নাজনীননেছানাবিলা
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৩৯
অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌❌❌
জানালার পর্দা ভেদ করে এক চিলতে রোদ এসে নীলার চোখেমুখে পড়তেই তার তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা কেটে গেল। ধীরে ধীরে চোখের পলক ফেলল সে। শরীরটা যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে আছে, বিশেষ করে মাথাটা। কালকের সেই হাড়ভাঙা খাটুনি আর রুদ্ধশ্বাস দৌড়ঝাপের ধকল এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি সে। সারা জীবনেও বোধহয় এতটা পথ তাকে এভাবে ছুটতে হয়নি।
নীলার একদম উঠতে ইচ্ছে করছে না। তার অবচেতন মন বারবার বলছে, সে এখন জীবনের সবচাইতে নিরাপদ কোনো আশ্রয়ে আছে। ঘুমের ঘোরে তার চোখজোড়া যখন বারবার বুজে আসছিল, তখন আর জোর না করে সে গা এলিয়ে দিল। কিন্তু চোখ বন্ধ করতেই গতরাতের প্রতিটি মুহূর্ত চলচ্চিত্রের মতো তার মানসপটে ভেসে উঠল।
মিহালের সাথে তার বিয়ে হয়ে গেছে—এই ধ্রুব সত্যটি মনে পড়তেই তার চোখজোড়া বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে খুলে গেল। পরক্ষণেই সে উপলব্ধি করল, সে কোনো জড় বালিশের ওপর নয়, বরং একজনের প্রশস্ত বুকের ওপর মাথা রেখে শুয়ে আছে। নীলার বুঝতে বাকি রইল না, এই উষ্ণ আশ্রয়টি কার।
একটু লজ্জিত হয়ে সে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। মিহাল তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে আছে, যেন এক মুহূর্তের জন্যও এই মায়ার বাঁধন আলগা হতে দিতে চায় না সে। নীলার নিজের ভেতরেও এক অদ্ভুত দ্বিধা—মিহালের এই নির্ভরতার বুক ছেড়ে উঠে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তার নেই। এক অব্যক্ত ভালোলাগা তাকে গ্রাস করে নিল। শেষ পর্যন্ত সে আর নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করল না,বরং সবটুকু সমর্পণ নিয়ে মিহালের বুকের মাঝে ঘাপটি মেরে শুয়ে রইল।
মিহালের বুকে মুখ গুঁজে পড়ে রইল নীলা। মিহালের শরীর থেকে ভেসে আসা সেই তীব্র পুরুষালি ঘ্রাণ ওর নাসিকারন্ধ্রে আঘাত করছে, যা ওকে ক্রমশ এক ঘোরলাগা নেশার অতলে তলিয়ে দিচ্ছে। এক অদ্ভুত নাম না জানা শিহরণে নীলার সারা শরীর বারবার কেঁপে উঠছে। ঘুমের ঘোরেই মিহালের একখানা হাত নীলার কোমরে এবং অন্য হাতটি ঘাড়ের কাছে অবাধ্য বিচরণ চালাচ্ছে। সেই অনিচ্ছাকৃত ছোঁয়ায় নীলার ভেতরকার সুপ্ত সত্ত্বাটা যেন বারবার জেগে উঠতে চাইছে।
নীলা বুঝতে পারল, এই মায়ার জালে নিজেকে সঁপে দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। তাই অত্যন্ত সন্তর্পণে নিজেকে মিহালের বাহুডোর থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা শুরু করল সে। কিছুটা সফলও হলো, মিহালকে সামান্য আলগা করে সে ইঞ্চিখানেক দূরে সরে এল। কিন্তু এই দূরত্বটুকু হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়াল।
নীলা সরে একটু যেতেই মিহাল ঘুমের ঘোরেই নড়েচড়ে উঠল এবং পরক্ষণেই নিজের মুখ নীলার গলার ভাঁজে গুঁজে দিল। নীলার তখন প্রাণ যায় যায় অবস্থা! ঘরে এসির হিমশীতল হাওয়া বইছে, বাইরেও কনকনে ঠান্ডা—অথচ নীলার কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। মিহালের তপ্ত ঠোঁট জোড়া বারবার নীলার গ্রীবায় ঠেকছে, আর মিহালের উষ্ণ দীর্ঘশ্বাস আগুনের হলকার মতো আছড়ে পড়ছে নীলার ত্বকে। এক হাত কোমরে আর অন্য হাতে ঘাড় আগলে ধরে মিহাল তাকে যেন আরও নিবিড়ভাবে নিজের কাছে টেনে নিল। নীলার মনে হচ্ছে বুক ফেটে দম আটকে আসবে। এই তীব্র আবেগ আর হৃদস্পন্দনের দ্রুতি সামলানোর সাধ্য যেন আজ তার নেই। নীলার মনে হলো সময়ের চাকা বুঝি থমকে গেছে। মিহালের নিশ্বাসের প্রতিটি স্পন্দন তার গলার রক্তনালীতে গিয়ে আছড়ে পড়ছে। নীলা অসহায়ের মতো দুহাতে মিহালের শক্ত কাঁধ আঁকড়ে ধরল—একবার মিহাল কে দূরে ঠেলে দিতে চাইল, আবার পরক্ষণেই মায়ার টানে আরও জাপ্টে ধরল। তার শরীরের প্রতিটি কোষে এক অদ্ভুত বিদ্রোহ শুরু হয়েছে।
হঠাৎ মিহালের হাতের বাঁধন আরও জোরালো হলো। সে ঘুমের ঘোরেই নীলার গলার ভাঁজে নাক,মুখ ঘষতে ঘষতে অস্ফুট স্বরে কিছু একটা বিড়বিড় করল। সেই উষ্ণ পরশ নীলার শিরদাঁড়া দিয়ে এক তীব্র বৈদ্যুতিক তরঙ্গ বইয়ে দিল। নীলার দুচোখ বুজে এল, নিজের অজান্তেই তার ঠোঁট থেকে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। সে বুঝতে পারল, মিহালের এই আচ্ছন্ন ভাবটা এখন আর কেবল ঘুমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং অবচেতন মনে মিহালও নীলার অস্তিত্বের স্বাদ নিচ্ছে।
নীলা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। সে আলতো করে মিহালের চুলে হাত ডুবিয়ে দিয়ে মিহালকে নিজের দিকে আরও একটু টেনে নিল। তার মনে হলো, দম আটকে মরে গেলেও এই মুহূর্তটা সে হারাতে চায় না। এসির ঠান্ডা বাতাস এখন আর তার গায়ে লাগছে না, মিহালের শরীরের উত্তাপ তাকে এক অন্য পৃথিবীতে নিয়ে গেছে যেখানে কেবল তারা দুজন। কিন্তু হুঁশ ফিরতেই সে চোখ খুলে ফেলল এবং আবার নিজেকে মিহালের বাহুডোর থেকে সরিয়ে আনার চেষ্টা শুরু করল।
ঠিক সেই মুহূর্তে মিহালের ঘুমন্ত ভারী কণ্ঠস্বর তার কানের কাছে ফিসফিস করে উঠল__
“পালাবার চেষ্টা করছিলে নীলাঞ্জনা ?”
নীলা চমকে তাকালো মিহালের দিকে। দেখল মিহাল আধবোজা চোখে তার দিকে তাকিয়ে এক চিলতে রহস্যময় হাসি হাসছে। তার দৃষ্টিতে এমন এক নেশা ছিল যে নীলা চাইলেও দৃষ্টি সরাতে পারল না। উত্তেজনায় সে কোনো কথা খুঁজে পেল না, শুধু তার গলার ওপর মিহালের ঠোঁটের সেই মৃদু চাপ তাকে আবার বাকরুদ্ধ করে দিল।
মিহালের সেই রহস্যময় হাসি আর তপ্ত চাহনি নীলাকে যেন পাথর করে দিল। সে পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে মিহালের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। মিহাল তার হাতের বাঁধন না সরিয়েই নীলার কানের লতিতে পরে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিল। ওর আঙুলের স্পর্শে নীলা যেন আবার বাস্তবে ফিরে এল। এবং কিছুটা কেঁপেও উঠলো। তবুও সে নিজেকে সামলে নিয়ে একটু গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল__
“ছাড়ুন আমাকে। একদম বাড়াবাড়ি করবে না আপনি। ভুলে যাবেন না কিন্তু আমাদের বিয়ের আগে কিছু চুক্তি হয়েছিল। সেখানে স্পষ্ট বলা ছিল— আপনি আমায় স্পর্শ করতে পারবেন না। তাহলে এখন কেন আমাকে স্পর্শ করছেন।”
মিহাল ভ্রু কুঁচকে একটু হাসল। তার চোখের নেশাটা যেন আরও গাঢ় হলো। সে নীলার কোমরে রাখা হাতের চাপ একটু বাড়িয়ে ওকে নিজের আরও কাছে টেনে নিয়ে বলল__
“চুক্তি? ওহ, সেই নীল আকাশ ছোঁয়ার বারণ? কিন্তু নীলাঞ্জনা, তুমি কি খেয়াল করেছো যে তুমি নিজেই এখন আমায় শক্ত করে ধরে আছো? তোমার দুহাত আমার কাঁধে, আর তুমি নিজেই সাড়া রাত আমার বুকের ওপর আশ্রয় নিয়ে ঘুমিয়ছিলে। আমি তো শুধু তোমাকে আগলে রেখেছি। এখন তুমিই বলো, তুমি যদি নিজ থেকে আমায় এভাবে আচ্ছন্ন করে রাখো, তবে আমি সাধারণ একজন মানুষ হয়ে, বলতে গেলে একজন আগুন সুন্দরী স্বামী হয়ে নিজেকে সামলাই কী করে?”
নীলা থতমত খেয়ে নিজের হাত সরিয়ে নিতে চাইল মিহালের কাঁধের উপর থেকে, কিন্তু মিহাল সুযোগ দিল না। সে নীলার হাতের উপর নিজের হাত রেখে নীলর হাত টেনে নিজের ঘাড়ের পেছনে রাখলো। তারপর নীলার চিবুক আলতো করে উঁচিয়ে ধরে বলল__
“দিনশেষে তো আমি তোমাকে ভালোবাসি নীলা। এই ভালোবাসার কাছে কোনো চুক্তি কি আদৌ টেকে? আর তাছাড়াও, কাল আমাদের বাসর রাত ছিল। পরিস্থিতির চাপে হয়তো রাতটা আমরা উপভোগ করতে পারিনি, কোনো রোমান্টিক মুহূর্ত কাটেনি। কিন্তু তাই বলে কি ‘বাসর দিন’ টাকেও এভাবে অবহেলায় কাটিয়ে দেব? রাতটা না হয় তোলা থাক, দিনটা তো আমার পাওনা হতে পারে।”
মিহালের এমন সোজাসাপ্টা আর গভীর কথায় নীলার সমস্ত যুক্তি যেন এলোমেলো হয়ে গেল। সে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে অন্য দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল__
“আপনি বড্ড বেশি কথা বলেন এবং নির্লজ্জ হয়ে যাচ্ছেন।”
মিহাল নীলার করা অপমান গায়ে না লাগিয়ে নীলার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল__
“বড্ড বেশি কথা বলার চেয়েও বেশি কিছু করার ক্ষমতা আমার আছে নীলাঞ্জনা, যদি তুমি রাজি থাকো তাহলে আমি তোমাকে প্রাক্টিক্যালি দেখাতে পারি।”
নীলার সারা মুখ লজ্জায় আরক্ত হয়ে উঠল। মিহালের গাঢ় চাহনি আর তপ্ত বিশ্বাসের মাঝে সে যেন এক মায়াবী গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছে। সে মনে মনে বুঝতে পারল, তাদের মধ্যকার সেই কৃত্রিম চুক্তিগুলো আজ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। মিহালের এই অবাধ্য ভালোবাসা আর দাবির কাছে তার সব যুক্তি আজ বড্ড অসহায়।
কিন্তু পরক্ষণেই একরাশ বিষণ্ণতা তার মনের কোণে মেঘের মতো জমা হলো। তার তো সময় চাই। একবার ধোঁকা পাওয়ার পর বিশ্বাসের ভিতটা যে বড্ড নড়বড়ে হয়ে গেছে। বাইরে থেকে সে যতই কঠিন হওয়ার অভিনয় করুক না কেন, নিজের হৃদস্পন্দনের প্রতিটি ধুকপুকানি সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। সে অস্বীকার করতে পারছে না যে, মিহাল নামক এই মানুষটি খুব সন্তর্পণে তার মনের বন্ধ দুয়ারে করাঘাত করছে এবং একটু একটু করে সেখানে নিজের স্থায়ী আসন গেড়ে নিচ্ছে।
নীলা অনুভব করল, সে মিহালের প্রতি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। আর এই দুর্বলতাটুকুই তার সবচেয়ে বড় ভীতি। সে আর কারো কাছে নিজেকে সঁপে দিতে চায় না, আর হারতে চায় না। অথচ তার নারী সত্ত্বা বারবার চিৎকার করে বলতে চায়—সেও তো রক্ত-মাংসের মানুষ! তারও খুব ইচ্ছে করে কারো প্রশস্ত বুকে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে চোখ বুজতে, কাউকে নিজের সবটুকু উজাড় করে ভালোবাসতে। এমন এক ভালোবাসা, যেখানে কোনো সংশয় থাকবে না, থাকবে না কোনো প্রতারণার ভয়। যেখানে ভালোবাসা গ্রহণ করতে গিয়ে হাত দুটো কাঁপবে না।
মিহাল হয়তো নীলার চোখের মণির সেই অব্যক্ত অস্থিরতা পড়ে ফেলল। সে আলতো করে নীলার কপালে জমে থাকা ঘামটুকু নিজের আঙুল দিয়ে মুছে দিল। তার স্পর্শে কোনো কামনার দাবি ছিল না, ছিল কেবল পরম এক মমতা। মিহাল ধীরস্থীরে বলল__
“নীলা, আমি জানি তোমার মনের ভেতর এক সমুদ্র যুদ্ধ চলছে। তুমি ভয় পাচ্ছো আবারও হারাবার। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে জয় করতে আসিনি, আমি এসেছি তোমার হারানো বিশ্বাসটুকু ফিরিয়ে দিতে। তোমার সবটুকু সময় তোমার, আমি শুধু পাশে থাকতে চাই।”
মিহালের এই গভীর উপলব্ধিবোধ নীলার চোখের কোণে এক বিন্দু জল এনে দিল। সে আর কথা বলতে পারল না। মাথা নিচু করে ফেলল। তখনই মিহাল নীলার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল, যেন তার চোখের গভীর অতলে লুকিয়ে থাকা ভয়ের প্রতিটি কণা সে পড়ে নিতে চায়। সে নীলার চোখে চোখ রেখে খুব শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল__
“নীলা, তুমি যদি ভাবো আমাকে ভালোবাসলে তুমি দুর্বল হয়ে পড়বে, তবে সেটা তোমার মস্ত বড় ভুল ধারণা। ভালোবাসা মানুষকে পঙ্গু করে না, বরং বেঁচে থাকার নতুন রসদ দেয়। আমার ভালোবাসা গ্রহণ করলে তুমি কক্ষনো দূর্বল হবে না, বরং ক্রমাগত আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।”
মিহাল এতোটুকু কথা বলে একটু থামল, তার দৃষ্টিতে তখন এক অদ্ভুত সংকল্পের ছাপ। সে নীলার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বুকের বাঁ পাশে চেপে ধরল, যেখানে তার হৃদপিণ্ডটা দ্রুত লয়ে স্পন্দিত হচ্ছে। সে আবার বলতে শুরু করল__
“তোমার সামনে এক অদৃশ্য দেয়াল হয়ে আমি দাঁড়াব, নীলা। এমন এক বর্ম হয়ে তোমাকে ঘিরে রাখব যেন পৃথিবীর কোনো অবহেলা বা কোনো ধোঁকা তোমাকে আর স্পর্শ করতে না পারে। কেউ তোমাকে দুর্বল করার সাহস পাবে না, কারণ তোমার সবটুকু দুর্বলতা তখন আমার দায়িত্বে থাকবে।”
মিহালের কণ্ঠের সেই গভীর আশ্বাস নীলার কান হয়ে সোজা তার হৃদয়ে গিয়ে আছড়ে পড়ল। মিহাল আরও নিচু স্বরে বলল__
“অতীত তোমাকে ক্ষতবিক্ষত করেছে বলেই কি তুমি বর্তমানকে দুহাতে ঠেলে দেবে? বিশ্বাস করো, আমি সেই মানুষ নই যে মাঝপথে হাত ছেড়ে দেব। আমি তোমার আকাশ হতে চাই না যাকে তুমি দূর থেকে দেখবে, আমি তোমার মাটি হতে চাই যেখানে তুমি নিশ্চিন্তে পা ফেলে চলতে পারবে। তোমার যখন সময় লাগবে, আমি দেব। তোমার যখন নিরবতা লাগবে, আমি চুপ করে পাশে বসে থাকব। কিন্তু দয়া করে ভালোবাসার ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলো না।”
নীলা এতক্ষণ পাথরের মতো নিথর হয়ে মিহালের কথা গুলো শুনছিল। মিহালের প্রতিটি শব্দ যেন তার মনের জমে থাকা বরফগুলোকে একটু একটু করে গলিয়ে দিচ্ছে। তার দীর্ঘদিনের পুষে রাখা ভয়গুলো যেন মিহালের এই তপ্ত নিঃশ্বাসের কাছে হার মানতে শুরু করেছে। সে মিহালের চোখের দিকে তাকালো সেখানে কোনো ছলনা নেই, নেই কোনো অস্থিরতা,আছে শুধু শান্ত এক সমুদ্রের মতো বিশাল নির্ভরতা। নীলার বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল, তবে সেটা কষ্টের নয়, বরং হালকা হওয়ার। সে অনুভব করল, তার কুঁকড়ে যাওয়া মনটা ধীরে ধীরে ডানা মেলছে। জীবনের যে কঠিন পথটা সে একা পাড়ি দেওয়ার শপথ নিয়েছিল, আজ মনে হচ্ছে সেখানে মিহালের হাতটা ধরে হাঁটলে খুব একটা ক্ষতি নেই। সে আর নিজেকে সরিয়ে নিল না, বরং প্রথমবারের মতো মিহালের হাতের ওপর নিজের আঙুলগুলো আলতো করে রাখল। সেই স্পর্শে কোনো কথা ছিল না, কিন্তু ছিল এক নীরব অঙ্গীকার। নীলার মনের কোণে জমে থাকা কালবৈশাখীর মেঘগুলো যেন মিহালের আশ্বাসের রোদে কেটে গিয়ে এক চিলতে শরতের আকাশ উঁকি দিল।
ইকরা একমনে ছাদে পায়চারি করছে। সূর্য তখনো ঠিকঠাক মাথার ওপর ওঠলেও, ভোরের স্নিগ্ধতা এখনো বাতাসে মিশে আছে। অনেক সকালেই তার ঘুম ভেঙে গেছে, কিন্তু এই অচেনা বাড়িতে কোনো ঘর বা মানুষ তার চেনা নেই বলে গুটি গুটি পায়ে সে ছাদের নির্জনতাকেই বেছে নিয়েছে। গতরাতে মিহাল আর নীলার বিয়ের সব ঘটনার পর ইকরা আর নিজের এপার্টমেন্টে ফিরে যায়নি কথা বলতে গেলে তাকে যেতে দেওয়া হয়নি। সে এই বাড়িরই একটি গেস্ট রুমে থেকে গিয়েছে। কিন্তু এখন এই শান্ত সকালে পায়চারি করতে করতে একটা গভীর দুশ্চিন্তা ইকরার কপালে ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। সে ভাবছে সেই বিশাল অ্যাপার্টমেন্টের কথা, যেখানে সে আর নীলা এতদিন একসাথে ছিল।
কিন্তু এখন তো নীলার বিয়ে হয়ে গেছে, এই ধ্রুব সত্যটি এখন তার সামনে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে। তার মানে নীলা এখন থেকে এই বাড়িতেই থাকবে। ইকরা মনে মনে হিসেব মেলালো, নীলার ফুফু যা মানুষ, তিনি আর যাই হোক তার আদরের ভাতিজিকে চোখের আড়াল হতে দেবেন না। একে তো কত বছর পর ভাতিজিকে ফিরে পেয়েছেন, তার ওপর নীলা এখন এই বাড়ির একমাত্র ছেলের বউ। নীলা নিজে যেতে চাইলেও এই বাড়ির থেকে আর যাই হোক তার ফুফুর আবদার তাকে আটকে দেবে শতভাগ।
চিন্তাটা এখানেই ইকরার গলার কাছে দলা পাকিয়ে এল। তার মানে কি এখন থেকে ওই বিশাল অ্যাপার্টমেন্টে তাকে একদম একা থাকতে হবে? এমনিতেই ইকরা জন্মগতভাবে একটু ভীতু প্রকৃতির। সামান্য শব্দে যেখানে তার বুক কেঁপে ওঠে, সেখানে ওই জনমানবহীন নিস্তব্ধ ফ্ল্যাটে একা রাত কাটানোর কথা ভাবতেই তার শিরদাঁড়া দিয়ে এক ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। নির্জন করিডোর, বন্ধ ঘর আর একাকীত্বের কথা ভেবে আতঙ্কে তার গা ছমছম করে উঠল। ইকরা আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা লম্বা শ্বাস নিল।
ইকরা যখন ভাবনার অথৈ সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছিল, ঠিক তখনই তার পেছনে কারো পায়ের শব্দ হলো। কিন্তু ইকরা নিজের দুশ্চিন্তায় এতটাই মগ্ন ছিল যে, চারপাশের জগতের কোনো হুঁশ তার ছিল না। যে মানুষটি নিঃশব্দে এসে তার পাশে দাঁড়াল, সে আর কেউ নয়—মুনভি। এ বাড়িতে তার আসা-যাওয়া দীর্ঘদিনের, তাই তার জন্য বরাদ্দ একটি ঘর সবসময়ই থাকে। কালকের হুলস্থুল শেষে সেও এ বাড়িতেই রাতটা কাটিয়ে দিয়েছে।
ইকরা তখনো আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছিল। মুনভি কিছুক্ষণ পাশ থেকে ইকরার মলিন মুখটা পর্যবেক্ষণ করল। মেয়েটির অস্থিরতা আর চিন্তার ভাঁজ দেখে সে বোধহয় সমস্যার মূল কারণটা আঁচ করতে পেরেছে। তাই নীরবতা ভেঙে মুনভি নিজে থেকেই বলে উঠল__
“তুমি চাইলে আমি তোমার এই দুশ্চিন্তার পাহাড়টা এক নিমেষেই সরিয়ে দিতে পারি।”
হঠাৎ কারো কণ্ঠস্বর কানে আসতেই ইকরা চমকে উঠল, যেন তার ভাবনার সুতোটা সজোরে কেউ ছিঁড়ে দিয়েছে। বুকটা ভয়ে ধক করে উঠলেও পাশে মুনভিকে দেখে পরক্ষণেই সে শান্ত হলো। মুনভির উপস্থিতিতে এক অদ্ভুত স্বস্তি কাজ করে। ইকরা বেশ কৌতূহলী হয়ে মুনভির দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল__
“আপনি কী করে বুঝলেন আমি কিছু নিয়ে চিন্তা করছি? আর সত্যি কি আমার এই সমস্যার সমাধান আপনার কাছে আছে? থাকলে দেরি না করে জলদি বলুন তো!”
মুনভি ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসি ঝুলিয়ে ইকরার চোখে চোখ রাখল। তারপর বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে বলতে শুরু করল__
“তোমার চোখের দিকে তাকালে যে কেউ বলে দিতে পারবে তুমি ওই বড় ফ্ল্যাটে একা থাকার আতঙ্কে ভুগছ। তো, এই সমস্যা থেকে বাঁচার একটা মোক্ষম উপায় আমার মাথায় আছে। তুমি বরং চটপট আমাকে বিয়ে করে ফেলো!”
ইকরা বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলতেই মুনভি আবার বলতে শুরু করল__
“দেখো, এটা স্রেফ বিয়ে নয়, বরং লাভের ওপর লাভ। প্রথমত, ওই বিশাল অ্যাপার্টমেন্টে তোমাকে আর একা ভূতের মতো থাকতে হবে না, বিয়ের পর তুমি আমার বাড়িতে আমার সঙ্গেই থাকবে। দ্বিতীয়ত, তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড নীলা এখন আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের বউ, তার মানে আমার বাড়িতে থাকলে তুমি রোজ তার সাথে দেখা করতে আসতে পারবে। আর তৃতীয়ত, তুমি তো চিতই পিঠার একটা বিজনেস চালু করেছিলে নীলাথ সাথে।সেখানেও আমি তোমাকে ফুল সাপোর্ট এবং দুই বান্ধবী মিলে সেই বিজনেস চালিয়ে যেতে পারবে।। ওহ, আরেকটা কথা বলতে ভুলে গেছি,আমি একজন ডাক্তার আর তোমারও স্বপ্ন ডাক্তার হওয়া। তার মানে সারাদিন আমাকে বিনামূল্যে একজন টিউটর হিসেবেও পাশে পাচ্ছ। ভেবে দেখো, সব দিক থেকেই তো তোমার লাভ!”
মুনভির এমন অদ্ভুত অথচ যুক্তিপূর্ণ বিয়ের প্রস্তাব শুনে ইকরা থমকে গেল। সে বুঝতে পারল না হাসবে না কি আকাশ থেকে পড়বে। কিন্তু মুনভির আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি আর দুষ্টুমিমাখা চাহনি তাকে এক মুহূর্তের জন্য যেন সব ভয় ভুলিয়ে দিল।
নীলা ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমে যেতেই মিহাল যেন এক ঘোরের রাজ্যে হারিয়ে গেল। সে নিজের হাতের তালুর দিকে তাকিয়ে আছে মন্ত্রমুগ্ধের মতো। এই হাত দুটোই তো কিছুক্ষণ আগে নীলার নরম হাতদুটোকে আগলে রেখেছিল। সেই রেশ যেন এখনো কাটছে না। মিহাল আপন মনেই নিজের হাতে বারবার চুমু খাচ্ছে আর লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছে। একা একাই মুচকি হেসে বিড়বিড় করে বলছে_ “আজ তো শুধু হাতে চুমু খেলাম, আর কাল…” কথাটা শেষ না করেই সে দুই হাতে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল। জীবনের প্রথম এমন অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করছে সে। এ যেন এক অন্য মিহাল! সে নিজেই নিজেকে বলছে_
“সবই তো আমার নীলা রানীর লীলা! নীলা রানীর প্রেমে পড়ে মিহাল আজ পুরোপুরি ‘ প্যারে লাল’ হয়ে গেছে।”
ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে একটি ফোনের রিংটোন বেজে উঠে মিহালের দিবাস্বপ্ন ভেঙে দিল। শব্দের উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখল বালিশের পাশে নীলার ফোনটা অনবরত কেঁপে যাচ্ছে। নীলা এখনো ওয়াশরুমে, তাই মিহাল ভাবল হয়তো জরুরি কেউ হবে। সে ফোনটা হাতে নিল, কিন্তু স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই তার চোখ জোড়া বিস্ময়ে চড়কগাছ হয়ে গেল!
ফোনের পর্দায় জ্বলজ্বল করছে ইয়া বড় একখানা নাম— “চিটার, ক্যারেক্টারলেস, আনএডুকেটেড!”
নামটা দেখেই মিহালের বুঝতে এক সেকেন্ডও দেরি হলো না যে, নীলা তার প্রাক্তন ইরফানের নম্বরটি এই বিশেষ ‘উপাধি’ দিয়ে সেভ করে রেখেছে। মুহূর্তের মধ্যে মিহালের সমস্ত লজ্জা আর গাম্ভীর্য উধাও হয়ে গেল। রুম কাঁপিয়ে সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। হাসতে হাসতে তার পেটে খিল ধরার দশা। এই মেয়েটা সত্যিই অদ্বিতীয়!
হাসি সামলাতে সামলাতে এক পর্যায়ে মিহাল ফোনটা রিসিভ করল। তার কৌতুহল হলো_
“এই ‘বিশেষ’ নামধারী ব্যক্তিটি এখন কী বলতে চায়।”
নীলার ফোনের ওপাশ থেকে কোনো পুরুষের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই ইরফান যেন আকাশ থেকে পড়ল। কয়েক মুহূর্তের জন্য তার হৃৎস্পন্দন থেমে গেল। স্তম্ভিত হয়ে সে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল—নম্বর তো নীলারই। তবে কি…? পরক্ষণেই গতরাতের সেই ভয়ংকর দৃশ্যগুলো তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। যে অপমান আর আতঙ্কের মধ্যে দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে, সেই স্মৃতি মনে পড়তেই তার রুহ কেঁপে উঠল। সে নিশ্চিত হয়ে গেল, ফোনটা আর কেউ নয়, স্বয়ং মিহাল ধরেছে।
ইরফান নিজের ভেতরের আতঙ্ক ঢাকতে রাগের নাটক করে চেঁচিয়ে উঠল__
“নীলার ফোন তুই কেন ধরেছিস? সাহস তো কম না!”
মিহাল ওপাশ থেকে বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। বরং তার কণ্ঠে এক ধরনের বিজয়ের হাসি আর চরম প্রশান্তি খেলে গেল। সে খুব শান্ত গলায় জবাব দিল__
“দেখুন মিস্টার ‘ক্যারেক্টারলেস’, নীলা এখন আমার বিবাহিতা স্ত্রী। তার মানে ওর মন, ওর শরীর আর ওর ব্যবহৃত সবকিছুই এখন আমার অধিকারে। তাছাড়া বাসর রাতের পর সকালে নিজের স্ত্রীর ফোন ধরাটা কি খুব অপরাধের কিছু।এসব বিষয়ে আর যাই হোক তোকে ভেঙে বোঝাতে হবে না।?”
মিহাল একটু থেমে ইরফানকে আরও উত্তপ্ত করার জন্য টিপ্পনী কেটে বলল_
“তুই তো আমার ছোট ভাই হয়েও আগেভাগে বিয়েটা সেরে ফেলেছিলি। তারমানে তোর তো ভালোই অভিজ্ঞতা আছে যে বাসর রাতে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে কী কী হয়! তাহলে এত সবের পর আমি কেন ওর ফোন ধরতে পারব না, সেটা নিশ্চয়ই তোকে ভেঙে বোঝাতে হবে না?”
মিহালের কথাগুলো তীরের মতো গিয়ে ইরফানের গায়ে বিঁধল। মিহাল আরও বাড়িয়ে বলল__
“আমার বাচ্চা বউটা সারা রাতের ধকল সইতে না পেরে এখন আমার বুকেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। বেচারিকে গতরাতে আমি একটুও ঘুমাতে দিইনি। তো এখন তাকে এই সাতসকালে বিরক্ত করার কোনো মানে হয়? তাই ওর হয়ে আমিই ফোনটা ধরলাম। বল, কী বলবি?”
মিহালের প্রতিটি শব্দ ইরফানের কানে বিষের মতো ঢুকল। ওপাশ থেকে ইরফানের দাঁত কিড়মিড় করার শব্দ পাওয়া গেলেও সে কোনো যুৎসই উত্তর খুঁজে পেল না। মিহালের এই বিজয়োল্লাস তাকে যেন মাটির সাথে মিশিয়ে দিচ্ছে। ইরফান বাম কানে থাকা ফোন ডান কানে নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল _
“মিহাল খান কে ইরফান মির্জা একবার ধোঁকা দিতে পারলে দ্বিতীয় বার ধোঁকা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।”
মিহাল ইরফানের কথা শুনে কিছুক্ষণ শব্দ করে হাসলো।হাসির শব্দটা অনেকটা মেঘাছন্ন আকাশ নে বজ্রপাতের শব্দের মতোন।মিহাল হাসতে হাসতে বলল __
“তোর মতোন ইঁদুর কে আমি নিজের মানি ব্যাগে চিপায় রেখে ঘুরার ক্ষমতা রাখি।বেশি কথা বললে তোর লেজ কেটে দিব।”
চলবে? কালকে থেকে চেষ্টা করব প্রতিদিন ছোট ছোট পর্ব দেওয়ার। প্রতিদিন দিলে পর্ব বড় হবে না। অনেকদিন পর তার জন্য দুঃখিত। খুব শীঘ্রই একটি সারপ্রাইজ দিব।
Share On:
TAGS: নাজনীন নেছা নাবিলা, নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৬(প্রথমাংশ + শেষাংশ)
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৩০
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১৯
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ২৩
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৯ প্রথম অংশ
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ২৭
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা সারপ্রাইজ পর্ব
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৩৪
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা বোনাস পর্ব ২
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৩৭