#যেখানে_প্রেম_নিষিদ্ধ
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
রাতের হাতের গিটারটা এক সেকেন্ডের জন্য কেঁপে উঠল। তার চোখের মণি স্থির। সে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। ওপাশে আর কেউ নয়… খোদ সুহানা! সেই ডাইনী রেসার, যাকে গত চারদিন ধরে সে পাগলের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছে।
রাত ছাদের রেলিংয়ের কাছ থেকে দ্রুত কয়েক কদম সরে গিয়ে কাজিনদের আড়াল হলো। বুকের ভেতরের ধুকপুকানিটা তখন রীতিমতো ড্রাম পেটাচ্ছে। সে গলাটা যথাসম্ভব নিচু করে, অথচ তীব্র চাপা আক্রোশে হিসহিসিয়ে উঠল, “সুহানা! তুমি এখন ঠিক আছো তো?”
“উফফ! জাস্ট শাট আপ, বলদ সিঙ্গার!” ওপাশ থেকে সুহানার সেই চেনা, তাচ্ছিল্য মেশানো তীক্ষ্ণ গলা রাতের কথার মাঝখানেই কাঁচি চালাল। “তোমার এই ঘ্যানঘ্যান শোনার জন্য আমি এত রাতে কল করিনি। আমি ঠিক আছি, না আছি সেই ডিটেকটিভ গিরি করার তোমাকে কে বলেছে রে চকোলেট বয়? ক্লাবে ওইদিন দুই-চারটে ঘুষি মেরেই নিজেকে খুব বড় অ্যাকশন হিরো ভাবছো নাকি?”
রাতের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। এই মেয়েটার এত অহংকার আর ঘাড়ত্যাড়ামি যে মাঝে মাঝে রাতের ইচ্ছে করে ওকে ধরে আচ্ছা করে ঝাঁকুনি দিতে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “হিরোগিরি আমি দেখাতে যাইনি, তুমি আমাকে জড়াতে বাধ্য করেছিলে।”
সুহানা ওপাশ থেকে এবার খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসির শব্দটা রাতের কানে এক অদ্ভুত নেশার মতো ঠেকল। হাসি থামিয়ে সুহানা চরম অবজ্ঞার সুরে বলল, “ওরে আমার সুপারম্যান রে! আমাকে বাঁচাবে! আরে তুমি তো নিজের হাতের ব্যথাই সামলাতে পারো না, সে হিরোগিরি নিয়ে কথা বলছে।”
“সুহানা! লিমিট ক্রস করছো তুমি!” রাত এবার সত্যিই রেগে গেল। “ফোনটা করেছো কেন সেটাই বলবে কি না?”
হঠাৎ করেই ওপাশের পরিবেশটা শান্ত হয়ে গেল। সুহানার সেই তীক্ষ্ণ, ব্যঙ্গাত্মক গলার স্বরটা একটা দীর্ঘশ্বাসের ভারে ভারী হয়ে এলো। রাত ফোনে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল ওপাশেও কোথাও তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ আর সুহানার দ্রুত শ্বাস নেওয়ার শব্দ রাতের রাগটাকে এক নিমেষে গলিয়ে দিল। মেয়েটা হাসছে ঠিকই, কিন্তু ও যে চরম বিপদে বা ক্লান্তিতে আছে, সেটা রাতের বুঝতে বাকি রইল না।
“সুহানা… তুমি ঠিক আছো?” রাতের গলাটা এবার একদম নরম হয়ে এলো…
কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা। তারপর সুহানার গলাটা ভেসে এলো। আগের সেই দাপটটা আর নেই, “খুব টায়ার্ড লাগছে রে সিঙ্গার। গত চারদিন ধরে শুধু দৌড়াচ্ছি। একটার পর একটা হাইওয়ে, অন্ধকার গলি… ঘুমাইনি একটুও।”
রাতের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। সে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই সুহানা আবার বলে উঠল, “এই বলদ সিঙ্গার… আমাকে একটা গান শোনাবে? পার্সোনালি? খুব শুনতে ইচ্ছে করছে রে।”
সুহানা জাবিনের মতো একটা ডেঞ্জারাস, ডমিনেটিং মেয়ের মুখে এমন একটা আবদার শুনে রাত কয়েক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে রইল। রাত আর কোনো কথা বাড়াল না। সে ফোনটা স্পিকারে দিয়ে ছাদের কার্নিশের ওপর রাখল। তারপর নিজের গিটারটা তুলে নিয়ে কোলে রাখল। বাইরের কালবৈশাখীর গর্জন আর বৃষ্টির শব্দের সাথে পাল্লা দিয়ে রাতের আঙুলগুলো গিটারের তারে জাদুকরী এক কর্ড তুলল।
রাত চোখ বন্ধ করল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সুহানার সেই মুখ, মারামারির রাতের সেই বুনো গন্ধ, আর এখনকার এই ক্লান্ত কণ্ঠস্বর। সে তার ভরাট গলায় গাইতে শুরু করল,
~আমি বৃষ্টি হয়ে তোমার চোখে ঝরবো অঝরা
তুমি দু’হাত পেতে আমায় চেয়ে করবে প্রার্থনা
তুমি আমার শুরু থেকে শেষ অবধি,
শুধু আমার তুমি আমার একলা ঘরে শূন্যতার চাদর~
দুজনের মাঝখানে মাইলের পর মাইল দূরত্ব, কিন্তু ওই এক গানেই যেন রাতের উষ্ণতা সুহানার সব ক্লান্তি ধুয়ে দিচ্ছিল। গান শেষে রাত যখন থামল, ওপাশ থেকে কোনো কথা এলো না। শুধু একটা চাপা, দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা গেল। তারপর কলটা কেটে গেল। রাত ফোনটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। “তুমি যেখানেই থাকো সুহানা, এই সিঙ্গার ঠিক তোমাকে খুঁজে বের করবে।”
–
জমিদার বাড়ির সেই আদিখ্যেতায় ভরা বিশাল ঘরটায় তখন পিনপতন নীরবতা। শুধু শোনা যাচ্ছে দুটি মানুষের দ্রুত ওঠানামা করা শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। নৈশির ভারী বেনারসির জাঁকজমক আর গলার জড়োয়া হার তখন আব্রাজের অফ-হোয়াইট সিল্কের পাঞ্জাবির বোতামের সাথে রীতিমতো যুদ্ধ করছে। নৈশির ফর্সা, ঘর্মাক্ত মুখটা আব্রাজের চওড়া বুকের এত কাছে যে, সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল মীর আব্রাজ রোদের বুকের ভেতর ধুকপুক করা হৃদপিণ্ডের মাতাল ছন্দ। এমনিতে লোকটার বাইরেটা পাথরের মতো কঠিন, কিন্তু বুকের ভেতরটা যে এমন পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটতে পারে, তা নৈশির জানা ছিল না। “জোর আমি খাটাইনি নেত্রী, বর্ডার ক্রস করে আপনি নিজেই আমার বুকের ওপর এসে আছড়ে পড়েছেন। আর মীর আব্রাজ রোদ নিজের বুকে আসা অধিকার কোনোদিন হাতছাড়া করে না।”
আব্রাজের সেই ভরাট, নেশাধরা গলা আর তার চোখের ওই অবাধ্য, ধূর্ত চাউনি নৈশির স্নায়ুর ভেতর এক অজানা শিহরণ জাগিয়ে তুলল। কিন্তু সে নৈশি। বিরোধী রাজনৈতিক ময়দানে যে মেয়েটা একা দাঁড়িয়ে পুলিশের লাঠিচার্জ ফেস করতে পারে, সে মীর আব্রাজের এই সস্তা রোমান্টিসিজমের কাছে হার মানবে? নৈশি নিজের ভেতরের কাঁপনটাকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে তীব্র রাগে ফুঁসে উঠল। সে প্রাণপণ শক্তিতে আব্রাজের বুকের ওপর নিজের দুই হাত রেখে সজোরে ধাক্কা দিল। কিন্তু আব্রাজের পেশিবহুল শরীরটা এক ইঞ্চিও নড়ল না, উল্টো সে নৈশির কোমর থেকে হাত না সরিয়েই একটা বাঁকা হাসি দিল।
“ছাড়ুন বলছি আব্রাজ! একদম গায়ে হাত দেওয়ার স্পর্ধা দেখাবেন না!” নৈশি দাঁতে দাঁত চেপে, ফিসফিস করে হিসহিসিয়ে উঠল।
আব্রাজ এবার খুব ধীরে, অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সাথে তার হাতের বাঁধন আলগা করল। নৈশি এক ঝটকায় পিছিয়ে গিয়ে নিজের শাড়ির কুঁচি আর আঁচল ঠিক করতে লাগল। তার ফর্সা গাল দুটো তখন রাগে আর অপমানে টকটকে লাল। আব্রাজ নিজের পাঞ্জাবির কলারটা ঠিক করতে করতে অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল, “গায়ে হাত দেওয়ার স্পর্ধা? লিগ্যাল পেপারস আর কাবিননামাটা কি আপনাকে মনে করিয়ে দিতে হবে নেত্রী? আপনি মীর আব্রাজ রোদের আইনগত স্ত্রী। বিশ টাকার কথা ভুলে গেছেন? স্পর্ধা নয়, এটাকে অধিকার বলে। যদিও আমি জানি, আপনার মতো পলিটিক্যাল অ্যাক্টিভিস্টের কাছে মীর বাড়ির বউয়ের ট্যাগটা একটা রাজনৈতিক আপস ছাড়া আর কিছুই নয়।”
নৈশি স্থির দৃষ্টিতে আব্রাজের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন আগুন জ্বলছে। “ঠিক বলেছেন! এটা শুধুই একটা আপস। একটা নোংরা রাজনৈতিক খেলা, যেখানে আপনি ক্ষমতার জোরে আমাকে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু মনে রাখবেন মিস্টার এমপি, এই খেলাটা আমি শেষ করব। আপনার ওই অহংকারের দুর্গ যেদিন আমি নিজের হাতে ভাঙব, সেদিন বুঝবেন অধিকার কাকে বলে!”
আব্রাজ এক পা এগিয়ে এসে নৈশির চোখের একদম সোজা তাকাল। তার চোখে কোনো রাগ নেই, বরং এক ধরনের অদ্ভুত, গা-জ্বালানো প্রশান্তি। “দুর্গ ভাঙবেন? শখটা মন্দ নয়। তবে তার আগে নিজের পায়ে ঠিকমতো দাঁড়াতে শিখুন, নেত্রী। কার্পেটে পা আটকে আমার বুকে এসে না পড়লে, এতক্ষণে আপনার ওই সুন্দর নাকটা ফ্লোরের সাথে ঘষা খেয়ে চ্যাপ্টা হয়ে যেত। মীর আব্রাজকে ধ্বংস করার আগে, মীর আব্রাজের সাপোর্ট ছাড়া অন্তত এক কদম হেঁটে তো দেখান!”
“ইউ অ্যারোগেন্ট বাস্টার্ড!” নৈশি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। হাতের কাছে থাকা ড্রেসিং টেবিল থেকে একটা ভারী পারফিউমের বোতল তুলে নিয়ে সে ছুড়ে মারল আব্রাজের দিকে।
আব্রাজ অত্যন্ত ক্ষিপ্রতায় মাথাটা সামান্য সরিয়ে নিল। পারফিউমের বোতলটা সশব্দে পেছনের দেয়ালে লেগে মেঝের ওপর পড়ে গেল, তবে ভাঙল না। আব্রাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেট থেকে হাত বের করল। সে বুঝতে পারছে, এই মেয়ের জেদ আর রাগ এখন আউট অফ কন্ট্রোল। আর এই মুহূর্তে তার সাথে তর্ক করা মানে নিজের এনার্জি নষ্ট করা।
আব্রাজ আর কোনো কথা না বলে গটগট করে ঘরের এক কোণায় রাখা একটা ভিন্টেজ কেবিনেটের দিকে এগিয়ে গেল। নৈশি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছিল আর দেখছিল লোকটা কী করে। আব্রাজ কেবিনেটের পাল্লা খুলে ভেতর থেকে একটা ব্ল্যাক লেবেলের বোতল আর একটা ভারী কাঁচের গ্লাস বের করল।
বোতলটা দেখে নৈশির চোখ দুটো বিস্ময়ে আর রাগে কপালে উঠে গেল। “আপনি… আপনি এখন মদ খাবেন? এই মাঝরাতে? তাও আবার আমার সামনে?”
আব্রাজ অত্যন্ত আয়েশ করে বোতলের ছিপি খুলল। গ্লাসে সোনালী তরলটা ঢালতে ঢালতে সে নির্লিপ্ত গলায় বলল, “আপনার চেঁচামেচিতে আমার কানের পর্দা ফাটতে বসেছে, নেত্রী। সারাদিনের ওই পলিটিক্যাল সার্কাস আর এখন আপনার এই পারফিউম ছোড়ার পর, আমার একটু রিলাক্সেশন দরকার। আর মীর আব্রাজ নিজের ঘরে বসে কী খাবে, সেটার জন্য তো বিরোধী দলের পারমিশনের প্রয়োজন নেই, তাই না?”
নৈশি দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে আব্রাজের হাত থেকে গ্লাসটা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু আব্রাজ তার চেয়েও বেশি দ্রুত। সে এক হাতে গ্লাসটা নিজের দিকে সরিয়ে নিয়ে অন্য হাতে নৈশির কব্জিটা শক্ত করে চেপে ধরল।
“লিমিট ক্রস করবেন না, নৈশি।” আব্রাজের গলাটা এবার আর শান্ত নেই, ধারালো হুংকার। “আমি আপনাকে আমার স্পেসে আসতে দিইনি, আপনি নিজেই এসেছেন। এখন আমি কী করব, না করব, সেটা নিয়ে জ্ঞান দিতে আসবেন না।”
“আপনার স্পেস?” নৈশি ব্যথায় মুখ কুঁচকে গেলেও কব্জি ছাড়ানোর চেষ্টা না করেই আব্রাজের চোখে চোখ রেখে বলল, “এটা শুধু আপনার স্পেস নয়, এই ঘরটা এখন আমারও। আর আমার সামনে বসে আপনি এই নোংরা জিনিস গিলবেন, আর আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেটা সহ্য করব? আপনি একজন জনপ্রতিনিধি! মানুষ যদি জানে তাদের আদর্শ এমপি সাহেব মাঝরাতে বউয়ের সামনে মাতলামি করে, তাহলে কাল আপনার ওই অহংকারের সিংহাসন কোথায় গিয়ে ঠেকবে?”
আব্রাজ নৈশির কব্জিটা একটা ঝটকা দিয়ে ছেড়ে দিল। গ্লাসটা ঠোঁটে ঠেকিয়ে এক চুমুক খেল সে। তারপর গ্লাসটা টেবিলে রেখে নৈশির একদম কাছে… এতটাই কাছে যে নৈশি আব্রাজের নিশ্বাসের সাথে মিশে থাকা অ্যালকোহল আর দামি সিগারেটের কড়া ঘ্রাণটা স্পষ্ট টের পাচ্ছিল… এসে দাঁড়াল। আব্রাজ নিচু, ভারী গলায় ফিসফিস করে বলল, “জনপ্রতিনিধি আমি বাইরে, নেত্রী। এই চার দেয়ালের ভেতর আমি শুধুই একজন পুরুষ। আর আপনি আমার স্ত্রী। এখানে আমার মাতলামি দেখার রাইট শুধু আপনার আছে। আর হ্যাঁ, আমি মদ খেয়ে মাতাল হই না। আমি মাতাল হই ক্ষমতার দর্পে, আর… আর আপনার ওই রাগে লাল হয়ে থাকা অবাধ্য চোখ দুটো দেখলে।”
কথাটা বলে আব্রাজ নৈশির গালের পাশ দিয়ে উড়ে আসা একটা অবাধ্য চুলের গোছা আলতো করে কানের পিঠে গুঁজে দিল। আব্রাজের তপ্ত আঙুলের ছোঁয়া নৈশির ফর্সা ঘাড়ে লাগতেই তার পুরো শরীরে যেন বিদ্যুতের শক লাগল। নৈশি এক পা পিছিয়ে গিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, “অসভ্য!”
“বাজে কথা কম বলে ওই সোফাটায় গিয়ে চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ুন, নেত্রী।” আব্রাজ আবার নিজের গ্লাসটা হাতে তুলে নিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “নয়তো আজ রাতে আমার এই মাতলামির পারদ যদি সত্যি সত্যিই চড়ে যায়, তখন কিন্তু আপনার ওই পলিটিক্যাল স্পিচ আমাকে আটকাতে পারবে না। চয়েস ইজ ইওরস।”
আব্রাজ গ্লাস হাতে ব্যালকনির দিকে চলে গেল। নৈশি রাগে কাঁপতে কাঁপতে সেই বদ্ধ ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল। লোকটার প্রতিটা কথা, প্রতিটা স্পর্ধা তার রক্তে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। এই অহংকারী, দাম্ভিক মীর আব্রাজ রোদের সাথে একই ছাদের নিচে কাটানো প্রতিটা সেকেন্ড যে কত বড় মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, তা সে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিল।
–
জানালার বাইরে তখন কালবৈশাখীর মাতম শুরু হয়ে গেছে। বৃষ্টির ছাঁট আর দমকা হাওয়া কাঁচের শার্সিতে আছড়ে পড়ছে বুনো আক্রোশে। কিন্তু ঘরের ভেতরের পরিবেশটা যেন হঠাৎ করেই অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। রাজ, মীর পরিবারের সেই তুখোড় সাইকিয়াট্রিস্ট, যার এক ইশারায় মানুষের মনের জটিলতম গ্রন্থিগুলো খুলে যায় সে আজ নিজেরই পেশেন্টের সামনে একেবারে বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অবনীর ওই সহজ, সাবলীল আর সরাসরি প্রশ্নটা, “আপনি আমায় ভালোবাসেন, তাই না ডাক্তারবাবু?” রাজের মগজের সব ক্লিনিক্যাল থিওরিগুলোকে এক নিমেষে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। রাজ চশমার ফ্রেমটা আরেকবার ঠিক করার চেষ্টা করল, কিন্তু তার হাত সামান্য কাঁপছে। সে ঢোক গিলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার একটা শেষ, মরিয়া চেষ্টা করল।
“অবনী… দেখো, সাইকোলজিতে একটা টার্ম আছে ট্রান্সফারেন্স। অনেক সময় পেশেন্ট তার থেরাপিস্টের ইমোশনাল সাপোর্টটাকে ভুল করে ভালোবাসা ভেবে বসে। তুমি এখন সেই ফেজটার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছো। আমার মনে হয় তোমার একটু রেস্ট নেওয়া দরকার…”
রাজ কথাগুলো শেষ করতে পারল না। অবনী তার আরও এক কদম কাছে এগিয়ে এলো। দুজনের মাঝে এখন এক হাতের দূরত্বও নেই। অবনীর ঠোঁটের কোণে সেই অদ্ভুত প্রশান্তির হাসিটা তখনো লেগেই আছে। সে হঠাৎ নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে রাজের বুকের বাঁ-পাশে, ঠিক হৃদপিণ্ডের ওপর আলতো করে রাখল।
রাজের শ্বাস আটকে যাওয়ার উপক্রম হলো। অবনী খুব ধীর গলায় ফিসফিস করে বলল, “আমার না হয় ট্রান্সফারেন্স হচ্ছে বুঝলাম, কিন্তু আপনার এই হার্টবিটটা যে এমন পাগলের মতো লাফাচ্ছে… মেডিকেল সায়েন্সে এটাকে কী বলে ডাক্তারবাবু? এটাও কি কোনো ক্লিনিক্যাল থিওরি?”
অবনীর হাতের ওই নরম স্পর্শ আর চোখের ওই গভীর চাউনি রাজের আত্মরক্ষার শেষ দেয়ালটাও ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল। সে আর নিজের সাথে অভিনয় করতে পারল না। রাজের কাঁধ দুটো সামান্য ঝুলে পড়ল, যেন একটা দীর্ঘদিনের লুকোনো ভার সে নামিয়ে রাখছে। সে নিজের ডান হাতটা তুলে অবনীর সেই হাতটার ওপর রাখল, যেটা তার বুকে রাখা ছিল।
“তুমি একটা সাইকিয়াট্রিস্টের ব্রেইন হ্যাক করে ফেলেছ, অবনী।” রাজের গলায় এবার আর কোনো ডাক্তারের কাঠিন্য নেই, বরং সেখানে এক চরম অসহায়, অথচ তৃপ্ত প্রেমিকের স্বর। “হ্যাঁ, আমি হেরে গেছি। আরযান ভাই ঠিকই বলেছিলেন, আমি পাগল হয়ে গেছি। একজন ডাক্তারের জন্য তার পেশেন্টের প্রেমে পড়ার চেয়ে বড় আন-এথিক্যাল আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু আমি পারিনি নিজেকে আটকাতে। তোমাকে ওই প্যানিক অ্যাটাকগুলোর মাঝে ছটফট করতে দেখে আমার থিওরিগুলো আর কাজ করত না, আমার শুধু মনে হতো তোমাকে বুকে জড়িয়ে পৃথিবীর সব ভয় থেকে দূরে সরিয়ে রাখি।”
অবনী কিছুই বলল না, শুধু তার চোখ দুটো খুশিতে আর অদ্ভুত এক শান্তিতে চিকচিক করে উঠল। রাজ এবার অবনীর হাতটা নিজের বুক থেকে নামিয়ে নিজের দুই হাতের মুঠোয় পরম যত্নে ধরে বলল, “কিন্তু মীর বাড়ির বউ হওয়াটা এত সহজ নয় অবনী। এই বাড়ির প্রতিটা ইটের সাথে যেমন ক্ষমতা আর অহংকার জড়িয়ে আছে, তেমনি জড়িয়ে আছে ভয়ংকর সব বিপদ। আমি তোমাকে প্রটেক্ট করতে চেয়েছিলাম। আমি চাইনি আমার এই ইমোশনটা তোমার জন্য কোনো বিপদের কারণ হোক। তাই ওই থেরাপির নাটকটা করতে হয়েছিল…”
অবনী রাজের ঠোঁটের ওপর নিজের একটা আঙুল রেখে তাকে থামিয়ে দিল। “বিপদ? আপনাকে ভালোবাসার চেয়ে বড় নিরাপত্তা আমার জীবনে আর কী হতে পারে রাজ? যেদিন থেকে আপনি আমার দায়িত্ব নিয়েছেন, সেদিন থেকে আমার সব অন্ধকার, সব ভয় আপনি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। এবার আমাকে একটু আপনার ওই ক্লান্ত মনটার দায়িত্ব নিতে দিন।”
‘রাজ’ এই প্রথম অবনী তাকে ‘ডাক্তারবাবু’ না বলে নাম ধরে ডাকল। ডাকটা শুনে রাজের বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত শীতলতায় জুড়িয়ে গেল। রাজ আর পারল না। সে দু’হাত বাড়িয়ে অবনীকে নিজের বুকের সাথে খুব শক্ত করে, অথচ পরম মমতায় জড়িয়ে ধরল। অবনীও কোনো বাধা দিল না, বরং একটা নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের মতো রাজের চওড়া বুকে মাথা রাখল। বাইরের কালবৈশাখীর ওই ভয়ংকর গর্জনের বিপরীতে, এই ঘরের ভেতর তখন দুটো আহত মনের এক হওয়ার স্নিগ্ধ উৎসব চলছে। রাজের থেরাপি আজ সত্যি সত্যিই অবনীর সব ট্রমা ভুলিয়ে তাকে এক নতুন জীবনের দিকে টেনে এনেছে।
–
বাইরে তখন কালবৈশাখীর তাণ্ডব আরও প্রখর হয়েছে। দমকা হাওয়ায় জানালার শার্সিগুলো থেকে থেকে কেঁপে উঠছে, আর ঘন ঘন বিদ্যুতের ঝলকানিতে আলোকিত হয়ে উঠছে পিলুগ্রামের আকাশ। কিন্তু আরভিদ আর আর্যার ঘরের ভেতরের পৃথিবীটা যেন স্নিগ্ধ প্রশান্তিতে ডুবে আছে। ঝড়ের কোনো আস্ফালন এই চার দেয়ালের ভেতরের উষ্ণতাকে ছুঁতে পারছে না। বিয়ের পর এই প্রথমবার তাদের মধ্যকার সব অদৃশ্য দেয়াল, সব ইগো আর জেদের দীর্ঘস্থায়ী লড়াইগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে একাকার হয়ে গেছে। বিশাল বিছানায় অগোছালো সাদা চাদরের মাঝে এলিয়ে আছে দুজন। আর্যার ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত মুখটা আরভিদের চওড়া, খালি বুকের ওপর লেপ্টে আছে। আরভিদ তার এক হাত দিয়ে আর্যার নগ্ন পিঠের ওপর আলতো করে বিলি কাটছে, আর অন্য হাতে পরম মমতায় তার এলোমেলো হয়ে থাকা চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিচ্ছে। ঘরের হালকা আলোয় আর্যার ফর্সা মুখে তৃপ্তি আর লজ্জার আভা খেলা করছে।
দীর্ঘক্ষণ দুজনের মাঝে কোনো কথা হলো না। শুধু বাইরের মেঘের গর্জন আর তাদের দুজনের মিলেমিশে এক হওয়া ভারী শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। হঠাৎ আর্যা একটু নড়েচড়ে আরভিদের বুকে আরও গভীরভাবে মুখ লুকাল। তার গলাটা একটু ধরে এলো।
“আরভিদ…” আর্যার কণ্ঠস্বর একদম ফিসফিসে।
“হুম?” আরভিদ খুব আদরে আর্যার কপালে নিজের উষ্ণ ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
“আমাদের মাঝের এই এতদিনের দূরত্ব, এত ঝগড়া… আজ সব শেষ হয়ে গেল তো?” আর্যার গলায় একটা চাপা অভিমান, আর একই সাথে এক বুক স্বস্তি ঝরে পড়ল। “আমি আর ওই রোজকার মান-অভিমানের লড়াইটা পারছিলাম না। মনে হতো একই ছাদের নিচে থেকেও আমরা যোজন যোজন দূরে।”
আরভিদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে আর্যাকে নিজের বাহুডোরে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল, “আমিও পারছিলাম না আর্যা। যা হওয়ার তা তো হয়েছেই। ভাগ্যে ছিল এসব। নিজেদের ইগো আর জেদের কারণে এতটা দূরে ছিলাম আমরা। একে অপরকে কষ্ট দিয়ে নিজেরাও যে ভেতরে ভেতরে কতটা পুড়ছিলাম, তা আজ বুঝতে পারছি।”
আর্যা আস্তে করে মুখ তুলে আরভিদের চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে জল টলমল করছে, কিন্তু ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছে ভুবনভোলানো হাসি। সে নিজের ডান হাতটা আরভিদের গালে রেখে খুব আদুরে গলায় বলল, “এবার আমাদের সব অভিমান, সব ঝগড়া ভুলে ভালো করে বৈবাহিক জীবনটা শুরু করতে হবে। প্রমিস করো, আর কখনো ছোট ছোট কথায় আমাকে ওই অন্ধকারে একা ফেলে রাখবে না।”
আরভিদ আর্যার চোখের ওই টলমলে জলের ওপর আলতো করে চুমু খেল। তারপর তার ঠোঁটের খুব কাছে এসে, এক পৃথিবীর নির্ভরতা নিয়ে গভীর গলায় বলল, “প্রমিস। মীর আরভিদ আজ থেকে শুধুই তোমার। কাল সকাল থেকে আমাদের এই নতুন জীবনের খাতায় আর কোনো জেদ, রাগ বা দূরত্বের জায়গা থাকবে না। আজ রাতের এই কালবৈশাখী আমাদের পুরোনো সব অভিমান ধুয়ে নিয়ে যাক।”
কথাটা বলেই আরভিদ পুনরায় আর্যার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। বাইরের তীব্র ঝড় আর বৃষ্টির শব্দের মাঝে তাদের দুজনের নতুন করে শুরু হওয়া এই ভালোবাসার কাব্যের কাছে পৃথিবীর বাকি সবকিছু যেন এক নিমেষে তুচ্ছ হয়ে গেল।
–
বাড়ির পূর্ব দিকের টানা বারান্দাটায় তখন আবছা অন্ধকার। কালবৈশাখীর ঝড়ের দাপট কিছুটা কমে এলেও, বাতাসের সাঁই সাঁই শব্দ আর ঝিরঝিরে বৃষ্টির ছাঁট তখনো পরিবেশটাকে বেশ ভারী করে রেখেছে। এই শান্ত, শীতল প্রহরে যখন পুরো মীর বাড়ি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন মীর আরবিন প্রাণের দু’চোখে এক ফোঁটাও ঘুম নেই। পরনে একটা গাঢ় নেভি ব্লু টি-শার্ট আর ট্রাউজার্স। বারান্দার গ্রিলে হেলান দিয়ে সে একটা জ্বলন্ত সিগারেট আঙুলের ফাঁকে ধরে বাইরের ঘুটঘুটে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে।
মেজো খালার মেয়ের বিয়ে। আরযান ভাইয়ের কড়া নির্দেশ ছিল মীর বাড়ির কোনো ছেলে এই বিয়েতে অনুপস্থিত থাকতে পারবে না। আরযান ভাইয়ের কথার অবাধ্য হওয়ার মতো সাহস মীর বংশের কারোর নেই, প্রাণেরও না। তাই বাধ্য হয়েই ঢাকার লাইট-ক্যামেরার রঙিন দুনিয়া ছেড়ে তাকে এই পিলুগ্রামের শান্ত, বোরিং পরিবেশে এসে আটকা পড়তে হয়েছে। কিন্তু শরীরটা পিলুগ্রামে থাকলেও, প্রাণের মনটা পড়ে আছে সেই চিরচেনা শুটিং স্পটে। তার ক্রু মেম্বারদের চেঁচামেচি, মনিটরের পেছনের সেই জাদুকরী পৃথিবী, আর… আর একটা নির্দিষ্ট মানুষের মুখের মায়ায়। ওই প্রত্যাশা নামটা মনে পড়তেই প্রাণের ঠোঁটের কোণে একটা স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠল। সে পকেট থেকে আইফোনটা বের করে গ্যালারি ওপেন করল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটা ক্যান্ডিড ছবি। মনিটরের দিকে তাকিয়ে শট বুঝিয়ে দিচ্ছে প্রাণ, আর তার ঠিক পাশেই ঘাড় বাঁকিয়ে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে সেটা শুনছে প্রত্যাশা। পরনে সাধারণ একটা সুতির শাড়ি, চোখে কাজল, আর কপালে ছোট্ট একটা টিপ।
প্রত্যাশা শুধু প্রাণের আপকামিং ড্রামা সিনেমার লিড অ্যাকট্রেস নয়। কবে, কখন, কোন ফাঁকে যে মেয়েটা প্রাণের নিজের জীবনের স্ক্রিপ্টের একমাত্র নায়িকা হয়ে বসেছে, তা এই তুখোড় পরিচালক নিজেও টের পায়নি। দুনিয়ার তাবড় তাবড় অভিনেতা-অভিনেত্রীর চোখের ইমোশন যে মানুষটা ক্যামেরার লেন্সে নিখুঁতভাবে বন্দী করতে পারে, সেই মীর আরবিন প্রাণ প্রত্যাশার চোখের দিকে তাকালে নিজের ফোকাস হারিয়ে ফেলে। মেয়েটার হাসির মধ্যে এমন একটা জাদু আছে, যা প্রাণের সব সিনেমাটিক থিওরিকে ভুল প্রমাণ করে দেয়।
সিগারেটে শেষ টান দিয়ে সেটা বারান্দার বাইরে ছুড়ে ফেলল প্রাণ। বৃষ্টির ঠান্ডা হাওয়া তার চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে। ফোনটার দিকে তাকিয়ে সে বিড়বিড় করে উঠল, “কী করছ মেয়ে? এই কালবৈশাখীর রাতে নিশ্চয়ই বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছ, আর নয়তো ভয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে গুটিসুটি মেরে আছ।”
শুটিং ফ্লোরে মেয়েটার সাথে সারাদিন কত বাহানায় কথা হয়। কখনো ডায়ালগ বোঝানোর ছলে, কখনো লাইটিং চেক করার নাম করে প্রাণ শুধু ওর কাছাকাছি থাকার সুযোগ খোঁজে। কিন্তু এখানে, এই পিলুগ্রামে আসার পর থেকে একটা কলও করা হয়নি। ইগো নয়, বরং একটা অদ্ভুত ভয় প্রাণকে আটকে রেখেছে। যদি প্রত্যাশা বুঝে ফেলে? যদি সে বুঝে যায় যে তার ডিরেক্টর সাহেব শুধু তাকে ক্যামেরার লেন্সেই নয়, নিজের হৃদয়ের সবচেয়ে দামি ফ্রেমেও বন্দী করে ফেলেছে?
প্রাণ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে আরযান ভাইয়ের মতো ডমিনেটিং নয়, আবার আব্রাজের মতো পলিটিক্যাল মাইন্ডেরও নয়। সে একজন আর্টিস্ট। আর একজন আর্টিস্টের কাছে না বলা প্রেমটা বড়ই যন্ত্রণার। সে স্ক্রিন আনলক করে প্রত্যাশার চ্যাটবক্সটা ওপেন করল। কিবোর্ডে আঙুল ছুঁইয়ে টাইপ করল,
“বৃষ্টি দেখছ?” কিন্তু মেসেজটা সেন্ড বাটনে চাপ দেওয়ার আগেই তার হাত আটকে গেল। রাত বাজে আড়াইটা। এই অসময়ে নিজের নায়িকাকে মেসেজ করাটা কতটা প্রফেশনাল হবে? সে ব্যাকস্পেস চেপে পুরো মেসেজটা মুছে ফেলল। ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে আবার অন্ধকারের দিকে তাকাল।
“আর দুটো দিন প্রত্যাশা। এই বিয়ের পাট চুকিয়েই আমি ফিরছি। ক্যামেরার সামনে তোমার ডিরেক্টর হয়ে নয়, ক্যামেরার পেছনের সাধারণ প্রাণ হয়ে এবার আমার জীবনের আসল গল্পটা তোমাকে বলব। খুব দ্রুতই বলব।”
বাতাসে বৃষ্টির ছাঁট যেন প্রাণের এই নীরব প্রতিশ্রুতিটাকে আরও একটু জোরালো করে দিল। মন খারাপের মধ্যেও প্রত্যাশার মুখটা মনে পড়তেই মীর বাড়ির বোহেমিয়ান পরিচালকের বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত ভালোবাসার ওমে ভরে উঠল।
–
জমিদার বাড়ির একেবারে পশ্চিম কোণের ছিমছাম ঘরটায় তখন কেবল একটা মৃদু হলদেটে রিডিং ল্যাম্প জ্বলছে। বাইরে কালবৈশাখীর দাপট কিছুটা স্তিমিত হয়ে এলেও, একটানা ঝুম বৃষ্টি পড়ে চলেছে। সেই বৃষ্টির একটানা শব্দের সাথে পাল্লা দিয়ে জানালার কাঁচ চুইয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। ঘরের ভেতর পিনপতন নীরবতা। ল্যাম্পের নিভু নিভু আলোয় বিছানায় হেলান দিয়ে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে একটা মোটা ইংরেজি থ্রিলার উপন্যাস পড়ছিল মীর পরিবারের ২য় কাঠখোট্টা এবং রসহীন মানুষটা…..
পেশায় তুখোড় কমার্শিয়াল পাইলট তাজের জীবনের রুটিন একদম ঘড়ির কাঁটার মতো মাপা। আকাশে হাজার ফুটের ওপর দিয়ে বিশাল উড়োজাহাজ যেমন সে শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করে, তেমনি নিজের জীবনটাকেও সে চরম শৃঙ্খলায় বেঁধে রেখেছে। তার চোখেমুখে সবসময় একটা রুক্ষ, বদরাগী আর ‘ডোন্ট কেয়ার’ ভাব লেগে থাকে। রোমান্স বা ইমোশন শব্দগুলো তাজের ডিকশনারিতে নেই বললেই চলে। আরযানের ফটোকপি বলা চলে…. হঠাৎ বিছানার পাশে রাখা তাজের আইফোনটা একটানা ভাইব্রেট করে বেজে উঠল। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে একটা নাম….‘সিয়া পাশেই লিখা কেবিন ক্রু।
তাজ একবার আড়চোখে স্ক্রিনটার দিকে তাকাল। তার ভ্রু দুটো সাথে সাথে কুঁচকে গেল। রাত তখন প্রায় তিনটে। এই অসময়ে সিয়ার কল করার কোনো মানেই হয় না। কোনো ইমার্জেন্সি থাকলে এভিয়েশন ডিপার্টমেন্ট থেকে কল আসত। তাজ বিরক্তি নিয়ে চোখ ফিরিয়ে আবার উপন্যাসের পাতায় মন দিল। ফোনটা বেজে বেজে একসময় কেটে গেল। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর আবারও স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। এবারও সেই সিয়া। তাজ এবারও ধরল না। কিন্তু যখন তৃতীয়বার কলটা এলো, তাজের বিরক্তির পারদ একেবারে চরমে পৌঁছাল। সে সশব্দে বইটা বন্ধ করে সাইড টেবিলে রাখল। তারপর এক ঝটকায় ফোনটা রিসিভ করে কানে ঠেকিয়ে অত্যন্ত কড়া আর গম্ভীর গলায় বলল,
“কী ব্যাপার সিয়া? রাত তিনটের সময় আমাকে একের পর এক কল করছ কেন? টার্বুলেন্সে প্লেন ক্র্যাশ করেছে, নাকি বোয়িংয়ের ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেছে? এক্সাক্টলি কোন ইমার্জেন্সির জন্য তুমি আমাকে এই মাঝরাতে কল করার সাহস পেলে?”
ওপাশ থেকে কয়েক সেকেন্ড কোনো কথাই শোনা গেল না। শুধু একটা ঢোক গেলার শব্দ আর চাপা নার্ভাসনেস টের পাওয়া গেল। তারপর সিয়ার কাঁপা কাঁপা, মিষ্টি গলাটা ভেসে এলো, “স্য… স্যরি স্যার। আ… আসলে কোনো ইমার্জেন্সি নেই। আমি শুধু…”
“ইমার্জেন্সি নেই?” তাজ এবার রীতিমতো ফেটে পড়ল। তার কণ্ঠস্বর আগের চেয়েও এক ধাপ চড়ে গেল। “ইমার্জেন্সি ছাড়া তুমি তোমার সিনিয়র ক্যাপ্টেনকে রাত তিনটে বাজে কল করেছ? সিয়া, তুমি কি তোমার বেসিক ম্যানার্সগুলো আকাশে উড়ে যাওয়ার সময় প্লেন থেকে ফেলে দিয়ে আসো? নাকি তোমার ডিউটি রোস্টার ইদানীং খুব হালকা হয়ে গেছে?”
“না স্যার! প্লিজ রাগ করবেন না!” সিয়া ওপাশ থেকে প্রায় কেঁদে দেওয়ার মতো গলায় দ্রুত বলতে শুরু করল। “আসলে… আপনি চাকরিতে জয়েন করার পর থেকে আজ পর্যন্ত কখনো আপনাকে ছুটি কাটাতে দেখিনি তো। টানা চার বছর শুধু ডিউটি আর ডিউটি। এই প্রথম আপনি লম্বা ছুটিতে কোনো গ্রামের বাড়িতে গেলেন। তাই… তাই ভাবছিলাম, আপনি কি ঠিক আছেন? মানে, আপনার তো আবার গ্রামের ওই পরিবেশ, মশা, কোলাহল একদম সহ্য হয় না। আপনার শরীর ঠিক আছে তো স্যার?”
সিয়ার এই অদ্ভুত, বোকাটে আর অযৌক্তিক কথা শুনে তাজের কপালের ভাঁজ আরও গভীর হলো। সে যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। এই মেয়েটা তাকে মাঝরাতে এটা জিজ্ঞেস করছে যে সে ঠিক আছে কি না?
তাজ একটা বড় করে শ্বাস নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “লিসেন টু মি ভেরি কেয়ারফুলি, সিয়া। আমি গ্রামে ছুটি কাটাতে এসেছি, কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে আসিনি যে আমার খোঁজ নেওয়ার জন্য তোমাকে মাঝরাতে রেড অ্যালার্ট জারি করতে হবে। আর আমার শরীর বা আমার পরিবেশ শুট করছে কি না, সেই মেডিকেল রিপোর্ট তোমাকে দেওয়ার জন্য আমি বসে নেই। নেক্সট টাইম যদি ডিউটি আওয়ার্সের বাইরে বা প্রপার রিজন ছাড়া আমার ফোনে তোমার কল আসে, আই উইল পার্সোনালি মেক শিওর যে তুমি গ্রাউন্ডেড হয়ে বসে আছো। আন্ডারস্টুড?”
“ই… ইয়েস স্যার। এক্সট্রিমলি স্যরি স্যার। গুড নাইট।” সিয়া ওপাশ থেকে তড়িঘড়ি করে লাইনটা কেটে দিল।
তাজ ফোনটা ছুড়ে বিছানায় ফেলে দিল। “স্টুপিড মেয়ে একটা! যত সব ননসেন্স!” বিরক্তিতে বিড়বিড় করতে করতে সে আবার বইটা হাতে তুলে নিল।
কিন্তু উপন্যাসের পাতায় চোখ রাখলেও, আগের সেই মনোযোগটা আর সে ফিরে পেল না। বারবার তার কানের কাছে সিয়ার ওই নার্ভাস, কাঁপা কাঁপা গলাটা বাজতে লাগল, “এই প্রথম আপনি লম্বা ছুটিতে গেলেন তো… তাই ভাবছিলাম আপনি কি ঠিক আছেন?”*
তাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চশমাটা খুলে চোখ দুটো একটু ডলল। মেয়েটা বোকা হলেও, কথাটা তো মিথ্যা বলেনি। সত্যি তো, মীর তাজের এই যন্ত্রের মতো জীবনে কেউ কখনো এভাবে তার খোঁজ নেওয়ার সাহস করেনি। তাজের বুকের ভেতর, ওই কঠিন বরফের স্তরের নিচে খুব সূক্ষ্ম, এক চিলতে উষ্ণতা যেন আলতো করে ছুঁয়ে গেল। কিন্তু মীর তাজ সেটা কিছুতেই প্রশ্রয় দেবে না। সে আবার জোর করে চোখ রাখল উপন্যাসের পাতায়।
বাইরে তখন বৃষ্টির বেগ আবার বাড়তে শুরু করেছে।
–
কালবৈশাখীর দাপট থিতিয়ে এলেও আকাশের বুক চিরে এখনো ঝিরঝিরে বৃষ্টি নামছে। করিডোরের সব আলো নিভে গেছে, শুধু আরযানের ঘরের সেই বিশাল কাঠের দরজার নিচ দিয়ে এক চিলতে ম্লান হলুদ আলো বাইরের অন্ধকার মেঝেতে আছড়ে পড়ছে।
বিছানায় সাদা চাদরের ভাঁজে মিশে আছে এক বিষাদময় মানবী সাঁঝ। মেয়েটার ফর্সা মুখটা জ্বরে আর কান্নায় টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। তার চোখের কোণে এখনো শুকিয়ে যাওয়া জলের দাগ। আদীবের চলে যাওয়া আর আরযানের সেই পৈশাচিক অধিকারবোধের লড়াইয়ে সে আজ পুরোপুরি নিঃস্ব। পেটে এক দানা খাবার পড়েনি, শরীরটা যেন উত্তপ্ত অগ্নিকুণ্ড। জ্বরের ঘোরে সে বারবার অসংলগ্ন কিছু বিড়বিড় করছে আর থেকে থেকে শিউরে উঠছে।
বিছানার পাশে রাখা রাজকীয় মখমলের চেয়ারটায় নিঃশব্দে বসে আছে মীর আরযান শান।
ঘরের বাতি নেভানো। শুধু টেবিল ল্যাম্পের আবছা আলো আরযানের চোয়াল আর চোখের ধারালো কোণগুলোকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। সে তার শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে অত্যন্ত নিপুণ হাতে একটা রূপালী বাটিতে রাখা বরফ-ঠান্ডা জলে সাদা রুমাল ভেজাচ্ছে। আরযানের চোখে এখন সেই ভয়ংকর শিকারি ভাবটা নেই, বরং সেখানে জমাট বেঁধে আছে এক পাহাড়সম উদ্বেগ, যা সে পৃথিবীর কারোর সামনে প্রকাশ করতে জানে না। সে খুব সাবধানে ভেজা রুমালটা নিংড়ে সাঁঝের তপ্ত কপালে রাখল। বরফ-ঠান্ডা স্পর্শে সাঁঝের শরীরটা একবার কেঁপে উঠল, একটা অস্ফুট আর্তনাদ বেরিয়ে এলো তার ঠোঁট চিরে। আরযান মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে তার বড়, শক্ত আঙুলগুলো দিয়ে সাঁঝের কপালে লেপ্টে থাকা ঘর্মাক্ত চুলগুলো সরিয়ে দিল।
“এত জেদ কেন তোর সাঁঝ? কেন বারবার আমাকে বাধ্য করিস নিজের ওপর রাগ বাড়াতে? তুই আমার অবাধ্য হতে চাস, আর আমি তো নিজের করে পাওয়ার জন্য পুরো পৃথিবীকে পুড়িয়ে দিতে পারি। তুই ভেঙে যাচ্ছিস, আর তোর এই ভেঙে যাওয়াটা আমাকে কতটা পোড়াচ্ছে, সেটা যদি একবার দেখতে পেতি!”
আরযান বিড়বিড় করে কথাগুলো বলল, যার কোনো শ্রোতা নেই। সে পাশেই রাখা অস্পর্শিত খাবারের ট্রে-টার দিকে একবার তাকাল। সাঁঝের জন্য নিজের হাতে পছন্দের খাবার নিয়ে এসেছিল সে, কিন্তু সাঁঝ অভিমানে সেটা ফিরিয়ে দিয়েছে। আরযানের রাগী সত্ত্বা চেয়েছিল মেয়েটাকে জোর করে খাওয়াতে, কিন্তু এই জ্বরের কাছে আজ মীর আরযানের সেই দাপুটে অহংকার যেন হাঁটু গেড়ে বসেছে। সে সারারাত এক মুহূর্তের জন্যও চোখের পাতা এক করল না। বারবার রুমাল ভেজানো, সাঁঝের কপাল মোছানো আর তার গায়ের চাদরটা ঠিক করে দেওয়া সবই সে করছে এমন এক নিপুণতায়, যা কোনো দক্ষ সেবিকার চেয়ে কম নয়। আরযানের হাতের ওই শক্ত স্পর্শে এক অদ্ভুত জাদুর মতো শান্তি ছিল। সাঁঝের জ্বলন্ত শরীরটা ধীরে ধীরে শীতল হতে শুরু করল। ঘুমের ঘোরেই সাঁঝ আরযানের হাতের তালুটা খপ করে চেপে ধরল, যেন কোনো এক ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন থেকে বাঁচার জন্য সে শেষ আশ্রয় খুঁজছে। আরযান হাত সরিয়ে নিল না। বরং সে তার অন্য হাতটা দিয়ে সাঁঝের পিঠে আর মাথায় অত্যন্ত ধীরলয়ে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। যে আরযান মানুষকে শাসন করতে জানে, আজ সে এক অবুঝ পাখিকে শান্ত করার জন্য নিজের ভেতরকার সবটুকু কোমলতা নিংড়ে দিচ্ছে।
রাত যখন প্রায় শেষের দিকে, আকাশের কালো মেঘ সরে গিয়ে আবছা ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে, তখন সাঁঝের তন্দ্রাটা পাতলা হয়ে এলো। তার গলাটা তৃষ্ণায় ফেটে যাচ্ছে। সে অস্ফুট স্বরে বলল, “জল… একটু জল…”
আরযান বিদ্যুৎগতিতে বিছানার পাশে রাখা কাঁচের গ্লাসে জল ঢালল। সে জানত, সাঁঝ তাকে এই অবস্থায় দেখলে আবার সিঁটিয়ে যাবে, আবার সেই ঘৃণার দেয়াল তুলবে। তাই সে খুব সন্তর্পণে সাঁঝের মাথাটা নিজের এক হাতের ওপর তুলে ধরল এবং গ্লাসটা তার ঠোঁটের কাছে ধরল। সাঁঝ চোখ না মেলেই তৃষ্ণার্তের মতো জলটুকু খেয়ে নিল। জল খাওয়ার পর সাঁঝের জ্ঞানটা একটু পরিষ্কার হলো। সে অনুভব করল তার মাথায় কেউ হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তার কপালে রাখা সেই শীতল রুমালের ঘ্রাণটা অবিকল আরযানের শরীরের মতো। সে কি স্বপ্ন দেখছে? নাকি আরযান ভাইয়া সত্যিই এখানে?
সাঁঝ খুব কষ্টে চোখের পাতা মেলল। কিন্তু ততক্ষণে আরযান নিজেকে আড়ালে নিয়ে গেছে। সে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, পিঠ ঘুরিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে। সাঁঝ বালিশ থেকে মাথা তুলে দেখল কপালে একটা ভেজা রুমাল। ঘরটা নিস্তব্ধ। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার প্রতিফলনে সে দেখল ঘরের দরজার কাছে একটা ছায়া দ্রুত সরে যাচ্ছে।
সাঁঝ অস্ফুট স্বরে ডাকল, “কে? কে এখানে?”
কোনো উত্তর নেই। শুধু করিডোর দিয়ে কারোর চলে যাওয়ার ভারী বুট জুতোর শব্দ পাওয়া গেল। সাঁঝের মনে হলো কেউ যেন তার কপালে এক দীর্ঘ সময়ের প্রশান্তি এঁকে দিয়ে গেছে। রুমালটা হাতে নিতেই সেই চড়া ওউড আর তামাকের গন্ধটা তার ইন্দ্রিয় অবশ করে দিল। সে বুঝতে পারল, এটা স্বপ্ন ছিল না। মীর আরযান শান সারারাত তার শিয়রে বসে ছিল। সাঁঝের দু’চোখ আবার জলে ভরে উঠল। ঘৃণা আর কৃতজ্ঞতার এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে সে বিছানায় এলিয়ে পড়ল। বাইরের বৃষ্টি তখন থেমে গেছে, কিন্তু মীর আরযানের সেই ‘নিষিদ্ধ টান’ আর ‘গোপন যত্ন’ সাঁঝের জীবনের সব হিসেব নিকেশ ওলটপালট করে দিল।
চলবে?
(একেবারে মীর বাড়ির সাত ছেলে আর এক মেয়ে সবাই এক পর্বেই উপস্থিত…. প্রায় আজকের পর্বের শব্দসংখ্যা ৫০০০… চাইলে ২ দিনেই দিতে পারতাম….কিন্তু একবারেই দিয়ে দিলাম….)
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমতৃষা সারপ্রাইজ পর্ব
-
পরগাছা পর্ব ৮
-
প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ৪
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৬(১ম অর্ধেক)
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ২৭
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৩
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪১
-
কমান্ডার তনয় জেইদি গল্পের লিংক
-
প্রেমতৃষা পর্ব ১৭+১৮