#নূর_এ_সাহাবাদ
#jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ৫০
গভীর রাত। চারপাশ একদম নিস্তব্ধ। আবিদ দের বাড়ির থেকে একটু দূরেই নদী। নদীর পাড় থেকে কুকুরের ডাক ভেসে আসছে ক্ষীণভাবে। হারিকেনের হলদে আলোয় ছোট্ট কক্ষটা আধো অন্ধকার। মেঝেতে বিছানা করে শুয়ে পড়েছিল নেওয়াজে আবিদ। সারাদিনের ক্লান্তিতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতেই পারে নি। হঠাৎ কেমন যেন ঘষটানোর শব্দ কানে আসে তার। ঘুম ভেঙে গেল আচমকাই। অবাক ও হলো বেশ। এই রাত বিরেতে কে কি করছে? মনে হলো ভারী কিছু টানা হচ্ছে মাটির ওপর দিয়ে। আবিদ চোখ খুলে কিছুক্ষণ বোঝার চেষ্টা করলো শব্দটা কোথা থেকে আসছে। তারপর কিছুটা বিচলিত ভাবে উঠে বসল। চারপাশ অস্বাভাবিক নীরব। থাকারই কথা এত রাতে ঘুম বাদ দিয়ে কে কি করবে।
তার দৃষ্টি সোজা গিয়ে পড়লো বিছানার দিকে।
কিন্তু বিছানাতে রত্নপ্রভা নেই। মুহূর্তেই বুক ধক করে উঠলো তার।
“শাহজাদি?”
আবিদ তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়ালো। দরজার বাইরে বের হলো। উঠান ফাঁকা। রান্নাঘর ফাঁকা। বারান্দা, পিছনের ছোট পথ, কুয়োর পাশ সব জায়গায় খুঁজলো। কোথাও নেই রত্নপ্রভা।
বাইরে ঠান্ডা বাতাস বইছে। বৃষ্টি হয়ে গেছে অল্প। আবার বোধহয় নামবে। রত্না কে না পেয়ে আবিদের হাত-পা কেমন ঠান্ডা হয়ে উঠলো।
মনে অদ্ভুত অস্বস্তি কাজ করতে লাগলো।
আজকালকার ঘটনাগুলোর পর থেকে কাউকেই বিশ্বাস করা যায় না। তার ওপর রত্নপ্রভার অতীত। গলা শুকিয়ে এলো তার। আবার মেয়েটা ভুলভাল কিছু করে বসবে না তো? আবার দ্রুত বাইরে বের হলো। ছোট্ট বাগানটাও খুঁজলো। কোথাও কেউ নেই। বাতাসে তীব্র জুঁই ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে।
অনেকক্ষণ খুঁজেও পেল না। নিজের ওপর বড় রাগ হচ্ছে। তার উচিৎ ছিল আজকের রাতটা তাকে চোখে চোখে রাখা। ক্লান্ত হয়ে আবার কক্ষে ফিরলো আবিদ। দরজা ঠেলেই থমকে গেল।
রত্নপ্রভা আগের মতই বিছানায় শুয়ে আছে।
চাদর গায়ে দেওয়া। যেন কোথাও যায়ই নি।
আবিদ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো।
তারপর এগিয়ে গেল খাটের দিকে।
“শাহজাদি? শাহজাদি”
দুইবার ডাকতেই রত্নপ্রভা চোখ খুললো। মুখে বিরক্তি নিয়ে বলল।
“কি হয়েছে?”
আবিদ কিংকর্তব্যবিমূঢ় গলায় বলল
“আপনি কোথায় গিয়েছিলেন?”
রত্নপ্রভা ভ্রু কুঁচকালো।
“মানে?”
“ আমি আপনাকে পাচ্ছিলাম না। পুরো বাড়ি খুঁজলাম।”
রত্নপ্রভা কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তারপর ধীর গলায় বলল
“ঘুম আসছিল না। বাইরে গিয়েছিলাম একটু।”
আবিদ হাঁফ ছাড়লো যেন। তবুও বুকের অস্বস্তিটা পুরো গেল না। তখন স্পষ্ট শুনেছিল ভারী কিছু টানার শব্দ। আর তাছাড়া বাইরে খুঁজতে গিয়ে কোথাও রত্নপ্রভাকে পায় নি। রত্নপ্রভা আবার চোখ বন্ধ করে ফেললো।
“এখন ঘুমান। মাথা ধরেছে আমার।”
আবিদ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর নিচে নিজের বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো। আর ঘুম এলো না তার।
বারবার মনে হতে লাগলো, কিছু তো একটা লুকাচ্ছে রত্না।
সকাল হয়েছে। সূর্য পুরোপুরি উঠেনি এখনো। চারপাশে হালকা কুয়াশার আস্তরণ। উঠানের কোণে জমে থাকা শিশিরে আলো পড়ে চিকচিক করছে। গভীর ঘুমে ছিল আবিদ। হঠাৎ তার মা এসে দরজায় খটখট শব্দ করে ডাকতে লাগল
। “আবিদ… এই আবিদ উঠ তো।”
আবিদ বিরক্ত গলায় বলল
“উফফ আম্মা… কি হয়েছে?”
“উঠ বলছি জরুরি কথা আছে।”
আধো ঘুম চোখে উঠে বসলো আবিদ। দরজা খুলে সাথে সাথেই আঙুল ঠোঁটে দিয়ে ফিসফিস করে বলল
“আস্তে কথা বলো। শাহজাদির ঘুম ভেঙে যাবে।”
কথাটা বলেই বিছানার দিকে তাকালো। রত্নপ্রভা এখনো ঘুমিয়ে আছে। মুখটা অন্যদিকে ফিরানো। কাল রাতের মতই নিশ্চুপ। আবিদ দরজা আগের মতই ভিড়িয়ে দিয়ে বাইরে বের হলো। উঠানে এসেই দেখলো তার মা কেমন অস্থির হয়ে চারপাশ দেখছে।
“কি হয়েছে?”
তার মা হাত তুলে মাটির দিকে দেখালো।
“এগুলো দেখ তো। কাল রাতে কি কিছু এনেছিলি বাড়িতে? এগুলো তো ঘোড়ার গাড়ির চাকার দাগ ও না। মনে হচ্ছে কিছু টেনে আনা হয়েছে। বড় কোনো থলে, বস্তা”
আবিদ নিচে তাকাতেই কপাল কুঁচকে গেল। ভেজা মাটির ওপর লম্বা লম্বা দাগ। মনে হচ্ছে ভারী কিছু টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে উঠান পেরিয়ে পিছনের সরু পথের দিকে।
একটা না, অনেকগুলো। মাটির কিছু অংশ গভীরভাবে কেটে গেছে ভারে। আবিদ হাঁটু গেড়ে বসে দাগগুলোর ওপর হাত বুলালো। মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠছে তার। গতরাতে তার শোনা শব্দটা ভুল ছিল না তার মানে। ঘষটানোর শব্দ। ভারী কিছু টানার শব্দ।
নিচু গলায় বলল
“রাতে কিছু শুনেছিলে নাকি আম্মা?”
“কই না তো। আমি তো কিছু শুনিনি। তুই শুনেছিলি?”
আবিদ ওপর নিচ মাথা নাড়ল।
“হ্যা…”
“কি?”
“মনে হয়েছিল… কেউ যেন ভারী কিছু টানছে।”
আবিদের মায়ের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“হায় আল্লাহ। চোর টোর নাকি। দেখি তো ঘরের সব ঠিক আছে কিনা।”
আবিদ উঠে দাঁড়ালো দ্রুত। তার চোখ এবার সোজা গিয়ে পড়লো কক্ষের দরজার দিকে।
ভিতরে এখনো নিশ্চুপ হয়ে ঘুমিয়ে আছে রত্নপ্রভা। কিন্তু কেন যেন হঠাৎ করে মেয়েটাকে আর আগের মত নিরীহ লাগছে না তার।
মনে হচ্ছে কালকের ঘটনারা রত্না ভালো করেই জানে। কেবল তার কাছে লুকাচ্ছে।
আবিদ হাতমুখ ধুয়ে বাজারে গেল। ফিরে এসে দেখে রত্নপ্রভা আয়নার সামনে বসে চুল আঁচড়াচ্ছে। মুখে আগের মতই শান্ত ভাব। যেন রাতের অদ্ভুত ঘটনাগুলোর কিছুই জানে না সে।
আবিদ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তারপর বলল
“শাহজাদি… একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?”
রত্নপ্রভা আয়নায় চোখ রেখেই বলল
“করুন।”
আবিদ কিছুটা ইতস্তত করলো।
“গতরাতে আপনি বাইরে গিয়েছিলেন। তখন কি কিছু দেখেছিলেন? নদ মানে, উঠানে কিছু দাগ পাওয়া গেছে।”
রত্নপ্রভা এবার ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকালো। “দাগ?”
“মনে হচ্ছে ভারী কিছু টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর রাতে যখন আপনাকে খুঁজলাম। সেরকম শব্দও পেয়েছিলাম।”
রত্নপ্রভার চোখের পলক পর্যন্ত পড়লো না। একদম স্বাভাবিক গলায় বলল
“আমি এমন কিছু জানি না। আর কোনো শব্দও শুনিনি।”
এতটা আত্মবিশ্বাসের সাথে কথাগুলো বললো যে নিজেকেই ভুল মনে হলো আবিদের। রত্নপ্রভা উঠে দাঁড়ালো তারপর শান্ত গলায় বলল
“আপনি কি ভাবছেন আমি মাঝরাতে বস্তা টানাটানি করেছি?”
আবিদ তড়িঘড়ি মাথা নাড়লো।
“না না। আমি সেভাবে বলিনি।”
রত্নপ্রভা ঠান্ডা স্বরে বলল
“তাহলে এসব নিয়ে আর ভাববেন না। গ্রামের বাড়িতে কত রকম শব্দই তো হয়।”
কথা শেষ করে ওড়না টেনে বাইরে বেরিয়ে গেল সে। আবিদ দাঁড়িয়ে রইলো ঠদয়। তার মনে হচ্ছে মেয়েটা কিছু লুকাচ্ছে। কিন্তু কী?
উঠানে এসে দেখলো তার মা রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মাটির চুলায় আগুন জ্বলছে। পাশে ডাল, সবজি রাখা। রত্নপ্রভা গিয়ে বসলো শাশুড়ীর পাশে। মুচকি হেসে বলল বলল
“আমি সাহায্য করি?”
ভদ্রমহিলা যেন আঁতকে উঠলো।
“না না না মা! আপনি এসব করবেন না।”
রত্নপ্রভা অবাক হলো।
“কেন?”
“আপনি শাহজাদি মানুষ। এই ধোঁয়া আগুনের কাজ আপনার মানায় না। হায় আল্লাহ, এই সব করার অভ্যাস আছে নাকি আপনার”
রত্নপ্রভা শান্ত স্বরে বলল
“এখন তো আমি আপনার ছেলের স্ত্রী। এত আড়ম্বরের কি আছে?”
মহিলার মুখ নরম হয়ে এলো।
“তাও হয় নাকি মা? আপনার হাতের চামড়া দেখেছেন? এই হাতে কড়াই ধরতে ভালো লাগবে?”
রত্নপ্রভা চুপ করে রইলো। অনেকদিন পর কেউ তাকে এত যত্নের স্বরে কথা বলছে। অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো বুকের ভেতর। ভদ্রমহিলা হাসিমুখে একটা পিঁড়ি এগিয়ে দিলো। “আপনি বসুন। আমি নাস্তা দিচ্ছি।”
রত্নপ্রভা সেখানেই বসলো। এই সাধারণ ছোট্ট সংসারের উষ্ণতা তার জীবনে বড় বেশি অপরিচিত। এভাবেই ধীরে ধীরে কাটতে লাগলো তাদের ছোট্ট সংসার। ছোট্ট দালানবাড়ি। সকালে উঠানে রোদ আসে সন্ধ্যায় তা অস্ত যায়। বিকেলে জুঁই ফুলের ছোট্ট বাগান টায় বসে থাকে রত্না। আবিদ চেষ্টা করতো। খুব চেষ্টা করতো শাহজাদির মন জয় করার। আর পাঁচ টা স্বামী স্ত্রীর মত হওয়ার।
কখনো বাজার থেকে রত্নপ্রভার পছন্দের ফল এনে রাখে। কখনো নতুন কাপড়। কখনো সন্ধ্যায় উঠানে বসে গল্প শুরু করতে চায়। কিন্তু রত্নপ্রভা সবসময় একটা দূরত্ব রাখে। তাদের সম্পর্কে ভদ্রতা, সম্মান সবই আছে। নেই কেবল ভালোবাসা। আবিদ বুঝে, তবুও কিছু বলে না”
রাতে একই কক্ষে থেকেও দুজনের মাঝে যেন অদৃশ্য একটা দেয়াল দাঁড়িয়ে থাকে। আবিদ অবশ্য কখনো জোর করে না। কখনো প্রশ্নও করে না বেশি। রত্নপ্রভা ইচ্ছে করেই নিজেকে সরিয়ে রাখে তার কাছ থেকে। কারণ মনটা এখনো অতীতের বিষাক্ত শেকলে আটকে আছে। মাঝরাতে কখনো ঘুম ভেঙে গেলে জানালার পাশে বসে থাকে সে। দূরে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ।
আবিদ মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে দেখে কিন্তু কাছে যায় না।
একদিন সকালের দিকে উঠানে ঘোড়ার গাড়ির শব্দ শোনা গেল। আবিদ বাইরে বের হয়েই থমকে যায়। সাহাবাদ মহলের রাজকীয় গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে সামনে।
দুজন সৈন্য নেমে সম্মান দেখালো।
“নায়েব মশাই, আপনাদের দুজনকে মহলে যেতে বলা হয়েছে। জরুরি সংবাদ।”
আবিদের কপাল কুঁচকে এলো।
“কি হয়েছে?”
সৈন্য মাথা নিচু করলো
“তা আমাদের জানানো হয়নি।”
ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো রত্নপ্রভা।
আজ তার পড়নে নীল পোশাক। চুলগুলো খোলা। মুখে কেমন অদ্ভুত টান পড়ে গেছে গাড়ি দেখেই।
মহল থেকে জরুরি তলব মানে সাধারণ কিছু না। নিশ্চয়ই তা গুরুতর কিছু। রত্নপ্রভা বলল
“কোনো বিপদ হলো নাকি?”
আবিদ উত্তর দিতে পারলো না। কারণ তার নিজের বুকেও অকারণ অস্বস্তি জমতে শুরু করেছে। উপায় না পেয়ে দুজনেই গেল গাড়িতে চড়ে।
ঘোড়ার গাড়িটা টগবগ শব্দ করে সাহাবাদ প্রাসাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দূর থেকেই কেমন যেন ভিন্ন এক পরিবেশ টের পেল আবিদ। প্রাসাদের বাইরের রাস্তা জুড়ে মানুষের আনাগোনা। বড় বড় মশাল টাঙানো হয়েছে। রঙিন কাপড় দিয়ে সাজানো ফটক। সৈন্যদের মুখেও কেমন উজ্জ্বল ভাব। আবিদ ভ্রু কুঁচকে তাকালো চারপাশে।
“আজ কি কোনো অনুষ্ঠান?”
পাশে বসা রত্নপ্রভাও জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে দেখছে। ঢাকের শব্দ ভেসে আসছে দূর থেকে।
প্রাসাদের কাছাকাছি আসতেই দেখা গেল বিশাল উঠানে বড় বড় ডেগে রান্না হচ্ছে। দাসীরা ব্যস্ত হয়ে এদিক সেদিক ছুটছে। পুরো সাহাবাদ যেন উৎসবে মেতে উঠেছে। প্রভা আবিদ কে বলল
“আপনার তো ভালো জানার কথা। বিয়ের পর আমি বাড়িতে না আসলেও আপনি গো রোজ ই আসেন।”
গাড়ি থামতেই এক দাসী এগিয়ে এসে সম্মান দেখালো।
“শাহজাদি, নায়েব মশাই। জমিদার সাহেব অপেক্ষা করছেন।”
আবিদ গাড়ি থেকে নেমে চারপাশে তাকালো বিস্মিত চোখে। গতকালও তো সে মহলে এসেছিল হিসাবের কাজে। কেউ তো একটা কথাও বলেনি। তাহলে হঠাৎ এত আয়োজন কেন? ভেতরে ঢুকতেই উত্তর পেয়ে গেল।
দরবার সংলগ্ন বিশাল প্রাঙ্গণে দোয়া মাহফিল বসেছে। সাদা কাপড়ে ঢাকা আসন। চারপাশে সুগন্ধি ধূপের গন্ধ। রাজ্যের গণ্যমান্য লোকজন উপস্থিত। সামনে বসে আছেন বাকের শাহ্।
তার মুখে বহুদিন পর এমন প্রশান্তি দেখা যাচ্ছে।
আবিদ আর রত্নপ্রভা এগিয়ে যেতেই বাকের শাহ্ খুশির কণ্ঠে বললেন
“এসেছো তোমরা? এসো এসো।”
রত্নপ্রভা মলিন হেসে বলল
“কি উপলক্ষে এত আয়োজন আব্বা?”
বাকের শাহ্ এর চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো আনন্দে।
“সাহাবাদ এর ভাবী উত্তরাধিকারীর জন্য।”
রত্নপ্রভার কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। আবিদও খুশি হয়ে বলল
“আরে এ তো সুসংবাদ”
বাকের শাহ্ গর্ব মেশানো কণ্ঠে বললেন “মেহেরুন্নেসা মা হতে চলেছে। আমার বংশের নতুন শাহজাদা আসছে। তাই রাজ্যের সকল মানুষের সাথে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছি।”
কিন্তু রত্নপ্রভার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন ভারী হয়ে উঠলো। তার চোখ অনিচ্ছায় চলে গেল দূরে বসে থাকা মেহেরুন্নেসার দিকে। কত সুখ তার।
সবাই তাকে ঘিরে আছে।
সম্মান, ভালোবাসা, রাজ্য, স্বামী, সন্তান সব যেন তারই। রত্নপ্রভা ঠোঁট শক্ত করে চোখ সরিয়ে নিলো।
আবিদ বাকের শাহ্ কে বলল
“আব্বা সিদ্ধান্ত টা হঠাৎ ই নেিয়া নাকি? গতকালও তো আমি আসলাম, কিছু বললেন না তো”
বাকের শাহ্ কিছু বলার আগেই প্রভা চেতে যায় আবিদের ওপর
“আপনি কে কে আপনাকে বলতে হবে সব টা?”
আবিদের মুখ অপমানে থমথমে হয়ে যায়। বাকের শাহ্ মেয়েকে ধমক দেয়।
“কি বলছো রত্না? ও আমাদের জামাই। কে হয় মানে? বাবা সিদ্ধান্তঃ টা বাইজিদ নিয়েছে। তাও আবার গত রাতে। তুমি বিকেলে চলে গেছিলে। রাতে তোমায় জানাতে পারিনি। তাই তো সক্কাল সক্কাল ঘোড়ার গাড়ি পাঠিয়েছি”
আবিদ হেসে বলল
“আমি বুঝতে পেরেছি আব্বা। রান্নার ওদিক টা দেখি বরং।”
“হ্যা বাবা যাও”
প্রভা চলে গেল নিজের ঘরে। মেহেরুন্নেসার পাশ কেটেই গেল। মেহেরুন্নেসা প্রভার ব্যবহারে ভাবলো হয়তো বিয়ের বিষয়টা নিয়ে এখনো তার ওপর রাগ করে আছে।
সুনেহেরা আজকাল ভীষণ চুপচাপ হয়ে থাকে। কথা বলে না দরকার ছাড়া। চঞ্চল মেয়েটার দস্যি পনা কমে গেছে। তার আপন মানুষ গুলোই রুপ বদলাচ্ছে। যে বোন কে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতো, সে অনেক আগেই মারা গেছে। এই মেয়েটা তার বোন নয়। অন্য কেউ। কোনো ভাবেই এটা মানতে পারছে না সুনেহেরা। নিজের মা তাকে হত্যা করতে চাইলো। আর কি কি দেখতো হবে বেঁচে থাকলে? এখন চিন্তা হয় মেহেরুন্নেসার জন্য। তার বাচ্চা টা ভালোভাবে দুনিয়ায় আসুক। ভাবনার মধ্যেই পাশ থেকে পুরুষালী কন্ঠ কানে আসে
“উহুম উহুম”
সুনেহেরা চমকে তাকাতেই দেখে মাহাদি পাশে দাড়িয়ে আছে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাথা ঠেকায় তার চওড়া বাহুতে।
“আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না”
“মাহফিলে একটু বসুন। হাদিস পাঠ শুনুন। ভালো লাগবে”
অগত্যা এই দৃশ্য দেখলো চন্দ্রা। সুনেহেরা কেই খুঁজছিল এসেছে পর থেকে। এতক্ষণ পরে এসে তাকে পেল। তাও আবার এই অবস্থায়। সেনাপ্রধান এর বাহু জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। রাগে চোখ জোড়া লাল হয়ে ওঠে তার। ক্রোধ নিয়ে ডাকে
“সুনেহেরা”
দুজনেই পিছনে ফিরে। দুজনের মধ্যে সামান্য ভয় বা লজ্জা কিছুই নেই। চন্দ্রা কড়া গলায় বলল
“এখানে কি হচ্ছে?”
“তা বলার আপনি কে?”
মাহাদি কে কিছু বলতে না দিয়ে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল সুনেহেরা। মাহাদি হতভম্ব। কখনো সুনেহেরা কে নোনের সাথে এমন ব্যবহার করতে দেখেনি সে। হতে পারে কোনো মনমালিন্য চলছে।
****
দোয়া মাহফিল শেষ হতে হতে অনেক রাত হয়ে গেল। কক্ষে ফিরে ক্লান্ত শরীর নিয়ে পালঙ্কে বসলো মেহেরুন্নেসা। এখন তার শরীর আগের মত নেই। পেটটা বেশ ভারী হয়ে উঠেছে। হাঁটলেও কষ্ট হয়। মাঝে মাঝেই মাথা ঘোরে। নিজের পেটের ওপর আলতো হাত রাখলো সে।
হঠাৎই খেয়াল হলো বাইজিদ কক্ষে নেই। কিছুক্ষণ পর পাশের দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলো সে। কালো পোশাক পড়া। কোমড়ে তলোয়ার বাঁধা। মনে হচ্ছে কোথাও বের হবে।
মেহেরুন্নেসা ভ্রু কুঁচকে বলল
“এত রাতে কোথায় যাচ্ছেন?”
বাইজিদ খুব স্বাভাবিক গলায় বলল
“একটু কাজ আছে।”
“কিসের কাজ?”
“ফিরে এসে বলবো।”
মেহেরুন্নেসা উঠে দাঁড়াতে গেলেই বাইজিদ দ্রুত এগিয়ে এসে ধরে ফেললো।
“আস্তে। কি যে করো না তুমি”
মেহেরুন্নেসা কেমন সন্দেহভরা চোখে তাকালো। “আপনি কিছু লুকাচ্ছেন?”
বাইজিদ ছোট্ট হাসলো।
“আপনার থেকে আমি লুকাবো সম্রাজ্ঞী?”
“আমি যাব আপনার সাথে।”
“উহুম। তুমি বিশ্রাম নাও। সারাদিন কম হুটোপুটি করো নি”
তারপর মেহেরুন্নেসার পেটের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল
“তাছাড়া এ অবস্থায় তোমার বাইরে যাওয়া ঠিক না।”
মেহেরুন্নেসা কিছু বলার আগেই বাইজিদ আলতো করে কপালে চুমু দিলো।
“ঘুমিয়ে পড়ো। ফিরতে বেশি দেরি হবে না।”
কথা শেষ করে বেরিয়ে গেল সে। মেহেরুন্নেসা স্থির হয়ে বসে রইলো। তার বুকের ভেতর কেমন অস্থিরতা কাজ করছে। হঠাৎ করেই দেখলো তাদের কক্ষের সামনে দিয়ে সুনেহেরা যাচ্ছে। মেহেরুন্নেসা ডাকলো
“সুনেহেরা আপা”
সুনেহেরা ডাক শুনে পিছনে ফিরল
“জি ভাবি?”
“একটু ভিতরে আসো।”
সুনেহেরা ভিতরে ঢুকতেই মেহেরুন্নেসা নিচু স্বরে বলল
“তোমার ভাইজান কোথাও যাচ্ছে। আমি যেতে পারছি না। তুমি ওকে অনুসরণ করো।”
সুনেহেরা চোখ বড় বড় করে বলল “গোয়েন্দাগিরি?”
মেহেরুন্নেসা চোখ পাকিয়ে তাকালো। সুনেহেরা হেসে ফেলল ফিক করে।
“আচ্ছা যাচ্ছি।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই কালো চাদর জড়িয়ে ঘোড়ায় চড়ে বেরিয়ে পড়লো সে। রাত তখন গভীর। সুনেহেরা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে অনুসরণ করতে লাগলো বাইজিদকে। মহল পেরিয়ে জঙ্গল পেরিয়ে শেষমেশ নদীর দিকেই যেতে লাগলো সে।
নদীর পাড়ের কাছে পৌঁছাতেই ঘোড়া থামিয়ে দূরে লুকিয়ে রইলো সে। বাইজিদ পানি ঘেষে দাঁড়িয়ে আছে। শিঘ্রই সুনেহেরার চোখো পড়লো নদীর কালো পানির ওপর বিশাল এক জাহাজ ভিড়ে আছে। ঠিক সেই পুরনো জাহাজটা। যেটাকে এর আগেও দেখেছে অনেকে। জাহাজের গায়ে মশালের আলো দপদপ করছে। পাটাতন নামানো হলো নদীর পাড় পর্যন্ত। বাইজিদ চারপাশ দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে সেই পাটাতন বেয়ে উঠে গেল জাহাজে। সুনেহেরার বুকের ভেতর কেমন ঠান্ডা একটা স্রোত নেমে গেল। জাহাজটার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো সুনেহেরা।
বাইজিদ উঠে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই পাটাতন আবার টেনে তুলে নিল লোকগুলো। তারপর নদীর বুক চিরে এগোতে শুরু করলো জাহাজটা।
সুনেহেরা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো। ভাইজান কোথায় যাচ্ছে? কার সাথে? তাও আবার এই জাহাজে।
তার বুকের ভেতর অদ্ভুত অস্বস্তি জমতে লাগলো।
সে আর মহলে ফিরলো না। ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে ছুটলো উত্তরের প্রাসাদের দিকে। অনেকদিন ধরেই জায়গাটা ফাঁকা। অঙ্কুর উধাও হওয়ার পর থেকে প্রাসাদটাকে গুদামঘর বানানো হয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলের বণিকেরা এখানে মালপত্র রাখে এখন। বিশাল ভবনের চারপাশে মশাল জ্বলছে।
প্রহরীও অনেক। সুনেহেরা দূরে একটা শুকনো ঝোপের আড়ালে ঘোড়াটা বেঁধে দিলো।
তারপর কালো চাদরটা ভালো করে মুড়িয়ে নিঃশব্দে এগোতে লাগলো।
রাতের বাতাসে চারপাশ টাতে কেমন স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ। পুরনো প্রাসাদটার দিকে তাকালে এখনো গা ছমছম করে। এখানেই তো কত ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছিল। সুনেহেরা দেয়ালের পাশে ঝুঁকে ঝুঁকে এগোতে লাগলো। কানে একটা একটা শব্দ আসলো। মাটি ঘষার মত শব্দ। তৎক্ষণাৎ থেমে গেল সে। সামনের খোলা জায়গাটার দিকে তাকাতেই চোখ সরু হয়ে এলো। দুজন লোক চারপাশ দেখে মাটির ওপরের বড় কাঠের ঢাকনাটা সরালো। তার নিচে অন্ধকার একটা গর্ত। গর্ত না ঠিক, সুরঙ্গ।
তারপর দেখতে পেল কালো কাপড় জড়ানো একজন লোক দ্রুত সেই সুরঙ্গ বেয়ে নিচে নেমে গেল। লোকটা নামতেই আবার ঢাকনাটা লাগিয়ে দিল বাকিরা। সুনেহেরার মাথার ভেতর যেন ঝড় বয়ে গেল। এই গুদামের নিচে সুরঙ্গ? আর সেখান দিয়ে লোক যাওয়া আসা করছে? কই সুনেহেরা তো কখনো এই সুরঙ্গ দেখেনি। কত গোপন সুড়ঙ্গ তার জানা। এসব ভাবনার মধ্যেই আচমকা পিছন থেকে কেউ একজন বারি দিল সুনেহেরার মাথা বরাবর। আগে থেকেই টের পেয়ে যেতেই সামান্য সরে গেল। কিন্তু তবুও বারি টা লাগলো তার বাম কাঁধে।
কদিন ধরে রিচ খুবই কম। গল্প অনেক পাঠক দের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। সবাই একটু রেসপন্স করবেন পর্বটায়। কমেন্ট করবেন সবাই।
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১৭
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩৬
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৪৬
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২৯ এর প্রথমাংশ
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩৪ এর এর খণ্ডাংশ
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৯
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৫৬
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২০