Golpo romantic golpo প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা

প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৪৩


প্রণয়ের_মায়াতৃষ্ণা ||৪৩||

ফারজানারহমানসেতু

শহরের ব্যাস্ততা ফুরিয়ে গেলেও, মানুষের ব্যাস্ততা রাতভর। এইতো শহর এখন নির্জন, তাও কোথাও না কোথাও কেউ নিজের কাজে মগ্ন আছে। রাত একটা বাজতে চলল, অথচ তূর্জান এইমাত্র অফিস থেকে এসেই এখনও আবার কোম্পানির হিসাব মিলাতে ব্যাস্ত। শাওয়ার নেওয়ার টাইম পর্যন্ত হচ্ছে না। এখানে তাজারুল নেওয়াজ কমই আসেন, স্টাফ আর ম্যানেজার এই কোম্পানির দেখাশোনা করেন।

বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া এখানে আসা হয় না। এতকিছুর মধ্যে হিসাবে প্রচন্ড গড়মিল। সবাই কি আর নিজের ভেবে অন্যের কাজ করে? তূর্জান ব্যাস্ততা কাটিয়ে উঠতেই পারেনি সারাদিনে। তাইতো বাড়ির সবার সাথে কথা হলেও রোজা ওখানে না থাকায় তার সাথে কথা হয়নি। বাবা-মায়ের সামনে তো আর বউকে নিয়ে ওভাবে বলা যায় না। তবে রোজার খোঁজ নিতে ভোলেনি।

হঠাৎ কি মনে করে অনলাইনে যেতেই দেখল, রোজা এখনো এক্টিভ আছে। তূর্জান কি ভেবে মুচকি হাসলো, রাত একটা বেজে যাচ্ছে। অথচ মহারানী না ঘুমিয়ে কি করছে, কে জানে? তূর্জান হেসে হুমকি স্বরূপ একটা ছোট্ট ম্যাসেজ লিখলো, “ এখনো জেগে থাকার কারণ কি? রাত কয়টা বাজে? ঘুমাসনি কেন?”

রোজা তখনো ফেইসবুক স্কল করছে। যদিও কিছুই দেখছে না। শুধু শুধু কি মনে করে এক্টিভ আছে কে জানে? ম্যাসেজ আসতেই, নোটিফিকেশন দেখল। তূর্জানের ম্যাসেজ, একসাথে এতগুলো প্রশ্ন করলে মানুষ কোনটা রেখে কোনটার উত্তর দেবে। নোটিফিকেশনে ম্যাসেজ দেখেই ফোন হাত থেকে রেখে দিল। এমন হুমকি দেওয়ার কি আছে? অদ্ভুত! রোজা তো এক্টিভ ছিলো… ভাবতেই অবাক হলো। আসলেই তো, সে যে পরিমান ঘুমকাতুরে, এতরাত জেগে ছিলো। সময়টা খেয়ালই নেই।

তবে যাইহোক, সকালে কিছু বললে বানিয়ে বলে দেবে অন্য কিছু। রোজা তো সেই সন্ধ্যায় ঘুমিয়েছে, আসলেই তো কে এক্টিভ ছিলো? ভাববার বিষয়। ফোন রেখে দিয়েই ঘুমানোর চেষ্টা করল। সারাদিনে আজ কেমন রুমটা গুমট লাগছে, সেই পরিচিত পারফিউমের তীব্র গন্ধ হালকা হয়েছে অনেকটা। কেনই বা হবে না? আজকে তো পারফিউমের মালিক সারাদিনে রুমে আসেনি।

রোজা একটা কুশনে মাথা রেখে অন্যটা দুহাতে আগলে নিয়ে চোখ বন্ধ করল। কুশনে কেমন যেন তূর্জান নেওয়াজের গায়ের সুগন্ধ মনে হচ্ছে। এই যা রোজা তো তূর্জানের কুশন বুকে চেপে ধরে ঘুমানোর চেষ্টা করছে।
এতকিছু হচ্ছে, হঠাৎ মনে তীব্র ইচ্ছা জাগলো , তূর্জানের ম্যাসেজর রিপ্লাই করবে। ভেবে ফোন হাতে নিতেই দেখল, দশমিনিট হয়ে গেছে ম্যাসেজ এসেছে। এতক্ষন পরে নিশ্চই কেউ ম্যাসেজ দেখেও রিপ্লাই না দিয়ে থাকে না?

তবে রোজার ভীষণ ইচ্ছে করছিলো, তূর্জানের ম্যাসেজের রিপ্লাই দিবে। মনে মনে ভেবেও ফেলল, “ আরেকটা ম্যাসেজ দিলে কি এমন ক্ষতি হবে? আপনার কথার ভান্ডার থেকে নিশ্চয় শব্দ ফুরাবে না? তো সেই দশমিনিট আগে একবার ম্যাসেজ লিখে, আর ম্যাসেজ দিচ্ছেন না। “

রোজা উশখুস করতে লাগলো। ম্যাসেজ দিবে, কি দিবে না? ফোন হাতে নিচ্ছে, তো রেখে দিচ্ছে। কি অদ্ভুত অনুভূতি তাই না? ভালোবাসলে প্রকাশ করার ক্ষমতা কি আর সবার থাকে? এইতো রোজাও হয়তো ভালোবেসে ফেলেছে, ওই উগ্র, ছন্নছাড়া, বদমেজাজি, কিন্তু সবার উর্ধে যত্নশীল পুরুষকে। যে নিজের রাগ কখনো কারোর উপর ঝাড়ে না। নিজে ঘুমড়ে ম’রে , কিন্তু অন্যের কাছে প্রকাশ করে না। হয়তো ভবিতব্য, নয়তো রোজা কেন, এই পুরুষের প্রেমে পড়ে গেল। তবে জ্ঞানী-গুনীরা ঠিকই বলে,

“প্রেমে পড়তে সময় লাগে না। মন তো নিজের অজান্তেই হাজারবার প্রেমে পড়ে। কখনো তীব্রভাবে, কখনো হালকাভাবে। তীব্রভাবে তাকে আপন করে, আর অন্যথায়, তাকে নিয়ে শুধু স্বপ্ন আঁকে।”

রোজাও ওই কোনো এক দলে পড়ে গেছে। হাজার ভাবনার মাঝে, এবার ম্যাসেজর টোন কানে আসতে দেরি হলেও রোজার ম্যাসেজ সিন করতে দেরি হয়নি। এবারেও ছোট্ট একটা ম্যাসেজ, “ পাষানী বউ, জেগে আছিস অথচ রিপ্লাই দিচ্ছিস না। “

রোজা কি ভেবে মুচকি হাসলো, রিপ্লাই দিলো ছোট্ট করে, “ হুমমম! বলুন, কিছু বলবেন কি? “

“ না বলবো না। ম্যাসেজ দিয়েছি কতক্ষন আগে?”

“ বারোমিনিট আগে। “

“ জেগে আছিস, তো রিপ্লাই কেন এলো না? তোর হাজবেন্ড নাহয় বিজি আছে, তুই অন্তত একটা ম্যাসেজ দিতে পারতি। “

“ বিজি ছিলেন ভালো কথা, তা কতটা বিজি থাকলে মানুষ অন্যজনের কথা ভুলে যায় ?”

“ বউ বউ ফিল পাচ্ছি। সরি, সত্যিই অনেক বিজি ছিলাম। সরি বউ আর এমন হবে না। “

“ এভাবে বলার কি আছে? আমি তো এমনিতেই জিজ্ঞেস করলাম। “

“ কিন্তু আমি তো বউয়ের মতো অধিকারবোধ দেখলাম। “

বলতেই ভিডিও কল এলো। রোজা কল রিসিভ করছে না দেখে, আবার লিখলো, “ ম্যাডাম ভালো হচ্ছে না কিন্তু! আমি আসলে, একদম…

পুরোটা পড়ার আগেই রিসিভ করল। তূর্জান মাত্রই শাওয়ার নিয়েছে। কি মায়াবী লাগছে দেখতে। চুল থেকে এখনো পানি ঝড়ছে। চিকচিক করছে, পানিবিন্দু সারা মুখশ্রী জুড়ে। রোজা ফোন রিসিভ করতেই দেখল তূর্জান ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছে। হয়তো কাজ করছে, মুখের এক সাইড দেখা যাচ্ছে। ল্যাপটপে কাজ করতে করতেই তূর্জান বলল, “ মিস ইউ বউ। “

রোজার যেন এই মুখটা দেখেই আকাশসম মন ভালো হয়ে গেল। ইশ কি সুন্দর, দেখতে এই পুরুষ। উহু পুরুষ নয়, একান্ত বাধ্যগত পুরুষ। রোজা কথা ঘুরিয়ে বলল, “ আপনি এখন শাওয়ার নিয়েছেন? “

কাজ করতে করতেই উত্তর দিল,“ হুমম। “

“ কেন? “
“ সময় পাইনি। কাজের অনেক প্রেশার এখানে,তোর শশুর আমাকে দিয়ে কাজ করাবে জন্য সব ফেলে রেখেছে। “

তূর্জানের মুখে তোর শশুর কথাখানা শুনে কেমন যেন লাগছে। ইশ, সবাই কত লজ্জা দেয় রোজাকে। কিন্তু ওভাবে যখন বসে কথা বলবে, তখন ভিডিও কল করার কি দরকার। ওই মুখের একসাইড ছাড়া কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। তাও চুলগুলো নিজ উদ্যোগকে তূর্জানের কপালে ছড়িয়ে যেন তূর্জানকে রোজা দেখতে না পারে।
কত বড় সাহস ওই চুলের, রোজার বিপরীতে গিয়ে তারই একান্ত পুরুষকে দেখতে দিতে নারাজ হচ্ছে। বড্ডো হিংসা হচ্ছে ওই চুলের প্রতি, কেমন অগোছালো হয়ে তূর্জানকে ভালোভাবে দেখতে দিচ্ছে না।

হঠাৎ বিপরীত থেকে কথা না আসতে দেখে ফোনের দিকে সম্পূর্ণ ঘুরে তাকলো।
রোজার হঠাৎ টমেটোর মতো লাল হওয়া মুখশ্রী দেখে রোজার অসস্থি বুঝতে পারলো তূর্জান। ইশ তার বউটা কত লজ্জা পেয়েছে। তাই কথা ঘুরিয়ে বলল, “ এতরাতে জেগে আছিস কেন? ঘুমিয়ে পর। শরীর খারাপ করবে। রাখছি। “

বলেই রোজার উত্তর না শুনেই ফোন কাটতে উদ্দত হলো। ঠিক তার আগেই রোজা প্রশ্ন করে বসল, “ খেয়েছেন আপনি?”

“ না। “

“ কেন? “

“ মাত্রই বাসায় ফিরেছি, আর মেইড যা রান্না করছে তা খেতে মন চাচ্ছে না। ভাবছি পরেরবার বউ সাথে করে নিয়ে আসবো। কি বলিস? “

রোজা প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই বলল, “ ছেলে নাকি মেয়ে মেইড? “

তূর্জান বোধহয় হাসল। বউ তার বড্ডো জেলাসি টাইপ দেখছি। একটু জ্বালানোই যায়। না থাক, শেষে যদি কান্না করে দেয়। কে সামলাবে রাগিনী কে? তার থেকে বাধ্য হাজবেন্ড হয়ে প্রশ্নের উত্তর দেওয়াই ভালো। সবাই তো বউকে জ্বালায়, তূর্জান নাহয়, জনম জন্মান্তর বাধ্য হাজবেন্ড হয়ে বউকে একটু তৃপ্তি দিয়ে যাক। অবশেষে কথা বলতে বলতে সময়টাই যেন রাতের শেষভাগের দিকে এগোতে থাকল। রোজা ঘুমিয়ে গেছে অনেক্ষন। তবে বোকাহরিনী এখনো জানেই না তার ঘুমন্ত মুখপানে এখনো একজন চেয়ে আছে। তূর্জানও বেডে গিয়ে শুয়ে পড়ল।

ফোনটা যত্নে নিজের হৃদপিন্ড বরাবর রেখে আওড়াল, “ তোর এই ঘুমকেও আমি ভীষণ ভালোবাসি বউ, কারণ তোর এই ঘুমই তোকে দেখার সুযোগ করে দেয়।ভালোবাসি বউ, আমার একান্ত ঘুমপরী। আমার পারসোনাল সুইটনেস রোজকে। “


মানুষ থেমে থাকলেও, সময় কি আর থেমে থাকে? থাকে না। মানুষ সময়ের ধার ধারলেও, সময় কখনো কোনো মানুষের ধার ধারে না। সে তো গন্তব্যের দিকে ছুটে চলে। সেকেন্ড, মিনিট, দিন পার করে সপ্তাহে পৌছায়। তেমনি আজ সপ্তাহ হয়ে গেছে তূর্জান বাড়িতে নেই। যদিও এমন একদিন নেই, যেদিন তূর্জান বাড়ির সবার সাথে কথা বলেনি।

আর রোজা, সে তো তূর্জানের হৃদপিন্ড, তার হিসাবটা তুলে ধরা কি আদেও সম্ভব? সম্ভব নয়, কারণ যে ব্যক্তি কাজের মাঝে সময় দিতে পারে, তাকে আর যাইহোক ভালোবাসার সংঙ্গায় সংঙ্গায়ীত করা যায় না। আজকে ফিরবে তূর্জান। তবুও একজন আজ অবাধ্যগতা করছে, ভার্সিটি তার আজ যেতেই হবে। এইতো রোজা, যে পুরো একসপ্তাহ ভার্সিটি যায়নি, তার আজ ভার্সিটি না গেলে কি এমন ক্ষতি হবে? নাকি প্রিয় পুরুষকে হেনস্থা করতে?

এদিকে তুবার বিয়ের শপিং এও আজকে যাবে সবাই। এইতো এই সপ্তাহে তুবাও অন্যের অর্ধাঙ্গিনী হয়ে যাবে। যে পুরুষ ভালোবাসার টানে, সূদূর দুরুত্ব ঘুচিয়ে, একেবারে সারপ্রাইজ স্বরূপ হাজির হয়েছে। তুবার কল্পনার আবেগে ঘেরা পুরুষ। যে প্রতিনিয়ত তুবাকে আগলে রাখার প্রচেষ্টা আর নিজের করে পাওয়ার তীব্র ইচ্ছা পোষন করছে।

সকালের আলোটা আজ একটু বেশিই উজ্জ্বল মনে হচ্ছে। যেন পুরো বাড়িটাই ব্যস্ততায় ডুবে গেছে। রান্নাঘরে হাঁড়ির টুংটাং শব্দ, ড্রয়িংরুমে তাড়াহুড়ো করে চলাফেরা সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত প্রাণচাঞ্চল্য। আজ তূর্জান ফিরবে।
এই একটা খবরই যেন পুরো বাড়ির আবহ বদলে দিয়েছে। তানিয়া নেওয়াজ এখন ছেলেকে বড্ডো চোখে হারায়। হারাবেই না কেন? সেই তো কতবছর ছেলেকে ধরতে পারেন নি, ছুঁয়ে দেখতে পারেন নি, দুটো কথা বলতে পারেননি। আজ ঐই সাতদিন যেন সে সাতবছর ঘুচিয়ে দিচ্ছে। মা বুঝি একেই বলে, সন্তান একঘন্টা পর বাসায় ফিরলেও, মনে হয় বছর পার করে ফিরছেন।

কিন্তু সেই একই বাড়ির এক কোণে, নিজের রুমে দাঁড়িয়ে আয়নার সামনে চুল বাঁধছে রোজা,মুখে একরাশ জেদ আর অভিমান,নিজেকেই যেন বোঝাচ্ছে সে,”আজকে আমার ভার্সিটি যেতেই হবে।”

কিন্তু কেন?এক সপ্তাহ যায়নি, আজ না গেলেও চলতো। তবুও যাচ্ছে,হয়তো নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য।হয়তো অপেক্ষাটাকে আরো একটু কষ্টকর করে তোলার জন্য।অথবা… তূর্জানকে একটু শাস্তি দেওয়ার জন্য। উহু এসব কিছুই না। বরং আজ তূর্জান নেওয়াজ যে সত্যি জানার কথা বলেছিলো, তা জানানোর জন্যই ভার্সিটি যাবে। কোথাও খোলা আকাশের নিচে দাড়িয়ে, সেই প্রশান্তিময় বাক্য তূর্জানের কানে তুলে ধরবে। যা শোনার একতীব্র জেদ সেদিন দেখিয়েছিলো তূর্জান।

হালকা গোলাপি একটা শাড়ি পড়ে পরে, অগোছালো চুলটা একটু গোছালো করে নিল। লম্বা কেশরাশি হাটু ছুইছুই। শাড়ির সাথে ম্যাচিং করে হালকা অর্নামেন্টস পড়ে নিল, চোখে কাজল নেওয়ায় যেন আরো সুন্দর লাগছে । চোখের কোণে অদ্ভুত একটা ঝিলিক,যেন কারো জন্য লুকিয়ে রাখা একরাশ অভিমান।

ঠিক তখনই দরজার পাশে এসে দাঁড়াল তুবা। মিষ্টি হেসে শুধালো,“ ভাবি, আজকে ভার্সিটি যাচ্ছো?”

অজান্তেই বলে ফেলল,“হুমম।”

রোজার হুমম বলতে দেরি, তুবার হেসে গড়াগড়ি খেতে দেরি হলো না। রোজা প্রশ্ন সূচক তাকাতেই বলল, “ অবশেষে ভাবি ডাকে উত্তর দিলি। “

“তো সারাদিন ভাবি ভাবি করিস, আমি কি করবো?”

“ আচ্ছা ভালো। কিন্তু ভাইয়া আজ আসবে…”

রোজা থামল না। শুধু হালকা গলায় বলল,“জানি।”

তুবা একটু মুচকি হেসে বলল,“তাহলে আজ না গেলেও পারতি! নাকি আমার ভাইয়া কে হেনস্থা করতে চাইছিস?”

রোজা এবার মিরর থেকে চোখ ফিরিয়ে তুবার দিকে তাকাল। চোখে হালকা কিছু অভিমান আর রাগমিশ্রিত কণ্ঠে বলল,“সবকিছু কি তার জন্য বন্ধ করে রাখতে হবে?”

তুবা আর কিছু বলল না। শুধু মনে মনে হাসল,“এই অভিমানটাই তো ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর রূপ।”


রোজা নিচে আসতেই তানিয়া নেওয়াজ চেপে ধরলেন, ব্রেকফাস্ট করে তবেই ভার্সিটি যেতে হবে। ইদানিং বেশ ভালোই লাগে, শাশুড়িমার আদর। এইতো তানিয়া নেওয়াজ সহ সবাই রোজাকে বৌমা বলে ডেকে অভ্যস্ত করে ফেলেছে। কেউ কিছু বললেই তূর্জানের দিক থেকে সম্মোধন করে। যদিও রোজার এখন বেশ ভালোই লাগে বৌমা, ভাবি, এইসব ডাক শুনতে। তানিয়া নেওয়াজ রোজাকে দেখে কি মনে করে জড়িয়ে ধরলেন, কান্নার বাধ ভাঙলো তার, মনে মনে আওড়াল, “ আজ তোকে দেখে ঠিক তোর মায়ের কথা মনে পড়ছে। একদম তোর মতোই দেখতে ছিলো সে। অথচ দেখ আজ তুই এতবড়ো হয়েছিস, তার রুপ পেয়েছিস, কিন্তু সে নেই। তাদের আর তোকে দেখার সৌভাগ্য হলো না। “

তানিয়া নেওয়াজ ফুফিয়ে উঠতেই রোজা তাকে সোজা করে দাড় করালো, চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলল, “ কি হয়েছে বড় আম্মু, কাদছো কেন? “

তানিয়া নেওয়াজ বোঝালেন, এমনিতেই। কান্নার মাঝেই, বলল, “ আমাকে একবার শাশুড়ি হিসেবে আম্মু ডাকতে পারবি? তোর মুখ থেকে শুনতে ভীষণ ইচ্ছা জাগছে।“

“ আমি তো তোমাকে আম্মুই ডাকি বড়আম্মু। “

“ উহু, ওভাবে নয়। আমার ছেলের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে একবার আম্মু বল। “

রোজা কিছু বুঝল না। সেও আবেগে কান্না করে দিচ্ছিলো। তার আগেই তানিয়া নেওয়াজ বাধ সাধলো, “ কান্না করলে তোকে একটুও ভালো দেখায় না। বিশ্রী লাগে। “

রোজা এবার বলেই দিলো,”আ, আ আম্মু। “ আম্মু বলতেই রোজা ফুফিয়ে কেদে উঠল। হঠাৎ তার বুকটা শূন্য লাগছে, কোথাও তার কেউ নেই। আপনজন হারিয়েছে এমন কষ্ট হচ্ছে। রাহেলা নেওয়াজ এসে তানিয়া নেওয়াজকে ইশারা করতেই তিনি কান্নার মাঝে হেসে ফেলল। রোজা যদি সত্যি জেনে যায়, যদি জানে, ওর বাবা মা নেই, রাফিয়া ওর বোন। এতো সত্যি কেউ ওকে বলেনি। আজ একেবারে জেনে গেলে, যদি ওর মস্তিস্কে আবার আঘাত হানে। তার থেকে নিজেদের ইমোশন কে এটে রাখাই ভালো।

তাজারুল নেওয়াজ আর মোস্তফা নেওয়াজও ইদানিং অফিসের কাজে বিজি। তাদের অফিসে হঠাৎ প্রচুর গোলমাল হয়েছে। এতদিন ধরা পড়েনি, অথচ তূর্জানের চোখে তা বাদ যায়নি। দুভাই সকাল সকাল অফিস গেছে। তুবা আরাজ, রাফিয়া সবাই এসে ড্রয়িং রুমে জড়ো হলো। রোজাকে নিয়ে ব্যাস্ত হলো, হাসি ঠাট্টায়, যেন তাকে ভুলিয়ে দেওয়া যায়, একটু আগের কাহিনী। হলোও তাই, তূর্জানকে জড়িয়ে দুএকটা কথা বলতেই লজ্জায় রাঙা হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি ব্রেকফাস্ট করে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলো।

অন্যদিকে কিচেনে দাড়িয়ে নোনাজল ফেলতে লাগল, রেহেনা নেওয়াজ। তিনি কি রোজার মুখ থেকে আর মা ডাক শুনতে পারবেন না। তার যে বড্ডো মেয়ের থেকে মা ডাক শোনার শখ। এতোদিন রোজা সেই শখ পূরণ করেছে। কিন্তু হঠাৎ যদি রোজা আর না ডাকে রেহেনা নেওয়াজ কে?

এদিকে তূর্জান আনমনে ড্রাইভ করছে। গাড়ি ধেয়ে আসছে পিছনে আকাবাকা রাস্তা ফেলে। চোখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট , কিন্তু ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসি,যেটা শুধু একজনের জন্য।
তার মাথায় একটাই চিন্তা ঘুরে বেড়ায়,“ তার বউটা কি করছে এখন?”

মনে মনে আওড়ালো, “ এবার সত্যিটা না বললে, তোর কি অবস্থা করবো নিজেও জানি না। বড্ডো জ্বালাচ্ছিস, এইতো হৃদপিন্ড এখন আর আমার কথা শোনে না। তোর ইশারায় নাচতে চায়। আচ্ছা কেউ কি এমন ভাবে কাউকে ভয় দেখিয়ে এতটা নিজের আয়ত্তে নিতে পারে ? যতটা ভালোবেসে নিজের আয়ত্তে নেওয়া যায়!”

রোজা তখন ভার্সিটির গেট দিয়ে ঢুকছে। নূর এসেছে আজ ভার্সিটি। যদিও প্রত্যেকদিন রোজাকে আসতে বললেও আসে না। সেখানে আজ নিজেই এসেছে, নূর দৌড়ে এসে বলল,“কোথায় ছিলি এতদিন? ভার্সিটি কেন আসিসনি? জানিস তূর্জান স্যার কত পড়া শেষ করে ফেলেছে? একগাদা টপিক মাথার উপর, এবার আমি বুঝতে পারছি, কেন তুই ওই ভাইয়ার প্রতি এত বিরক্ত ছিলি।”

কেউ কি আর নিজের হাজবেন্ডের নামে এমন কথা শুনবে নাকি? আর রোজা তো শুনবেই না। তবে ভার্সিটিতে বলা কি ঠিক হবে, যে সে প্রফেসর তূর্জান নেওয়াজের ওয়াইফ। তাই কিছু বললো না, তবে নূর কে আর কিছু বলতে দিলো না।
রোজা শুধু হেসে তূর্জানের কথা এড়িয়ে গেল।

ক্লাসে বসেও মন নেই। তাই ক্যান্টিনে গেলো দুজন। বারবার ফোনটা চেক করছে, কোনো ম্যাসেজ নেই। কিন্তু সময় অনুযায়ী এতক্ষন তূর্জান বাড়িতে চলে এসেছে। তাহলে একটা ম্যাসেজ অন্তত আসার কথা ছিলো। রোজাকে ভুলেই গেছে, নয়তো খোঁজ করলো না সে কোথায় আছে? মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল সাথে-সাথেই। “আসুক… আজ কথা বলবো না। ভাববোও না, সে কেউ না আমার।”

কিন্তু মনটা কি আর কথা শোনে? মন যে মস্তিস্কের বিপরীতে চলে।বারবার ভাবনায় ওই একপুরুষ ব্যতীত আর কারোর ঠাই এই মূহর্তে আসছে না। নূর বারবার রোজাকে খোচাতে লাগলো, কিন্তু এতকথা নূর বলে যাচ্ছে, রোজা শুনছেই না। আর দশমিনিট পরেই প্রফেসর ক্লাসে আসবে। ক্লাসেও যেতে হবে। আর রোজা বারবার ফোন নিয়ে ঘাটছে, আবার নামিয়ে রাখছে।না কিছু বলছে, না ক্লাসে যাচ্ছে। আজব মেয়ে!

ঠিক তখনই কেউ পাশ থেকে, খুব পরিচিত একটা কণ্ঠস্বর, নিচু স্বরে ভেসে এলো,“মিসেস নেওয়াজ, এখানে অভিমান জমিয়ে বসে বসে,মোবাইল চেক করা কি খুব জরুরি?”

রোজার শরীর কেঁপে উঠল, নূর অবাক হয়ে তাকাচ্ছে একবার রোজার দিকে, একবার তূর্জানের দিকে। নূর যেন দর্শক স্বরূপ,, কিছুই তার মাথায় ধরছে না।
তূর্জানের কণ্ঠ শুনে চোখ বন্ধ করে নিলো রোজা। ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল, তূর্জান ঠিক তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, চোখে সেই চেনা দৃষ্টি।
যেটা দেখলেই রোজার বুক কেঁপে ওঠে।নিজেকে ওই চোখের অতলে হারাতে মন চায়।

“আপনি… এখানে?”

তূর্জান ঠোঁটের কোণে হাসি টানল। বউ যে তার বুঝেও না বোঝার ভান করছে, তা ভালোই জানে। তাই পাশের চেয়ারে বসতে বসতে বলল, “ওয়াইফকে নিতে আসছি। কোনো সমস্যা?”

ক্যান্টিনের সবাই তাকিয়ে আছে। তূর্জান নেওয়াজ যে বিবাহিত তা কেউ জানেই না। না জেনেই মেয়েরা স্বপ্ন আঁকে তাকে নিয়ে। অথচ ভার্সিটিতে বউ নিয়ে ঘোরে এ। এই পরিণতি, মেয়েরা শুধু বিবাহিত ছেলের উপর ক্রাশ খেয়ে বসে থাকে। নয়তো, এমন কেউ, যে এক নারীতে আসক্ত।

রোজার গাল লাল হয়ে উঠল। এই পুরুষের জন্য আর কত লজ্জা পাবে রোজা, তা সে নিজেই জানে না। “আমি… ক্লাস করবো।”

“হুমম, ভালো।”

রোজা কিছু বলল না। শুধু চোখ নামিয়ে ফেলল। তূর্জানের সহজ কথা মানেই অন্য কিছু। নূর কিছু একটা আন্দাজ করতে পেরে, রোজাকে বাই বলে ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে গেলো। রোজা কিছু বলছে না দেখে,তূর্জান একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,“চল, বাড়ি যাই। অনেকদিন তোকে…”

রোজার নিঃশ্বাস আটকে গেল। একটু সরে বলল,“ কি করছেন?সবাই দেখছে…”

“ কি করলাম? আর দেখলে দেখুক। আই ডোন্ট কেয়ার!”

তূর্জান এবার সরাসরি হাত ধরে ফেলল। কোনো বাড়তি কথা না বলে সরাসরি বলল,“আমার ওয়াইফ, আমি নিয়ে যাচ্ছি। তোর হেটে যেতে সমস্যা হলে বল, আমি কোলে নিচ্ছি।”

রোজা আর প্রতিবাদ করল না। শুধু মাথা নিচু করে তূর্জানের সাথে বেরিয়ে গেল। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে চুপিচুপি একটা হাসি ফুটে উঠেছে। যাক প্রথম স্টেপ সাকসেসফুল । বাইরে এসে গাড়ির দরজা খুলে দিল তূর্জান। রোজা গাড়িতে বসছে না দেখে তূর্জান বলল, “রাগ করেছিস?”

রোজা মুখ ঘুরিয়ে বলল,“না।”

“মিথ্যা বলাটা ইদানিং ভালো করে শিখেছিস ।”

“আপনি তো খুব বিজি মানুষ, আমার রাগ-অভিমান নিয়ে ভাবার সময় কোথায়?”

তূর্জান হালকা হেসে তার দিকে ঝুঁকল।রোজার চিবুক আলতো করে তুলে বলল,“তাই নাকি? তাহলে এই সাতদিনে প্রতিদিন রাতে কার সাথে কথা বলে তার অভিমান ভাঙালাম ? ”

“ আমি কি জানি?”

“ ভালো, তা কার কথা ভেবে ঘুমাইনি? “

“আপনার সেই ছোটবেলার প্রেমিকার কথা হয়তো? তাকে তো অনেক ভালোবাসেন। নিশ্চয় তাকে ভেবেই…“

কথা শেষ হওয়ার আগেই তূর্জান বলল,“ উহু, এখন তার থেকে তোকে বেশি ভালোবাসি।”

“ আমি দুই নারীতে আসক্ত পুরুষ চাইনা। “

“ আমি এক নারীতেই আসক্ত। এখন কথা না বলে গাড়িতে ওঠ। ভালোবাসতে তো পারিস না, তো হাজবেন্ড কে হেনস্থা করা কোথা থেকে শিখেছিস? “

গাড়িতে উঠতে গিয়ে রোজার খেয়াল হলো, তার ফোন ক্যান্টিনে পড়ে আছে। তূর্জান রোজার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুচকাতেই বলল, “ আমার ফোন, ক্যান্টিনে ফেলে আসছি। “

তূর্জান রোজাকে গাড়িতে বসতে বলে ক্যান্টিনে চলে গেল। খানিকবাদে ফিরে এসে রোজাকে পেল না। গাড়িতে বা আশেপাশে কোথাও নেই। তবে খেয়াল করলো, গাড়ির একপাশে রোজার সেই পায়েল পরে আছে। তূর্জান বিরবির করলো, “ তুই ঠিক আছিস তো সুইটনেস রোজ…

ইনশাআল্লাহ চলমান….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply