়েছিলেন আমাকে এতিমখানায় দিয়ে যেতে। ঠিক তখনই রহিম চাচা আমাকে তার কাছে রাখার প্রস্তাব দিলেন। বাবা রাজি হয়ে গেল। আমার পাঁচ বছর বয়স থেকে এই বাড়িতেই আছি।
রহিম চাচার কোনো মেয়ে ছিল না। রাহাত ভাইয়ের পর আর কোনো সন্তানও হচ্ছিল না। তাই চাচিমনিও আমাকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। নিজের মেয়ের মতো আগলে রাখতেন। আমি এই বাড়িতে আসার তিন বছর পর অলৌকিকভাবে চাচিমনি আবার মা হয়। এবার তার কোলজুড়ে আসে হৃদি। এত সুন্দর ও! কিন্তু হৃদি হওয়ার পরও আমার প্রতি চাচিমনি কিংবা চাচ্চুর একটুও আদর, ভালোবাসা কমেনি। বরং চাচিমনি সবসময় বলে, ‘তুই এই বাড়ির লক্ষ্মী। তুই এসেছিস বলেই তোর উসিলায় আল্লাহ্ আমার কোলে হৃদিকে দিয়েছে।’ ছোটোবেলা থেকেই চাচ্চু বা চাচিমনি কিছু কিনলে সব দুটো করে নিয়ে আসে। একটা আমার ও একটা হৃদির। কিন্তু সবাই আমাকে আদর করলেও রাহাত ভাই কখনো আমায় আদর করেনি। খুব বেশি কথা বলেনি। ছোটোবেলায় দেখতাম, তিনি হৃদিকে তার সাইকেলে নিয়ে ঘুরতে যেত। কিন্তু আমায় কখনো তিনি সাইকেলে করে ঘুরতে নিয়ে যাননি। আমার মনে আছে, এজন্য একদিন আমি খুব কান্না করেছিলাম। তাও তিনি আমাকে তার সাইকেলে ওঠাননি!
ছোটোবেলায় এসব নিয়ে মন খারাপ হলেও এখন আর হয় না। অনেক কিছুই সহ্য হয়ে গেছে। কত মানুষের কত কটু কথাও সহ্য করি। এ আর এমন কী!
রুমে যাওয়ার সময় চাচিমনির ডাক পড়ল তখন।
“প্রিয়, ক্লাস নেই আজ?”
আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম,
“আছে তো।”
“তাহলে রেডি না হয়ে এমন ঘুরঘুর করছিস কেন? জলদি যা রেডি হ। হৃদিকেও ডেকে তোল। স্কুলে যাওয়া লাগবে না?”
আমি আবারও বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়িয়ে বললাম,
“আচ্ছা।”
হৃদিকে ডেকে তুলতে আমাকে বেশ কসরত করতে হয়েছে। মেয়েটা খুব ঘুম কাতুরে। হৃদি হয়েছে চাচিমনির মতো। সব কাজ শেষ করে চাচিমনি সময় পেলেই ঘুমাবে। হৃদিও অমন। কিন্তু রাহাত ভাই আবার একটু আলাদা। একটু না, অনেকটাই। তার ঘুমানোর টাইম-টেবল একদম সব ঠিক করা। সবকিছু সময় দেখে করে। চাচ্চুও নাকি ইয়ংকালে এমনই ছিল। আমি আবার এদের সবার থেকে আলাদা। না, কম না বেশি! মাঝে মাঝে তো নিজেকে আমার পাগলও মনে হয়।
হৃদিকে নিয়ে যখন আমি খেতে গেলাম ডাইনিং রুমে, বাইরে তখন তুমুল বৃষ্টি। আমার একটুও মন নেই কলেজে যাওয়ার আজ। কিন্তু এ কথা বলার সাহস আমার নেই। চাচ্চু পড়ায় ফাঁকিবাজি একদম পছন্দ করে না।
আমি সাধারণত রিকশা করে কলেজে যাই। কিন্তু আজ সেরকম পরিস্থিতি নেই। তাই চাচ্চুকে বললাম,
“আমাকে আজ গাড়িতে করে দিয়ে আসো চাচ্চু।”
“আমি তো আজ বাইরে যাব না, আম্মু। সমস্যা নেই, রাহাত তোমাকে দিয়ে আসবে।”
রাহাত ভাইয়ের খাওয়া শেষ। পানি পান করছিলেন। গ্লাসের পানিটুকু শেষ করে টিস্যু দিয়ে মুখ মুছে বললেন,
“পারব না আমি। সিনথিয়া সকালে কল করেছিল। ওকে ভার্সিটিতে দিয়ে আসতে হবে।”
চাচ্চু বললেন,
“সমস্যা কী তাতে? সিনথিয়াকে দিয়ে ঐদিক দিয়ে পরে প্রিয়তাকেও কলেজে নামিয়ে দিয়ে এসো।”
রাহাত ভাই হাত ঘড়িতে সময় দেখে বললেন,
“সম্ভব না। আমার দেরি হয়ে যাবে।”
আমার এত রাগ হলো কথাটা শুনে। সিনথিয়া আপুর ভার্সিটি থেকে আমার কলেজের দূরত্ব মাত্র দশ মিনিটের। এতেই নাকি তার লেট হয়ে যাবে! আমার খুব একটা বাজে স্বভাব আছে। অল্পতেই মাথা গরম হয়ে যায়। কখনো সেই রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, আবার কখনো পারি না। এই যেমন এখনো পারছি না! আমি প্রায় চেঁচিয়ে উঠে বললাম,
“আমার বেলাতেই আপনার যত সমস্যা তৈরি হয়! অন্য কারো বেলায় তো কখনো কোনো সমস্যা দেখি না।”
রাহাত ভাই উঠে চলে যাচ্ছিলেন। আমার কথা শুনে থামলেন এবং খুব ঠান্ডা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চলে গেলেন। হৃদি পাশ থেকে তখন আমার হাত চেপে ধরে খুব আস্তে করে বলল,
“শান্ত হও আপু!”
চাচ্চু মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“আচ্ছা চল আমি তোকে দিয়ে আসছি আজ উবারে করে।”
রাহাত ভাইয়ের ওপরে করা রাগটুকু গিলে চাচ্চুকে শান্ত কণ্ঠে বললাম,
“আমার কোনো ব্যাপারে আর কখনো রাহাত ভাইকে কিছু বলবে না।”
“আচ্ছা আর বলব না। এখন শান্ত হ। খাওয়া শেষ করে ব্যাগ নিয়ে আয় যা।”
“খাব না আর।”
হাত ধুয়ে উঠে আমি রুমে চলে গেলাম। কিছুক্ষণ একা একা রুমে হাঁটাহাঁটি করে জোরে জোরে শ্বাস নিলাম। এরপর কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে রাহাত ভাইয়ের রুম ক্রস করার সময় পেছন থেকে তার কণ্ঠ ভেসে এলো,
“দাঁড়াও।”
আমি পেছনে ফিরে দাঁড়ালাম। রাহাত ভাই পকেটে হাত গুঁজে রুম থেকে বেরিয়ে এলো। আমার সামনে দাঁড়িয়ে রুক্ষ কণ্ঠে বলল,
“প্রিয়তা, তুমি ভুলে যেও না যে তুমি এই বাড়ির আশ্রিতা! আমার সাথে বেয়াদবি করার দুঃসাহস যেন আর কখনো না দেখি। বরদাস্ত করব না একদম!”
চলবে…
#যে_পাখি_মন_বোঝে_না
#সূচনা_পর্ব
#মুন্নি_আক্তার_প্রিয়া
[এটা কোনো কাজিন গল্প না। এবং ছোটো একটা গল্প। ভীষণ রকম মন খারাপ, সময় খারাপ তাই নিজেকে ব্যস্ত রাখতে ছোটো গল্প লিখছি।]
Share On:
TAGS: মুন্নি আক্তার প্রিয়া, যে পাখি মন বোঝে না
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ৩
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২১
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২৯
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১১
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২৮
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৩৮ (অন্তিম পর্ব)
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৩২
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৫
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৩