#জল_তরঙ্গের_প্রেম
পর্ব সংখ্যা;৩৭
#লেখনীতে_নবনীতা_চৌধুরি
অক্টোবরের সকাল থেকেই কুয়াশার অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় ধরনীতে। আজ ও তার ব্যতিক্রম নেই।
হোটেলের চারপাশ ধোঁয়াশা হয়ে আছে কুয়াশার আস্তরণে। চারিদিকে কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে প্রকৃতি। সকাল সাড়ে সাতটা বাজছে। ঘড়ি না দেখলে কেউই বিশ্বাস করবে না। এদিকটাতে গ্রাম্য সাইড হওয়াতে পাখির কিচিরমিচির শব্দ শোনা যাচ্ছে। পাখির ডাকে তরঙ্গের ঘুম ভেঙে গেলো। দু’হাতে চোখ ডলে কোমরের কাছটাতে আরেকটু কম্পোটার টেনে নিলো সে। চোখে আলোর খানিক ছটা পড়তেই অন্যদিকে কাত হয়ে শুলো। তবুও আগের মতো আর গাড়ো হলো না চোখের ঘুম। উপায় না পেয়ে অলস দেহে উঠে বসলো তরঙ্গ। পাশে তরীকে না পেয়ে ওয়াশরুমের দরজার দিকে তাকালো সে।
দরজার বাইরে থেকে ছিটকিনি দেওয়া। চোখ ঘুরিয়ে ব্যালকনির দিকে তাকালো তরঙ্গ। ব্যালকনির দরজা খোলা। রুমে হু, হু করে দক্ষিণা বাতাস ঢুকছে দরজা দিয়ে। বাতাসের তালে হোটেলের জানলাতে টানানো সাদা পর্দা গুলো উড়ছে। মিটি মিটি হেসে; মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি এঁটে এক লাফে বিছানা থেকে নেমে পড়লো ছেলেটা। ব্যালকনির দরজায় এসে দাঁড়ালো তরঙ্গ। উদোম শরীরে অলস ভঙ্গিতে আড়মোড়া ভেঙে; নিঃশব্দে তরীর ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াল তরঙ্গ। ভোরের কোমল আলো গাছের পাতার ফাঁক গলে দু’জনের গায়ে এসে পড়ছে। একরাশ নিস্তব্ধতা বিরাজমান ঝুলন্ত ব্যালকনি ঝুড়ে। হঠাৎ, পেছনে কার ও উপস্থিতি টের পেয়ে ঘুরে তাকাতে উদ্যত হলো তরী।
কিন্তু সে সুযোগ দিল না তরঙ্গ। পুরুষালি আড়ষ্ট হাত জোড়া বাড়িয়ে তরীর মেদহীন কোমর খানা আঁকড়ে ধরলো সে। পর পর, নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো মেয়েটাকে। পরিচিত উষ্ণ স্পর্শে মুহূর্তেই কেঁপে উঠল তরী। শীতল ভোরের দক্ষিণা হাওয়ার সাথে, অদৃশ্য উষ্ণ স্রোত বয়ে গেল তার সমগ্র সত্তা জুড়ে। বুকের গহীনে বয়ে গেলো প্রশান্তিময় অব্যক্ত এক ভালো লাগার পরশ। অতঃপর সেই ভালো লাগার পরশ নিঃশব্দে ছুঁয়ে গেল তরীর মন – মস্তিষ্কে। তরীকে এমন ছটপট করতে দেখে তরঙ্গ নিজের থুতনি চাপলো তরীর কোমল ঘাড়ে। তরঙ্গের সূক্ষ্ম বের্য়াডের খোঁচা লাগতেই নড়ে চড়ে উঠলো তরী। কনুই দ্বারা সল্প বিস্তর ধাক্কা দিলো তরঙ্গের বুকে।
–” ইশশ, খোঁচা লাগছে আমার।”
তরীর গালে চুমু খেলো তরঙ্গ। চোখ দুটো আধ বোজা রেখেই ঘুম জড়ানো কণ্ঠে মৃদু স্বরে বলল সে;-
–” জামা – কাপড় কিছু যে আনিসনি কেন! আমার গুলো পরার ধান্দা করেছিস নাকি!”
তরঙ্গের তীক্ষ্ণ ঘুম ঘুম কণ্ঠ কানে পৌঁছাতেই ওষ্ঠ জোড়া তির তির করে কেঁপে উঠলো তরীর। উপরের ওষ্ঠ দিয়ে নিচের ওষ্ঠ চেপে ধরলো সে।
–” ছিঃ না। আমি তা কখন বললাম।”
–” ইন্ডাইরেক্টলি তো তাই বোঝাচ্ছিস। জানিস ই তো, আমি মাশাল্লাহ ব্রিলিয়ান্ট। সব মুখে বলে দিতে হয় না আমাকে।”
ভেঙচি কাটলো তরী। ঘুরে তরঙ্গের বুকের কাছের র্টি-শার্ট মুঠোয় পুরে ভ্রু কুঁচকে নিলো সে। সুযোগ পেয়ে, তরঙ্গ ও নিজের দু’হাতের বাঁধনে পেঁচিয়ে ধরলো তরীকে। শক্ত বলিষ্ঠ হাত জোড়া দড়ির মতো করে রেলিংয়ের পেছনে নিয়ে রাখলো। পর পর হাস্কিং স্বরে আওড়ালো সে।
–” একটু আগে কি বললি? হোয়াট বিদ্যা?”
ঢোক গিললো তরী,
–” এটাকে মেধা বলে না। জ্যোতিষ বিদ্যা বলে।”
–” হোয়াট বিদ্যা?”
তরঙ্গের মুখ ভঙ্গি দেখে ঠোঁট চেপে মুচকি হাসলো তরী। অতঃপর জবাব দেওয়ার ভঙ্গিতে সুধালো সে।
–” যা পৃথিবীতে নেই। তাও হাতের তালু দেখে খুঁজে, খুঁজে বের করাই হলো জ্যোতিষ বিদ্যা। আপনি ও এখন তাই করছেন।”
–” এক্সকিউজ মি. ওসব বিদ্যা টিদ্যা নিয়ে ভাবার সময় তরঙ্গ দেওয়ানের নেই। যত্তসব কুসংস্কার।”
–” ধন্য হলাম। ছাড়ুন আমাকে।”
কথা না বাড়িয়ে তরীকে নিজের বাহু ডোর থেকে ছেড়ে দিলো তরঙ্গ। ছাড়া পেতেই রুমের দিকে পা বাড়ালো মেয়েটা। জানলার পর্দা গুলো সরিয়ে দিয়ে বাইরে তাকালো তরী। তরঙ্গ গিয়ে পুনরায় বিছানায় বসে পড়লো। রির্সোটটা গাজীপুরের গ্রাম্য সাইডে। কাল রাতে বহু কষ্টে খুঁজে বের করে ছিলো তরঙ্গ। অবশ্য যে রাগ করে বাড়ি ছাড়তে পারে। তার কাছে এই সামান্য রির্সোট খুঁজে পাওয়া ও বড় বিষয় না। রির্সোটের প্রবেশ পথেই একটা ছোট্ট পদ্ম পুকুর আছে। তার পাশেই আম গাছে দোলনা ঝোলানো। পুকুরে ফুটন্ত পদ্ম গুলোর দিকে তাকিয়ে; শান্ত স্বরে তরী প্রশ্ন করলো।
–” বাড়ি তো ছেড়ে চলে এলেন। এইবার থাকবো কোথায় আমরা?”
তরীর প্রশ্নে বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে পড়লো তরঙ্গ। কঠিন চোয়ালে, অ-ঘূর্ণায়মান ফ্যানের দিকে তাকিয়ে ভাবুক ভঙ্গিতে জবাব দিলো সে।
–” প্রয়োজনে গাছ তলায় থাকবো। তবুও আর বাড়ি ফিরে যাবো না।”
********
প্রতিদিনের তুলনায় আজ দেওয়ান বাড়ির রান্নাঘরের চিত্র ভিন্ন। তরীর পরিবর্তে আজ বুশরা আর প্রতিদিনের সকালের কাজ করে দেওয়া মেয়েটা রান্না ঘরে উপস্থিত।
সাহানারা কাল রাত থেকে অসুস্থ। হাতে ক্যানাল ফিট করা; স্যালাইন চলছে। তরঙ্গ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবার পর পর ই তিনি অজ্ঞান হয়ে গিয়ে ছিলেন। আধা ঘন্টা পেরোনোর পর ও জ্ঞান ফেরার বদলে দাঁতে দাঁত লেগে যাওয়ার কারণে ফোরকান দেওয়ান ডাক্তার কে কল করে ছিলেন। অতঃপর, রাত সাড়ে দশটায় ডাক্তার এসে দেখে গিয়ে ছিলেন সাহানারাকে। চিন্তার কোনো কারণ নেই। শরীর দুর্বল হওয়ার কারণে হঠাৎ শক পাওয়াতে অজ্ঞান হয়ে গেছে। কিছু ওষুধ আর স্যালাইন দিয়ে উনি ফিরে গিয়েছিলেন।
ব্যস্ত হাতে কপালের ঘাম মুছে রুটি তাওয়ায় তুলে দিলেন বুশরা। বিরক্তিতে গা পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে ওনার। এইসব হচ্ছে সাহানারার জন্য। বেশি বাড়াবাড়ি করে মেয়েটার পিঠে ছ্যাঁকা না দিলে আজ এই দিন দেখতে হতো না। ভোর সকালে উঠে ও বাড়ির ঝি ঘিরি করতে হতো না ওনাকে। নিজের মনে মনে কথা গুলো আওড়াতে, আওড়াতে চুলো থেকে তাওয়া নামিয়ে চায়ের পানি বসালেন বুশরা। চোখ ঘুরিয়ে মঝেতে বসে তরকারি কাটতে থাকা টুনটুনির দিকে এক বার তাকালেন তিনি। অতঃপর বিরক্ত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলেন।
–” তরকারি কাটছিস নাকি আমার গুষ্ঠি উদ্ধার করছিস? একটু পর যে তোর সাহেবরা অফিসে চলে যাবেন। তা কি ভুলে গেছিস?”
বুশরার ধমকে চোখ তুললো টুনটুনি। বয়স কতো হবে! এই বাইশ, তেইশ। ঠোঁটে কৃত্রিম রঙে ঠাসা। চোখে ও লাল টকটকে আইশেডো মেখেছে। পরণের জামাটার রঙ কটকটে সবুজ। ওড়নাটা ও লাল। সব মিলিয়ে অদ্ভুত সাজ পোশাক মেয়েটার। দাঁতের কপাটি খুলে হেসে ফেললো সে।
–” এতো টেশুন করুন কেন খালা? টুনটুনি আছো না। সব টামের আগেই হইয়া যাইতুন।”
টুনটুনির ভুল উচ্চারণ পূর্ণ কথা গুলো শুনতেই দ্বিগুণ রাগ উঠে গেলো বুশরার। রাগী চোখে খুন্তি উঁচিয়ে ধমকালেন তিনি।
–” একদম এই ভাষায় কথা বলবি না। এসব কেমন ধরণের কথাবার্তা।”
বুশরাকে খুন্তি উচাতে দেখে তড়িঘড়ি করে বঁ*টি হাতে দাঁড়িয়ে পড়লো টুনটুনি। বুশরার থেকে দ্বিগুণ হুংকার ছাড়লো সে।
–” এই টুনটুনিরে এক্কেরে তরী আপা ভাবুন নাই। মুই কিন্তু নট চুপ থাকুম। এক্কেরে কু*পা*ই, কাঁ*ই*ট্টা লামু। আমারে ছুঁইবার ও কথা ভাবপেন না।”
নিজের কথা শেষ করে মরা কান্না জুড়ে দিলো টুনটুনি। বঁ*টি টা মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে ড্রয়িং রুমের দিকে ছুট দিলো মেয়েটা।
******
প্রতিদিনের মতো সকাল বেলা উঠেই সংবাদপত্র পড়ছেন ফারহান দেওয়ান। উনার সামনে খালি চা-য়ের কাপ রাখা। যা মিনিট পাঁচেক আগে তিনি পান করে ছিলেন।
রান্না ঘর থেকে ছুটে এসে ফারহান দেওয়ানের পায়ের কাছে মেঝেতে বসে পড়লো টুনটুনি। দু’হাতে ফারহান দেওয়ানের পা চেপে ধরে ঠুকরে কেঁদে উঠলো সে।
–” ও খালুজান গোওও। আম্নেরা দেহি খু*নি বউ লইয়া সংসার করতাছেন। তাইনরা দেহি হগ্গলরে হুইড়া মারবার লাগি উইডা পইড়া লাগছে। তরী আপারে বাড়ি ছাড়া কইরা। এহন আমারে ও হুইড়া লাইতেছে গোওও।”
আচমকা টুনটুনিকে এভাবে হুড়মুড়িয়ে এসে মেঝেতে পড়ে হাউ – মাউ করে কাঁদতে দেখে অবাকের তোপে হা হয়ে গেলেন ফারহান দেওয়ান। কিছু বলার জন্য মুখ খুলবেন তার আগেই বুশরা ও ছুটে এলো হন্তদন্ত পায়ে। স্বামীর নিকট এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বুশরা বলে উঠলেন।
–” একদম এই মেয়ের কথা বিশ্বাস করবে না। এক নাম্বারে হাড়ে বজ্জাত। ঠিক মতো কাজ না করে। সেই কখন থেকে পাগলের প্রলাপ বকছে।”
দীর্ঘ শ্বাস চাপলেন ফারহান দেওয়ান। সত্যিই নিত্যদিনের এই ঝামেলা আর সহ্য হচ্ছে না ওনার। নিয়ম করে, সকাল বিকাল এ ওর সঙ্গে ঝামেলা করছে। এ ও কে আঘাত করছে। বাড়িটা রীতিমত অশান্তির আখড়া হয়ে গেছে। গম্ভীর কণ্ঠে সুধালেন তিনি;-
–” এতো নিচে নেমে গেছো বুশরা? বাইরের মানুষ কে ও ছাড় দিচ্ছো না তোমরা। যাকে তাকে মারতে আত্মঘাতী হয়ে উঠছো।”
ফারহান দেওয়ানের কথায় ওড়নায় মুখ লুকিয়ে হাসলো টুনটুনির। ফের কান্নার মাত্রা বাড়িয়ে দিলো সে।
–” আমার কেউ নাই বইলা এমন অত্যাচার করবার পারবো? আম্নেই কন খালু জান।”
–” তুই যা টুনটুনি। কাজ কর। বাড়তি কথা বলিস না। বুশরা তুমি ও যাও। আমি বেরোবো একটু পর। নাশতা দাও।”
স্বামীর গম্ভীর কণ্ঠের বিপরীতে তর্ক করতে পারলেন না বুশরা। গজ গজ করতে করতে খুন্তি হাতে রান্না ঘরে চলে গেলেন তিনি। চোখের চশমা খুলে, চোখে হাত বুলালেন ফারহান দেওয়ান। সোফায় পিঠ এলিয়ে দিয়ে ছাদের দিকে তাকালেন তিনি। জীবনে শুনে ছিলেন ভাগ্যবানের বউ মরে। অভাগার মরে গরু। কিন্তু ওনার বউ মরে তো কপাল পুড়েছে। লোকে বরাবর ভুল কথা গুলোই গলা উঁচিয়ে আওড়ায়।
( প্রিয় পাঠক মহল,
এতোদিন গল্প না দেওয়ার জন্য দুঃখিত। আর ইনশাল্লাহ, এবার থেকে জলদি গল্প দেওয়ার চেষ্টা করবো। রিচেক দেইনি। কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু।)
Share On:
TAGS: জল তরঙ্গের প্রেম, নবনীতা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৩৮
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ২৩
-
She is my Obsession পর্ব ১৯
-
She is my Obsession পর্ব ৩১
-
She is my Obsession পর্ব ১০
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১
-
She is my Obsession পর্ব ১৩
-
She is my Obsession পর্ব ৩
-
She is my Obsession পর্ব ১৭
-
She is my Obsession পর্ব ২৮