#জল_তরঙ্গের_প্রেম
পর্ব সংখ্যা;৩৬
#লেখনীতে_নবনীতা_চৌধুরি
নিঝুম রাত কতজনের কতো দুঃখের সাক্ষী হয়। তবে সেই রাত আজ এক জোড়া শালিকের সুখের সাক্ষী হওয়ার নিমিত্তে উতলা হয়ে আছে।
সময় পেরোতে লাগলো নিজের নিয়মে। তরী তবুও তরঙ্গ কে ছাড়ালো না। এদিকে দেরী হয়ে যাচ্ছে। রাত বাড়লে আর হোটেল পাওয়া যাবে না। উপায়ান্তর না পেয়ে তরীর চুলের ভাঁজে আলতো হাত চালালো তরঙ্গ। মিহি কণ্ঠে সুধালো সে।
–” এতোদিনে বুঝি আমার বুকে মাথা রাখতে ইচ্ছে হয়েছে তোর?”
–” কেন?”
–” এই চার বছর ধরে একবার ও কি আমার প্রশস্ত বুকটা কাঁদবার জন্য দেখিসনি?”
তরঙ্গের অভিমানী সুর কানে পৌঁছাতেই নাক টানলো তরী। আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ছেলেটাকে। যেন তরঙ্গের চার বছর ধরে মরুভূমিতে পরিণত হওয়া হৃদয়ে আজ বৃষ্টি রূপে বর্ষিত হয়ে তার সব আক্ষেপ গুছিয়ে দিবে সে। তরীর এহেন বাচ্চামোতে তরঙ্গ ও স্বায় দিলো।
–” আপনি আমাকে কেন বোঝেন না তরঙ্গ? সব সময় কেন ভুল বোঝেন?”
তরঙ্গ হাসলো, ক্লান্ত, মলিন চোখ-মুখ ও তার হাসির সৌন্দর্য একটু ও কমাতে পারলো না। তরীকে সে ও ঝাপ্টে জড়িয়ে ধরলো বুকের সাথে।
–” আমি তোকে বুঝি না বুঝি?”
–” কই বুঝলেন? বুঝলে কি আর এখন নিজের খারাপ শরীর নিয়ে যুদ্ধ করতে ঢাল, তরোয়াল গোছাতেন? প্লিজ, বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত টা বাদ দিন।”
তরীর কথায় মুখ গম্ভীর হয়ে এলো তরঙ্গের। গমগমে কণ্ঠে জবাব দিলো সে।
–” তুই আমাকে বুঝিস নাকি? বুঝলে এমন আজাইরা আবদার করতি না।”
–” বুঝি বলেই নিষেধ করছি এসব করতে?”
–” বুঝলে এটা কেন বুঝিস না! যে তোর কষ্টে আমার ও কষ্ট হয়। তোকে কেউ কিছু বললে আমার বুক পুড়ে। পিঠে ছ্যাঁকা দিয়েছে তোর। কিন্তু কষ্ট হচ্ছে আমার।”
জবাব না দিয়ে, তরঙ্গের বুক থেকে সরে এলো তরী। তরঙ্গ ও সোজা হয়ে দাঁড়ালো। কুঁচকে যাওয়া র্টি-শার্টটা ঠিক করে; তরীর ওড়নাটা মেঝে থেকে তুলে রাখলো তার ঘাড়ে।
–” বাই দ্য ওয়ে, কালো টিপ পরেছিস কেন?”
ভ্রু-কুঁচকে তরীর কপালের দিকে তাকিয়ে আছে তরঙ্গ। তা দেখে অজান্তেই নিজের হাত কপালে উঠে এলো তরীর। অবাক কন্ঠে প্রশ্ন করলো সে।
–” এতোক্ষণ বৃষ্টিতে ভেজার পর ও টিপটা উঠে যায়নি?”
তরীর প্রশ্নে ফিচেল হাসলো তরঙ্গ। টিপটা কপালের মাঝ বরাবর এনে আওড়ালো সে।
–” তোর কপালের টিপটা মূলত আমি। চার বছর ধরে এতো অপমান, অবহেলার পরে ও আমি যেমন তোকে ভালোবাসা ছাড়িনি। তেমন এতো ঝড় – বৃষ্টির পর ও টিপটা তোর কপাল থেকে যায় নি।”
–” সব কথায় নিজেকে টানেন কেন, হ্যাঁ?”
–” যা সত্যিই তাই তো বললাম। অবশ্য, তোর গুষ্ঠির তো সহন ক্ষমতা কম। সত্যি শুনলেই স্মৃতি শক্তি লোপ পায়। তুই ও তার ব্যতিক্রম না। শালা আমার কপালটাই খারাপ।”
বিরক্তি হয়ে ঘুরে দাঁড়ালো তরী। যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই তরঙ্গ তার কনুই চেপে ধরলো। নিমেষেই হেঁচকা টানে নিজের শক্ত পোক্ত বুকের কাছে এলো মেয়েটাকে। তরঙ্গের এহেন আচরণে যারপরনাই অবাক তরী। একটু লাই না দিতেই মাথায় উঠে নিত্য করছে বদ টা। তরঙ্গের কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার বুকের মাঝ বরাবর কনুই দিয়ে ক্ষিপ্ত ক্ষতিতে আঘাত করলো তরী। নিজেকে ছাড়িয়ে সরে এলো খানিকটা দূরে। কনুইয়ের গুঁতো খেয়ে বুকে হাত চেপে কিঞ্চিত পিছিয়ে গেলো তরঙ্গ।
–” কি গুন্ডা বউ বিয়ে করলাম এটা?”
–” করেছেন কেন বিয়ে? কেউ মাথার দিব্যি দিয়ে ছিলো নাকি?”
–” হ্যাঁ, আমার অনাগত সন্তানেরা।”
তরঙ্গের কথায় থ হয়ে গেলো তরী। হা করে কিছুক্ষণ ছেলেটাকে দেখে উল্টো ঘুরে হাঁটা দিলো সে। এই হাঁটুর বয়সী, আধ পাগল তরঙ্গের সাথে কথা বলে লাভ নেই। সে অন্তত এই ছেলের সাথে ঝগড়ায় জিততে পারবে না। এতো বছরে জিততে পারেনি। আজ তো বিলাসিতা। তরীকে যেতে দেখে উচ্চস্বরে সুধালো তরঙ্গ।
–” তোমার কপালে কালো টিপ মানায় না তরী জান। তোমার কপালে তো চন্দন বীজের মতো টকটকে লাল টিপ মানায়। শ্যামা কপালটাতে একখন্ড লাল টিপ আমাকে চিহ্ন বিচ্ছিন্ন করতে যথেষ্ট বউ।”
তরঙ্গের কণ্ঠ কানে পৌঁছাতেই লাজুক হাসি ফুটে উঠলো তরীর ওষ্ঠ জুড়ে। কোমল হেসে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলো সে। তরঙ্গ ফের নিজের কাছে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।
*******
বাবা – মায়ের রুমে দাঁড়িয়ে আছে তরঙ্গ। কাঁধে তার গিটার আর ভার্সিটির ব্যাগটা।
–” আমি আর এই বাড়িতে থাকবো না, বাবা!”
ছেলের কথায় বিশেষ চিন্তিত হলে না ফোরকান দেওয়ান। বিরস মুখে মেঝের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন তিনি।
–” কোথায় যাবে তুমি?”
–” যেই বাড়িতে আমার বউয়ের পিঠ পুড়িয়ে দেওয়ার মতো নির্মম নির্যাতন করা হয়। এবং তার বিচার হয় না। সেই বাড়িতে অন্তত থাকবো না।”
ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে ছেলের কথা শুনতেই দপ করে সোফায় বসে পড়লেন সাহানারা। ছলছল চোখে অপলক তরঙ্গের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। নিজের কানকে বিশ্বাস করতেই যেন কষ্ট হচ্ছে ওনার। এই সামান্য বিষয়ে ছেলেটা বাড়ি ছেড়ে দিবে? ওনার এতো ভালোবাসা দেখলো না ছেলেটা। চোখ ফেটে অশ্রু বিসর্জন হলো সাহানারার। তরঙ্গ বাবার থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে মায়ের দিকে তাকালো। কয়েক পা এগিয়ে এসে মায়ের সামনে দাঁড়ালো সে। মেঝেতে হাঁটু গেড়ে মায়ের হাত জোড়া নিজের মুঠোর মাঝে নিয়ে বসলো তরঙ্গ।
–” তুমি মা হিসেবে খুব ভালো আম্মু। আমার সাথে কখনো খারাপ ব্যবহার করোনি। কখনো কষ্ট পেতে দাওনি।”
নিজের কথা অর্ধেক শেষ করে তরঙ্গ থামলো। ঝুঁকে চুমু খেলো মায়ের হাতের উপর পৃষ্ঠে। ছেলের ভালোবাসাময় স্পশে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো সাহানারার গাল বেয়ে। নিজের হাতে শীতল অস্তিত্ব অনুভব হতেই মায়ের মুখের দিকে তাকালো তরঙ্গ। নিঃশব্দে কাঁদছে সাহানারা। মুচকি হাসলো তরঙ্গ।
–” তুমি আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসো না মা? আমার জন্যই তো এমন করছো তরীর সাথে। তাহলে তোমার শাস্তি হবে আমাকে কষ্ট পেতে দেখা। অনেক সহ্য করেছি। মা বলে ছাড় দিয়েছি আর না। তুমি দিন দিন সীমা অতিক্রম করে আসামী হয়ে উঠছো।”
নিজের কথাতে ইতি টানলো তরঙ্গ। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গটগট পায়ে প্রস্থান করলো সে।
*******
বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে বিকেলের শুকিয়ে আনা জামা কাপড় গুলো ভাঁজ করে কার্বাডে তুলে রাখছে তরী। তিন্নি ঘুমিয়ে পড়েছে।
তখন নিচে থেকে এসে, ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বিছানায় শুয়ে পড়েছিলো সে। তখনি ঘুমিয়ে পড়েছিলো। তরী আর ডাকেনি। ভেবেছে একেবারেই খাবার সময় উঠিয়ে খাইয়ে আবার শুইয়ে দিবে। এমন সময় তরঙ্গ প্রবেশ করলো। তরীর দেকে তাকিয়ে তিন্নির পাশে এসে বসলো সে। বোনের মাথায় আলতো হাতে বিলি কেঁটে ডাকলো সে।
–” টেমা? টেমা? উঠবি একটু?”
দু’বার ডাকতেই নড়ে চড়ে শুলো তিন্নি। চোখ ডলে পুনরায় ঘুমিয়ে পড়লো সে। ধৈর্য্য ধরে তিন্নিকে ঘুম থেকে তুললো তরঙ্গ। ঘুম ঘুম র*ক্তি*ম চোখে উঠে বসলো তিন্নি। হাই তুলে তরঙ্গের দিকে তাকাতেই বোনকে নিজের কোলের দিকে টেনে নিলো তরঙ্গ। বাচ্চাটার মাথার সাথে নিজের গাল চেপে ধরে মিহি কণ্ঠে বলতে শুরু করলো সে।
–” ভাইয়া এখন তোকে কিছু কথা বলবো টেমা। তুই মনোযোগ দিয়ে শুনবি কেমন?”
চোখ ডলতে ডলতে “আচ্ছা” বললো তিন্নি।
–” আমি তোর আপুকে নিয়ে কয়েকদিনের জন্য একটু বাড়ির বাইরে যাবো। তোকে এখন সাথে নিতে পারবো না টেমা। ভাইয়া একটু বাসাটা ঠিক করে নেই। তোকে ও নিয়ে যাবো কেমন?”
ভাইয়ের কথায় ঘুম পালালো তিন্নির চোখ থেকে। মাথা উঁচিয়ে তরঙ্গের মুখের দিকে তাকালো সে। কথাটা শুনতেই বাচ্চা মুখটা শুকিয়ে একদম এইটুকুন হয়ে গেলো। তরঙ্গ চুমু খেলো বোনের মাথায়।
–” ভাইয়ার কথা রাখবে না টেমা??”
–” রাখবে ভাইয়া।”
লাফিয়ে উঠে, তরঙ্গের গলা জড়িয়ে ধরলো তিন্নি। মুচকি হেসে তরঙ্গ বোনকে আগলে ধরলো।
*******
অতঃপর, সকল বাঁধন চিহ্ন করে। নিজের একমাত্র ভালোবাসাকে বুকে নিয়ে দেওয়ান বাড়ি ছাড়লো তরঙ্গ দেওয়ান। এই চব্বিশ বছরের জীবনে; সব সম্পর্কের উপর স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কেই বড় করে রাখলো সে। ছেলেটা পাগল ই বটে! না হলে এতোটা ভালোবাসতো কেন তরীকে??
( প্রিয় পাঠক মহল,
আমি হসপিটালে আছি। আজ সারাদিন ছুটোছুটি করেছি। এখনো ছুটছি। ডক্টরের আপয়েনমেন্ট, ওষুধ সব কিছু নিয়ে খুবই ব্যস্ত। আপনাদের প্রার্থনায় রাখবেন প্রিয়রা। আর আম্মু হসপিটালে ভর্তি। আমি আলহামদুল্লিলাহ ঠিক আছি। রিচেক দেইনি, গল্প কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু!)
Share On:
TAGS: জল তরঙ্গের প্রেম, নবনীতা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
She is my Obsession পর্ব ১০
-
She is my Obsession পর্ব ৩৩
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৩২
-
She is my Obsession পর্ব ৪
-
জল তরঙ্গের প্রেম গল্পের লিংক
-
She is my Obsession পর্ব ১৬
-
She is my Obsession পর্ব ২৫
-
She is my Obsession পর্ব ১৭
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১১
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১৪