Golpo romantic golpo বাঁধন রূপের অধিকারী

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৫১(প্রথম অংশ+শেষাংশ)


#বাঁধন_রূপের_অধিকারী ||৫১||

#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী ||প্রথম অংশ||

‎রাত আরও গাঢ় হয়ে এল। গাড়ির ড্রাইভিং সিটে পাথরের মতো গম্ভীর মুখে বসে গাড়ি চালিয়ে চলেছে বাঁধন। তার পাশেই সিটে বসে ক্লান্তিতে বারবার হাই তুলছে রূপা৷ ঘুমের আমেজে চোখের পাতা যেন জড়িয়ে আসছে তার। পেছনের সিটে চুপচাপ বসে আছে আকাশ। পুরো গাড়ির অন্দরে থমকে আছে ভারী নীরবতা।

‎

‎অবশেষে দীর্ঘ যাত্রা শেষে গাড়িটা এসে থামল রহমান বাড়ির ফটকের সামনে। গাড়ি থামতেই রূপা আর এক পলকও অপেক্ষা করল না৷ সোজা হেঁটে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। বাঁধন গাড়িটা পার্ক করে সবেমাত্র নেমে এল, অমনি আকাশ অধৈর্য গলায় প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,

‎

‎”তাহলে তো রূপা চলে এল৷ এবার কথা মতো তুই বৃষ্টির বিয়েটা ভেঙে দিবি তো?”

‎

‎আকাশের ভাবলেশহীন কথা শুনে বাঁধনের মেজাজ চড়ে গেল। ঝটকায় আকাশের মাথায় আলতো থাপ্পড় মেরে বাঁকা হাসিতে বললো,

‎

‎”কচু করেছিস তুই৷ বউকে মানাতে গিয়ে ক্ষমা আমাকে চাইতে হয়েছে, সবার সামনে কান ধরে উঠবস আমাকে করতে হয়েছে তাহলে তুই ঠিক কী করলি শুনি?”

‎

‎নিমিষে আকাশের মুখটা রাগে লাল হয়ে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে চরম ক্ষোভে বলল,

‎

‎”কী বললি, আমি কচু করেছি?”

‎

‎বাঁধন কপালে ভাঁজ ফেলে বেশ তাচ্ছিল্যের সুর টানল,

‎

‎”তা নয়তো কী?”

‎

‎”এত রাতে তোকে বৃষ্টিদের বাড়িতে নিয়ে গেলাম! রূপাকে ডেকে আনলাম! ওর সামনে হাত জোড় করে অনুরোধ করলাম! এত কিছু করার পরও তুই বলছিস আমি কিছু করি নাই?”

‎

‎বাঁধন ঠান্ডা গলায় মনে করিয়ে দিল,

‎

‎”আমাদের মধ্যে কথা কী হয়েছিল? কথা ছিল তুই রূপাকে রাজি করিয়ে নিয়ে আসবি। রূপা কি তোর কথায় ভিজেছিল? একেবারেই না! শেষ পর্যন্ত হাঁটু গেড়ে মাফটা তো আমাকেই চাইতে হলো।”

‎

‎আকাশ তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে উঠল,

‎

‎”মাফ চাইছিস তো কী হয়েছে? বউয়ের কাছেই তো মাফ চাইছিস, কোনো পরনারীর কাছে তো না! তাহলে এত ড্রামা করছিস কেন?”

‎

‎আকাশের যুক্তি ধুলোয় উড়িয়ে দিয়ে বাঁধন ধীরেসুস্থে একটা হাই তুলল। তারপর বেশ আলসে ভঙ্গিতে বলল,

‎

‎”আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। রাতদুপুরে তোর এই ফালতু বকবক শোনার মতো মুড আমার একদম নেই। চললাম, ঘুমাবো। গুড নাইট!”

‎

‎কথাটা বলেই বাঁধন বেশ ভাব নিয়ে লম্বা লম্বা পায়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে গেল।পেছনের চত্বরে দাঁড়িয়ে বিষম হতাশায় আকাশ চিৎকার করে উঠল,

‎

‎”শালা বেইমান একটা! আর জীবনেও তোর সাথে কথা বলবো না আমি।”

___________

‎

‎

‎রুমের ভেতরে পা রেখেই বাঁধন দেখে তার বউটা চুপচাপ বিছানায় শুয়ে আছে।দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো।কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে ফিরে এসে নিঃশব্দে বিছানায় শুয়ে রূপাকে জড়িয়ে ধরলো ।চেনা পুরুষালি স্পর্শ পেতেই রূপার শরীরের ভেতরটা মৃদু কেঁপে উঠলো। আলতো করে চোখ মেলে তাকালো।রূপাকে তাকাতে দেখে বাঁধন ভ্রু কুঁচকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো,

‎

‎”ঘুমাওনি এখনো?”

‎

‎ঘুমজড়ানো ভারি কণ্ঠে রূপা উত্তর দিল,

‎”চলে যাচ্ছি…”

‎

‎”কোথায়?”

‎

‎”ঘুমের দেশে।”

‎

‎বাঁধন একটু নড়েচড়ে উঠল। রূপাকে আরও শক্ত করে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো,

‎

‎”তোমাকে একটা কথা বলব।”

‎

‎ঘুমের ঘোরে বুঁদ হয়ে থাকা রূপা ঝিমিয়ে পড়া কণ্ঠে বললো,

‎”হুম…”

‎

‎”আর ইউ শিওর?”

‎

‎”শিওর।”

‎

‎বাঁধন ঠোঁট কামড়ে দুষ্টু হেসে ফেললো। রূপার কানের খুব কাছে মুখ এনে বিশেষ কথাটা ফিসফিস করে বলে দিল।কথাটা কানের ভেতর দিয়ে সোজা মস্তিষ্ক পৌঁছানো মাত্রই রূপার তন্দ্রা এক লহমায় উবে গেল৷ ঝটকায় তার চোখ দুটো রসগোল্লার মতো বড় হয়ে গেল। মাটির তল থেকে কেউ যেন এক টানে তুলে নিয়েছে এমনভাবে এক ঝটকায় বিছানায় সোজা হয়ে বসে পড়লো। বুকফাটা চিৎকারের সুরে আঁতকে বলে উঠলো,

‎

‎”কীহহহহহহ?।”

‎

‎তৎক্ষনাৎ বাঁধন বিদ্যুতের বেগে হাত বাড়িয়ে রূপার মুখটা শক্ত করে চেপে ধরলো। ফিসফিস করে ধমকের সুরে বললো,

‎

‎”এই এডিয়ট! করছো কী ? এভাবে চিল্লাচ্ছো কেন? বাড়ির সবাই যে জেগে যাবে!”

‎

‎রূপা ঝটকায় বাঁধনের হাতটা সরিয়ে দিল। থরথর করে কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বললো,

‎

‎”আ-আপনি যা বলছেন… তা কি সত্যিই সত্যি?”

‎

‎বাঁধন ভ্রু নাচিয়ে রহস্যময় হেসে বললো,

‎

‎”কী মনে হয় তোমার?”

‎

‎রূপা একটুও ধৈর্য রাখতে পারল না। দুহাতে বাঁধনের টি-শার্টের কলারটা শক্ত করে খামচে ধরে ছোট্ট শিশুর মতো জেদ ধরে বললো,

‎

‎”প্লিজ বলুন না? কথাটা কি সত্যিই সত্যি?”

‎

‎বাঁধন সামান্য ঠোঁট কামড়ে এক চিলতে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বললো,

‎

‎”বলব, তবে তার বদলে আমাকে একটা শর্ত পূরণ করতে হবে।”

‎

‎রূপা একজোড়া ভ্রু কুঁচকে সন্দিগ্ধ গলায় শুধালো,

‎

‎”আপনার আবার কী চাই?”

‎

‎বাঁধন তার আরও কিছুটা কাছে ঝুঁকে এসে রহস্যময় গলায় বললো,

‎

‎”আমার তো তোমার কাছে চাওয়ার অন্ত নেই! তবে আপাতত অত বড় কিছু চাইছি না, কেবল ছোট্ট একটা জিনিস চাইব। বাকি আবদারগুলো জমিয়ে রাখলাম, সময়মতো সুদে-আসলে আদায় করে নেব। এখন আর কথা বাড়িয়ে কাজ নেই বলো, আমি যা চাইব, তুমি তা-ই দেবে তো?”

‎

‎রূপা লজ্জায় তৎক্ষণাৎ মাথা নিচু করে ফেলল। ভয়ে ভয়ে নিজের দুই হাত কচলাতে লাগল। পুরুষটা যে একাধারে কতটা ধূর্ত আর কতটা রোমান্টিক, তা তো রূপার অজানা নয়। কখন যে হঠাৎ করে এমন কোনো আবদার করে বসে, যা সামলানোর ক্ষমতা এই কাঁচা হৃদয়ের থাকে না! লোকটা গায়ে ঘেঁষে দাঁড়ালেই শরীরের সমস্ত রক্তস্রোত কেমন যেন উল্টো দিকে বইতে শুরু করে। নিজের ওপর থেকে তার সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়।রূপাকে চুপ করে আড়ষ্ট হয়ে থাকতে দেখে বাঁধন বাঁকা হেসে ফিসফিস করে বললো,

‎

‎”কী ব্যাপার, ভয় পাচ্ছো নাকি যে আমি এখনই বাসর করতে চাই?”

‎

‎বাঁধনের সরাসরি খোলামেলা কথায় চমকে গিয়ে রূপা থতমতো খেয়ে গেল। তোতলাতে তোতলাতে কোনোমতে বলে উঠলো,

‎

‎”না… মানে আসলে…”

‎

‎বাঁধন আলতো করে তার চিবুকটা ছুঁয়ে অভয় দেওয়ার সুরে বললো,

‎

‎”ভয় পেও না৷ জোর করে এ মুহূর্তে আমি কিচ্ছু চাইব না। এসব চাওয়ার জিনিস নয়, অনুভব করার। তবে হ্যাঁ, সঠিক সময়ে আমি নিজেই আমার অধিকার আদায় করে নেব৷ সেদিন তুমি রাজি আছো কি নেই, তা আমি বিন্দুমাত্র দেখতে যাব না। তো, এখন আর অত পেরা নিও না, ঝটপট বলো রাজি আছো তো?”

‎

‎রূপা বুকের ভেতর থেকে একরাশ স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। লোকটা যখন মুখেই বলে দিয়েছে যে সে এখন জোর করবে না, তখন আর অতটা ভয়ের কিছু নেই। পরেরটা তো পরেই দেখা যাবে! এই ভেবে খানিকটা স্বাভাবিক হয়ে শক্ত গলায় বললো,

‎

‎”ঠিক আছে, আমি রাজি! এবার জলদি আপনার সেই সত্যি কথাটা বলুন তো!”

‎

‎

‎বাঁধন প্রশান্তির হাসি ঝুলিয়ে একদম নিশ্চিত গলায় বলে বললো,

‎

‎”কথাটা সত্যি, সত্যি, সত্যি একদম তিন সত্যি! আর সেটা কাল তুমি নিজের চোখেই দেখতে পাবে।”

‎

‎রূপার বুকটা বাঁধভাঙা আনন্দের জোয়ারে থইথই করে উঠল। খুশিতে আত্মহারা হয়ে প্রায় চেঁচিয়ে উঠতেই নিয়েছিল,

‎

‎”তার মানে সত্যি কাল আ…”

‎

‎পুরো কথাটা মুখ দিয়ে বের হওয়ার সুযোগই দিল না বাঁধন। বিদ্যুতের বেগে হাত বাড়িয়ে শক্ত করে রূপার মুখটা চেপে ধরলো। চোখের ইশারায় কড়া বারণ করে কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,

‎

‎”একদম শব্দ কোরো না, হার্টওয়াইফ! এটা সারপ্রাইজ, এভাবে আগেভাগে সব ফাঁস করে দিতে নেই।”

‎

‎রূপা আলতো করে বাঁধনের হাতটা সরিয়ে দিল। তার কাজলকালো চোখ দুটো আনন্দের তীব্রতায় চিকচিক করছে। বুকের ভেতর উপচে পড়া বাঁধভাঙা অনুভূতি আর ধরে রাখতে না পেরে একরাশ লজ্জা আর উচ্ছ্বাস মিশিয়ে মিষ্টি গলায় বললো,

‎

‎”ইশ! আমার যে ঠিক এই মুহূর্তে কী পরিমাণ আনন্দ লাগছে, তা আমি জাস্ট আপনাকে বোঝাতেই পারছি না!”

‎

‎বাঁধন দুষ্টু হেসে ঠোঁটের কোণে বাঁকা চিলতে হাসি ফুটিয়ে বললো,

‎

‎”হয়েছে, আর অত বোঝাতে হবে না ম্যাডাম! এখন আমি যা চাইব, তা তোমাকেই দিতে হবে মনে আছে তো আমাদের সেই শর্ত?”

‎

‎নিমিষে রূপার মুখের উচ্ছ্বসিত হাসিটা যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেল। বুকটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠতেই থরথর কাঁপা গলায় বললো,

‎

‎”ব-বলুন… কী চাই আপনার?”

‎

‎পলকেরও কম সময়ে রূপাকে একটা জোরালো টানে নিজের বুকের একদম কাছে টেনে নিল বাঁধন। আচমকা আকস্মিক সান্নিধ্যে রূপা পুরোপুরি হকচকিয়ে গেল। তোতলাতে তোতলাতে কাঁপাকাঁপা গলায় বললো,

‎

‎”আ-আপনি তো… আপনি তো বললেন যে এখনই এসব কিছু চাইবেন না!”

‎

‎বাঁধন রূপার নরম ঠোঁটের ঠিক কাছাকাছি নিজের মুখ এনে চোখে দুষ্টুমি মেখে বললো,

‎

‎”আমি কিছু চেয়েছি নাকি?”

‎

‎রূপা বড় বড় চোখে তাকিয়ে অপরাধীর মতো অস্ফুটে বললো,

‎

‎”তাহলে…?”

‎

‎বাঁধন তার দুটি হাত বাড়িয়ে রূপার নরম গাল দুটো ছোট্ট বাচ্চার মতো ধরে আলতো করে বেলুনের মতো ফুলিয়ে দিল। অতঃপর নরম কণ্ঠে বললো,

‎

‎”আমিচ্ছু না, শুধু চাই আমার এই পাগলী হার্টকুইন বউটা ঠিক আমার মতো করে আমাকেও একটু ‘তুমি’ করে ডাকুক! আজ থেকে তুমি আর আমাকে ‘আপনি’ বলে দূরে সরিয়ে রাখতে পারবে না, একদম ‘তুমি’ করে ডাকবে। আর… ওই ‘ভাইয়া’ ডাকটা চিরতরে বন্ধ! সোজাসুজি আমার নাম ধরে ডাকবে। মনে থাকবে?”

‎

‎‎লজ্জায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রূপা দ্রুত মাথাটা নিচু করে ফেলল। মুহূর্তে তার মুখ দিয়ে কোনো টু শব্দও বের হলো না। তার নীরবতা দেখে বাঁধন আরও একটু ঝুঁকে এসে ব্যাকুল গলায় বললো,

‎

‎”প্লিজ হার্টকুইন! শুধু একবার মুখ ফুটে একটু ‘তুমি’ করে ডাকো না?”

‎

‎ভেতরে জমে থাকা সমস্ত সংকোচ এক পলকে ভেঙে চুরমার করে দিল রূপা। বুকের গভীরে সাহস সঞ্চয় করে সোজা বাঁধনের গভীর চোখের দিকে তাকাল। ঠোঁটে মায়াবী হাসি ফুটিয়ে ফিসফিস করে বললো,

‎

‎”শুনছো।”

‎

‎রূপার কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়া ওই একটামাত্র শব্দ যেন তীরের বেগে এসে সোজাসুজি আঘাত করল বাঁধনের বুকে। তার বুকটা একটা দীর্ঘশ্বাসে হঠাৎ বড্ড ভারী হয়ে উঠল। তীব্র আবেগের ঝাপটায় কোনো মুমূর্ষু রোগীর মতো হাঁপাতে হাঁপাতে সে বললো,

‎

‎”কী বললে হার্টওয়াইফ? প্লিজ… আরেকবার বলো?”

‎

‎রূপা চোখের পলক ফেলে মিষ্টি হেসে বললো,

‎

‎”বাঁধন, তুমি না অনেক মায়াবী।”

‎

‎প্রিয়তমার মুখ থেকে উচ্চারিত এই একটিমাত্র নাম আর সম্বোধন এবার বাঁধনের শুধু বুকে নয়, গিয়ে সরাসরি ধাক্কা মারল তার হৃদয়ের গভীরতম স্পন্দনে। তার ডান হাতটা আপনাআপনি খপ করে চলে গেল বুকের বাঁ পাশে। সত্যি সত্যি যেন একটা মৃদু হার্টঅ্যাটাকের আকস্মিক ধাক্কায় সে ঘন ঘন শ্বাস টানতে লাগল। শরীরের ওপর থেকে তার সমস্ত নিয়ন্ত্রণ এক নিমিষে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। টলে টলে সে ঝুঁকে পড়ল বিছানার কিনারার দিকে। বাঁধনকে এভাবে বিছানা থেকে গড়িয়ে পড়তে দেখে রূপা শিউরে উঠে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলো,

‎

‎”এই, পড়ে…”

‎

‎পুরো কথাটা মুখ দিয়ে সম্পূর্ণ বের হওয়ারও ফুরসত পেল না। তার আগেই বিকট একটা শব্দ তুলে বাঁধন বিছানা থেকে সোজা নিচে ফ্লোরে আছড়ে পড়ে গেল।

চলবে…!

#বাঁধন_রূপের_অধিকারী ||৫১||

#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী [শেষাংশ||

‎পরদিন সকাল হতেই রহমান বাড়ির অন্দরে এক অদ্ভুত ব্যস্ততা। সবাই বৃষ্টিদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল বাঁধন। তার পরনে ধবধবে সাদা শার্ট, আর তার ওপর একটা লং ব্ল্যাক ওভারকোট। ফর্সা গড়নের মানুষটার গায়ে পোশাকটা জাস্ট মারাত্মক মানিয়েছে।

‎

‎ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই বাঁধন দেখল বাড়ির সবাই কেমন যেন থমথমে মুখে সোফায় বসে আছে। সবার চেহারায় এমন অদ্ভুত গম্ভীর ভাব দেখে তার কপালে সামান্য ভ্রুর ভাঁজ পড়ল। সন্দিগ্ধ গলায় বললো,

‎

‎”কী হয়েছে?”

‎

‎শিল্পি রহমান চিন্তিত মুখে বললো,

‎

‎”আকাশ যাবে না। নিজের রুমের দরজা বন্ধ করে ভেতরে বসে আছে।”

‎

‎বাঁধন স্বাভাবিক গলায় বললো ,

‎

‎”ঠিক আছে, আমি দেখছি।”

‎

‎লম্বা পা ফেলে বাঁধন এসে দাঁড়াল আকাশের রুমের সামনে। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজায় কড়া নাড়ল,

‎

‎”আকাশ দরজা খোল।”

‎

‎ভেতর থেকে আকাশ ক্ষিপ্ত গলায় বলে উঠল,

‎

‎”এই শালা, আমাকে ডাকবি না । তোর সাথে কোনো কথা নেই আমার। আস্ত একটা বেইমান তুই।”

‎

‎বাঁধন বিন্দুমাত্র না ঘাবড়ে ঠান্ডা গলায় বললো,

‎

‎”তর্ক করার বা বকবক শোনার মুডে আমি একদম নেই। আমার হাতে মার খেতে না চাইলে নিজ দায়িত্বে দরজা খোল।”

‎

‎বাইরে বাঁধনের সেই বরফশীতল কণ্ঠস্বর শুনে নিমিষে আকাশের বুকটা কেঁপে উঠল। এই মানুষটার কোনো বিশ্বাস নেই! সত্যি সত্যিই রেগে গেলে যে সে গায়ে হাত তুলতে দুবার ভাববে না, তা আকাশ ভালো করেই জানে। অগত্যা ভয়ে ভয়ে বাধ্য হয়ে দরজাটা খুলে দিল। মুখটা গম্ভীর করে রেখে বললো,

‎

‎”কী হয়েছে?”

‎

‎বাঁধন হাতের ঘড়িটার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললো,

‎

‎”দশ সেকেন্ড সময় দিলাম। এর মধ্যে রেডি হয়ে নিচে নামবি।”

‎

‎বলাই বাহুল্য কথা শেষ করেই বাঁধন উল্টো পায়ে হেঁটে চলে যেতে লাগল। পেছন থেকে আকাশ রাগে কটমট করে বললো,

‎

‎”আমি কিচ্ছুতেই যাব না!”

‎

‎বাঁধন না থেমে হাঁটতে হাঁটতে পেছন ফিরে ঠান্ডা গলায় বললো,

‎

‎”ঠিক দশ মিনিট পর যদি তোকে রেডি অবস্থায় নিচে না পাই, তবে তোকে বৃষ্টিদের বাড়িতে নয় সোজা হসপিটালের বেডে পাঠাবো। মাইন্ড ইট।”

‎

‎রাগের চোটে সশব্দে দরজাটা সজোরে বন্ধ করে দিল আকাশ। ওয়াশরুমের দিকে দ্রুত পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সে বিরক্তি নিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করে বললো,

‎

‎”এই শালাটা শান্তিতে একটু ছ্যাকাটাও খেতে দেবে না আমায়।”

‎

‎_______

‎

‎পাক্কা দশ মিনিটের মাথাতেই কোনোমতে হন্তদন্ত হয়ে রেডি হয়ে নিচে নেমে এল আকাশ। তার এমন তাড়াহুড়ো করা মূর্তি দেখে অ্যান্সি আর নিক্সি ঠোঁট কামড়ে মৃদু হাসল। আকাশ তাতে বিন্দুমাত্র কান না দিয়ে একদম পাথরের মতো গম্ভীর মুখে এসে দাঁড়াল।ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে তখন নির্বিকার চিত্তে ফোন টিপছিল বাঁধন। আকাশের উপস্থিতি টের পেয়ে সে কেবল এক পলক চোখ তুলে তাকাল, পরক্ষণেই আবার উদাসীনভাবে নিজের ফোনে মনোযোগ ফিরিয়ে নিল।

‎

‎এদিকে বাড়ির সবার প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও রূপার কোনো পাত্তা নেই। চারপাশের থমথমে ভাবের মধ্যে অ্যান্সি ভ্রু কুঁচকে উসখুস করে বললো,

‎

‎”রূপা এখনো নিচে নামছে না কেন? ওর কি এখনো রেডি হওয়া হয়নি?”

‎

‎অ্যান্সির কথা শেষ হতে না হতেই ওপরের তলা থেকে রূপার একটু আমতা আমতা করা গলা ভেসে এল,

‎

‎”কাকিমণি… একটু ওপরে আসবে প্লিজ?”

‎

‎রূপার ডাক শুনে শিল্পি রহমান নিজে যাওয়ার জন্য সোজা হয়ে দাঁড়াতেই বাঁধন হাত বাড়িয়ে তাঁকে আলতো করে থামিয়ে দিয়ে বললো,

‎

‎”কাকিয়া, তুমি বসো। আমি দেখছি।”

‎

‎বলেই বাঁধন পা বাড়াল রূপার ঘরের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে ঘরের সামনে এসে দাঁড়াতেই তার গতিরোধ হলো হঠাৎ করেই যেন স্তব্ধ হয়ে গেল তার দুই পা। রুমের খোলা দরজার আড়াল থেকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রূপার দিকে চোখ পড়তেই বাঁধনের নিঃশ্বাস আটকে গেল।

‎

‎রূপা তখন একমনে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে শাড়ি পরতে। শাড়ির কুঁচিগুলো ঠিকঠাক মতো গোছাতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। একটু পরপর অভিমানী শিশুর মতো খিটমিট করে ঠোঁট উল্টে ফেলছে মেয়েটা, যেন শাড়ির ওপরই তার সব রাগ। সেই ব্যস্ততায় তার ধবধবে ফর্সা পেটের অংশটুকু উন্মুক্ত। মোহময় দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই বাঁধনের কণ্ঠনালীতে যেন শব্দ আটকে গেল৷ পাথরের মূর্তির মতো একদৃষ্টিতে ওখানেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

‎

‎ওদিকে দরজার কাছে কারোর উপস্থিতি টের পেয়ে রূপা ভেবে বসল কাকিমণি বুঝি এসে গেছে। তাই পেছন ফিরে না তাকিয়েই ব্যাকুল গলায় বললো,

‎

‎”কাকিমণি, এসেছো! দেখো না, শাড়িটা সেই কখন থেকে পরার ট্রাই করছি, কিন্তু কিছুতেই কুঁচিগুলো ঠিক করতে পারছি না। তুমি একটু এসে পড়িয়ে দাও না প্লিজ?”

‎

‎পিছন থেকে পরিচিত কণ্ঠে ভেসে এল,

‎

‎”যেটা পারো না, সেটা নিজে পড়তে যাও কেন?”

‎

‎আচমকা চেনা পুরুষালি কণ্ঠস্বর কানে আসতেই বিদ্যুতের বেগে চমকে উঠল রূপা। দ্রুত মাথা তুলে সামনে আয়নার প্রতিবিম্বে বাঁধনকে দেখতেই লজ্জায় তার সমস্ত শরীর যেন আষ্টেপৃষ্ঠে কুঁকড়ে গেল। পরক্ষণেই লজ্জার তীব্রতা ঢাকতে উল্টো দিকে ঘুরে রাগে কটমট করে চেঁচিয়ে উঠলো,

‎

‎”তুমি এখানে কেন? প্লিজ, রুম থেকে বের হও বলছি!”

‎

‎রূপার কোনো কথাই যেন বাঁধনের মাথায় ঢুকল না। কোনো রাখঢাক না করে ধীর পায়ে সোজা রূপার সামনে এসে দাঁড়াল। গম্ভীর গলায় বললো,

‎

‎”আমি তোমার হাজবেন্ড, কোনো পরপুরুষ নই। সুতরাং এত লজ্জা না পেয়ে এদিকে ঘুরে দাঁড়াও, আমি পরিয়ে দিচ্ছি।”

‎

‎বাঁধনের সরাসরি কথায় রূপা আরও বেশি আড়ষ্ট হয়ে গেল। লজ্জায় লাল হয়ে আমতা আমতা করে বললো,

‎

‎”তু…তুমি পরিয়ে দিবে?”

‎

‎বাঁধন নিজের চোখের চাউনি একটু নামিয়ে নরম গলায় বললো,

‎

‎”হুম, এবার সোজা হয়ে একটু ঘুরে দাঁড়াও।”

‎

‎রূপা লজ্জায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে আমতা আমতা করে বললো,

‎

‎” লজ্জা করছে তো”

‎

‎রূপার আড়ষ্টতা দেখে বাঁধন বাঁকা হেসে মোক্ষম তীরটা ছুঁড়ে দিয়ে বললো,

‎

‎”তুমি কী জীবনেও আমাকে বাবা হতে দেবে না?”

‎

‎বাঁধনের আকস্মিক অদ্ভুত কথার চাবুকে রূপা থতমত খেয়ে এক্কেবারে আকাশ থেকে পড়ল। হতভম্ব হয়ে বড় বড় চোখে তাকিয়ে বললো,

‎

‎”এসব কী যা তা বলছো তুমি?”

‎

‎বাঁধন এক পা এগিয়ে আরও একটু কাছে এসে গম্ভীর মুখে ভান করে বললো,

‎

‎”ভুল কিছু বললাম নাকি? তুমি যদি এভাবে সর্বক্ষণ লজ্জায় মরে যেতে থাকো, তবে আমি বাবা হবো কেমনে? সারাজীবন কি আমার বেবিরা এভাবেই আল্লাহর কাছেই ঝুলে থাকবে?”

‎

‎রূপা লজ্জায় লাল টকটকে হয়ে খেই হারিয়ে ফেলে কোনোমতে অস্ফুটে বললো,

‎

‎”আমি… আমি আবার কখন বললাম যে ওরা আল্লাহর কাছে থাকবে?”

‎

‎বাঁধন এবার দুষ্টু হাসিতে মুখটা উজ্জ্বল করে চটজলদি জবাব দিল,

‎

‎”মুখে বলোনি তো কী হয়েছে! কিন্তু তুমি যেভাবে জলের মতো গলে গলে লজ্জা পাচ্ছো, তাতে তো মনে হচ্ছে ওরা পৃথিবীতে আসার রাস্তাটাই ভুলে গেছে!”

‎

‎রূপা চোখ দুটো বড় বড় করে কিছুটা ধমকের সুরে বললো,

‎

‎”দেখো একদম ফাজলামি করবে না। সময় হলে আল্লাহ ঠিকই আমাদের বেবি দেবে।”

‎

‎বাঁধন লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে একটু বিরক্তির ভান করে বললো,

‎

‎”হ্যাঁ, এভাবেই লজ্জায় কুকড়ে থেকো। বেবি মনে হয় আকাশ থেকেই ধপাস করে পড়বে।”

‎

‎রাগে আর লজ্জায় রূপা ডেকে উঠলো,

‎

‎”বাঁধন!”

‎

‎বাঁধন সঙ্গে সঙ্গে হাত দুটো তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে বললো,

‎

‎”ওকে ফাইন! এখন আর কোনো কথা না বলে চুপচাপ ঘুরে দাঁড়াও। আমি কিছু দেখব না, একদম চোখ বন্ধ করে তোমাকে শাড়ি পরিয়ে দেবো।”

‎

‎রূপা এখনও বিশ্বাস করতে না পেরে সন্দিগ্ধ গলায় শুধাল,

‎

‎”প্রমিস?”

‎

‎”প্রমিস!”

‎

‎রূপা আশ্বস্ত হয়ে নরম গলায় বললো,

‎

‎”ঠিক আছে, চোখ বন্ধ করো।”

‎

‎কথা শেষ হতে না হতেই বাঁধন সাথে সাথে তার দুই চোখ শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। রূপা ধীরে ধীরে ঘুরে বাঁধনের দিকে মুখ করে দাঁড়াল। চোখ বন্ধ রাখা অবস্থাতেই হাত দুটো সামনে বাড়িয়ে বাঁধন বললো,

‎

‎”এবার শাড়িটা আমার হাতে দাও?”

‎

‎রূপা লজ্জা মেশানো আড়ষ্টতায় মাথাটা নিচু রেখে আলগোছে শাড়িটা বাঁধনের হাতে তুলে দিল। বাঁধন সত্যি সত্যি একদম বাধ্য ছেলের মতো চোখ দুটো বন্ধ রেখে নিখুঁত হাতে ধীরে ধীরে শাড়ির কুঁচি করতে লাগল।রূপা মুগ্ধ চোখে আলতো করে মুখখানা তুলে বাঁধনের দিকে তাকাল। সত্যি তার স্বামী একদম চোখ বন্ধ রেখেই কত যত্ন করে শাড়ির কুঁচিগুলো গুছিয়ে দিচ্ছে৷ মুহূর্তের মধ্যে রূপার ঠোঁটের কোণে এক টুকরো অপরূপ মায়াবী হাসি ফুটে উঠল। মানুষটা সত্যি অনেক যত্নশীল আর ভীষণ দায়িত্ববান। কখনো রূপা স্বপ্নেও কল্পনা করেনি যে নিজের জীবনে এমন একজন মানুষকে স্বামী হিসেবে পাবে সে। নিজেকে আজ সত্যি বড্ড ভাগ্যবতী মনে হচ্ছে তার।

‎

‎একমনে যত্ন নিয়ে ধীরে ধীরে কুঁচিগুলো করা শেষ করল বাঁধন। তারপর বন্ধ চোখেই কুঁচিগুলো রূপার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সহজ গলায় বললো,

‎

‎”আমি গুঁজে দেব, নাকি তুমি নিজেই গুজবে?”

‎

‎বাঁধনের কথায় রূপার যেন হুট করে আচ্ছন্ন ভাবটা কাটল, এক নিমিষে হুশ ফিরল তার। দ্রুত মাথাটা নিচু করে লজ্জামাখা গলায় ফিসফিস করে বললো,

‎

‎”আমাকে দাও, আমি… আমি নিজেই গুঁজে নেব।”

‎

‎শাড়ির কুঁচির নিখুঁত ভাঁজগুলো রূপার বাড়িয়ে দেওয়া হাতে আলতো করে তুলে দিল বাঁধন। রূপা ভিজে ওঠা হাতে কুঁচিগুলো পেটে গুঁজতে গেল, কিন্তু কাপড়ের তোড়ে হাত ফসকে নিমিষে সব এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। হতাশায় ফুঁসে উঠলো,

‎

‎”ধুর।”

‎

‎বাঁধন লক্ষ্মী ছেলের মতো চোখ দুটো বন্ধ রেখে শান্ত গলায় বললো,

‎

‎”কী হয়েছে?”

‎

‎রূপা অবুঝ শিশুর মতো ঠোঁট উল্টে বিষণ্ন কণ্ঠে বললো,

‎

‎”ফসকে গেছে।”

‎

‎বাঁধন ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে সহানুভূতির সুরে বললো,

‎

‎”সমস্যা নেই, আবার দাও আমি গুছিয়ে দিচ্ছি।”

‎

‎রূপা লজ্জায় নিজের নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরে শাড়িটা আবার বাঁধনের বাড়িয়ে দেওয়া হাতে সঁপে দিল। বাঁধন নিমগ্ন হয়ে আবার এক এক করে শাড়ির কুঁচিগুলো ভাঁজ করতে লাগল। কাজ শেষ করে কুঁচিগুলো রূপার দিকে বাড়াতেই সে মাথা নিচু রেখে ধীর কণ্ঠে বললো,

‎

‎”তুমি গুঁজে দাও।”

‎

‎বাঁধন মৃদু হেসে নিশ্চিত হতে চেয়ে বললো,

‎

‎”শিওর?”

‎

‎রূপা মাথা নাড়িয়ে আলতো সুরে বললো,

‎

‎”হুম।”

‎

‎বাঁধন নিজের ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর অত্যন্ত সযত্নে ও সাবধানে হাতটা বাড়িয়ে আনল রূপার উন্মুক্ত পেটের কাছাকাছি। ধীর স্থির ছন্দে শাড়ির কুঁচিগুলো এক এক করে রূপার কোমরের খাঁজে গুঁজে দিল সে। হঠাৎ পেটের অনাবৃত ত্বকে সুগঠিত পুরুষালি হাতের তপ্ত স্পর্শ পেয়ে শিউরে উঠল রূপা। পলকের মধ্যে ঝাপাট করে নিজের চোখ দুটো শক্ত করে বুজে ফেলল। অজান্তেই বুক ফুঁড়ে আপনাআপনি বেরিয়ে এল একটা গভীর দীর্ঘনিশ্বাস। দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে খামচে ধরল শাড়ির আঁচলটা। প্রিয় মানুষের আবেশমাখানিবিড় স্পর্শের অনুভূতি বুঝি এমনই হয়৷ রূপার সারা শরীরে যেন শীতল রোমাঞ্চের ঢেউ খেলে গেল। বাঁধন ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে পরম আদরে শাড়ির আঁচলটা রূপার গায়ে ও কাঁধে সুন্দর করে গুছিয়ে দিল।

‎

‎আর ঠিক তার পরমুহূর্তেই যেন পুরো ঘরে অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। রূপা অবাক হয়ে পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাল৷ সামনে বাঁধন নেই৷ রুমের চারপাশে বিভ্রান্ত হয়ে চোখ বুলাল , কিন্তু কোথাও লোকটির দেখা মিলল না। মানে কী? লোকটা কি চলে গেল? সত্যিই তো৷ঘরের কোথাও বাঁধন নেই।

‎

‎বুকের ভেতর হঠাৎ একরাশ মিষ্টি রোমাঞ্চ খেলে গেল রূপার। লজ্জামাখা হাসি ভেসে উঠল তার রাঙা ঠোঁটে। তারপর আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে চুলগুলো ব্রাশ করতে লাগল।

‎

‎__________

‎

‎অবশেষে সবাই এসে পৌঁছাল বৃষ্টিদের বাড়িতে। ইতিমধ্যে পুরো বাড়িটা ঝলমলে আলো আর ফুলে ফুলে অপরূপ সৌন্দর্যে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। অতিথেদের বসার জন্য সুসজ্জিত টেবিল পাতা হয়েছে, আর ঘরের এক পাশে তৈরি করা হয়েছে এক মোহনীয় এনগেজমেন্টের স্টেজ। এক পলক তাকালেই মনে হয় যেন পুরো বাড়িটা কোনো রূপকথার রাজ্যে পরিণত হয়েছে৷ হলরুমে আমন্ত্রিত অতিথিদের ঢল৷ কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্পে মশগুল, আবার কেউ টেবিলে বসে খোশগল্পে ব্যস্ত। সবাই যার যার মতো উদযাপনে মত্ত।

‎

‎বাড়িতে পা রেখেই রূপা চটজলদি এক দৌড়ে চলে গেল বৃষ্টির রুমের দিকে। আর ওদিকে আকাশ একদম থমথমে গম্ভীর মুখ করে এসে একটা টেবিলে বসল। তার ঠিক পাশেই বসল বাঁধন। আর টেবিলের অন্য পাশের চেয়ারগুলোতে একে একে গিয়ে বসল অ্যান্সি, নিক্সি, ওমর এবং জেইন।

‎

‎আকাশের মেঘলা মুখ দেখে ওমর তার দিকে তাকিয়ে কৌতূহলী কণ্ঠে বললো,

‎

‎”কী হয়েছে বলো তো ব্রো? মুখটা এমন গুমড়া করে রেখেছ কেন?”

‎

‎আকাশ মুখ বাঁকিয়ে নিরুত্তাপ গলায় বললো,

‎

‎”কিছু হয়নি।”

‎

‎ওমর আর জেইন সুযোগ পেয়ে আকাশের সাথে হালকা ঠাট্টা-মজা শুরু করে দিল, কিন্তু আকাশ বিরক্তি ভরা মুখ নিয়ে চুপচাপ বসে রইল। বাঁধন হেলেদেলে চেয়ারে বসে নিজের ফোনে স্ক্রোল করতে ব্যস্ত ছিল। ঠিক তখনই অচেনা এক তরুণ এসে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে বললো,

‎

‎”হাই, আমি আবিদ।”

‎

‎সবাই কৌতূহল নিয়ে ছেলেটির দিকে তাকাল। ফোন থেকে মুখ তুলে বাঁধনও একবার আবিদের ওপর নজর বুলাল। জেইন অমায়িক হেসে বললো,

‎

‎”জ্বি, আমি জেইন।”

‎

‎এরপর সবাই এক এক করে আবিদের সাথে নিজের পরিচয় দিল। মুখ গুমড়া করে রাখা আকাশও কোনোমতে নিজের নামটা উচ্চারণ করল। বাঁধন হঠাৎ সোজা হয়ে বসে ধারালো গলায় আবিদ কে প্রশ্ন করল,

‎

‎”তুমি বৃষ্টির কী হও?”

‎

‎আবিদ সাবলীল কণ্ঠে জবাব দিল,

‎

‎”জ্বি, আমি ওর কাজিন।”

‎

‎কথাটা কানে আসতেই বাঁধন আচমকা আকাশের দিকে এক পলক তাকাল। হঠৎ তার ঠোঁটের কোণে ঠোঁট-টিপা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। নিঃশব্দে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর আবিদকে একটু একান্তে ডেকে নিয়ে দূরে এসে দাঁড়িয়ে বললো,

‎

‎”আবিদ, একটা ছোট কাজ করে দিতে পারবে?”

‎

‎আবিদ কৌতূহল নিয়ে বললো,

‎

‎”কী কাজ, ভাইয়া?”

‎

‎বাঁধন ফিসফিস করে কাজের কথাটা আবিদের কানে বুঝিয়ে দিল। শুনে আবিদ মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বললো,

‎

‎”ডান ভাইয়া৷ আমি এখনই যাচ্ছি।”

‎

‎আবিদ সোজা হেঁটে এসে ঠিক আকাশের পাশের ফাঁকা চেয়ারটাতে ধুপ করে বসে পড়ল। তারপর টেবিলে বসা সবার দিকে তাকিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো,

‎

‎”আসলে তখন যখন এসেছিলাম, তখন পুরো কথাটা বলতে পারিনি আমি হলাম বৃষ্টির হবু হাজবেন্ড৷ ওর সাথেই আজ আমার এনগেজমেন্ট।”

‎

‎কথাটা শোনামাত্র বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চটজলদি চমকে উঠল আকাশ৷ চোখ দুটো বড় বড় করে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে আবিদের দিকে তাকাল। আবিদ আকাশের হাবভাব পুরোপুরি উপেক্ষা করে আয়েশ করে আবার বলতে লাগল,

‎

‎”আসলে আজ শুধু আমার এনগেজমেন্টই নয়, আমার বছরের পর বছর ধরে জমানো ভালোবাসার পূর্ণতা পাওয়ার দিন! সেই কবে থেকে যে আমি বৃষ্টিকে ভালোবেসে আসছি, তা তোমাদের আমি বলে বোঝাতে পারব না। সেই পাগলিটাকে যে এত সহজে নিজের করে পেয়ে যাব, তা সত্যি বলতে আমি কখনো স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি।”

‎

‎আবিদের কথাগুলো শুনে মুহূর্তে আকাশের চোখের সামনে যেন লাল আগুন জ্বলতে শুরু করল। রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে কাঠ হয়ে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে এমনভাবে ফুঁসতে লাগল, যেন এই মুহূর্তে আবিদকে আস্ত গিলে খাবে বা খুন করে ফেলবে।আবিদ তার কথা শেষ করে আবারও কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তার আগেই ধৈর্য হারিয়ে ফেলল আকাশ। ঝাপট মেরে চেয়ার ছেড়ে হুংকার দিয়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর এক টানে আবিদের শার্টের কলারটা খামচে ধরে রক্তিম চোখে তার দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠল,

‎

‎”অনেক বকেছিস তুই! আজাইরা প্যাঁচাল বন্ধ কর। এই জোছনায় আরেকবার ওকে নিয়ে কিছু বলবি তো তোর গলা কেটে একদম আলাদা করে দেব।”

‎

চলবে…!

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply