Golpo romantic golpo জল তরঙ্গের প্রেম

জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৩৯


#জল_তরঙ্গের_প্রেম

পর্ব সংখ্যা;৩৯

#লেখনীতে_নবনীতা_চৌধুরি

রিকশা চলার সাথে, সকালের ফুরফুরে বাতাসে দুলছে তরীর ওড়না। বেণি থেকে খসে পড়া কিছু এলো মেলো চুল বারে বারে উড়ে এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে তার নাক-মুখ। এ নিয়ে বেশ বিরক্ত তরী।

সে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে সেগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিচ্ছে। তার পাশে বসা তরঙ্গ ফুরফুরে মেজাজে চারপাশ অবলোকন করছে। এদিকটাতে আগে তেমন আসা হয়নি তরঙ্গের। জায়গা টা আবাসিক এলাকা টাইপ। নতুন করে বড় বড় ব্লিডিং উঠছে। অলরেডি দশ/বারো তলা কয়েকটা ব্লিডিং উঠে গেছে। সেগুলোর আবার ফ্ল্যাট বিক্রি হচ্ছে। মধ্য বয়স্ক রিকশা চালকটি পায়ে চালিত রিকশার প্যাডেলে ছন্দময় চাপ ফেলতে ফেলতে ঢালাই করা রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছে। সূর্যের তাপে ওনার কপালে জমেছে ফোঁটা ফোঁটা ঘামের বিন্দু। তবু থামছেন না তিনি। গাজীপুর শহরের উপকণ্ঠে একটি চার তলা বাড়ির সামনে এসে রিকশা টা থামলো।

রিকশা থামতেই পকেট থেকে একটা চকচকে একশো টাকার নোট বের করে চালকের দিকে বাড়িয়ে দিলো তরঙ্গ। ভাড়া রেখে বাকি টাকা ফেরত দিতেই বাঁধ সাধলো সে।

–” বাকি টাকা আপনি রেখে দেন মামা। এটা কিন্তু ফ্রি, ফ্রি দিচ্ছি না। আপনাদের বউমার নতুন সংসারের জন্য দোয়া করবেন। যাতে বাচ্চা – কাচ্চাতে ভরে উঠে তার ঘর দ্বোর।”

তরঙ্গের কথার ভঙ্গিমায়; লজ্জায় মাথা নুইয়ে নিলো তরী। রিকশা চালক মধ্য বয়সী লোকটি তরীর পানে এক পলক তাকিয়ে এক গাল হাসলো। পর পর তরঙ্গের দিকে তাকিয়ে মোলায়েম কণ্ঠ শুধালেন।

–” আম্মারে খুব ভালোবাসেন তাই না আব্বা?”

–” মেলা চাচা। তারে আমি ভুলতেই পারি না। কন দেহি কি জ্বালা।”

কথাটা শেষ করেই অট্টহাস্যে ফেটে পড়ল তরঙ্গ। হাসির দোলায় তার সমগ্র শরীর দুলে উঠল। তরী সেই হাসি মুগ্ধ চোখে অবলোকন করলো। পর পর নিচু কণ্ঠে আপন মনে আওড়ালো সে।

–” মাশাল্লাহ, আমার কলঙ্ক বিহীন চাঁদ।”

–” আল্লাহ্ আপনাগোরে হারাডা জীবন একলোগে রাহুক। এমনেই মিল মোহাব্বত থাকুক দুইজনার।”

–” আমিন, আমিন, আমিন।”

ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে তরীকে গেট দিয়ে প্রবেশ করতেই দারোয়ানের মুখোমুখি হলো। তরঙ্গ কে দেখতেই নিজের জায়গা ছেড়ে এগিয়ে এলেন বৃদ্ধ দারোয়ান। ওনাকে এগোতে দেখে হ্যান্ডশেক করার উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়ে দিলো তরঙ্গ। হ্যান্ডশেক শেষে পাশে দাঁড়ানো তরীকে দেখিয়ে বলে উঠলো সে।

–” আপনাদের বউমা চাচা। তরী উনি আজম চাচা।”

ভদ্রতার খাতিরে শীতল কণ্ঠে সালাম দিলো তরী।

–” আসসালামু অলাইকুম।”

–” ওয়ালাইকুম সালাম মা। তোমরা কি আজকেই বাসায় থাকতে আসছো তরঙ্গ?”

–” জ্বি চাচা। এখন যাই তাহলে অনেক কাজ আছে।”

–” আচ্ছা যাও। কিছু লাগলে বলিও আমাকে।”

–” আচ্ছা।”

কথোপকথনে ইতি টেনে তরীর হাত নিজের মুঠোয় পুরে নিলো তরঙ্গ। পুরোটা সিঁড়ি তরীর হাত ধরে; নিজেদের ফ্ল্যাটের সামনে এসেই তরীর হাত ছেড়ে পকেট হাতড়ে চাবি বের করলো সে। ফ্ল্যাটের তালা খুলে ভেতরে ঢুকলো দু’জনে। তরঙ্গ আগে আগে গিয়ে বারান্দার দরজা আর জানলা গুলো খুলে দিলো। ড্রয়িং রুমে পা রেখেই পুরো ফ্ল্যাটে চোখ বোলালো তরী। ড্রয়িং রুমটা মাঝারি মাপের। পাশেই গেস্ট রুম, তার সাথে কমন ওয়াশরুম, এরপরেই কিচেন। বেডরুম আর কিচেন একসাথেই। ধীর পায়ে কিচেনে এসে দাঁড়ালো সে। ওমা, কিচেনে যে কয়েকটা পাতিল, প্লেট, আর চাল, ডাল। বেডরুমে প্রবেশ করে বেশ অবাক হলো তরী।

মেঝেতে একটা তোশকে সুন্দর করে বিছানা চাদর, আর দুটো বালিশ পাতা। দুটো বসার টুল। একটা ছোট্ট আরএফএল এর ওয়ারড্রপ। জানলাতে ও পর্দা টানিয়েছে ছেলেটা? চমকে তরঙ্গের দিকে তাকালো তরী।

–” এতো কিছু কখন করলেন?”

কোমরে হাত চেপে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তরীর পানে চাইলো তরঙ্গ। পর পর অনুসন্ধানী কণ্ঠে সুধালো সে;-

–” কই কি করলাম?”

ফুঁপিয়ে উঠলো তরী। তার কান্না পাচ্ছে। তরঙ্গ এতো কেন ভালোবাসলো তাকে? তাকে বেশি ভালোবাসা মানুষ গুলো খুব দ্রুত হারিয়ে যায়। যেমন মা তাকে একা করে হারিয়ে গেছে। সে তরঙ্গ কে হারাতে চায় না। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এই পাগল ছেলেটাকে তার চাই ই চাই। তড়িৎ গতিতে ছুটে এসে তরঙ্গের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো তরী। তরী সমেত নিজেকে সামলাতে গিয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গেলো তরঙ্গ। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়েই তরী আওড়ালো;-

–” আপনাকে ভালোবাসি তরঙ্গ।”

তরীর বলা ভালোবাসি শব্দ টা কানে পৌঁছাতেই; তরঙ্গ অবাকের তোপে নিজের গালে দুটো থাপ্পড় মারলো। সে এতোই অবাক হয়েছে। যে তার মনে হচ্ছে, সে এই মাত্র সপ্তম আকাশ থেকে টপ করে পৃথিবীতে টপকেছে।

–” আপনি কে মহাশয়া? আমি তো আপনাকে চিনি না। এতো কিউট তরীজান কে তো আমি ভালোবাসিনি। এই আপনার জ্বর টর হয়নি তো? মাথা ঠিক আছে? ডাক্তারের কাছে যাবেন।”

তরঙ্গের অতিরঞ্জিত নাটক দেখে তার পিঠে চিমটি বসালো তরী।

–” এবার কিন্তু ভালো হচ্ছে না তরঙ্গ!”

–” খারাপের কি হলো? আমার বেরসিক বউ আমাকে ভালবাসে বলেছে। তা শুনে আমি অবাক হয়ে এএএএ করে উঠলাম! এতে খারাপের কি হলো?”

তরী লজ্জায় নিজের মুখ লুকালো তরঙ্গের বুকে।

–” এই জন্যই আপনাকে কিছু বলতে চাই না।”

–” কিন্তু, আপনার সব গোপন কথা একমাত্র আমাকে শোনার অধিকার দিয়েছেন উপরওয়ালা! ব্যাডলাক মিসেস দেওয়ান।”

তরঙ্গের সাথে কথায় না পেরে তার বুক থেকে সরে এলো তরী। ঝুল ব্যালকনির দরজার নিকট এগিয়ে গিয়ে পা রাখলো ব্যালকনিতে। উষ্ণ মেঝেতে পা রাখতেই একরাশ রৌদ্দুর এসে তরীকে রৌদ্র স্নান করিয়ে দিলো। মিষ্টি হেসে সামনের দিকে তাকালো সে। কি সুন্দর লাগছে চারপাশের আকাশচুম্বি দালান গুলোকে। তরঙ্গ ও এসে তার বউয়ের পাশে দাঁড়ালো। মুখটা ছোটো বাচ্চাদের মতো করে তরীর আচঁল টেনে ধরলো।

–” খিদেতে প্রাণ উষ্ঠাগত। আপনার কি আপনার স্বামীর ক্ষণয় স্থায়ী রাজপ্রাসাদ দেখা হয়েছে? তবে খেতে চলুন মহারাণী।”

–” কোথায় যাবেন খেতে?”

–” পাশেই একটা কাচ্চির হোটেল আছে। আপাতত ওখানেই খাবো। বড়লোক হলে কাচ্চি ডাইনে খাওয়াবো নে।”

********

খাওয়া দাওয়া শেষ করে ফের রিকশা নিলো তরঙ্গ।

উদ্দেশ্য দেওয়ান বাড়ি। বাসা যেহেতু পেয়ে গেছে। তাই এবার তিন্নিকে নিয়ে আসাটাই বেটার। এটাই সিদ্ধান্ত তরঙ্গের। মা, চাচি কেউই বাচ্চাটার ঠিকঠাক খেয়াল রাখবে না। উল্টো তরীর জন্য মন খারাপ করে শরীর স্বাস্থ্য খারাপ করবে তার বোন। রিকশা এসে গেইটের সামনে থামতেই ভয়ে জড়সড় হয়ে গেলো তরী। আজ আর নতুন করে ঝামেলা না হলেই হলো। তরঙ্গের হাত চেপে নিচু স্বরে বললো সে;-

–” আল্লাহর কসম লাগে তরঙ্গ। দয়া করে আজ কারো সাথে ঝামেলা করবেন না প্লিজ। আমি চাই না। আমার আর আমার বোনের জন্য আপনি সবার শক্র হয়ে যান।”

ফিচেল হাসলো তরঙ্গ। তরীর কপালে আলতো করে টোকা দিলো সে।

–” আমি কার ও শত্রু হবো না। যা সত্য, শুধু সেটুকুই তুলে ধরার চেষ্টা করছি। কিন্তু তোর অন্ধ গুষ্ঠি সেই সত্য দেখার ক্ষমতাটুকু ও হারিয়েছে। সত্য বলার অপরাধে যদি তোর বাপ – চাচার হাতে গুলি ও খেতে হয়, তবু আমি পিছু হটব না। নো টেনশন!”

তরীকে আশ্বস্ত করে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো দু’জনে। ড্রয়িং রুমে বসে টিভি দেখছেন সাহানারা আর বুশরা। সোফায় আধ শোয়া হয়ে শুয়ে আছে সাহানারা। শরীর এখন আগের থেকে একটু সুস্থ। তবুও, মাথা ঘোরানোর জন্য দাঁড়াতে পারছেন না। শরীর খুবই দুর্বল। কেউ কি কল্পনা করে ছিলো? যে কেবল ছেলে বাড়ি ছাড়াতেই শক্ত পোক্ত সাহানারা এমন দুর্বল হয়ে পড়বেন? নিজের কঠিন রূপ ছেড়ে শয্যাশায়ী হবেন! টিভি থেকে চোখ সরিয়ে দরজায় দাঁড়ানো তরঙ্গ কে দেখতেই চিৎকার করে উঠলেন সাহনারা।

–” তরঙ্গ আব্বা। আব্বা তুমি আসছো? আমার আব্বা।”

ক্লান্ত দেহ টেনে হিঁচড়ে তরঙ্গের সামনে এসে দাঁড়ালেন সাহানারা। এইটুকু পথ আসতে গিয়েই দু’বার হোঁচট খেয়েছেন তিনি। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে কেঁদে ফেললেন সাহানারা।

–” ও বাপ, বাপ গোওও। তুমি আমার উপর রাগ করে তোমার বাড়ি ছাড়লা কেন। আমি আমার বাপের বাড়ি চলে যাবো। তুমি তোমার বাড়ি ফিরে আসো আব্বা।”

মায়ের এমন অবস্থা দেখে চোখ লাল হয়ে উঠলো তরঙ্গের। কণ্ঠ রোধ হয়ে এলো তার। কথা বলতে গিয়ে বুঝলো গলার মধ্যে কেউ ভারি একটা পাথর বসিয়ে দিয়েছে। শব্দ গুলো সব গলাতেই আটকে যাচ্ছে। জিভ গলিয়ে উচ্চারণ করতে পারছে না। বহু কষ্টে নিজেকে সামলে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজালো। মাকে আগলে ধরে সুধালো সে।

–” আমি এখন বাড়ি ফিরবো না মা। সবার ভালোর জন্য। আমাদের কিছুদিনের জন্য দূরে থাকাই ভালো হবে।”

–” এসব কি বলছিস তুই?”

–” হ্যাঁ, আমি আজ তিন্নি কে নিতে এসেছি।”

–” তুমি তোমার স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি ছেড়েছো। কিন্তু আমার ছোটো মেয়ে কে নিয়ে যাওয়ার কোনো অধিকার তোমার নেই।”

#চলবে

( প্রিয় পাঠক মহল,

কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু! গল্প পড়ে রেসপন্স আর মন্তব্য না জানালে পরবর্তী পর্ব পাবেন না। যতো বেশি রেসপন্স করবেন ততো জলদি গল্প পাবেন,ইনশাল্লাহ।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply