Golpo romantic golpo নতুন প্রেমের গান

নতুন প্রেমের গান পর্ব ৩২


#নতুন_প্রেমের_গান

#পর্ব_৩২

সিয়াদাতের শক্ত হাতের বাঁধন সুপ্রভার কাঁধে বিষম এক অনুভূতির সৃষ্টি করল। সেই স্পর্শে যেমন ছিল তীব্র অধিকারবোধ, তেমনই ছিল এক অদ্ভুত নির্ভরতা। সিয়াদাত সুপ্রভার মুখের খুব কাছে ঝুঁকে এলো। ইস্পাতকঠিন গলায় বলল,

“আমি আবারও বলছি ,তোমার অতীত নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। তবে একটা কথা জেনে রাখো,সিয়াদাত শাহরিয়ার যখন কারও হাত ধরে, তখন দুনিয়ার কারো সাধ্য নেই সেই হাতটা আলগা করার। তুমি আমার বর্তমান, তুমিই আমার ভবিষ্যৎ। নিজের মনে এই সত্যিটা যত দ্রুত পারো গেঁথে নাও।”

সিয়াদাতের কথায় বাক্যহারা হলো সুপ্রভা।তার বুকের ভেতর এতক্ষণ ধরে জমে থাকা সব সংশয়, ভয় আর সংকোচ যেন এক নিমেষেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল।এই মানুষটাকে যত দেখছে ততোই অবাক হচ্ছে সুপ্রভা।যে মানুষটাকে সে এতদিন কেবলই গম্ভীর, রুক্ষ আর ধরাছোঁয়ার বাইরের কেউ বলে ভেবে এসেছে, সেই মানুষটাই আজ তার সমস্ত অপবাদের সামনে এক বিশাল প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুপ্রভার মনে হলো, সিয়াদাতকে নিয়ে তার তৈরি করা এতদিনকার সমস্ত ভ্রান্ত ধারণা, সমস্ত ভুল বোঝাবুঝি স্রেফ তাসের ঘরের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।

তার চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সিয়াদাত তখনও তার কাঁধ ধরে রেখেছিল,যার দরুন সুপ্রভার চোখের সেই নোনা জল সরাসরি গিয়ে পড়ল সিয়াদাতের হাতের ওপর।

পানির উষ্ণ স্পর্শ পেতেই সিয়াদাতের ভেতরের রুক্ষতা এক পলকে মিলিয়ে গেল। সে আলতো করে সুপ্রভার কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে নিল। নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে সুপ্রভার গাল বেয়ে পড়া জলের দাগটুকু মুছে দিল। সিয়াদাতের হাতের স্পর্শে সুপ্রভার পুরো শরীর কেঁপে উঠল। সে ভাঙ্গা গলায় বলল,

“কিন্তু আপনার মা তো ভুল বলেননি। সমাজ তো আমার দিকেই আঙুলটাই তুলবে। আজ আপনার বাবা পাশে দাঁড়িয়েছেন বলে আমি এ বাড়িতে ঢুকতে পেরেছি, কিন্তু আপনার মায়ের মন থেকে তো আমি এই ঘৃণা মুছতে পারব না।”

সিয়াদাত সুপ্রভার মুখটা দুহাতে আঁজলা করে ধরলো।তাকে অভয় দিয়ে বলল,

“তুমি মমকে যতটুকু দেখেছ, ততটুকুই চিনেছ সুপ্রভা। কিন্তু আমি তাকে জন্ম থেকে দেখে আসছি। মম নিজেকে যতটা কঠিন আর পাথরের মতো দেখায়, ভেতরে ভেতরে সে আসলে ততটাও কঠিন হৃদয়ের মানুষ নয়। তার একটাই স্বভাব । সে যখন কাউকে ভালোবাসে, তখন নিজের সবটুকু উজাড় করে ভালোবাসে। আবার কোনো কারণে কারও ওপর রেগে গেলে বা কাউকে ঘৃণা করলে, সেটাও তীব্রভাবে প্রকাশ করে ফেলে।”

সিয়াদাত থামল। সুপ্রভার কপালে আঁচড়ে পড়া চুলগুলো সরিয়ে সুপ্রভাকে আশ্বস্ত করলো,

“তোমার অতীত আর এই হঠাৎ বিয়েটা মম এখনো মন থেকে মেনে নিতে পারেনি।তাই সে এখন প্রচণ্ড রেগে আছে। কিন্তু আমি জানি, এই রাগটা সাময়িক। তুমি যখন নিজের ভালোবাসা আর দায়িত্ব দিয়ে এই শেখ পরিবারের হাল ধরবে, তখন মমের এই ভুল ধারণাগুলো বরফের মতো গলে যাবে। আমার বিশ্বাস, আর কিছুদিন বাদে মম নিজেই তোমাকে টেনে নেবে বুকের ভেতর। তখন দেখবে, নিজের জন্ম দেওয়া মেয়ে সারার থেকেও সে তোমাকে বেশি ভালোবাসছে। তাই মমের মন নিয়ে এই মুহূর্তে তোমাকে কিচ্ছু ভাবতে হবে না। তুমি শুধু নিজের ওপর আর আমার ওপর ভরসা রাখো।”

সিয়াদাতের এই গভীর আত্মবিশ্বাসী কথাগুলো সুপ্রভার অশান্ত মনে যেন এক পশলা বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ল। তার ভেতরের সমস্ত দ্বিধা এক নিমেষে কেটে গেল। তার ইচ্ছে করলো একটাবার সিয়াদাতের বুকে মাথা রাখতে। কিন্তু ভয়ে, লজ্জায় সে নিজের ইচ্ছেকে দমিয়ে রাখলো। কিন্তু এতেও সুপ্রভা স্বস্তি পেলো না।

অস্থিরতায় ছটফট করতে লাগলো।এক পর্যায়ে সুপ্রভা নিজের ভয় ,লজ্জা ইগো বালিশ চাপা দিয়ে সিয়াদতের দিকে এগিয়ে গেল।সিয়াদাত কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে সিয়াদাতের চওড়া বুকের মাঝে নিজের মুখটা লুকিয়ে তীব্র এক প্রশান্তিতে চোখ দুটো বুজে ফেলল। তার মনে হলো এতদিনের ঝড় ঝাপটার পর অবশেষে সে তার আসল নীড়ের খোঁজ পেয়েছে।

সিয়াদাতের চওড়া বুকে মুখ লুকিয়ে সুপ্রভা যখন জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রশান্তিটুকু খুঁজে পাচ্ছিল, ঠিক তখনই দরজায় হালকা খটখট শব্দ হলো।

মুহূর্তের মধ্যে দুজনের ঘোর কেটে গেল। লোকলজ্জা আর চরম সংকোচে সুপ্রভা ছিটকে সিয়াদাতের বুক থেকে সরে দাঁড়াল। সিয়াদাতও কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল।

দরজা ঠেলে সারা ভেতরে ঢুকল। তার এক হাতে সুপ্রভার ট্রলি ব্যাগ।অন্য হাতে একটা বড় শপিং ব্যাগ। ঘরে ঢুকেই ভাইয়া আর ভাবীর মাঝের এই থমথমে নীরবতা দেখে সারার ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমির হাসি ফুটে উঠল। সে মজা করে বলল,

“আমি কি ভুল সময়ে চলে এলাম ভাইয়া?”

সারার কথায় সুপ্রভার ফর্সা গাল দুটো লজ্জায় একদম লাল হয়ে গেল। সে মাথা নিচু করে নিজের শাড়ির আঁচল খুঁটতে লাগল। সিয়াদাত অবশ্য একদমই দমবার পাত্র নয়। সে সারার দিকে একটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। গম্ভীর গলায় বলল, “তুই সবসময় বেশি কথা বলিস সারা। লাগেজটা ওখানে রাখ।”

সারা হেসে ফেলে ট্রলি ব্যাগটা একপাশে রাখল। তারপর শপিং ব্যাগটা সুপ্রভার দিকে এগিয়ে দিয়ে মিষ্টি গলায় বলল, “ভাবী, এই শাড়ি আর দরকারি কিছু জিনিসপত্র বাবা তোমার জন্য পাঠিয়েছেন। তুমি ঝটপট ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি নিচে যাচ্ছি, মমের রাগ ভাঙানোর মিশন শুরু করতে হবে তো!”

কথাটা বলেই সারা সিয়াদাতকে উদ্দেশ্য করে একটা চোখ টিপে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

সারা চলে যেতেই ঘরে আবার সেই চেনা নীরবতা ফিরে এলো। সিয়াদাত ধীর পায়ে সুপ্রভার কাছে এগিয়ে এলো। মৌনতা ভেঙে বলল,

“আর দেরি করো না সুপ্রভা। চটজলদি ফ্রেশ হয়ে নাও। এত বড় একটা ঝড়ের পর আমাদের দুজনেরই একটু শান্তির প্রয়োজন। ফ্রেশ হয়ে এসে আমরা দুজনে একসাথে সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া জানাব। তিনি আমাদের সমস্ত বাধা পেরিয়ে আজ এক করেছেন। তাঁর কাছেই প্রার্থনা করব, যেন আমাদের এই নতুন পথচলাটা সুন্দর হয়।”

সুপ্রভা সম্মতি সূচক মাথা নেড়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ালো।

মিনিট পনেরো পর ওয়াশরুমের দরজা খোলার মৃদু আওয়াজ হলো। সিয়াদাত তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। আওয়াজটা পেতেই সে ধীর পায়ে পেছনে ঘুরে তাকাল।

দরজার চৌকাঠে সুপ্রভা দাঁড়িয়ে আছে। সাদমান শেখের পাঠানো নতুন জমকালো শাড়িটা সে পরিধান করেনি। বরং তার পরনে রয়েছে আগের মতোই অত্যন্ত সাদামাটা, হালকা রঙের একটি সুতির থ্রিপিস। কোনো রকম জাঁকজমক বা কৃত্রিমতার ছোঁয়া নেই তার মাঝে। ওড়নাটা মাথায় সুন্দর করে টানা, যা তার স্নিগ্ধতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

সদ্য ধুয়ে আসা ফর্সা মুখটায় স্বচ্ছ পানির কণাগুলো মুক্তোর মতো চিকচিক করছে। দুই একটা অবাধ্য ভেজা চুল কপালে আর গালে লেপ্টে আছে। সুপ্রভার এই রূপ সিয়াদাতের চোখে বিষম এক ভালো লাগার সৃষ্টি করল। পৃথিবীর সমস্ত দামি প্রসাধন , রাজকীয় পোশাকের চেয়েও সিয়াদাতের কাছে এই মুহূর্তে সুপ্রভাকে অনেক বেশি পবিত্র আর মোহময়ী মনে হলো। মনে হলো যেন এক পশলা বৃষ্টির পর ধুয়ে যাওয়া কোনো স্নিগ্ধ শিউলি ফুল তার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

সিয়াদাত পলকহীন চোখে তাকিয়ে রইল। তার মুগ্ধ দৃষ্টি সুপ্রভাকে কিছুটা আড়ষ্ট করে তুলল। সে ভেজা হাত দুটো ওড়নার এক কোণ দিয়ে আলতো করে মুছতে মুছতে চোখ নিচু করে ফেলল।

বেশ কিছু সময় পর মুগ্ধতা কাটিয়ে সিয়াদাত নিজেই নিজেকে সামলে নিল। সে আলতো হেসে আলমারির দিকে এগিয়ে গেল। সেখান থেকে নিজের জন্য একটি সুতি পাঞ্জাবি আর দুটো জায়নামাজ বের করল।

সুপ্রভার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “তুমি একটু বোসো।আমি জাস্ট পাঁচ মিনিটে ফ্রেশ হয়ে আসছি। তারপর আমরা একসাথে নামাজে দাঁড়াব।”

সুপ্রভা মৃদু মাথা নাড়ল।ঠিক পাঁচ মিনিটের মাথায় সিয়াদাত ফ্রেশ হয়ে শুভ্র এক পাঞ্জাবি পরে বের হলো। তার ভেতরের রুক্ষ পুরুষালি রূপটা যেন এই পোশাকে এক পরম শান্ত ও স্নিগ্ধ রূপে রূপান্তর হয়েছে।

সিয়াদাত আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ঘরের এক কোণে কিবলামুখী করে দুটো জায়নামাজ বিছিয়ে দিল। একটি সামান্য সামনে, অন্যটি ঠিক তার একটু পেছনে।

সে সুপ্রভার দিকে তাকিয়ে কোমল সুরে বলল, “এসো।”

সুপ্রভা ধীর পায়ে এগিয়ে এসে সিয়াদাতের পেছনের জায়নামাজটিতে দাঁড়াল। মাথার ওড়নাটা আরও ভালো করে টেনে সে নিজের মনকে সম্পূর্ণ পবিত্র করে নিল। সিয়াদাত সামনে দাঁড়িয়ে নিয়ত বাঁধল, তার পরপরই সুপ্রভাও।

মোনাজাত শেষ করে বসা অবস্থাতেই সিয়াদাত সুপ্রভার দিকে ঘুরে তাকালো। অবলীলায় সুপ্রভার ডান হাতটা টেনে নিয়ে হাতের উল্টো পিঠে ঠোঁট ছুঁয়ালো।সুপ্রভা কেঁপে উঠে চোখ বন্ধ করে নিলো। সিয়াদাত স্মিত হেসে পুনরায় সুপ্রভার কপালে চুমু খেল।সুপ্রভা পুনরায় চমকে উঠলো।তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল বিষ্ময়ে।সিয়াদাত দুষ্টু হাসলো।মজা করে বলল, “ কপালে চুমু দিলাম রাগ করলা??”

চলবে?

® Nuzaifa Noon

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply