#বাঁধন_রূপের_অধিকারী
#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী
#পর্ব ৮
কলেজের গেটের একদম কাছাকাছি আসতেই রূপার মেজাজটা আবারও বিগড়ে গেল। সে দেখল, বাইকের ওপর হেলে দিয়ে আয়েশ করে বসে আছে ইশতিয়াক। তার পরনে একটা সাদা টি-শার্ট, তার ওপর কালো জ্যাকেট যার সামনের বোতামগুলো খোলা ফলে ভেতরের সাদা অংশটা দেখা যাচ্ছে। সাথে কালো প্যান্ট আর গলায় ঝোলানো একটা দামি রুপার চেইন, যেটাতে গিটারের মতো একটা লকেট দুলছে। চোখে গাঢ় কালো সানগ্লাস পরে সে যেন কোনো সিনেমার নায়কের মতো ভাব নিয়ে বসে আছে।রূপার কপাল বিরক্তিতে কুঁচকে গেল। এই পাঁচ দিন সে জ্বরে ভুগেছে ঠিকই, কিন্তু যখনই জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছে বা একটু সুস্থ হয়ে নিচে নেমেছে, তখনই এই ইশতিয়াককে বাসার নিচে ঘোরাঘুরি করতে দেখেছে। হুটহাট তাকে এভাবে নিজের বাড়ির আশেপাশে দেখে রূপা এমনিতেই চরম রেগে ছিল। আজ সামনে পেয়ে সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
রূপা সরাসরি ইশতিয়াকের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কড়া গলায় বলল।
“আপনার সমস্যা কী বলুন তো? প্রতিদিন আমার বাসার সামনে কেন ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন?”
হুট করে রূপাকে এভাবে সামনে দেখে ইশতিয়াক কিছুটা ভড়কে গেলেও সামলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। চোখ থেকে সানগ্লাসটা খুলে রূপার দিকে একপলক তাকিয়ে হালকা হেসেই বলল।
“ওইটা তো রাস্তা! আমি তো স্রেফ রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকি,তোমার বাসার ভেতরে তো ঢুকি না।”
রূপা দু-কোমরে হাত দিয়ে মুখ বেঁকিয়ে ঝাঝালো কণ্ঠে উত্তর দিল।
“তাই বুঝি? তো সারা শহর খুঁজে আর কোনো রাস্তা পেলেন না? আমাদের বাড়ির সামনেই আপনার দাঁড়ানোর জন্য একমাত্র রাস্তা টিকে আছে? তা বুঝলাম আপনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকেন, তো আমাকে দেখে ওমন দাঁত বের করে হাসেন কেন? কেন আমাকে হাই দিয়েছেন আপনি?”
ইশতিয়াক মাথা চুলকাতে চুলকাতে একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলল।
“তুমি আসলেই অনেক বেশি কথা বলো তো!”
রূপা এক চুলও ছাড় না দিয়ে পাল্টা জবাব দিল।
“মুখ আছে অবশ্যই বলবো! আপনার তাতে কী?”
ইশতিয়াক যেন রূপার এই রাগী রূপ দেখে আরও মজা পেল। সে সানগ্লাসটা জ্যাকেটের পকেটে রাখতে রাখতে বলল।
“ওকে নো প্রবলেম, বলো আমি শুনছি। তোমার কথাগুলো আমার কাছে আমৃত্যুর মতো মধুর লাগছে।”
ইশতিয়াকের এই নির্লজ্জ উত্তর শুনে রূপা রাগে একদম অগ্নিশর্মা হয়ে গেল। সে এক মুহূর্ত থামল না, এক নিঃশ্বাসে ইশতিয়াককে লক্ষ্য করে বলতে লাগল।
“তাই? খুব ভালো লাগছে? তাহলে শুনেন আপনি একটা কুত্তা, গাধা, শিয়াল, শুকর, গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ, বানর, হনুমান, ভল্লুক, শিয়াল, নেকড়ে, হায়েনা, ইঁদুর, চিকা, বিড়াল, সাপ, বিচ্ছু, গুই সাপ, চামচিকা, হাতি, ঘোড়া, গণ্ডার।”
রূপার মুখে পৃথিবীর সব পশুর নামের ফিরিস্তি শুনে ইশতিয়াক চোখ টেরা করে ফেলল। সে বুকে হাত দিয়ে নাটুকে ভঙ্গিতে পেছনে থাকা নিজের বাইকের দিকে হেলে পড়তে পড়তে আর্তনাদ করে উঠল।
“ও আল্লাহ! কেউ আমারে ধর! হার্ট অ্যাটাক করব মনে হয়!”
রূপা ওর নাটুকেপনা দেখে একটা বিশ্রী মুখভঙ্গি করে গটগট করে কলেজের ভেতরে ঢুকে গেল। রনি ইশতিয়াককে কোনোমতে ধরে ফেলে অবাক হয়ে বলল।
“ভাই, কি ডেঞ্জারাস মেয়ে রে বাবা? আমি নিজেও তো এত পশুর নাম জানি না। আর এই মেয়েটা এক নিশ্বাসে এতগুলো পশুর নাম কেমনে বলল?”
ইশতিয়াক তখনো ঘোরের মধ্যে। সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।
“আমাকে পানি দে তাড়াতাড়ি। গলা শুকায় কাঠ হয়ে গেছে!”
পাশ থেকে একজন ছেলে তড়িঘড়ি করে এক বোতল পানি নিয়ে এল। ইশতিয়াক প্রাণভরে ঢকঢক করে পানি খেয়ে বুক ভরে দীর্ঘশ্বাস নিল। রনি সুযোগ বুঝে আবার ফোড়ন কাটল।
“ভাই, মেয়েটা বিয়ের আগেই আপনার সাথে এমন চণ্ডাল আচরণ করছে, বিয়ের পর তো এই মেয়ে আপনাকে ঝাঁটা পেটা করতেও পিছুপা হবে না। ভাই ভাবেন, কপালে কী আছে!”
ইশতিয়াক তার টি-শার্টের কলারটা একটু স্টাইলে ঝেড়ে নিয়ে এক গাল হেসে বলল।
“আরে শা’লা! ও তো ইশতিয়াকের হবু বউ। আর ইশতিয়াকের বউ কি এতোটা শান্ত হবে নাকি? আমি যেমন ডেঞ্জারাস, আমার বউ হবে তেমন ডেঞ্জারাস! আর রইলো ঝাঁটা পেটা বউয়ের হাতের ওসব আদুরে মার, দু-একটা খাওয়া তো বড় কোনো ব্যাপার না। আর সেই বউ যদি রূপা হয় তাহলে তো কথাই নেই, ওর হাতে সারাজীবন মার খেতেও আমি রাজি।”
__________
ময়মনসিংহের জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়। বিশাল এক কক্ষ, যার আভিজাত্য আর গাম্ভীর্য যে কাউকে শুরুতেই বুঝিয়ে দেবে এই শহরের আইন-শৃঙ্খলার মূল কেন্দ্রবিন্দু এটি। ঘরের মাঝখানে রাখা বিশাল এক মেহগনি কাঠের টেবিল, যার ওপরটা কাঁচ দিয়ে ঢাকা। টেবিলের একপাশে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা আর অন্যপাশে পুলিশের লোগো খচিত স্ট্যান্ড। সুসজ্জিত আলমারিতে সারিবদ্ধভাবে সাজানো আইনের মোটা মোটা বই আর দেয়ালের একপাশে টানানো বেগম খালেদা জিয়া এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ছবি। এসপি বাঁধন তার সেই গদিওয়ালা উঁচু কালো রিভলভিং চেয়ারে মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে।
পুরো ঘরে এসি-র একটা মৃদু গুনগুন শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। বাঁধনের বাঁ কানের সাথে লেগে আছে সাদা রঙের একটি দামী অ্যাপেল এয়ারপড। সেখানে মৃদু স্বরে বাজছে অনেক বছর পুরনো একটি গান, যা বাঁধন প্রায়ই একা থাকলে শুনে থাকে। হঠাৎ বাঁধনের বন্ধ চোখের পাতায় ভেসে উঠল পাঁচ দিন আগের সেই দৃশ্য ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে এক পাগলী মেয়ে আপনমনে নাচছে আর গান গাইছে। পরক্ষণেই মনে পড়ল আজকের সকালের ঘটনা সেই মেয়েটিই কেমন কাঠবেড়ালির মতো ভয়ে কুঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। রূপার সেই ভীতু চাহনি আর মায়াবী মুখের কথা ভেবে বাঁধনের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক ভুবনভোলানো রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।সে চোখ বন্ধ রেখেই চেয়ারে হেল দুল করতে করতে ব্লুটুথে বাজতে থাকা গানের সুরের সাথে তাল মিলিয়ে গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠল।
~চাঁদনী পসরে কে আমায় স্মরণ করে~
~কে আইসা দাঁড়াইছে গো আমার দুয়ারে~
~তাহারে চিনি না আমি সে আমারে চিনে~
~চাঁদনী পসরে কে আমায় স্মরণ করে~
~কে আইসা দাঁড়াইছে গো আমার দুয়ারে~
গানের রেশ কাটতে না কাটতেই দরজার কাছ থেকে আসা পরিচিত এক জোরালো গলা খাঁকারিতে বাঁধনের ভাবনায় ছেদ পড়ল। সে দ্রুত চোখ মেলে তাকাল এবং কান থেকে এয়ারপডটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল। দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই থানার নতুন ওসি অখিল, যে মাত্র দুই দিন আগে এখানে জয়েন্ট করেছে। অখিলের সাথে বাঁধনের বন্ধুত্ব আজকের নয়, ঢাকায় থাকার সময় থেকেই তাদের মধ্যে এক গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
অখিল এগিয়ে এসে বাঁধনকে একটা স্যালুট দিয়ে হোহো করে হেসে বলল।
“কিরে এসপি সাহেব, একা একা চেম্বারে বসে বিরহী গান ধরলি নাকি? আমি তো ভাবলাম কোনো সিরিয়াস ফাইল দেখছিস!”
বাঁধন মৃদু হেসে চেয়ার থেকে সোজা হয়ে বসে বলল।
“তুই কি স্রেফ আমার গান শোনার জন্য দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলি? বস অখিল। কেসটার আপডেট কী বল।”
অখিল সামনের চেয়ারে ধপ করে বসে একটা ফাইল টেবিলের ওপর এগিয়ে দিয়ে বলল।
“অবস্থা খুব একটা ভালো না রে। এই যে ব্যবসায়ী খুনের কেসটা, এটা দিন দিন জটিল হচ্ছে। আমরা সিসিটিভি ফুটেজ চেক করেছি, কিন্তু খুনি এতটাই স্মার্ট যে কোনো ক্যামেরাতেই তার চেহারা স্পষ্ট আসেনি। সব জায়গায় ব্লার হয়ে আছে।”
বাঁধন ফাইলটা হাতে নিয়ে উল্টাতে শুরু করল। তার তীক্ষ্ণ নজর প্রতিটি পাতার ওপর দিয়ে দ্রুত চলে যাচ্ছে। সে ভ্রু কুঁচকে একটি ফরেনসিক রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে রইল।
“তার মানে তুই বলতে চাচ্ছিস, আমরা এখনো অন্ধকারে? অখিল, ময়মনসিংহের মতো জায়গায় এত বড় একটা মার্ডার কোনো ক্লু ছাড়া হওয়া সম্ভব না। ভিকটিমের কল লিস্টে নতুন কিছু পেলি?”
“সেটাই তো রহস্য। ভিকটিমের শেষ কলটা এসেছিল একটা পাবলিক টেলিফোন বুথ থেকে, যেটা এখন প্রায় বিলুপ্ত। আর যে তিনজনকে আমরা সন্দেহ করে তুলেছিলাম, তাদের প্রত্যেকেরই সলিড অ্যালিবাই আছে। তারা ঘটনার সময় অন্য জেলায় ছিল।”
বাঁধন ফাইলে একটা নির্দিষ্ট জায়গাতে এসে থেমে গেল। সে কলম দিয়ে একটা বিশেষ সময়ের ওপর গোল দাগ কাটল।
“আসামি খুব চতুর, কিন্তু সে একটা ভুল করেছে। দেখ, খুনের ঠিক দশ মিনিট আগে ওই এলাকার পাওয়ার গ্রিড ডাউন ছিল। এটা কোনো টেকনিক্যাল ফল্ট ছিল না, ম্যানুয়ালি করা হয়েছে। আসল আসামি এই সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছে। ফাইলটা এখানে রেখে যা, আমি আজ রাতে এটা নিয়ে আবার বসব।”
“ঠিক আছে এসপি সাহেব। সাবধানে থাকিস, কেসটা কিন্তু ওপর মহলের চাপে আছে। আমি চললাম।”
অখিল উঠে দাঁড়িয়ে একটা স্যালুট দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।কিন্তু দরজার কাছে আসতেই অখিল হঠাৎ সজোরে কারো সাথে ধাক্কা খেল। ধাক্কাটা এতটাই আচমকা ছিল যে, সামনে থাকা মানুষটা টাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে পড়ে গেল। পরক্ষণেই ব্যথায় ককিয়ে ওঠার শব্দ শোনা গেল।
“আহ! আল্লাহ মরে গেলাম গো!”
অখিল হকচকিয়ে সামনে তাকিয়ে দেখে একটা মেয়ে মেঝেতে বসে নিজের কনুই ডলছে। মেয়েটির পরনে অ্যাশ রঙের জর্জেট থ্রি-পিস, কাঁধের এক সাইডে ঝোলানো একটা সুন্দর ব্যাগ। শান্তা অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়িয়ে সামনে সটান পুলিশ অফিসারকে ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় দেখে ভয়ে কুঁকড়ে গেল। তার হার্টবিট যেন কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। সে ভয়ে আমতা আমতা করে কাঁপা গলায় বলল।
“স…সরি স্যার! আসলে আমি একদম দেখতে পাইনি। আমি খুবই দুঃখিত।”
অখিল শান্তার ভয়ার্ত চেহারা দেখে নিজের গলার স্বর কিছুটা নরম করে বলল।
“ইটস ওকে। তো, তুমি এখানে কেন? এসপির সাথে কি কোনো দরকার আছে?”
শান্তা ওড়নাটা ঠিক করতে করতে বলল।
“ওই… বাঁধন ভাইয়ার সাথে দেখা করতে এসেছি।”
অখিল এবার অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকাল। তার কপালে ভাঁজ পড়ে গেল। সে বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করল।
“হোয়াট? বাঁধন ভাইয়া?”
শান্তা মাথা নেড়ে বলল।
“হ্যাঁ, ভেতরে যিনি আছেন উনি আমার ভাইয়া। আচ্ছা স্যার আসি!”
বলেই শান্তা আর এক মুহূর্ত দেরি না করে অখিলের পাশ কাটিয়ে দ্রুত পায়ে বাঁধনের কেবিনের ভেতরে ঢুকে গেল। অখিল সেখানেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে নিজের মনে বিড়বিড় করে বলতে লাগল।
“বাঁধনের বোন? কই, বাঁধন তো কখনো আমায় বলেনি যে ওর এত সুন্দর পরীর মতো দেখতে একটা বোন আছে! হালার ঘরের হালা, এত বড় খবর চেপে গেছিস তোর তো খবর আছে?”
এদিকে শান্তা বাঁধনের কেবিনে ঢুকে দেখে বাঁধন খুব মনোযোগ দিয়ে একটি ফাইল দেখছে। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। শান্তা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে বলল।
“আসসালামু আলাইকুম, ভাইয়া।”
বাঁধন ফাইল থেকে চোখ তুলে সামনে তাকাল। শান্তাকে এই অসময়ে নিজের অফিসে দেখে সে ভ্রু কুঁচকে সালামের উত্তর নিয়ে বলল।
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। তুই এখানে?”
শান্তা কোনো অনুমতির তোয়াক্কা না করেই বাঁধনের ঠিক সামনের চেয়ারটাতে ধপ করে বসে পড়ল। একদম বাঁধনের চোখের দিকে তাকিয়ে চ্যালেঞ্জিং সুরে বলল।
“কেন? আমি কি আসতে পারি না?”
বাঁধন ফাইলের দিকে পুনরায় নজর দিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর কণ্ঠে বলল।
“আমি কাজের সময় ডিস্টার্ব একদম পছন্দ করি না। গেট আউট!”
শান্তা সাথে সাথে গাল ফুলিয়ে অভিমানে মুখটা ছোট করে ফেলল। সে কাঁধের ব্যাগটা ঠিক করতে করতে বলল,
“এইটা কোনো কথা ভাইয়া? অতিথির মতো আপনার রাজকীয় কক্ষটা একটু দেখতে আসলাম, আর আপনি দেখা হতেই তাড়িয়ে দিচ্ছেন?”
বাঁধন বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে আবার বলল।
“শান্তা, আমি এখন ফালতু কথা বলার মুডে নেই। কাজের অনেক চাপ আছে।”
শান্তা নাছোড়বান্দা। সে চেয়ারে আরও আরাম করে বসে বলল।
“ঠিক আছে, আপনি চুপচাপ আপনার কাজ করেন। আমি জাস্ট এখানে চুপচাপ বসে বসে আপনাকে দেখি। কোনো কথা বলব না, প্রমিস!”
বাঁধন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিরক্তিতে আবার ফাইলগুলো দেখতে লাগল। সে জানে শান্তাকে বলে লাভ নেই। আর এদিকে শান্তা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বাঁধনের দিকে। মনে মনে সে কবেই এই মানুষটার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে, আর এখন তো সেই ভালো লাগা গভীর ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে।শান্তা মুগ্ধ হয়ে দেখল, এসির ঠান্ডা বাতাসে বাঁধনের কপালের কয়েকটা চুল অবাধ্য হয়ে এলোমেলোভাবে নড়াচড়া করছে। বাঁধনের সেই স্লিট করা ভ্রু-টা এখন একদম স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে, যা তাকে মারাত্মক আকর্ষণীয় আর পুরুষালি করে তুলেছে। শান্তার মনে হলো, এই কঠোর পুলিশ অফিসারের আড়ালে থাকা মানুষটাকে সে সারাজীবন এভাবেই অপলক দেখে যেতে পারবে। তার হৃদস্পন্দন যেন নিজের অজান্তেই বেড়ে গেল। বাঁধনের প্রতিটি নড়াচড়া, তার ফাইল দেখার ভঙ্গি। সবকিছুই শান্তার কাছে কোনো মায়াবী স্বপ্নের মতো লাগছে।
___________
কলেজের বারান্দার গ্রিলের ওপর ভর দিয়ে রূপা, কেয়া, বৃষ্টি আর নাদিয়া সবাই মিলে টিফিন পিরিয়ডের আড্ডায় মেতেছে। চারপাশের হৈচৈয়ের মাঝে হুট করে কেয়া প্রশ্ন করে বসল।
“এই রূপা, তোর না বড় ভাই বিদেশ থেকে এসেছে? তা তোর জন্য কী কী আনল শুনি?”
কেয়ার প্রশ্নে রূপার হাসিখুশি মুখটা মুহূর্তেই মেঘলা হয়ে গেল। সে অভিমানী সুরে ঠোঁট ফুলিয়ে ছোট্ট করে বলল,
“কিছু না।”
কেয়া অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে বলল।
“বলিস কী! কিছুই আনেনি? এক্কেবারে খালি হাত?”
রূপা উদাস গলায় আবার বলল।
“জানি না রে।”
পাশ থেকে নাদিয়া একটু বাঁকা স্বরে টিপ্পনী কাটল।
“আরে বাদ দে তো! সৎ ভাই তো, আপন ভাই তো আর না যে তোর জন্য জান লড়িয়ে দেবে। এত পস্তানোর কী আছে?”
নাদিয়ার কথায় রূপার বুকে যেন একটু লাগল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।
“আমি ভাইয়াকে কোনোদিন সামনাসামনি দেখিনি। শুধু এটুকু জেনেছি যে আমার একটা সৎ ভাই আছে যে বিদেশে থাকে। কিন্তু বিশ্বাস কর, আমি কখনো তাকে ‘সৎ’ মনে করিনি। সবসময় ভেবেছি আমার একটা আপন বড় ভাই আছে, সে যখন বিদেশ থেকে আসবে তখন আমার জন্য কত কী আনবে! ভেবেছিলাম ভাইয়া এলে কত দুষ্টুমি করব, আবদার করব… কিন্তু তা আর হলো না।”
বৃষ্টির চোখ কপালে উঠল। সে অবিশ্বাসের সুরে বলল।
“মানে কী? তুই এখনো তোর বড় ভাইকে চোখের দেখাও দেখিসনি?”
রূপা ম্লান হেসে মাথা নাড়ল।
“না।”
নাদিয়া অবাক হয়ে কপালে চোখ তুলে বলল।
“কী বলিস এগুলা? এখনো দেখিস নাই মানে? বাঁধন ভাইয়া কি একবারও তোর সাথে দেখা করতে আসেনি?”
রূপা উদাস মনে আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার কণ্ঠে এক বুক অভিমান চেপে বলল।
“না রে। আমি কতবার দেখা করতে চেয়েছি কিন্তু বাঁধন ভাইয়াকে বাড়িতেই পাওয়া যায় না। সারাদিন কোথায় যে থাকে আর রাতে যখন ফেরে তখন আমি ঘুমে থাকি। গত পাঁচটা দিন এভাবেই কেটে গেল।”
কেয়া রূপার বিষণ্ণ মুখটার দিকে তাকিয়ে মমতা ভরে তার কাঁধে হাত রাখল। তারপর নিচু স্বরে বলল।
“থাক মন খারাপ করিস না। হয়তো বাঁধন ভাইয়া তোর সাথে দেখা করতে চায় না। তাই তোরও উচিত হবে না উনাকে আগ বাড়িয়ে বিরক্ত করা।”
কেয়ার প্রতিটি কথা রূপার বুকে বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধল। সে ঝাপসা চোখে নীল আকাশটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে কেবল একটাই প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে। তাহলে কি বাঁধন ভাইয়া তাকে বোন বলে স্বীকার করতেই পারছে না? সে সৎ বোন বলে কি তার প্রতি ভাইয়ার এত ঘৃণা আর অবহেলা? রূপার চোখ ফেটে জল আসতে চাইল কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল।
রানিং…!
Share On:
TAGS: বাঁধন রূপের অধিকারী, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোকে পর্ব ৩
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩১
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৮
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৮
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৯
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৭
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৪৩