Golpo romantic golpo বাঁধন রূপের অধিকারী

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৫৫


#বাঁধন_রূপের_অধিকারী

#লখিকা_সুমি_চৌধুরী

[৫৫]

‎আর সহ্য হয় না বাঁধনের। অস্থিরতায় ছটফট করে ওঠে। অতঃপর সোফা ছেড়ে উঠে দরজায় সজোরে বসায় লাথি। মুহূর্তেই ধড়াম করে ভেঙে পড়ে দরজা।ভেতরে আঁতকে ওঠে রূপা। সম্মুখে ক্রোধোন্মত্ত বাঁধন। ভয়ে শুকিয়ে আসে কলিজা। তবুও নিজেকে সামলে রাখে।রূপার অশ্রুসিক্ত মুখ দেখে দৃষ্টি অবনত করে বাঁধন।মেয়েটার কান্না যে তার অসহ্য। রূপার চোখে যত ফোঁটা অশ্রু ঝরে। তার দ্বিগুণ রক্তক্ষরণ হয় বাঁধনের বুকে৷ কিছুক্ষণ পর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। অতঃপর বড় বড় পায়ে এগিয়ে এসে চেপে ধরে রূপার গাল। আকস্মিক স্পর্শে হকচকিয়ে যায় রূপা। বিস্ময়ভরা চোখে তাকায় বাঁধনের দিকে। তার চোখ দুটো রক্তিম। নিঃশ্বাস উত্তপ্ত। চোয়াল দৃঢ়। অতঃপর দাঁত চেপে আওড়ায়,

‎

‎” আজ তুই আমার কাছে এমন একটা আবদার করেছিস। যা পূরণ করার সাধ্য আমার নেই। ড্যাম ইট। কিন্তু তোর কান্না সহ্য করতে পারি না। খোদা আমাকে তোকে দিলেও তোর কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা আমাকে দেয়নি। “

‎

‎কথা থামায় বাঁধন। ঠোঁট কামড়ে ঢোক গিলে। অতঃপর পুনরায় শুধায়,

‎

‎” বৃষ্টিদের বাড়িতে যেতে চাস। তাই না? ফাইন। গো অ্যাহেড। যা। দেখি কত দিন আমাকে ছেড়ে থাকতে পারিস। “

‎

‎কথা শেষ করেই পলকের মধ্যে রূপাকে কোলে তুলে নেয় বাঁধন। ভয়ে ছটফট করে রূপা। দুহাতে বাঁধনকে ঠেলে নামার চেষ্টা করে। হঠাৎই হুহু করে কেঁদে ওঠে ।বাড়ির সবার সম্মুখ দিয়ে রূপাকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে আসে বাঁধন। অতঃপর গাড়ির সিটে বসিয়ে নিজেও উঠে বসে। স্টার্ট দেয় গাড়িতে। পরক্ষণেই বেপরোয়া গতিতে ছুটিয়ে নেয় রাজপথে।ভয়ে কান্নার বেগ আরও বাড়ে রূপার। সহসা সজোরে ব্রেক কষে বাঁধন। ষাঁড়ের মতো হাঁপাতে হাঁপাতে আবারও চেপে ধরে রূপার গাল। দাঁত পিষে গর্জে ওঠে,

‎

‎” কাঁদবি না। একদম কাঁদবি না। কাঁদলে জানে মেরে ফেলব। “

‎

‎বলেই পুনরায় স্টার্ট দেয় গাড়ি।মাথা অবনত করে ফুঁপিয়ে কাঁদে রূপা। বুকভরা অভিমান। চোখভরা অশ্রু। তবুও বাঁধনকে একটা প্রশ্ন করার সাহসটুকু হয় না তার।এই প্রথম বাঁধনের এমন রুদ্ররূপ দেখছে । এর আগে কখনো তার ওপর এভাবে ক্রোধ ঝাড়েনি লোকটা। আজ যেন সম্পূর্ণ অচেনা বাঁধনকে দেখছে সে। ভালোবাসার মানুষটাকেই আজ বড্ড ভয়ংকর লাগছে তার।হঠাৎই রূপার দৃষ্টি পড়ে বাঁধনের হাতের দিকে। থেঁতলে ফুলে আছে হাতটা। দৃশ্যটা দেখে বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে তার। কান্না থামিয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে প্রশ্ন করে,

‎

‎” তোমার হাতে কী হয়েছে? “

‎

‎নীরব বাঁধন। গম্ভীর মুখে চালিয়ে যায় গাড়ি। কোনো উত্তর নেই। কোনো সাড়াশব্দ নেই।বাঁধনের নিস্তব্ধতা যেন রূপার বুকের বাঁধ ভেঙে দেয়। কান্না চেপে রাখতে পারে না ।পুনরায় হু হু করে কেঁদে ওঠে।বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে আসে বাঁধনের। এই মুহূর্তে রূপার অশ্রুভেজা মুখের দিকে তাকানোর সাহস নেই তার। একবার তাকালেই যে সমস্ত রাগ গলে জল হয়ে যাবে। তাই দৃষ্টি সামনের পথে স্থির রেখে গাড়ি চালাতে চালাতেই গর্জে বলে,

‎

‎” এই তুই কাঁদছিস কেন? কাঁদতে নিষেধ করছি না তোকে? একদম কাঁদবি না। আর একবারও তোর কান্নার শব্দ কানে এলে গাড়ি থেকে ফেলে দেব। মাইন্ড ইট। “

‎

‎বাঁধনের রক্তচক্ষুর দিকে তাকায় রূপা। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে কাঁপতে কাঁপতে শুধায়,

‎

‎” কোথায় নিয়ে যাচ্ছো আমাকে? “

‎

‎বাঁধন তীক্ষ্ণ কণ্ঠে জবাব দেয়,

‎

‎” মারতে নিয়ে যাচ্ছি। চুপ থাকবি তুই। “

‎

‎ধমকে আবারও কেঁপে ওঠে রূপা। মানুষটা এমন করছে কেন। কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না । ভয়ের সঙ্গে বুকের ভেতর জমে ওঠে অজস্র প্রশ্ন। তবুও থামে না কান্না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেই চলে।

‎একসময় অসহ্য বিরক্তিতে মুখ ঘুরিয়ে রূপার দিকে তাকায় বাঁধন। দাঁত চেপে ধমকে বলে,

‎

‎” চুপ করবি তুই? “

‎

‎ঝট করে মাথা তুলে বাঁধনের পানে তাকায় রূপা। হেঁচকি তুলে কাঁপা কণ্ঠে বলে,

‎

‎” কেন এমন করছ আমার সঙ্গে? “

‎

‎নিমিষেই রূপার গলা থেকে ওড়না টেনে নেয় বাঁধন। সেই ওড়না দিয়েই শক্ত করে বেঁধে দেয় তার মুখ। এক হাতে চেপে ধরে রূপার দুটো হাত। অন্য হাতে সামলায় গাড়ির স্টিয়ারিং।

‎বিস্ফারিত নেত্রে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে থাকে রূপা। চোখেমুখে বিস্ময়। বুকজুড়ে আতঙ্ক। কিছুই করার নেই তার। নীরবে চেয়ে থাকা ছাড়া।কয়েক মিনিট পর গাড়িটা এসে থামে একটি বাড়ির সম্মুখে। রূপার মুখ থেকে ওড়না খুলে গলায় পরিয়ে দেয় বাঁধন।বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে বাড়িটার দিকে তাকায় রূপা। চিনতে ভুল হয় না তার। অবাক কণ্ঠে বলে,

‎

‎” এটা বৃষ্টিদের বাড়ি না? “

‎

‎বাঁধন শান্ত কণ্ঠে জবাব দেয়,

‎

‎” হুম। এখন গাড়ি থেকে নামো। “

‎

‎রূপার চোখেমুখে প্রশ্নের ছায়া। দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে জানতে চায়,

‎

‎” কেন? “

‎

‎মুহূর্তেই বদলে যায় বাঁধনের মুখের অভিব্যক্তি। ভ্রু কুঁচকে ধমকে বলে,

‎

‎” নামতে বলছি তো। চুপচাপ নামো। ডোন্ট আস্ক মি এগেইন। “

‎

‎বাঁধনের ধমকে শিউরে ওঠে রূপা। ভয়ে মুষড়ে পড়ে অন্তরাত্মা। নির্বাক পায়ে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায়। গাড়ির জানালায় স্থির বাঁধনের দৃষ্টি। রূপার মুখপানে চায় । ক্ষণকাল দুজনের চোখে চোখ নিবদ্ধ থাকে। নিঃশব্দে বয়ে যায় অভিমানের ক্ষণ। অতঃপর বাঁধন গম্ভীর কণ্ঠে বলে,

‎

‎” বৃষ্টিদের বাড়িতে দুদিন থাকতে চেয়েছিলে না? এখন দুদিন নয়। যত দিন মন চায় তত দিন থাকো। “

‎

‎বাক্যশেষে গাড়ি স্টার্ট দেয় বাঁধন। নিমেষেই ধূলিঝড়ের বেগে ছুটে যায় গাড়ি। হতবিহ্বল রূপা তাকিয়ে থাকে সেদিকে। বাতাসে উন্মুক্ত কেশরাশি উড়তে থাকে এলোমেলো। দৃষ্টির সীমানা পেরিয়ে মিলিয়ে যায় গাড়ি। আর ঠিক সেই ক্ষণে রূপার আঁখিকোণে টলমল করে ওঠে এক বিন্দু অশ্রু। গড়িয়ে পড়ে গণ্ডদেশ বেয়ে।সহসা উপলব্ধি করে । এতক্ষণ বাঁধন তাকে বৃষ্টিদের গৃহেই নিয়ে আসছিল। তার আবদার অগ্রাহ্য করেনি লোকটা। রূঢ়তার অন্তরালে নীরবে পূর্ণ করেছে তার ইচ্ছা। ভাবতেই অভিমানের মেঘ সরিয়ে অধরে ফুটে ওঠে স্নিগ্ধ হাসির রেখা।অশ্রুসজল আঁখি মুছে দূরে মিলিয়ে যাওয়া পথের পানে চেয়ে মৃদু স্বরে বলে,

‎

‎” থ্যাংক ইউ সো মাচ। আমার ভালো জামাই। “

‎

‎তৎক্ষণাৎ ছুটে যায় রূপা। বৃষ্টিদের বাড়ির সদর দরজায় পৌঁছে আনন্দে বাজিয়ে চলে কলিংবেল। ক্ষণিকের অপেক্ষা। অতঃপর খুলে যায় দ্বার।

‎দুয়ারে বৃষ্টি। সম্মুখে রূপা।‎দুজনের দৃষ্টি মিলতেই বিস্ময়ে বিস্ফারিত হয় আঁখিপল্লব। মুহূর্তেই আনন্দের উচ্ছ্বাসে চিৎকার করে ওঠে বৃষ্টি,

‎

‎” রূপা। তুই। “

‎

‎হাস্যোজ্জ্বল মুখে রূপা বলে,

‎

‎” আমাকে কি দেখা যাচ্ছে? তাহলে আমিই। “

‎

‎পরক্ষণেই দুহাত প্রসারিত করে রূপাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বৃষ্টি। বান্ধবীর উষ্ণ আলিঙ্গনে সাড়া দেয় রূপাও। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানে দুজনের মুখেই আনন্দের ঝিলিক।বৃষ্টি আবেগভরা কণ্ঠে বলে,

‎

‎” আমি ভাবতেই পারছি না তুই আসবি। “

‎

‎রূপা আলিঙ্গন ছেড়ে খানিক ভাব নিয়ে দাঁড়ায়। ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমির হাসি। গর্বিত ভঙ্গিতে বলে,

‎

‎” একমাত্র বেস্টির বিয়ে বলে কথা। তার ওপর আমার ভাইয়ের বউ হতে যাচ্ছিস তুই। তোর বিয়ের দুদিন আগে আমি আসব না তো কে আসবে? “

‎

‎কথাটা শুনে বৃষ্টির গণ্ডদেশে লজ্জার আভা ছড়িয়ে পড়ে। পরক্ষণেই বাড়ির বাইরে দৃষ্টি বুলিয়ে কৌতূহলী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,

‎

‎” কার সঙ্গে এসেছিস? “

‎

‎রূপা সহজ স্বরে জবাব দেয়,

‎

‎” বাঁধন ভাইয়া দিয়ে গেল। “

‎

‎বৃষ্টির চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়। অবিশ্বাস মেশানো কণ্ঠে বলে,

‎

‎” আসতে দিল তোকে? “

‎

‎রূপা মৃদু হেসে জবাব দেয়,

‎

‎” প্রথমে তো আসতেই দিতে চাইছিল না। পরে কান্নাকাটি করেছি। আমার কান্না দেখে শেষমেশ নিজেই দিয়ে গেল। “

‎

‎

‎বৃষ্টি মৃদু হেসে বলে,

‎

‎” আচ্ছা ঠিক আছে। চল। নাদিরা আর কেয়াও এসেছে। “

‎

‎দুই বান্ধবী পা বাড়ায় বৃষ্টির কক্ষপানে। রূপাকে দেখেই নাদিরা আর কেয়ার মুখেও ছড়িয়ে পড়ে উচ্ছ্বাস। চার বান্ধবী একত্র হতেই জমে ওঠে হাসি-ঠাট্টার আসর। কথার ফাঁকে ফাঁকে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দের কলরোল।আড্ডার মাঝেই নাদিরা দুষ্টুমিভরা কণ্ঠে বলে,

‎

‎” ভাই। কী কামালটাই না দেখালি তোরা দুজন। রূপা হয়ে গেল বাঁধনের বউ। আর বৃষ্টি হতে যাচ্ছে আকাশ স্যারের বউ। তার মানে দুজনেই একই বাড়ির বউ। “

‎

‎নাদিরার কথা শুনে কেয়া গালে হাত রেখে আক্ষেপের সুরে বলে,

‎

‎” আল্লাহ। রহমান বাড়িতে আর দুইটা পোলা দিলে কী হইত? আমরাও যাইতাম গা। “

‎

‎কেয়ার কথা শেষ হতেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে হাসির রোল। হাসতে হাসতে একে অপরের গায়ে ঢলে পড়ে চার বান্ধবী। দুষ্টুমি আর খুনসুটিতে মুখর হয়ে ওঠে ঘরখানি। তাদের হাসির ফাঁকে ফাঁকে বয়ে চলে জমজমাট আড্ডা।

‎আড্ডার উচ্ছ্বাসে কখন যে রাত একটা বেজে যায়। টেরই পায় না চার বান্ধবী। রাতের খাওয়া সেরে নাদিরা আর কেয়া ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে।রূপা আর বৃষ্টিও ফিরে আসে কক্ষে। ঘরে পা রাখতেই কেমন ছটফট করে ওঠে রূপার মন। চারদিকে দৃষ্টি বুলায় সে। পরিচিত মুখের ভিড়েও আজ কেমন এক শূন্যতা। বুকের গহিনে দানা বাঁধে অদ্ভুত অস্থিরতা।বিছানায় বালিশ ঠিক করতে করতে ঘুমজড়ানো কণ্ঠে বৃষ্টি ডাকে,

‎

‎” দাঁড়িয়ে আছিস কেন? শুয়ে পড়। অনেক রাত হয়েছে। “

‎

‎নীরবে বিছানায় শুয়ে পড়ে রূপা। বৃষ্টিও নিভিয়ে দেয় ঘরের আলো। রাতের আঁধারে ছাদের পানে চেয়ে থাকে রূপা। চোখে ঘুম নেই। মনে প্রশান্তি নেই।কিছুক্ষণ পর চোখের পাতা মুদতেই ভেসে ওঠে বাঁধনের রাগান্বিত মুখখানি। নিমেষেই চোখ মেলে তাকায় । বুকের ভেতর দীর্ঘশ্বাসের ঢেউ। নিঃশ্বাসে জমে ওঠে অস্থিরতা৷ পাশ ফিরে বৃষ্টিকে জড়িয়ে ধরে। চোখ বুজে ঘুমকে ডাকার চেষ্টা করে। কিন্তু ঘুমের দেখা মেলে না।

‎

‎প্রতিটি রাত বাঁধনের বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে কাটে তার। সেই পরিচিত বক্ষের উষ্ণতা ছাড়া আজ বিছানাটাও কেমন পর মনে হয়। বালিশে মাথা রেখেও স্বস্তি নেই। চোখের পাতায় ঘুম নামে না। হৃদয়জুড়ে কেবলই ছটফটানি।মনে হয়। এই মুহূর্তে বাঁধনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে পারলেই বুঝি সমস্ত অস্থিরতা থেমে যাবে। বুকের ভেতর জমে থাকা শূন্যতা মুছে গিয়ে ফিরে আসবে সেই চিরচেনা প্রশান্তি।

‎

‎বৃষ্টির আলিঙ্গন ছিন্ন করে সমগ্র বিছানায় ছটফটিয়ে গড়াগড়ি খায় রূপা। কী এক দুর্বোধ্য অস্থিরতা তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। কেন নিদ্রা আজ তার দুয়ারে ধরা দিচ্ছে না? কেন বারবার স্মৃতির অলিন্দে ভেসে উঠছে বাঁধনের মুখচ্ছবি? তবে কি ভালোবাসারই এমন ব্যাকুলতা? ভালোবাসলেই কি দূরে থাকা যায় না? এতক্ষণ তো বেশ ছিল । তবে এখন কেন বিরহের এই অসহনীয় দহন?অস্থিরতায় ছটফট করতে করতে আপনমনেই বিড়বিড় করে ওঠে ।

‎

‎” উফ। শান্তি পাচ্ছি না। বাঁধন ভাইয়া তুমি কোথায়? আমাকে একটু জড়িয়ে ধরো। আমার ঘুম আসছে না। “

‎

‎কথাগুলো বলেই পুনরায় বৃষ্টিকে বক্ষলগ্ন করে । তবু মনের ব্যাকুলতা প্রশমিত হয় না। অধর নেড়ে আবারও আপনমনে ফিসফিস করে ।

‎

‎” প্লিজ বাঁধন ভাইয়া। তুমি কোথায়? আমাকে একটু জড়িয়ে ধরো না। আমার কেমন জানি লাগছে। “

‎

‎কিন্তু বিরহিণীর আকুল আহ্বানেও সাড়া মেলে না প্রিয় পুরুষের। আসে না কোনো প্রত্যুত্তর। বাতাসে ভেসে আসে না তার কণ্ঠস্বর। মেলে না সেই চিরপরিচিত সুবাস। যে সুবাসের সান্নিধ্যে প্রতিটি রাত নিদ্রামগ্ন হয় রূপা।এদিকে প্রায় ঘুমের অতলে তলিয়ে গিয়েছিল বৃষ্টি। হঠাৎ রূপার এমন ছটফটানি দেখে চমকে উঠে বসে সে। উদ্বিগ্ন হাতে রূপার কপাল ও গাল স্পর্শ করে ব্যাকুল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,

‎

‎” রূপা। কী হয়েছে তোর? এমন করছিস কেন তুই? “

‎

‎বিছানা ছেড়ে ধড়মড় করে উঠে বসে রূপা। পরম আকুলতায় বৃষ্টিকে বক্ষলগ্ন করে কাঁপা কণ্ঠে বলে,

‎

‎” জানি না। আমার কেমন যেন লাগছে। কিছুতেই ভালো লাগছে না। বাঁধন ভাইয়া কোথায়? উনি কেন আমাকে জড়িয়ে ধরছেন না? কেন আমার কাছে আসছেন না? “

‎

‎রূপার অসংলগ্ন প্রলাপ শুনে বৃষ্টি বুঝতে পারে। বিরহের ব্যাকুলতায় মেয়েটা যেন নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। বাঁধনের সাথে ঘুমানোর অভ্যাসটা যে তার কতখানি গভীরে প্রোথিত। আজ প্রিয় মানুষটির সান্নিধ্যহীন একটি রাতই যেন তার সমস্ত স্বস্তি কেড়ে নিয়েছে।বৃষ্টির হৃদয়ে মায়া জাগে। স্নেহসিক্ত হাতখানি রূপার মাথায় বুলিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলে,

‎

‎” সোনা। এখানে বাঁধন ভাইয়া কোথা থেকে আসবে? তুই তো আমাদের বাড়িতে। আর বাঁধন ভাইয়া ওদের বাড়িতে। “

‎

‎কিন্তু বৃষ্টির কথায় রূপার ব্যাকুলতা প্রশমিত হয় না। বরং বন্ধন আরও দৃঢ় করে বৃষ্টিকে আঁকড়ে ধরে। যেন এইটুকু আশ্রয়ও হারিয়ে যাওয়ার ভয় তার। কণ্ঠে শিশুসুলভ জেদ। চোখেমুখে অসহায় আকুলতা।

‎

‎” আমি জানি না। আমি কিছুই জানি না। প্লিজ বৃষ্টি। তুই বাঁধন ভাইয়াকে আসতে বল না। আমার এখানে থাকতে ভালো লাগছে না। আমি থাকব না এখানে। আমি উনার কাছে যাব। উনার সঙ্গে থাকব। প্লিজ তুই একবার উনাকে ফোন কর। বল না আমাকে এসে নিয়ে যেতে। আমার বাঁধন ভাইয়াকে চাই। এখনই চাই। “

‎

‎রূপার উন্মনা আচরণে বৃষ্টি নিজেই অস্থির হয়ে পড়ে। কীভাবে এই ব্যাকুলতাকে শান্ত করবে সে? কীভাবে বোঝাবে এই উতলা হৃদয়কে? স্নেহভরা হাতে রূপার মাথায় হাত বুলিয়ে কোমল স্বরে বলে,

‎

‎” লক্ষ্মীটি। এখন অনেক রাত। এত রাতে কীভাবে আসবে বল? প্লিজ। রাতটা কোনো রকমে কাটিয়ে দে। ভোর হলেই আমি বাঁধন ভাইয়াকে বলব তোকে নিয়ে যেতে। “

‎

‎কিন্তু আশ্বাসের বাণীও রূপার ব্যাকুল চিত্তে প্রশান্তি আনে না। বরং মুহূর্তেই দু’চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমান অশ্রুধারায় গলে পড়ে। কাঁদতে কাঁদতেই বৃষ্টিকে আঁকড়ে ধরে বলে,

‎

‎” আমার ভালো লাগছে না বৃষ্টি। আমার কেমন যেন লাগছে। আমি বাড়ি চলে যাব। তুই প্লিজ বাঁধনকে আসতে বল। প্লিজ। আমি ওর কাছে যাব। আমার ওকে চাই। “

‎

‎রূপার কান্নায় দোটানায় পড়ে বৃষ্টি। একদিকে প্রিয় বান্ধবীর এমন অসহায় আকুলতা। অন্যদিকে গভীর রাতের অসহায়ত্ব। কতভাবেই না মেয়েটাকে বোঝানোর চেষ্টা করে সে। সান্ত্বনার বাণী শোনায়। বুকে টেনে নিয়ে শান্ত করতে চায়। কিন্তু রূপার উন্মনা হৃদয় কিছুতেই শান্ত হয় না। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তার ব্যাকুলতা যেন আরও দুর্বার হয়ে ওঠে।শেষমেশ আর উপায় খুঁজে পায় না বৃষ্টি। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে সাহস সঞ্চয় করে হাতে তুলে নেয় মুঠোফোন। বাঁধনের নম্বরে কল দেয় সে। কিন্তু ওপাশ থেকে ভেসে আসে ফোন বন্ধ থাকার বার্তা।

‎

‎বৃষ্টি কল কেটে দেয়। আবারও চেষ্টা করে। তবু একই উত্তর। বাঁধনের মুঠোফোন বন্ধ।এবার নিরুপায় হয়ে আকাশের নম্বরে কল দেয় সে। কয়েক মুহূর্তের প্রতীক্ষা শেষে ওপাশ থেকে কলটি রিসিভ হয়।বৃষ্টি আর এক মুহূর্তও দেরি করে না। দ্রুত ফোনটি রূপার হাতে তুলে দিয়ে আকাশের সঙ্গে কথা বলতে বলে।কাঁদতে কাঁদতে ফোনটি কানে ঠেকায় রূপা। কান্নায় ভেঙে পড়া কণ্ঠে ওপাশের মানুষটিকে ডাকে ,

‎

‎” হ্যালো। আকাশ ভাইয়া। “

‎

‎রূপার কান্নাভেজা কণ্ঠস্বর কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই ওপাশে আকাশ কিছুটা চমকে ওঠে। প্রায় ঘুমের অতলে তলিয়ে যাচ্ছিল সে। এমন নিশীথে বৃষ্টির ফোন পেয়ে যতটা বিস্মিত হয়েছিল। রূপার কান্নার শব্দে তার চেয়েও বেশি শঙ্কিত হয়ে পড়ে। ঘুমজড়ানো কণ্ঠে জানতে চায়,

‎

‎” কী হয়েছে? কাঁদছিস কেন? “

‎

‎বৃষ্টি আড়ালে বিড়বিড় করে বলে,

‎

‎” জামাইয়ের কাছে যাওয়ার জন্য কাঁদছে। “

‎

‎রূপা তখনো ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কান্নাজড়ানো কণ্ঠে আকুতি জানায়,

‎

‎” আমি বাড়ি যাব। আমার ভালো লাগছে না। তুমি এসে আমাকে নিয়ে যাও প্লিজ। “

‎

‎আকাশের ভ্রুযুগল কুঞ্চিত হয়ে আসে।

‎

‎” বাড়ি আসবি মানে? “

‎

‎বৃষ্টির ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। রূপার এমন কাণ্ড দেখে হাসি সামলানো দায়। ফোনের কাছে মুখ এগিয়ে নিয়ে চাপা হাসিতে কথাগুলো আরও স্পষ্ট করে বলে,

‎

‎” এই এলো। বাঁধন ভাইয়াকে ছাড়া ঘুমাতে পারছে না। খুব মিস করছে ভাইয়াকে। থাকতে পারছে না উনাকে ছাড়া। তাই এখন বাড়ি ফিরতে চায়। “

‎

‎কথাগুলো কর্ণগোচর হতেই আকাশের ঘুম মুহূর্তে উবে যায়। চোখেমুখে নেমে আসে বিরক্তির ছায়া। চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে ধমকে ওঠে,

‎

‎” থাপ্পড় চিনিস? এক থাপ্পড়ে দাঁত ফেলে দেব। বৃষ্টিদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য পুরো বাড়ি মাথায় তুলে ফেলেছিলি। আর এখন বলছিস বাড়ি আসবি? “

‎

‎ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে ওঠে রূপা । কান্নায় ভেঙে পড়া কণ্ঠে জেদ ধরে বলে,

‎

‎” আমি কিছু জানি না। আমি বাড়ি যাব। “

‎

‎রূপার অশ্রুসিক্ত মুখখানা দেখে বৃষ্টিও আর স্থির থাকতে পারে না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার হাত থেকে মুঠোফোনটি নিয়ে কানে ঠেকায়৷ অনুনয়ের সুরে বলে,

‎

‎” স্যার। আপনি একটু কষ্ট করে এসে ওকে নিয়ে যান। বেচারি জামাইয়ের জন্য একেবারে পাগল হয়ে গেছে। কিছুতেই সামলানো যাচ্ছে না। “

‎

‎বৃষ্টির আকুল অনুরোধে আকাশের রাগ যেন মুহূর্তেই উবে যায়। কঠোরতার আবরণ সরিয়ে মনটা শান্ত হয়ে আসে। পরক্ষণেই ঠোঁট কামড়ে মুচকি হাসে । দুষ্টুমির সুরে বলে,

‎

‎” তো তুমি। কিছু শিখে রাখো ওর কাছ থেকে। “

‎

‎আকাশের এমন কথায় বিস্ময়ে ভ্রু তোলে বৃষ্টি।

‎

‎” আমি আবার কী শিখব? “

‎

‎ওপাশ থেকে হেসে উত্তর দেয় আকাশ,

‎

‎” কীভাবে জামাইয়ের কাছে যাওয়ার জন্য পাগল হতে হয়। “

‎

‎বৃষ্টি নাক কুঁচকে জবাব দেয়,

‎

‎” উহ্। আমি পাগল কেন থাকব? বরং আমার জামাই আমার কাছে আসার জন্য পাগল থাকবে। “

‎

‎আকাশের অধরে দুষ্টু হাসি খেলে যায়।

‎

‎” আচ্ছা। থাকবোনি। “

‎

‎কথাটা শুনে বৃষ্টির গাল দুটো লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে। আর কথা না বাড়িয়ে দৃষ্টি ফেরায় রূপার দিকে। মেয়েটা তখনো মাথা অবনত করে কেঁদে চলেছে। বুকের ভেতর জমে থাকা ব্যাকুলতা যেন অশ্রু হয়ে ঝরে পড়ছে অবিরাম।বৃষ্টি পুনরায় ফোনে মনোযোগ দেয়। মিনতিভরা কণ্ঠে বলে,

‎

‎” এখন প্লিজ। একটু তাড়াতাড়ি আসুন। “

‎

‎ওপাশে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আকাশ। তবে মনের গহিনে অজান্তেই আনন্দের ঢেউ খেলে যায়। এই ছুতোয় তার হবু বউটাকে একনজর দেখার সুযোগ মিলবে। দুটো দিন পেরিয়ে গেছে। দেখা হয়নি সেই মায়াবী মুখখানার। কতটা দেখতে ইচ্ছে করছে তাকে।ভাবনার রেশ কাটতেই বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে সংক্ষিপ্ত স্বরে বলে,

‎

‎” আচ্ছা। আসছি। “

‎

‎

‎কয়েক মিনিটের ব্যবধানেই গাড়ি নিয়ে বৃষ্টিদের বাড়িতে উপস্থিত হয় আকাশ। ততক্ষণে রূপাকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির প্রধান ফটকের সম্মুখে এসে দাঁড়িয়েছে বৃষ্টি। শীতের হিমেল পরশে দুজনের শরীরই ক্রমশ শীতল হয়ে আসছে।গাড়ি থেকে নেমেই তাদের দৃষ্টিগোচর হয় আকাশের। কিন্তু তার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হয় বৃষ্টির মুখশ্রীতে। অপলক নেত্রে চেয়ে থাকে । ক্ষণকাল ধরে চলে নীরব দৃষ্টিবিনিময়। একসময় গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়।

‎

‎এদিকে রূপা আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে পারে না। বাঁধনের কাছে ফেরার আকুলতায় ছুটে গিয়ে গাড়িতে উঠতে উদ্যত হয়৷ সহসাই বাধা দেয় আকাশ।

‎

‎” স্টপ। গাড়িতে উঠবি না? “

‎

‎আকাশের বাধায় ভ্রুকুটি করে রূপা।

‎

‎” কেন? “

‎

‎আকাশের মুখে ফুটে ওঠে গাম্ভীর্যের আভাস। ঠোঁটের কোণে খেলে যায় দুষ্টুমির হাসি। ভাবগম্ভীর ভঙ্গিতে বলে,

‎

‎” এত রাতে শীতের মধ্যে এত কষ্ট করে এলাম। এখন কি আমি কিছু না নিয়েই চলে যাব? “

‎

‎আকাশের অদ্ভুত আবদারে রূপা ও বৃষ্টি দুজনেরই ভ্রু কুঁচকে আসে। পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে আবার আকাশের দিকে দৃষ্টি ফেরায় রূপা।

‎

‎” কী চাও তুমি? “

‎

‎আকাশ আড়চোখে বৃষ্টির দিকে তাকায়। ক্ষণিকের সেই দৃষ্টিতে লুকিয়ে থাকে দুরন্ত দুষ্টুমি। তারপর ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলে,

‎

‎” বেশি কিছু না। শুধু তোর বান্ধবীকে বল। আমার গালে একটা চুমু দিয়ে ধন্যবাদ জানাতে। “

‎

চলবে…!

🌸 যাদের গল্প ভালো লাগবে না, তারা দয়া করে স্কিপ করে যাবেন। গল্পটি ভালো না লাগতেই পারে, সবার পছন্দ একরকম নয়। তবে অনুরোধ রইল, গল্প নিয়ে উল্টাপাল্টা বা অসম্মানজনক মন্তব্য করবেন না। গঠনমূলক সমালোচনা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য। আশা করি, সবাই বিষয়টি বুঝবেন এবং সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখবেন। ধন্যবাদ সবাইকে। ❤️🙏

‎

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply