Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৫৩


#নূর_এ_সাহাবাদ

#jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব – ৫৩

দেখতে দেখতে শীতের মৌসুমও কেটে গেল। কুয়াশা সরিয়ে আবার রোদ উঠতে শুরু করেছে সাহাবাদে। মহলের বাগানে নতুন ফুল ফুটেছে। পুরো মহল জুড়ে এখন সবচেয়ে বড় আনন্দের নাম মানুষটি হয়ে উঠেঋে জান্নাত। তাকে ঘিরেই মেতে থাকে জমিদার বাড়ির সদস্য রা। ছোট্ট মেয়েটা এখন হাঁটা শিখে গেছে। টলমল পায়ে পুরো মহল ঘুরে বেড়ায়। অতটা চঞ্চল বলা চলে না তবে বেশ আদূরে আর লক্ষি বাচ্চা। দাসীদের সাথেও তার বড় ভাব। প্রহরীদের তলোয়ার দেখে “আআআ” করে হাত বাড়ায়। চকচকে ধারালো জিনিস টা তার ধরার খুব লোভ। সে তো আর জানে না ওটা ধরলে তার কত বড় ক্ষতি হবে।

সবচেয়ে বেশি জ্বালায় বোধহয় বাইজিদ কেই ।

তার দরকারি কাগজপত্র হাতের নাগালে পেলেই ছিঁড়ে ফেলে। তলোয়ারের খাপ মাঝেমধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায় না। অবশেষে খোজাখুজির পর উদ্ধার হয় হয়তো পালঙ্কের তলা থেকে নয়তো সিড়ির কোনো কোণা কাণিতে।

বাবার কোল তার বড় পছন্দ। বাবা কোলে করে বাইরে নিয়ে যায়। বাগানে নিয়ে যায়, ঘোড়া দেখায়, রাজহাস দেখায়। মহলে ফিরে কোলে না নিলেই কান্না আরম্ভ করে দেয়। কত অভিমান জমে বাবার ওপর। সবচেয়ে পছন্দ সুনেহেরদ কে। জান্নাতের মা। মেহেরুন্নেসা কে আম্মি, আম্মু আধোআধো গলায় ডাকলেও, সুনেহেরা কে মা ডাকে। শেখাচ্ছে মনি মা। তবে পুরোটা এখনো বলতে পারে না। বাইজিদ মহলে ফিরে আর কাজ করার অবকাশ পায় না। মেয়েকে আহ্লাদ না করলে গাল ফুলিয়ে বসে থাকে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, বাইজিদ একটুও রাগ করে না। উল্টো মেয়ের পিছু পিছু ঘুরে বেড়ায়। মেহেরুন্নেসা মাঝে মাঝে বুরক্ত হয়। কিন্তু তার মনি মায়ের জন্য কিছু বলার উপায় আছে নাকি। একটু রাগ করলেই সে মেয়ে নিয়ে মহল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি দেয়। অগত্যা সবাই মুখ বুজে মেনে নেয় তাদের মা-মেয়ের ছেলেমানুষী।

বাইজিদ বাইরে নিয়ে গেলে এখন কোলে থাকতে চায় না জান্নাত। আঙুল ধরে হাঁটতে পছন্দ করে। সুনেহেরা কোথ থেকে একটা বিড়াল ছানা এনেছে। জান্নাতের ভীষণ পছন্দ সেটা।

এদিকে রত্নপ্রভার প্রসবের সময়ও ঘনিয়ে এসেছে। পেট বেশ বড় হয়ে গেছে তার। আগের মত রাগারাগি কমে এসেছে কিছুটা। যদিও আবিদের সাথে পুরোপুরি সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়নি এখনো। তবুও আবিদ এক মুহূর্তের জন্যও তাকে একা রাখে না। মহল থেকেও তাকে ছুটি দেওয়া হয়েছে। সারাদিন রত্নার আশেপাশেই ঘুরঘুর করে।

সময়মতো খাবার খাওয়ানো, হাঁটতে নিয়ে যাওয়া।

সব নিজেই করে। যথা সম্ভব চোখে চোখে রাখে যাতে বাইরে না যায় একা একা। এই পাপের ছোঁয়া সে তার অনাগত সন্তান এর গায়ে লাগাতে চায় না।

কয়েকদিন ধরে মেহেরুন্নেসা একটা বিষয় খেয়াল করছে। গভীর রাতে বাইজিদ কোথাও যায় চুপিচুপি। আর ফিরে আসে শেষ রাতে। জিজ্ঞেস করলেও বলে কাজ আছে। আজও তাই হলো।

গভীর রাত। পুরো মহল ঘুমিয়ে। জান্নাত মায়ের বুকের পাশে ঘুমাচ্ছে। বাইজিদ খুব আস্তে উঠে কালো চাদর গায়ে জড়ালো। মেহেরুন্নেসা চোখ বন্ধ রেখেই বুঝলো সব। বাইজিদ বেরিয়ে যেতেই সেও ধীরে উঠে বসলো। আর ছাড় দেওয়া যাবে না এ বিষয়ে। বাইজিদ কোনো ভুল এর সাথে জড়িত হলে তাকে থামাতেই হবে। নিঃশব্দে বোরখা পরে বেরিয়ে এলো কক্ষ থেকে। দূরত্ব রেখে অনুসরণ করতে লাগলো বাইজিদকে।

রাতের অন্ধকারে ঘোড়া ছুটছে দ্রুত। নদীর পাড়ের কাছে এসেই থামলো বাইজিদ।

মেহেরুন্নেসা দূরের গাছের আড়ালে লুকিয়ে তাকিয়ে রইলো। চোখ বড় হয়ে এলো তার ।

নদীর বুকে সেই পুরনো জাহাজ। যেটা বহুদিন আগে সুনেহেরা দেখেছিল। বড় কালো জাহাজটা নিঃশব্দে ভিড়ে আছে। কিছু লোক নামছে সেখান থেকে। সবার গায়ে কালো পোশাক,মুখ ঢাকা।

বাইজিদ তাদের সাথে নিচু স্বরে কিছু কথা বললো। তারপর সবাই মিলে জঙ্গলের ভেতর চলে যেতে লাগলো। মেহেরুন্নেসার বুক ধুকপুক করছে। এরা আবার কারা? বাইজিদ কী লুকাচ্ছে? কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সে জাহাজটার দিকে এগিয়ে গেল। চারপাশ নিস্তব্ধ। পাটাতন এখনো নামানো। মেহেরুন্নেসা সাবধানে উঠে পড়লো জাহাজে। উপরে উঠে চারপাশ দেখে অস্বস্তি হতে লাগলো। জাহাজের ভেতর অদ্ভুত সব কাঠের বাক্স। লোহার তৈরি বড় বড় খাঁচা।

কিছু কাপড়ে ঢাকা জিনিস। দেয়ালে ঝোলানো অচেনা অস্ত্র। আর এক কোণে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য কাঁচের শিশি।

ঠিক সেই ধরনের, যেগুলো একসময় অঙ্কুরের বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করতো। জাহাজের ভেতরটা অস্বাভাবিক ঠান্ডা। মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে হাঁটছে। চারপাশে কেবল কাঠের শব্দ।

নদীর ঢেউয়ের ধাক্কায় জাহাজটা হালকা কাঁপছে।

একটা বড় টেবিলের ওপর অনেক কাগজপত্র রাখা। মেহেরুন্নেসা সাবধানে একটা তুলে নিলো।

ভ্রু কুঁচকে গেল। সব ইংরেজিতে লেখা। কিছু আবার অদ্ভুত ভাষা। এসব ভাষা সে আগে কখনো দেখেনি। বড় বড় সিল মারা, লাল কালির অদ্ভুত চিহ্ন। সে আরেকটা দলিল হাতে নিলো। এক করে অনেক কাগজ দেখলো কোনো টায় বাংলা থাকলে অবশ্যই বুঝবে। হঠাৎই তার চোখ গেল নিচে লেখা সাক্ষর টায়। বুক ধক করে উঠলো তার। মেহেরুন্নেসার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।

এ সাক্ষর সে চেনে। খুব ভালো করেই চেনে।

বাইজিদ এর ইংরেজি সাক্ষর। সেই একই সাক্ষর।

একই হাতের লেখা। ঠান্ডা হয়ে গেল মেহেরুন্নেসার হাত। আরও তাড়াতাড়ি কাগজগুলো দেখতে লাগলো সে। আরও ভেতরে এগিয়ে গেল সে।

এক কোণে ভারী লোহার দরজা। সেখান থেকে যেন চাপা গোঙানির শব্দ আসছে। দরজাটা ঠেলে খুলতেই জমে গেল। ভেতরে কয়েকজন মানুষ বাঁধা। হাত শিকলে আটকানো। তাদের পোশাক দেখে বুঝতে বাকি রইলো না এরা চিকিৎসা বিজ্ঞানী। ঠিক অঙ্কুরের লোকগুলোর মত।

মেহেরুন্নেসার মাথা ঘুরে উঠলো। তার কানে যেন শব্দ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।বাইজিদ এসবের সাথে জড়িত? না…না এটা হতে পারে না। ঠিক তখনই দূর থেকে ভেসে এলো পায়ের শব্দ। লোকজন ফিরে আসছে মনে হয়। মেহের প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে এলো জাহাজ থেকে। পাটাতন বেয়ে নিচে নেমেই হাঁটা ধরলো মহলের দিকে। তার পা কাঁপছে। মাথার ভেতর হাজার প্রশ্ন। চাঁদের আলোয় দীর্ঘ পথ পেরিয়ে দ্রুত হাঁটছে সে।

আজ প্রথমবার নিজের স্বামীকেই অচেনা লাগছে তার। এই দুঃখ কোথায় রাখবে সে? বাইজিদ যদি ভুলক্রমেও ওই অপরাধী দের সাথে যুক্ত থাকে, মেহেরুন্নেসা কি করবে তখন? কোথায় যাবে সে?”

মাথার ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে তার । হাঁটতে হাঁটতে আচমকা থেমে গেল। সামনের অন্ধকার থেকে একটা ছায়া বেরিয়ে এলো। মুহূর্তেই হাত চলে গেল কোমরের ছোট ছুরির দিকে। তারপর সামনে থেকে এক পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো

“আমি।”

মেহেরুন্নেসা হাঁফ ছাড়লো।

“মিরান?”

মিরান সামনে এগিয়ে এলো। কালো চাদরে ঢাকা শরীর। সে এক নজরেই বুঝে ফেললো কিছু একটা হয়েছে। মেহেরুন্নেসার সামনে দাড়িয়ে বলল

“কি হয়েছে বেগম? সব ঠিক আছে তো?”

মেহেরুন্নেসা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো।

তারপর ব্যাথিত গলায় বলল

“আমি…আমি ওই জাহাজে উঠেছিলাম।”

মিরানের চোখ সরু হয়ে এলো।

“কোন জাহাজ?”

“যেটায় করে মাঝরাতে লোক আসে।”

মিরান এবার পুরো মনোযোগ দিল। দুজন রাস্তার পাশের পুরনো একটা ভাঙা পাথরের ওপর গিয়ে বসল। কুয়াশার ভেতর তাদের নিঃশ্বাসও দেখা যাচ্ছে বাষ্পের মত। মেহেরুন্নেসা সব বলতে শুরু করলো। সব শুনে মিরান দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলো। মেহেরুন্নেসা কাঁপা কাপা গলায় বলল

“আমি কিছুই বুঝতে পারছি না মিরা। উনি এসবের সাথে কেন জড়াবেন?”

মিরান নিচু স্বরে বলল

“অনেক সময় সবচেয়ে বড় সত্যি চোখের সামনেই থাকে। তবুও মানুষ দেখতে চায় না।”

মেহেরুন্নেসা মাথা নাড়লো।

“না। উনি এমন না।”

মিরান তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল

“সবাই ভালো। তবে সেটা ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত”

চোখের পানি বাধ মানে না মেহেরুন্নেসার। বুকের ভেতর অদ্ভুত ভয় জমছে। মিরান এবার বলল

“আর কিছু দেখেছেন?”

“কয়েকজন চিকিৎসা বিজ্ঞানী। বাঁধা ছিল।”

মিরানের চোখ মুহূর্তেই বদলে গেল।

সে ধীরে উঠে দাঁড়ালো।

“আমায় জায়গাটা দেখাতে হবে বেগম”

মেহেরুন্নেসা চমকে তাকালো।

“এখন?”

“হ্যাঁ।”

মেহেরুন্নেসা দ্বিধায় পড়ে গেল। তারপর আচমকা কিছু মনে পড়তেই মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মিরান ভ্রু কুঁচকালো।

“কি হয়েছে?”

“আমি বাবুকে মহলে রেখে এসেছি।”

সে তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়ালো।

“আমায় ফিরতে হবে।”

মিরান মাথা নেড়ে বলল

“আপনি যান। আমি জাহাজটার পিছু নিচ্ছি।”

“সাবধানে থেকো।”

মিরান হালকা হাসলো।

“মৃত্যু আমার পিছু ছাড়ে না। ভয় নেই।”

কথাটা বলেই অন্ধকারে মিলিয়ে গেল সে।

মেহেরুন্নেসাও দ্রুত হাঁটা ধরলো মহলের দিকে।

প্রায় দৌড়ে পৌঁছালো। মহলের ভেতরে ঢুকতেই কান্নার শব্দ আসে কানে। জান্নাত কাঁদছে।

পুরো মহল মাথায় তুলে কাঁদছে ছোট্ট মেয়েটা।

সুনেহেরা তাকে কোলে নিয়ে হাঁটছে।

“আরে বাবু থামো। তোমার আম্মা আসবে এখনই। কি আশ্চর্য এত রাতে ভাইজান ভাবি কেউই কক্ষে নেই। গেল কই তারা?”

কিন্তু জান্নাত আরও জোরে কাঁদছে। ছোট ছোট হাত ছুঁড়ছে। মেহেরুন্নেসাকে দেখতেই সুনেহেরা হাঁফ ছাড়লো।

“এই যে ভাবি! কোথায় গেছিলেন? বাবু তো কেঁদে মহল ভাসিয়ে ফেলছে।”

মেহেরুন্নেসা দ্রুত গিয়ে জান্নাতকে কোলে নিলো।

মায়ের গায়ের গন্ধ পেয়েই একটু থামলো সে।

ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে এখনো। মেহেরুন্নেসা বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো মেয়েকে।

তার বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো।

বাচ্চাটাকে এভাবে একা রেখে যাওয়া ঠিক হয় নি তার।

সকাল হতেই রান্নাঘরের দাসীরা সকালের খাবারের আয়োজন করছে। মেহেরুন্নেসা ঢুলতে ঢুলতে নিচে আসে। রাতের সেই অস্বস্তি নিয়ে খুব একটা ঘুম হয়নি মেহেরুন্নেসার। জান্নাতও রাতে কয়েকবার কেঁদেছে। ফজরের নামাজ শেষে মেয়েটাকে ঘুম পাড়িয়ে নিচে নামলো সে।

সিঁড়ি বেয়ে নামতেই দেখতে পেলো উঠানের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে সুনেহেরা। পরনে সাদা পোশাক। সোনালী খোলা চুলগুলো এলোমেলো।

মাথা নিচু করে নিঃশব্দে কাঁদছে। মেহেরুন্নেসা অবাক হয়ে এগিয়ে গেল।

“সুনেহেরা আপা?”

সুনেহেরা তড়িঘড়ি চোখ মুছলো।

“হ্যাঁ ভাবি বলো”

মেহেরুন্নেসা কাছে এসে কপাল কুঁচকে বলল “কাঁদছো কেন?”

সুনেহেরা কিছু বললো না প্রথমে। দূরের তাকিয়ে রইলো। তারপর খুব নিচু গলায় বলল

“আজ একটা বিশেষ দিন ভাবি।”

“কেন?”

সুনেহেরার চোখ আবার ভিজে উঠলো।

“আজ রত্না আপা আর ছোট ভাইজানের মৃত্যু বার্ষিকী।”

মেহেরুন্নেসা চমকে তাকালো

“মৃত্যু…বার্ষিকী?”

সুনেহেরা মাথা নাড়লো।

“এই দিনেই ওরা মারা গেছিল।”

মেহেরুন্নেসার বুক ধক করে উঠলো। ছোট ভাইজান মানে কি বলল সে?

“অরণ্য শাহ…?”

সুনেহেরা ফুঁপিয়ে উঠলো।

“হ্যাঁ। ছোট ভাইজান।”

সে কাঁপা গলায় বলতে লাগলো

“আমি তখন অনেক ছোট। কিন্তু ওই দিনের কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে ভাবি। তুমি বলতে না? ভাইজান এর মত দেখতে অন্য কেউ ছিল কিনা? ছোট ভাইজান ছিল। তাকে বিনা অপরাধে দন্ডিত করা হয়। সেই শোক সইতে না পেরে আপা সেদিন সকালেই আত্মহত্যা করে”

চারপাশ যেন আরও নীরব হয়ে গেল।

সুনেহেরা ধীরে ধীরে উঠানের মাঝখানে হাঁটতে লাগলো।

“অথচ অপরাধী রা এখনো মুক্ত ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি কিচ্ছু করতে পারছি না ভাবি। “

মেহেরুন্নেসার মাথার ভেতর কিছু একটা প্যাচ খেলতে লাগলো। এই বিশাল সত্যি টা উন্মুক্ত করার সময় এসেছে। যদিও পুরোটা এখনো অন্ধকার।

সকাল গড়িয়ে দুপুরের দিকে এগোলো। আজ সাহাবাদ মহলে আগের মত প্রাণচাঞ্চল্য নেই।

পুরো মহলে অদ্ভুত একটা ভারী পরিবেশ।

মেহেরুন্নেসা জান্নাতকে কোলে নিয়ে করিডোর দিয়ে হাঁটছিল। হঠাৎ তার চোখ গেল বারান্দার দিকে। বাইজিদ দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। একদম স্থির। কালো পাঞ্জাবি পরা। দুই হাত পেছনে রাখা।

দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। অদ্ভুত ক্লান্ত লাগছে তাকে দেখতে। মেহেরুন্নেসা কাছে গেল। জান্নাত বাবাকে দেখেই ছোট ছোট হাত বাড়িয়ে দিলো।

“আআআ…আআ”

বাইজিদ তাকালো মেয়ের দিকে। তারপর খুব নরম স্পর্শে কোলে তুলে নিলো। মেয়েটা খিলখিল করে হাসছে বাবার কাছে গিয়ে। অথচ তার বাবা হাসছে না। মেহেরুন্নেসা শান্ত গলায় বলল

“আপনার মন খারাপ?”

বাইজিদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর নিচু স্বরে বলল

“আজ ফাল্গুন এর বাইশ তারিখ। অরণ্য আর রত্নার মৃত্যু বার্ষিকী ”

মেহেরুন্নেসা নির্বাক তাকিয়ে রইলো। বাইজিদ জান্নাতের ছোট্ট হাতটা নিজের আঙুলে জড়িয়ে নিলো।

“নয় বছর হয়ে গেল। মনে হয় এই তো সেদিনের কথা।”

দূরের ফাঁকা উঠানের দিকে তাকিয়ে বলল

“অরণ্যটা রত্না কে বড় ভালোবাসতো মেহের। রত্নাও অবশ্য কম ছিল না। যেদিন ফাসির দিন ধার্য করা হয়, সেদিন সকালেই আত্মহত্যা করে রত্না। আর ওই…”

বাক্য শেষ করলো না। মেহেরুন্নেসা খেয়াল করলো বাইজিদের চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে নিজেকে সামলাচ্ছে।

“ওদের দুজনকে আমি রক্ষা করতে পারিনি।”

কথাটা বলেই চোখ নামিয়ে ফেললো সে।

মেহেরুন্নেসা বাইজিদ এর বাহুতে হাত রেখে বলল

“আপনার তোর আর দোষ ছিল না।”

বাইজিদ হালকা মাথা নাড়লো।

“দোষ তো ওদেরও ছিল না মেহের। আমরা যাদের রক্ষা করার শপথ নিই, তাদের হারালে বিনেক থেকে দোষ নিজের ওপরই আসে।”

জান্নাত বাবার জামার কলার ধরে টানছে।

বাইজিদ মেয়ের দিকে তাকালো। অনেকক্ষণ পর খুব ক্ষীণ একটা হাসি ফুটলো তার ঠোঁটে। মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে বলল

“আল্লাহ অন্তত তোকে আমার কাছ থেকে দূরে না করুক।”

মেহেরুন্নেসার বুকটা হালকা কেঁপে উঠলো। বাইজিদ মেয়েকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো।

মেয়ের ছোট্ট হাতটায় চুমু খেয়ে বলল

“অর্ষা ও ঠিক জান্নাতের মতই ছিল। ভীষণ আদূরে। তুই ওর মত হোস না মা। তুই অর্ষা বা রত্নার মত হবি না। তুই হবি তোর মনি মার মত। সুনেরাহ কে দেখে শিখবি কি করে শত্রুকে প্রতিহত করতে হয়। ওমন তেজ তোর চোখেও থাকবে। বড় বড় ঘাতক রাও তোর মনি মা কে ভয় পায়। ওটা নাকি মেয়ে না, ওটা আগুন। তুই ও ওমন হবি।”

বাইজিদ এর শোকাচ্ছন্ন অবস্থা দেখে আর গতরাতের বিষয়টা তুলতে পারলো না মেহেরুন্নেসা। লোকটার চোখেমুখে আজ শোকের চিহ্ন বসে গেছে একেবারে। যেন নয় বছর আগের ক্ষততে আবার নতুন করে খোঁচা লেগেছে।।

চুপচাপ বাইজিদ এর পাশে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। বাইজিদ জান্নাতকে বুকের সাথে জড়িয়ে বারান্দার বাইরে তাকিয়ে আছে।

ছোট্ট মেয়েটা বাবার দাড়ি টানছে। তবুও আজ তার মুখে হাসি ফুটছে না। মেহেরুন্নেসা ছোট্ট করে বলল

“আপনি একটু রাখুন ওকে। আমি বাবুর জন্য দুধ গরম করে আনি।”

বাইজিদ শুধু মাথা নাড়লো। জান্নাত মায়ের দিকে হাত বাড়াতে গিয়েও আবার বাবার জামা আঁকড়ে ধরলো। মেহেরুন্নেসার বুকটা নরম হয়ে গেল।

মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে সে নিচে নেমে এলো।

হেঁশেলের দিকে যেতে যেতেও মাথায় গতরাতের দৃশ্য ভেসে উঠছে। কোনো ভাবেই নিশ্চিত হতে পারছে না আসলেও কি বাইজিদ এসবের সাথে জড়িত? বুকের ভেতর অস্বস্তিটা ক্রমশ বাড়তে লাগলো। হেঁশেলে ঢুকলো ভাবনা নিয়েই। উষ্ণ ধোঁয়া এসে লাগলো মুখে। দাসীরা দুপুরের রান্নায় ব্যস্ত। মেহেরুন্নেসাকে দেখেই সবাই সরে দাঁড়ালো।

“সম্রাজ্ঞী এসেছেন।”

মেহেরুন্নেসা মাথা নেড়ে একটা পিতলের পাত্রে দুধ ঢাললো। চুলার ওপর বসিয়ে নাড়তে লাগলো ধীরে ধীরে। তখনই তার চোখ গেল হেঁশেলের এক কোণে একটা ছোট কাঠের তাক। সেখানে কয়েকটা কাঁচের শিশি রাখা। কালো কাপড়ে অর্ধেক ঢাকা। মেহেরুন্নেসার ভ্রু কুঁচকে গেল।

এই শিশিগুলো কোথায় যেন দেখেছে? এগিয়ে গেল শিশির তাকের দিকে। একটা হাতে তুলে নিয়ে ভালো করে দেখলো। ভেতরে নীলচে রঙের তরল। ঠিক একই ধরনের শিশি সে গতরাতে জাহাজে দেখেছে। নিঃশ্বাস ধীর হয়ে এলো।

শিশিটার মুখ খুলে খুব সাবধানে গন্ধ নিতেই কপাল কুঁচকে গেল। তীব্র এক অচেনা গন্ধ।

মেহেরুন্নেসা দ্রুত চারপাশে তাকালো। দাসীরা নিজেদের কাজে ব্যস্ত। কেউ খেয়াল করছে না।

সে আরেকটা শিশি হাতে নিলো। সেটার ভেতরে সাদা গুঁড়ো। আরেকটায় লালচে তরল। তার হাত ঠান্ডা হয়ে এলো।

“এগুলো এখানে কেন?”

ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা দাসীর কণ্ঠ ভেসে এলো

“সম্রাজ্ঞী?”

মেহেরুন্নেসা চমকে তাকালো। দাসীটা বলল

“দুধ উথলে পড়ছে।”

মেহেরুন্নেসা দ্রুত শিশিগুলো জায়গামতো রেখে চুলার দিকে গেল। কাঠ টেনে বের করে জ্বাল কমিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলল।

“এই শিশি গুলো এখানে কে এনেছে? কার এত দুঃসাহস? কে ক্ষতি করার চেষ্টা করছে এ পরিবারের?”

ঈদ মোবারক সবাইকে। কাজের ব্যস্ততায় ও লিখেছি তোমাদের জন্য। সবাই রেসপন্স করিও হুমম। কেমন হয়েছে বলিও। সবার ঈদ প্রিয়জন দের সাথে সুন্দর কাটুক, হাসিখুশি আর আনন্দে কাটুক। ঈদ মোবারক সবাইকে 🥰🫶

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply