Golpo romantic golpo Uncategorized তুমি এলে অবেলায়

তুমি এলে অবেলায় পর্ব ১৯


#তুমি_এলে_অবেলায়🍁

#পর্ব_১৯

#আতিয়া_আদিবা

সময় তার নিজস্ব নিয়মে বয়ে চলে। কারো জন্য থেমে থাকে না। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে পুরো দু’মাস কেটে গেছে লাউটারব্রুনেনের সেই ঝোড়ো রাতের পর। ঢাকার বুকে ফাল্গুনের রঙ লেগেছে। চারিদিকের ফুলের মিষ্টি সুবাস।

এই দুটো মাসে স্কাইলাইন ভিলার অন্দরের সমীকরণগুলো কেমন বেশ শান্ত অবয়ব ধারণ করেছে। শেহজাদ আর সামাইরার তীব্র ঘৃণা আর ইগোর লড়াইগুলোও এক অদৃশ্য যুদ্ধবিরতির চাদরে ঢাকা পড়ে গেছে।

শেহজাদ সত্যিই তার কথা রেখেছে। সে সামাইরার ওপর কোনোদিন জোর খাটায়নি। স্বামীর কোনো অধিকার নিয়ে তার শোবার ঘরের চৌকাঠ মাড়ায়নি। দুজন একই ঘরে থেকেও দুটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো দিন কাটিয়েছে।

গভীর রাতে যখন শেহজাদের চিলতে কাশির শব্দ হয়, সামাইরার ঘুম ভেঙে গিয়েছে। সে অন্ধকারেই তাকিয়ে দেখেছে পাশে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে শেহজাদ। অতি সন্তপর্ণে হাতে ধরে রাখা সিগারেট জ্বলতে জ্বলতে নিভে গিয়েছে। হাতের সেই সিগারেটের পোড়া তাজা ক্ষতগুলো এক মাসে হালকা রুপোলি দাগে পরিণত হয়েছে। সামাইরাও তার জীবনটা উপভোগ করতে শুরু করেছে বেশ।

সকাল এগারোটা বাজে। রোদটা বেশ কড়া হয়ে উঠেছে। সামাইরা বেডরুমের নরম বিছানায় উপুড় হয়ে বসে নিজের ফোনে পিন্টারেস্ট স্ক্রোল করছিল। ঘর গোছানোর প্রতি তার বরাবরই একটা অন্যরকম ঝোঁক আছে। স্ক্রোল করতে করতে হুট করেই একটা বেডরুম ডেকোরেশনের আইডিয়া তার চোখের সামনে আটকে গেল। অফ-হোয়াইট আর প্যাস্টেল শেডের থিম, জানালার পাশে ঝুলন্ত ম্যাক্রেমের ইনডোর প্ল্যান্টস, ঘরের এক কোণে একটা ছোট রিডিং নুকার আর সিলিং থেকে ঝুলে থাকা ভিন্টেজ ওয়ার্ম লাইটস। সব মিলিয়ে ঘরটায় কেমন শান্তি শান্তি আবহ।

সামাইরা নিজের চারপাশের রাজকীয় ইন্টেরিওরের দিকে বিষণ্ণ মনে তাকাল। তার হঠাৎ তীব্র ইচ্ছা হলো পুরো ঘরটাকে পিন্টারেস্টের ওই আইডিয়াটার মতো করে সাজিয়ে তুলতে। কিন্তু সে তো এই বাড়ির স্থায়ী কেউ নয়! তা ছাড়া শেহজাদ যদি অমত করে?

তবুও গত দুই মাসের শান্ত স্বভাবের শেহজাদকে মনে করে সামাইরা কিছুটা সাহস বুক বেঁধে নিলো। সে ফোনটা হাতে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ দ্বিধাদ্বন্দ্বের পর শেহজাদের নাম্বারে ডায়াল করল।

ওদিকে গুলশানের ‘রহমান টাওয়ার’ এর একশো তলার সুবিশাল কর্পোরেট কনফারেন্স রুমে তখন এক টানটান উত্তেজনা চলছে। কাঁচের ঘেরা এসি রুমে বসে আছেন দেশের প্রথম সারির কয়েকজন ব্যবসায়ী এবং সিঙ্গাপুর থেকে আসা একদল হাই-প্রোফাইল ফরেন ডেলিগেট। টেবিলের মাঝখানে রাখা প্রজেক্টরে মাল্টি-মিলিয়ন ডলারের একটা প্রজেক্টের স্লাইড চলছে। প্রায় ১০০ কোটি টাকার একটা মেগা ডিল সাইন হতে চলেছে আজ।

টেবিলের প্রধান আসনে বসে আছে শেহজাদ রহমান চৌধুরী। সে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সিঙ্গাপুরের ইনভেস্টরদের প্রতিটি শর্ত জাজ করছিল। এই কর্পোরেট গাম্ভীর্যের মাঝেই টেবিলের ওপর রাখা শেহজাদের ব্যক্তিগত আইফোনটি মৃদু ভাইব্রেট করে উঠল।

স্ক্রিনে ‘MC Woman’ নামটা ভেসে উঠতেই শেহজাদের মন চঞ্চল হয়ে উঠল। MC woman এর ফুল ফর্ম মিডেল ক্লাস উইমেন। এটি শেহজাদের বানানো শর্ট ফর্ম।সামাইরা তাকে এই সময়ে কেন ফোন করেছে?

শেহজাদ হাতের ইশারায় সিঙ্গাপুরের ডেলিগেটদের এক মিনিট থামতে বলল। দেশের এত বড় প্রজেক্টের ডিল মাঝপথে থামিয়ে সে ফোনটা কানে তুলল।

-হ্যালো, সামাইরা বলো। এনিথিং আরজেন্ট?

ওপাশ থেকে সামাইরার কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,

-উম… না, মানে… ফ্রি আছেন আপনি?

শেহজাদ সামনে বসা ১০০ কোটি টাকার ডিল নিয়ে অপেক্ষা করা ইনভেস্টরদের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মিটমিটে হাসি ফুটিয়ে বলল,

-হ্যাঁ, বলো।

সামাইরা ওপাশ থেকে একটু ইতস্তত করে বলল,

-আসলে, আমি পিন্টারেস্ট ঘেঁটে খুব সুন্দর একটা রুম ডেকোরেশনের আইডিয়া পেয়েছি। আমাদের বেডরুমের এই ডার্ক থিমটা আমার কাছে বড্ড বেশি গুমোট লাগে। আমি কি ঘরের পর্দা, লাইটস আর ডেকোরেশনটা ওই আইডিয়াটার মতো একটু চেঞ্জ করতে পারি?

শেহজাদ নিজের চেয়ারে কিছুটা হেলান দিয়ে বসল। তার স্বভাবসুলভ সে একটা খোঁচা মারার সুযোগ হাতছাড়া করল না। নিচু স্বরে বলল,

-ওহ্! তো আমাদের ভিলার রাজকীয় ইন্টেরিওর তোমার পছন্দ না? শেষ পর্যন্ত তোমার ওই সস্তা মিডল-ক্লাস পিন্টারেস্টের ডেকোরেশন দিয়ে নষ্ট করতে চাচ্ছো?

সামাইরা ওপাশ থেকে মুখটা কুঁচকে ফেলল। তার গলার স্বর আবার আগের মতো তেজি হয়ে উঠল,

-তাহলে থাক! যেমন আছে তেমনই রাখছি। আপনার ভিলা, আপনার সব। আমি কে এই বাড়ির!

সামাইরার এই অভিমানী রাগটা শেহজাদের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দিল। সে এবার নরম গলায় বলল,

-আচ্ছা বাবা, এত রাগ করতে হবে না। শোনো, ওই ডেকোরেশনের জন্য যা যা লাগবে চুপচাপ সেটা আমার অ্যাসিস্ট্যান্টের নাম্বারে ফরওয়ার্ড করে দাও। বিকেলের মধ্যে সব ম্যাটেরিয়ালস স্কাইলাইন ভিলাতে পৌঁছে যাবে। তুমি যা খুশি করো। ওকে?

সামাইরা খুশি হয়ে ফোন রেখে দিল।

ফোনটা রাখার পর শেহজাদ আবার তার সেই পাথুরে রূপে ডেলিগেটদের দিকে তাকাল। যদিও তার মনের ভেতর তখন সামাইরার সেই নরম কণ্ঠস্বরটা গুনগুন করছিল!

শেহজাদের কথা মতোই চার-পাঁচটা বড় বড় পার্সেল এসে পৌঁছাল স্কাইলাইন ভিলাতে বিকালের আগেই। সামাইরা অত্যন্ত উৎসাহ নিয়ে পার্সেলগুলো খুলতে লাগল। অফ-হোয়াইট কালারের দামী সিল্কের পর্দা, কিছু ইনডোর মানিপ্ল্যান্টের টব, ফেয়ারি লাইটস আর চমৎকার কিছু ভিন্টেজ শো-পিস।

সামাইরা এবার নিজের হাতে ঘর সাজাতে লেগে গেল। সুফিয়া রহমান নিচে লিভিং রুমে বসে ছিলেন। সামাইরা একা একাই ঘরের ডার্ক গ্রে পর্দাগুলো খুলে হুক থেকে নামাতে লাগল। একটা একটা করে ভারী পর্দা নামাতে গিয়ে তার শরীরটা কেমন যেন একটু ক্লান্ত লাগছিল। কপালের কোণে বিন্দু বিন্দু ঘামও জমে উঠছে।

জানালার একদম ওপরের দিকের শেষ হুকটা খোলার জন্য সামাইরা একটা ছোট টুলের ওপর দাঁড়াল। নিজের দুই হাত ওপরে তুলে নতুন পর্দাটা ঝোলাতে গেল।

কিন্তু হুট করেই সামাইরার চোখের সামনে পুরো ঘরটা কেমন যেন বনবন করে উঠল। চক্কর দিয়ে উঠল মাথা। চারপাশের আলো-ছায়াগুলো কেমন ধোঁয়াটে হয়ে গেল। তার পাকস্থলীর ভেতর থেকে কুন্ডলী পাকিয়ে তীব্র বমি বমি ভাব উথলে উঠল। সামাইরা নিজেকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল. কিন্তু তার হাত-পা অবশ হয়ে এলো।

টুল থেকে তার পা টা পিছলে গেল। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই চতুর্দিক থেকে তীব্র অন্ধকারের তাকে গ্রাস করে নিল। সামাইরা মেঝের ওপর সশব্দে লুটিয়ে পড়ল। পর্দাটা তার শরীরের ওপর এসে ঢেকে গেল।

ওপরের তলা থেকে ভারী কিছু পড়ার শব্দ আর সামাইরার অস্ফুট আর্তনাদ নিচে থাকা সুফিয়া রহমানের কান এড়ালো না। তিনি অত্যন্ত ঘাবড়ে গিয়ে কাঁপাকাঁপা পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলেন। বেডরুমের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তার হৃদপিণ্ড স্তব্ধ হয়ে গেল।

নিথর অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছে সামাইরা!

-সামাইরা! মা রে আমার কী হলো!

সুফিয়া রহমান চিৎকার করে উঠলেন। তিনি দ্রুত সামাইরার পাশে বসে তার মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিলেন। সামাইরার হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা। সুফিয়া রহমান পাগলের মতো কাঁদতে কাঁদতে নিজের ফোন বের করে শেহজাদের নাম্বারে ডায়াল করলেন।

কনফারেন্স রুমে তখন চলছে ক্লাইম্যাক্স মুহূর্ত। ১০০ কোটি টাকার সেই মেগা প্রজেক্টের ডিল ফাইলটি শেহজাদের সামনে রাখা। সিঙ্গাপুরের মেইন ইনভেস্টর নিজের দামী কলম দিয়ে অলরেডি সাইন করে দিয়েছেন। এবার শেহজাদের সাইন করার পালা। সে কলমটা হাতে তুলে জাস্ট কাগজের ওপর ছোঁয়াতে যাবে, ঠিক তখনই তার ফোনটা আবার ভাইব্রেট করে উঠল।

স্ক্রিনে ‘মা’ নামটা দেখে শেহজাদ কলম থামিয়ে ফোনটা রিসিভ করল। ওপাশ থেকে সুফিয়া রহমানের কান্নায় ভেঙে পড়া কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,

-শেহজাদ! তুই জলদি বাড়ি আয় বাবা! সামাইরা… সামাইরা মাথা ঘুরে মেঝেতে পড়ে গেছে। নড়াচড়া করছে না। একেবারে অচেতন হয়ে গেছে! ও কোনো কথা বলছে না বাবা, ওর শরীর একদম বরফ হয়ে গেছে! তুই তাড়াতাড়ি বাড়ি আয়!

মায়ের মুখ থেকে ‘সামাইরা অচেতন হয়ে গেছে’ শোনা মাত্রই শেহজাদ রহমান চৌধুরীর হাতের দামী ফাউন্টেন পেনটা টেবিলের ওপর ছিটকে পড়ল। সে এক সেকেন্ডও আর ভাবল না। চেয়ার ছেড়ে ঝড়ের গতিতে উঠে দাঁড়াল।

কনফারেন্স রুমে বসা সিঙ্গাপুরের ডেলিগেট আর ইনভেস্টররা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তাদের প্রধান অত্যন্ত অবাক হয়ে বললেন,

-Mr. Rahman, what happened? The deal is almost done, you just need to sign!

শেহজাদ তাদের দিকে একবারও তাকাল না। তার কাছে এই মুহূর্তে ১০০ কোটি টাকার ডিল স্রেফ এক টুকরো কাগজ। কিংবা কাগজের চেয়েও সস্তা বলে মনে হলো। সে ডিল পেপার টেবিলে ফেলে রেখে কঠোর গলায় বলল,

-দিস ডিল ইজ অন হোল্ড। আই হ্যাভ টু লিভ, রাইট নাউ!

এই বলে সে কনফারেন্স রুমের কাঁচের দরজাটা সজোরে ঠেলে ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে গেল। কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডের সেই দাপুটে বিজনেস টাইকুন আজ এক মুহূর্তে নিজের প্রফেশনালিজম ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে পাগলের মতো লিফটের দিকে ছুটল।

গাড়ির গ্যারেজে গিয়ে সে নিজের মার্সিডিজের স্টিয়ারিং হুইল ধরল। ঢাকার জ্যাম , ট্রাফিক সিগন্যাল কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে সে গাড়িটাকে এক বন্য পশুর মতো ছুটিয়ে দিল স্কাইলাইন ভিলার উদ্দেশ্যে।

স্কাইলাইন ভিলার বেডরুমে ততক্ষণে ফ্যামিলি ডক্টর এসে গেছে। সামাইরার চেকআপ করাও প্রায় শেষ। সকল টেস্টের স্যাম্পল নেওয়া হয়েছে। সামাইরাও চেতনা ফিরে পেয়েছে। সে বিছানায় পিঠ ঠেস দিয়ে আধো-বোজা চোখে শুয়ে আছে। তবে তার পুরো শরীর তখনো দুর্বলতায় কাঁপছে।

ঠিক তখনই ঘরের দরজাটা একপ্রকার ভেঙে ভেতরে ঢুকল শেহজাদ। তার পরনের স্যুটের টাইটা আলগা।কলারের বোতাম খোলা। চুলগুলো এলোমেলো।

সে হাপাতে হাপাতে বিছানার কোণে ধপ করে বসে পড়ল। সামাইরার চোখ খোলা দেখে তার বুকের ভেতর থেকে এক বিশাল পাথরের ভার নেমে গেল।

সে সামাইরার দিকে না তাকিয়ে সরাসরি ডক্টরের দিকে তাকিয়ে রুক্ষ গলায় জিজ্ঞেস করল,

-ডক্টর! কী হয়েছে ওর? ও ফেইন্ট হয়ে গেল কেন? এনিথিং সিরিয়াস?

ডক্টর রহমান স্টেথোস্কোপটা নিজের ব্যাগে রাখতে রাখতে শেহজাদের এই চরম ব্যাকুলতা দেখে মৃদু হাসলেন। তিনি সুফিয়া রহমান আর শেহজাদের দিকে তাকিয়ে পেশাদার গলায় বললেন,

– মিস্টার রহমান, শান্ত হন। ভয়ের কোনো কারণ নেই। তবে মিসেস রহমানের ব্লাড প্রেশার অনেক বেশি লো। শরীরে একজিউশন আছে। আমি যা লক্ষণ দেখছি, আমার মনে হচ্ছে শি ইজ প্রেগনেন্ট।

‘প্রেগনেন্ট!’ শব্দটা ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হওয়া মাত্রই ভেতরের পুরো আবহাওয়া এক সেকেন্ডে স্তব্ধ হয়ে গেল। সামাইরার পুরো শরীরটা জমে বরফ হয়ে গেল। তার চোখের মণি দুটো তীব্র আতঙ্কে বড় বড় হয়ে গেল।

ডক্টর আবার বললেন, তবে এখনই ১০০% শিওর হওয়া যাচ্ছে না। সামাইরা তোমার পিরিয়ড মিস হয়েছে কতদিন হল?

সামাইরা ডক্টরের এই প্রশ্নে কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার ফর্সা গাল দুটো এক মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।সামাইরার বরাবরই ইররেগুলার পিরিয়ডের সমস্যা ছিল। কখনো দুই মাস, কখনো তিন মাস পর পর তার ডেট হতো। এই সমস্যার কারণে সে এই কারণেই সে এবারও পিরিয়ড মিস হওয়াটাকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দেয়নি।ভেবেছিল হয়তো হরমোনাল কোনো ইস্যুই হবে।

কিন্তু আজ ডক্টরের মুখে এই ‘প্রেগনেন্সি’র সন্দেহের কথা শোনা মাত্রই সামাইরার বুকের ভেতর কাঁপন শুরু হলো। লাউটারব্রুনেনের সেই নেশাগ্রস্ত রাতের প্রতিটি স্মৃতি তার চোখের সামনে সিনেমার মতো ভেসে উঠল। শেহজাদের পিঠে তার নখের আঁচড়। তার গলায়, বুকের ভাজে বহুদিন লাল রঙের ছোপ ছোপ বন্য ভালোবাসার দাগ সে পেলেছে! এসব মনে পড়তেই তার কলিজায় শিরশিরে অনুভূতি শুরু হল।

ডক্টর শেহজাদের দিকে তাকিয়ে বললেন,

– ল্যাবে ইউরিন স্যাম্পল পাঠিয়েছি। কিছুক্ষণের মাঝেই রিপোর্ট চলে আসবে। রিপোর্ট পজিটিভ আসলেই আমরা বাকি গাইনোকোলজিক্যাল প্রসিডিউরে যাব। তবে আমি ৯৯% শিওর মিসেস রহমান প্রেগন্যান্ট। আমার ডায়াগনোসিস ভুল হয় না। কনগ্রাচুলেশনস ইন অ্যাডভান্স!

সুফিয়া রহমান আল্লাাহর দরবারে সাথে সাথে হাত তুলে কেঁদে উঠলেন। এ কান্না শুকরিয়ার স্কান্না।

শেহজাদও সামাইরার দিকে নিজের গভীরভাবে তাকাল।

সামাইরা চোখ ফিরিয়ে নিল। সে বিছানার চাদরটা নিজের মুঠোর মধ্যে শক্ত করে চেপে ধরল। রিপোর্ট যদি সত্যিই পজিটিভ আসে, তবে এই মানুষটার জাল থেকে সে কোনোদিনও মুক্ত হতে পারবে না! এই ভয়ে তার পুরো সত্তা কাঁপতে লাগল।

ডক্টর ঘর থেকে বের হওয়া মাত্রই সুফিয়া রহমান আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি সামাইরার পাশে বসে পরম মমতায় বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন। তার দুচোখ বেয়ে আনন্দের নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। একজন বাঙালি মায়ের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন আজ পূর্ণতার মুখ দেখেছে। তিনি সামাইরার কপালে, গালে পরম আদরে চুমু খেতে খেতে অস্ফুটে আওড়াতে লাগলেন,

-শুকুর আলহামদুলিল্লাহ! শত কোটি শুকরিয়া সেই আল্লাহর দরবারে। আমি আমার আল্লাহর কাছে প্রতিটি মোনাজাতে কেবল এটাই চেয়েছিলাম মা। আমার এই ভাঙা শরীরে আর কতদিনই বা প্রাণ আছে বলো?আমি আল্লাহর কাছে হাত পেতে বলতাম হে দয়াময় আল্লাহ, মরার আগে আমার শেহজাদ-সামাইরার কোলজুড়ে যেন নূর আসে। নাতি-নাতনির মুখ যেন দেখে মরতে পারি।আল্লাহ আমার মনের সেই শেষ আশা পূর্ণ করতে চলেছেন মা। শেহজাদের রক্ত এই পৃথিবীতে আসবে, এর চেয়ে বড় আনন্দের দিন আমার জীবনে আর দ্বিতীয়টি হতে পারে না!

সুফিয়া রহমান সামাইরার মুখটা নিজের দুই হাতের তালুতে তুলে নিলেন। ডুকরে কেঁদে উঠে আবার বললেন,

-তুই আমাদের এই শূন্য বাড়িটা আলোয় ভরিয়ে দিলি মা। এখন থেকে শুধু নিজের খেয়াল রাখবি। তোর ভেতরে একটা ছোট্ট প্রাণ বড় হচ্ছে। আর কোনো অবহেলা নয়। বুঝলি?

সামাইরা পাথরের মূর্তির মতো শাশুড়ির বুকে মাথা দিয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জলও বের হলো না। শুধু এক তীব্র ঠান্ডা স্রোত তার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল। সে আড়চোখে বিছানার কোণে বসে থাকা শেহজাদের দিকে তাকাল।

সুফিয়া রহমান এবার নিজের চোখের জল মুছে এক চিলতে সার্থকতার হাসি হাসলেন। তার অভিজ্ঞ মন বলল এই মুহূর্তে তাঁর ছেলে আর ছেলের বউয়ের নিজেদের মাঝে কিছু একান্ত কথা বলা প্রয়োজন। তিনি শেহজাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। সামাইরাকে আবার সান্ত্বনা দিয়ে ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। নিজের পেছনে বন্ধ করে দিলেন ভারী দরজাটাও।

বিশাল বেডরুমে এখন শুধু তারা দুজন। শেহজাদ এবং সামাইরা। জানালার ফাঁক গলে শেষ বিকেলের রোদ এসে পড়েছে মেঝের ওপর। গাছের পাতার ছায়ানৃত্য স্পষ্ট সেখানে।

শেহজাদ দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না। সে অসীম মায়া নিয়ে সামাইরার ফর্সা, ক্লান্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। এই মেয়েটা তাকে এক অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে ফেলেছে বহু আগেই। কিন্তু আজ আরেকটি দৃশ্যমান সুতো যুক্ত হতে চলেছে।

শেহজাদ অজানা আনন্দে নিজের করা প্রতিজ্ঞার খেলাপ করল। হাত বাড়িয়ে সামাইরার হাতটা ছুঁতে গেল।

কিন্তু মুখে কিছু বলার আগেই সামাইরা এক ঝটকায় নিজের মাথাটা উঁচু করল। তার চোখ দুটোতে ফিরে এসেছে অবাধ্য জেদ। সে শেহজাদের চোখের দিকে তাকিয়ে ধারালো গলায় বলে উঠল,

-আপনার সাথে আমার কথা আছে।

শেহজাদ তার হাতটা গুটিয়ে নিল। ভ্রু জোড়া সামান্য কুঁচকে ফেলল। সামাইরার এই আকস্মিক গম্ভীর সুর তাকে কিছুটা সচকিত করল। সে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,

-কী কথা সামাইরা?

সামাইরা নিজের ভেতরের সমস্ত ভয়কে এক পাশে ঠেলে দিয়ে বিষাক্ত চাবুকের মতো শব্দগুলো ছুড়ে মারল শেহজাদের পানে,

-বিকেলে ওই ল্যাবের রেজাল্ট যদি পজিটিভ আসে, আমি এই বাচ্চা নষ্ট করে ফেলব। আমি এই সন্তানকে পৃথিবীতে আনব না!

ঠাসসস…

সামাইরা নিজের বাক্যটি শেষ করার সাথে সাথে পুরো ঘরের বাতাস কাঁপিয়ে এক প্রচণ্ড চড় আছড়ে পড়ল তার ফর্সা গালে। চড়ের তীব্রতায় সামাইরার মাথাটা এক পাশে ঘুরে গেল।

শেহজাদ বিছানা ছেড়ে এক লাফে উঠে দাঁড়িয়েছে ততক্ষণে। তার পুরো শরীরে বয়ে চলছে প্রলয়ংকারী ক্রোধ। রাগে থরথর করে কাঁপছিল। সে সামাইরার ওপর বাঘের মতো ঝুঁকে এলো। দুই কাঁধ সজোরে খপ করে চেপে ধরল। তার কণ্ঠস্বর হিংস্রতায় কাঁপছিল। বলল,

-খবরদার সামাইরা! খবরদার! এমন জঘন্য কথা যদি আর একটা বার তোমার মুখে তুলেছ, তবে আমি নিজের হাতে তোমার জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব! কার রক্তকে তুমি ধ্বংস করার দুঃসাহস দেখাচ্ছ? ওটা শেহজাদ রহমানের অংশ! আমার সন্তান!

গালে চড়ের তীব্র জ্বালা আর কাঁধের ওপর শেহজাদের লৌহকঠিন আঙুলের চাপ সামাইরাকে প্রচণ্ড যন্ত্রণা দিচ্ছিল। চোখে নোনা জলের বন্যা নেমে এলো। তবুও, তার ভেতরের সেই জেদি আর মধ্যবিত্ত আত্মসম্মান বিন্দুমাত্র নত হলো না। সে চোখের জল নিয়েই, শেহজাদের দিকে তাকিয়ে তীব্র চিৎকারে বলে উঠল,

-তাহলে মেরে ফেলুন আমাকে! আমার জীবনটা পুরোপুরি শেষ করে দিন। কিন্তু আমি এই বাচ্চা কোনোক্রমেই আমার পেটে রাখব না! আপনি কি ভুলে গেছেন আমাদের সম্পর্কটা কেমন? আমাদের এই বিয়ের ভিত্তিটা কী? এমন একটা সম্পর্কের মাঝে কেন একটা নিষ্পাপ প্রাণ আসবে? আমাদের ভুলের মাশুল ও কেন নিজের জীবন দিয়ে দেবে? যেদিন এই সম্পর্কটা আর থাকবে না, যেদিন আমরা আলাদা হয়ে যাব, তখন? এই বাচ্চার ভবিষ্যৎ কী হবে? ও কার পরিচয়ে বড় হবে এক লাঞ্ছিত নারীর সন্তান হয়ে?

সামাইরার ছুঁড়ে দেওয়া প্রতিটি প্রশ্ন যেন শেহজাদের বুকের গভীরে গিয়ে এক একটা তপ্ত সিসার মতো বিঁধল। সামাইরা তো ভুল কিছু বলেনি! এই বিয়ের মেয়াদ যে সুফিয়া রহমানের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত, তা তো শেহজাদই ঠিক করেছিল। কিন্তু আজ এই সন্তানের আগমনের বার্তা তার মনের সব সমীকরণ ওলটপালট করে দিয়েছে। সে সামাইরাকে নিজের বাহুর বাঁধন থেকে মুক্ত করে দিল।

(চলবে..)

(টার্গেট কমপ্লিট হয়নি।তাও দ্রুত গল্প দিলাম। আজ টার্গেট কমপ্লিট না করলে গল্প দেরি করে দিব বলে দিলুম। 😞 ২০০০ লাইক , ৩০০ কমেন্ট। দেখেন যা ভালো মনে করেন 🫠)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply