Golpo romantic golpo নতুন প্রেমের গান

নতুন প্রেমের গান পর্ব ২৬


নতুনপ্রেমেরগান

পর্ব_২৬

“ফাইনালি তুমি প্রফেসর শেখ সিয়াদাত শাহারিয়ার হয়েই গেলে লাল চমচম!”

সিয়াদাতের কথাগুলো শেলের মতো সুপ্রভাত বুকে বিঁধল।এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো তার পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে। সিয়াদাতের চোখেমুখে সেই চিরচেনা দুষ্টুমি আর বিজয়ের হাসি এঁটে রয়েছে।কিন্তু সুপ্রভার ভেতরটা অপমানে আর রাগে ফুঁসছে।সে এক পা পিছিয়ে এসে সিয়াদাতের চোখের দিকে তাকিয়ে ধরা গলায় বলল, “আপনি এত বড় একটা জালিয়াতি করলেন আমার সাথে? সই করানোর সময় একবারও মনে হলো না যে আমার মতামত নেওয়া উচিত ছিল?”

সিয়াদাতের ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা হাসিটা এবার একটু ম্লান হলো। সে পকেটে হাত গুঁজে শান্ত স্বরে বলল, “জীবন কখনো কখনো আমাদের পছন্দের চেয়ে প্রয়োজনের দিকে বেশি ঠেলে দেয়, লাল চমচম। আর তোমাকে হারানোটা আমার তালিকার কোনো অপশনেই ছিল না। বিয়েটা যেভাবেই হোক, এখন তুমি আমার বিবাহিত স্ত্রী।আমার লাল চমচমে ব‌উ।এটাই নিরেট সত্য।”

সুপ্রভা এবার আগুনলাগা মরিচবাতির মতো জ্বলে উঠল। দুই পা পিছিয়ে গিয়ে চিৎকার করে বলল , “আপনি একটা ঠকবাজ! আস্ত একটা প্রতারক ।আপনি জালিয়াতি করে আমার সই নিয়েছেন। আমি এই বিয়ে মানি না, কোনোদিনও মানব না!”

সুপ্রভার কথায় গা করলো না সিয়াদাত। বরং শান্ত ভঙ্গিতে পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়াল। সুপ্রভা পরাস্ত সৈনিকের ন্যায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে র‌ইল। অকষ্মাৎ তার হাতের পেপারের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ হতেই কুটিল হাসলো সুপ্রভা। অতি সত্বর বাম হাতের উল্টো পিঠে চোখের জল মুছে নিলো।

সিয়াদাতের চোখে চোখ রেখে ম্যারেজ রেজিস্ট্রি পেপারটা হিংস্রভাবে ছিঁড়তে শুরু করল। কুচিকুচি করে কাগজগুলো মেঝের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “এই যে, শেষ! আপনার সাজানো নাটক আমি শেষ করে দিলাম মিস্টার প্রফেসর।”

সিয়াদাত এবার শব্দ করে হেসে উঠল।সুপ্রভার দিকে ঝুঁকে এসে ধীরস্থির গলায় বলল, “তুমি যে এই কাজটা করবে, সেটা আমি আগেই জানতাম লাল চমচম। তাই ব্যাকআপ রেডি করেই রেখেছি। তুমি যে পেপার টা ছিঁড়লে ওটা ছিল ফটোকপি। অরিজিনাল ম্যারেজ রেজিস্ট্রি পেপার আমার উকিলের মাধ্যমে অনেক আগেই সেফ কাস্টডিতে চলে গেছে। আইনত তুমি এখন মিসেস সিয়াদাত শাহারিয়ার।এটা কাগজ ছিঁড়ে বদলাতে পারবে না।”

সিয়াদাত সুপ্রভার আরো ঘনিষ্ঠ হলো।তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, তুমি বরং মিষ্টি খাওয়ার প্রস্তুতি নাও। কারণ তোমার প্রফেসর বর কিন্তু খুব একটা ধৈর্যশীল মানুষ নয়!”

সুপ্রভা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ছে। অসংখ্য মানুষ দেখছে সেই দৃশ্য।কারো কাছে সুশ্রী লাগছে আবারও কারো কাছে কুশ্রী লাগছে।

ব্যাপার টা নোটিশ করলেন ঈশিতা চৌধুরী। পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে এলেন তিনি। তিনি বেশ অভিজ্ঞ এবং দূরদর্শী নারী। পারিবারিক এই নাটকীয়তা যাতে বাইরের মানুষের কাছে তামাশার খোরাক না হয়, সেজন্য তিনি অত্যন্ত চতুরতার আশ্রয় নিলেন।

তিনি মুখে স্নিগ্ধ হাসি ফুটিয়ে নিমন্ত্রিত অতিথিদের দিকে এগিয়ে গেলেন। বিনয়ের সাথে উচ্চস্বরে বললেন, “আজকের মতো অনুষ্ঠান এখানেই শেষ করতে হচ্ছে। আসলে নতুন বউয়ের শরীরটা হঠাৎ বেশ খারাপ হয়ে পড়েছে, ওর একটু বিশ্রামের প্রয়োজন। আপনারা দয়া করে কিছু মনে করবেন না। বাকি আনুষ্ঠানিকতা আমরা পরে ঘরোয়াভাবে সেরে নেব। আপনাদের আসার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।”

ঈশিতা চৌধুরীর দৃঢ় কণ্ঠস্বরের সামনে কেউ আর বাড়তি প্রশ্ন করার সাহস পেল না। তিনি অত্যন্ত কৌশলে এবং দ্রুততার সাথে অতিথিদের বিদায় করে দিয়ে সদর দরজা আটকে দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে গমগমে বাড়িটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

তিনি ধীর পায়ে সুপ্রভার সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার শান্ত চাউনি সুপ্রভার ওপর স্থির হলো। চারদিকের নিস্তব্ধতায় সুপ্রভার কান্নার শব্দটা এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সুপ্রভা ঈশিতা চৌধুরীর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো। ঈশিতা চৌধুরী সুপ্রভার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “দেখ মা! সিয়াদাত যা করেছে তা হয়তো সঠিক পদ্ধতি ছিল না।কিন্তু ওর উদ্দেশ্য খারাপ ছিল না। আমরা সব জানি। আমাদের সম্মতিতেই ও এই পদক্ষেপ নিয়েছে। সিয়াদাতের মতো ছেলে তোর দায়িত্ব নিলে আমরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারব। জেদ করিস না মা, মেনে নে।তোর মা, শ্বশুর, ভাই , আমি ,আমরা সবাই বিয়েটা মেনে নিয়েছি। তুই‌ও মেনে নে সুভা। সিয়াদাতের চোখে তোর জন্য আমি যে ভালোবাসা দেখেছি, সেটা নোমানের চোখে কখনো দেখিনি।সিয়াদাত তোকে অনেক ভালো রাখবে সুভা। তুই আর জেদ করিস না মা।”

সুপ্রভা কিছু বলল না।আলেয়া বেগম সুপ্রভার দিকে এগিয়ে এলেন।সুপ্রভাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ কান্না করলেন।সুপ্রভা থমকে গেল। বিচলিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “ তোমার কী হয়েছে মা? তুমি কান্না করছো কেন?”

আলেয়া বেগম শাড়ির আঁচলে চোখের জল মুছে নিলেন। আনন্দে খাবি খাওয়ার মত করে বললেন,
“ এ কান্না দুঃখের কান্না নয় রে মা।এ কান্না যে সুখের কান্না।”

আলেয়া বেগমের কথা শুনে সুপ্রভার কান্নার বেগ যেন স্তিমিত হয়ে এল। সে বিস্ময়ভরা চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। আলেয়া বেগম সুপ্রভার মুখটা দুই হাতের আঁজলায় তুলে নিলেন। তার চোখে তখনো আনন্দ আর তৃপ্তির ঝিলিক।

তিনি সুপ্রভার কপালে পরম মমতায় একটা চুমু খেয়ে বললেন, “তোর ভাইয়া আর আমি প্রতিটা রাত এই চিন্তায় কাটিয়েছি যে, তোর ওপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গেছে, তারপর কে তোকে আগলে রাখবে? কে তোর এই ভাঙা মনটাকে জোড়া লাগাবে?সেদিন যখন সিয়াদাত নিজে এসে আমাদের কাছে তোর হাতটা চাইল, তখন মনে হলো ওপরওয়ালা আমাদের প্রার্থনা কবুল করেছেন। ওর মতো দায়িত্ববান ছেলে এই যুগে মেলা ভার রে মা!”

সুপ্রভা মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে সব শুনলো। আলেয়া বেগম আবার বললেন, “ও তোকে কতটা ভালোবাসে সেটা আমরা আজ নিজের চোখে দেখলাম। তুই হয়তো এখন ওর ওপর রেগে আছিস।কিন্তু বিশ্বাস কর সুপ্রভা, একজন মেয়ের কাছে তার সম্মানের চেয়ে বড় আর কিছু নেই। সিয়াদাত আজ সবার সামনে তোকে যে সম্মানটা দিল, সেটা তোর প্রাপ্য ছিল। এখন তুই যদি জেদ ধরে থাকিস, তবে সেটা শুধু তোর একার নয়, আমাদের সবার পরাজয় হবে।”

সৌরভ রহমত মিয়ার কাঁধে ভর দিয়ে সুপ্রভার দিকে এগিয়ে এলো। নরম স্বরে বলল, “বোন, অনেক তো হলো। এবার না হয় একটু শান্ত হ। আমাদের পরিবারের সুখের জন্য না হলেও, অন্তত নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবে এই নতুন শুরুটা মেনে নে। সিয়াদাত ভাই তোকে কোনোদিন কষ্ট পেতে দেবে না। তুই ভালো থাকবি বোন।সুখে শান্তিতে থাকবি।তোর সুখ শান্তি যে আমাদেরকেও শান্তি দিবে।”

সুপ্রভা এক পলক সিয়াদাতের দিকে তাকাল। সিয়াদাত ঘরের এক কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে সেই আগের মতো দুষ্টুমি নেই। বরং সেখানে খেলা করছে এক গভীর উৎকণ্ঠা আর অপেক্ষা। সে যেন সুপ্রভার একটা শব্দের জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে।

পুরো ঘরে এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল। সবাই সুপ্রভার উত্তরের অপেক্ষায়। সুপ্রভা মাথা নিচু করে নিজের শাড়ির আঁচলটা আঙুলে জড়াতে লাগল। কিছুক্ষণ পর সে ক্ষীণ স্বরে বলল, “তোমরা যখন সবাই চাইছ,তাহলে আমার আর বলার কী আছে? তবে মনে রাখবে, আমি কিন্তু এখনো ওনাকে ক্ষমা করিনি।আর কখনো করবোও না।”

সুপ্রভার এই টুকু বলাতেই ঘরে খুশির জোয়ার বয়ে গেল। ঈশিতা চৌধুরী সুপ্রভাকে আবারও জড়িয়ে ধরলেন। সিয়াদাতের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল সেই বিজয়ের রহস্যময় হাসি। সে মনে মনে বলল, “ক্ষমা করানোর দায়িত্বটা তো আমারই লাল চমচম। একটু সময় দাও।তুমি নিজেই একদিন বলবে কংগ্রাচুলেশন মিস্টার ভন্ড প্রফেসর । আমি আপনার প্রেমে পড়ে গেছি!”

চলবে?

® Nuzaifa Noon

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply