#বাঁধন_রূপের_অধিকারী
#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী [৩৮]
মুহূর্তে বাঁধনও এক হাত দিয়ে মেয়েটাকে শক্ত করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। তার চোখ জোড়া পরম বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে উঠল। সে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল।
—-“অ্যান্সি! তুই…?”
বাঁধনের সেই ঘোর কাটার আগেই, হুরমুড় করে খোলা দরজা দিয়ে ঘরের ভেতর প্রবেশ করল আরও দুটো বিদেশি ছেলে আর একটা বিদেশি মেয়ে। তাদের চোখে-মুখে দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি থাকলেও আনন্দের কোনো কমতি নেই। তিনজনে একসাথে চওড়া হেসে সমস্বরে বলে উঠল।
—-” শুধু ও না বাঁধন, আমরাও এসেছি!”
বাঁধন এবার যেন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। সে পুরো অবাক হয়ে সেই তিনজনের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে তখন হাজারো স্মৃতির দোলাচল।
“নিক্সি, ওমর, জেইন, তোরা সবাই বাংলাদেশে?!”
ঠিক তখনই অ্যান্সি বাঁধনের কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে আরও একটু শক্ত করে নিজের কাছে টেনে নিল। পরম নির্ভরতায় বাঁধনের বুকে মাথা রেখে বেশ আবেগী গলায় বলল।
—-“দোস্ত, আই মিস ইউ সো মাচ! তুই ওখান থেকে এভাবে হুট করে চলে আসার পর থেকে আমাদের সেই আড্ডাটা পুরো ভেঙে গিয়েছিল রে। আমরা কেউ তোকে ছাড়া একদম ভালো ছিলাম না, তোকে ভীষণ মনে পড়ত আমাদের। তাই তো সবাই মিলে তোকে একটা মস্ত বড় সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য কাউকে কিছু না বলেই প্লেনের টিকিট কেটে সোজা বাংলাদেশে চলে আসলাম!”
বাঁধন বন্ধুদের এই পাগলামি দেখে যেমন খুশি হলো, তেমনি কিছুটা অবাকও হলো। সে অ্যান্সির মাথায় আলতো করে একটা গাঁট্টা মেরে হেসে বলল।
—-“তা তো বুঝলাম পাগলের দল! কিন্তু তোরা এই অচেনা শহরের মাঝে আমার এই নতুন বাসার ঠিকানা কোথায় পেলি?”
ওমর তখন একগাল হেসে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিক্সির কাঁধে হাত দিয়ে আয়েশ করে বলল,
—-“আরে, সে এক বিশাল ইতিহাস! আমরা এয়ারপোর্ট থেকে নেমে প্রথমে তোর সেই রহমান বাড়িতে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে শুনি তুই সেখানে নেই, অন্য কোথাও শিফট করেছিস। আমরা তো পুরো আকাশ থেকে পড়েছিলাম! তারপর ভাগ্যিস সেখানে আকাশ নামে একটা ছেলের সাথে দেখা হলো। ও-ই আমাদের তোর এই নতুন বাসার ঠিকানা দিল, আর আমরাও আর এক সেকেন্ড সময় নষ্ট না করে গাড়ি নিয়ে সোজা এখানে চলে এলাম।”
বন্ধুদের সাথে বাঁধনের এই খুনসুটি, এই আত্মিক টান আর আনন্দের প্রতিটি মুহূর্ত দুর থেকে লক্ষ্য করছে রূপা। সে পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।বাঁধন এক হাত দিয়ে একটা আবেদনময়ী বিদেশি মেয়েকে জড়িয়ে ধরে আছে, আর দুটো ছেলে ও একটা মেয়ের সাথে অনাবিল আড্ডায় মেতে হেসে হেসে কথা বলছে। এই পুরো দৃশ্যটা রূপার চোখের সামনে যেন একটা জীবন্ত চাবুকের মতো আছড়ে পড়ছে। এই বিদেশি মানুষগুলো আসলে কারা, বাঁধনের অতীত জীবনের সাথে এদের সম্পর্কটা ঠিক কতটা গভীর, তা রূপা কিছুই চেনে না, জানে না।কিন্তু বাঁধনের সেই চওড়া বাহুর বন্ধনে অ্যান্সি নামের মেয়েটাকে এভাবে লেপ্টে থাকতে দেখে রূপার বুকের ঠিক বাঁ পাশে তীব্র একটা হাহাকার আর তীব্র ব্যথা অনুভূত হতে লাগল। তার কলিজাটা যেন কেউ নিষ্ঠুরভাবে চিপে ধরেছে। মনের ভেতরে এক অদ্ভুত, কুৎসিত আর ভীষণ বাজে অনুভূতি দানা বাঁধছে।আজ এই প্রথম রূপা জীবনের এক কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একটা অমোঘ প্রমাণ পেল, ভালোবাসা যতটা সুন্দর আর মায়াবী মনে হয়, নিজের চোখের সামনে নিজের সেই ভীষণ শখের পুরুষটিকে অন্য কোনো মেয়ের এতখানি সান্নিধ্যে দেখাটা ঠিক ততটাই নারকীয় আর বাজে এক অনুভূতি!রূপার চোখের সামনে ঘরের চেনা দৃশ্যটা বারবার ঝাপসা হয়ে কাঁপতে লাগল।
রূপা আর দাঁড়িয়ে থাকার মতো নূন্যতম শক্তিটুকুও নিজের ভেতরে খুঁজে পেল না। বাঁধনের মুখে ফুটে ওঠা প্রতিটি হাসির রেখা যেন এক একটা ধারালো তীরের মতো এসে সোজা তার বুকে বিঁধছে। মাথার ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে আসছে, চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে চারপাশটা ঘুরছে মনে হচ্ছে এই বুঝি সে জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়বে।
অন্য দিকে, এতক্ষণ পর অ্যান্সি বাঁধনকে আলতো করে ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। ঠিক তখনই অবিন্যস্ত চুলে ঘরের একটু দূরে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকা রূপার দিকে তার চোখ পড়ল। অ্যান্সি চরম অবাক হয়ে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—-” এই মেয়েটা কে?”
অ্যান্সির কথা শুনে বাঁধনও ঘাড় ঘুরিয়ে রূপার দিকে তাকাল। রূপার সেই মায়াবী চোখ দুটোতে তখন এক আকাশ অভিমানের নোনা জল টলমল করছে, যা যেকোনো মুহূর্তে বাঁধ ভেঙে গড়িয়ে পড়বে। বাঁধন অবশ্য রূপার ভেতরের সেই সুনামি টের পেল না সে উল্টো স্বভাবসুলভ এক চিলতে হেসে বলল,
—-” ও রূপা, আমার ওয়াই..।”
কিন্তু বাক্যের সেই শেষ অংশটুকু বাঁধনের ঠোঁট গলে বের হওয়ার আগেই, রূপা নিজের সমস্ত শক্তি এক করে ওখান থেকে সজোরে দৌড় দিল। তার অবাধ্য চোখের জল তখন গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। সে এক দৌড়ে নিজের রুমে গিয়ে ধড়াম করে ভেতরের দিক থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিল। সেই সজোর আঘাতের শব্দে যেন পুরো ড্রয়িংরুমটা মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল।ঘরের এমন থমথমে পরিস্থিতিতে জেইন চরম অবাক হয়ে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে বলল,
—-” কী হলো? মেয়েটা এভাবে হুট করে দৌড়ে চলে গেল কেন?”
বাঁধন নিজেও ঠিক বুঝতে পারছে না রূপার এই আকস্মিক আচরণের কারণ। রূপা যে হঠাৎ এভাবে চোখের জল ফেলে অমন পাগলের মতো রুমে চলে যাবে, তা তার ধারণারও বাইরে ছিল। তবে বন্ধুদের সামনে নিজের ভেতরের অস্বস্তিটুকু প্রকাশ পেতে দিল না সে। নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক আর ঠিক রেখে, সবার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
—-” হয়তো হঠাৎ তোদের একসাথে দেখে লজ্জা পেয়েছে, ও আসলে একটু লাজুক টাইপের। যাই হোক,ও আমার ওয়াইফ।”
বাঁধনের মুখে ‘ওয়াইফ’ শব্দটা শুনে তার বিদেশি বন্ধুদের চোখ জোড়া বিস্ময়ে চকচক করে উঠল,অ্যান্সি যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারল না, সে রীতিমতো চিৎকার করে উঠল,
—-” হোয়াট! তুই বিয়ে করেছিস?”
বাঁধন বন্ধুদের এই আকাশ থেকে পড়া চাহনি দেখে মৃদু হেসে মাথা দোলাল। সে শান্ত গলায় বলল,
—-” হুম।”
নিক্সি এবার কিছুটা অভিমানের সুরে বলল,
—-” কিন্তু আমাদের তো একটা বারও বললি না!”
বাঁধন সোফার দিকে ইশারা করে বলল,
—-” ওইটা অনেক কাহিনি , তোদের পরে বিস্তারিত সব বলবো। এখন তোরা আগে বস।”
কিন্তু বসার নাম নেই, অ্যান্সি উল্টো ভীষণ উৎসাহিত হয়ে হাততালি দিয়ে বলল,
—-” আমি আগে তোর ওয়াইফের সাথে দেখা করবো! প্লিজ, ওকে একটু ডাক দে না বাঁধন।”
নিক্সিও তার সাথে সুর মিলিয়ে খুশি হয়ে বলল,
—-” আমিও দেখা করবো!”
বন্ধুদের এমন আগ্রহ দেখে বাঁধন আর না করতে পারল না। সে হেসে বলল,
—-” আচ্ছা ঠিক আছে, তোরা সোফায় বস, আমি ওকে ডাক দিচ্ছি।”
বাঁধনের কথা শুনে চারজনে মিলে ড্রয়িংরুমের আরামদায়ক সোফাটায় গিয়ে বসল। বাঁধন ড্রয়িংরুম পেরিয়ে সোজা এসে দাঁড়াল রূপার বন্ধ রুমের দরজার সামনে। সে হাত বাড়িয়ে দরজায় নক করতে যাবে, ঠিক তখনই তার হাতটা মাঝপথেই থমকে গেল। বন্ধ দরজার ওপার থেকে ভেসে আসছে এক অতি পরিচিত অথচ বুকভাঙা আর্তনাদ রূপার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ!শব্দটা কানে আসতেই বাঁধনের ভেতরের সমস্ত স্বস্তি কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে মুহূর্তে দরজার হাতল ধরে সজোরে ধাক্কাতে ধাক্কাতে ব্যাকুল গলায় বলল,
—-” রূপ, দরজা খোল!”
কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ এলো না, দরজার ছিটকিনিটাও নড়ল না। কেবল কান্নার বেগটা আরও একটু তীব্র হয়ে বাঁধনের কানে এসে আছড়ে পড়তে লাগল। বাঁধনের বুকের ভেতরে অজানা আশঙ্কায় ঝড় শুরু হয়ে গেল। রূপার এই আকস্মিক ও তীব্র কান্নার মানে সে কোনোভাবেই মেলাতে পারছে না। বন্ধুদের সামনে এমন একটা পরিস্থিতিতে রূপার এই অবুঝপনা তার ভেতরের পুরুষালি অহংকার আর ধৈর্যের বাঁধকে নিমেষে গুঁড়িয়ে দিল। সে পুনরায় দরজায় প্রচণ্ড জোরে ধাক্কাতে ধাক্কাতে নিজের দাঁতে দাঁত চেপে কঠোর গম্ভীর গলায় বলল,
—-” কানে শুনতে পাসনি রূপ? তোকে দরজা খুলতে বলছি!”
তবুও রূপা দরজা খুলছে না, কোনো উত্তরও দিচ্ছে না; শুধু ভেতর থেকে অবিরাম ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দটা ভেসে আসছে।
ওদিকে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে থাকা অ্যান্সি, নিক্সি, ওমর আর জেইন চারজনেই আচমকা বাঁধনের এমন রাগি ও কঠোর কণ্ঠস্বর শুনতে পেল। কৌতূহল আর একরাশ ধোঁয়াশা নিয়ে তারাও সোফা ছেড়ে উঠে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। ওমর সবার আগে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—-” কোনো সমস্যা বাঁধন?”
বাঁধন ওমরের কথার কোনো উত্তর দিল না। রূপার এই একগুঁয়েমি আর বন্ধুদের সামনে তাকে এভাবে আটকে রাখাটা তার রাগ যেন সাত আসমানে তুলে দিল। সে এবার প্রচণ্ড রাগে দরজায় একটা শক্ত লাথি মেরে চিৎকার করে বলল,
—-” রূপের বাচ্চা! তুই নিজে থেকে দরজা খুলবি, নাকি আমি দরজা ভেঙে ভেতরে আসবো?”
সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা কারও মাথায় কিছু ঢুকছে না যে আসলে হচ্ছেটা কী। ঠিক তখনই জেইন হঠাৎ চিবুক হাতড়ে গম্ভীর মুখে বলল,
—-” বাঙালি মেয়েরা সাধারণত নিজের হাজবেন্ডকে অন্য মেয়ের পাশে দেখলে ভীষণ রাগ আর অভিমান করে, যতটুকু আমার জানাশোনা। তো তোকে অ্যান্সি ওভাবে জড়িয়ে ধরেছিল বলে রূপা কোনোভাবে রাগ বা জেলাস হলো না তো?”
জেইনের কথাটা শোনামাত্রই বাঁধনের মাথায় যেন একটা লাইট জ্বলে উঠল। এতক্ষণে সে সুতোটা মেলাতে পারল রূপার আচমকা অমন পাগলের মতো ছুটে যাওয়া আর দরজার ওপারে বুক চিরে কান্নার আসল কারণটা কী! তাকে অন্য এক নারীর বাহুবন্ধনে দেখে মেয়েটার বুকে যে তীব্র আঘাত লেগেছে, তা বাঁধন এবার স্পষ্ট বুঝতে পারল।
জেইনের মুখে এই ব্যাখ্যা শুনে অ্যান্সি নিজের ভেতরে এক তীব্র অপরাধবোধ অনুভব করল। সে ভীষণ লজ্জিত ও বিব্রত হয়ে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে অপরাধীর গলায় বলল,
—-” ওহ গড! রিয়ালি সরি দোস্ত, আমি আসলেই একদম বুঝতে পারিনি।”
অ্যান্সির এমন কাঁচুমাচু মুখ দেখে বাঁধনের রাগটা এক নিমেষে জল হয়ে গেল। সে পুনরায় অ্যান্সির মাথায় হালকা করে একটা গাট্টা মেরে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল,
—-” বলদ একটা!”
বলেই বাঁধন তার ঠোঁটের সেই চেনা বাঁকা হাসিটা ধরে রেখে, প্যান্টের ট্রাউজারের পকেটে দুই হাত গুঁজে দিল। তারপর খুব শান্ত পায়ে মেইন দরজার দিকে এগোতে এগোতে বন্ধুদের উদ্দেশ্যে বলল,
—-” তোরা সোফায় গিয়ে আরাম করে বস, আমি জাস্ট আসছি।”
বলেই বাঁধন চটজলদি ফ্ল্যাটের মালিকের বাসায় গিয়ে রূপার ঘরের দরজা খোলার ডুপ্লিকেট চাবিটা নিয়ে আসলো।ওদিকে ড্রয়িংরুমের সোফায় গালে হাত দিয়ে বসে আছে অ্যান্সি, নিক্সি, ওমর আর জেইন। চারজনের মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে তারা ঠিক কতটা চিন্তিত আর অপরাধবোধে ভুগছে। কিছুক্ষণ পর বাঁধন আবার ঘরে ফিরে এলো। সে অত্যন্ত শান্ত পায়ে রূপার বন্ধ রুমের সামনে এসে দাঁড়াল এবং চাবির গোছা থেকে সঠিক চাবিটা বেছে নিয়ে আস্তে করে দরজার লকে ঢুকিয়ে মোচড় দিল। একটা মৃদু শব্দ করে লকটা খুলে গেল।বাঁধন একদম নিঃশব্দে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল। ভেতরে এসেই তার চোখ পড়ল বিছানার দিকে। সে দেখলো রূপা বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে নিজের মুখটা বালিশে গুঁজে দিয়ে এখনো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। অনবরত তীব্র কান্নার কারণে তার বুকটা বারবার কেঁপে উঠছে, আর ঘন ঘন হেঁচকি উঠছে তার।বাঁধন রূপার কাছে গেল না সে বন্ধ দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে, বুকে দুহাত শক্ত করে ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর রূপার কাঁপতে থাকা পিঠের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে সেই চেনা বাঁকা হাসিটা ফুটিয়ে ঢঙে বলল,
—-” আমার বউ দেখি আজকাল আমাকে নিয়ে বড্ড বেশি জেলাস হতে শুরু করেছে!”
এই থমথমে নিস্তব্ধ ঘরে আচমকা বাঁধনের সেই অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে রূপা পুরো চমকে উঠল। সে তীব্র বিস্ময়ে বুঝতে পারল বাঁধন ঘরের ভেতরে চলে এসেছে। কিন্তু অভিমানে সে বাঁধনের দিকে ফিরেও তাকাল না। তবে সে শব্দের কান্নাটা কোনোমতে জোর করে থামিয়ে দিল, যদিও তার ভেতরের নিঃশব্দ কান্নার অবাধ্য স্রোতটা আর থামল না।বাঁধন এবার আর দূরে দাঁড়িয়ে রইল না। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বিছানার পাশে বসল। তারপর রূপার নরম হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে আলতো করে একটা টান দিয়ে রূপার মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল।
কিন্তু রূপার মুখের দিকে তাকানো মাত্রই বাঁধন নিজেই পুরো অবাক হয়ে গেল! তার ভেতরের সমস্ত চপলতা এক মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল। এত অল্প সময়ের ব্যবধানে একটা মানুষ কাঁদতে কাঁদতে নিজের চোখ জোড়া এভাবে ফুলিয়ে ফেলতে পারে, তা সে ভাবতেও পারেনি। রূপার ফর্সা গাল দুটো তীব্র অভিমানে একদম টকটকে লাল হয়ে উঠেছে, আর চোখের পাপড়িগুলো নোনা জলে ভিজে একে অপরের সাথে এলোমেলো হয়ে লেপ্টে আছে। মেয়েটার এই করুণ আর মায়াবী রূপ দেখে বাঁধনের বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত মায়ায় মুচড়ে উঠল।বাঁধন রূপাকে আর একটুও দূরে থাকতে দিল না; সে একপ্রকার জোর করেই রূপাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিয়ে আসলো। তারপর পরম মায়ায় নিজের হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে রূপার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া নোনা জলটুকু মুছে দিতে দিতে একটুখানি টিটকারির সুরে বলল,
—-” একটা মানুষ মরে গেলেও বোধহয় আজকাল কেউ এভাবে কাঁদে না রূপ, যেভাবে তুই সামান্য কারণে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছিস।”
রূপা কোনো কথা বলল না, তার চোখের জল যেন এক নিমেষে ক্ষোভে রূপ নিল। সে বাঁধনের শক্ত বাহুডোর থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য তীব্র ছটফট করতে থাকল। রূপার এমন অবাধ্য ছটফটানিতে বাঁধন কিছুটা বিরক্ত হলো। সে আর কোনো সুযোগ না দিয়ে এক ঝটকায় রূপার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিল এবং মুহূর্তের মধ্যে রূপার ওপর ওঠে নিজের আধিপত্য বিস্তার করে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—-” এভাবে ছটফট করছিস কেন? আমি কি তোকে মারছি, ইডিয়ট?”
রূপা রাগে ও চরম অভিমানে নিজের দুহাত দিয়ে বাঁধনের চওড়া বুকে সজোরে ধাক্কা দিতে দিতে চেঁচিয়ে বলল,
—-” ছাড়ুন আমাকে! ছুবেন না আমাকে আপনি!”
রূপার এই দূরত্ব তৈরি করার চেষ্টা দেখে বাঁধনের ভেতরের পুরুষালি জেদটা আরও চাড়া দিয়ে উঠল। সে রূপার ঠোঁটের খুব কাছে নিজের ঠোঁট দুটো নিয়ে আসলো। বাঁধনের মুখের তপ্ত নিঃশ্বাসগুলো তখন রূপার কপালে আর গালের ওপর আছড়ে পড়ছে। সে রূপার চোখের গভীরে নিজের চোখ জোড়া ডুবিয়ে দিয়ে নেশালো গলায় বলল,
—-” আই নো বেবি, ওরা আমার জাস্ট ফ্রেন্ড, দুবাই থেকে এসেছে। কিন্তু তোর কী হয়েছে বল তো? এভাবে হন্যে হয়ে কেঁদে আমাকে পাগল করে তুলছিস কেন? তুই কি জানিস না, তোর এই অবুঝ কান্না আমার বুকে অন্যরকম নেশা ধরিয়ে দেয়?”
রূপা বাঁধনের নেশালো চোখের দিকে নিজের জ্বলন্ত দৃষ্টি ফুটিয়ে অত্যন্ত রাগী কণ্ঠে বলে উঠল,
—-” তো আপনার ফ্রেন্ড এসেছে তাতে আমার কী? আমাকে কেন বলছেন এসব? যান না, গিয়ে আপনার ওই ফ্রেন্ডকে কোলে নিয়ে বসে থাকেন! শুধু জড়িয়ে ধরে তো আর মন ভরবে না, এবার কোলে তুলে নিতেও হবে আপনার!”
রূপার মুখ থেকে এমন ত্যাড়াবেঁকা কথা শোনামাত্রই মুহূর্তে বাঁধনের চোখের মণি দুটো রাগে গনগনে আগুনের মতো গরম হয়ে উঠল। সে এক ঝটকায় রূপার নরম চোয়ালটা নিজের শক্ত আঙুলের মুঠোয় চেপে ধরল। তারপর নিজের মুখটা রূপার কানের কাছে নিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে হিসহিসিয়ে বলল,
—-” আরেকটা ফালতু কথা যদি তোর মুখ থেকে বের হয়েছে তাহলে এখানেই তোকে জানে মেরে ফেলবো! এক কথা আমি দ্বিতীয়বার বলতে পছন্দ করি না, আই জাস্ট ডোন্ট লাইক ইট। সো আবারো পরিষ্কার করে বলছি, ওরা আমার ফ্রেন্ড। আর যে আমাকে ওভাবে জড়িয়ে ধরেছিল ওর নাম অ্যান্সি, খুব ভালো একটা মেয়ে ও। ওর সাথে আমি দীর্ঘ চৌদ্দটা বছর একসাথে বড় হয়েছি, ও আমার অতীত। তাই অ্যান্সিকে নিয়ে তোর এই নোংরা মন দিয়ে এরকম কোনো খারাপ কথা মুখেও আনবি না। অ্যান্সি আমার যেমন বেস্ট ফ্রেন্ড, ঠিক তেমনি ও আমার বোনের মতো, বুঝেছিস?”
রূপা নিজের চোয়ালের ব্যথা অগ্রাহ্য করে জেদি গলায় বলল,
—-” না বুঝি না! আর আপনার কোনো কথা আমি বুঝতেও চাই না। ছাড়ুন আমাকে আপনি!”
বাঁধনের ধৈর্যের বাঁধ এবার পুরোপুরি ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হলো। সে তার গলার রগ ফুলিয়ে বলল,
—-” রূপ, তুই কিন্তু আমাকে বড্ড বেশি রাগিয়ে দিচ্ছিস,এর ফল কিন্তু একদম ভালো হবে না।”
রূপা নিজের জেদ ধরে রেখে উল্টো চ্যালেঞ্জ ছোঁড়ার মতো করে বলল,
—-” কী করবেন আপনি?”
বাঁধন নিজের ঠোঁটের কোণে প্রগাঢ় হাসির রেখা ফুটিয়ে বলল,
—-” দেখতে চাস আমি এই মুহূর্তে কী করতে পারি?”
রূপা দমবার পাত্রী নয়, সে অবজ্ঞার সুরে বলল,
—-” কী করবেন? মারবেন? এটাই তো…।”
কিন্তু রূপা তার বাক্যের সেই বাকি অংশটুকু আর শেষ করার সুযোগ পেল না। বাঁধন নিজের সমস্ত রাগ আর কামনার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এক ঝটকায় রূপার ওষ্ঠে নিজের ওষ্ঠ মিলিয়ে দিল।এক মুহূর্তে রূপা চরম বিস্ময়ে ছটফট করতে থাকল। সে তার সর্বশক্তি দিয়ে বাঁধনের এই আকস্মিক অধিকার থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য দুমদাম করে বাঁধনের চওড়া পিঠে কিল-ঘুষি মারতে লাগল। কিন্তু বাঁধনের সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই সে যেন বাইরের সমস্ত পৃথিবীর কোলাহল ভুলে, নিজের চোখ দুটো বুজে পরম আপন গতিতে কখনো রূপার ঠোঁটে তীব্র কামড় বসাচ্ছে, আবার কখনো চুম্বকের মতো গভীর তৃষ্ণায় চুষে নিচ্ছে এই অনিন্দ্য রমণীর নরম ঠোঁট জোড়া। ঘরের ভেতরের বাতাস তখন দুই যুগলের তপ্ত আর অবাধ্য নিঃশ্বাসে ভারী হয়ে উঠতে লাগল।হাজার ছটফটানি আর পিঠে দুমদাম কিল-ঘুষি মেরেও রূপা এক চুল পরিমাণও সরাতে পারলো না এই বিশালদেহী পুরুষকে। বাঁধনের অমানুষিক শক্তির কাছে নিজের সমস্ত প্রতিরোধকে ব্যর্থ হতে দেখে সে একসময় হাল ছেড়ে দিয়ে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে নিল। ওষ্ঠের চরম আক্রোশ আর তৃষ্ণার মাঝে অজান্তেই সে অনুভব করতে থাকল পুরুষটির প্রতিটি গভীর ও মাদকতাময় স্পর্শ।
পাক্কা আট মিনিট পর, যখন রূপার দম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো, তখন বাঁধন আলতো করে রূপার ঠোঁট জোড়া ছেড়ে দিল। দুজনেই তীব্রভাবে হাঁপাতে থাকল, ঘরের নিস্তব্ধ বাতাস তাদের দ্রুত ওঠানামা করা তপ্ত নিঃশ্বাসে ভারী হয়ে উঠল। রূপার ফর্সা বুকটা রাগে আর উত্তেজনায় দ্রুত ওঠানামা করছে।বাঁধন নিজের বুকভরে শ্বাস নিতে নিতে রূপার থমথমে মুখের দিকে তাকাল। তারপর ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসিটা ফুটিয়ে বলে উঠল।
—-” তুই এখনো জ্ঞান হারাসনি রূপ? আমি তো ভাবছি এতক্ষণে হয়তো তুই তোর স্বভাবমতো জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিস। কিন্তু এখন দেখি বড় বড় চোখ করে রাগ নিয়ে তাকিয়ে আছিস আমার দিকে! কী ব্যাপার বল তো? তোকে রাগান্বিত অবস্থায় তোর সাথে রোমান্স করতে আসলে দেখি তুই একটুও কাঁপিস না, অথচ এমনিতে আমি সাধারণভাবে তোর কাছে আসলেই তুই থরথর করে কাঁপতে থাকিস!”
রূপা নিজের সমস্ত ক্ষোভ আর অপমান এক করে রাগে চিৎকার করে উঠল,
—-” অসভ্য, নির্লজ্জ পুরুষ একটা! একটু আগে ড্রয়িংরুমে অন্য একজনকে জড়িয়ে ধরে থাকা হচ্ছিল, আর এখন এখানে এসে আমাকে চুমু খাওয়া হচ্ছে? লজ্জা করে না আপনার?”
রূপার ঝাঁঝালো কথার পিঠে কোনো উত্তর না দিয়ে, বাঁধন শব্দ করে রূপার ঠোঁটে আরও একটা গভীর চুমু খেলো। তারপর তার টকটকে লাল হয়ে থাকা গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে পরম মায়ায় বলল,
—-” আমি কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে অ্যান্সিকে জড়িয়ে ধরিনি রূপ, আর না অ্যান্সি আমাকে ওভাবে ধরেছে। তোর এই ছোট্ট মনের নোংরা চিন্তাগুলো এবার বন্ধ কর? আর লক্ষ্মী মেয়ের মতো আমার সাথে চল, ওরা বাইরে আমার ওয়াইফের সাথে দেখা করার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।”
রূপা বাঁধনের চওড়া বুকে হাত দিয়ে সজোরে একটা ধাক্কা দিয়ে মুখ ফিরিয়ে বলল,
—-” যাবো না আমি! চলে যান এখান থেকে আপনি।”
বাঁধন রূপার চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে শান্ত সুরে বলল,
—-” যাবি না?”
রূপা নিজের জেদ ধরে রেখে বলল,
—-” না!”
—-” সত্যি যাবি না?”
—-” বললাম তো যাবো না!”
রমণীর এই অবাধ্য জেদ আর মুখের ওপর সরাসরি ‘না’ শব্দটা পুরুষটিকে যেন আরও বেশি বেসামাল আর উগ্র করে তুলল। সে মুহূর্তের মধ্যে নিজের মুখটা ডুবিয়ে দিল রমণীর উন্মুক্ত গলার ভাঁজে। রূপার দুটো হাত এক করে মাথার ওপর শক্ত করে চেপে ধরে, মসৃণ ঘাড়ের ওপর নিজের নাক ঘষতে ঘষতে ঘোর লাগা নেশালো কণ্ঠে বলল,
—-” নো প্রবলেম বেবি! তুই তাহলে এখানেই শুয়ে থাক, আর আমার এই পাগলামিগুলো নিরবে সহ্য কর।”
বাঁধনের আকস্মিক ও তীব্র আক্রমণে রূপার সারা সর্বাঙ্গে এক অলৌকিক শিহরণ খেলে গেল, তার ভেতরটা ছটফট করে উঠল। সে নিজের সমস্ত কম্পন আড়াল করার চেষ্টা করে কোনো রকমে জড়ানো গলায় বলল,
—-” দেখুন, ভালো হবে না কিন্তু! আমার ওপর থেকে উঠুন বলছি!”
কিন্তু সেই মিনতি এই কামনাসিক্ত পুরুষের কানেই পৌঁছাল না। বাঁধন নিজের ভেজা ঠোঁট দিয়ে রমণীর টি-শার্টটা কাঁধ থেকে কিছুটা নিচে নামিয়ে ফেলল।মুহুর্তে উমক্ত হয়ে ওঠল রমণীর কিছুটা কাঁধ। সাথে সাথে রমণীর সেই উন্মুক্ত, ফর্সা কাঁধের ওপর নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল সে। তীব্র এক শিহরণে থরথর করে কেঁপে উঠল রূপা, তার চোখ দুটো আপনাআপনি বন্ধ হয়ে এল।কিন্তু পুরুষটি সেখানেই থামল না সে যেন এক গভীর নেশায় ডুবে গিয়ে রমণীর পুরো ঘাড় ও গলার আশেপাশে একে অপরের পর এক তৃষ্ণার্ত চুমু খেতে থাকল। তার ঠোঁটের প্রতিটি ভেজা ও তপ্ত স্পর্শ রূপার সারা শরীরে অদ্ভুত অবশ করা কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে। রূপা নিজের ঠোঁট দুটো দাঁত দিয়ে চেপে ধরে, রাগে আর ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
—-” কী হচ্ছে কী এসব? ছাড়ুন বলছি আমাকে!”
বাঁধন রূপার ঘাড়ের নরম চামড়ায় ঠোঁট ডুবিয়ে রেখেই ডুবন্ত গলায় জবাব দিল,
—-” উম্ম কী ইয়াম্মি! তুই এভাবেই রাগ করে থাক রূপ, সহজে রাগ কমাবি না একদম, আর আমি এভাবেই সারাক্ষণ তোকে আদর করব।”
রূপা নিজের চোখ দুটো বড় বড় করে রাগী গলায় বলল,
—-” এবার কিন্তু বেশি হয়ে যাচ্ছে!”
বাঁধন কোনো কথা না শুনে ঝটপট রূপার ঠোঁটে আরও একটা গভীর চুমু খেলো, তারপর তার কাঁধের ফর্সা অংশে হালকা একটু জোরে কামড় বসাল।
—-” আহহ! অসভ্য একটা!”
ব্যথায় আর তীব্র শিহরণে রূপার মুখ থেকে অস্ফুট শব্দ বের হতেই বাঁধন তার গাল দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,
—-” লিসেন টু মি বেবি, তোকে আমি কোনো কিছুই কম দেবো না। আমার সবটাই তোর। আমার ভালোবাসা, আমার আদর, সব তোর। এমনকি আমার ভেতরের প্রাণটাও তোর নামে লিখে দেওয়া।”
রূপা তীব্র অভিমানে মুখটা একদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বলল,
—-” বুকের ভেতর কয়জনকে রেখে এত ভালোবাসা দেখাতে আসছেন মিস্টার বাঁধন রহমান?”
বাঁধন মুহূর্তে থেমে গেল। সে রূপার মুখের পানে চেয়ে ভুবন ভোলানো একটা চওড়া হাসি দিল। তারপর নিজের মুখটা রূপার কানের খুব কাছে নিয়ে আলতো করে লয় মিলিয়ে গেয়ে উঠল,
‘এই বুকেতে কেউ থাকে না
থাকো শুধু তুমি
খুব যতনে সংগোপনে
লুকিয়ে রাখি আমি’
বাঁধনের মিষ্টি গানের সুরে মুহূর্তের মধ্যে থমকে গেল রূপা। তার মনে হলো, কোনো এক মায়াবী রাজকুমার যেন তার কানে কানে গভীর ভালোবাসার কথা আউড়ে গেল। রূপার এই নীরবতা আর শান্ত রূপ দেখে বাঁধন ঠোঁট ফুলিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস নিল। তারপর আলতো করে রূপার নরম গালে হাত রেখে, তার চোখের গভীরে তাকিয়ে আকুতিভরা কণ্ঠে বলল,
—-” বিলিভ মি মাই হার্ট, আমি সেভাবে অ্যান্সিকে জড়িয়ে ধরিনি, আর অ্যান্সিও না। ও সত্যিই খুব ভালো একটা মেয়ে। প্লিজ সোনা, একবার আমার সাথে বাইরে চল, ওদের সাথে কথা বল। তারপর তুই নিজের চোখে দেখিস ওরা কেমন। প্লিজ বেবি, জাস্ট একটা বার আমার কথাটা রাখ।”
বাঁধনের এমন আকুতি আর নরম সুরের কথাগুলো রূপার ভেতরের জমে থাকা অভিমানের পাহাড়টাকে নিমেষেই গলিয়ে দিল। তার রাগটা কিছুটা শিথিল হয়ে এলো। সে একটু নিচু স্বরে, আস্তে করে বলল,
—-” ঠিক আছে, চলুন।”
বাঁধনের চোখে-মুখে খুশির জোয়ার বয়ে গেল। সে আর এক সেকেন্ড সময় নষ্ট না করে রূপার গালে শব্দ করে একটা চুমু খেয়ে বলল,
—-” এই তো আমার লক্ষ্মী বউ!”
তারপর বাঁধন রূপার হাতটা পরম শক্তিতে নিজের হাতের মুঠোয় পুরে ড্রয়িংরুমের দিকে এগিয়ে গেল।ড্রয়িংরুমে তখন অ্যান্সি, নিক্সি, ওমর আর জেইন চারজনে মূর্তির মতো চুপচাপ বসে আছে। পুরো ঘরে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। বাঁধন রূপাকে সাথে নিয়ে ঠিক সবার সামনে এসে দাঁড়াল। রূপাকে দেখামাত্রই অ্যান্সি সোফা ছেড়ে প্রায় ছুটে আসলো। তারপর রূপাকে চরম অবাক করে দিয়ে, তাকে আলতো করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বলল,
—-” আই অ্যাম সো সরি রূপা! আমি আসলেই জানতাম না যে তুমি এভাবে রাগ করবে। প্লিজ, আমার ওপর আর রাগ করে থেকো না।”
অ্যান্সির এই আকস্মিক আচরণে রূপা যেন পুরো থমকে গেল। একটা বিদেশি মেয়ে তাকে এভাবে আপন করে জড়িয়ে ধরবে, তা সে কল্পনাও করতে পারেনি। সে যেন ক্ষণিকের জন্য মুখের ভাষাটুকুই হারিয়ে ফেলল। ওদিকে রূপাকে নীরব থাকতে দেখে অ্যান্সি ভাবল রূপা হয়তো এখনো তার ওপর মনে কষ্ট চেপে রেখেছে। সে মুহূর্তে রূপাকে ছেড়ে দিয়ে, তার দুটো নরম হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বেশ আকুল হয়ে বলল,
—-” রূপা, প্লিজ আমাকে মাফ করে দাও। আসলে আমি বাংলাদেশের কালচার বা নিয়মকানুনের বিষয়ে তেমন একটা জানি না। আমাদের বিদেশে এরকম আবেগে বা খুশিতে যে কাউকে জড়িয়ে ধরা যায়, কেউ কিছু মনে করে না। আর আমি ঠিক ওখানকার নিয়মেই বাঁধনকে জড়িয়ে ধরে ফেলেছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি অন্য কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে ওকে জড়িয়ে ধরিনি। বাঁধন আমার ছোটবেলার বেস্ট ফ্রেন্ড, ও ওখান থেকে চলে আসার পর আমরা সবাই ওকে অনেক মিস করেছি। তাই তো ওকে না জানিয়ে হুট করে সবাই মিলে বাংলাদেশে চলে আসলাম। আর হঠাৎ ওকে চোখের সামনে দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারিনি, জড়িয়ে ধরে ফেলেছি। প্লিজ তুমি কিছু মনে করো না।”
অ্যান্সির এমন অমায়িক ব্যবহার, অকপট স্বীকারোক্তি আর চোখের ভেতরের সরলতা দেখে এখন রূপার নিজের ভেতরেই এক তীব্র অপরাধবোধ কাজ করতে লাগল। সে মনে মনে ভাবল কেন যে সে কিছু না জেনে, না শুনে ওভাবে রাগ করে সবার সামনে থেকে কেঁদে কেঁদে চলে গেল! নিজেকে বড্ড ছোট মনে হতে লাগল তার।রূপাকে এভাবে মাথা চুপ করে থাকতে দেখে আর কোনো উত্তর না পেয়ে অ্যান্সি কিছুটা মন খারাপ করে আবার বলল,
—-” কথা বলবে না আমার সাথে?”
রূপা নিজের লজ্জা আর অস্বস্তিতে মাথাটা একটু নিচু করে ফেলল। নিজের হাত দুটো মোচড়াতে মোচড়াতে আমতা আমতা করে বলল,
—-” ইয়ে মানে আপু সরি! ভুলটা তোমার নয়, আসলে আমারই ছিল।”
রূপার লাজুক ভঙ্গি দেখে অ্যান্সি খিলখিল করে হেসে উঠল। পরম মায়ায় রূপার থুতনি ধরে মাথাটা সোজা করে চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—-” বুঝেছি! তুমি আমার বন্ধুকে নিয়ে বড্ড বেশি সিরিয়াস, আর সেটাই তো স্বাভাবিক। এটাই তো খাঁটি ভালোবাসা! যাই হোক, আমি অ্যান্সি। তোমার হাজবেন্ডের একদম ছোটবেলার বেস্ট ফ্রেন্ড।”
অ্যান্সির মুখের আন্তরিক হাসি দেখে রূপার ভেতরের সব জড়তা কেটে গেল। সেও মৃদু হেসে বলল,
—-” আমি রূপা।”
অ্যান্সি আবারও হেসে ফেলল,
—-” সেটা অনেক আগেই জেনে গেছি!”
ঠিক তখনই নিক্সি সোফা ছেড়ে এগিয়ে আসলো। সে রূপার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলল,
—-” আমি নিক্সি। কেমন আছো রূপা?”
রূপা নিক্সির দিকে তাকিয়ে নম্র গলায় বলল,
—-” আলহামদুলিল্লাহ, ভালো। আপনি?”
—-” আমিও ভালো আছি।”
এরপর বাঁধন একে একে ওমর আর জেইনের সাথেও রূপার পরিচয় করিয়ে দিল। প্রথম দিকের সেই ভুল বোঝাবুঝি আর অস্বস্তিগুলো ভুলে রূপা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সবার সাথে বেশ মিশুক হয়ে উঠল। বাঁধন সবার পছন্দের কথা চিন্তা করে রাতের খাবারের জন্য বাইরে অর্ডার করে দিল।সবাই ড্রয়িংরুমে গোল হয়ে বসে জমজমাট আড্ডায় মগ্ন হলো। বাঁধন অ্যান্সি, নিক্সি, ওমর আর জেইনের সাথে পুরোনো দিনের হাজারো স্মৃতি নিয়ে হেসে হেসে কথা বলছে। রূপা একপাশে চুপচাপ বসে তাদের সেই আনন্দের মুহূর্তগুলো দেখছে। বিদেশি মানুষরা যে এতটা অমায়িক, বন্ধুবৎসল আর ভালো মনের হতে পারে, তা হয়তো বাঁধনের এই বন্ধুদের না দেখলে রূপা কোনোদিন জানতেই পারত না। তার মনের ভেতরের শেষ সংশয়টুকুও দূর হয়ে গেল।হঠাৎ আড্ডার মাঝেই বাঁধন সোফায় একটু আয়েশ করে গা এলিয়ে দিয়ে বসল। সে আড়চোখে একবার রূপার লাজুক মুখের দিকে তাকিয়ে নিল, তারপর ঠোঁটের কোণে একটা দুষ্টুমিভরা হাসি ফুটিয়ে অ্যান্সির দিকে চেয়ে বলল,
—-” অ্যান্সি, শোন।”
অ্যান্সি ওমরের সাথে একটা বিষয়ে হাসাহাসি করছিল, বাঁধনের ডাক শুনে সে চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে জবাব দিল,
—-” হুম বল, শুনতেছি?”
বাঁধন আবার আড়চোখে রূপার দিকে তাকাল। রূপা তখন এমন একটা থমথমে মুখ করে সোফায় বসে আছে, যা দেখে স্পষ্ট মনে হচ্ছে আগামী পাঁচ মিনিটের মধ্যে সে ঠিক কারও না কারও কপালে রান্নাঘরের শক্ত বেলন এনে ভাঙবে! বাঁধন অবশ্য সেই চন্ডী রূপ দেখেও পুরো নির্বিকার। সে অ্যান্সির দিকে চেয়ে বেশ আয়েশ করে বলল,
—-” তুই আমার বউরে এভাবে মাঝেমাঝেই রাগাই দিবি। যদি প্রতিদিন ওকে একটু একটু করে রাগাইতে পারোস, তাইলে তোরে আমি প্রতিদিন একটা কইরা আমাদের বাংলাদেশের স্পেশাল জিলাপি কিনা খাওয়ামু।”
অ্যান্সি বাঁধনের এমন অদ্ভুত শর্ত শুনে সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভ্রু উঁচিয়ে অবাক হয়ে বলল,
—-” হোয়াট ইস জিলাপি? এটা কী জিনিস? আর তাছাড়া, আমি তোর ওয়াইফকে কেন হুদাহুদি রাগাবো?”
বাঁধন এবার নিজের মুখের সমস্ত চপলতা মুছে একদম গম্ভীর মুখ করে অ্যান্সির দিকে তাকাল। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে যেন এই মুহূর্তে দেশের কোনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে যাচ্ছে। সে অত্যন্ত ধীরস্থির গলায় বলল,
—-” কারণ আমার বউ স্বাভাবিক অবস্থায় সুস্থ মাথায় রোমান্স করতে গেলে ঝটপট জ্ঞান হারাইয়া ফেলে। কিন্তু ও যখন প্রচণ্ড রেগে থাকে, তখন আমি ডার্ক রোমান্স করলেও আমার বউ সহজে জ্ঞান হারায় না।”
বাঁধন এক সেকেন্ডের জন্য থামল, তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে সোজা রূপার দিকে তাকাল। রূপার চোখ দুটো তখন বাঁধনের এই নির্লজ্জ স্বীকারোক্তি শুনে এমনিতেই গোল গোল হয়ে গেছে। বাঁধন তার দিকে তাকিয়েই আবার অ্যান্সির উদ্দেশ্যে বলল,
—-” যার জলজ্যান্ত প্রমাণ আমি আজ নিজেই নিজ চোখে পাইছি।”
অ্যান্সি ধীরে ধীরে একবার রূপার সেই লাল হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকাল, তারপর আবার চরম বিস্ময় নিয়ে বাঁধনের দিকে চাইল,
—-” তুই তোর বউকে রাগিয়ে তারপর রোমান্স করবি?”
বাঁধন খুব স্বাভাবিক ও শান্ত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল,
—-” হুম।”
অ্যান্সি নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, সে সোফায় সোজা হয়ে বসে বলল,
—-” ইউ আর সাইকো বাঁধন!”
বাঁধন ঠোঁটের কোণে চেনা বাঁকা হাসিটা ফুটিয়ে বলল,
—-” ধন্যবাদ।”
অ্যান্সি বাঁধনের এমন সাবলীল উত্তর শুনে পুরো হতভম্ব হয়ে গেল। সে চোখ বড় বড় করে বলল,
—-” আবাল একটা! আমি তোকে গালি দিছি!”
—-” আমি ওটা প্রশংসা হিসেবেই নিলাম।”
বাঁধন আবারও রূপার দিকে তাকাল, তারপর অ্যান্সির দিকে ঝুঁকে এসে বেশ নিচু গলায় বলল,
—-” তুই বরং ওকে আরেকবার যেকোনো উপায়ে রাগাই দিস।”
অ্যান্সি এবার নিজের চোখ দুটো কপালে তুলে বলল,
—-” কেন রে?”
বাঁধন একদম শান্ত ও গম্ভীর গলায় উত্তর দিল,
—-” এবার সুযোগ বুঝে বাসরটা সাইরা নিমু।”
রূপা রাগে আর চরম লজ্জায় সোফার ওপর থেকে একটা কুশন বালিশ তুলে নিয়ে সজোরে ছুঁড়ে মারল বাঁধনের দিকে। বাঁধন অবশ্য বেশ পাকা খেলোয়াড়ের মতো এক হাতেই ওটা ক্যাচ ধরে ফেলল।ওমর বাঁকা হেসে বাঁধনের দিকে চেয়ে কৌতূহলী গলায় বলল,
—-” তার মানে তুই এখনো ভার্জিন?”
বাঁধন একটুও না লুকিয়ে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। তার এই স্বীকারোক্তি শোনামাত্রই জেইন রূপার লাল হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলল,
—-” আরে হালার পুত, দেখ তোর বউ রেগে পুরো ফায়ার হয়ে গেছে!”
বাঁধন রূপার পানে চাইল। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে তীব্র দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটা। বাঁধন দুষ্টুমি করে বলল,
—-” ওইভাবে বাঘিনীর মতো তাকিয়ে আছিস কেন? কামড়ে খেয়ে ফেলবি নাকি?”
রূপা মুখে কিছু বলল না। রাগে সোফা থেকে আরও একটা বালিশ তুলে সজোরে বাঁধনের দিকে ছুঁড়ে মারল এবং ফুঁসতে ফুঁসতে হনহন করে নিজের রুমে চলে গেল।ড্রয়িংরুমে থাকা অ্যান্সি, ওমর আর জেইন একযোগে উচ্চস্বরে হেসে উঠল। শুধু বাঁধন বাদে, সে রূপার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে। নিক্সি এগিয়ে এসে বাঁধনের পাশে বসল। তার কাঁধে আলতো করে একটা চাপড় মেরে বলল,
—-” শুধু শুধু মেয়েটাকে ওভাবে সবার সামনে রাগিয়ে দিলি কেন বল তো?”
বাঁধন কুশনটা সোফায় একপাশে রেখে খুব নির্ভাবনায় জবাব দিল,
—-” ভালো লাগলো, তাই রাগিয়ে দিলাম।”
অ্যান্সি রূপার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধতার সুরে বলল,
—-” ও দেখতে কিন্তু অনেক মিষ্টি! বাংলাদেশি মেয়েরা যে এতটা সুন্দর হতে পারে, সেটা আমি আগে জানতামই না।”
জেইন এতক্ষণ রূপার চেহারার গড়নটা খুব সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করছিল। সে চিবুক হাতড়ে বলল,
—-” কিন্তু রূপার চেহারার মাঝে কেমন জানি একটা বিদেশি টাইপ কাটিং আছে, যদিও ও পুরোপুরি বাংলাদেশি।”
বন্ধুদের এই আলোচনা শুনে বাঁধন এবার সোফায় সোজা হয়ে বসল। সে বেশ গম্ভীর গলায় বলল,
—-” বিদেশি মানুষের চেহারায় বিদেশি কাটিং আসবে না তো কি আমাদের দেশের কাটিং আসবে?”
অ্যান্সি জেইনের কথার খেই ধরে নিজের ভ্রু জোড়া কুঁচকে ফেলল,
—-” বিদেশি মানে? তুই কী বলতে চাস?”
বাঁধন একটা দীর্ঘ গভীর শ্বাস ফেলে সবার মুখের ওপর তাকাল। চরম সত্যটা প্রকাশ করে শান্ত গলায় বলল,
—-” রূপা আসলে বাংলাদেশি নয়, ওর জন্ম কানাডায় একটা নামকরা ক্রিশ্চিয়ান বংশে।”
বাঁধনের মুখের এই একটা বাক্য শোনামাত্র ড্রয়িংরুমের চারজন যেন আকাশ থেকে পড়ল। তারা একযোগে তীব্র বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল,
—-” হোয়াট!”
বাঁধন নিজের দুই কান হাত দিয়ে চেপে ধরে চরম বিরক্ত কণ্ঠে বলল,
—-” আরে আস্তে! কানের পর্দা ছিড়ে ফেলবি নাকি বেকুবের দল?”
জেইন আর এক মুহূর্তও তর সইতে পারল না। সে ঝড়ের গতিতে সোফা থেকে উঠে এসে সোজা বাঁধনের সামনে ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। বাঁধনের দুই হাঁটু খামচে ধরে আকুল হয়ে বলল,
—-” রহস্যটা কী বল তো? রূপা বিদেশি মানে? তুই নিজে একজন সাচ্চা মুসলিম হয়ে একটা খাঁটি বিদেশি খ্রিষ্টান মেয়েকে বিয়ে করে ফেললি কীভাবে?”
অ্যান্সিও সোফায় বাঁধনের আরও একটু ঘেঁষে বসল। ওমর জেইনের এই ব্যাকুলতা দেখে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, সে-ও সোফা ছেড়ে এসে জেইনের পাশে ধপ করে ফ্লোরে বসে পড়ল। সবার চোখে-মুখে তখন এক বিশাল রহস্য উন্মোচনের তীব্র কৌতূহল। অ্যান্সি বাঁধনের হাত ঝাঁকিয়ে বলল,
—-” বল না দোস্ত, তুই রূপাকে ঠিক কোথায় পেলি?”
বাঁধন আর বন্ধুদের কাছে কিছু লুকাল না। সে এক এক করে রূপার অতীত, কানাডার সেই ক্রিশ্চিয়ান বংশের পরিচয় থেকে শুরু করে তাদের জীবনের ঘটে যাওয়া সমস্ত ঝড়-ঝাপটার ইতিহাস বিস্তারিত খুলে বলল। বাঁধনের মুখের অবিশ্বাস্য কাহিনি শুনে ড্রয়িংরুমের চারজনের চোখ চড়কগাছে উঠে গেল।জেইন নিজের মাথায় হাত দিয়ে বলল,
—-” ও মাই গড! এত বড় ঘটনা ঘটে গেছে তোর লাইফে?”
নিক্সি বিস্ময়ে ঢোক গিলে বলল,
—-” তার মানে তুই কোনো সাধারণ মেয়ে না, সরাসরি মাফিয়া ডনের মেয়েকে বিয়ে করেছিস?”
ওমর অবশ্য এসবে একদমই পাত্তা দিল না, সে হাত নেড়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
—-” ধুর, তাতে কী হয়েছে? রূপার বাবা তো মারাই গেছে। এখন কী সে কবর থেকে ভূত হয়ে উঠে এসে বাঁধনের বাসরে বাধা দেবে নাকি?”
নিক্সি ওমরের এই ফাজিল মার্কা কথা শুনে আর সহ্য করতে পারল না। সে সাথে সাথে ওমরের মাথায় একটা শক্ত চাট্টি মেরে বলল,
—-” ভূত হয়ে উঠে এসে সবার আগে তোর এই হাতির মতো ঘাড়টা মটকে দেবে, দেখিস!”
ওমর নিজের মাথায় হাত বুলিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
—-” আর তোর এই ঝাঁকড়া চুলগুলো টেনে ছিঁড়ে ফেলবে ডাইনি বুড়ি!”
নিক্সি রাগে সোফায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত দিয়ে বলল,
—-” কী বললি তুই? আমি ডাইনি?”
ওমর নিজের দুই হাত তুলে বলল,
—-” আহা, ভুল হয়ে গেছে, চরম ভুল! সরি। তুই আসলে ডাইনি নোস, তুই হচ্ছিস অ্যানাকন্ডা সাপ!”
নিক্সি এবার রাগে পুরো অগ্নিশর্মা হয়ে গেল। সে এক ঝটকায় ফ্লোরে ঝুঁকে এসে ওমরের মাথার চুল শক্ত করে টেনে ধরে বলল,
—-” তুই নিজে কী ? তুই হচ্ছিস মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা ড্রেন থেকে ওঠা একটা ভেজা ইঁদুর!”
ওমরও ব্যথায় ককিয়ে উঠে সাথে সাথে নিক্সির মাথার চুল খামচে ধরে টেনে বলল,
—-” চুল ছাড় কইতাছি ওরে আমার নাইজেরিয়ান ডাইনি! নাহলে তোর এই গু কালারের মেকআপ করা চুলগুলো একটা একটা করে ছিঁড়ে নিয়ে গিয়ে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেবো, তখন বুঝবি!”
—-“চুল ছাড় বলছি, ড্রেনের ইঁদুর!”
—-” তুই আগে ছাড় অ্যানাকন্ডা!”
বাঁধন নিজের দুহাত দিয়ে সোফায় একটা সজোরে থাপ্পড় মেরে রাগী গলায় ধমক দিয়ে বলল,
—-” থামবি তোরা নাকি ঘাড় ধরে ঘর থেকে বের করে দেবো?”
বাঁধনের বাঘের মতো ধমক খেয়ে দুজনেই ভয় পেয়ে ছিটকে গেল এবং তড়িঘড়ি করে একে অপরের চুল ছেড়ে দিয়ে যার যার জায়গায় সুড়সুড় করে বসে পড়ল। ওমরের মাথার চুল তখন পাখির বাসার মতো খাড়া হয়ে আছে, আর নিক্সি ফুঁসতে ফুঁসতে নিজের গু কালারের চুলগুলো সোজা করতে ব্যস্ত। বাঁধনের রাগী মুখের সামনে আর কেউ একটাও কথা বলার সাহস পেল না। ড্রয়িংরুমে এক ঝটকায় পিনপতন নীরবতা নেমে এল, সবাই চোরের মতো চুপচাপ বসে রইল।
কিছুক্ষণ পর পুরো ঘরের থমথমে ভাবটা কাটাতে অ্যান্সি আলতো করে বাঁধনের কাঁধে হাত রাখল। সে অত্যন্ত আন্তরিক নরম গলায় বলল,
—-” আমরা যতোদিন আছি, তোর পাশে আছি দোস্ত। যেকোনো বিপদে আমরা চারজন তোর পাশে থাকবো।”
অ্যান্সির ভরসা জোগানো কথায় বাঁধনের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে সুন্দর হাসি ফুটে উঠল। সে মনে মনে ভাবল, বিদেশে গিয়ে আর কিছু পাক বা না পাক, এমন কিছু হীরের টুকরো মনের মতো বন্ধু সে পেয়েছে, যাদের জন্য সত্যিই বুক ফুলিয়ে গর্ব করা যায়।তার কিছুক্ষণের মধ্যেই মেইন দরজার কলিংবেলটা বেজে উঠল। ডেলিভারি ম্যান রাতের খাবার নিয়ে চলে এসেছে। বাঁধন খাবারগুলো রিসিভ করার পর সবার ভেতরের গুমোট ভাবটা একদম কেটে গেল। এরপর ডাইনিং টেবিলে সবাই একসাথে বসে হাসতে হাসতে, একে অপরকে খেপিয়ে আড্ডা দিতে দিতে রাতের খাওয়া শেষ করল। রূপাও এতক্ষণে সবার সাথে বেশ সহজ হয়ে একটু-আধটু হাসিমুখে কথা বলল।খাওয়া-দাওয়া শেষে এবার ঘুমানোর পালা। বাঁধন পুরো ফ্ল্যাটের ঘুমানোর ব্যবস্থাটা একটু সাজিয়ে নিল। সে রূপার দিকে তাকিয়ে অ্যান্সি আর নিক্সিকে বলল,
—-” তোরা আজ রাতে রূপার সাথে ওর রুমেই গিয়ে শো।”
অ্যান্সি আর নিক্সিও সানন্দে রাজি হয়ে রূপার সাথে তার রুমে চলে গেল। আর ওদিকে বাঁধন জেইন আর ওমরকে সাথে নিয়ে নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ল।
এদিকে রূপার চোখে যেন আজ কোনো ঘুমই নেই। বিছানার একপাশে শুয়ে সে এপাশ-ওপাশ করতে লাগল। আসলে ইদানীং বাঁধনের শক্ত চওড়া বুকে মাথা গুঁজে নিশ্চিন্তে ঘুমানোটা তার একটা প্রাত্যহিক অভ্যাস হয়ে গেছে। বাঁধনের সেই চেনা পুরুষালি গায়ের গন্ধ আর ওই নিরাপদ আশ্রয় ছাড়া আজকাল যেন তার চোখেই ঘুম আসে না। মনের ভেতর এক তীব্র শূন্যতা আর বাঁধনের জন্য এক অদ্ভুত টান অনুভব করতে লাগল সে। তবুও এখন আর কোনো উপায় নেই, সবার সামনে নিজের অস্থিরতা আড়াল করতে সে শুধু জোর করে চোখ দুটো বন্ধ করে পড়ে থাকল।রাত যখন একদম নিঝুম হয়ে এল, ঘড়ির কাঁটা তখন শেষ রাতের জানান দিচ্ছে। রূপার ক্লান্ত মন আর অবাধ্য চোখের পাতা দুটো এতক্ষণে কিছুটা ভারী হয়ে আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে এল। সে গভীর ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেল।
__________
পরেরদিন বাঁধন সরকারি অফিস থেকে নিজের জিপ গাড়িটা নিয়ে চলে আসলো এবং সবাইকে নিজের দেশ ঘুরে দেখানোর জন্য বেরিয়ে পড়ল। রূপাকে তার কলেজের গেটের সামনে নামিয়ে দিয়ে বাঁধন বেশ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
—-” এক্সামের পর একদম গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকবি, আমি তোকে নিতে আসবো। আর মন দিয়ে লিখবি, কোনো সমস্যা হলে আকাশকে বলবি। ইট উইল বি রিমেম্বার্ড!”
রূপা বাধ্য মেয়ের মতো হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। গাড়ির ভেতর থেকে অ্যান্সি সাথে সাথে রূপার দিকে হাত নেড়ে মিষ্টি করে বলল,
—-” বাই রূপা! খুব ভালো করে এক্সাম দিও। বিকেলে আবার দেখা হবে।”
বাঁধন গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বন্ধুদের নিয়ে চলে গেল। কলেজের মেইন গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই রূপার সাথে বৃষ্টির দেখা হয়ে গেল। দুই বান্ধবী এক্সাম নিয়ে টুকটাক কথা বলতে বলতে পরীক্ষার হলের দিকে এগিয়ে গেল এবং ক্লাসে প্রবেশ করল। বসার পর রূপা বাঁধনের সেই বিদেশি ফ্রেন্ডদের আসার সব কথা বেশ উৎসাহ নিয়ে বৃষ্টিকে বলল। বৃষ্টিও সব শুনে খুব খুশি হলো।সময়ের নিজস্ব গতিতে পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল। ফাইনাল বেল পড়তেই পুরো হলের মধ্যে এক পিনপতন নীরবতা নেমে আসলো এবং সবাই যার যার খাতায় লেখায় তুমুল বিজি হয়ে পড়ল। আজ তাদের বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষা। লেখার মাঝেই বৃষ্টি হুট করে একটা প্রশ্নের উত্তর মেলাতে পারল না, কিছুতেই মনে পড়ছে না। প্রশ্নটা দেখে তার মনে হচ্ছে এটা সিলেবাসের যেন একদম বাহির থেকে এসেছে। সে উত্তরটা মনে করার চেষ্টা করতে করতে নিজের কলমটা নিয়ে আঙুলের ফাঁকে অনবরত মুচড়ামুচড়ি করতে থাকল। সে রূপাকে একটু জিজ্ঞেস করবে, তারও কোনো উপায় নেই, কারণ রূপা তার থেকে অনেকটা দূরে অন্য একটা বেঞ্চে পড়েছে। বৃষ্টির মুখটা মুহূর্তে চরম অসহায় হয়ে এলো।
ঠিক তখনই কলেজের একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত স্যারের সাথে পরীক্ষার নানা বিষয়ে কথা বলতে বলতে করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল আকাশ। হঠাৎ তার তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া গিয়ে পড়ল ওই ক্লাসরুমের জানালার দিকে। সে দেখতে পেল, বৃষ্টি লেখা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়ে কলমটা ধরে অবাধ্যের মতো মুচড়ামুচড়ি করছে। মুহূর্তেই আকাশের ঘন ভ্রু জোড়া কুঁচকে আসলো। পরীক্ষা চলছে, অথচ লেখা বন্ধ করে মেয়েটা এভাবে চুপচাপ বসে আছে কেন? নিজের ভেতরের কৌতূহল আর দ্বিমত সামলাতে না পেরে আকাশ সাথে থাকা স্যারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সরাসরি ওই ক্লাসরুমে প্রবেশ করল।
আকাশকে হঠাৎ হলের ভেতর ঢুকতে দেখে অনেক ছাত্র-ছাত্রী ভয় পেয়ে এক ঝটকায় সোজা হয়ে বসে পড়ল। বৃষ্টিও হুট করে আকাশকে নিজের সামনে দেখে ভেতরে ভেতরে তীব্রভাবে কেঁপে উঠল। সে সাথে সাথে মাথাটা একদম নিচু করে ফেলল, তার বুকের ভেতরটা ভয়ে দড়াম দড়াম করে কেঁপে চলছে।আকাশ ধীর পায়ে হেঁটে সোজা বৃষ্টির বেঞ্চের পাশে এসে দাঁড়াল। নিজের দুই হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে বৃষ্টির নিচু হয়ে থাকা মুখের পানে চেয়ে অত্যন্ত গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
—-” ইজ দেয়ার এনি প্রবলেম, বৃষ্টি?”
আকাশের গম্ভীর ও ভারী কণ্ঠস্বর শুনে আবারও শিউরে উঠল বৃষ্টি। সে নিজের থরথর করে কাঁপতে থাকা গলায় কোনো রকমে আমতা আমতা করে উত্তর দিল,
—-” না.. না স্যার! কোনো…কোনো সমস্যা নেই।”
আকাশ নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বৃষ্টির চোখের ওপর স্থির রেখে শান্ত গলায় বলল,
—-” বৃষ্টি, একদম মিথ্যা বলবে না! আমি চাইলে কিন্তু এই মুহূর্তেই তোমাকে ক্লাস থেকে বের করে দিতে পারি। কোন কোশ্চেনে সমস্যা হচ্ছে, সেটা পরিষ্কার করে বলো?”
বৃষ্টির বুঝতে আর এক বিন্দুও বাকি রইল না যে, এই হিটলার স্যার কোনো না কোনোভাবে ঠিকই বুঝে গেছে সে প্রশ্নের গোলকধাঁধায় পড়ে বিপদে পড়েছে। তবুও বৃষ্টিকে এভাবে নিরুত্তর চুপচাপ থাকতে দেখে আকাশ এবার বেশ চড়া সুরে ধমক দিয়ে বলল,
—-” হোয়াট হ্যাপেন্ড? কানে শুনতে পাওনি আমি কী বলেছি? উত্তর দাও!”
বৃষ্টি কাঁপতে কাঁপতে নিজের প্রশ্নপত্রটা আকাশের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে অপরাধীর মতো নিচু গলায় বলল,
—- ” স্যার এই প্রশ্নের উত্তরটা কোনোভাবেই মনে করতে পারছি না।”
আকাশ নিজের ঘন ভ্রু জোড়া কুঁচকে প্রশ্নটার দিকে তাকাল। খুবই সহজ একটা সাধারণ জ্ঞান ও সৃজনশীল অংশের প্রশ্ন, অথচ এই সামান্য উত্তরটা নাকি এই মেয়েটা মনে করতে পারছে না! মনে মনে একটু হাসলেও আকাশ তার গম্ভীর ভাবটা বজায় রাখল। সে সরাসরি এখানে উত্তরটা বলে দিতে পারছে না কারণ শিক্ষকের মুখ থেকে উত্তর শুনলে হলের বাকি ছাত্র-ছাত্রীরাও তখন সুযোগ বুঝে তাকে ডাকাডাকি শুরু করবে, আর তখন সাহায্য না করলে সবাই মিলে একটা ঝামেলা পাকাবে।হঠাৎ আকাশ নিজের মুখের ভাবটা আরও বেশি থমথমে আর রাগী করে ফেলল। সে বৃষ্টির বেঞ্চ ছেড়ে করিডোরের দিকে যেতে যেতে ক্লাসের সবার সামনে বেশ চড়া ও রাগী কণ্ঠে বৃষ্টির উদ্দেশ্যে বলল,
—- ” ছোটবেলায় আমার দাদি আমাকে একটা অদ্ভুত গল্প শুনিয়েছিল, কেউ নাকি যদি কাজী নজরুল ইসলামকে ভুলে যায়, তবে তাঁর ভূত এসে মাঝরাতে নাকি তার গলা চেপে ধরে! সেই ভয়ের চোটে আমি তখন থেকে কাজী নজরুল ইসলামকে একটু বেশিই মনে রেখেছি। তুমিও এবার থেকে ভালো করে পড়াশোনা কোরো বৃষ্টি, নাহলে রাতে কাজী নজরুল ইসলাম তোমাকেও এসে ওভাবে গলা টিপে ধরবে!”
কথাটা বলতে বলতেই আকাশ আর এক সেকেন্ডও না দাঁড়িয়ে হনহন করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেল।বৃষ্টি তো পুরো হা হয়ে বসে রইল। সে আকাশের এই অদ্ভুত কথার কোনো মাথামুন্ডুই বুঝল না। পরীক্ষার হলের মাঝে কাজী নজরুল ইসলাম গলা টিপে ধরে মানে কী? এই হিটলার স্যার কি পাগল হয়ে গেল নাকি!হঠাৎ ‘কাজী নজরুল ইসলাম’ নামটা মনের ভেতর খটকা লাগাতেই বৃষ্টি চট করে নিজের প্রশ্নপত্রের দিকে তাকাল। এক নম্বর জ্ঞানমূলক প্রশ্নের দিকে চোখ পড়তেই তার চোখ দুটো চড়কগাছে উঠল,
ক.’বিদ্রোহী’ কবিতার রচয়িতা কে?
প্রশ্নটা দেখামাত্রই বৃষ্টির মাথায় যেন এক নিমেষে বজ্রপাত হলো! ‘বিদ্রোহী’ কবিতার রচয়িতা কবি তাহলে কাজী নজরুল ইসলাম!তার মানে আকাশ স্যার সরাসরি উত্তর না বলে এতক্ষণ দাদির গল্পের বাহানায় তাকে এই এক নম্বরের উত্তরটাই ওভাবে ইশারায় দিয়ে গেল! হিটলার স্যারের এমন বুদ্ধিদীপ্ত উপায়ে নকল সাপ্লাই দেওয়ার কায়দা দেখে বৃষ্টি নিজের ঠোঁট চেপে এক গাল হেসে ফেলল।
_____________
পরীক্ষা শেষ হওয়ার ফাইনাল বেল পড়তেই রূপা, বৃষ্টি, নাদিয়া আর কেয়া মনের আনন্দে খাতা জমা দিয়ে গল্প করতে করতে ক্লাস থেকে বের হলো। করিডোর পার হয়ে কলেজের মেইন গেটের কাছে আসতেই সীমা বেশ তাড়াহুড়ো করে রূপার দিকে এগিয়ে এসে বলল,
—- ” তোমার জন্যই এতক্ষণ গেটের কাছে অপেক্ষা করছিলাম রূপা। আমার সাথে প্লিজ একটু একটা জায়গায় যাবে?”
রূপা বেশ কৌতূহল নিয়ে সীমার মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—- ” কোথায় যাবে সীমা? কী হয়েছে?”
সীমা নিজের চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু আড়াল করে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
—- ” আমার মা খুব অসুস্থ, হসপিটালে ভর্তি। আমি এই নতুন শহরে তেমন একটা রাস্তাঘাট চিনি না। ইসরাতের শরীর খারাপ থাকায় ও পরীক্ষা দিয়েই আগেই বাড়ি চলে গেছে। তাই এখন আমি একাই হসপিটালে যাওয়ার সাহস পাচ্ছি না। আমার ফুপি আর ফুপা অবশ্য আগেই ওখানে চলে গেছেন, কিন্তু আমার বড্ড ভয় করছে।”
সীমার মায়ের এমন বিপদের কথা শুনে রূপা আর কিছুতেই ‘না’ করতে পারল না। সে সাথে সাথে সীমার হাত ধরে বলল,
—- ” কোনো চিন্তা কোরো না সীমা, চলো আমি যাবো তোমার সাথে।”
পাশ থেকে রূপাকে এবাভাবে একা ছাড়তে না পেরে বৃষ্টিও চট করে বলে উঠল,
—- ” আমিও তোদের সাথে যাবো।”
নাদিয়া আর কেয়া ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যার যার বাড়ির উদ্দেশ্যে চলে গেল। এরপর সীমা, রূপা আর বৃষ্টিকে সাথে নিয়ে একটা খালি রিকশায় উঠে বসল।রিকশায় ওঠার পর সীমার মায়ের চিন্তায় রূপা এতটাই মশগুল হয়ে পড়ল যে, সে সম্পূর্ণ ভুলেই গেল বাঁধন তাকে পরীক্ষা শেষে গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে বলেছিল এবং সে নিজেই তাকে নিতে আসবে। ওদিকে রিকশায় বসে সীমার বুকটা এক তীব্র অপরাধবোধে কুঁকড়ে যাচ্ছিল। সে রূপার দিকে তাকাতে পারছিল না, তাই মুখ ফিরিয়ে নীরবে চোখের পানি ফেলছিল।বেশ কিছুক্ষণ চলার পর রিকশাটা হসপিটালের সামনে না গিয়ে হুট করে এসে থামল একটা একদম ফাঁকা, জনমানবহীন নদীর পাড়ে। চারপাশটা বড্ড নিঝুম। রিকশা থেকে নেমে রূপা আর বৃষ্টি দুজনেই চরম অবাক হয়ে চারদিকে তাকাতে লাগল। রূপা ভ্রু কুঁচকে সীমার দিকে চেয়ে বলল,
—- ” এখানে কেন নিয়ে আসলে সীমা? হসপিটাল কোথায়?”
সীমা কোনোমতে নিজের গলার স্বর স্বাভাবিক রেখে বলল,
—- ” আমার সাথে চলো আমি সব বলছি।”
সীমা দুজনকে সাথে নিয়ে নদীর পাড়ের একটু ভেতরের দিকে চলে আসলো। রূপা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সীমা হুট করে নিজের ব্যাগ থেকে একটা কালো রঙের রেশমি কাপড় বের করে রূপার চোখ দুটো শক্ত করে বেঁধে ফেলল। রূপা চমকে উঠতেই সীমা মিষ্টি করে বলল,
—- ” একটা দারুণ সারপ্রাইজ আছে তোমার জন্য! প্লিজ রূপা, কিচ্ছু জিজ্ঞেস কোরো না, চুপচাপ জাস্ট আমার সাথে চলো।”
রূপা আর বৃষ্টি দুজনের কেউই আসলে মাথায় খাটাতে পারছে না যে সীমা এই নির্জন নদীর পাড়ে এনে তাদের সাথে ঠিক কী করতে চাইছে। বৃষ্টি একটু ভয় পেলেও সীমার আশ্বাসে চুপ রইল। কিছুক্ষণ পর সীমা রূপার হাত ধরে ধরে নিয়ে এসে নদীর একদম সামনে দাঁড় করাল।ঠিক তখনই সামনের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির চোখ দুটো বিস্ময়ে ও ধাক্কায় বড় বড় হয়ে গেল! সে কিছু একটা বলার জন্য যেই না মুখ খুলবে, অমনি দেখতে পেল ঠিক রূপার সামনে লাল টকটকে একগুচ্ছ গোলাপ ফুল হাতে নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল ইশতিয়াক!ইশতিয়াক হাঁটু গেড়ে বসে রূপার ওই কালো কাপড়ে বাঁধা চোখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলল,
—- ” আমি কোনো কবি নই রূপা যে একজন কবির মতো সুন্দর সুন্দর ছন্দ মিলিয়ে তোমাকে প্রপোজ করব। আমি খুব সাধারণভাবেই আজ তোমাকে আমার মনের জমানো কথাটা জানাতে চাই। তবে আজ যে কথাটা আমি তোমাকে বলব, এই কথাটা আমার দীর্ঘদিনের অপেক্ষার ফসল। বহু বহুদিন ধরে আমি চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করে ছিলাম এই একটা কথা তোমাকে সামনাসামনি বলার জন্য। আজ অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এসেছে আমার মনের সবটুকু ভালোবাসা তোমাকে জানানোর। রূপা, আমি তোমাকে ভালোবাসি। শুধু ভালোবাসাই না, নিজের জীবনের চেয়েও অনেক বেশি ভালোবাসি! আই লাভ ইউ রূপা!”
ঠিক সেই মুহূর্তে নদীর পাড়ের একটু দূরে হেঁটে হেঁটে এসে থেমে দাঁড়াল বাঁধন, অ্যান্সি, নিক্সি, ওমর আর জেইন। কিছুক্ষণ আগে রূপাদের কলেজে যাওয়ার সময় বাঁধন জিপ গাড়িটা ড্রাইভ করার ফাঁকে হঠাৎ দেখতে পায় রূপা একটা রিকশায় চড়ে অন্যদিকে যাচ্ছে। কলেজ গেটে নেওয়ার কথা থাকলেও রূপাকে এভাবে অন্য দিকে যেতে দেখে বাঁধনের মনের ভেতর খটকা লাগে। সে সন্দেহ বশে গাড়ি ঘুরিয়ে ওই রিকশাকে দূর থেকে নীরবʽ ফলো করতে করতে এই নির্জন নদীর পাড়ে এসে পৌঁছায়। গাড়ি থেকে নেমে তারা পিছু নিতে নিতে ঠিক এই দৃশ্যটার সামনে এসে দাঁড়াল, বাঁধন বাদে বাকি সবার মুখ চরম বিস্ময়ে জাস্ট হা হয়ে গেল!অ্যান্সি নিজের চোখ দুটো ডলতে ডলতে ফিসফিস করে বলে উঠল,
—- ” ওহ মাই গড! এটা কী হচ্ছে এখানে?”
চলবে….!
[বড় পর্ব লিখতে অনেক সময় লাগছে।গল্পে বিদেশি চরিত্রগুলোর সংলাপ আমি সাধারণ বাংলা ভাষায় লিখেছি, যাতে সবাই সহজে পড়তে ও বুঝতে পারে। কারণ ইংরেজি বা অন্য বিদেশি ভাষায় লিখলে অনেকেরই বুঝতে সমস্যা হতে পারে। তবে তোমাদের যদি মনে হয় বিদেশি চরিত্রদের সংলাপ তাদের নিজস্ব ভাষায় থাকলে গল্পটা আরও বাস্তবসম্মত ও সুন্দর লাগবে, তাহলে অবশ্যই কমেন্ট করে জানিও। তোমাদের মতামতকে আমি সবসময় গুরুত্ব দিই]
[আর একটা ছোট্ট অনুরোধ গল্পটা ভালো লাগলে অবশ্যই লাইক, কমেন্ট, শেয়ার আর বেশি বেশি সাপোর্ট কোরো। সত্যি বলতে, তোমাদের সাপোর্টই আমার লেখার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। সাপোর্ট না পেলে লিখতে বসার ইচ্ছেটাই অনেকটা হারিয়ে যায়। তাই সবসময় পাশে থেকো। ভালোবাসা রইল সবাইকে]
Share On:
TAGS: বাঁধন রূপের অধিকারী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ১৮
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২৮
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ১৯
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২০
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২৯
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৮
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২৫
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩৪
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩৫