Golpo romantic golpo প্রিয়তার পূর্ণতা

প্রিয়তার পূর্ণতা পর্ব ১২


প্রিয়তার_পূর্ণতা

Nadia_Afrin

১২

কলিং বেলের শব্দ কানে আসা মাত্র চমকে উঠেছি।সবে ঘুমটা এসেছে।
আমি চোখ মেলে চাইলাম।
বিছানা ছেড়ে উঠে দরজা খুলে বাহিরে এলাম।
মা দরজা খুলে দিল।
প্রলয়কে দেখা মাত্র কান্না জুড়ে দিয়ে বলল,”বাবা তুই এসেছিস বাবা।আমাদের তুই বাঁচা বাবা।”

প্রলয় বিরক্ত সহিত বলে,”সরো তো মা দরজার সামনে থেকে।”

মা নাক-মুখ কুচকালেন।
প্রলয় ভেতরে এলো।আয়েশ করে সোফায় বসলো।মা নিজেকে সামলে নিয়ে আবারো কান্নাভেজা কন্ঠে বললেন,”বাবা প্রলয় তোর বউ আজকে কী করেছে জানিস?
তোর একটাই ছোট বোন।মেয়েটা ভাবিকে বোন মনে করে।এজন‍্য একটু গিয়েছিল ভাবির থেকে একটা শাড়ি ধার নিতে।কলেজে কী প্রোগ্রাম আছে সেখানে পড়ে যাবে।
ওমা!তোর বউ শাড়িতো দেয়ইনি উল্টে মেয়েটাকে অপমান করে দিয়েছে।বলে কিনা এ বাড়ি ওর না।এ বাড়ির কোনো জিনিসে ওর অধিকার নেই।
বলি বাড়ি কী ওর বাপ তৈরি করে দিয়েছে?
এক ঘরের ফার্নিচার দিয়ে পুরো বাড়ির দখল নিতে চায় তোর বউ।
ও এতো কিছু করলো কোনো দোষ হলোনা।
আর আমার মেয়েটা ছোট মানুষ শুধু রাগের মাথায় ওর একটা শাড়ি নিচে ফেলে দিয়েছে দেখে তোর বউয়ের কী চোপা!
বলে কিনা ওটা ওর মৃত দাদির।বলি মরা মানুষের জিনিস নিয়ে ওতো নাটকের কী আছে?
সামান্য শাড়িটা নিয়ে তোর বউ পারলে আমাদের সবাইকে খেয়ে নেয়।আমাকে বলে কিনা মেয়েকে শাসন করতে।মুখে মুখে তর্ক করে।”

প্রলয় গোলগোল চোখ করে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,”সত‍্যিই এসব বলেছে?”

“হ‍্যারে।তোকে কী আমি মিথ্যা বলবো?
তুই আমার পেটের ছেলে।আরো অনেক কিছু বলেছে।”

ঘর থেকে সুমা আপু বের হতে হতে বলল,”শুধু তাই নয়।তোর বউ দুদিন এসেই আমায় খাওয়ার খোটা দেয়।রিপাকে তো কতো কথাই বলেছে।মেয়েটা দুঃখে কাল প্রোগ্রামেই যাবেনা।ঘর বন্ধ করে বসে আছে।
শোন প্রলয়,এমন মেয়ে মানুষ নিয়ে আমার মা সংসার করতে পারবেনা।
হয় তুই তোর বউকে বের করে দে।নাহয় বউ নিয়ে ঘর ভাড়া কর।জমিটা কিন্তু বাবার।মায়ের অধিকার বেশি।”

প্রলয় ভ্রু কুচকে বলল,”বউ নিয়ে চলে যাবো?
ঠিক আছে যাবো।তাহলে তোদের চালাবে কে?
তোর আরেক ভাই নিশ্চয় তোদের ভরণপোষণ দেবেনা।সে তো শুনি দেশেই আসবেনা।
আমিও চলে যাই।ঝামেলা কম হবে।দুজনের সুন্দর চলে যাবে।সঙ্গে গোছানোও হবে।”

ওমনি সঙ্গে সঙ্গে সুমা আপু বলে উঠলো,”এটা কী বলছিস তুই?বউয়ের দায়িত্ব পালন করবি আর মা-বোনকে ভুলে যাবি?
আমরা তোকে মানুষ করেছি প্রলয়।
ও পরের ঘরের মেয়ে। আমাদের মতো ও তোর আপন নয়।মনে রাখিস,মা-বোনের আগে কখনোই বউ আসেনা।
তুই যেখানেই থাকিস,আমাদের ভরণপোষণ তোর কর্তব্য।”

প্রলয় সোজা উঠে দাঁড়িয়ে বলল,”তাহলে বরং তুই চলে যা।তুই গেলে মায়ের মন কিছুটা ফ্রেশ থাকবে।অন্তত বিষ ঢালার জন্য কেউ থাকবেনা।তোকে বিয়ে দিয়েছি,তোর ভরণপোষণের দায়িত্ব এখন তোর স্বামীর।আমার নয়।
আর জমি বাবার নামে হলেও জমির ওপর যে বিশাল বাড়িটা আছে সেটা আমার টাকায় করা।
জমির খোটা দিলে বাড়ি ভেঙে নিয়ে চলে যাবো।
আমি প্রলয় জেদের ভাত কুকুরকে দিয়ে খাওয়াই।”

মা ছলছল চোখে বললেন,”এই তোর বিচার প্রলয়?
তোর বউ তোর মা বোনকে কতো অপমান করলো আর তুই কিনা ওকে কিচ্ছু বলছিস না।উল্টে আমাদের কটু কথা শোনাচ্ছিস?
বলি মা টা কী খুব বেশি হয়ে গেছে তোর ঘাড়ে?
বোন গুলো কী বোঝা হয়ে গেছে?
কদিনই থাকবে আর ঘরে?
একজনের তো বিয়ে হয়েই গেছে।বাড়িটা করা হয়ে গেলেই চলে যাবে।আর একজনেরও বিয়ে ঠিক।কদিন পরই চলে যাবে।তাতেও এমন করছিস?”

প্রলয়কে দেখলাম এবার চুপ গেল।জবাব দিলনা।চেহারাটা নরম করে হনহন করে সিড়ি বেয়ে উঠে যেতে লাগলো।

আমি ঘরে ঢুকে গেলাম।ওরা আমায় দেখেনি।
ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লাম চোখ বন্ধ করে।
প্রলয় ধপ করে দরজা খুলে ভেতরে এলো।ফোনটা বিছানায় ছুড়ে রেখে জুতা খুলতে খুলতে বলল,’একই কথা বিয়ের পর থেকে শুনছি।কবে ঠিক হবে বাড়ি?
আসলে ঠিক করার ইচ্ছাই নেই।ওরা হলো আমার হাড় জ্বালিয়ে খাবে।
দাদি বলতেন বিবাহিত মেয়ে এসে মায়ের বাড়ি গেড়ে বসলে ঐ সংসারে উন্নতি হয়না।
আমারও হয়েছে তাই।উন্নতি তো ছাড়!
পারলে আমার মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খায়।যতো দেই,তাদের চাহিদা বাড়তেই থাকে।
এতো দিয়েও তো চাহিদা পূরণ হয়না।লোকের জিনিস দেখলে হুশ থাকেনা।’

আনমনে এসব বলতে বলতে বাথরুমে ঢুকলো সে।তখন আমি উঠে বসলাম।
কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে।আবারো শুয়ে পড়ি।
মনে মনে ভাবছি,প্রলয় এখনো অদিতিকে ভালোবাসে।ওর জীবনে হয়ত আমার কোনো স্থানই নেই।ওর বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলেও সে বাজে ব‍্যবহার করে আমার সঙ্গে।
এদিকে ওর কদিনের যত্নে আমার মন নরম হয়েছে ওর প্রতি।ঠিক ভালোবাসা নয়।একটু খানি ভালোলাগা।ভালোবাসা তৈরি হতে সময় লাগে।
আদৌ কী আমাদের কখনো ভালোবাসা তৈরি হবে?
নাকি নিছক এক ভালোবাসাহীন বৈবাহিক সম্পর্ক হয়ে থাকবে?

খুব কষ্ট হচ্ছে আমার।বুকে ভারী লাগছে।
চোখ থেকে এক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ে।
দরজা খোলার শব্দে চোখের পানি মুছে ফেললাম।
প্রলয় একটা পাতলা কালো রঙের শার্ট পড়েছে।সঙ্গে টাউজার।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল মোছে সে।
শার্টের কলার ঠিক করে।মিষ্টি ঘ্রাণের বডি স্প্রে ব‍্যবহার করে।
এরপর পেছনে তাকায়।আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে।
আমার দিকে এগিয়ে আসছে।অনুভব করছি আমি।
এসে আমার মাথার কাছে বসে।
মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।আমি চুপ রইছি।
প্রলয় ধীর স্বরে ডাকে আমায়।চোখ মেলে চাইলাম।উঠে বসতে বলল।বসলাম চুপচাপ।প্রলয় আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,”খেয়েছেন?”

মাথা ওপর-নিচ করি।
প্রলয় কিছুপল আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,”মিথ‍্যা কেন বলছেন?”

ফট করে তাকালাম।
ও বুঝলো কী করে?

প্রলয় আবারো বলল,”আপনি খাননি নির্ঘাত।মুখটা শুকনো লাগছে।সঙ্গে আপনার মনটাও খারাপ।এজন‍্যই আপনার আপেলের মতো গোলগাল গালগুলো শুকনো লাগছে।”

আমি অবাক হলাম।মনে মনে একটু হাসিও পায়।

প্রলয় উঠে গিয়ে খাবারের থালাটা এনে হাত ধুয়ে ভাত মাখতে মাখতে বলল,”আপনি যা নিয়ে মন খারাপ করছেন সেটা অযৌক্তিক।”

আমি কিছু বললাম না।

উনি আমার মুখের সামনে খাবার ধরে।
মুখ ঘুরিয়ে নিলাম।
প্রলয় কড়া চোখে তাকালো।খাবারের থালাটা পাশে রেখে আমার গালদুটো ধরে সামনে করে মুখে খাবার তুলে দিল।
একান্ত অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও খেতে হলো আমায়।
খাওয়া শেষে প্রলয় থাল রাখতে নিচে গেল।
আমি শুয়েছি সবে,এমনই সময় শাশুড়ি,রিপা,সুমা আপু এলো আমার ঘরে।
মা কেমন হাঁপাচ্ছে।আমি দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে বসতে বললাম তাকে।মা সোজা শুয়ে পড়লো।
সুমা আপু দৌড়ে বাথরুম থেকে বালতি মগ এনে মাথার নিচে পলি বিছিয়ে পানি ঢালতে লাগলো।
আমি কিছুই বুঝছিনা।
দেখে মনে হচ্ছে মায়ের শরীর অসুস্থ।কিন্তু এরা এখানে কেন তাহলে?হাসপাতালে কেন যাচ্ছেনা?
রিপা বলল,”এখন ভালো লাগছে মা?”

মা মাথা ঝাঁকায়।

বললাম,”কী হয়েছে মায়ের?”

“মায়ের শরীরটা ভালো নয় ভাবি।এজন‍্য এখানে নিয়ে এলাম।”

“শরীর ভালো নয় তো এখানে এনে কী হবে?
হাসপাতালে নিতে হবে।”

আমার কথায় রিপার মুখে রাগের আভা দেখা গেল।
সুমা আপু তার হাত ধরলেন।
স্বাভাবিক গলায় বললেন,”এই ঘরের এসি চলছে এজন্য নিয়ে এলাম।বাড়ির দুটো ঘরেই শুধু এসি।মায়ের আর তোমাদের ঘরের।মায়ের ঘরের এসিটা নষ্ট হয়ে গেছে।
গরমে শরীর আরো খারাপ করছিল মায়ের।এজন‍্য নিয়ে এলাম এ ঘরে।তবে চিন্তা করোনা একটু ঘুমোলেই ঠিক হয়ে যাবে।
আমরা দু-বোন মায়ের কাছে থাকবো।তুমি প্লিজ আজকের দিনটা নিচে গিয়ে থাকো।আমার ছেলেটা ঘরে একা আছে।ওর সঙ্গে গিয়ে থাকো।ওকে নিয়ে আসিনি।ও আসলে এদিক-ওদিক ছুটে আরো আমার মাকে অসুস্থ করে দেবে।
প্রলয়কে একটু মানিয়ে নাও প্লিজ।
আজকের রাতটা একটু এঘরে থাকি আমরা।”

কী বলবো বুঝতে পারলাম না।
সুমা আপু তাড়া দিল তার ঘরে যেতে।তার ছেলে একা আছে।প্রলয়ও বাইরে গেছে।
আমি বিছানা থেকে উঠেছি এমনই সময় গুনগুন করতে করতে ঘরের দরজায় দাঁড়ায় প্রলয়।
ওর হাতে একটা ব‍্যাগ ছিল।মুখের সামনে রিপাকে দেখে ব‍্যাগটা সাইট করে সে।
ভ্রু কুচকে বলে,”তোরা সব এখানে?”

সুমা আপু এগিয়ে এসে বলে,”ওয়েট ওয়েট!
তুই কী লুকোলি?কী আছে ঐ ব‍্যাগেতে?
দেখা আমাদের।”

“আমার ব‍্যক্তিগত জিনিস।”

রিপা লক্ষ‍্য করে।ব‍্যাগটার দিকে হাত বাড়িয়ে বলে,”দেখি কী আছে?”

প্রলয় কড়া গলায় বলে,”থাপ্পড় খেতে না চাইলে হাত সরা।লজ্জা করেনা বড়ো ভাইয়ের ব‍্যক্তিগত জিনিস দেখতে চাস।”

রিপা মুখটা শুকনো করলো।

সুমা আপু বলল,”ঠিক আছে তাহলে আমাকে দেখা।আমি তো তোর বড়ো।
তোকে কোলে পিঠে মানুষ করেছি।”

প্রলয় বিরক্তসহিত বলল,”ওহ প্লিজ!রোজ রোজ এক কথা বলা বন্ধ কর প্লিজ।
মানুষ করেছিস বলে আমার সব প্রাইভেট বিষয়ে নাক গলাবি নাকি?”

সুমা আপু চুপ গেলেন।
মা বেশ রাগান্বিত স্বরে বলল,”ওমন কেন করছিস প্রলয়?
বোন দুটো দেখতে চাইছে ব‍্যাগেতে কী আছে দেখানা।কী এমন ধন-দৌলত আছে ওতে?”

“এতে তোমার আর তোমার স্বামীর বিয়ের কাবিন আছে।সঙ্গে তোমার মেয়েদের মুন্ডু আছে।
দেখবে নাকি?”

মা থতমত খেয়ে গেলেন।
আমি এবার কথা ধরলাম।বললাম,”আপনি না অসুস্থ মা।অসুস্থতার জন্য এ ঘরে এলেন।
এতো দ্রুত সুস্থ হয়ে গেলেন?”

মা আমতা আমতা করতে লাগলেন।

প্রলয় বলল,”ওরা এ ঘরে থাকবে মানে?
কিসের অসুস্থতা?আমার অনুমতি ছাড়া আমার ঘরে থাকার পরিকল্পনা হচ্ছে মানে?”

“ঐ আর কী মায়ের ঘরে এসি নষ্ট।শরীর খারাপ করেছে।খুব ঘামছিল।এজন‍্য এ ঘরে নিয়ে এসেছি।”

প্রলয় কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,”নষ্ট হয়েছে কখন?”

“একটু আগেই।”

“তো ঘরতো এখনি গরম হওয়ার কথা নয়।
যাকগে।চল ঘরে।দেখি কী অবস্থা।মা থাক এখানে।”

প্রলয়কে নিয়ে সুমা আপু,রিপা যেতে নিল।
আমায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ওদের সঙ্গে যেতে বলল।মায়ের সঙ্গে থাকতে চেয়েছি।ওরা নিষেধ করেছে।সঙ্গে যেতে বলল।আমি নাকি কী উপকার করবো ওখানে গিয়ে।
ততক্ষণে প্রলয় বাইরে চলে গেছে।
সবাই গেলাম।
গিয়ে দেখি ঘরের সব কটা জানালা খোলা।দরজা হাট করে খোলা।পর্দা সরানো।বাথরুমের দরজা খোলা।
এজন্য ঘরের ঠান্ডা ভাব অনেকটা কমে গেছে।তবে শিতল আছে এখনো।
বললাম,”এতো রাতে এভাবে ঘরের জানালা-দরজা খোলা কেন?”

“ঐ আরকি মায়ের অস্বস্তি হচ্ছিলো এজন্য।
ভেবেছিলাম দরজা-জানালা গুলো খুললে হয়ত মায়ের ভালো লাগবে।
সবরকম চেষ্টা করেও যখন মা ঠিক হচ্ছিলো না তখন তোমাদের ঘরে নিয়ে গেছি বাধ‍্য হয়ে।”

এদের কথার লজিকের ‘ল’ টাও আমি বুঝিনা মাঝেমধ্যে।এই বলছে এসির নিচে থাকলে ভালো লাগছে।আবার ঘরেতে এসির হাওয়া বাইরে বের করে দিচ্ছে স্বস্তির জন্য।

প্রলয় চারপাশে তাকিয়ে বলল,”তো ডাক্তারের কাছে নিতি।আমার ঘর কী ডাক্তারের চেম্বার?আর আমার বউ কী ডাক্তার?”

“তুই ছিলিনা।কীভাবে নিতাম?”

“বাড়িতে দু-দুটো চালাক-চতুর মহিলা তোরা।সারা দুনিয়া উল্টে খাস।আর সামান্য মাকে ডাক্তারের কাছে নিতে পারিসনি?
তেমন হলে প্রিয়তার থেকে হেল্প নিতি।”

আপু মাথা নত করে বলল,”হেল্প নিতেই গিয়েছিলাম তোর বউয়ের কাছে।”

প্রলয় একটা চেয়ায় নিয়ে এসে ওপরে ওঠে।এসির কাছে দাঁড়ায়।গুজে রাখা একটা কাঁটা তার বের করে বলে,”এই তারটা কে কেঁটেছে?”

সুমা আপুর মুখে ভয়ের ছাপ দেখলাম।
রিপা শুকনো ঢোক গিলল।
কেন যেন আমার মনে হলো কাজটা ওরাই করেছে।
ওরা একে-ওপরের দিকে তাকিয়ে এমন ভাব ধরলো যেন কিছুই জানেনা।
বিষ্ময়ের স্বরে বলল,”ওমা কী করে হলো এটা?
নিশ্চয় বেড়ালে কেঁটেছে।”

প্রলয় ও আমি প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকাই ওদের দিকে।
সুমা আপু বলল,”ওহ স‍্যরি।ইঁদুরে কেঁটেছে।মায়ের শরীর ঠিক নেই।চিন্তায় আমাদেরও মাথা ঠিক নেই।ভুল বকছি।”

প্রলয় কিছু বলেনা এবার।
নিচে নেমে এসে বলল,”অনেক কিছুই বলতে ইচ্ছে করছে তোদের।কিন্তু আজ আমার মনটা ভালো নেই।তাই ছাড় দিলাম।”

সুমা আপু বলল,”তাহলে আমরা থাকবো আজকে তোর ঘরে?”

প্রলয় চুপ রইলো।

সুমা আপু কিছুটা উচু গলায় বলল,”দ‍্যাখ প্রলয় আমার মায়ের যদি আজকে কিছু হয় তোকে আমরা কোনো দিনই ক্ষমা করবোনা।”

“এমনভাবে বলছিস যেন আমার ঘরে না থাকলে মা বাঁচবেই না।
যাকগে থাক।থেকে যদি তোদের মন শান্ত হয়।”

সুমা আপু নিশ্চিন্ত হলো।
আমি মিনমিনে স্বরে বললাম,”আপু আমিও কী আপনাদের সঙ্গে থাকবো?
যদি কোনো প্রয়োজনে আসি।”

“তুমি আবার কী প্রয়োজনে আসবে?তুমি কী ডাক্তার নাকি?”

মুখ ফুটে বলেই ফেললাম,”আপানারা কী ডাক্তার নাকি?”

“না সেটা না।তবে আমরা আমার মায়ের যেভাবে সেবা করবো তুমি পারবে সেভাবে করতে?পরের ঘরের মেয়ে তুমি।তোমায় ওতো খাটাতে পারিনা।তুমি গিয়ে সেইতো ঘুমাবে।
আমরা আবার ওতো বিবেক ছাড়া নই যে সারারাত বাড়ির বউকে বসিয়ে রেখে সেবা নেওয়ার মতো দজ্জাল শশুর বাড়ির লোক হবো।আমরা বউকে রাজার হালে রাখি।
তোহ তুমি যাও ঘুমিয়ে।এ ঘরে বিছানা করা আছে।”

প্রলয় হাত উচিয়ে বলল,”ঠিক আছে।তবে এঘরে আমরা থাকবোনা।এমনিতেই তোরা আমায় চোর বদনাম দিস।না জানি এ ঘরে থাকলে পরেরদিন আবার কী বলে বসবি!
আমি আমার সেকেন্ড রুমে থাকবো।”

“আমাদের পাশের ঘরে?”

“হুম।”

“কেন এঘরে থাকলে কী সমস্যা?না মানে এটা সাউন্ড প্রুফ ছিল।তোরা শান্তিতে ঘুমোতে পারতি।”

“ওতো শান্তির প্রয়োজন নেই।শান্তির ওপরে ছাই ঢালতে এমনিতেই লোকের অভাব নেই।আর মা যেহেতু অসুস্থ,কোনো বিপদ হলে ডাকবি নিশ্চয়।
সাউন্ড প্রুফ রুমে ঘুমালে শুনতে পারবো কী করে?”

সুমা আপু বা রিপা কেউ আর কিছু বলার সুযোগ পেল না।চুপচাপ মুখ ভার করে চলে যেতে লাগলো ওরা।
আমিও গেলাম।আমায় দেখে বলল,”কোথায় যাচ্ছো?”

“ঐ আমার আর কী একটা জিনিস নেওয়ার ছিল।”

“কী বলো আমরা নিয়ে দেই।”

ওদের কথা না শোনার ভান করে আমি ভেতরে ঢুকি ঘরের।
ভেতরে ঢুকে আমি তো অবাক!

মা আমাদের ড্রয়ার খুলে কী সব যেন দেখছে।
আমায় দেখে ঘাবড়ে গেল প্রচন্ড।
হেসে বলল,”ঐ এখান থেকে কিসের যেন একটা শব্দ এসেছিল।তাই আর কী দেখছিলাম কীসের শব্দ আসছে।”

অথচ ঐ ড্রয়ারটা আমি নিজের হাতে গুছিয়েছি।
ওখানে কোনো ডিভাইস জাতীয় জিনিস তো দূর কটা পেপার্স ছাড়া কিছুই নেই।তবে কিসের কাগজ তা আমি জানিনা।প্রলয়ের প্রয়োজনীয় কিছু।
আমি আর কিছু না বলে আমার নাইট ড্রেসটা নিয়ে চলে গেলাম পাশের রুমে।প্রলয় ততক্ষণে ঘর হালকা পাতলা গুছিয়েছে।
বিছানায় দুটো বালিশ পাশাপাশি রেখেছে। সাধারণত আমাদের দুটো বালিশ এতো ক্লোজ থাকেনা।আজ প্রলয় রেখেছে এতো কাছাকাছি।
আমি একটু ইতস্তত বোধ করি।
চুপচাপ বিছানায় গিয়ে বসলাম।প্রলয় হালকা কাশলো।ব‍্যাগ থেকে আমার পছন্দের চকলেট,একটা কানের ঝুমকো।এক মুঠো কাঁচের চুড়ি,তিনটি গোলাপ দিল।
দুটো আইসক্রিমও বের করে দিল আমার সামনে।এগুলো সব মেয়েদের ইমোশন।এগুলো দেখেও কেউ অভিমান চেপে রাখতে পারেনা মনে।কিন্তু আমার রয়েছে।
মন থেকে খটকা দূর হচ্ছেনা।
ওগুলো সব সাইট করে রেখে বালিশটা টেনে নিয়ে শুয়ে পড়লাম।
প্রলয় কিছুক্ষণ বসে রইলো এরপর শুয়ে পড়লো আমার পাশে।রাত বাড়ে।দুজনার কারো চোখে ঘুম নেই।আমি বিছানার এপাশ-ওপাশ করছি।
প্রলয় হুট করে আমার মাথায় হাত রাখে।হাত বুলিয়ে দেয় মাথায়।আমি চুপ থাকি।এটা আমার দূর্বলতা।মাথায় হাত দিয়ে কেউ কিছু বললে আমি মেনে নেই।বুঝে যাই।
প্রলয় বলল,”আপনি যেটা ভাবছেন সেটা ঠিক নয়।আমি চেষ্টা করছি আপনার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার।
অদিতি আমার অতীত।বর্তমানে আপনিই আমার সব এবং ভবিষ্যৎ।”

এবার মনে কিছুটা স্বস্তি হয়।
বললাম,”কোনোভাবে আপনি কী আমায় ঘৃণা করেন?”

উনি সামান্য হেসে বললেন,”ঘৃণা করলে আপনার এতো ভালো চাই?
আপনার জন্য এতো ফাইট করি?”

উনি আমায় ভালো না বাসুক,ঘৃণা তো করেনা।
সন্তুষ্ট হলাম আমি।উনার দিকে ঘুরলাম।
প্রলয় তাকিয়ে আছে ওপরের দিকে।
হঠাৎ আমি বললাম,”ড্রয়ারের ওপর ড্রয়ারে কী যেন পেপার্স আছে।আমি গুছিয়ে রেখেছিলাম।কিন্তু পড়া হয়নি।ওগুলো কিসের কাগজ?”

“আমার ব‍্যাংক এ‍্যাকাউন্টের সব পেপার্স।এছাড়াও আমার কেনা দুটো জমি ও একটা ফ্ল‍্যাটের কাগজ সহ আমার ব‍্যবসায়িক সব কাগজ আছে।
একটা পেপার্স খুঁজতে সব বের করেছিলাম।
এরপর তাড়াহুড়োয় সব ড্রয়ারের ওপরে রেখেছিলাম।আপনি সম্ভবত ড্রয়ারের ভেতরে রেখেছেন।
হঠাৎ এটা কেন জিজ্ঞেস করছেন?”

আমি উত্তর না দিয়ে উঠে বসলাম।মনে খটকা লাগছে কেমন যেন।
আমার কী যাওয়া উচিৎ ঐ ঘরে?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply