Golpo romantic golpo যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ

যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৩৫


#যেখানে_প্রেম_নিষিদ্ধ

#ইশরাত_জাহান_জেরিন

#পর্ব_৩৫

জানালার পর্দা ভেদ করে সকালের কড়া রোদ তখন সরাসরি এসে পড়েছে নৈশির মুখের ওপর। নৈশি খুব ধীরে, অনেক কষ্টে চোখের পাতা মেলার চেষ্টা করল। কিন্তু চোখের পাতা দুটো মেলতেই মনে হলো পুরো মগজের ভেতর কে যেন একশোটা হাতুড়ি দিয়ে একসাথে পিটছে। কপালের দুই পাশের রগ দুটো তীব্র যন্ত্রণায় দপদপ করছে। “উফফ… আমার মাথাটা! এত ব্যথা করছে কেন?”

নৈশি বিড়বিড় করে নিজের কপালে হাত দিতে গেল। কিন্তু হাতটা তুলতে গিয়েই সে টের পেল, তার গায়ের সিল্কের বেনারসি শাড়িটা চরম অগোছালো হয়ে বিছানার এক পাশে পড়ে আছে। শুধু তাই নয়, তার হাতটা গিয়ে ঠেকল পাশে শোওয়া এক তপ্ত, চওড়া মানবদেহের ওপর। নৈশি ঝটকা দিয়ে চোখ মেলল। চোখের সামনের ঝাপসা ভাবটা কাটতেই তার পুরো শরীর এক মুহূর্তের জন্য জমে পাথর হয়ে গেল।

তার ঠিক পাশেই উপুড় হয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছেন মীর আবরাজ রোদ। আব্রাজের পিঠের ওপর নখের কয়েকটি হালকা আঁচড়ের দাগ স্পষ্ট। আর বিছানার ঠিক নিচে, কার্পেটের ওপর পড়ে আছে আব্রাজের সেই অফ-হোয়াইট সিল্কের পাঞ্জাবিটা, যেটার একটা বোতামও আস্ত নেই। সবগুলো বোতাম যেন কোনো হিংস্র যুদ্ধের শিকার হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। নৈশি দুই হাতে কম্বলটা বুকের কাছে টেনে নিয়ে উঠে বসল। তার হার্টবিট তখন প্রতি মিনিটে দুশো বার স্পন্দন ছুঁতে চাইছে।

“এসব… এসব কী? আমি… আমি এখানে কীভাবে? আর এই ঘরটার এই অবস্থা কেন?”

নৈশি নিজের মাথায় চাপ দিয়ে গত রাতের কথা মনে করার চেষ্টা করল। আর ঠিক তখনই, একের পর এক স্মৃতি তার মগজে পারমাণবিক বোমার মতো ফাটতে শুরু করল, “আব্রাজ! এগুলো কী ধরনের অসভ্যতা?”

“কাল রাতে বউ হয়ে স্বামীর ইজ্জত খেয়েছেন, তা কেমন সভ্যতা ছিল?” নৈশির মনে হলো, তার মগজের ভেতর কেউ যেন হাজার ওয়াটের একটা বাল্ব জ্বালিয়ে দিয়েছে। তীব্র আলোয় গত রাতের ঝাপসা স্মৃতিগুলো যখন স্পষ্ট হতে শুরু করল, তখন তার কলিজা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।

সে কি সত্যিই আব্রাজের পাঞ্জাবির কলার ধরে তাকে ‘ফড়িং’ বলেছে? সে কি সত্যিই মীর আবরাজ রোদের মতো একজন ডাকসাইটে এমপি-র নাকে কামড় দিতে গিয়েছিল? নিজের ওপর নিজেরই এমন প্রবল ঘৃণা আর লজ্জা আগে কখনো হয়নি। আব্রাজ তখনো বিছানায় আধশোয়া হয়ে বাঁকা চোখে নৈশির অস্থিরতা উপভোগ করছে। তার সুঠাম শরীরের পেশিগুলোতে ভোরের আলো পড়ে এক অদ্ভুত আভা তৈরি করেছে। আব্রাজ এক হাত দিয়ে নিজের চুলগুলো একটু ঠিক করে নিয়ে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে বলল,

“এত কষ্ট করে সওয়াল-জবাব করার দরকার নেই নেত্রী। আপনার ওই পলিটিক্যাল ব্রেইন এখন কাজ করবে না। তার চেয়ে বরং আমার গ্যালারিটা চেক করেন, আপনার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র কিছু ফুটেজ রেকর্ড করে রেখেছি। একদম ৪কে কোয়ালিটি!”

নৈশি এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়াল। গলার কাছে শাড়ির আঁচলটা কোনোমতে পেঁচিয়ে সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আপনি… আপনি ভিডিও করেছেন? আপনি কি ব্ল্যাকমেইল করছেন আমাকে?”

আব্রাজ একটা শব্দ করে হাসল। সে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে নৈশির দিকে এক পা এগিয়ে এল। নৈশি ভয় পেয়ে পিছিয়ে যেতে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সাথে ধাক্কা খেল। আব্রাজ তার দুপাশে হাত দিয়ে নৈশিকে আয়নার সাথে একপ্রকার বন্দী করে ফেলল।

“ব্ল্যাকমেইল? আরে না! এটাকে বলে ‘সেফগার্ড’। কোনোদিন সংসদে যখন আপনি আমার ওপর তর্জনী উঁচিয়ে দেশের নীতি-নৈতিকতা নিয়ে বড় বড় ভাষণ দেবেন, তখন এই ভিডিওটা দেখলে আপনার ওই বিপ্লবী কণ্ঠস্বরটা একটু কেঁপে উঠবে কি না, সেটাই পরীক্ষা করব। ২০ টাকার বউ তো কী হয়েছে? আপনার পারফরম্যান্স তো দেখি ২০ কোটি টাকারও বেশি দামি!” নৈশির গাল দুটো অপমানে আর লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে উঠল। সে আব্রাজের বুকের ওপর হাত রেখে তাকে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু আব্রাজের সেই পাথরকাটা শরীর এক চুলও নড়ল না। “আপনি কোকে বিষজাতীয় কিছু তরল মিশিয়েছিলেন তাই না?”

আব্রাজ নৈশির কানের খুব কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “গত রাতে ওই কোকের বোতলে আমি বিষ মিশিয়েছিলাম কি না জানি না, কিন্তু আপনি যে বিষাক্ত একটা নেশা ধরিয়ে দিলেন নেত্রী, সেটার এন্টিডোট কিন্তু আমার কাছেও নেই। আপনার এই নখের আঁচড়গুলো… এগুলো কি আমার পলিটিক্যাল লাইফের প্রাপ্তি হিসেবে ধরব?” নৈশি মাথা নিচু করে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল। তার চোখ দিয়ে দু ফোঁটা লোনা জল গড়িয়ে পড়ল। এই অহংকারী লোকটার সামনে সে নিজেকে কতটা ছোট করে ফেলেছে, তা ভেবেই তার দম আটকে আসছে। নৈশির চোখের জল দেখে আব্রাজের মেজাজটা যেন হঠাৎ করেই দমে গেল। সে নৈশির চিবুকটা ধরে মুখটা একটু উঁচু করল।

“কাঁদছেন কেন? ভোট কি কমে গেছে? নাকি বিরোধী দলের নেত্রীর ইগোতে চোট লেগেছে? গত রাতে চুরির মাল খেয়ে যে মাতলামিটা করেছেন, সেটা অন্তত সৎ ছিল। আপনার ওই পলিটিক্যাল মুখোশের চেয়ে গত রাতের ওই ‘মাতাল নৈশি’ আমার কাছে অনেক বেশি রিয়েল ছিল।” আব্রাজ এক ঝটকায় নৈশিকে ছেড়ে দিয়ে আলমারির দিকে চলে গেল। সে একটা নতুন ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি বের করতে করতে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,

“দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নিন। আরযান ভাইয়া অলরেডি ডাইনিং টেবিলে বসে গেছেন। এই মুখ নিয়ে নিচে গেলে সবাই ভাববে আমি বোধহয় আপনাকে সারা রাত টর্চার করেছি। যদিও ভিডিও দেখলে সবাই বুঝবে টর্চারটা আসলে কে কার ওপর করেছে!” নৈশি ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের বিদ্ধস্ত চেহারাটার দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের এক কোণ সামান্য ফোলা, আর শাড়ির ভাঁজগুলো সবটুকু শ্লীলতা হারিয়েছে। নৈশি আব্রাজের দিকে ফিরে বলল, “আমি নিচে যাব না। আমার শরীর ভালো লাগছে না।”

আব্রাজ পাঞ্জাবিটা গায়ে চড়াতে চড়াতে আয়নায় নৈশির দিকে তাকাল। “শরীর ভালো না লাগলে বিছানায় শুয়ে ঘাস খান। ছাগলদের সকালে বেশি পুষ্টির দরকার হয়। তবে মনে রাখবেন নেত্রী, মীর আব্রাজ রোদের ঘরে থাকতে হলে আপনাকে বাঘিনী হয়ে থাকতে হবে, এমন বিলাই সেজে থাকলে আমার পোষাবে না। যান, দ্রুত তৈরি হন। আর ওই ভিডিওটা আমি ডিলিট করব কি না, সেটা নির্ভর করছে আজ আপনার বসার ঘরের পারফরম্যান্সের ওপর। বুঝতেই পারছেন… পলিটিক্স ইজ অল অ্যাবাউট গিভ অ্যান্ড টেক!”

আব্রাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেট থেকে রুমাল বের করে তার আয়নার সামনের চুলগুলো ঠিক করল এবং শিস দিতে দিতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নৈশি সেই বিশাল রাজকীয় ঘরের মাঝখানে একা দাঁড়িয়ে রইল। তার মাথার যন্ত্রণাটা যেন আরও বেড়ে গেল। এই লোকটা তাকে পাগল করে ছাড়বে। সে একটা বালিশ তুলে সজোরে দরজার দিকে ছুড়ে মারল, কিন্তু ততক্ষণে আব্রাজ করিডোরে তার দাপুটে পদক্ষেপে নিজের রাজ্য জয়ের দিকে এগিয়ে গেছে।

জমিদার বাড়ির দোতলার করিডোর পেরিয়ে নিচে নামতেই বসার ঘরের চেনা শোরগোল কানে আসে। মেজো খালার মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে পুরো বাড়ি যেন এক জীবন্ত উৎসবের রূপ নিয়েছে। চারিদিকে সুগন্ধি আতর, রান্নার মশলার কড়া ঘ্রাণ আর আত্মীয়-স্বজনদের উচ্চস্বরে কথা বলার আওয়াজ। তবে মীর বাড়ির বাকি ভাইদের সকালটা যে যার মতো করে নিজস্ব রঙে সাজিয়ে নিচ্ছিল। নিচের মস্ত বড় ড্রয়িংরুমে তখন আত্মীয়দের বেশ ভিড়। সকালের নাস্তা শেষ করে সবাই সোফায় জাঁকিয়ে বসে গল্পগুজবে ব্যস্ত। অবনী একটা বড় কাঁসার ট্রে-তে করে ধোঁয়া ওঠা লিকার চায়ের কাপগুলো একে একে সবার সামনে এগিয়ে দিচ্ছিল। পরনে তার হালকা নীল রঙের একটা জামদানি, চুলে সাধারণ একটা খোঁপা। কয়েকদিনের ধকল শেষে তার মুখে এক চিলতে শান্ত স্নিগ্ধতা। ঠিক তখনই সোফার এক কোণ থেকে মেজো খালার দূর সম্পর্কের এক চিলতে কুটনামী স্বভাবের খালাতো বোন, মমতাজ বেগম, চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে গলাটা একটু উঁচিয়ে বললেন,

“আচ্ছা অবনী, শুনলাম তুমি নাকি কিসের জন্য জানি অনেকদিন ঘরের দরজা বন্ধ করে থাকতে? ওই যে কী যেন বলে… ডিপ্রেশন? আমাদের আমলে তো এসব বিলাসিতা ছিল না বাপু। আজকালকার মেয়েদের একটুতেই মন খারাপ, একটুতেই হাত-পা ছেড়ে দেওয়া! তা মীর বাড়ির মতো এমন বনেদী ঘরে এসেও কি এখনো ওই মনমরা ভাবটা কাটেনি? তোমার বাপের বাড়ির ওদিকের ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়েও তো কত কথা শুনলাম……”

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ড্রয়িংরুমের প্রবেশদ্বারে একটা ছায়া এসে দাঁড়াল। সেটা আর কেউ নয় রাজ। পরনে তার অফ-হোয়াইট রঙের শার্ট। সবাই ভাবল রাজ হয়তো রেগে চিৎকার করবে। কিন্তু একজন সাইকিয়াট্রিস্ট যখন রেগে যায়, সে কখনো গলার আওয়াজ উঁচুতে তোলে না। রাজ অত্যন্ত ধীর পায়ে এগিয়ে এল এবং অবনীর হাত থেকে চায়ের ট্রে-টা নিজের হাতে নিয়ে সোজা মমতাজ বেগমের মুখোমুখি দাঁড়াল। তার গলার স্বর এতটাই নিচু হলো যে পুরো ঘর এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। রাজ খুব ভদ্রভাবে হাসল, মমতাজ খালামণি, রাইট? আপনার অবনীর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এই গভীর উদ্বেগ দেখে আমি সত্যিই মুগ্ধ। আসলে মেডিকেল সায়েন্সে একটা টার্ম আছে, ‘প্রোজেকশন’। মানুষ যখন নিজের জীবনের চরম ব্যর্থতা, একাকীত্ব আর ভেতরের কুৎসিত রূপটা নিজে সহ্য করতে পারে না, তখন সে অন্যের ট্রমা বা অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে সাময়িক আনন্দ পাওয়ার চেষ্টা করে। এটাকে এক ধরনের ক্রনিক মেন্টাল ডিসঅর্ডারও বলা যায়।”

মমতাজ বেগমের মুখের রঙ এক সেকেন্ডে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তিনি থতমত খেয়ে বললেন, “আরে রাজ, আমি তো এমনিতেই….”

“আমি জানি খালামণি।” রাজ তাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে আরও একটু ঝুঁকে বলল, “আপনার এই বয়সে এসে অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এত বেশি কৌতূহল হওয়াটা কিন্তু ডিমেনশিয়া বা মস্তিস্কের কোষ ক্ষয়ের পূর্বলক্ষণ হতে পারে। আমার ঢাকা চেম্বারে চলে আসবেন কোনো একদিন, আত্মীয় হিসেবে আপনাকে একদম ফ্রি-তে থেরাপি দেব। আর হ্যাঁ, অবনী এই মীর বাড়ির বউ। ওর বাপের বাড়ি কিংবা অতীত নিয়ে সস্তা মন্তব্য করার আগে নিজের প্রেসারটা একবার মেপে নিয়েন, স্ট্রোকের ঝুঁকি কিন্তু আপনার বয়সেই সবচেয়ে বেশি।”

পুরো ড্রয়িংরুমে তখন পিনপতন নীরবতা। মমতাজ বেগম লজ্জায় চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে ওড়না ঠিক করার বাহানায় ওখান থেকে উঠে ভেতরের ঘরের দিকে প্রায় পালালেন। রাজ অবনীর দিকে তাকাল। অবনীর চোখে তখন কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসার দু ফোঁটা জল চকচক করছে। রাজ চোখের ইশারায় তাকে আশ্বস্ত করে চায়ের কাপটা নিজের হাতে নিয়ে বলল, “বউ! তোমার ডাক্তারের জন্য এক কাপ কড়া চিনি ছাড়া চা হবে?” অবনী জবাব দিল না। কেবল মাথা নিচু করে হাসল।

মেজো খালার বাড়ির পেছনের কাঠের বারান্দায় একটা বেতের চেয়ারে পা তুলে বসে ছিল মীর আরবিন প্রাণ। তার বোহেমিয়ান অবাধ্য চুলগুলো কপালে এসে পড়েছে, আর সে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে তার ফোনে একটা নতুন মিউজিক ভিডিওর কালার গ্রেডিং দেখছিল। ঠিক তখনই ওখান দিয়ে যাচ্ছিল মীর আরভিদ। আরভিদের পরনে তখনো সকালের সেই অগোছালো ভাব, কিন্তু প্রাণের এই সাতসকালে ‘সিরিয়াস’ মোড দেখে সে কনুই দিয়ে তাকে একটা খোঁচা মারল। “কী গো ডিরেক্টর? গ্রামের এত সুন্দর কাঁচা রোদের সকাল, চারদিকে এত সুন্দরী কাজিনদের মেলা, আর তুমি মিয়া এখনো ওই ফোনের স্ক্রিনে নায়িকার মুখ লকিং করছো? তোমার নিজের জীবনের ফ্রেমটা কবে লক হবে শুনি?”

প্রাণ ফোনটা একপাশে সরিয়ে আরভিদের দিকে তাকিয়ে চোখ ছোট করল। “আরভিদ সবাইকে নিজের মতো ভাবিস না। তোর সকালটা কীভাবে কেটেছে, সেটা তোর ওই কুঁচকে যাওয়া শার্ট আর আর্যার লাল হয়ে থাকা চোখ দেখলেই বোঝা যায়। সো, জাস্ট ব্যাক অফ! আমাকে আমার আর্ট নিয়ে থাকতে দে।”

“বিয়ে করো ভাই, রাত জাগলে ভাবী আর তোমারও চোখ ওমন লাল হয়ে থাকবে সকালে।” আরভিদ একটা অট্টহাসি দিয়ে সেখান থেকে চলে যেতেই প্রাণের ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল ‘প্রত্যাশা’ নামটা। একটা টেক্সট মেসেজ।

“শুনলাম গ্রামে কাল রাতে খুব কালবৈশাখী ঝড় হয়েছে। ডিরেক্টর সাহেব কি ঝড়ে উড়ে গেলেন, নাকি নতুন কোনো ট্র্যাজিক স্ক্রিপ্ট লিখছেন? এখানে কিন্তু সকাল থেকে খুব মিষ্টি রোদ। আপনার পিলুগ্রামের আপডেট কী?” মেসেজটা পড়তেই প্রাণের সেই গম্ভীর, রাশভারী ডিরেক্টর সুলভ মুখটা এক নিমেষে গলে গেল। তার ঠোঁটের কোণে এমন এক চিলতে চওড়া হাসি ফুটে উঠল, যা সে নিজেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। সে বারান্দার কাঠের রেলিংয়ে ভর দিয়ে বাইরের রোদে ভেজা সবুজ উঠোনটার দিকে তাকাল। তার মনে হলো, চণ্ডীপুরের এই রোদটা যেন হুট করেই বসন্তের অবাধ্য বাতাসে রূপ নিয়েছে।

সে টাইপ করল, “ঝড়ে উড়িনি, তবে গ্রামের আকাশটা আজ হঠাৎ করেই খুব চেনা একটা মানুষের হাসির মতো সুন্দর লাগছে। স্ক্রিপ্ট লিখছি না, তবে আমার পরবর্তী সিনেমার হিরোইন ফিক্সড হয়ে গেছে। সিনেমার নাম কিন্তু আমার জীবন।”

ডাইনিং টেবিলের এক কোণায় তখন যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। তাজ অত্যন্তশান্ত ভঙ্গিতে ছুরি-কাঁটা দিয়ে ডিম-পরোটা খাচ্ছে। তার বসার ভঙ্গি, মেরুদণ্ড সোজা রাখার স্টাইল দেখলেই বোঝা যায় সে একজন পাইলট। তার ঠিক পাশেই বসা বড় ভাই মীর আরযান তখন মেজো খালার এক ছেলেকে কোনো একটা ভুলের জন্য কড়া ধমক দিচ্ছে। আরযানের সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বরের সামনে ডাইনিং টেবিলের বাকিদের পরোটা গেলা দায় হয়ে পড়েছে। কিন্তু তাজের মুখে কোনো বিকার নেই। ঠিক তখনই তাজের প্যান্টের পকেটে থাকা ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। তাজ পরোটার টুকরো মুখে পুরে অত্যন্ত ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে ফোনটা বের করল। সিয়ার রিপ্লাই এসেছে। তাজ সকালে তাকে একটা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, অফিশিয়াল মেসেজ পাঠিয়েছিল,“আমাকে নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না৷ Focus on your pending reports.”

তার বিপরীতে সিয়া পাঠিয়েছে, “থ্যাঙ্ক গড স্যার! আপনি যে অক্ষত অবস্থায় আছেন, এটা জেনে অফিসের সবাই হাফ ছেড়ে বাঁচল। গ্রামের মশাগুলো আসলেই খুব লাকি যে ক্যাপ্টেন মীর তাজের মতো একজন প্রিমিয়াম কাস্টমারের রক্ত খাওয়ার সুযোগ পেয়েছে! আই উইল ডেফিনেটলি ফোকাস অন মাই ডিউটি স্যার। আপনিও বিয়ে বাড়িতে গিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করবেন, নয়তো মেহমানরা আপনাকে বাউন্সার ভেবে ভুল করতে পারে। থ্যাঙ্ক ইউ!”

তাজ পরোটা চিবানো বন্ধ করে দিল। ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তার চোখের মণি একটু সংকুচিত হলো। এই মেয়েটার স্পর্ধা দিন দিন বেড়েই চলেছে। একজন সিনিয়র পাইলটকে সে বাউন্সারের সাথে তুলনা করছে? তাজ ফোনটা টেবিলে রাখতে গিয়েও থামল। তার সেই পাথরের মতো শক্ত আর গম্ভীর ঠোঁটের কোণেএকটা অত্যন্ত সূক্ষ্ম হাসি ফুটে উঠল।

আরযান ভাইয়ার ধমকানো তখনো থামেনি, কিন্তু সে আড়চোখে তাজের এই বিরল পরিবর্তনটা লক্ষ্য করল। আরযান ধমকানো থামিয়ে তাজের দিকে তাকিয়ে চিবুক উঁচিয়ে বললেন,

“কী রে তাজ? কার মেসেজ দেখে তোর এই মরুভূমির মতো মুখে একটু বৃষ্টির ছাঁট দেখা যাচ্ছে? এয়ারফোর্সের নতুন কোনো যুদ্ধবিমান অর্ডার করলি নাকি?”

তাজ এক সেকেন্ডে নিজের মুখটা আবার সেই বরফশীতল মোডে নিয়ে গিয়ে বলল, “কিছু না ভাইয়া। জাস্ট অফিসের একটা স্টুপিড ফাইল নিয়ে ঝামেলা হচ্ছে।” আরযান মনে মনে হাসলেন, এই মীর বাড়ির শক্ত বরফগুলো যে একে একে গলতে শুরু করেছে, তা বুঝতে তার আর বাকি নেই। বড় ভাইয়ের চোখ এড়িয়ে ফোনটা আবার হাতে নেওয়া তার মতো শৃঙ্খলিত মানুষের জন্য একপ্রকার ‘ক্রাইম’, কিন্তু সিয়ার ওই মেসেজটা তার মগজের কোথাও একটা সূক্ষ্ম সুড়সুড়ি দিচ্ছে। তাজ আঙুল চালিয়ে টাইপ করল, “তোমার রসবোধের প্রশংসা করা যেত যদি সেটা কাজের ক্ষেত্রেও থাকত, সিয়া। বাউন্সারের সাথে তুলনা করার জন্য সোমবার অফিসে তোমার জন্য একটা স্পেশাল ড্রিল অপেক্ষা করছে। এন্ড ফর ইয়োর ইনফরমেশন, মশা আমাকে নয়, বরং আমিই মশাগুলোকে আমার এরিয়া থেকে ডিসচার্জ করছি।”

মেসেজটা পাঠিয়ে তাজ ফোনটা টেবিলের ওপর উপুড় করে রাখল। তার ধারণা ছিল সিয়া হয়তো এবার ভয় পাবে। একজন সিনিয়র অফিসারের ‘স্পেশাল ড্রিল’-এর হুমকি কোনো ক্যাডেটের জন্য খুব একটা সুখকর হওয়ার কথা নয়। কিন্তু পাঁচ সেকেন্ড পার হতে না হতেই ফোনটা আবার ভাইব্রেট করে উঠল। তাজ কপালে ভাঁজ ফেলে স্ক্রিন অন করল। সিয়া লিখেছে, “স্যার, ড্রিল তো আমি রোজই করি। কিন্তু গ্রামের বিয়ে বাড়িতে আপনি ওই ‘ডিসচার্জ’ করার বদলে মানুষের সাথে একটু কথা বললে কি আপনার বিমানের ফুয়েল শেষ হয়ে যাবে? আর হ্যাঁ, বাউন্সার বলেছি কারণ আপনার ওই গম্ভীর লুক দেখে যদি কোনো হবু শ্যালিকা এসে আপনাকে দুলাভাই ভেবে ভুল করে বসে, তবে তো আপনার ইগোতে জিপিএস সিগন্যাল কাজ করবে না! জাস্ট বি সেফ, স্যার।”

তাজ এবার সত্যি সত্যিই দমে গেল। সে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে নিজের ফোনটার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন সেটা কোনো আনআইডেন্টিফাইড ফ্লাইং অবজেক্ট। এই মেয়েটা কি ভয়ডর বলে কিছু চেনে না? নাকি সে জানে যে তাজের এই পাথরের আস্তরণের নিচে একটা মানুষ আছে যাকে চাইলেই রাগানো বা হাসানো যায়? তাজ এবার একটু কড়া হওয়ার চেষ্টা করে লিখল,

“সিয়া, লিমিট ক্রস করবে না। আমি এখানে ফ্যামিলি ফাংশনে আছি। ডোন্ট ডিস্টার্ব মি উইথ ইয়োর সিলি জোকস। ফোকাস অন ইয়োর রিপোর্টস, দ্যাটস অ্যান অর্ডার।” সিয়ার রিপ্লাই আসতে এবার একটু সময় নিল। তাজ ভাবল, যাক অবশেষে বোধহয় মেয়েটা দমেছে। সে এক ঢোক পানি খেয়ে ডাইনিং টেবিল থেকে ওঠার প্রস্তুতি নিল। ঠিক তখনই স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। কোনো টেক্সট নয়, সিয়া একটা ছবি পাঠিয়েছে। ছবিটা সিয়ার নিজের। অফিসের ডেস্কে বসে আছে সে, সামনে ফাইলের স্তূপ। তার মাথায় একটা বড় আকারের এভিয়েটর চশমা, আর মুখটা এমনভাবে ফুলিয়ে রেখেছে যেন সে খুব ‘সিরিয়াস’ একটা মিশনে আছে। নিচে ক্যাপশন,

“বিমান বালা হয়েও রিপোর্টে ফোকাস করছি স্যার! কিন্তু আপনার ওই ‘অর্ডার’ দেওয়ার স্টাইলটা মনে পড়লেই আমার কলমটা কেমন যেন লুপ দিয়ে আকাশে উড়তে চাইছে। বাই দ্য ওয়ে স্যার, গ্রামের ওই ‘সিলি’ বিয়ে বাড়ির বিরিয়ানিটা কি আমার জন্য পার্সেল করা সম্ভব? আপনার ড্রিলের এনার্জি পেতে ওটা খুব দরকার!”

তাজের ঠোঁটের কোণটা এবার আর নিয়ন্ত্রণ মানল না।এই মেয়েটা জাদুকর নাকি কোনো ভাইরাস? তার মতো একজন ডিসিপ্লিন্ড পাইলটকে সে গত দশ মিনিটে তিনবার হাসিয়ে ছেড়েছে। যদিও রাগের কারনেই হাসি পাচ্ছে। সে আবার টাইপ করল,

“বিরিয়ানি চাইলে কিনে খাও। আর হ্যাঁ, ওই চশমাটা তোমার মাথার তুলনায় অনেক বড় লাগছে। ওটা সরিয়ে রিপোর্টে মন দাও।”

সিয়ার তাৎক্ষণিক উত্তর, “চশমাটা বড় কারণ ওটা আপনার সিগনেচার স্টাইল স্যার! আপনাকে কপি করার চেষ্টা করছি যাতে বাউন্সার না হয়ে লিডার হতে পারি। এনিওয়ে স্যার, এনজয় দ্য ওয়েডিং। আমি রিপোর্টে ডুব দিলাম। আর হ্যাঁ… একটু হাসবেন, প্লিজ? গ্রামের রোদটা আপনার হাসির অভাবে ফিকে হয়ে যাচ্ছে।”

তাজ আর কোনো রিপ্লাই দিল না। সে ফোনটা পকেটে পুরে টেবিল থেকে উঠে দাঁড়াল। পাশ থেকে আরযান বলল, “ফাইলটা তো বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে রে তাজ। যার কারণে মরুভূমিতেও রোদ উঠছে। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ করে যাওয়ার সময় ওই ‘ফাইল’টা আমাকে একবার দেখাস তো, আমি একটু ভেরিফাই করে দেবো।”

তাজ থতমত খেয়ে গেল। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে শুধু বলল, “জি ভাইয়া… আই মিন, না ভাইয়া। ওটা জাস্ট… ওটা স্টুপিড একটা বিমানবালা।”

আরযান হাসতে হাসতে করিডোর দিয়ে এগিয়ে গেলেন। তাজ ডাইনিং হলের বড় আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে একবার নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল। সে কি সত্যিই বাউন্সারের মতো গম্ভীর হয়ে থাকে? সে অবচেতনভাবেই আয়নায় তাকিয়ে নিজের মুখটা একটু স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। ঠিক তখনই তার কানে সিয়ার শেষ লাইনটা প্রতিধ্বনিত হলো, “গ্রামের রোদটা আপনার হাসির অভাবে ফিকে হয়ে যাচ্ছে।”

তাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়না থেকে চোখ সরাল। তাজ বুঝতে পারল, আকাশে হাজার ফুট ওপরে বিমান চালানো হয়তো সহজ, কিন্তু সিয়ার মতো একটা অবাধ্য আর চঞ্চল বিমানবালার টেক্সট মেসেজের মোকাবিলা করা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন রণকৌশল। সে নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে বলল, “স্টুপিড মেয়ে একটা…!”

চলবে?

ভাই রিয়েক্ট কমেন্ট কইরেন, ফাউ ফাউ এসে খালি গল্প পড়ে চলে যান।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply