Golpo romantic golpo প্রিয়তার পূর্ণতা

প্রিয়তার পূর্ণতা পর্ব ১৯


#Nadia_Afrin

১৯

ব‍্যাথাতুর শরীর নিয়ে বিছানায় বসে আছি আমি।জ্বর করেছে।ব‍্যাথাটা আছে।থেকে থেকে বাড়ছে।

পাশে থাকা ফোনটা বেজে উঠলো।

ভাই কল করেছে।রিসিভ করতেই বলল,”স‍্যরি রে প্রিয়তা চোরটাকে ধরতে পারলামনা।টানা দু-দিন ঐ দোকানদারের বাড়িতে পাহাড়া বসিয়েও কোনো লাভ হলোনা।সম্ভবত জেনে গেছে।

আর সেই দোকানদারকেও ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে।কে নিয়ে গেছে জানিস?

তোর শাশুড়ি আর একটা মহিলা।সম্ভবত তোর খালাশাশুড়ি হবে।এদের ওপর মহলে হাত আছে।

কোনোভাবেই আটকে রাখতে পারিনি আমি।”

এই বলে ভাইয়া কল রেখে দিল।

আমি ভাবনায় পড়ে গেলাম মা কেন সেই লোককে ছাড়ালো।

জিজ্ঞেস করতে হবে।

ধীরে ধীরে উঠলাম।সিড়ি দিয়ে নামলাম খুব সাবধানে।মাকে দেখলাম সোফায় বসে টিভি দেখছে।আমি তার পাশে গিয়ে বসলাম।বসে বললাম,”একটা কথা ছিল মা।”

মা নজর টিভির দিকে রেখেই বলল,”বলো।”

“মা আমার গহনা যার কাছে পাওয়া গেছিলো তাকে পুলিশ এ‍্যারেস্ট করেছিল।শুনলাম আপনি আর খালাম্মা তাকে ছাড়িয়ে এনেছেন।”

মা এবার কিছুটা কঠোর গলায় বলল,”ওটা তোমার খালার আপন দেবর হয়।লোকটাকে চিনি আমি।ভীষণ সহজ সরল।ও যেই কাজ করেনি তার শাস্তি কেন পাবে?ও তো বলেছেই ওকে কেউ দিয়ে গেছে গহনাগুলো।সুতরাং ওর তো কোনো দোষ নেই।বেচারা নিরহ মানুষ।ওতো কিছু না বুঝেই দোকানে বিক্রি করতে গেছে।

আর তোমার খালার স্বামী বারবার বলছিল তাকে ছাড়িয়ে আনতে।ওর বউটা কাঁদছে।ছোট দুটো বাচ্চা আছে।এজন‍্য ছাড়িয়ে আনলাম।খামাখা অন‍্যের জন্য বেচারা কেন শাস্তি পাবে?”

আমি কিছু বললাম না।

চুপ থাকতে দেখে মা বলল,”প্রিয়তা তোমার ভাইকে বললে না আমার গহনাগুলো খুঁজে দিতে?

সেদিন এসে জিজ্ঞেসাবাদ করে গেল।এরপর তো আর কিছুই বলল না।”

“ও তো চেষ্টা করছেই।পেলে জানিয়ে দেবে।”

এই বলে উঠে দাঁড়ালাম।

ডাইনিং টেবিলের কাছে গেলাম।মাঝখানে জগ।পানি খাবো।কিন্তু হাত পাচ্ছিনা।কোথা থেকে যেন প্রলয় এলো।জগ নিয়ে গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে বলল,”পারছেন না যখন কাউকে ডাকতে পারতেন।মা তো ওখানেই বসে আছে।”

মা শুনে বলল,”আমি যেন ওর বউয়ের চাকর হয়েছি।ভাত তুলে খাওয়াবো,পানি ঢেলে খাওয়াবো!”

প্রলয় একবার তার দিকে তাকালো।কিছু বলল না।সব কথায় জবাব দিতে নেই।

আমায় বলল,”ঘরে চলুন।”

ধরে ধরে নিয়ে যেতে লাগে।সিড়ির কাছে যেতেই প্রলয় ফট করে আমায় কোলে তুলে নেয়।মা ভ্রু কুচকে তাকায়।বিরবির করে কী সব বলে যেন।

আমি লজ্জায় নত হয়ে আছি।

ঘরে বিছানাতে বসিয়ে দেয়।

সে বসে ল‍্যাপটপ নিয়ে।

ক্ষীণ স্বরে বললাম,”আমার জন্য আপনার অফিস কামাই হলো আজ।”

“সমস‍্যা নেই।মেইল করে দিয়েছি।

আচ্ছা শুনুন আমি একটু দু-ঘন্টার জন্য বাইরে যাবো।একটা দরকারি কাজ পড়ে গেছে।না গেলেই নয়।

একটা পার্টি আছে।ওখানে আমাদের দুজন ক্লাইন্ট মিট করতে বলছে।বড়ো আকারের একটা ডিল সাইন হবে।সো যেতেই হবে।

আপনি প্লিজ এ সময়টুকু ম‍্যানেজ করে নিন।

আমি খুব দ্রুত আসার চেষ্টা করবো।”

আমি মাথা নেড়ে রাজি হলাম।

প্রলয় উঠে গিয়ে আলমারি খুলল ড্রেস বের করতে।

একটা শপিং ব‍্যাগ ওর হাতে পড়লো। ঘুড়িয়ে দেখে আমার দিকে ফিরে বলল,”এটা কী?”

আমি আমতা আমতা করতে লাগলাম।এটা আসলে আমার কেনা প্রলয়ের জন্য সেই ড্রেস।দিতে পারিনি।জড়োতা কাজ করে আমার।

প্রলয় ভ্রু কুচকে আমার দিকে তাকালো।

আমার নার্ভাসনেস দেখে ব‍্যাগটি খুলল।ড্রেসটি বের করলো।

পুরোটা খুলে দেখলো।

বলল,”ওয়াও!ইটস বিউটিফুল।

অন অফ মাই ফেভরেট কালার।”

উচ্ছাসের সঙ্গে বললাম,”সত‍্যিই এটা আপনার পছন্দ হয়েছে?”

“হুম।কিন্তু এটা কার জন্য নিয়েছেন?”

লজ্জামিশ্রিত কন্ঠে বললাম,”আপনার জন্য।”

প্রলয় বড়ো বড়ো চোখ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।

আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে মিটিমিটি হাসছি।এভাবে তাকানোর কী আছে?

ড্রেসটা গায়ে ধরে দেখলো সে।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,”কোন রিজনে এটা দিচ্ছেন?

আমার বার্থডে তো এখনো একমাস পর।তাহলে?”

“ঐ আসলে এমনিই।পছন্দ হলো তাই নিলাম।”

“আপনার পছন্দ কিন্তু বেশ ভালো বলতে হয়।

তা আমার জন্যই প্রথমবার কিনলেন নাকি আগেও কারো জন্য কিনেছেন?

না এতো ফিটিংস তারপর সুন্দর কালার দেখে কিনেছেন এজন্য বলছি।”

কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম,”এর আগেও কিনেছিলাম ছেলেদের পোশাক।

বাবার জন্য আর একজন বন্ধুর জন্য।”

প্রলয় আর কিছু বলল না।ড্রেসটা নিয়ে বলল,”আজ পার্টিতে এটাই পড়ে যাবো।”

চেঞ্জ করতে গেল সে।

আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম।এর আগে আমি একবার অয়ন ভাইকে পাঞ্জাবী গিফট করেছিলাম তার বার্থডেতে।

অয়ন ভাই বরাবরই এসব বার্থডে সেলিব্রৈট পছন্দ করতেন না।তার কাছে এসব ঝামেলা।কিন্তু একবার জুনিয়রদের জোড়াজুড়িতে রাজি হন।একটা কেক কাটিং ছোটখাটো পার্টি করা হয়।সবাই মিলে আনন্দ করাই ছিল মূল কারণ।মোটামুটি অনেককেই ইনভাইট করা হয়েছিল।অয়ন ভাই ছিল ব্রিলিয়ান্ট একজন স্টুডেন্ট।যে জুনিয়রদের ভীষণ হেল্প করতো পড়াশোনা বিষয়ে।এছাড়াও দেখতেও ভালো।অনেকের ক্রাশ বটে।যেমন আমার।

তো আমাকেও বলা হয়েছিল জয়েন হতে।সবাই চকলেট,ফুল এসবই দিচ্ছিলো গিফট হিসেবে।আমি চাচ্ছিলাম একটু ইউনিক কিছু দিতে।চকলেট একবার খেলে ফুরিয়ে যাবে।ফুল দুদিনে শুকে নষ্ট হয়ে যাবে।আমি চাচ্ছিলাম এমন কিছু দিতে যা পুনরায় ব‍্যবহার করা যায়।যা স্মৃতি হয়ে রয়ে যাবে আমার।

আগেরদিন সারারাত ভেবে ডিসিশন নেই তাকে পাঞ্জাবী গিফট করবো আমি।যতোবার পড়বে,আমার কথা মনে হবে।

পরদিন সকালেই কিনতে চলে যাই।আসলে আমি ভীষণ এক্সাইটেড ছিলাম।ধূসর রঙের পাঞ্জাবীতে হালকা কাজ।বেশ সুন্দর দেখতে!

যখন সবার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমার গিফটটা দিলাম,অয়ন ভাইয়ের মুখটা চুপসে গেল।এতোক্ষণ হাসছিল কী সুন্দর।

সবার সামনেই বলে উঠলো,”তোমার এই গিফটটা আমার এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে বড্ড বেমানান লাগছে।

তবুও এনেছো যেহেতু নিচ্ছি।”

ভীষণ অপমান লেগেছিল সেদিন।অনেকে মুখ চেপে হেসেছিল আমায় নিয়ে।

আমি কখনো ভার্সিটির কোনো প্রোগ্রামে অয়ন ভাইকে ওটা পড়তে দেখিনি।খুব আশা ছিল মনে,ওটা তিনি পড়বেন।

কিন্তু না।সে পড়েনি।আমার যত্নে দেওয়া জিনিস কেউ অবহেলায় ফেলে রেখেছে আলমারির কোণে অথবা দান করেছে।

একই ভাবে আজ প্রলয়কেও কিছু গিফট করলাম আমি।সে কতো খুশি।অপেক্ষা না করে সঙ্গে সঙ্গে পড়তে গেল।আগ্রহ দেখালো।দুজনের মাজে এটা হলো তফাৎ।একজনের কাছে আমার কষ্টের,চেষ্টার মূল্য আছে।আরেকজনের কাছে তা ছিল না।

যাকগে!অতীত নিয়ে ভাবাটা পাগলামো।যা কখনো আমার ছিলই না তা নিয়ে আবেগ দেখানো বোকামি।

ওয়াশরুমের দরজা খুলে বের হলো প্রলয়।

চুলগুলো ঠিক করতে করতে বের হচ্ছে সে।বিশ্বাস করুন এক মূহুর্ত্তের জন্য আমি যেন ‘হা’ হয়ে গেছি জাস্ট।এতোটাই সুদর্শন লাগছে তাকে।কালার কম্বিনেশনটা গায়ের রঙের সঙ্গে একদম মানিয়েছে খাসা।

ও আমার সামনে দাঁড়িয়ে হাসলো।আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখলো।

আমি তখনও ওর দিকে হা করে তাকিয়ে।প্রলয় পেছন ফিরলো।

বলল,”এভাবে কী দেখছেন মিসেস সরকার?”

ধ‍্যান ভাঙে।চোখ সরিয়ে নেই।

আমতা আমতা করে বললাম,”কিছুনা।”

প্রলয় একটু হাসলো।

ড্রেসের রিসিভ দেখে বলল,”বাহ!মিসেস সরকার দেখছি আমার জন্য বেশ দামী ড্রেস কিনেছে।এরকম জামা বছরে দু-তিনটে পেলে মন্দ হয়না কিছু।”

আমি হাসলাম।

প্রলয় তার ফোন নিয়ে আমায় বলল,”আপনার এ‍্যাকাউন্ট নাম্বারটা দিন টাকা ট্রান্সফার করে দিচ্ছি।”

“কেন?আর কিসের টাকা?”

“আপনি ড্রেসটা কিনেছেন এটার টাকা।”

“ওটা আপনাকে দিতে হবেনা।

ওটা আমি দিয়ে দিয়েছি।আমার কাছে টাকা নেই নাকি?”

প্রলয় ভ্রু কুচকে বলল,”আছে?আপনি ইনকাম করেন নাকি?”

“তোহ আপনি কী আমায় অপমান করছেন নাকি?আমার কার্ড আছে।বাবার কার্ড ও আমার কাছে থাকে।

এছাড়াও আমার নামে না ঢাকায়,,,,,”

প্রলয় এগিয়ে এসে চেপে ধরে আমার মুখ।

ধীর স্বরে বলল,”আস্তে।এসব কথা যেন কেউ না জানে।”

আমি তার দিকে ফ‍্যালফ‍্যাল করে তাকিয়ে।

প্রলয়ও আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

আনমনেই সে বলে উঠলো,”আপনার চোখ দুটো ভীষণ মায়াবী।ঠিক যেন অদিতির মতো।”

শেষের কথাটি বলে ও নিজেই যেন ভ‍্যাবাচেকা খেয়ে গেল।

সরে গেল।

আমি শূণ্য দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

প্রলয় তৈরি হলো দ্রুত।যাওয়ার সময় বলল,”বাবার কার্ডগুলো দিয়ে দেবেন।আপনি এখন আমার কর্তব্য।ড্রয়ারে আমার সব কার্ড আছে।প্রয়োজন মতো সেগুলো ব‍্যবহার করবেন।”

প্রলয় চলে গেল।

আমার কেমন হাসফাস লাগছে।

ও কী আমার মাঝে অদিতিকে খোঁজার চেষ্টা করছে?আমি কী এতোটাই অসম্পূর্ণ?যে আমার মাঝে অন‍্যকারো অস্তিত্ব খুঁজতে হয়।

আমি কী প্রলয়ের জীবনের কোথাও নেই?

বরাবরই চেয়েছি আমার জীবনে কেউ একজন আসুক।যার সবটা জুড়ে আমি থাকবো।

কিন্তু বিধাতা আমায় এমন এক এমন সম্পর্কে জুড়ে দিয়েছেন,যাতে আমি কারো ফাঁকা জায়গা পূরণ করছি শুধুমাত্র।বলতে গেলে একটা চন্দ্রবিন্দু।যা না দিলেও চলে।

আবার না দিলে কিন্তু শব্দটি বেমানান লাগে।

চোখের বাধ ভাঙে আমার।কান্না পায় খুবই।

কাঁদছি আমি।

ফোনে কল এলো।চোখের পানি মুছলাম আমি।প্রলয় কল করছে।রিসিভ করলাম না।তাকিয়ে রইলাম শুধু।মনে অভিমানের পাহাড়।

আবারো কল করলো।আবারো।আবারো।

আমি হাঁটুতে মাথা নুয়ে বসে রইলাম।মিনিট দুয়েক পর হঠাৎ হুড়মুড়িয়ে ঘরে প্রবেশ করলো কেউ।

দেখি দরজায় দাঁড়িয়ে প্রলয় হাপাচ্ছে।

আমার কাছে ছুট্ট‍ে এলো।

গালে হাত দিয়ে বলল,”আমার অতীত নিয়ে কষ্ট পাবেননা।

আপনিই আমার সব।বর্তমান,ভবিষ‍্যৎ সব কিছু।”

মুখ ফুটে বলেই ফেললাম,”আপনি কী তাহলে আমায় ভালোবাসেন?”

প্রলয় এবার চুপ।

উঠে শার্টের কলার ঠিক করে বলল,”খেয়ে নেবেন।

ড্রয়ারে আপনার পছন্দের স্ন‍্যাক্স আছে।বসে বসে খান।নিচে যাওয়ার দরকার নেই।”

এই বলে চলে যায় তিনি।

ঠোঁটের কোণে সামান্য একটু হাসির রেখা ফোঁটে আমার।

সামান্য এই কথাটা বলতে আবার ফিরে এলো মানুষটা?

তারমানে উনার কাছেও আমার গুরুত্বটা আছে।আমার মন খারাপে উনার যায় আসে।

কবির ভাই ও সুমা আপু ঘরে আসার অনুমতি চাইলো।

আমি উঠে দাঁড়িয়ে তাকে আসতে বললাম।বসতে

বললাম।তারা বসলেন না।

কবির ভাই বললেন,”একটা সমস্যা হয়ে গেছে প্রিয়তা।

আমার ছোট বোনটা আছেনা কাভিয়া?

ওর জন্য একটা সম্বন্ধ এসেছে।ছেলেটা আমাদের মোটামুটি পরিচিত।বাবা যেহেতু বেঁচে নেই,আপাতত ওর গার্জেন্ট হিসেবে আমিই আছি

আর আমিতো আপাতত এখানে আছি।তো ঐ ছেলের বাড়ির লোক চাচ্ছে এখানে এসে কথা বলতে।মানে কাভিয়ার সঙ্গে ছেলেটার একটু পরিচয়ালাপ করে দিতে।আমাদের বাড়িতে শুরুতেই যেতে চাচ্ছেনা।ওখানকার কিছু মানুষ ভীষণ শত্রুতা করছে এজন্য।

তো প্রিয়তা তোমার কী অনুমতি,,,”

ভাইয়ার কথা শেষ করার আগেই আমি বললাম,”এতে আপত্তির কিছু নেই।আপনি আমায় বোন বলেন।আপনার বোন তো আমারো ছোট বোন।

বিয়ের কাজে যুক্ত থাকা ভালো কাজ।

আপনি নিশ্চিন্তে আয়োজন করুন সবটা।যতোটা সম্ভব আমি হেল্প করবো।”

পাশ থেকে ফট করে সুমা আপু বলল,”ওর কথাই সব নাকি?ও আমাদের বাড়ির কর্তা নাকি?

প্রলয় নেই বাড়িতে।”

একটু হেসে বললাম,”আমি আর প্রলয় একই।

দুজনের মতামত,জবাবও এক।

আর ওর অবর্তমানে সবকিছু আমারই কন্ট্রোলে চলবে।শুধু অবর্তমানে নয়,সৃষ্টিকর্তা চাইলে বর্তমানেও চলবে।

আমার কর্তৃত্বই খাটবে সবখানে।”

আমার কথা শুনে আপুর মুখে আধার।কবির ভাই ভীষণ খুশি হলেন।

সে তার মতো আয়োজন করতে চলে গেলেন।

একটু পর আমিও নিচে এলাম।রান্নাবান্না হচ্ছে।বাজার থেকে শুরু করে সবটা কবির ভাই নিজের টাকায় করেছে।যদিও এসেছে থেকে প্রায় প্রায় বাজার করেন তিনি।এতে আবার আপুর সঙ্গে কয়েক দফা হয়ে যায়।

আমি শুধু বসে থাকা ছাড়া তেমন কিছুই পারলাম না পায়ের জন্য।

ঘন্টা খানিক পর কবির ভাইয়ের মা ও বোন এলো।

কাভিয়া এসেই আগে গেল সামির অর্থাৎ সুমা আপুর ছেলের কাছে।ছেলেটা ফুপিকে দেখে আল্লাদে আটখানা।তা দেখে আপু মুখ বাকিয়ে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে যায়।

তার শাশুড়ি বলেন,”ভালো আছো বউমা?”

সুমা আপু জবাব দিল কী জানেন?

বলল,”সেটা আপনার না জানলেও চলবে।”

বেচারা বয়স্ক মহিলার চোখদুটো ছলছল করে উঠলো।ভেবেছিলাম এতো বড়ো কথা ছেলেকে জানাবে।অন্তত এ বাড়ির মানুষ হলে তাই ই করতো কিন্তু উনি তা করলেন না।

বরং নিজের মন খারাপকে পাত্তা না দিয়ে নাতির সঙ্গে খেলতে লাগলেন।

আমি গেলাম কাছে।সালাম দিয়ে ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করলাম।

তিনি উত্তর দিয়ে বললেন,”তুমি প্রলয়ের বউ না?”

লজ্জা মিশ্রিত হাসলাম আমি।

তিনি আমার মাথা ছুয়ে দোয়া করে বললেন,”দাঁড়াও মা তোমার জন্য একটা গিফট এনেছি।”

একটা সুন্দর হাতে তৈরি ব‍্যাগ দিলেন আমায়।

খুবই সুন্দর সেটি।আমার প্রথম দেখাতেই পছন্দ হয়ে গেল।

বললাম,”ওয়াও!এটা খুবই সুন্দর।আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে।এটা কে তৈরী করেছে?”

সে কিছু বলার আগেই কাভিয়া তার কাধে হাত রেখে বললেন,”এটা আমার মা বানিয়েছে।আমার মা খুব সুন্দর সুন্দর ব‍্যাগ বানাতে পারে।আমিতো

সারাজীবনে মায়ের তৈরি হাতের ব‍্যাগেতেই দিন পার করে দিলাম।

আপনার হাতে সেই ব‍্যাগটা আছে ওটা মা তিনটে বানিয়েছিল।একটা আপনার,একটা আমার আর একটা ভাবির।কিন্তু ভাবিতো এসব ব‍্যাগ পছন্দ করেননা।”

মেয়েটা দমে গেল।দুজনেই মন খারাপ করলো।

প্রসঙ্গ এড়াতে আমি বললাম,”আমার ভালো লেগেছে।আমিও ভার্সিটি গেলে এটা নিয়ে যাবো।ধন‍্যবাদ আপনাকে আন্টি।”

উনি একটু হাসলেন।

আমি বিদায় নিয়ে কিচেনে গেলাম।মা আর আপু নাস্তা রেডি করছেন আর বিরবির করছেন।

আমি শরবত বানাতে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।

আপু বলছেন,”মা সুযোগটা মিস হয়েগেল।ভেবেছিলাম এই ছেলেটার সঙ্গে আমার বোনের বিয়ে দেব।যদিও ছেলে কবিরদেরই আত্মীয়।তবুও আমি ছলেবলে বিয়ে দিতাম রিপার সঙ্গে।কবির না এলেই দিতে পারতাম।

ছেলেটার সরকারি চাকরি।পারিবারিক ব‍্যবসা।ভীষণ ভালো ছেলে।দেখতে সুন্দর।মার্জিত ব‍্যবহার।পরিবার ভালো।অর্থ সম্পদ আছে।মা-বাবার দুটো মাত্র ছেলে।বড়োজন পাইলট।

এমন পরিবারে আমার বোন গেলে সোনায় সোহাগা হতো।রাণী করে রাখতো।বোন শুধু এ বাড়িতে সব ঢালতে পারতো।”

মানে এদের কী পরিমাণ লোভ ভাবা যায়?

এরা কী আদৌ মানুষ?

মুখের ওপর জবাব দিতে যেয়েও চুপ গেলাম।

শরীরে ভালো লাগছেনা।এদের সঙ্গে তর্ক করে আর প্রেশার হাই করতে চাইনা।

আমি ফ্রেশ হতে গেলাম।

প্রলয় কল করলো।বলল,”মহারাণীর অভিমান ভেঙেছে?”

আমি একটু হাসলাম শুধু।

প্রলয় আবারো বলল,”কী করছেন?”

“এইতো গোসল সেড়ে মাথা মুছছিলাম।”

“কী পড়েছেন?”

ভ্রু কুচকে বললাম,”হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন?”

উনি বলল,”আরে বলুনই না।”

“জামা পড়েছি।”

“কী রঙের?”

“নীল।”

“একটু কষ্ট করে চেঞ্জ করে একটা সাদা রঙের ড্রেস পড়ুন।আলমারিতে রাখা আছে।আপনাকে নিয়ে আজ বের হবো ভেবেছি।”

“কোথায়?”

“গেলেই দেখতে পাবেন।এখন রাখছি।”

উনি কল রেখে দিল।

আমি তার কথা মতো ড্রেস বদলে তৈরি হয়ে নিচে এলাম।

মা মুখ বাকিয়ে বললেন,”সাদা পড়েছো কোন দুঃখে?”

মুখের ওপর বলে দিলাম,”আমার স্বামীর পছন্দ বলে।”

উনি আর কিছু বলল না।ততক্ষণে ছেলেপক্ষ চলে এসেছে।

কাভিয়া মেয়েটা লজ্জায় সামনেই যাবেনা।জোর করে নিয়ে যেয়ে বসানো হলো।চোখ তুলে তাকাচ্ছেনা ছেলের দিকে।

পারিবারিক কথা হলো।দুজনকে আলাদা কথা বলার জন্য পাঠানো হলো।পিছে পিছে দেখছি সুমা আপুও যাচ্ছে।আমি তাকে আটকে দিয়ে বললাম,”আপনি কোথায় যাচ্ছেন?”

সে আমায় দেখে আমতা আমতা শুরু করলো।বসে পড়লো আগের স্থানে।মিনিট পাঁচেক পর ফিরে এলো।দুজনের মুখেই লজ্জার আভা।

জানতে চাওয়া হলো মতামত।ছেলে রাজি।

কাভিয়া বলল,”আমার মা-ভাইয়া যেটায় খুশি, আমি তাতেই রাজি।”

সবাই মিলে আলহামদুলিল্লাহ্ বলা হলো।বিয়ের ডেট ঠিক হলো।দেনা পাউনা কিছু নেই শুনে সুমা আপুর খুশি দেখে কে!

কবির ভাই বলল,” যৌতুক আমারও পছন্দ নয়।একই মনমানসিকতার পরিবার পেয়েছি এজন্য ভালো লাগলো।

তবে আমার একটা ইচ্ছা আছে।আমার একটাই বোন।বাবা মারা যাওয়ার আগে খুব শখ করে ওর জন্য একটা গলার হার বানিয়েছিল।মা খুব কষ্ট করে জুগিয়ে বাঁচিয়ে দুটো কানের গড়িয়ে দিয়েছে।

এবার আমার দায়িত্ব।আমি আমার বোনকে দুটো হাতের বালা ও আংটি দিয়ে এক সেট গহনা দিতে চাই।ওটা আমার বোনের ভবিষ্যৎ হিসেবে সঞ্চয় থাকবে ওর কাছে।বিপদের সঙ্গী হবে।”

সুমা আপু ঠাস করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,”এ আবার কেমন কথা?

উনারা বলছেই তো যৌতুক নেবেনা।তুমি কেন জোর করে দিচ্ছো?”

কবির ভাই প্রথমে দৃষ্টি কড়া করলেন পরে মানুষ দেখে হালকা হেসে বললেন,”ওটাতো ভাই হিসেবে আমি কর্তব্য পালন করছি।উপহার দিচ্ছি আমার বোনকে।যা একান্তই আমার বোনের থাকবে।ছেলেকে বা তার বাড়ির লোককে তো কিছু দিচ্ছিনা।”

“কিন্তু,,,”

কবির ভাই উঠে দাঁড়ালেন।সুমা আপুকে বলতে না দিয়ে প্রসঙ্গ বদলে দিলেন।ছেলের বাবাকে আলিঙ্গন করে বললেন,”তাহলে সেই কথাই রইলো।খুব শিগ্রই চারহাত এক করা হবে।”

উনারা সায় দিলেন।খাওয়া দাওয়া শেষে চলে গেলেন।যাওয়ার আগে কাভিয়ার হাতে কিছু টাকা দিলেন।সুমা আপু চোখ বড়ো বড়ো করে সেদিকে তাকিয়ে থাকে।

এবার উনাদেরও যাওয়ার পালা।আমি থাকতে বললাম।

কবির ভাইয়ের মা-বোন কিছু বলার আগেই সুমা আপু বলল,”ওদের থাকতে হবেনা।থেকেই বা কী করবে?

কাভিয়ার সামনে পরিক্ষা।পড়া আছে।ওরা বরং চলেই যাক।নাহলে পড়ার ক্ষতি হবে।”

মেয়েটা অপমানে মাথা নিচু করলো।

কবির ভাইয়ের মা ছেলের থেকে বিদায় নিলেন।নাতিকে আদর করলেন।হাতে একহাজার টাকা দিয়ে বললেন,”কিছু কিনে খেও।”

ছেলেটা ওর দাদির হাত ধরে মনমরা হয়ে বলল,”আজ থাকোনা দাদিয়া।”

ভদ্র মহিলা অসহায়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন শুধু।নাতিকে কীসব বুঝিয়ে সুঝিয়ে হাঁটা ধরলেন।আমার ভীষণ মায়া লাগছে।কী হতো একটা দিন থাকতে দিলে?

দু-পা গিয়ে কাভিয়া পেছন ফিরলো।

নরম গলায় বলল,”একটা কথা বলতাম ভাইয়া।

মাকে কাল ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে।অসুখ বেড়েছে।

আমিতো টিউশনি করি।তো যেই সময় ডাক্তারের সিরিয়াল,ঐ সময় আমার টিউশন আছে।না গেলেই নয়।স্টুডেন্টের পরিক্ষা পরসু।

তাই তুমি কী একটু মায়ের সঙ্গে যেতে পারবে?”

কবির ভাই কিছু বলার আগেই সুমা আপু বলল,”ও যেতে পারবেনা।কাল ওর ছেলেকে স্কুলে নেওয়া আনা করতে হবে।কাল আমি পার্লারে যাবো।বুকিং দিয়েছি।মা খালাবাড়ি যাবে।রিপা কলেজ যাবে।তো ওকেই ওর ছেলেকে নিয়ে যেতে হবে।”

পাশ থেকে আমি বললাম,”কিছু মনে না করলে একটা কথা বলি?

কাল সামিরকে আমি আর ওর মামা স্কুলে দিয়ে আসি?”

সুমা আপু বলল,”তা আবার হয় নাকি?তুমি চেনো নাকি?আর সামির তোমার সঙ্গে যাবেনা।”

বললাম,”চিনে নেব আপু।এছাড়াও ওর মামা আছে।

আর সামির সোনা তুমি আমার সঙ্গে যাবেনা?”

সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটা আনন্দে লাফিয়ে উঠলো।

বলল,”কেন যাবোনা।মামিয়া কতো ভালো।আমায় কতো আদর করে।সন্ধ‍্যায় মজা করে নুডলস রান্না করে দেয়।মামিয়া অনেক ভালো।

আমি যাবো তার সঙ্গে স্কুলে।”

কবির ভাই বলল,”তাহলে তো হয়েই গেল।কাল আমি আমার মাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছি।”

কাভিয়া মেয়েটা স্বস্তির শ্বাস নিয়ে হাসিমুখে চলে গেল তার মাকে নিয়ে।

ওরা যাওয়া মাত্র সুমা আপু তেড়ে এলো ছেলেটার কাছে।বকা দিল খামাখা।

ঘরে পাঠিয়ে দিল।

এরপর কবির ভাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,”বলি তুমি এতো অবিবেচক স্বার্থপর কেন কবির?

মায়ের গহনা সব দিয়ে দেবে তোমার বোনকে?আমি কী ভেসে এসেছি?জানোনা শাশুড়ির গহনায় পুত্রবধুর অধিকার সবচেয়ে বেশি।কিছুই তো তেমন নেই তোমাদের।আছে শুধু ওকটা গহনা।সেগুলোও সব তোমার বোনকে দেবে?আমার কী কোনো আশা নেই শাশুড়ির জিনিসে?

ঐ গহনাটা সেই বিয়ের দিন থেকে পছন্দ ছিল আমার।

তোমরা নাহয় দুজনকে ভাগ করে দিতে।”

কবির ভাই বলল,”তোমায় কী দেয়নি?

বিয়ের পর তোমাকেও কিন্তু দেওয়া হয়েছিল এক সেট।এছাড়াও তুমি মায়ের গলার চেইন পেয়েছো।হাতের আংটিও পেয়েছো।আর কতো চাই তোমার?”

“হ‍্যা হয়েছে হয়েছে।সামান‍্য কী দিয়েছো,তাতেই মাথায় উঠছো।তুমি আর তোমার মা যে কতো ছোটলোক তা আমার বোঝা হয়ে গেছে।”

সুমা আপুর বলতে দেরি নেই,কবির ভাই ঠাটিয়ে থাপ্পড় বসিয়ে দিল গালে।

এরপর তিনি যা বললেন তাতে আমার চোখ যেন ছানাবড়া।কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।

এটাও সম্ভব?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply