#যেখানে_প্রেম_নিষিদ্ধ
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#পর্ব-২৩
নির্বাচন কেন্দ্রের মূল হলরুমের ভেতরের তপ্ত হাওয়া আর বাইরের ঝুম বৃষ্টির শব্দ মিলে এক মহাপ্রলয়ের আবহ তৈরি করেছে। মীর আব্রাজ রোদ, যে কি না সকাল থেকে এসি রুমের ভেতরেও বরফ গলানো ঠান্ডা আইসক্রিম খেয়ে ঘামছিল, রিটার্নিং অফিসারের সেই জাদুকরী ঘোষণার পর তার পুরো শরীরজুড়ে এক তীব্র রাজকীয় উত্তাপ ফিরে এলো। মাত্র সাত ভোটের ব্যবধান! এই সাতটি ভোট যেন আব্রাজকে মাটি থেকে তুলে এক ঝটকায় মীর বংশের চিরচেনা সিংহাসনে বসিয়ে দিল। হলরুমের কাচের দরজাটা গলিয়ে যখন বাইরের কর্মী-সমর্থকদের “মীর আব্রাজ জিন্দাবাদ!”, “সিংহ পুরুষ আব্রাজ ভাই!” স্লোগান ভেতরে আসছিল, তখন ভেতরের দৃশ্যটা ছিল দেখার মতো। আব্রাজ তার প্লাস্টিকের চেয়ারটা ছেড়ে যখন সোজা হয়ে দাঁড়াল, তখন তার চওড়া বুক আর তীক্ষ্ণ চাউনিতে সেই সকালের অসহায়ত্বের লেশমাত্র ছিল না। তার এসিস্ট্যান্ট সামির এতক্ষণ ধরে ভয়ে চোখ বন্ধ করে সব পীর-আউলিয়ার দরগায় মানত করছিল, রেজাল্ট শোনা মাত্রই সে নিজের হাতের পানির বোতলটা শূন্যে ছুড়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠল, “ভাই! আমরা জিতে গেছি! আমরা ইতিহাস গড়ে ফেলেছি!”
আব্রাজ সামিরের দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি দিল, কিন্তু তার আসল চোখ ছিল হলরুমের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা নৈশির ওপর। নৈশি, রাজনীতির ময়দানে যাকে বাঘিনী বলা হয়, যে কি না অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় পুরো নির্বাচনটা নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল, সে এখন পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার ফর্সা মুখটা অপমানে আর তীব্র ক্ষোভে টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। মাত্র সাতটি ভোট তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নটাকে এভাবে চুরমার করে দেবে, এটা সে তার নিখুঁত পলিটিক্যাল ডায়েরির কোনো পাতায় লিখে রাখেনি। তার হাতের মুঠোয় থাকা কলমটা সে এত জোরে চেপে ধরেছে যে তার আঙুলের নখগুলো সাদা হয়ে গেছে।
কিন্তু নাটকের আসল ক্লাইম্যাক্স তখনো বাকি ছিল। হলরুমের প্রবেশদ্বার দিয়ে হঠাৎ করেই একটা বিকট শোরগোল শোনা গেল। ঢোল-তবলা আর ভুভুজেলা বাঁশির আওয়াজের সাথে সাথে “দুলাভাই জিন্দাবাদ! মীর আব্রাজ জিন্দাবাদ!” স্লোগান দিতে দিতে নাচতে নাচতে ভেতরে ঢুকলেন নৈশির নিজের বাবা আর তার ছোট ভাই রিফাত! তাদের দুজনের গলায় অন্তত চার-পাঁচটা বিশালাকার গাঁদা ফুলের মালা, আর রিফাতের কাঁধে একটা মস্ত বড় মিষ্টির হাঁড়ি।
নৈশি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার শরীরের প্রতিটা নিউরন যেন এক নিমেষে অবশ হয়ে গেল। যে বাবা আর ভাই গতকাল রাত পর্যন্ত মীর বাড়িকে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় নরক ভাবত, যারা স্বতন্ত্র আর জামায়াত-শিবিরের নেতাদের সাথে গোপন বৈঠকে বসে আব্রাজকে কীভাবে রাজনৈতিকভাবে জবাই করা যায় সেই ছক কষেছে তারা আজ নির্বাচনের রেজাল্ট বের হতে না হতেই, তেলের ওপর জল ঢেলে দিয়ে সবার আগে এই মীর বাড়ির অবাধ্য ছেলের পা চাটতে চলে এসেছে! রাজনীতি যে কতটা নোংরা, কতটা গিরগিটির মতো রঙ বদলাতে পারে, তা নিজের জন্মদাতা পিতা আর আপন ভাইকে দেখে নৈশি আজ নতুন করে হাড়েমজ্জায় টের পেল।
নৈশির বাবা সেকান্দার সরকার একেবারে গদগদ মুখে, দাঁত সব বের করে এগিয়ে গেলেন আব্রাজের দিকে। আব্রাজ তখন অত্যন্ত অহংকারী ভঙ্গিতে হাত দুটো বুকের ওপর বেঁধে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিল। সেকান্দার সাহেব আব্রাজের সামনে গিয়ে প্রায় ঝুঁকে পড়ে তার গলায় একটা বিশাল গাঁদা ফুলের মালা পরিয়ে দিলেন। তারপর আব্রাজকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “আরে বাবা আব্রাজ! আমি তো জানতাম, এই আসনে তুমি ছাড়া আর কোনো যোগ্য ছেলেই নেই! মীর বংশের রক্ত বলে কথা! মাঝখান থেকে ওই স্বতন্ত্র আর জামায়াতের লোকগুলো আমার কান ভার করেছিল, আমার এই অবুঝ মেয়েটাকেও ফুসলিয়ে তোমার বিপক্ষে দাঁড় করিয়েছিল। এখন থেকে তুমিই ওর সব, তুমিই ওর অভিভাবক!”
রিফাত তো আরও এক কাঠি ওপরে। সে পকেট থেকে আইফোন বের করে আব্রাজের সাথে সেঁটে গিয়ে সেলফি তুলতে তুলতে বলল, “দুলাভাই, ইউ জাস্ট রকড! আমি জানতাম আপু আপনার সামনে টিকবে না। এবার কিন্তু আমাদের ক্লাবের জন্য ওই বড় মাঠটার পারমিশন চাই-ই চাই!” এই পুরো দৃশ্যটা যখন নৈশির চোখের সামনে ঘটছিল, তখন তার মনে হচ্ছিল তার নিজের কলিজাটা কেউ টেনে ছিঁড়ে ফেলছে। নিজের পরাজয়ের দগদগে ক্ষতের ওপর আপন মানুষের এই চরম বিশ্বাসঘাতকতা সে সহ্য করতে পারছিল না। রাগে, অপমানে তার চোখ দিয়ে দু ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়তে চাইল, কিন্তু সে তীব্র অভিমানে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে তা আটকে দিল। সে বড় বড় চোখে তার বাবার দিকে তাকিয়ে রইল, কিন্তু সেকান্দার সাহেবের সেদিকে খেয়ালই নেই; তিনি তখন জামাইয়ের মন জয়ে ব্যস্ত।
আব্রাজ মালা পরা অবস্থায় আড়চোখে নৈশির এই জ্বলন্ত রূপটা দেখছিল। তার ভেতরের পৈশাচিক আনন্দটা যেন মুহূর্তে দ্বিগুণ-তিনগুণ হয়ে গেল। আরযান ভাইয়া তার অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে তাকে যে কষ্টটা দিয়েছিল, সেই সব কষ্ট যেন এই এক দৃশ্যে উধাও হয়ে গেল। সে শ্বশুরের কাঁধে হাত রেখে অত্যন্ত বিনয়ের নাটক করে বলল, “আরে বাবা, আপনি এসব কী বলছেন? নৈশি তো এখন আমার বিবাহিত স্ত্রী, আমার অর্ধাঙ্গিনী। রাজনীতিতে হার-জিত থাকবেই, কিন্তু ঘরের ভেতরের সম্পর্ক তো আর বদলে যায় না। ও একটু অবুঝ, তাই হয়তো স্বামীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিল। আপনি একদম চিন্তা করবেন না বাবা, আজ রাত থেকেই ওর সব অবুঝপনা আর জেদ কীভাবে দূর করতে হয়, সেই দায়িত্ব আমি নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছি।”
আব্রাজ ‘আজ রাত’ শব্দটার ওপর এমন এক হিংস্র আর গভীর টান দিল যে নৈশির শিরদাঁড়া দিয়ে একটা বরফশীতল স্রোত বয়ে গেল। রিফাত তখন মিষ্টির হাঁড়ি থেকে একটা মস্ত বড় রাজভোগ বের করে আব্রাজের দিকে এগিয়ে দিল। আব্রাজ মিষ্টিটা হাতে নিয়ে মাথা নাড়িয়ে বলল, “না না, বিজয় তো আমার একা না। এই মিষ্টির প্রথম হকদার আমার পরাজিতা প্রতিদ্বন্দ্বী, মানে আমার প্রিয়তমা স্ত্রী।”
আব্রাজ মিষ্টিটা হাতে নিয়ে অত্যন্ত ধীর পায়ে নৈশির দিকে এগোতে লাগল। তার পেছনে পেছনে নাচতে নাচতে আসছিল রিফাত আর তার বাবা। হলরুমের বাকি মানুষেরা তখন এই রোমাঞ্চকর পারিবারিক ড্রমা হাঁ করে দেখছে।
“কী গো এমপি সাহেবা?” আব্রাজ নৈশির একদম মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল। তাদের মাঝখানের দূরত্ব এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চি। আব্রাজের শরীর থেকে আসা দামি পারফিউমের গন্ধ আর গাঁদা ফুলের উগ্র গন্ধ নৈশির দম আটকে দিচ্ছিল। আব্রাজ মিষ্টিটা নৈশির ঠোঁটের কাছে ধরে অত্যন্ত ঠান্ডা কিন্তু কড়া গলায় বলল, “জনগণের সেবা তো অনেক করার চেষ্টা করলে, এবার নিজের বরের হাতের বিজয়ের মিষ্টিটা খেয়ে দেখো তো দেখি?”
নৈশি মুখ শক্ত করে অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিতেই সেকান্দার সাহেব পেছন থেকে কড়া গলায় ধমক দিয়ে উঠলেন, “নৈশি! বড় অসম্মান করছিস কিন্তু! দেশের এত বড় একজন নেতা, তোর স্বামী, নিজ হাতে মিষ্টি খাওয়াচ্ছে আর তুই মুখ ঘুরিয়ে আছিস? হা কর বলছি!”
“আপু, নো পলিটিক্স প্লিজ! জাস্ট হা করো!” রিফাত পাশ থেকে চিল্লিয়ে উঠল।
নৈশি বুঝতে পারল, এই মুহূর্তে এখানে প্রতিবাদ করতে গেলে তার নিজের বাবা আর ভাই তাকে আরও বড় তামাশার পাত্রী বানাবে। সে তীব্র ঘৃণায় আর ক্ষোভে আব্রাজের চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের মুখটা সামান্য হা করল। আব্রাজ সুযোগটা হাতছাড়া করল না। সে বেশ জোরেই মিষ্টিটা নৈশির মুখের ভেতর গুঁজে দিল। মিষ্টির রস নৈশির ঠোঁটের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়তে চাইল, আব্রাজ নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে অত্যন্ত ধীরগতিতে সেই রসটুকু মুছে দিয়ে নৈশির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “ভোটের লড়াই তো শেষ হলো পলিটিশিয়ান বউ। এবার মীর আব্রাজের পার্সোনাল বাসর ঘরের যুদ্ধ শুরু হবে। তৈরি থেকো। বিয়ে যেহেতু হয়েছেই আমার তো একটা দায়িত্ববোধ আছে বলো? বউকে উজার করে যদি প্রথমে সোহাগই না করতে পারি, দেশের জনগনকে আর কি করব?”
নৈশি রাগে মিষ্টিটা চিবোতে চিবোতে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল এই অপমানের শোধ সে মীর বাড়ির ওই চার দেয়ালের ভেতরেই তুলবে। সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। নিজের দামী সুতির শাড়ির কুঁচিটা একহাতে শক্ত করে চেপে ধরে সে হনহন করে করিডোর দিয়ে বাইরের দিকে রওনা দিল। পেছন থেকে আব্রাজ তার এসিস্ট্যান্ট সামিরকে ডেকে উচ্চস্বরে বলল, “সামির! জলদি গাড়ি রেডি করো। আমাদের নতুন পরাস্ত প্রার্থীর জন্য কোনো সরকারি গাড়ির দরকার নেই, উনি আজ মীর বাড়ির ক্ষমতাশালী গাড়িতেই আমার সাথে ফিরবেন!”
–
মীর আবরিজ রাজের সাইকিয়াট্রিক চেম্বারের ভেতরের পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এসি-র হিমশীতল বাতাসের মধ্যেও রাজের কপালে তখনো হালকা ঘামের রেখা। তার টেবিলের ওপর রাখা নীল রঙের ডায়েরিটার পাতাগুলো ঝোড়ো বাতাসে উড়ছিল।
কাজী সাহেব তখনো চেম্বারের কোণায় বসে তার রেজিস্ট্রি খাতা গোছাচ্ছিলেন। রাজের নিখুঁত এবং অবিশ্বাস্য ‘রোড-ব্লক থেরাপি’র জাল এতক্ষণে পুরোপুরি সফল হয়েছে। অবনী তার ডেস্কে বসে কাবিননামার কাগজে নিজের সইটা করে দেওয়ার পর থেকে কেমন যেন এক ঘোরলাগা চোখে রাজের দিকে তাকিয়ে আছে। সে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না যে তার চিকিৎসার শেষ ধাপটা এত বাস্তব ছিল। “ডাক্তার সাহেব…” অবনী ধীর গলায় বলল, তার কণ্ঠস্বর এখনো সামান্য কাঁপছে। “এই থেরাপিটা কি আসলেই কাজ করবে? আমার মনে হচ্ছিল… সবকিছু কেমন যেন সত্যি সত্যি ঘটে গেল। ওই কাজী সাহেব, এই কাগজের দেনমোহরের অঙ্ক সবকিছুই তো রিয়েল ছিল।”
রাজ তার চশমাটা নাকের ডগা থেকে ঠেলে ওপরে তুলল। তার মুখে একজন অত্যন্ত পেশাদার এবং গম্ভীর চিকিৎসকের অভিব্যক্তি, যদিও তার ভেতরের হৃৎপিণ্ডটা তখন মীর বংশের ছেলেদের মতো এক হিংস্র আনন্দে লাফাচ্ছিল। সে অত্যন্ত কোমল গলায় বলল, “অবনী, সাইকোলজিতে একটা টার্ম আছে ‘ইনটেনসিভ এক্সপোজার থেরাপি’। তোমার মনের ভেতরে যে বিয়ের প্রতি একটা তীব্র ভয় আর ট্রমা লুকিয়ে ছিল, তাকে পুরোপুরি উপড়ে ফেলার জন্যই এই আয়োজন। যতক্ষণ না তোমার মস্তিষ্ক এই পুরো প্রসেসটাকে আসল বলে ধরে নেবে, ততক্ষণ তোমার অবচেতন মনের সেই ক্ষতটা শুকাবে না। তুমি যে আজ কোনো প্যানিক অ্যাটাক ছাড়া, কোনো ভয় ছাড়া এই কাগজে সই করতে পেরেছ, এটাই প্রমাণ করে যে তুমি এখন মেন্টালি একশ ভাগ স্ট্রং।”
অবনীর বাবা পাশে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে রাজের দিকে তাকালেন। তার চোখে তখন জল। তিনি গদগদ কণ্ঠে বললেন, “বাবা রাজ, তুমি আমার মেয়ের জন্য যা করলে, তার ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না। একটা ভাঙা আর ট্রমাটাইজড মেয়েকে তুমি যেভাবে নতুন জীবন দিলে, তা ঈশ্বরের অলৌকিক ক্ষমতার মতো।”
রাজ টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সে অবনীর বাবার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলল, “আঙ্কেল, ওটা আমার দায়িত্ব ছিল। একজন ডাক্তার হিসেবে পেশেন্টের মেন্টাল হেলথ সুস্থ করাই আমার ধর্ম। আপনি অবনীকে নিয়ে এখন বাড়ি যান। আজ রাতটা ওকে একদম রিল্যাক্স থাকতে দিন। কোনো পুরনো কথা যেন ওর সামনে না আসে।”
অবনী ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে দরজার দিকে যাওয়ার আগে রাজের চোখের দিকে শেষবারের মতো তাকাল। রাজের সেই তীক্ষ্ণ, উজ্জ্বল চোখের গভীরে কী লুকিয়ে ছিল, তা অবনী ধরতে পারল না। তবে সে চলে যাওয়ার পর রাজ নিজের চেম্বারের দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিল।
সে ধীর পায়ে নিজের রিভলভিং চেয়ারটায় এসে বসল। টেবিলের ওপর রাখা কাবিননামার ডুপ্লিকেট কপিটা সে নিজের হাতে তুলে নিল। যেখানে অবনী ইসলামের নামের পাশে জ্বলজ্বল করছে তার নিজের সই, আর বরের নামের জায়গায় লেখা ‘মীর আবরিজ রাজ’। রাজ কাগজটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে এক পৈশাচিক কিন্তু মধুর হাসি হাসল। সে বিড়বিড় করে বলল, “রোগী তো সুস্থ হয়ে বাড়ি চলে গেল আঙ্কেল, কিন্তু আপনার মেয়ের এই ডাক্তার যে আজীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে গেল, তা তো আপনি টের পেলেন না! মীর বাড়ির ছেলেরা যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ, সেখানে এভাবেই রাজত্ব কায়েম করে।”
—
রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। মীর বাড়ির বিশাল লোহার গেটটা যখন আব্রাজের বিজয় মিছিলের গাড়ির হর্নে কেঁপে উঠল, তখন পুরো বাড়ির আলো ঝলমল করছিল। আব্রাজের মা সোফায় বসে ফোনের কন্টাক্ট লিস্টের সবাইকে একের পর এক কল দিয়ে যাচ্ছেন। তার খুশি যেন ধরে না।
“হ্যাঁ, মেঝ খালা? শুনছ তো? আমাদের আব্রাজ জিতে গেছে! মাত্র সাত ভোটে! উফ, কী যে এক টেনশন ছিল সারাটা দিন… হ্যাঁ, হ্যাঁ, নতুন বউও সাথে আছে। আরে ও তো মীর বাড়ির ছেলে, হারবে কেন?”
মায়ের এই এলাহী কাণ্ড দেখে সাঁঝ ড্রয়িংরুমের সিঁড়ির কোণায় দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে নাচানাচি করছে।। সে চিৎকার করে বলছে,, ” এবার কিন্তু মীর বাড়িতে তিন দিন ধরে বিরিয়ানি রান্না হতে হবে! আব্রাজ ভাই তো পুরাই কাঁপিয়ে দিল!”
কিন্তু সাঁঝের এই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হঠাৎ করেই তার নজর গেল দোতলার করিডোরের দিকে। আরভিদ সেখানে কালো শার্টের হাতা গুটিয়ে, ল্যাপটপ ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে অত্যন্ত শীতল চোখে সাঁঝের দিকে তাকিয়ে আছে। আরভিদের সেই চাউনি দেখেই সাঁঝের ভেতরের সব নাচানাচি এক সেকেন্ডে বন্ধ হয়ে গেল। তার বুকের ভেতরটা আবার ধড়াস করে উঠল। স্বাধীনের মুখটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। আজ সকালে যে চুমুর কাণ্ডটা সে ঘটিয়েছে, আরভিদ ভাই যদি আদেও সেটা আরযান ভাইকে বলে দেয়, তবে মীর বাড়িতে আজ নতুন করে একটা লাশ পড়বে।
আরভিদ সিঁড়ি দিয়ে ধীর পায়ে নেমে এসে সাঁঝের একদম পাশে এসে দাঁড়াল। ড্রয়িংরুমের হৈচৈয়ের মাঝে সে নিচু হয়ে সাঁঝের কানের কাছে বলল, “কী রে সাঁঝ? আব্রাজ ভাইয়ের জয়ে তো খুব নাচছিস। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো চিন্তা আছে? নাকি কাল সকালে আরযান ভাইয়ের বেল্টের বাড়ির শব্দ শুনলে নাচটা আরও ভালো জমবে?”
“ভাইয়া… প্লিজ!” সাঁঝের গলা দিয়ে প্রায় কান্নার সুর বেরিয়ে এলো। সে আরভিদের হাতটা চেপে ধরে বলল, “আমি আর কোনোদিন এমন ভুল করব না। তুমিপ্লিজ আরযান ভাইকে কিছু বলো না। আমি মরে যাব ভাইয়া!”
আরভিদ একটা কুৎসিত কিন্তু বিজয়ী হাসি হেসে বলল, “বলব না একটা শর্তে। তুই তো জানিস, আর্যার সাথে আমার এই ঘরের পরিবেশটা কেমন। বিয়োর পর থেকে ও আমার মাথায় নাচানাচি করে। আগামী এক মাস আমাদের ঘরে যে যুদ্ধই হোক না কেন, তার সব দোষ তোকে নিজের ঘাড়ে নিতে হবে। আর প্রতিদিন সকালে আর রাতে আমাদের ঘরের সব চা-নাস্তা তুই নিজ হাতে সার্ভ করবি। যদি একটা কাজেও ভুল হয়, তবে কিন্তু আরযান ভাইয়ের কানে স্বাধীনের নামটা পৌঁছে যাবে।”
সাঁঝ অসহায় চোখে মাথা নাড়ল। সে বুঝতে পারল, আব্রাজ ভাই তো বিশ টাকায় বউ কিনে আজ বিজয়ী রাজা হয়ে ঘরে ফিরল, আর সে একটা চুমুর অপরাধে নিজের পুরো জীবনটা এক মাসের জন্য আরভিদ ভাইয়ের কাছে বন্ধক দিয়ে দিল।
বাইরে তখন বৃষ্টির বেগ আরও বেড়েছে। মীর বাড়ির বিশাল গেটটা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে বাড়ির ভেতরে এক নতুন অন্ধকারের সূচনা হলো। আব্রাজ তখন নতুন বউ নৈশির হাত শক্ত করে ধরে দোতলার সোজা তার রুমে দিকে এগোচ্ছে। নৈশি তখনো তার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু আব্রাজের সেই লোহার মতো শক্ত মুঠো আজ আলগা হওয়ার নয়। আজকে তো বাসর সে করেই ছাড়বে। ২০ টাকা এখনো উশুল করা বাকি……
চলবে?
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১১
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৯
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১৭
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৪
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৮
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ২৯
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪+৫
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৩৫+৩৬
-
প্রেমতৃষা পর্ব ২৮
-
প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ১