Golpo romantic golpo মূল্য

মূল্য পর্ব ৩


#মূল্য | ০৩ |
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
[গল্পের শেষের কথাগুলো পড়ার অনুরোধ রইলো। ]
সেদিনের পর কেটে গিয়েছে আরো একটা মাস। একদিন অফিস থেকে এসে অরিত্র কলিংবেলে বাজায়। কিন্তু প্রায় দশ মিনিটের মতো হয়ে যাওয়ার পরও নীলা দরজা খুলে না। একে তো টানা নয় ঘন্টা অফিস করে, বসের ঝাড়ি খেয়ে, ঢাকা শহরের বিশ্রী জ্যাম ঠেলে সে এসেছে। তারউপর কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থাকার পরও বউ দরজা খুলছে না দেখে অরিত্রের মেজাজ চরম খারাপ হয়ে যায়।
আরও দুই মিনিট বেল বাজানোর পর নীলা এসে দরজা খুলে দেয়। দরজা খুলতেই অরিত্র দেখতে পায় এক এলোমেলো, রঙ লাগা, আধ ঘুম ভাঙা নারীকে।
নারীটির মুখে হাতে রঙ লেগে যা-তা হয়ে আছে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে রয়েছে কপালের দুই মাসে। গায়ের জামাটাতেও রঙ লেগেছে দুয়েক জায়গায়।
নীলার এমন এলোমেলো অবস্থা দেখে অরিত্রের মেজাজ আরো খিঁচে যায়। সে তিরিক্ষি মেজাজ নিয়ে ঝাড়ি দিতে দিতে বাসায় ঢুকতে ঢুকতে বলে–
—এতক্ষণ লাগে দরজা খুলতে? সেই কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি তোমার খেয়াল আছে? রিডিকিউলেস!
নীলা ক্লান্ত ও ঘুম ভাঙা গলায় বলে–
—কাজ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। টায়ার্ড ছিলাম বলে ঘুমটা গভীর হয়েছিল। তাই শুনতে পাই নি। সরি।
অরিত্র আরেকটু বকাঝকা করতে চায় নীলাকে। কিন্তু নীলার চোখমুখ বলে দিচ্ছে সে আসলেই ক্লান্ত। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। তার একটু মায়াই হয় মেয়েটির জন্য। তাই অরিত্র আর কিছু না বলেই শোয়ার ঘরে চলে যায়।
তবে শোয়ার ঘরের অবস্থা দেখে অরিত্রের পড়ে যাওয়া রাগ আবারও তড়তড়িয়ে মাথায় চড়ে বসে। রুমটার একটা বিশাল অংশ জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে কাপড়, রঙের ডিব্বা, ব্লকের জন্য নকশার কাঠগুলো।
এই ঘরটার অবস্থা আর দরজার সামনে থাকা নীলার অবস্থা একদমই সেম। ভীষণ এলোমেলো ও অগোছালো।
অরিত্র আবার একটু গোছালো ঘর পছন্দ করে। তাই সে নিজের রুমের এই বেগতিক অবস্থা দেখে রেগে উচ্চস্বরে বলে–
—এসব কি অবস্থা করেছো রুমের? এটা রুম নাকি গোয়ালঘর? সারা দিন খেটে আসার পর এই রুমের অবস্থা দেখা লাগবে আমার এখন?
নীলা মিনমিনে গলায় বলে–
—তুমি ফ্রেশ হয়ে আসো, আমি ততক্ষণে এগুলো গুছিয়ে নিচ্ছি। রাগ করো না প্লিজ। আমার পিরিয়ড হয়েছে তো, তাই কিচ্ছু করার বল পাচ্ছি না। অল্প কিছু করতেই ক্লান্তি জেঁকে বসছে।
—তোমাকে এসব করতে কে বলেছে? আমি বলেছি? বা আমার পরিবারের কেউ বলেছে? কি দিচ্ছি না তোমাকে আমি? টাকা, সুখ, দামী জামাকাপড়, একটা স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন। তাহলে কিসের জন্য তুমি এসব করছো?
নীলার বলতে ইচ্ছে করল,
—তোমার গুরুত্বের জন্য। তুমি এগুলো আমায় দিচ্ছ ঠিকই, কিন্তু তার সাথে সাথে আমাকে নিজের কাছে ও তোমার কাছে বড্ড বেশি মূল্যহীন করে দিচ্ছ। যা আমার আত্মসম্মানকে চরমভাবে আহত করেছে, করছে। আমি তা আর সহ্য করতে পারছি না বলেই, নিজেই নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছি।
কিন্তু নীলা বললো না কথাটা। সবসময় মুখে বলাটাই সব না। কিছু সময় চুপ থেকে কাজে করিয়ে দেখানোটাই মুখ্য হয়।
সে শুধু স্বভাবসুলভ ভাবে একটা কথাই বলল,
—আমার দিন কাটে না, তাই করছি এসব।
অরিত্র আর কিছু বলে না। তবে রাগ দেখিয়ে নীলার বের করে দেওয়া বাসার জামাকাপড় গুলো নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গিয়ে সশব্দে দরজাটা লাগিয়ে দেয়। সেই শব্দ শুনে নীলা কিছুটা কেঁপে উঠে।
তারপর চটপট করে রুমটা পরিষ্কার করতে লেগে যায়। পিরিয়ডের পেইন এখনও কিছুটা হচ্ছে তার। কিন্তু বিকেলের মতো দমবন্ধ করার মতো নয়।
দুপুরে খেয়ে সে কাজ করতে বসেছিল। উঠেছে একদম আসরের আজান কানে আসায়। কাজের মাঝে সে এতটা মশগুল হয়ে গিয়েছিল যে, তার সময়ের ধ্যানজ্ঞানই ছিল না। আজ দু’টো কামিজ ও তিনটে ওড়নার উপর ব্লক প্রিন্টের কাজ করেছে। সেগুলো তাদের পাশের খালি রুমটায় শুকাতে দিয়েছে।
রাতে খাবার শেষ করে অরিত্র সোজা চলে যায় শুতে। তার বউ যে শারীরিক ভাবে আজ অসুস্থ সেদিকে তার বিশেষ খেয়াল নেই। রুমে গিয়েই শুয়ে শুয়ে ফোন টিপতে থাকে। ফোন দেখতে দেখতে কখন যে রাত এগারোটা বেজে যায় সে খেয়ালই করে না। ঘুমে চোখ ভেঙে আসার পূর্ব মূহুর্তে তার মনে পড়ে, কি ব্যাপার? নীলা কোথায়? কত রাত হয়ে গেলো এখনও আসছে না কেন শুতে?
প্রশ্ন গুলো মাথায় আসতেই সে শোয়া থেকে উঠে বসে। নীলাকে খুঁজতে খুজতে সে রুমের বাহিরে এসে দেখে, নীলা কাল সকালের রান্নার জোগাড় করছে। কাজ শেঅ হয়েছে মাত্রই, এখনই হয়ত শুতে যেতো।
অরিত্র তাঁকে এত রাতেও কাজ করতে দেখে বলে–
—কি ব্যাপার? আজ এত রাত অব্দি কাজ করলে যে?
—কাল সকালের নাস্তা আর লাঞ্চের জন্য কি রাঁধব সেটা আগেই একটু গুছিয়ে রাখলাম। যাতে রান্নাটা তাড়াতাড়ি শেষ করে কাস্টমারের কাজগুলো শেষ করতে পারি।
সেই আবারও কাস্টমারের কাজের কথা শুনে অরিত্রের শরীর চিটমিটিয়ে উঠে বিরক্তিতে। সে বিরক্তি নিয়ে বলে–
—তুমি কি বুঝতে পারছো, তোমার এই শখ আমাদের মাঝে দূরত্ব তৈরি করছে?
—একজন মানুষের শখ তার ব্যক্তিগত সম্পর্কে দূরত্বের কারণ হয় কীভাবে? যদি না সম্পর্কে আগে থেকেই দূরত্ব তৈরি হয়ে থাকে? তাহলে কি আমাদের সম্পর্কে আগে থেকেই দূরত্ব তৈরি ছিলো কি?
আজকাল নীলার মতো একটা যেনতেন সাবজেক্টে টেনেটুনে গ্র্যাজুয়েশন পাশ করা গৃহিণী মুখের উপর এমন ঠাস ঠাস প্রশ্ন করে বসে, যা একটি সনামধন্য সফটওয়্যার কোম্পানি বিচক্ষণ কর্মচারী অরিত্রকে থতমত খাইয়ে দেয়। সত্যিই তো, কারো শখ কি করে সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি করবে? একজন মানুষের শখ হয়ই বা কতটুকু, যেটা বিয়ের মতো একটা শক্ত-পোক্ত পবিত্র সম্পর্কের ভীতকে নড়বড়ে করে দিয়ে সেখানে দূরত্ব নামক ভাঙনের দেখা দেয়?
বেশ কিছুক্ষণ হয়ে যাওয়ার পরও অরিত্র নীলার প্রশ্নের কোন জবাব দেয় না। নীলা জানে, অরিত্র দিতেও পারবে না। সে অরিত্রের কাছ থেকে আগেও কোন জবাব আশা করত না, এখন তো ছেড়েই দিয়েছে কোন কিছু আশা করা।
নীলা রান্নাঘরের লাইট বন্ধ করে কোমরে বাঁধা ওড়না খুলতে খুলতে রুমে চলে যায়। বেশি করে পানি দিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আসে সে। শরীর ক্লান্ত থাকায় এসেই শুয়ে পড়ে।
নীলা শোয়ার কিছুক্ষণ পর অরিত্র তার কাছে এগিয়ে আসে। চোখ বন্ধ করে রাখার কারণে নীলার একটু তন্দ্রা ভাব এসে পড়েছিল, কিন্তু তার তন্দ্রা ভাবটা কেটে যায় মাথায় কারো স্পর্শ পেয়ে। হুট করে স্পর্শ পাওয়ায় আধো ঘুম, আধো জাগ্রত নীলা চমকে চোখ মেলে তাকায়। নিজের অতি কাছে অরিত্রকে দেখে সে যতটা না চমকায়, তার চেয়ে বেশি চমকায় তাঁকে নীলার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে।
নীলার মনে পড়ে না শেষ কবে অরিত্র এমন করে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছে। দুইমাস? তিনমাস? নাকি ছ’মাস আগে? ঠিক মনে করতে পারে না নীলা।
অরিত্র নীলাকে চোখ মেলতে দেখে মলিন গলায় বলে–
—ছেড়ে দাও না এসব করা। আমি লাগলে তোমার হাত খরচের টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে দিবো আরো। শুধু শুধু এসব করে নিজেকে কষ্ট দেওয়ার কোন মানে হয় না নীলু।
—একটা কথা কি জানো অরিত্র, এসব করতে আমার একটুও কষ্ট হয় না। নিজের শখ পূরণে কারো কষ্ট হয় বুঝি? কষ্ট আমার তখন হতে যদি আমি এই কাজে স্বস্তি না পেতাম। কিন্তু তুমি হয়ত জানো না, কাজটা করতে গিয়ে আমি নিজেকে খুঁজে পাই। বিয়ের পর সংসারের যাতা কলে হারিয়ে যাওয়া নীলাকে আমি আমার কাজের মাধ্যমে।
অরিত্র অবাক হয়ে যায় নীলার জেদ দেখে। বিগত পাঁচ বছরে সে কেন, তার পুরো পরিবার নীলাকে শান্ত-শিষ্ট, নিবেদিত প্রাণের অধিকারী একজন বলে জেনে এসেছে । সেই মেয়ে এমন জেদ করছে আজ। নিজের সুখ-ভৈভবকে পায়ে ঠেলে দিয়ে কষ্ট করে পরিশ্রম করতে চাইছে।
অরিত্র নীলার এহেন জেদ দেখে তাচ্ছিল্য করে বলে–
—নিজের শখ পূরণ করছো সেই তো আমার টাকা দিয়েই। কই আমাকে কখনো দেখেছো, তোমার থেকে টাকা নিয়ে নিজের শখ পূরণ করতে?
অরিত্রের কথাটি যেন নীলার আত্মসম্মানে সপাটে চড় বসায়।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন। ]
#চলবে?
বি.দ্র.১ঃ একজন বিবাহিত মেয়ে কি সত্যিই স্মুদলি বিজনেস চালিয়ে যেতে পারে? তার শ্বশুর বাড়ির সাপোর্ট যদি না থাকে? প্রিয় মানুষটির সাপোর্ট না থাকলে?
অরিত্রের মতো পুরুষেরা যখন আপোষে নীলাদের মানাতে পারে না, তখন শুরু করে মানসিক ট”র্চার।
বি.দ্র.২ঃ প্লিজ নেক্সট, নেক্সট করবেন না। দুই লাইনের হলেও গঠনমূলক মন্তব্য করবেন প্লিজ।
বি.দ্র.৩ঃ আমি এই গল্পটা দুইদিন পরপর দিবো। আগে যদিও প্ল্যান ছিল গল্পটা ৫পর্বের মধ্যে শেষ করে দেওয়ার, কিন্তু গল্পটা শুরুর পর থেকে আমার প্রিয় আপুদের বিভিন্ন কমেন্ট পেয়ে আমি সত্যি আবেগাপ্লুত ও বিস্মিত। সমাজে মেয়েরা আজও কতটা অবহেলিত সেটা আমি আমার এই গল্পটার মাধ্যমে জানতে পারছি। তাই গল্পটা আরেকটু বড় হবে। নীলার সংসার সামলে বিজনেস বড় করার স্ট্র্যাগলটা দেখাতে চাচ্ছি। তাই একটু ধৈর্য ধারণ করার অনুরোধ রইল আপনাদের কাছে।
বি.দ্র.৪ঃ গল্পটায় ব্যবহৃত পিকটি আমি চ্যাট জিপিটি দিয়ে বানিয়েছি দেখে, পোস্টের উপর “Al content ” লেখা উঠছে। কিন্তু আমার আল্লাহ জানেন আমি আমার জীবনের কত ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে লেখালেখি করি। একসপ্তাহ ধরে জ্বর তাও লিখছি দু’টো গল্প। তাই আপনারা কেউ ভাববেন না আমি এআই দিয়ে লেখি।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স। ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply