জাহানারা পর্ব ৮৩
#জান্নাত_মুন
পর্ব :৮৩
ক’পি করা নিষিদ্ধ
সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।
চৌধুরী বাড়ির নিস্তব্ধতা জানান দিচ্ছে এখন গভীর রাত। পুরো বাড়ি অন্ধকারের অতলে তলিয়ে আছে। বাইরে তুমল বৃষ্টি এবং তীব্র গর্জন করে বজ্রপাত হচ্ছে। বাতাসের ঘর্ষণের ফলে শো শো আওয়াজ চতুর্দিকে ভেসে বেড়াচ্ছে। অন্ধকারাচ্ছন্ন ড্রয়িং রুমে কেমল মাত্র দেয়াল ঘড়ির টিকটিক আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। হঠাৎ সেই শব্দের পাল্লা ভারী হলো সদরদরজা খোলার মটমট আওয়াজে। আগুন্তক কাঁধে ব্লেজার ঝুলিয়ে টালমাটাল পায়ে আঁধারের বুক চিরে অগ্রসর হচ্ছে। সে রেলিঙ ধরে ধরে ধীর পায়ে দুটো সিঁড়ি অতিক্রম করতেই ড্রয়িং রুমের লাইট জ্বলে উঠল। তৎক্ষণাৎ ইফানের পা থমকে দাঁড়াল। আকস্মিক আলোর ঝলকানিতে সে সহসা নিজের চোখ-মুখ কুঞ্চিত করে নিল।
ইফান ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকাতেই নাবিলা চৌধুরীর সাথে চোখাচোখি হল। নাবিলা চৌধুরী ওয়াটার পট হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। রুমে খাবার পানি শেষ হয়ে যাওয়ায় নিজেই এসেছেন পানি নিতে। কিন্তু এত রাতে ইফান কোথা থেকে বাড়িতে ফিরল? তড়িৎ গতিতে নাবিলা চৌধুরীর মস্তিষ্কে প্রশ্নটি জাগ্রত হলো। পরক্ষণেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ইফানকে পরখ করে নিল। ইফানের পোশাকে খানিকটা ভেজাভাব। তার আধবোজা চাহনি বলে দিচ্ছে সে নে’’শায় বুদ হয়ে আছে, সেই সাথে আহতও। কপালের একপাশে চুইয়ে চুইয়ে র’ক্ত গড়িয়ছে কিছুক্ষণ আগে তা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। নাবিলা চৌধুরীর কাছে এটা নতুন না। দেশে ফিরার পর অনেকবার ইফানকে এই অবস্থায় দেখেছে। বরং এর চেয়েও বিধস্ত অবস্থায় রাতবিরেত বাড়ি ফিরেছে। উপরে অনুভূতিহীন শান্ত চেহারা করে থাকলেও ভেতরে মাতৃমন ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। নাবিলা চৌধুরী ইফানের কাছে এগিয়ে গেলেন। আর্তকণ্ঠে শুধালেন,
–“বেটা, কি হয়েছে তোমার?
ইফান মায়ের দিকে একনাগাড়ে তাকিয়ে রইল। বেশ কিছুদিন যাবৎ মাকে সুকৌশলে অত্যাধিক মাত্রায় এড়িয়ে চলছে সে। বুকের কোথাও একটা তীব্র অথচ ভোঁতা ব্যথা অনুভব করে। এই নাবিলা চৌধুরী আর আগের নাবিলা চৌধুরী নেই। তার সেই জৌলুশময় চেহারা আজ মলিন, ফ্যাকাসে। দৃঢ় চোয়ালের সেই দাপুটে ভাব উবে গিয়ে সেখানে এখন কেবল বিষাদের গাঢ় ছায়া। ভীষণ বাজে একটা অনুভূতি হয় ইফানের। ইফান সজোরে ঢোক গিলল। হাত বাড়িয়ে মায়ের মাথায় রাখল। বিস্ময় খেলে গেলে নাবিলা চৌধুরীর চোখে। ইফান মায়ের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মৃদু গলায় বলল,
–“এভরিথিং ইজ গোয়িং ফাইন। আর ইউ ওকে?”
অবুঝ শিশুর ন্যায় ফ্যালফ্যাল করে ছেলের পানে চেয়ে রইলেন নাবিলা চৌধুরী। অনেকদিন পর আপনজনের থেকে একটু আশকারায় চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। মায়ের ব্যথাতুর দৃষ্টি সামনের দুর্ধর্ষ ব্লাডিবিস্ট খ্যাত মাফিয়া বসের প্রাণহীন হৃদয়ে তীব্রতর দহন শুরু হলো। বেশিক্ষণ সেই দৃষ্টির সাথে চোখ রাখতে পারলা না ইফান। সহসা দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল। পুনরায় ধীরলয়ে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে লাগল। এগিয়ে যেতে যেতে নাবিলা চৌধুরীর উদ্দেশ্যে মৃদু গলায় বলল,
–“রাত মেইবি অনেকটা হয়েছে। রুমে গিয়ে শুয়ে পড়।”
–“বেটা।”
মায়ের কণ্ঠ কর্ণপাত হতেই চলন্ত পা স্থির করল ইফান। ঘাড় ঘুরিয়ে ফের মায়ের পানে দৃষ্টি ঘুরাল। নাবিলা চৌধুরী ভরাট নয়নে ছেলের দিকে চেয়ে রইলেন। ইফান যেন মায়ের অব্যক্ত কথা পড়ে নিল। বিদ্রুপ করে হেসে বলল,
–“অপেক্ষা খারাপ না। তবে সব অপেক্ষা পূর্ণতা পায় না। ডেফিনিটলি নট ফর দ্য রং পারসন।”
ছেলের কথায় নাবিলা চৌধুরীর মনে তোলপাড় শুরু হলো। ইফান কি কোনো ইঙ্গিত দিল? নাকি সত্যিই সে যা বুঝেছে তাই বুঝাতে চেয়েছে? বুকের ভেতর ভার হয়ে এলো নাবিলা চৌধুরীর। দেহ মনের সকল শক্তি, জোড় যেন অসাড় হয়ে গেছে। ইফান এবারও বুঝে গেল মায়ের না বলা কথা। ফের তাচ্ছিল্য করে মৃদু হেসে বলে উঠল,
–“ইউ কুড’ভ হ্যাড আ গুড লাইফ। দেন হোয়াই দ্য হেল ডিড ইউ চুজ দ্য রং পাথ অ্যান্ড ডিস্ট্রয় ইউর লাইফ?”
–“জাস্ট ফর ইউ।”
–”হু টোল্ড ইউ টু গিভ বার্থ টু মি? ইউ শুড’ভ কিল্ড মি ইনস্টেড, দ্যান আ বিস্ট লাইক মি উডন’ট এক্সিস্ট, অ্যান্ড আই উডন’ট বি দ্য কজ অফ এভরিওয়ান’স পেইন।”
ছেলের কথা শুনে বিষণ্ণতায় মলিন হাসলেন নাবিলা চৌধুরী। দৃষ্টি সরিয়ে ভেজা কণ্ঠে বললেন,“এটা পারলে মন্দ হতো না। তবে কি জান, আমি পারি নি। নিজের পেটের সন্তান কেউ কি করে মা’রতে পারে? কিভাবে পারতাম মা হয়ে গর্ভফুলকে হ”ত্যা করতে? আমি এত নিষ্ঠুর হতে পারি নি। তাই তো গর্ভে যত্নে রেখেছিলাম তুমি নামক ফুলটিকে। পৃথিবীর সকল নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে পায়ের নিচে ঠেলে পৃথিবীতে এনেছিলাম তোমাকে।”
ইফান ঠোঁট বাঁকাল। অতঃপর বিনা বাক্যে সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে হাঁটা ধরল। নাবিলা চৌধুরী তাকিয়ে রইলেন সেদিকে। ইফান যেতে যেতে নিচু কণ্ঠে আওড়াল,
–“আমার সন্তানও তো ওর গর্ভে ছিল। ও তো পেরেছে…!”
বাইরে প্রকৃতির তাণ্ডব আর মেঘের গর্জনের আড়ালে ইফানের কণ্ঠস্বরটুকুও নিমেষেই বিলীন হয়ে গেল। চোখের সামনে থেকে আড়াল হলেও সেদিকেই পলকহীন তাকিয়ে রইলেন নাবিলা চৌধুরী। ইফানের কথার মর্মার্থ বোধগম্য হলো না তাঁর। তবে বুকের ভেতরটা মুচড়ে ধরল। ব্যথিত হৃদয় আরও বিষাদে ছেয়ে গেল নিজ সন্তানের আজ এই পরিণত দেখে।
__________
পাসওয়ার্ড চেপে নিজ কক্ষে প্রবেশ করল ইফান। ঘরের একপাশ নিকষ অন্ধকারে তলিয়ে থাকলেও অন্যপাশে রঙবেরঙের ফেইরী লাইটের মায়াবী বহর। তবে রুমের এই কৃত্রিম সৌন্দর্য ইফানের নজর কাড়তে ব্যর্থ হলো। ধূসর বাদামী অক্ষিযুগল কক্ষের চারধারে একবার ঘুরে এসে স্থির হলো বিছানার উপর। মাঝ বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছি আমি। কোমর অব্ধি কম্ফোর্টার জড়িয়ে রাখা। দীর্ঘ কেশরাশিগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে। সেই সাথে বিছানাময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বই, খাতা, কলম। ইফান স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বিছানার পানে। আমার মুখ দেখা যাচ্ছে না একাংশও। ইফান হাতের ব্লেজার ফেলে টালমাটাল পায়ে এগিয়ে এলো বিছানার দিকে। অতঃপর ফ্লোরে নিঃশব্দে বসে পড়ল। দৃষ্টি আটকালো আমার হাতের নাগালে থাকা ডাইরিটার পানে। ইফান জানে এই ডাইরির কথা। সে আমার জন্য কোনো প্রাইভেসির সুযোগ রাখে না কখনো। বরাবরই বুড়ো আঙুল ঢুকিয়ে দেয়। কিন্তু কখনো এই ডায়েরি খোলার সাহাস তার হয়ে উঠেনি। আজও তাই করল, যত্ন করে আমার হাত থেকে কলমটা সরিয়ে রাখল। অতঃপর ডায়েরিটা নিয়ে বন্ধ করতে যাবে তখনই ফেইরী লাইটের মিটমিটে আলোয় দৃশ্যমান হলো চিত্রকর্ম। কাঁচা হাতে আঁকা তিনটা মানবী। উমম! মানবী বললে ভুল হবে। বাচ্চারা শৈশবে যেমন পুতুল অংকন করে তেমনই তিনটে পুতুল। একটি ছবি বাকি দুটো থেকে সুউচ্চতাবিশিষ্ট এবং বলিষ্ঠ দেহী পুরুষের অবয়ব আঁকা। যার কোলে ছোট্ট শিশু। উপরে গোটা গোটা ইংরেজি অক্ষরে লেখা ইফান ড্যাডি। অপর হাত দিয়ে ছোট্ট একটি বাচ্চার হাত ধরে আছে। পাশেই বাচ্চাটির অপর হাত ধরে আছে একটি মেয়ে। তার কোলে একটি বিড়াল ছানা। উপরে লেখা জারা মাম্মা। স্মিথ হাসল ইফান। ধূসর বাদামী নেত্রপল্লব হঠাৎই ঘোলাটে দেখাল। সত্যিই কি তাই? কি জানি? পরক্ষণেই চোখদুটো স্বাভাবিক হয়ে গেল।
বাইরের ঝড়ের তোপে ঘরের ভেতরের পর্দাগুলো উন্মত্তের মতো দোল খাচ্ছে। বাতাসের ঝাপটায় আমার এলোমেলো চুলগুলো আরও অবিন্যস্ত হয়ে পড়ল। ইফান নির্নিমেষ নয়নে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইল ডায়েরির সেই ছবিটার দিকে। অতঃপর যত্ন করে সাইডে রাখল। আলতো হাতে আমার মুখের উপর ছড়িয়ে থাকা চুল গুচ্ছ সরাতেই দৃশ্যমান হলো প্রিয়দর্শিনীর মুখাবয়ব। ফেইরী লাইটের এক টুকরো মৃদু আলো আছড়ে পড়ল সেই অবয়বে। ইফান বিছানায় দু’হাত ভাঁজ করে তার হাতের উপর মাথা ঠেকাল। নে’শাক্ত ধারালো চোখদুটোতে যেন অনুভূতির স্রোত বয়ে যাচ্ছে। ইফান লক্ষ্য করলো হঠাৎই আমার ঠোঁটে মৃদু হাসির উদয় হয়েছে। দু গাল ডেবে সুক্ষ্ম খাঁজের আবির্ভাব ঘটেছে। দেখতে কি চমৎকার তা! ইফানের সিগারেটে পোড়া বাদামি ওষ্ঠপুটও সেই সাথে প্রসারিত হলো। তাঁর বাম গালেও আবির্ভূত হলো সুক্ষ্ম খাঁজের। আমাদের সহস্র অমিলেও কত মিল, তাই না?
ইফানের ঠোঁটের হাসি প্রসারিত হতে পারল না। পরক্ষণেই আমার চেহারা বাচ্চাসুলভ রূপ ধারণ করল। ঠোঁট দু’টো ভেঙে ফুঁপিয়ে উঠলাম। এক মূহুর্তের জন্য ভরকে গেল ইফান। হিমশীতল হাতখানা আমার গাল স্পর্শ করতেই আমার সারা অঙ্গে শিহরণ বয়ে গেল। পরক্ষণেই আমার চেহারা ফের স্বাভাবিক রূপ নিল। ইফান এবার লক্ষ্য করল আমার ঠোঁট দু’টো নড়ছে। বিড়বিড়িয়ে কিছু আওড়ে যাচ্ছি। ইফান আমার মুখের আরও সন্নিকটে আসতেই কর্ণপাত হলো আমার ডাক,
–“ই..ইফান…।”
–“আ’ম হিয়ার।”
তৎক্ষনাৎ প্রত্যুত্তর করলো সে। এরপর খানিকটা সময় ঘর জুড়ে বিরাজ করল এক ভারি নৈঃশব্দ। ঘুমের ঘোরে চোখ খোললাম। ডুলুডুলু চোখের পাতা, তখনই ভেসে উঠল কাঙ্খিত পুরুষটিকে। শ্লেষ হাসলাম। তক্ষুনি বাইরে বিদ্যুৎ চমকাল। স্পষ্ট হয়ে উঠল পুরুষটির মুখশ্রী। বজ্রপাতের কানফাটানো তীব্র শব্দে সহসা মস্তিষ্ক সচল হয়ে উঠল। আমি তড়াক করে ধরফরিয়ে উঠে বসলাম। ইফান আমার এরূপ আচরণে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সে কিছু বুঝে উঠার আগেই আমি ওর মুখ দু’হাতের তালুর মধ্যে নিয়ে নিলাম। কাঁপা কাঁপা গলায় এলোমেলো বুলি আওড়ে শুধালাম,
–“ক..কি হয়েছে তোমার? র..র’ক্ত, আ’ঘাত পেলে কি করে? দেখি কতটা লেগেছে?”
–“আ’ম ফাইন। ডোন্ট বি অ্যাফ্রেইড।”
–“ত..তুমি ঠিক নেই? কি হয়েছে তোমার, আমায় বল?”
গলায় কান্না আটকে আসছে। চোখ দু’টো নোনা জলে টইটম্বুর হয়ে উঠেছে নিজের অজান্তেই। হঠাৎ ঘুম ভেঙে এমন অপ্রত্যাশিত ঘটনায় বুক অস্বাভাবিক দ্রুততায় ওঠানামা করছে। ইফান এক হাতে আমার কোমর এবং অপর হাতে পেছন থেকে মাথা আঁকড়ে ধরে আমায় নিজের কাছে টানল। কিছু বলবে তক্ষুনি নজর আটকায় আমার সুউচ্চ উন্নত নারীকায়ায়। যা অস্থিরতায় নিয়ন্ত্রণহীনভাবে হাপরের মতো ওঠানামা করছে। পরনের শার্টের প্রথম বোতামটি আলগা হয়ে থাকায় অভ্যন্তরীণ সেই অনাবৃত অংশটি দৃশ্যমান হয়ে উঠল। ইফান তৎক্ষনাৎ চোখ ঘুরিয়ে দৃষ্টি সংযত করে বড়সড় ঢোক গিলল। তরঙ্গায়িত হলো তার পৌরুষদীপ্ত এডামস অ্যাপল। আমি উন্মাদের মতো ইফানের আধভেজা শরীরে হাত বুলিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম। ওর পরনের অসুভরঙা শর্টের বোতাম খুলতে খুলতে তরল গলায় বললাম,
–“কত জায়গায় লেগেছে! কতবার বলেছিলাম মনটা কু গাইছে বাড়ি থেকে আজ বেরিও না। শুনলে না আমার কথা…।”
বলার মাঝ পথে আমি থেমে গেলাম। ইতোমধ্যে ইফান আমার হাতটা ধরে থামিয়ে দিয়েছে। নিজে শার্টের বোতামে হাত চালাতে চালাতে ধীরলয়ে উঠে দাঁড়াল। শান্ত গলায় বলল,
–“ঘুমিয়ে পড় তুমি। নিশ্চয়ই অনেকটা রাত জেগে অপেক্ষা করেছিলে? এবার কিন্তু মাথা আবার ব্যথা ক..।”
–“তুমি একটা উন্মাদ, পাগল লোক।”
–“আমি জানি।”
রাগে ফোঁস করে উঠলাম। বিছানা ছেড়ে ওর বাহু চেপে ধরে ক্রোধিত কণ্ঠে বললাম,“আমায় কষ্ট পেতে দেখল ভালো লাগে তাই না?”
ইফান কিছু বলার ফুরসত না দিয়ে লাইট জ্বালানোর জন্য অগ্রসর হতেই হাতে হেঁচকা টান পড়ে। তাল হারিয়ে ইফানের উন্মুক্ত প্রশস্ত বুকে এসে পড়লাম। ইফান দু’হাতে জড়িয়ে ধরল। হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে আওড়াল,
–“আলো ভীষণ রকম অপছন্দ করি।”
–“ঔষধ লাগিয়ে আবার বন্ধ করে দিব।”
–“মেডিসিন লাগাতে হবে না। এমনি সেরে যাবে।”
–“অধিক জান তুমি? এতই জান যে আ…।”
আমার মুখের কথা মুখেই আঁটকে গেল। ইফানকে টেনে ধরে স্টাডি রুমে নিয়ে আসলাম। এখানে আলোটা বেশি স্পষ্ট। ইফানকে চেয়ারে বসিয়ে ওর কপালে ড্রেসিং করতে শুরু করলাম। পিয়ার্সিং করা কানের রিংয়ে চাপ লেগে রক্ত গড়িয়ে জমাট বেঁধে গেছে। আশেপাশে ছিলে গেছে অনেকটা। ওর এই দশা দেখে বুক ফেটে কান্না আসছে। ফুঁ দিয়ে মলম লাগিয়ে দিতে দিতে নাক টেনে শুধালাম,
–“এত বাজে ভাবে ব্যথা কি করে পেলে তুমি? কাদের সাথে মা’রপিট করে এসেছ?”
ইফান এক মূহুর্তের জন্য ভাবনায় বিভোর হয়। নিজ কাজ সেরে বাসায় আসার সময় হঠাৎ একটা গাড়ি তার গাড়ির দিকে ধেয়ে আসে। চারপাশে গুটগুটে অন্ধকারে গাড়ির হেডলাইটের আলোয় একমাত্র ভরসা। চতুর্দিকে উম্মত্ত ঝড়বৃষ্টির কারণে রাস্তাঘাট তখন জনমানবহীন। তখন হঠাৎ একটি গাড়ি ধেয়ে আসে। সেই গাড়ির হেড লাইটের ঝলকানিতে ইফানের ড্রাইভিং মনযোগ ক্ষুন্ন হয়। এমতাবস্থায় গাড়ি ধাক্কা দেয় বলে। উপায়ন্তর না পেয়ে ইফান গাড়ি থেকে ঝাপ দেয়। মুহূর্তের ব্যবধানে ঘাতক গাড়িটি ইফানের গাড়িকে সজোরে পিষে দিয়ে অন্ধকারে লাপাত্তা হয়ে যায়। কিন্তু পালিয়ে কই যাবে? মাফিয়া বসকে মা’রার সাহস দেখানোর শাস্তি তো পেতে হবেই। মাটি খুঁড়ে হলেও বের করে আনবে ঐ বা”স্টার্ডকে।
ইফানের ভাবনার সুতো ছিঁড়ে কিছুক্ষণ আগের একই দৃশ্যে। আমি আপন মনে ইফানের সাথে কথা বলেই যাচ্ছি। কিন্তু একবারও উত্তর না পেয়ে ভ্রু কুঞ্চিত হলো। সহসা দৃষ্টি নত করতেই ইফানের ঘোর লাগা দৃষ্টি লক্ষ্য করি। সেই দৃষ্টি অনুসরণ করে নিজের দিকে তাকাতেই আড়ষ্টায় জমে গেলাম। সহসা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ইফানের যেন ভ্রম ছুটল। ঢোক গিলে উঠে দাঁড়াল। আমার দৃষ্টি এলোমেলো হয়ে পড়ল। ইফান টাউয়াল নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই কোমরে টাউয়াল জড়িয়ে বেরিয়ে আসল। সে আরেকটি টাউয়াল দিয়ে ঘন চুলগুলো মুছতে ব্যস্ত।
আমি টেবিলে কিছু স্ন্যাকস আর ব্যথার মেডিসিন রেখে আড় চোখ ইফানের দিকে তাকাতেই লক্ষ্য করলাম তার উন্মুক্ত সুঠাম দেহ। এখনো বিন্দু বিন্দু পানির কণা রঙবেরঙে ফেইরী লাইটের আলোয় হিরের মতো ঝিলমিল করছে। দু’চোখে ঘোরে লেগে এলো। দেহ, মন, মস্তিষ্ক এক অদম্য কামনায় খুব টানছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। ভেতরের অস্থিরতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে নিষিদ্ধ বাসনায়। দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম। বিড়বিড়িয়ে নিজেকে ভৎসনা করতে লাগলাম,“ছি, জারা ছি! লজ্জা হওয়ার দরকার তোমার, দিনদিন লুচু স্বাভাবের হয়ে যাচ্ছ। শেষে কিনা নিজের স্বামীর দিকেই কু নজর দিচ্ছ? বেহায়া মেয়ে কোথাকার!”
সত্যিই আজকাল এই মন বড্ড বেহায়া। মনে মনে বারংবার নিজেকে তিরস্কার করার পরও চোখের অবাধ্যতা থামল না। লুকিয়ে ফের ইফানের দিকে তাকালম। কিছুতেই দৃষ্টি সরাতে পারছি না। যেন সামনের সুদর্শন লোকটার প্রতি সম্মোহিত হয়ে পড়ছি। মনের গহীনে লুকায়িত নিষিদ্ধ অনুভূতিগুলো কড়া নাড়ছে। এবার গলার সাথে ওষ্ঠ জোড়াও শুকিয়ে এলো। আমি ঠোঁট ভিজিয়ে ঢোক গিললাম। ইফানের দেহ থেকে দৃষ্টি ধীরে ধীরে উপরে তুলতেই চোখ ছানাবড়া। চোর ধরা পড়ার মতো আঁতকে উঠলাম। ইফানের গভীর অথচ শীতল চাহনি তখন থেকে আমাতেই নিবদ্ধ। তড়িৎ গতিতে দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম। বুকের ভেতর অসহনীয় তান্ডব চলছে। আমাকে এলোমেলো করে দিতে চাইছে। তাই হলো। আমি এলোমেলো অসংলগ্ন বুলি আওড়াতে লাগলাম,
–“ত..তু তোমার খ..খা খ..খেয়ে…!”
মুখ দিয়ে রা বের হতে চাইছে না। কি করবো আমি ভেবে পাচ্ছি না। উপয়ান্তর না পেয়ে ভোঁ দৌড় লাগাতে নিলেই পিছন থেকে হাতে হেঁচকা টান অনুভব করি। ইফান আমাকে স্টাডি টেবিলের সাথে চেপে ধরে। মূহুর্তেই চোখাচোখি হলো আমাদের। আমার কম্পিত ঠোঁট কিছু বলতে যাবে তার আগেই দূরত্ব ঘুচাল ইফান। দু’জোড়া ঠোঁটের মিলন হতেই অনুভূতিরা ডানা মেলেল৷ চুম্বন গাঢ় হতেই দুজনের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। অবচেতন মনে হাত দু’টো দিয়ে ইফানের কলার চেপে ধরতে চাইলাম। কিন্তু অনাবৃত হওয়ায় গলা জড়িয়ে ধরলাম। ইফান খনিকের জন্য থামল। আমার ঠোঁট দু’টো টনটন করছে। চোখ জোড়া বন্ধ। ইফান ওর খড়খড়ে ওষ্ঠ আমার কানের সন্নিকটে আনল। সেখানে তপ্ত ঠোঁট ছুঁইয়ে হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বলে উঠল,
–“আমি অনেক চেষ্টা করেছি নিজেকে সংযত করার, নিষিদ্ধ অনুভূতিগুলো ধামাচাপা দেওয়ার। বারবার তোমার চোখের ভাষা পড়েও এড়িয়ে গিয়েছি। শুধুমাত্র তোমার সুস্থতার জন্য। পরপর মিসক্যারেজ হয়েছে। আমি চাই নি আমার উগ্র চাহিদার জন্য তোমার আবার ক্ষতি হোক। কিন্তু আজ যে নিজেকে সামলে নিতে পারছি না।”
ইফানের প্রতিটি বাক্য আমার নারীসত্তাকে বিকল করে দিচ্ছে। সারা দেহে মৃদু কম্পন বইছে। যা ইফানের তীক্ষ্ণ ইন্দ্রিয় এড়াতে পারল না। ফের হিসহিসিয়ে বলে উঠল,
–“আজ একটু মানিয়ে নাও তোমার জা’নোয়া’রটাকে। তোমাকে বেশিক্ষণ কষ্ট দিব না বুলবুলি। প্রমিজ।”
ইফান আমার নিরবতাকে মৌন সম্মতি ধরে নিল। ফের দূরত্ব ঘুচল দু জোড়া তৃষ্ণার্থ ওষ্ঠের। সময় যত গড়াচ্ছে লোকটার ওষ্ঠের প্রকোপ দংশনে রূপ নিচ্ছে। আমি আরও শক্ত করে ইফানের গলা জড়িয়ে ধরলাম। আমার নখড়ের আঁচড়ে বোধহয় ওর দেহে চিহ্ন বসে গেছে। তল পেটের ব’জ্জাত প্রজাতি গুলো স্বাধীন হয়ে ডানা ঝাপটাতে শুরু করেছে। ইফান ওষ্ঠ মগ্ন থেকেই আমাকে টেবিলের উপর বসিয়ে দিল। ওর অবাধ্য হাত দু’টো আমার দেহের প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে প্রণয়ের সুখানুভূতির সুর তুলছে। ওর একটা অবাধ্য হাত আমার শার্টের আরেকটি বোতাম খোলে কাঁধের এক পাশ থেকে নামিয়ে নিল। সে ঘাড়ে মুখ গুঁজে উন্মুক্ত অংশে ছোট্ট ছোট্ট গভীর চুমুতে ভরিয়ে দিল। সিক্ত হতে লাগল তার ওষ্ঠের স্পর্শকৃত অংশগুলো। আজ বহুদিন পর আবার বুঝি এই নি’র্লজ্জ দেহ-মন দু’টো একে অপরের সান্নিধ্যে পাবে। আমাদের মাঝে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকা অদৃশ্য দেয়ালও বোধহয় ভেঙেচুরে ধূলিসাৎ হবে। আমাদের মাঝখানের দূরত্বগুলো ক্রমান্বয়ে মোচন হতে থাকে। বাইরের প্রলয়ঙ্করী ঝড়-তুফানের তাণ্ডবের কাছে আমার কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসা মৃদু শীৎকারগুলো তলানি পড়ছে। আমি মৃদু কণ্ঠে আওড়ালাম,
–“এ…এখানে না। বেডে চল।”
লোকটা তাই করল। আমাকে পাঁজাকোলে নিয়ে এগোতে লাগল। ওর গলা জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে মুখ গুঁজে রইলাম। ইফান সন্তপর্ণে আমাকে শুইয়ে দিল। অতঃপর পাশে শুইয়ে দু’জনকে একই চাদরে মুড়িয়ে নিল। ফের ঘুচে গেল আমাদের ওষ্ঠাধরের দূরত্ব। অতঃপর দৈহিক দূরত্বের সীমালঙ্ঘন হওয়ার পূর্বেই দরজায় কেউ বারংবার কড়া নাড়তে শুরু করল। এক মূহুর্তের জন্য দু’জনেই থ হয়ে গেলাম। বাইরে থেকে মেয়েলি কণ্ঠে ভেসে আসছে,
–“জাহানারা ভাবি ঘুমিয়ে পড়েছ? ভাবিইই..!”
মাদকতা কেটে গিয়ে বাস্তবে ফিরতেই আমি তড়িঘড়ি করে ইফানের বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম। দ্রুত হাতে নিজের বেশভূষা গুছিয়ে নিয়ে ঝটপট বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। পা বাড়ানোর আগে এক পলক তাকালাম লোকটার পানে। ইফান তপ্তশ্বাস ছেড়ে দৃষ্টি ঘুরিয়ে বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়ল।
_________
দরজা খুলতেই দেখি পলি কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দরজা খুলতে দেখেই যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। আমি শুধালাম,
–“এত রাতে তুমি! কোনো সমস্যা হয়েছে?”
অপ্রস্তুত হয়ে হেসে দিল পলি। আমতা আমতা করে বলতে লাগল,“না আসলে হ্যা..।”
–“বুঝি নি কি বলছ?”
পলির দৃষ্টি এলোমেলো, অস্থির। অজ্ঞাত কোনো এক কারণে সে হাপিত্যেশ করছে। এই তো কিছুক্ষণ আগের ঘটনা। ইদানীং নাবিলা চৌধুরী ইতির সাথেই রাতে থাকে। তাই ভয় করলেও রাতবিরেত ইতির রুমে যেতে পারে না। অগত্যা কাচুমাচু হয়ে নিজ রুমেই শুয়েছিল। ক্লান্তিতে চোখ দুটো ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে যেতেও সময় নেয়নি। কিন্তু সেই শান্তির ঘুম দীর্ঘস্থায়ী হলো না। দরজায় সজোরে কড়া নাড়ার শব্দে পলির ঘুম নিমেষেই ছুটে গেল। বাইরে তখন প্রবল ঝড়-বৃষ্টির তাণ্ডব। এই মাঝরাতে দরজার ওপাশে কে হতে পারে? ভাবতে ভাবতে দরজা খুলে দেয়। উপস্থিত আগুন্তককে দেখেই পলির গা শিউরে ওঠে। ভেজা শরীরে তৎক্ষনাৎ হুড়মুড় করে রুমে প্রবেশ করে দরজা আঁটকে দেয় ইমরান। পলির মস্তিষ্ক তখন শূন্য। আজ বহুদিন বাদে ইমরান বাড়িতে ফিরেছে। পলির মিথ্যা দেখিয়ে হলেও খুশি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে হতে পারে নি।
ইমরান বউকে দেখে মৃদু হাসে। পলির শাড়ির আঁচল দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বলতে লাগল,“বউজান কেমন আছ জান? কতদিন তোমাকে কাছ থেকে দেখি না। সব ঠিক চলছে তো?”
–“এএত রাতে ক..কোথা থেকে আসলেন?”
ইমরান চোখ তুলে তাকাল রমণীর পানে। অপ্রস্তুত হাসল মেয়েটা। অথচ ভেতরে ক্রোধ। ইমরান এক আঙুল বউয়ের ঠোঁটে স্পর্শ করে হাস্কি স্বরে বলল,“কেন, খুশি হও নি?”
–“ওমা খুশি হব না কেন?”
হেসে দিলে ইমরান। পলি ঢোক গিলল। ইমরান আচমকা পলির কোমর জড়িয়ে ধরে। ঘাড়ে মুখ গুঁজতে যাবে তার আগেই ছিটকে দূরে সরে গেল মেয়েটা। ইমরান ভ্রু কুঁচকে নেয়। পলি অপ্রস্তুত হেসে বলল,
–“ভিজে গেছেন আপনি। যান ফ্রেশ হয়ে নেন।”
ইমরান মাথা নাড়াল। পলি শুধাল,“কিছু খাবেন, বানাব?”
–“না খেয়ে এসেছি।”
ইমরান ফ্রেশ হতে চলে গেল। খানিকটা হাফ ছেড়ে বাঁচল মেয়েটা। কিন্তু তার ভেতরের অস্থিরতা তাতে বিন্দুমাত্রও দমল না। ইমরানকে আবারও মা’রতে ব্যর্থ হয়েছে পলাশ। এতোদিনে কি ইমরান কিছু আন্দাজ করতে পারে নি? নাকি বাইরে যা দেখাচ্ছে সেটাই সত্যি?
পলি বিছানায় ঘাপটি মেরে শুয়ে রইল ঘুমের ভান ধরে। ইমরান ফ্রেশ হয়ে পাশে এসে শুয়ে পড়ল। পলিকে কয়েকবার ডেকেও সারা পেল না। অতঃপর মেয়েটার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের দিকে ফিরাল। নিজেকে ছাড়াতে চাইল পলি। যত দিন যাচ্ছে তার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে যেন। গা ঘৃণায় জ্বলে যায়। ইমরান বাহুবন্ধনে আবদ্ধ মেয়েটাকে মুচরামুচরি করতে দেখে ভ্রু কুঁচকে শুধাল,
–“কি হয়েছে? আজ কতদিন পরে তোমাকে কাছে পেলাম বউপাখি। বিরক্ত করো না আমায়।”
গলা শুকিয়ে এলো মেয়েটার। দ্রুত পানি খেতে যাবে তখন দেখে ঘরে পানি নেই। খুশিতে চকচক করল মেয়েটার চেহারা। পানি আনার অযুহাত দেখিয়ে বেরিয়ে এক ছুটে আমার দোয়ারে এসে দাঁড়িয়েছে।
মেয়েটাকে অন্য মনস্ক দেখে ওর কাঁধে হাত রাখলাম। সংবিৎ ফিরল পলির। ওর উদভ্রান্ত চেহারা দেখে ফের শুধালাম,
–“কিছু হয়েছে?”
দু দিকে জোরে মাথা ঝাঁকিয়ে মানা করল পলি। আমি কিছু একটা ভেবে বললাম,“বরের জন্য মন পুড়ছে?”
ফের দুদিকে মাথা নেড়ে না করল সে। আমি ভাবুক চেহারায় শুধালাম,“তাহলে কি হয়েছে বল?”
–“ও বাড়িতে ফিরেছে আজ।”
ঠোঁট প্রসারিত হলো আমার। মজা করে বললাম,“তাহলে আর কি? যাও বরের সাথে আদর সোহাগ কর গিয়ে। এতদিন একলা একলা থেকে শুকিয়ে গেছ।”
মলিন হয়ে গেল পলির চেহারা। বুঝলাম মজা করার মুডে নেই। পলি বলে উঠল,“আমি যাব না ঐ ঘরে।”
–“কেন?”
পলি ঢোক গিলল। কিছুটা ভীত হয়ে আছে। জড়তা আর সংকোচ নিয়ে বলল,
–“ভাবি, আমি তোমাকে কিছু বলতে চাই।”
___________
ভয়ে জড়সড় হয়ে আছে জুই। মাহিন মেয়েটার হাতের ইশারা দেখে নিজ হাতের পলিথিনটিতে দৃষ্টিপাত করল। অতঃপর মেয়েটির দিকে এগিয়ে গেল। সময় ব্যয় না করে ভেতর থেকে একটা কা’টা মাথা বের করে এনে জুইয়ের পায়ের কাছে রাখল। তড়িৎ গতিতে লাফিয়ে দূরে সরে গেল মেয়েটা। তার আত্ম চিৎকার চার দেয়ালে বাড়ি খেল। বাইরের ঝড়বৃষ্টির কারণে ভেতরের আওয়াজ বাইরে পৌঁছাল না। জুই অনুভব করছে দেহের সকল শক্তি যেন লোপ পাচ্ছে। ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকতে বেগ পোহাতে হচ্ছে। জুইয়ের এহেন টালমাটাল অস্তিত্ব দেখে মাহিন এগিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু ভেসে আসল কড়া নিষেধাজ্ঞা,
–“দূরে যান। সরান এটাকে?”
মাহিন তাই করল। পা দিয়ে লাথি মেরে কা’টা মাথাটা দূরে সরিয়ে দিল। গা গুলিয়ে আসছে জুইয়ের। সে আতংকিত কণ্ঠে আওড়ালো,
–“আ..আপনি এভাবে আপনার বাবাকে খ..খু’’ন করেছেন?”
এতক্ষণ মাহিনের চেহারা নমনীয় থাকলেও মূহুর্তেই ক্রোধে ফেটে পড়ল তার মস্তিষ্ক। চোয়াল শক্ত করে জুইয়ের বাহু চেপে ধরে হুশিয়ারি দিয়ে দিয়ে বলল,
–“এটা বা”স্টার্ড, জা”নোয়ার। ডোন্ট কল হিম মাই ফাদ.! ফাক!”
মাহিন ঘৃণায় বিকৃত করে ফেলল চেহারা। জুই একনো ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। বারবার গা গুলিয়ে আসছে তার। না চাইতেও দৃষ্টি চলে যাচ্ছে মেঝেতে পরে থাকা ইরহাম চৌধুরী নামক জা”নোয়ারের শিরে। কি বিকৃত আর বি’’ধস্ত দৃশ্য। তৎক্ষনাৎ চোখ খিঁচে নিল সে। অনুনয় করে বলল,
–“দয়া করে এটা নিয়ে চলে যান। আমি সহ্য করতে পারছি না।”
–“চল।
চোখ মেলল জুই। নির্বোধের ন্যায় শুধাল,“কোথায়?”
–“আমার সাথে।”
–“আপনার সাথে কেন যাব?”
–“কারণ আমিই তোমার একমাত্র ডেস্টিনি।”
–“আমি কারো সাথে কোথাও যাব না। আমি একলা থাকতে চাই। দোহায় লাগি, চলে যান।”
মাহিন শান্ত চোখে চেয়ে রইল জুইয়ের সিক্ত নেত্রপল্লবের পানে। এগিয়ে গেল এক কদম। দুজনের মধ্যে দূরত্ব এক হাত। মাহিন বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে মেয়েটার চোখের কোণার অশ্রু কণাগুলো মুছে দিল। হিসহিসিয়ে জানিয়ে দিল মনের অব্যক্ত কথা,
–“ভালোবাসি তোমায়। বিয়ে করব তোমাকে। আর সারাজীবন নিজের কাছেই রাখব। তুমি চাও বা না চাও তবুও।”
–“ভালোবাসেন আমায়? একজন ধ”র্ষিতাকে বিয়ে করতে চাইছেন! সমাজের ভয় নেই নাকি আপনার? কলঙ্ক লাগবে তো!”
কন্দনরত কণ্ঠে বাক্যগুলো আওড়ে মাহিনের থেকে আরেকটু দূরে সরে যাওয়ার জন্য এক পা পিছিয়ে পড়ল। দুর্বল দেহ নড়বড়ে। এই বুঝি হেলে পড়বে। আরও এক পা পিছিয়ে যেতে চাইলে মাহিন জড়িয়ে ধরল। জুই উচ্চতায় বেশ খাটো হওয়ায় মাহিনকে ঝুঁকতে হয়েছে খানিকটা। মেয়েটা ফুঁপিয়ে কেঁদে যাচ্ছে। মাহিন কোমর জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত রাখল। ঘাড়ে মুখ গুঁজে তরল গলায় হিসহিসিয়ে আওড়াল,
–“কলংকের ভয় করলে কি আর ভালোবাসা হয়?
আমি কালা করি না লোকনিন্দার ভয়।”
_____________
ভোরের আলো ফুটেছে। পূব আকাশে সূর্যের উদয় হতেই রাতের সব গুমোট অন্ধকার বিলীন হয়ে গেছে। যান্ত্রিক এই ব্যস্ত নগরী আবারও নিজের চিরচেনা ব্যস্ততায় রূপ নিয়েছে। বাগান থেকে ভেসে আসছে বন্য পাখিদের কিচিরমিচির আওয়াজ। নিশ্চয়ই ঝড়-তুফানে ওদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শুধু পশুপাখিরই নয়, গাছপালারও হয়েছে বোধহয়। কদিন আগের ঝড়ে বাগানের কাঠগোলাপ গাছের বড় ডালটাই ভেঙে পড়েছিল। ইশশ! সেদিন নাবিলা চৌধুরীর চেহারাটা তখন এইটুকু হয়ে গিয়েছিল। বাগানটি উনার বড্ড শখের। পরে ভাঙা ডালটা মনিরা বেগমের কবরের পাশে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। উনার নাকি কাঠগোলাপ ভীষণ প্রিয় ফুল ছিল।
রাতে পলিকে মীরার রুমে দিয়ে এসেছিলাম। পরে নিজের রুমে ফেরার পথে ইমরানের সাথে দেখা। বউয়ের খোঁজ চাইলে বানোয়াট কথা বলে দিয়েছি,
–“আজ মীরা একা থাকতে ভয় পাচ্ছে। তাই পলিকে ওর কাছে রেখে এসেছি। আমিই থাকতাম কিন্তু তোমার ভাইয়ের শরীর ঠিক নেই।”
টুকটাক কথা বলে নিজ রুমে চলে আসলাম। মীরার ভয় পাওয়া বিষয়টি বোধহয় ইমরানের হজম হয় নি। তবে কিছু বলে নি। আমায়িক হেসে নিজ রুমে চলে গিয়েছে। আমি রুমে এসে দেখি ইফান বেঘোরে ঘুমচ্ছে। আর ডাক দেইনি। ঠিক তখনই ভোরের নিস্তব্ধতা চিরে ফজরের আজান ভেসে এল। নামাজ শেষ করে ওর পাশেই গা এলিয়ে দিয়েছিলাম। তবে বেশিক্ষণ ঘুম হয়নি। উঠে ফ্রেশ হয়ে দেখলাম এখনো কেউ উঠেনি। আর শুতে মন চাইল না। শরীর মেজমেজ করছে। তাই রুম ছেড়ে করিডর দিয়ে হাঁটাচলা করতে লাগলাম। বাড়ির কোণায় কোণায় নজরদারি করেছি। অনেক জায়গায় ধুলোবালি জমে আছে। কাজের মহিলাগুলো বড্ড ফাঁকিবাজ হয়েছে। কাকিয়া থাকতে তিনি সব দিকে নজরদারি করতেন। ছাঁদে উঠে দেখি একই তথৈবচ অবস্থা, রাতের তান্ডবে চারপাশ ময়লা এবং সেঁতসেঁতে হয়ে আছে। কদিন অসুস্থতার কারণে উপরে আসি নি। এদিকে মালি ছাঁদ বাগানের গাছপালাগুলো ছাঁটাই করেনি। কি এক অবস্থা! মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছাড়লাম। ক্ষুদায় পেটের ভেতর ঘুরঘুর করছে। এখনই পেটে কিছু না পড়লেই নয়।
আমি নিচে নামার জন্য অগ্রসর হলাম। ইতোমধ্যে কে সদরদরজায় কলিং বেল বাজিয়ে চলেছে। সাতসকালে আবার কে এলো? বাড়ির লোকগুলো না হয় ঘুমে আছে। কিন্তু কাজের লোকগুলো কি করছে? এতবার বেল বাজাচ্ছে খুলছে না কেন? মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে। আজ সবকটাকে করা শাসন না করলে হবে না। দিনকে দিন কাজে ফাঁকিবাজ হয়ে যাচ্ছে। বাড়ির সবাইকে ভালো মানুষ পেয়ে বসেছে। বিড়বিড়িয়ে বকাঝকা করতে করতে নিচে নামলাম। শাড়ির আঁচল কাঁধে তুলে এগিয়ে গেলাম সদর দরজার দিকে। পিছনে ডুলুডুলু নয়নে হেলে দুলে নোহাও সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে।
সদর দরজা খুলতেই দেখলাম মাহিন দাঁড়িয়ে। আজ এতদিন পর বাড়ির ছেলেকে সুস্থভাবে ফিরতে দেখে ভেতর থেকে কিছুটা স্বস্তি পেলাম। মীরাটা ভাইয়ের চিন্তায় সবসময় বিভোর থাকে। আমি সরে দাঁড়ালাম। মাহিন ভেতরে আসল না। বরং হঠাৎ পিছন থেকে একটা কালো বোরকা পরহিত মেয়ে বেরিয়ে আসল। ভ্রু কুঁচকে আসল আমার। ইতোমধ্যে বাড়ির লোকজন জেগে ওঠেছে। সিঁড়ি বেয়ে সকলে নিচে নামতেই অভাবনীয় দৃশ্যটি দেখতে পেল। পিছন থেকে ভেসে আসল মীরার কন্ঠ,
–“ভাই।”
মীরা আমার পাশে এসে দাঁড়াল। ভাইয়ের পাশে বোরকা পরহিত মেয়েটিকে দেখে অবাক হলো। বিস্ময় নিয়ে শুধাল,
–“ও কে?”
–“আমার বউ।”
তৎক্ষনাৎ মাহিনের থেকে সহজ জবাব ভেসে আসল। আশ্চর্য হলো সকলে। আমরা কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পরক্ষণেই আমার ওষ্ঠ জোড়া সামান্য প্রসারিত হলো। এগিয়ে গেলাম মেয়েটির দিকে। মৃদু হেসে মাহিনের উদ্দেশ্য বললাম,
–“তোমার বউ! হঠাৎ এভাবে বিয়ে করে বউ নিয়ে আসলে? দেখি নতুন জা’কে!”
চলবে,,,,,,,
Share On:
TAGS: জান্নাত মুন, জাহানারা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জাহানারা পর্ব ২৫+২৬
-
জাহানারা পর্ব ৭৩
-
জাহানারা পর্ব ১১+১২
-
জাহানারা পর্ব ৬১+৬২
-
জাহানারা পর্ব ৮০
-
জাহানারা পর্ব ২৭+২৮
-
জাহানারা পর্ব ৬৯
-
জাহানারা পর্ব ৫৩+৫৪
-
জাহানারা পর্ব ২১+২২
-
জাহানারা পর্ব ১০