Golpo romantic golpo Uncategorized বাঁধন রূপের অধিকারী

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৫৪(প্রথম অংশ+)


#বাঁধন_রূপের_অধিকারী ||৫৪||

#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী ||প্রথম অংশ||

‎নামাজ শেষে ধীর পায়ে রুমের দিকে এগিয়ে যায় বাঁধন। বুকের ভেতর অস্থিরতা। মনে জুড়ে হাজারো দুশ্চিন্তা। কোনোমতে নিজেকে সামলে দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়। ভেতরে চোখ পড়তেই থমকে যায়। বিছানায় শুয়ে এখনো যন্ত্রণায় ছটফট করছে রূপা। তলপেট চেপে ধরে কাঁদছে অবিরাম।

‎

‎দৃশ্যটা দেখেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে বাঁধনের। ভেতরে যাওয়ার সাহসটুকু যেন হারিয়ে ফেলে। কীভাবে যাবে? কীভাবে নিজের চোখের সামনে রূপাকে এভাবে কষ্ট পেতে দেখবে? ওর কান্না শুনলেই যে নিজের চোখের জল আটকে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। সেখানে কাছে গেলে হয়তো নিজেও হাউমাউ করে কেঁদে উঠবে। নিজেকে সামলাতে পারবে না। সমস্ত শক্তি হারিয়ে অসহায়ের মতো ভেঙে পড়বে রূপার সামনেই।

‎

‎না। এখন ভেতরে যাওয়া যাবে না।দ্রুত পায়ে সেখান থেকে সরে আসে বাঁধন। সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে যায়। চারদিকে ঘন অন্ধকার। রাতের নিস্তব্ধতা যেন আরও ভারী হয়ে চেপে বসেছে তার বুকে। ছাদের একপাশে গিয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে পড়ে। হাঁটু দুটো ভাঁজ করে বুকের কাছে টেনে নেয়। তারপর আর কান্না আটকে রাখতে পারে না। মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।

‎

‎হঠাৎ মনে পড়ে যায় মায়ের কথা।শৈশবের স্মৃতিতে যতটুকু মনে আছে। সেও একদিন নিজের মাকে এভাবেই তলপেট চেপে ধরে যন্ত্রণায় কাঁদতে দেখেছিল। মায়ের সেই অসহায় মুখখানি আজও কোথাও যেন মনের গভীরে রয়ে গেছে। সেদিন তার বাবা আহসান রহমান নামাজ পড়ছিলেন। ছোট্ট বাঁধন নিজের চোখে সবকিছু দেখেছিল। মায়ের কষ্ট। বাবার নামাজ। সেই সময়ের প্রতিটি দৃশ্য তার স্মৃতিতে অল্প অল্প করে জমে ছিল।

‎

‎সেদিন সে বুঝতে পারেনি সেই দৃশ্যের গভীরতা। বুঝতে পারেনি মায়ের যন্ত্রণা দেখে বাবার বুকেও হয়তো ঝড় উঠেছিল। আজ বড় হয়ে নিজের জীবনে সেই একই দৃশ্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাঁধন যেন নতুন করে সবকিছু অনুভব করছে।সেদিন তার মা যন্ত্রণায় কেঁদেছিলেন। আর আজ কাঁদছে তার স্ত্রী।সেদিন বাবা নামাজে দাঁড়িয়েছিলেন। আর আজ বাঁধনও জায়নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে হাত তুলেছে। নিজের সমস্ত আকুলতা দিয়ে প্রার্থনা করেছে। তবু রূপার কষ্ট কমাতে পারছে না সে। ভালোবাসার মানুষটাকে চোখের সামনে এভাবে ছটফট করতে দেখা যে কতটা অসহায় করে দেয়। তা আজ নিজের বুক দিয়েই বুঝতে পারছে।

‎

‎হাঁটুর ওপর মাথা রেখে আবারও কেঁদে ওঠে বাঁধন। চোখের জল গড়িয়ে পড়ে মাটিতে। বুকের ভেতরটা কেমন শূন্য হয়ে আসে। মনে হয় নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে যদি রূপার কষ্টটুকু সরিয়ে নেওয়া যেত। তাহলে এক মুহূর্তও দেরি করত না সে।

‎

‎ইশ। যদি জাদু জানত৷ যার সাহায্যে মুহূর্তেই রূপার সমস্ত যন্ত্রণা নিজের শরীরে টেনে নিতে পারত। তাহলে নিজের বুক চিরে হলেও সেই কষ্টটুকু গ্রহণ করত। রূপাকে একটুও কষ্ট পেতে দিত না। ওর চোখে জল আসার আগেই সমস্ত যন্ত্রণা নিজের ভেতর আটকে নিত। রূপা নিশ্চিন্তে ঘুমাত। মুখে ফুটে থাকত প্রশান্তির হাসি। আর বাঁধন নীরবে সব সহ্য করে যেত।

‎

‎দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। বুকের ভেতর শুধু একটাই আকুতি। কীভাবে রূপার কষ্ট কমাবে? কী করলে ওর মুখে আবার হাসি ফিরবে?কিছুই তো করতে পারছে না সে। নিজের ভালোবাসার মানুষটার যন্ত্রণা নিজের শরীরে নেওয়ার ক্ষমতাটুকুও তার নেই। এই অসহায়ত্বই যেন তাকে ভেতর থেকে শেষ করে দিচ্ছে।

‎

‎কাঁদতে কাঁদতে একসময় সেখানেই ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে বাঁধন। অশ্রুসিক্ত চোখের পাতা কখন যে নিদ্রার ভারে বুজে আসে। তা সে নিজেও টের পায় না।রাত পেরিয়ে ভোরের আলো ফোটার ক্ষণে বাঁধনের অনুভব হয়। তার বুকে কেউ একজন শুয়ে আছে। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায় সে। নিজের বুকের দিকে দৃষ্টি পড়তেই ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। তার বুকে মাথা রেখে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে রূপা। দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে তার গলা। ছোট্ট শিশুর মতো স্বামীর বুকে মুখ গুঁজে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন মেয়েটি।

‎

‎ভ্রুযুগল কুঞ্চিত হয় বাঁধনের। মনে প্রশ্ন জাগে। মেয়েটা কখন ছাদে আসলো?পরক্ষণেই দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় রূপার মুখশ্রীতে। কী অপরূপ প্রশান্তিতে ঘুমাচ্ছে মেয়েটা। মুখজুড়ে লেগে আছে গভীর নিশ্চিন্ততার কোমল আভা। নিজের বুকের ওপর হার্টওয়াইফকে এভাবে নির্ভার হয়ে ঘুমাতে দেখে বাঁধনের অন্তরে নেমে আসে পাহাড়সম প্রশান্তি। বুকের ভেতর জমে থাকা অস্থিরতা যেন মুহূর্তেই স্তিমিত হয়ে আসে। বুঝতে পারে। কাল রাতে হয়তো তাকে খুঁজতে খুঁজতে ছাদে চলে আসে রূপা। তারপর এখানে তাকে পেয়ে আর কোথাও যায়নি। স্বামীর বুকে মাথা রেখে দুহাতে গলা জড়িয়ে ধরেই ঘুমিয়ে পড়েছে।

‎

‎বাঁধনের অধরে ফুটে ওঠে স্নিগ্ধ হাসি। পরম মমতায় দুহাতে বউটাকে নিজের বুকের সঙ্গে আরও নিবিড় করে জড়িয়ে নেয় ।তারপর ঝুঁকে পড়ে আলতো করে চুমু এঁকে দেয় তার কপালে।‎ আপনমনে বিড়বিড় করে।

‎

‎” আমার হার্টওয়াইফ। “

‎

‎

‎________

‎

‎ইশতিয়াক আর সীমার দিনগুলো মোটামুটি ভালোই কাটছে। অন্তত ওপর থেকে দেখলে তাই মনে হয়। কিন্তু সীমার অবস্থা নাজেহাল। ইশতিয়াকের পাগলামিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে মেয়েটা। সারাক্ষণ জ্বালিয়ে মারছে। একটু শান্তিতে থাকার উপায় নেই।শেষমেশ বাবাকে ফোন করে আসতে বলেছে সীমা। এই বাড়িতে আর এক মুহূর্তও নয়। যতটা সম্ভব ইশতিয়াকের কাছ থেকে দূরে থাকবে।

‎

‎সকাল সকাল তৈরি হয়ে নিচে নামে ইশতিয়াক। আজ তার চাকরির ইন্টারভিউ। মনে মনে প্রস্তুতি নিয়েই সিঁড়ি বেয়ে নিচে আসে।নিচে নেমে থমকে যায়। তার মামা এসেছেন। সবার সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলছেন। পাশেই বসে আছে সীমা। ইশতিয়াককে দেখতেই বিলকিস বানু হাতের ইশারায় ডাকেন। মায়ের ডাক উপেক্ষা করার সাধ্য নেই। সঙ্গে সঙ্গেই এগিয়ে এসে তাঁর সামনে দাঁড়ায়। বিলকিস বানু প্রশ্ন করেন।

‎

‎” কোথায় যাচ্ছিস? “

‎

‎ইশতিয়াক জবাব দেয়।

‎

‎” একটু কাজ আছে। “

‎

‎বিলকিস বানু গম্ভীর স্বরে বলেন।

‎

‎” বস। কথা আছে। “

‎

‎নীরবে সোফায় বসে পড়ে ইশতিয়াক। বিলকিস বানু সীমার প্রসঙ্গ টেনে বলেন।

‎

‎” সীমা তোর সঙ্গে থাকতে চায় না। ও ডিভোর্স চায়?। “

‎

‎কথাটা শুনে মুহূর্তেই থমকে যায় ইশতিয়াক। ধীর ভঙ্গিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় সীমার দিকে। মাথা অবনত করে বসে আছে মেয়েটা। ইশতিয়াক ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি টেনে শান্ত কণ্ঠে বলে।

‎

‎” আমি কখন বলেছি যে ওকে ডিভোর্স দেব? “

‎

‎বিলকিস বানু ছেলের দিকে তাকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করেন।

‎

‎” তুই ডিভোর্স দিবি না। বেশ। কিন্তু ও তোকে ডিভোর্স দেবে? “

‎

‎

‎” অসম্ভব। আমার দেহে প্রাণ থাকতে না ও আমাকে ডিভোর্স দিতে পারবে৷ আর না আমি ওকে ডিভোর্স দিব৷ বিয়ে যখন হয়েছে তখন আমার সঙ্গে ওকে সংসার করতেই হবে। আমাকে ভালো লাগুক কিংবা না লাগুক। আমার সঙ্গেই ওর সংসার করতে হবে। “

‎

‎কথাটা কানে যেতেই ঝট করে মুখ তুলে তাকায় সীমা। ইশতিয়াকের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে।

‎

‎” থাকব না আমি আপনার সঙ্গে৷ আপনি একটা বেকার। কোনো কাজকর্ম করেন না। দিনরাত ঘুরে বেড়িয়ে বাবার হোটেলে খান। কী যোগ্যতা আছে আপনার? যে আপনার সঙ্গেই আমাকে সংসার করতে হবে? আর যা-ই হোক। এমন মাস্তান ছেলের সঙ্গে আমি কিছুতেই সংসার করব না৷ “

‎

‎সীমার একের পর এক তির্যক বাক্যেও ইশতিয়াকের মুখের প্রশান্তি ম্লান হয় না। মেয়েটার অভিযোগে বিরক্ত হওয়ার বদলে তার চোখেমুখে আরও কোমলতা ছড়িয়ে পড়ে। শান্ত দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে প্রশ্ন করে।

‎

‎” যদি চাকরি করি? তাহলে কি আমার সঙ্গে থাকবে? “

‎

‎

‎মুখ বাঁকিয়ে সীমা তাচ্ছিল্যের সুরে বলে।

‎

‎” চাকরি করে তো দেখান? “

‎

‎” ঠিক আছে। “

‎

‎সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়েই উঠে দাঁড়ায় ইশতিয়াক। সীমা এবারও নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থেকে বলে।

‎

‎” আমি বাবার সঙ্গে চলে যাব। আমার আর এখানে থাকতে ভালো লাগছে না। আপনার সঙ্গে থাকতে থাকতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। “

‎

‎ঘাড় সামান্য অবনত করে সীমার মুখের দিকে তাকায় ইশতিয়াক। গম্ভীর মুখাবয়বে বিরক্তি কিংবা অভিমানের কোনো ছাপ নেই। শান্ত কণ্ঠে বলে।

‎

‎” যাও। তবে মনে রেখো। আমি চাকরি নিয়েই ফিরব। ততদিন নিজের খেয়াল রেখো। এমন কিছু করে বসো না। যার জন্য আমাকে জানোয়ার হয়ে উঠতে হয়। “

‎

‎কথা শেষ করেই আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না ইশতিয়াক। দীর্ঘ পদক্ষেপে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। তার চলে যাওয়ার দিকে বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে থাকে ইসরাত। যেন ভাইয়ের এমন সিদ্ধান্ত এখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না। অবাক কণ্ঠে বলে।

‎

‎” ভাইয়া কি সত্যিই চাকরি করবে? নাকি আমি স্বপ্ন দেখছি? “

‎

‎সীমা ঠোঁট বাঁকিয়ে অবজ্ঞার সুরে বলে।

‎

‎” হুদাই। মুখের কথার তো অভাব নেই। চাকরি পাওয়া কি এতই সহজ? “

‎

‎ইসরাত বোনের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলে।

‎

‎” এমন করছিস কেন? পেতেও তো পারে। “

‎

‎সীমা নির্বিকার ভঙ্গিতে জবাব দেয়।

‎

‎” দেখা যাবে। “

‎

‎____________

‎

‎দুপুরের খরতপ্ত রোদে চাকরির ইন্টারভিউ শেষে অফিস থেকে বেরিয়ে আসে ইশতিয়াক। ইন্টারভিউ মোটামুটি ভালোই হয়েছে। তবে ফলাফল জানতে অপেক্ষা করতে হবে আগামীকাল পর্যন্ত। প্রচণ্ড গরমে তৃষ্ণায় বুকের ছাতি শুকিয়ে আসছে তার। পাশের দোকান থেকে এক বোতল ঠান্ডা পানি কিনে ঢকঢক করে পান করতে থাকে।

‎

‎পানির বোতলটা ঠোঁটে ঠেকানো অবস্থাতেই হঠাৎ দৃষ্টি আটকে যায় রাস্তার দিকে। মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে বছর চারেকের ছোট্ট একটি মেয়ে। পরম নিশ্চিন্তে আইসক্রিম খেতে ব্যস্ত সে। তার পেছনেই দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছে বিশাল এক বাস। চালক একের পর এক সজোরে হর্ন বাজিয়ে চলেছে। কিন্তু সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই শিশুটির। নিজের ছোট্ট জগতে মগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আইসক্রিম খাচ্ছে সে।

‎

‎দৃশ্যটা চোখে পড়তেই মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে যায় ইশতিয়াক। হাত থেকে পানির বোতলটা ছিটকে পড়ে যায় মাটিতে। পরক্ষণেই আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে প্রাণপণে ছুটে যায় । ছুটে গিয়ে শিশুটিকে টেনে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগটুকুও পায় না। এক ঝটকায় তাকে তুলে রাস্তার ওপাশে ছুড়ে মারে।

‎

‎কিন্তু শিশুটিকে বিপদমুক্ত করতে গিয়ে নিজের জীবনের কথাটুকু ভাবার অবকাশ পায় না ইশতিয়াক। নিজেকে রাস্তা থেকে সরিয়ে নেওয়ার আগেই মুহূর্তের মধ্যে তার ওপর দিয়ে চলে যায় বাসটা।নিমিষেই রক্তে রঞ্জিত হয়ে ওঠে রাজপথ। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। পথচারীরা ছুটে আসে দুর্ঘটনাস্থলে। মুহূর্তের মধ্যে সেখানে জমে যায় মানুষের ভিড়। আর রাস্তার বুকে নিথর হয়ে পড়ে থাকে ইশতিয়াক।

চলবে….!

এই পর্বে আরো ছিল বাট লেখার সময় পাইনি৷ আপাতত আজ এই টুকু পড়ো৷ কাল এই পর্বের শেষাংশ আসবে ইনশাআল্লাহ। 🤲

#বাঁধন_রূপের_অধিকারী

#লেখিকা_সুৃমি_চৌধুরী [৫৪][শেষাংশ]

‎বাবার সঙ্গে মার্কেটে এসেছে সীমা। সঙ্গে রয়েছে ইসরাতও। কেনাকাটা শেষ হলেই বাবার সঙ্গে বাড়ি ফিরে যাবে সীমা। কেনাকাটা সেরে রাস্তায় এসে দাঁড়াতেই একটু দূরে মানুষের জটলা চোখে পড়ে ইশরাতের। কৌতূহলী দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে সীমাকে প্রশ্ন করে।

‎

‎” ওখানে কিসের ভিড় রে? “

‎

‎সীমার দৃষ্টিও অনুসরণ করে সেদিকে। ভ্রু কুঁচকে আসে । দূর থেকে কিছুই বুঝতে পারে না। কৌতূহল দমাতে না পেরে ইসরাত এগিয়ে গিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করে।

‎

‎” আঙ্কেল। ওখানে কী হয়েছে? এত মানুষ জড়ো হয়েছে কেন? “

‎

‎লোকটি সেদিকে একবার তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে।

‎

‎” দুর্ঘটনা হয়েছে মা। একটা বাচ্চাকে বাঁচাতে গিয়ে বাসের নিচে পড়ে গেছে একটা ছেলে। আজকাল এমন ভালো মানুষ কয়জন আছে বলো তো? নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে আরেকজনকে বাঁচাতে ছুটে যায়, এমন মানুষ কি আর সহজে দেখা যায়? “

‎

‎কথাগুলো শুনে স্তব্ধ হয়ে যায় সীমা। অচেনা মানুষের এমন আত্মত্যাগের কথা তার মনে গভীর কৌতূহল জাগায়। অন্যের প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন করেছে মানুষটা৷ পৃথিবীতে এমন নিঃস্বার্থ মানুষও যে থাকতে পারে, তা যেন সীমার কল্পনারও বাইরে ছিল। মনের মধ্যে অজানা টান অনুভব করে । ইসরাতের হাত ধরে বলে।

‎

‎” চল। একটু দেখে আসি।”

‎

‎সীমা আর ইসরাত ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসে দুর্ঘটনাস্থলের দিকে। মানুষের ধাক্কাধাক্কি সামলে আহত মানুষটার কাছাকাছি পৌঁছাতে বেশ বেগ পেতে হয় তাদের। অবশেষে সামনে পৌঁছে যেতেই রক্তাক্ত মানুষটার মুখের দিকে তাকায় ইসরাত। পরমুহূর্তেই যেন তার বুকের ভেতরটা চিরে বেরিয়ে আসে হৃদয়বিদারক আর্তনাদ। সমস্ত শক্তি এক করে চিৎকার করে ওঠে।

‎

‎” ভাইইইইইইয়া।”

‎

‎ইসরাতের আর্তচিৎকারে যেন চারপাশের কোলাহলও মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। সীমাও দৃষ্টি মেলে তাকায় রক্তাক্ত মানুষটার মুখের দিকে। নিমিষে তার পায়ের তলার মাটি যেন সরে যায়। রাস্তায় নিথর পড়ে আছে ইশতিয়াক। যার সঙ্গে আজ সকালেও তর্ক করেছে । যাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথার আঘাতে বিদ্ধ করেছে। সেই মানুষটাই রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পরে আছে৷ মুহূর্তের জন্য সমস্ত উপলব্ধি যেন থমকে যায় সীমার। মনে হয়। এ নিশ্চয়ই কোনো দুঃস্বপ্ন। চোখের সামনে যা দেখছে, তা বাস্তব হতে পারে না। কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। এ মানুষটা ইশতিয়াক নয়। কিছুতেই নয়।

‎

‎কিন্তু সীমার সেই অবিশ্বাসের দেয়াল ভেঙে চুরমার করে দিয়ে ইসরাত ঝাঁপিয়ে পড়ে ইশতিয়াকের নিথর দেহের ওপর। ভাইকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো চিৎকার করে কেঁদে উঠে। কাঁপতে থাকা কণ্ঠে বারবার ডাকতে থাকে ভাইয়াকে। যেন তার সেই আকুল ডাকেই ফিরে আসবে ভাইয়ের প্রাণ।

‎

‎

‎ধীরে ধীরে বাস্তবতার নির্মম আঘাতে চেতনা ফিরে পায় সীমা। ইশতিয়াকের রক্তাক্ত দেহ বুকে জড়িয়ে ধরে ইসরাতের আহাজারি দেখে মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে । ধপাস করে বসে পড়ে রাজপথের বুকে। সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপতে থাকে। শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়ে হিমশীতল অনুভূতি। মনে হয় যেন দেহের প্রতিটি শিরা-উপশিরা থেকে প্রাণশক্তি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। তবুও ধীরে ধীরে নিজেকে টেনে নিয়ে এগিয়ে আসে ইশতিয়াকের দিকে। প্রতিটি পদক্ষেপে কেঁপে ওঠে তার অবশ শরীর। বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যায়। অবশেষে ইশতিয়াকের মায়াবী মুখখানা চোখে পড়তেই আর নিজেকে সামলে রাখতে পারে না । ঝট করে ইসরাতের কাছ থেকে ইশতিয়াককে নিজের বুকে টেনে নেয়। কাঁপতে থাকা দুহাতে পুরুষটার মাথা নিজের কোলে তুলে পরম মমতায় আগলে ধরে। রক্তমাখা মুখের দিকে তাকিয়ে ভেঙে পড়ে সীমার সমস্ত অভিমান। আর্তি কণ্ঠে বলতে শুরু করে।

‎

‎” আপনি আসলেই একটা বেইমান পুরুষ। চাকরির কথা বলে আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন। আপনি কি আর কখনো ভালো হবেন না। আর কত কাঁদাবেন আমাকে। আর কত কষ্ট দেবেন। এবার অন্তত আমাকে ভালোবাসুন। এবার অন্তত আমার হয়ে যান। কেন বারবার আমাকে ছেড়ে চলে যেতে চান। “

‎

‎সীমার আকুল আহ্বানে সাড়া দেয় না পুরুষটা। নিথর হয়ে পড়ে থাকে তার বুকের ওপর। ইশতিয়াকের নিস্তব্ধতা সীমার বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে দেয়। কাঁপতে থাকা হাতখানা পুরুষটার গালে রেখে মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা মানুষের মতো হাঁপাতে হাঁপাতে বলে।

‎

‎” কথা বলছেন না কেন। কী হয়েছে আপনার। আমার দিকে তাকান। একবার শুধু আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলুন। আমি ডাকছি তো আপনাকে। শুনতে পাচ্ছেন না আমার কথা। দেখুন। এবারও যদি কথা না বলেন তাহলে কিন্তু সত্যি সত্যি চলে যাব। আর কখনো আপনার কাছে ফিরে আসব না। “

‎

‎

‎তবুও কোনো সাড়া মেলে না পুরুষটার। আগের মতোই নিথর হয়ে পড়ে থাকে । সীমার কাতর আহ্বান যেন তার কান পর্যন্ত পৌঁছায় না। আর নিজেকে সামলে রাখতে পারে না সীমা। ইশতিয়াকের শরীরটা দুহাতে ঝাঁকিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে।

‎

‎”এই যে। কথা বলছেন না কেন। আমার সঙ্গে কথা বলেন। শুনতে পাচ্ছেন না আমি কী বলছি। আপনাকে ডাকছি তো। একবার আমার দিকে তাকান। প্লিজ। এভাবে চুপ করে থাকবেন না। “

‎

‎সীমার বুকফাটা কান্নায় প্রতিধ্বনিত হয়ে ওঠে রাজপথ। পুরুষটাকে বুকে আঁকড়ে ধরে পাগলের মতো বিলাপ করতে থাকে। তবুও ইশতিয়াকের কাছ থেকে সামান্যতম সাড়াও মেলে না। এভাবেই কেটে যায় কয়েকটি মুহূর্ত। এরই মধ্যে ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায় অ্যাম্বুলেন্স।

‎

‎

‎দ্রুত স্ট্রেচার বের করে কয়েকজন নার্স সীমার কাছ থেকে প্রায় জোর করেই ইশতিয়াককে সরিয়ে নেয়। মুহূর্তের মধ্যেই রক্তাক্ত দেহটা স্ট্রেচারে তুলে ছুটে চলে তারা। ইসরাতও দেরি করে না। সীমাকে ধরে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে তুলে নেয়। ঝড়ের গতিতে অ্যাম্বুলেন্স ছুটে চলে হাসপাতালের পথে।

‎

‎ইতিমধ্যে ছেলের দুর্ঘটনার খবর পৌঁছে গেছে ইশতিয়াকের বাবা-মায়ের কাছে। সংবাদটা শোনামাত্রই দিশেহারা হয়ে পড়েন তাঁরা। বুকের ভেতরটা কাঁপিয়ে দেওয়া আতঙ্ক নিয়ে পাগলপ্রায় হয়ে ছুটে আসেন হাসপাতালে।সেখানে পৌঁছেই জানতে পারেন ইশতিয়াককে জরুরি অস্ত্রোপচারের জন্য অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ক্ষণিকেই ভেঙে চুরমার হয়ে যায় পুরো পরিবার। কারও মুখে কথা নেই। সবার চোখেমুখে ছেলেকে হারিয়ে ফেলার ভয়।

‎

‎এদিকে সীমার অবস্থা ক্রমেই শোচনীয় হয়ে ওঠে। নিজেকে সামলে রাখার সমস্ত শক্তি যেন হারিয়ে ফেলেছে মেয়েটা। ইশতিয়াককে চোখের আড়াল হতেই পাগলের মতো ছটফট করতে থাকে। বারবার অপারেশন থিয়েটারের দিকে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করে। কেউ তাকে থামাতে গেলেই হাত-পা ছুড়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে। কোনোভাবেই তাকে সামলাতে পারে না ইসরাত কিংবা পরিবারের অন্য কেউ।

‎

‎” আমাকে ছাড়ুন। আমি ওনার কাছে যাব। আমাকে যেতে দিন। আমার ইশতিয়াকের কাছে যাব আমি। “

‎

‎সীমার আর্তচিৎকারে কেঁপে ওঠে হাসপাতালের পরিবেশ। বাঘিনীর মতো গর্জে ওঠছে মেয়েটা। তার বুকফাটা চিৎকারে যেন হাসপাতালের মানুষের কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হয়। বারবার অপারেশন থিয়েটারের দিকে ছুটে যেতে চাচ্ছে। যেন একবার ইশতিয়াকের কাছে পৌঁছাতে পারলেই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। যেন তার হাতটা একবার ছুঁতে পারলেই ফিরিয়ে আনতে পারবে নিজের মানুষটাকে।কিন্তু কেউ তাকে যেতে দেয় না। সবাই মিলে আঁকড়ে ধরে রাখে । আর অসহায়ভাবে ছটফট করতে থাকে সে। প্রিয় মানুষটার জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে মেয়েটার সমস্ত পৃথিবী যেন পলকে অন্ধকার হয়ে আসে।

‎

‎

‎একটানা পাগলের মতো ছটফট করতে করতে একসময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলে সীমা। নিস্তেজ হয়ে ঢলে পড়ে মেয়েটা। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালের একটি কেবিনে। ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয় তাকে। নইলে জ্ঞান ফিরলেই আবার ইশতিয়াকের কাছে যাওয়ার জন্য উন্মাদের মতো ছটফট করবে।

‎

‎এভাবেই রাত পেরিয়ে ভোর হয়। ভোরের আলো গড়িয়ে সকাল নামে। অথচ কারও পেটে একদানা খাবারও পড়ে না। কেউ বেঞ্চে বসে আছে। কেউবা হাসপাতালের মেঝেতে নিশ্চুপ হয়ে ঠাঁই নিয়ে পড়ে আছে। দুশ্চিন্তা আর নির্ঘুম রাতের ক্লান্তিতে সবার মুখ শুকিয়ে কাঠ। কারও মুখে কোনো কথা নেই। নেই হাসির সামান্য রেখাটুকুও। চারপাশজুড়ে কেবল নিস্তব্ধতা আর গভীর শোকের ছায়া। যেন এক অজানা আশঙ্কা গ্রাস করে রেখেছে পুরো পরিবারকে।

‎

‎অবশেষে সকাল আটটার দিকে ইশতিয়াকের পরিবারের সামনে এসে দাঁড়ান ডাক্তার। তাঁর মুখাবয়বে স্পষ্ট চিন্তার ছাপ। দেখেই বোঝা যায়। রোগীকে সামলাতে গিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে তাঁকেও প্রচণ্ড চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

‎ডাক্তারকে দেখামাত্রই অস্থির পায়ে তাঁর দিকে এগিয়ে আসেন বিলকিস বানু। উৎকণ্ঠায় তাঁর বুক কাঁপছে। কাতর কণ্ঠে ছেলের খবর জানতে চান তিনি।

‎

‎” ডাক্তার। আমার ছেলে কেমন আছে। ওর কিছু হয়নি তো। আমার ছেলেটা এখন কেমন আছে বলুন?। “

‎

‎বিলকিস বানুর উদ্বিগ্ন মুখের দিকে তাকিয়ে ডাক্তার ধীরে ধীরে চোখ থেকে চশমাটা খুলে নেন। মাথা সামান্য নিচু করে গম্ভীর কণ্ঠে বলেন।

‎

‎” রোগীর শারীরিক অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল। তবে একটা সমস্যা রয়েছে। “

‎

‎কথাটা শুনেই বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে বিলকিস বানুর। অজানা আশঙ্কায় কণ্ঠ কেঁপে ওঠে তাঁর।

‎

‎” সমস্যা। কী সমস্যা ডাক্তার। আমার ছেলের কী হয়েছে?। “

‎

‎ডাক্তার একটু থেমে গভীর কণ্ঠে বলেন।

‎

‎” রোগী কোমায় চলে গেছেন। “

‎

‎তৎক্ষণাৎ পেছন থেকে ভেসে আসে নারীকণ্ঠ।

‎

‎” ওনার প্রাণটা আছে তো?। “

‎

‎নারীকণ্ঠ শুনে উপস্থিত সবাই একযোগে পেছন ফিরে তাকায়। সামনে দাঁড়িয়ে আছে সীমা। এলোমেলো চুল। বিবর্ণ মুখখানা শুকিয়ে কাঠ। চোখ দুটো কান্নায় ফুলে উঠেছে। চেহারাজুড়ে ক্লান্তি আর বিষণ্নতার গভীর ছাপ। দেখেই বোঝা যায়। কতটা দুঃসহ সময় পেরিয়ে এসেছে মেয়েটা।

‎

‎ধীর পায়ে ডাক্তারের দিকে এগিয়ে আসে সীমা। চোখেমুখে একরাশ উৎকণ্ঠা। কাঁপা কণ্ঠে আবারও জানতে চায় সেই একটি কথাই।

‎

‎” ওনার প্রাণটা আছে তো। বলুন না ডাক্তার। আমার ইশতিয়াকের প্রাণটা আছে তো?। “

‎

‎সীমার ব্যাকুলতা দেখে ডাক্তার সম্মতিসূচক মাথা নাড়েন। মুহূর্তেই মেয়েটার মুখে ফুটে ওঠে এক টুকরো হাসি। যেন বুকের ওপর চেপে বসে থাকা পাহাড়সম ভারটা নিমেষে সরে গেছে। দুহাত তুলে পরম করুণাময়ের দরবারে কৃতজ্ঞতা জানায়।

‎

‎” আল্লাহর কাছে লাখো কোটি শুকরিয়া। আমার আর কিছু চাই না। আর কিছু লাগবে না আমার। শুধু ওর প্রাণটা যেন থাকে। ও আমার পাশে থাকুক। এইটুকুই যথেষ্ট। ও কোমায় থাকুক। হাঁটতে না পারুক। সারাজীবন বিছানায় পড়ে থাকুক। তবুও আমার কোনো অভিযোগ থাকবে না। “

‎

‎কথাগুলো বলতে বলতে সীমার চোখ দুটো আবারও অশ্রুতে ভরে ওঠে। ঠোঁটের কোণে হাসিটুকু থাকলেও কণ্ঠে কেমন গভীর আবেগের কাঁপন।

‎

‎” জানেন ডাক্তার। ওর এই শরীরটা আমার কাছে বড় কথা নয়। ও সুস্থ হয়ে হাঁটতে পারল কি না। নিজের হাতে আমাকে ছুঁতে পারল কি না। সেসব নিয়েও আমার কোনো চাওয়া নেই। আমার শান্তি তো ওর শরীরের মধ্যে নেই। আমার সমস্ত সুখ। আমার সমস্ত শান্তি লুকিয়ে আছে ওর বুকের ভেতর থাকা ওই ছোট্ট প্রাণটায়। ওই প্রাণটা আছে বলেই আমার পৃথিবীটা আছে। ওই প্রাণটা বেঁচে আছে বলেই আমার বেঁচে থাকার এতটুকু অর্থ আছে। ওর নিঃশ্বাস চলুক। ওর হৃদয়টা স্পন্দিত হোক। ও আমার পাশে থাকুক। আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলতে না পারলেও ক্ষতি নেই। শুধু আমি যেন জানি। এই পৃথিবীর কোথাও আমার ইশতিয়াক বেঁচে আছে। আমার ভালোবাসার মানুষটা এখনও এই পৃথিবীর আলো-বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। আমার আর কিছুই চাই না। আল্লাহর কাছে এর চেয়ে বেশি কিছু চাওয়ার নেই আমার। “

‎

‎কথাগুলো শেষ করে একের পর এক স্বস্তির শ্বাস ছাড়ে মেয়েটি। তারপর ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট শিশুর মতো আবদার করে বলে,

‎

‎”আমাকে একটু ওর কাছে যেতে দেবেন। শুধু একবার ওকে দেখব। বিশ্বাস করুন। ওই ভেতরে থাকা পুরুষটাকে একনজর দেখার জন্য আমার বুকটা খাঁ খাঁ করছে। আমি ভীষণ তৃষ্ণার্ত। বড় বেশি তৃষ্ণার্ত। আমাকে একবার ওকে দেখতে দিন না। অন্তত একনজর। এই বুকের ভেতর জমে থাকা তৃষ্ণাটুকু একটু মেটাতে দিন। ওই মানুষটা ছাড়া পৃথিবীর আর কারও সাধ্য নেই আমার এই তৃষ্ণা মেটানোর। একটু যেতে দিন না ওর কাছে। শুধু একবার ওকে দেখতে দিন।”

‎

‎

‎সীমার আকুলতা দেখে ডাক্তার নিজেও যেন ভেতর থেকে ভেঙে পড়েন। মেয়েটার চোখেমুখে ফুটে থাকা ব্যাকুলতা তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শান্ত কণ্ঠে বলেন।

‎

‎” ঠিক আছে। তবে শুধু আপনিই যেতে পারবেন। আর বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। রোগী এখনো শারীরিকভাবে গুরুতর আহত। তাই এই মুহূর্তে তাঁর খুব কাছাকাছি কারও অবস্থান করা ঠিক হবে না। “

‎

‎ডাক্তারের অনুমতি পেয়ে সীমা আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করে না।কেবিনে প্রবেশ করে। বেডের ওপর সোজা হয়ে শুয়ে আছে ইশতিয়াক। সারা শরীর ব্যান্ডেজে মোড়ানো। বাঁ হাতে গেঁথে রয়েছে স্যালাইনের সুই। শরীরের কোথাও সামান্য নড়াচড়াও নেই। বুকের ওঠানামা এতটাই ক্ষীণ যে নিঃশ্বাস চলছে কি না, তা-ও যেন বোঝা দায়।

‎

‎ধীর পায়ে বেডের পাশে গিয়ে বসে সীমা। কয়েক মুহূর্ত অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে পুরুষটার মুখপানে। কত কথা জমে আছে বুকের গভীরে। কত অভিমান। কত অনুশোচনা। কত না বলা ভালোবাসা। সবকিছু উজাড় করে দিতে ইচ্ছে করে তার। কিন্তু ঠোঁট খুলেও যেন কথাগুলো গুছিয়ে বলতে পারে না মেয়েটা। অবশেষে বুকের ভেতর জমে থাকা অনুশোচনা নিয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে বলতে শুরু করে,

‎

‎” আই অ্যাম সরি। আই রিয়েলি সরি। কাল আপনার সঙ্গে ওমন ব্যবহার করার জন্য আমি ভীষণ দুঃখিত। বিশ্বাস করুন। আমি আপনাকে ভালোবাসি। ভীষণ ভালোবাসি। ঠিক ততটাই ভালোবাসি। যতটা ভালোবাসলে কোনো মানুষকে চাইলেও কখনো ভুলে থাকা যায় না। আমি তো আপনাকে কখনোই ছেড়ে যেতাম না। কোনো দিনও না। “

‎

‎কথাগুলো বলতে বলতে সীমার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। তবুও নিজের মনের কথাগুলো ইশতিয়াকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করে ।

‎

‎” আমি শুধু চেয়েছিলাম আপনি একটা চাকরি করুন। নিজের পায়ে দাঁড়ান। নিজের একটা পরিচয় গড়ে তুলুন। ব্যস। এইটুকুই তো চেয়েছিলাম আমি। এর বেশি কিছু না। আপনার কাছে আমার আর কোনো চাওয়া ছিল না। আমি শুধু চেয়েছিলাম আপনি নিজের যোগ্যতায় মাথা উঁচু করে বাঁচুন। বিশ্বাস করুন। আপনাকে ছোট করা কিংবা আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া আমার উদ্দেশ্য ছিল না। আপনি আমাকে অবহেলা করেছেন। আমার ভালোবাসাকে তুচ্ছ করেছেন। তবুও এর জন্য আপনার প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। জানেন কেন? মানুষ যাকে সত্যিকারের ভালোবাসে। সেই প্রিয় মানুষটার সামান্য অবহেলাও একসময় তুচ্ছ মনে হয়। তার একটু ভালোবাসা। একটুখানি ভরসা। সমস্ত অভিমানকে বৃষ্টির জলের মতো ধুয়েমুছে নিয়ে যায়। আমার বেলায়ও ঠিক তাই হয়েছে। আপনার প্রতি আমার আর কোনো অভিমান নেই। বিশ্বাস করুন। একটুও নেই। “

‎

‎কথাগুলো বলে একটু থামে সীমা। তারপর ইশতিয়াকের হাতের ওপর নিজের হাতখানা আলতো করে ধরে রাখে। পরম মমতায় আঁকড়ে ধরে পুরুষটার নিথর হাত। চোখের দৃষ্টি স্থির হয়ে থাকে তার মুখের ওপর। অতঃপর আবেগমথিত কণ্ঠে বলে।

‎

‎” আর কখনো আপনার কাছ থেকে দূরে যাব না। এই যে আপনার হাতটা ধরেছি। সারাজীবন এভাবেই ধরে রাখব। সুখে থাকুন কিংবা দুঃখে। সুস্থ থাকুন কিংবা অসুস্থ। আপনার হাতটা আর ছেড়ে দেব না আমি। আপনিই আমার জীবনের প্রথম অধ্যায়। আপনিই আমার শেষ ঠিকানা। আমার শুরুটা আপনাকে দিয়ে। আমার শেষটাও আপনাতেই। “

‎

____________

‎কেটে যায় বেশ কিছুদিন। এরই মধ্যে শীত বেশ ভালোভাবেই জেঁকে বসেছে প্রকৃতির বুকে। সকাল হলেই ঘন কুয়াশার চাদরে ঢেকে যায় পৃথিবীর চারপাশ। দৃষ্টিসীমা ঝাপসা করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সাদা ধোঁয়াটে আবরণ। রাতভর জমে থাকা শিশিরবিন্দুতে ভিজে ওঠে সবুজ গাছপালা। ঘাসের ডগায় আর পাতার বুকে মুক্তোর মতো ঝুলে থাকে ছোট ছোট জলকণা। হিমেল বাতাসের শীতল পরশে কেঁপে ওঠে প্রকৃতি। রোদের দেখা মিললেও তার উত্তাপ যেন শীতের কাছে হার মেনে যায়। সব মিলিয়ে চারদিকে বিরাজ করে শীতের স্নিগ্ধ অথচ কনকনে আমেজ।বৃষ্টি আর আকাশের কাল গায়েহলুদ। তাই রহমান বাড়ির প্রতিটি মানুষ বিয়ের আয়োজন নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। কারও যেন এক মুহূর্তের অবসর নেই। বাড়িজুড়ে চলছে সাজসজ্জা আর প্রস্তুতির ধুম। সবার ব্যস্ততায় মুখর হয়ে আছে পুরো বাড়ি।

‎

‎বিকেলের দিকে রূপা এসে দাঁড়ায় নিজের ঘরের ব্যালকনিতে। সেখানে বসে ল্যাপটপে কিছু একটা করছে বাঁধন। তার চোখজোড়া গভীর মনোযোগে ডুবে আছে ল্যাপটপের পর্দায়। আর কাঁধের ওপর পিচ্চি মেয়ের মতো গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে ক্যান্ডি।ইদানীং ক্যান্ডির সঙ্গে বেশ ভাব জমেছে বাঁধনের। এমনকি রূপার চেয়েও এখন বাঁধনের কাছাকাছি থাকতে বেশি পছন্দ করে ছোট্ট ক্যান্ডি। বিষয়টা একদমই ভালো লাগে না রূপার। মনে মনে বেশ হিংসাও হয় তার। তাই মাঝেমধ্যে অভিমান করে ক্যান্ডিকে কোলেই নেয় না।কিন্তু ক্যান্ডিও কম জেদি নয়। রূপা কোলে না নিলেই ইচ্ছে করে তার গায়ের সঙ্গে আরও বেশি করে শরীর ঘষতে থাকে। কখনো ছোট্ট আঙুলে জিভ বুলিয়ে আদুরে ভঙ্গিতে ভালোবাসা জানায়। ক্যান্ডির এমন আদুরে স্বভাবের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানতেই হয় রূপাকে। মুহূর্তেই গলে যায় তার সমস্ত অভিমান। পরম মমতায় কোলে তুলে নেয় ছোট্ট ক্যান্ডিকে। তারপর আগের মতোই আদর-সোহাগে ভরিয়ে দেয় তাকে।

‎

‎

‎রূপা বাঁধনের সামনে এসে দাঁড়ায়। দুই হাতের আঙুল কচলাতে কচলাতে ইতস্তত ভঙ্গিতে বলে।

‎

‎” শুনছো?। “

‎

‎ল্যাপটপের পর্দা থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই বাঁধন উত্তর দেয়।

‎

‎” হুম হার্টওয়াইফ। বলো। শুনছি?। “

‎

‎রূপা একটু ইতস্তত করে প্রশ্ন করে।

‎

‎” কাল বৃষ্টির গায়েহলুদ, তাই না?। “

‎

‎ল্যাপটপের কিবোর্ডে অনবরত আঙুল চালাতে চালাতে বাঁধন সংক্ষিপ্ত স্বরে বলে।

‎

‎” তো?। “

‎

‎স্বামীর নির্লিপ্ত উত্তরে রূপা কিছুটা আমতা আমতা করে। আঙুলগুলো আরও শক্ত করে কচলাতে কচলাতে জড়ানো কণ্ঠে বলে।

‎

‎” ইয়ে। মানে আসলে… আমি দুদিন ওদের বাড়িতে থাকতে চাইছি?। “

‎

‎কথাটা কানে যেতেই ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে রূপার মুখপানে তাকায় বাঁধন। স্বামীর আকস্মিক দৃষ্টিতে চমকে ওঠে মেয়েটা। বাঁধনের মুখাবয়ব নিমিষে গম্ভীর হয়ে আসে। রূপার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে কঠিন কণ্ঠে বলে।

‎

‎” সম্ভব না। “

‎

‎রূপা অভিমানভরে ওষ্ঠ উল্টে ফেলে। ঠোঁট ফুলিয়ে প্রশ্ন করে।

‎

‎” কেন সম্ভব না?। “

‎

‎সহসা এক টানে রূপাকে নিজের কোলে বসিয়ে নেয় বাঁধন। দুহাতে তার কোমর জড়িয়ে নিজের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশিয়ে নেয় রমণীকে। স্বামীর আকস্মিক আচরণে শিরশির করে ওঠে রূপার সর্বাঙ্গ। কিছু বলার জন্য অধর মেলতেই তার মুখের একেবারে কাছে মুখ এনে উষ্ণ নিশ্বাস ফেলে বাঁধন। গভীর কণ্ঠে বলে।

‎

‎” হার্টওয়াইফ। এখানে ব্যাখ্যা দেওয়ার মতো কিছু নেই। আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না। “

‎

‎অকপট স্বীকারোক্তিতে কেঁপে ওঠে রূপার সমস্ত শরীর। স্বামীটা একটু কাছে টেনে নিলেই কেমন যেন অদ্ভুত শিহরণ বয়ে যায় তার সর্বাঙ্গে। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে অনুনয়ভরা কণ্ঠে বলে।

‎

‎” দুটো রাতই তো। প্লিজ। “

‎

‎বাঁধন রূপার নাকের ডগায় নিজের নাকখানা আলতো করে ছুঁইয়ে দেয়। দুজনের নিঃশ্বাস এসে মিশে যায় এক সুতোয়। রমণীর চোখের গভীরে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে অধর ভিজিয়ে নেশালো কন্ঠে বলে,

‎

‎” দুটো রাত কেন হার্টওয়াইফ। তোমাকে ছাড়া আমি যে এক মুহূর্তও থাকতে পারব না। রাতের বেলা তোমাকে বুকে জড়িয়ে না ধরলে আমার চোখে ঘুম নামে না। “

‎

‎রূপা অভিমানভরে গাল ফুলিয়ে বলে।

‎

‎” একদিন জড়িয়ে ধরে না ঘুমালে কী এমন হবে?। “

‎

‎বাঁধন ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি টেনে নিয়ে বলে।

‎

‎” আপনার স্বামী পাগল হয়ে যাবে। “

‎

‎” বেশি পাগলামি হচ্ছে। “

‎

‎” আরও করব। “

‎

‎” প্লিজ। “

‎

‎” নো। “

‎

‎” প্লিজ। “

‎

‎” নো। “

‎

‎” প্লিজ। প্লিজ। প্লিজ। “

‎

‎” নো। নো। নো। “

‎

‎ঝটপট করে বাঁধনের কোল থেকে নেমে পড়ে রূপা। রাগে আর অভিমানে ফুঁসতে ফুঁসতে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলে।

‎

‎” সবসময় শুধু নিজেরটাই বোঝো। আমার মনের কথাটা একটুও বোঝার চেষ্টা করো না। “

‎

‎কথাটা বলেই আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না রূপা। অভিমানভরা পায়ে বড় বড় পদক্ষেপে সেখান থেকে চলে যায়। সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মুচকি হাসে বাঁধন। দিন দিন তার বউটা যেন আরও বেশি অভিমানী হয়ে উঠছে। সামান্যতেই রাগ করে বসে। মুখ ফুলিয়ে দূরে সরে যায়। আর বউয়ের এই ছোট্ট ছোট্ট অভিমানগুলোই যেন বাঁধনের ভীষণ প্রিয়। রূপার এই অভিমানী রূপ দেখতে তার বেশ ভালোই লাগে।

‎

‎________________

‎

‎রাতের নিস্তব্ধতায় সোফায় চুপচাপ বসে আছে বাঁধন। আর গেস্টরুমের দরজা বন্ধ করে ভেতরে বসে অঝোরে কেঁদে চলেছে রূপা। বৃষ্টির বিয়ের দুদিন আগে বান্ধবীদের সঙ্গে তাদের বাড়িতে গিয়ে থাকার কত শখ ছিল তার। একসঙ্গে হাসি-আড্ডায় মেতে উঠবে। আনন্দে কাটাবে সময়টা। এই ইচ্ছেটা আজকের নয়। বহু আগে থেকেই মনের গভীরে লালন করে এসেছে স্বপ্নটা। কত আশা ছিল। কত আয়োজন করে রেখেছিল নিজের মনে। অথচ তার সেই ছোট্ট ইচ্ছেটুকুও পূরণ হতে দিচ্ছে না বাঁধন। কিছুতেই যেতে দিচ্ছে না তাকে।স্বামীর ওপর ভীষণ রাগ জমেছে রূপার।এবার আর সহজে অভিমান ভাঙাবে না। বাঁধন যতই ডাকুক। যতই কথা বলতে আসুক। তার মুখ থেকে একটি শব্দও বের হবে না। এবার সে কিছুতেই হার মানবে না।

‎

‎এদিকে গেস্টরুমের বন্ধ দরজার বাইরে থেকে একের পর এক ডেকে চলেছেন আহসান রহমান ও শিল্পী রহমান। অ্যান্সি, নিক্সি। সবাই পালা করে রূপাকে ডাকছে। কিন্তু কারও ডাকেই সাড়া দিচ্ছে না মেয়েটা। যেন বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ ছিন্ন করে বসে আছে সে। অভিমানে পাথর হয়ে গেছে তার মন।

‎

‎আর সবার মাঝখানে সোফায় নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে বাঁধন। মুখাবয়বে নেই কোনো অভিব্যক্তি। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই, তার ভেতরে কী তোলপাড় চলছে। শীতের রাতেও কপাল ঘামে ভিজে উঠেছে তার। স্থির দৃষ্টিতে বসে থাকা পুরুষটার নীরবতার আড়ালে কতটা অস্থিরতা জমে আছে, তা যেন তার মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই।

‎

‎আকাশ বাঁধনের সামনের সোফায় বসে ক্লান্ত ভঙ্গিতে বলে।

‎

‎” সামলা ভাই। আমি আর পারছি না। তোর বউটা তো পুরো বাড়ি মাথায় তুলে ফেলছে। “

‎

‎এবার অ্যান্সি এগিয়ে এসে বাঁধনের পাশে দাঁড়ায়। উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে।

‎

‎” তোদের মধ্যে কি কিছু হয়েছে? হঠাৎ রূপা এত রেগে গেল কেন? “

‎

‎কারও কোনো কথারই উত্তর দেয় না বাঁধন। নির্বাক হয়ে বসে থাকে সোফায়। যেন চারপাশে এত মানুষের উপস্থিতি সত্ত্বেও তার মন পড়ে আছে বন্ধ দরজার ওপাশে। গেস্টরুমের ভেতর কান্নারত মেয়েটার কাছে।

‎

‎এদিকে রূপাকে অনবরত ডাকতে ডাকতে আহসান রহমানের কাশি শুরু হয়ে যায়। নিক্সি তড়িঘড়ি করে পানি এনে দেয় তাঁকে। পানি পান করে ধীরে ধীরে সোফায় বসেন আহসান রহমান। তারপর বাঁধনের দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানতে চান।

‎

‎” কী হয়েছে রূপার? মেয়েটা এভাবে রেগে আছে কেন? তুই কিছু বলেছিস ওকে? “

‎

‎কথাটা কানে যেতেই হঠাৎ সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় বাঁধন। এতক্ষণ বুকের গভীরে চেপে রাখা অস্থিরতা যেন আর সামলে রাখতে পারে না। মুহূর্তেই তার ভেতরে জমে থাকা উন্মাদনা বিস্ফোরিত হয়। টেবিলের ওপর রাখা ফুলদানিটা তুলে সজোরে মেঝেতে আছড়ে মারে সে। বিকট শব্দে ভেঙে চুরমার হয়ে যায় ফুলদানিটা। আর সেই সঙ্গে বাঁধনের বুকের ভেতর জমে থাকা আর্তনাদও ফেটে বেরিয়ে আসে।

‎

‎” হ্যাঁ। বলেছি। কী করব আমি? বৃষ্টিদের বাড়িতে যেতে চায় ও। দুটো দিন ওখানে থাকতে চায়। আমি যেতে দেব না। দেব না আমি। “

‎

‎কথাগুলো বলতে বলতে বাঁধনের কণ্ঠ কেঁপে ওঠে। চোখেমুখে ফুটে ওঠে অস্থিরতা। দুহাতে নিজের চুল খামচে ধরে আবারও চিৎকার করে বলে।

‎

‎” তোমরা কেউ বুঝবে না আমার কষ্টটা। কেউ না। ওকে ছাড়া আমি কীভাবে থাকব? তোমরাই বলো। রাতে ওকে বুকে জড়িয়ে না ধরলে আমার ঘুম আসে না। সকালে ঘুম ভাঙতেই ওকে পাশে না দেখলে বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। আর আমি কিনা দুটো রাত ওকে ছাড়া কাটাব? হাউ ইজ দ্যাট পসিবল? আমি পারব না। আই জাস্ট কান্ট লিভ উইদাউট হার। “

‎

‎বাঁধনের আচরণে ফুটে উঠেছে উন্মাদ প্রেমিকের অসহায়ত্ব। ভালোবাসার মানুষটাকে হারানোর ভয় নয়। বরং কয়েকটা রাত তার কাছ থেকে দূরে থাকার কল্পনাটুকুও যেন সহ্য করতে পারছে না সে।

‎

‎” ও আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। আমার নিশ্বাসের সঙ্গে মিশে গেছে মেয়েটা। ওকে ছাড়া এই ঘরটা আমার কাছে ঘর মনে হয় না। এই বিছানায় শুয়েও আমার ঘুম আসবে না। চোখ বন্ধ করলেই মনে হবে, আমার হার্টওয়াইফটা কোথায়? কী করছে? আমাকে ছাড়া ঘুমাতে পারছে তো? ওরও কি আমার মতো কষ্ট হচ্ছে? “

‎

‎একটু থেমে বাঁধন বন্ধ দরজাটার দিকে তাকায়। চোখের দৃষ্টিতে জমে ওঠে গভীর আকুলতা। ভাঙা কণ্ঠে বলে।

‎

‎” আমি জানি, ওর ইচ্ছেটা খুব ছোট। ও বান্ধবীদের সঙ্গে আনন্দ করতে চায়। আমি ওর আনন্দ কেড়ে নিতে চাই না। কিন্তু কী করে বোঝাই ওকে? ওকে ছাড়া আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। ও আমার কাছে শুধু বউ না। ও আমার পুরো পৃথিবী। আমার বেঁচে থাকার কারণ। ওকে ছাড়া দুটো রাত কাটানো আমার কাছে দুটো যুগ কাটানোর মতো। আমি কী করে থাকব ওকে ছাড়া? বলো তোমরা। কী করে থাকব? “

‎

‎‎কথাগুলো শেষ করেই সজোরে মুষ্টিবদ্ধ হাত দিয়ে মেঝেতে ঘুষি মারে বাঁধন। নিমিষে ঘরের নিস্তব্ধতা চিরে প্রতিধ্বনিত হয় বিকট শব্দ। বুকের ভেতর জমে থাকা অসহনীয় যন্ত্রণা যেন আছড়ে পড়ে মেঝের বুকে। বাঁধনের উন্মাদ আচরণে তৎক্ষণাৎ ছুটে আসে আকাশ।তার হাতটা শক্ত করে ধরে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে।

‎

‎” বাঁধন। কী করছিস তুই? পাগল হয়ে গেছিস নাকি? “

‎

‎দাঁতে দাঁত চেপে ঠোঁট কামড়ে ধরে বাঁধন।বুকের মধ্যে জমে থাকা হাহাকার যেন কোনোভাবেই প্রশমিত হচ্ছে না। ভালোবাসার মানুষটাকে কাছে পেয়েও নিজের মনের কথাগুলো বোঝাতে না পারার যন্ত্রণা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে বিষণ্ন কণ্ঠে বলে।

‎

‎” কী করব আমি? বল না আকাশ। কী করব? যাকে নিজের চাইতেও বেশি ভালোবাসি। যাকে ছাড়া একটা মুহূর্তও কল্পনা করতে পারি না। সেই মানুষটাই আমার বুকের ভেতরকার দহন বুঝতে পারে না। আমার ভালোবাসার গভীরতা বুঝতে পারে না। আমি যে ওকে ছাড়া থাকতে পারি না, এই সামান্য কথাটাও ওর মাথায় ঢোকে না। এই যে বুকের ভেতরটা পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। এই দহন আমি সহ্য করব কেমনে? কেমনে সহ্য করব আমি? “

‎

‎মেঝেতে সজোরে ঘুষি মারার কারণে বাঁধনের হাতটা বেশ ফুলে উঠেছে। পরিস্থিতি দেখে আহসান রহমান তৎক্ষণাৎ শিল্পী রহমানকে বরফ আনতে বলেন। শিল্পী রহমান দ্রুত পায়ে ছুটে গিয়ে ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা বরফ নিয়ে আসেন। আকাশ আর দেরি না করে বরফের টুকরো বাঁধনের ফোলা হাতটায় আলতো করে চেপে ধরে সেঁক দিতে থাকে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই হাতটা আরও ফুলে ওঠে।

‎

‎তবুও নিজের হাতের যন্ত্রণার দিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই বাঁধনের। তার সমস্ত মনোযোগ পড়ে আছে বন্ধ দরজাটার ওপাশে। যেখানে অভিমান জমিয়ে বসে আছে তার হার্টওয়াইফ। হাতের ব্যথা তো সময়ের সঙ্গে একসময় কমে যাবে। কিন্তু বুকের ভেতর প্রিয় মানুষটার জন্য যে আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে, সেই আগুন নেভাবে কে?

‎

‎

‎চলবে…!

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply