Golpo romantic golpo বাঁধন রূপের অধিকারী

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ১৩


বাঁধন রূপের অধিকারী

#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী

#পর্ব ১৩

শান্তা পিল পিল করে চোখ খুলল। নিজেকে একটা অচেনা রুমে আবিষ্কার করে সে কপালে হাত দিয়ে উঠে বসল। মাথাটা প্রচণ্ড ভারী লাগছে। হঠাৎ সবকিছু মনে পড়ে যেতেই তার বুকটা ধক করে উঠল। কেউ তাকে অপহরণ করেছে বুঝতে পেরে সে বাঁচাও বলে আর্তনাদ করতে চাইল। কিন্তু আর্তনাদ করার আগেই দরজা খুলে প্রবেশ করল চওড়া সুঠাম দেহের এক দীর্ঘ যুবক।

শান্তা কেভিনকে দেখে ভয়ার্ত আর কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল।

“আ—আমায় এখানে কেন নিয়ে এসেছেন? প্লিজ আমায় ছেড়ে দিন?”

কেভিন এক চিলতে শয়তানি হাসি দিয়ে শান্তার দিকে এগোতে এগোতে কুৎসিত রসিকতার কণ্ঠে বলল।

“আরে রিলাক্স বেবি। এত হাইপার হচ্ছো কেন? তোমাকে তো ছেড়ে দেওয়ার জন্য আনা হয়নি।”

শান্তা বিছানায় পিছাতে পিছাতে আকুল কণ্ঠে বলল।

“কেন আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন? কী ক্ষতি করেছি আমি আপনাদের? প্লিজ আমাকে যেতে দিন?”

কেভিন শান্তার আরও কাছে ঝুঁকে এসে নেশাক্ত কণ্ঠে বলল।

“আরে ডার্লিং। ভয় পেয়ো না। তুমি কোনো ক্ষতি করোনি। তবে তোমার এই শরীরটা করছে। সে আমাকে ডাকছে। কাম অন বেবি। জাস্ট ইনজয়।”

বলেই সে শান্তার ওপর ঝুঁকে পড়ল। শান্তা রাগ আর ঘেন্নায় কেভিনকে ধাক্কা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকল। কেভিন শান্তার দুই হাত বিছানায় লক করে দিয়ে তার শরীরের সুবাস নেওয়ার চেষ্টা করতেই শান্তা সব শক্তি দিয়ে কেভিনের ঘাড়ে সজোরে কামড় বসিয়ে দিল।

“আহহহহ।”

কেভিন যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠে বিছানার এক পাশে ছিটকে পড়ল। সে হাত দিয়ে ঘাড় চেপে ধরে হিংস্র আর রাগী কণ্ঠে গর্জে উঠল।

“এত বড় সাহস। তুই কেভিনকে কামড় দিস? হারামি মেয়ে। ভালো ভাবে আদর করতে চেয়েছি আর তুই কামড় দিলি? দাঁড়া। তোর কী অবস্থা করি আমি দেখ।”

শান্তা এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে বিছানা থেকে নেমে আশে পাশে তাকাতে লাগল। হঠাৎ টেবিলের ওপর একটা ভারী মাটির ফুলদানি দেখে সে দ্রুত সেটা হাতে তুলে নিল এবং কেভিনের মাথায় সজোরে আঘাত করল।

“আহহহ শিট।”

কেভিন মাথা চেপে ধরে মেঝেতে বসে পড়ল। তার কপাল বেয়ে তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। সে ব্যথায় আর্তনাদ করতে থাকল। শান্তা বিছানার কোণায় নিজের ব্যাগটা দেখতে পেয়ে সেটা ছোঁ মেরে নিয়ে পাগলের মতো রুম থেকে বেরিয়ে দৌড় দিল।

কেভিনের আর্তনাদ শুনে রবিন ঝড়ের বেগে রুমে ঢুকল। কেভিনের রক্তাক্ত অবস্থা দেখে সে আতঙ্কিত কণ্ঠে বলল।

“ওহ গড। এইটা কীভাবে হলো? আপনার মাথা দিয়ে তো অনেক রক্ত পড়ছে?”

কেভিন রক্তমাখা হাতে নিজের জখমটা চেপে ধরে প্রতিহিংসায় ভরা ক্রুর কণ্ঠে বলল।

“সুন্দর জিনিসের দাম আর তেজ একটু বেশিই থাকে। মেয়েটা পালিয়েছে। ওকে ধর। ওকে আমি এমন শিক্ষা দেবো যে ও নিজের নাম উচ্চারণ করতেও ঘৃণা বোধ করবে।”

শান্তা বাড়ি থেকে বেরিয়ে দেখল চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। চারপাশ থেকে বন্য জীবজন্তুর ডাক ভেসে আসছে তার মানে এটা কোনো গভীর জঙ্গল। হঠাৎ সে দেখল চারজন লোক তাকে ধরার জন্য হন্যে হয়ে আসছে। সে আর কিছু না ভেবে ঘন জঙ্গলের দিকে মরণপণ দৌড় দিল। পিছু পিছু ধাওয়া করল রবিন আর তার সাঙ্গোপাঙ্গরা। পেছন থেকে রবিন হুমকিভরা কণ্ঠে চিৎকার করে বলল।

“এই দাঁড়া বলছি। পালালে কিন্তু হাশর খুব খারাপ হবে।”

শান্তা থামল না। বাঁচার শেষ চেষ্টাটুকু দিয়ে সে দৌড়াচ্ছে। একসময় সে হাঁপিয়ে উঠল। ফুসফুস ফেটে যাওয়ার দশা। চারদিকে তাকিয়ে দেখল কেউ নেই। সে দ্রুত নিজেকে আড়াল করার জন্য একটা ঘন ঝোপের ভেতরে ঢুকে পড়ল। কিছুক্ষণ পর রবিনরা সেখানে এসে থামল। রনি চারপাশ দেখে বাকি ছেলেদের উদ্দেশ্যে আদেশসূচক কণ্ঠে বলল।

“গেল কোথায়? এত তাড়াতাড়ি এই জঙ্গল পার হওয়ার কথা না। আমার মনে হয় আশেপাশেই আছে। সবাই আলাদা হয়ে সার্চ কর।”

সবাই আলাদা হয়ে শান্তাকে খুঁজতে লাগল। শান্তা ঝোপের মধ্যে একটা মোটা কাঠের ডাল খুঁজে পেল। ঠিক সেই মুহূর্তে একটা ছেলে শান্তার একদম কাছে চলে এল। শান্তা সুযোগ বুঝে হাতের লাঠি দিয়ে সজোরে ছেলেটার মাথায় আঘাত করল। ছেলেটা ব্যথায় আর্তনাদ করতে গেলে শান্তা খপ করে তার মুখ চেপে ধরল। তারপর অন্য হাতে একমুঠো ধুলো নিয়ে সজোরে ছেলেটার চোখে মেখে দিল। যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা ছেলেটার পকেট থেকে সে ফোনটা বের করে নিল। ফোনটা লক করা থাকলেও সে বিন্দুমাত্র দেরি না করে ইমার্জেন্সি ৯৯৯-এ ডায়াল করল। ওপাশ থেকে ওসি অখিল পেশাদার গাম্ভীর্য নিয়ে ফোন রিসিভ করে বলল।

“হ্যালো। কন্ট্রোল রুম থেকে বলছি। আপনার সমস্যাটা বলুন।”

শান্তা হাপাতে হাপাতে অস্থির কণ্ঠে বলল।

“স্যার। আমি শান্তা। আমাকে বাঁচান। আমাকে একটা জঙ্গলের ভেতর তুলে নিয়ে আসা হয়েছে। ওরা আমার বড় ক্ষতি করতে চায়।”

অখিল চমকে উঠল। সে দ্রুত সহকর্মীদের সিগন্যাল দিয়ে তৎপরতার সাথে বলল।

“শান্তা। আমরা তোমাকেই খুঁজছি। শান্ত হও। আমাদের বলো তুমি ঠিক কোন জায়গায় আছো?”

শান্তা কাঁদতে কাঁদতে বলল।

“আমি জানি না স্যার। চারদিকে শুধু ঘন জঙ্গল আর অন্ধকার। কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না।”

অখিল তাকে সাহস দিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল।

“শোনো শান্তা। ফোনটা একদম কাটবে না। আমাদের সাথে লাইনে থাকো। আমরা তোমার লোকেশন ট্র্যাক করছি। একদম ভয় পেয়ো না। পুলিশ টিম মুভ করছে। জাস্ট হোল্ড অন।”

ফোনটা লাইনে রেখেই অখিল কম্পিউটার অপারেটরকে কর্তৃত্বের স্বরে নির্দেশ দিল।

“ফাস্ট। এই নম্বরটা ইমিডিয়েটলি ট্রেস করো। আই ওয়ান্ট দ্য কো-অর্ডিনেটস রাইট নাউ।”

এরপর সে দ্রুত এসপি বাঁধনকে কল দিল। বাঁধন তখন শান্তার নিজের ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করে দেখছিল সেটা তার বাড়িতেই পড়ে আছে। অখিলের ফোন পেতেই বাঁধন উদ্বিগ্ন কিন্তু গম্ভীর কণ্ঠে রিসিভ করল। অখিল দ্রুত জানাল।

“শান্তার খোঁজ পাওয়া গেছে। ও ৯৯৯-এ কল করেছে। ও হিউম্যান ট্র্যাফিকারদের খপ্পরে পড়েছে। এখন একটা জঙ্গলের ভেতরে আছে।”

বাঁধন বিদ্যুৎবেগে উঠে দাঁড়িয়ে কমান্ডিং ভয়েসে জিজ্ঞেস করল।

“লোকেশন কি পিনপয়েন্ট করা গেছে?”

অখিল উত্তর দিল।

“আইটি সেল কাজ করছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পেয়ে যাব।”

বাঁধন তখন তার গান বেল্টটা ঠিক করতে করতে চূড়ান্ত পেশাদারিত্বের সাথে আদেশ দিল।

“লোকেশন পাওয়ার সাথে সাথে আমাকে ম্যাপ ফরোয়ার্ড কর। আর সবকটা এন্ট্রি পয়েন্ট ব্লক করার জন্য লোকাল থানাকে অ্যালার্ট পাঠা। আই অ্যাম অন মাই ওয়ে।”

কিছুক্ষণের মধ্যেই লোকেশন ট্র্যাক করে বাঁধন সহ পুরো পুলিশ টিম রওনা দিল। এদিকে শান্তা সেই ছেলেটার মুখ ছেড়ে দিয়ে পাশে এলিয়ে পড়ল। তার শরীরটা প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে এসেছে। সাথে সাথে ছেলেটা চিৎকার শুরু করতেই সেই শব্দে রবিনরা দৌড়ে আসল। শান্তাকে দেখতে পেয়েই দুইজন তাকে টেনেহিঁচড়ে তুলল। রনি আর বাকিরা মিলে আহত ছেলেটাকে পাঁজাকোলে তুলে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল।

শান্তার তখন জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা। তাকে টেনেহিঁচড়ে আবার সেই বাড়িতে এনে রুমের ভেতর ছুড়ে মারল। শান্তা তার দুর্বল শরীর নিয়ে যন্ত্রণায় আর্তনাদ করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর কেভিন আবার রুমে ঢুকল। তার মাথায় সাদা ব্যান্ডেজ। চোখ দুটো রাগে রক্তবর্ণ হয়ে আছে। শান্তা আবারও কেভিনকে দেখে আকুল হয়ে বলল।

“প্লিজ আমার এত বড় সর্বনাশ করবেন না। আমি আপনার বোনের মতো।”

কেভিন ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে এসে শান্তার চুলের মুঠি ধরে হিংস্র কণ্ঠে বলল।

“হারামি মেয়ে। তোর সাহস দেখে আমি অবাক। তুই আমার মাথা ফাটিয়েছিস? তোর আজ এমন হাল করব যে আয়নাতে নিজের চেহারা দেখতেও তুই ভয় পাবি।”

বলেই কেভিন নিজের কোমরের বেল্ট খুলে শান্তার হাত দুটো শক্ত করে বেঁধে দিল। এরপর সে শান্তার গায়ের পোশাক টেনে ছিঁড়ে ফেলল। শান্তা অসহায়ভাবে চোখ বন্ধ করে গগণবিদারী চিৎকার দিয়ে উঠল।

“ওহ আল্লাহ। তুমি আমার মরণ লেখো।”

কেভিন শান্তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং পশুর মতো আচরণ শুরু করল। শান্তার সারা শরীর সে কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করতে লাগল। শান্তা আর্তনাদ করতে করতে বাঁচার শেষ আশাটুকুও হারিয়ে ফেলছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে প্রচণ্ড শব্দে লাথি মেরে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল অখিল। ভেতরের দৃশ্য দেখে অখিল কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে চোখ বন্ধ করে নিল। অপমানে আর রাগে তার শরীর কাঁপছে। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সজোরে এক লাথি মারল কেভিনকে। কেভিন ছিটকে পড়ে চিৎকার করে উঠল।

“আহহহ। কোন কুত্তার বাচ্চা রে এটা?”

পিছন থেকে অখিল বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠল।

“তোর আজরাইল।”

কেভিন বিছানা থেকে নেমে অখিলকে দেখে চমকে উঠল। তার এই গোপন ডেরায় পুলিশ কীভাবে ঢুকল সে ভেবে পেল না। শান্তা তখন বিছানায় বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে কাঁদছে। অখিল এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজের গায়ের পুলিশের ইউনিফর্মটা খুলে দ্রুত শান্তার শরীরে জড়িয়ে দিল। এই সুযোগে কেভিন জানলা দিয়ে লাফিয়ে দৌড়ে পালালো। শান্তা কাঁদতে কাঁদতে ভাঙা গলায় বলল।

“ওরা আমাকে কলঙ্কিত করে দিল। এই সমাজে আমি আর মুখ দেখাতে পারব না।”

অখিল পরম মমতায় শান্তাকে নিজের বুকে চেপে ধরে সান্ত্বনার স্বরে বলল।

“কিচ্ছু হয়নি শান্তা। সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি একদম চিন্তা করো না। আমি আছি তো।”

অখিল দ্রুত বাঁধনকে ফোন দিল। বাঁধন তখন বাকি গুন্ডাদের সাথে তুমুল লড়াইয়ে ব্যস্ত। চারপাশ থেকে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়ছে অপরাধীরা। পুলিশ বাহিনী প্রথমে আত্মরক্ষার চেষ্টা করলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় তারাও পাল্টা গুলিবর্ষণ শুরু করে। বাঁধন অনেক কষ্টে অখিলকে ভেতরে পাঠাতে পেরেছিল। সে একটা বড় গাছের আড়ালে পজিশন নিয়ে অখিলের ফোন রিসিভ করে হাপাতে হাপাতে বলল।

“অখিল। তুই ঠিক আছিস? শান্তাকে পেয়েছিস?”

অখিল ওপাশ থেকে গম্ভীর কিন্তু কিছুটা স্বস্তির গলায় জানাল।

“হ্যাঁ শান্তাকে পেয়েছি। ও সুরক্ষিত আছে। কিন্তু যে অপরাধী শান্তার ক্ষতি করতে চেয়েছিল। সে পিছনের জানালা দিয়ে পালিয়েছে। শান্তার অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না বলে আমি ওকে রেখেই পিছু নিতে পারিনি। আগে ওকে সামলাতে হয়েছে।”

বাঁধন দাতে দাত চেপে বলল।

“ওকে। তুই শান্তার ওখানেই থাক। বাকিটা আমি দেখছি।”

বলেই বাঁধন রিভলবার হাতে নিয়ে পিছনের ঘন জঙ্গলের দিকে দৌড় শুরু করল। এদিকে কেভিন উন্মাদের মতো দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ একটা গাছের শিকড়ে হোঁচট খেয়ে উপুড় হয়ে পড়ে গেল। সে ওঠার চেষ্টা করতেই দেখল যমদূতের মতো তার সামনে দাঁড়াল বাঁধন। বাঁধন সরাসরি কেভিনের কপালে রিভলবার তাক করে কঠোর কণ্ঠে গর্জে উঠল।

“হ্যান্ডস আপ। একদম নড়াচড়া করবে না। জাস্ট সারেন্ডার বিফোর দ্য ল। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করলে একদম খুলি উড়িয়ে দেব। পালানোর রাস্তা বন্ধ। জাস্ট কিপ ইউর হ্যান্ডস হোয়্যার আই ক্যান সি দেম।”

কেভিনের মুখটা ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে মরিয়া হয়ে চারপাশ দেখল। হঠাৎ সে তার পুরনো চাতুরতা কাজে লাগিয়ে দুই হাত মাটিতে চেপে ধরে একমুঠো ধুলো নিল। পলক ফেলার আগেই সে ধুলোটা বাঁধনের চোখে ছুড়ে মারল। বাঁধন তীব্র যন্ত্রণায় মুহূর্তেই চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার চোখ যেন পুড়ে যাচ্ছে।

সেই সুযোগে কেভিন বাঁধনের হাত থেকে রিভলবারটা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। বাঁধনের রাগের আর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। কিসের আইন। কিসের পেশাদারি নিয়ম সে সব ভুলে গিয়ে চোখ বন্ধ অবস্থাতেই আন্দাজে কেভিনের নাক বরাবর এক সজোরে ঘুষি মারল। কেভিন ছিটকে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। বাঁধন পকেট থেকে টিস্যু বের করে দ্রুত চোখ মুছে কেভিনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারপর ইচ্ছেমতো মারতে মারতে ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলল।

“হারামির বাচ্চা। তোকে ভালোভাবে সারেন্ডার করতে বলেছি আর তুই আমার চোখে ধুলো দিস? তোর কত বড় সাহস এটাই আমি দেখবো।”

কেভিনও পালটা আক্রমণ করার চেষ্টা করল। কিন্তু বছরের পর বছর ট্রেনিং নেওয়া বাঁধনের কৌশলের কাছে সে নস্যি। বাঁধনের মারামারি করার স্টাইল একদম সিনেমার অ্যাকশন হিরোদের মতো নিখুঁত। কেভিনের নাক-মুখ ফেটে রক্ত ঝরতে লাগল। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে বাঁধনের বেল্ট থেকে রিভলবারটা মাটিতে পড়ে গেল। কেভিন মাটিতে লুটিয়ে থাকা অবস্থাতেই ওটা দেখতে পেল এবং বিদ্যুৎবেগে রিভলবারটা হাতে নিয়ে বাঁধনকে লক্ষ্য করে ট্রিগার চেপে দিল।

পরপর গুলির শব্দ। বাঁধনের কপাল ভালো যে গুলিটা সরাসরি বুকে না লেগে তার হাতে বিঁধল। বাঁধন যন্ত্রণায় হাত চেপে ধরে আর্তনাদ করে উঠল।

“আহহহ শিট।”

কেভিন টালমাটাল অবস্থায় উঠে দাঁড়িয়ে দৌড় শুরু করল। বাঁধন এক হাত দিয়ে অন্য হাতের ক্ষতস্থান চেপে ধরে ওই অবস্থাতেই কেভিনের পিছু নিল। সে জঙ্গলের লতাপাতা মাড়িয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে একদম হিমশীতল আর জেদি কণ্ঠে চিৎকার করে বলল।

“ভালোয় ভালোয় বলছি ধরা দে। নাহলে আজ যদি তোকে জ্যান্ত ছেড়ে না দিই। তবে আমিও বাঁধন না। এমন অবস্থা তোর করব যে বেঁচে থেকেও তুই প্রতি মুহূর্তে মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করবি।”

দৌড়াতে দৌড়াতে বাঁধনের শরীর এখন একদম অবশ হয়ে আসছে। মাথায় প্রচণ্ড ঝিমঝিনি। চোখ ভেঙে ঘুম আসছে সে বুঝতে পারছে আর কিছুক্ষণ এভাবে চললে সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু এই নরপিশাচ অপরাধী কেভিনকে তাকে ধরতেই হবে। নাহলে সব শেষ। বাঁধন যখন টলমল পায়ে শেষ চেষ্টাটুকু করছিল। ঠিক তখনি তার চোখের সামনে দিয়ে বিদ্যুতের বেগে একটা মেয়ে দৌড়ে গেল।

বাঁধন মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। সে যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। চাঁদের আবছা আলোয় মনে হচ্ছে কোনো এক রূপকথার পরী জঙ্গল চিরে বেরিয়ে এসেছে। মেয়েটার পরনে ধবধবে সাদা রঙের একটা লম্বা ড্রিফট ড্রেস। যার হাতাগুলো অনেক চওড়া আর ঝুলন্ত। পিঠে ঝোলানো তীরের তূণ আর হাতে মজবুত একটা ধনুক। তার লম্বা কালো চুলগুলো পিঠ ছাপিয়ে নিচে নেমে গেছে। আর মুখটা একটা পাতলা ওড়না বা কাপড়ে ঢাকা। শুধু রহস্যময় এক জোড়া চোখ দেখা যাচ্ছে।

মেয়েটা এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। সে খুব নিখুঁতভাবে তার ধনুক থেকে একটা তীর লক্ষ্য করল কেভিনের দিকে। শাঁ শাঁ করে একটা শব্দ হলো। আর পরের মুহূর্তেই সেই বিষাক্ত তীরের মতো ফলা গিয়ে বিঁধল কেভিনের পায়ে। কেভিন মরণ চিৎকার দিয়ে আছাড় খেয়ে পড়ল মাটিতে।

বাঁধন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। তার চোখের সামনে পুরো জঙ্গলটা যেন বনবন করে ঘুরছে। সে পাশে থাকা একটা বিশাল পুরোনো গাছের সাথে হেলান দিয়ে ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল। তার ইউনিফর্মের হাতা বেয়ে টপটপ করে রক্ত ঝরছে। ঝাপসা দৃষ্টিতে সে শুধু দেখল সেই সাদা পোশাকের রহস্যময়ী মেয়েটা ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে। বাঁধন ফিসফিস করে কিছু বলতে চাইল। কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। সে শুধু অপলক দৃষ্টিতে ওই মায়াবী চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।

রানিং..

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply