চেকমেট_২
সারিকা_হোসাইন
সূচনা_পর্ব
গায়ে জড়ানো লম্বা গাউন দুই হাতে উঁচিয়ে দৌড়ে চলেছে তরুণী।অন্ধকার অমৃসন পথ,কাটালো ঝোপঝাড় আর শুকনো পাতার মরমর ধ্বনি ভেঙে প্রাণপণে ছুটে চলেছে সে।চারপাশে ঘুটঘুটে কালো অন্ধকার আর ঝাপসা কুয়াশা।
মেয়েটির নীল চোখ জোড়ায় আকাসম ভয়।ফর্সা চিবুক জুড়ে মুক্তা দানার ন্যয় ঘর্ম বিন্দুর আধিপত্য।চুলগুলো আলুথালু।কম্পিত ফিনফিনে পাতলা গোলাপি ঠোঁট।ঠিক মতো শ্বাস টানতে না পেরে গর্ত হয়ে যাচ্ছে কণ্ঠনালীর ভাঁজ।
এই বুঝি পেছনের মানুষটা তাকে ধরে ফেললো।পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে এক পলক হিংস্র মানবকে দেখে পুনরায় দৌড়ে চললো সে।কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না।কিছুর সাথে বেঁধে মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়তে নিলো সে।কিন্তু তার আগেই দুটো শক্ত পুরুষালি হাত তার উদর জড়িয়ে ধরলো।বন্দি করলো শক্ত বন্ধনে।অতঃপর বাঁকা হেসে মুখের উপরের লেপ্টে থাকা এলোমেলো চুল সরিয়ে নিজের একদম সন্নিকটে নিয়ে এলো তাকে।ভয়ে মেয়েটি চোখ খিচে বন্ধ করে ঘাড় ঘুরিয়ে ফেললো।মানুষটার অপছন্দ হলো মানবীর এই আচরণ।হিংস্র মানব আরেকটু প্রসারিত হেসে তার লালচে ঠোঁট জোড়া মানবীর গলার ভাঁজে ডুবিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠলো
“মাই লাভিং সানরাইজ”
ত্বরিত চোখ মেললো মেয়েটি।শীতল আবহাওয়াতেও তার পুরো শরীর ঘেমেনেয়ে একাকার।গায়ের মোটা ব্ল্যাংকেট ছুড়ে ফেলে বিছানায় বসে হাঁপাতে আরম্ভ করলো সে।অদ্ভুত ভয়ানক স্বপ্নের কথা মনে পড়তেই শ্বাস রোধ হয়ে এলো।হাতের উল্টোপিঠে গলার নীচে জমে থাকা ঘাম গুলো মুছে বিছানা থেকে নেমে বেলকনীর দরজা খোলে দিলো।বেলকনীর দরজা খুলতেই এক জোড়া খরগোশ আর একটা উলের সাদা মাফলার নিজ বেলকনিতে দেখে বেশ অবাক হলো রুদ্ররাজ কন্যা রোদসী অরোরা।ডাক নাম রোদ।মেয়েটি রোদের মতোই ঝলমলে,প্রণোচ্ছল, উজ্জ্বল আর কোমল।নামটা যেনো তার জন্যই সৃষ্টি হয়েছে।
রোদের নীল চোখ জোড়া বিস্ফারিত হয়ে নিবদ্ধ হলো তুষারের ন্যয় শুভ্র খরগোশ দুটোর উপর।কালো চোখের শুভ্র খরগোশ দুটি যেনো এক খন্ড বরফ যা রোদের খোলা বৃহৎ বেলকনিতে শীতলতা ছড়াচ্ছে।খরগোশের কানের উপরের সামান্য অংশ কালচে বাদামি।এটা বন্য খরগোশ।প্রকৃতির সাথে সাথে রঙ বদলানোর অদ্ভুত জাদুকরী ক্ষমতা আছে এদের।বেশ কয়েকবার রুদ্রের কাছে এই খরগোশ এর বায়না করেছে সে।কিন্তু রুদ্র হাজার চেষ্টা করেও খুঁজে পায়নি।প্রমিস করেছিলো বার্থডে আসার আগেই কোনো একদিন খরগোশ এনে তাকে চমকে দেবে।
রোদ ধরেই নিলো তার বাবা তাকে আঠারোতম জন্মদিনে সারপ্রাইজ দিতে খরগোশ দুটো নিয়ে এসেছে।সেই উচ্ছাসে খরগোশ দুটোকে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে বুকে জড়ালো রোদ, অতঃপর মাফলার খানা গলায় পেঁচিয়ে বাইরের প্রকৃতিতে চোখ বুলালো।প্রকৃতির শুভ্রতা ভয়ানক কালো স্বপ্নের কথা বেমালুম ভুলিয়ে দিলো তাকে।
বৃষ্টির ন্যয় ঝুরঝুর শব্দে ঝরে যাচ্ছে বরফের দানা।কি সুন্দর!কি শুভ্র!
এক হাতে খরগোশ দুটোকে বুকে জড়িয়ে ওপর হাত বাইরে মেলে ধরলো।মুহূর্তেই হাত ভরে উঠলো সাদা আবলুসে।শরীর শিউরে উঠলো শীতল অনুভূতিতে।
আজকের সকালটা অদ্ভুত রকম,ভয় আনন্দ দুইয়ের মিশ্রণ।কিন্তু ঘুম ভেঙেই এমন চমক পেয়ে তার মন প্রাণ দুই ই ভরে উঠলো।
রোদ খরগোশ দুটো নিয়ে বেলকনি ছেড়ে কক্ষে এলো এরপর বেরিয়ে এলো লিভিং রুমে।
কিচেনে রান্নার কাজ শুরু করেছে চুপকথা,রুদ্র জগিং থেকে ফিরেই ব্রেকফাস্ট সেরে হসপিটালে যাবে।মানুষটা সময়ের গরমিল একদম পছন্দ করেনা।সব কিছু নিয়ম মাফিক হওয়া চাই।
চুপকথার অত্যাধিক ব্যাস্ততার মাঝে গিয়ে খরগোশ দুটো নিয়ে মায়ের সামনে দাঁড়ালো রোদ।মেয়েকে এক পলক দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো সে।অতঃপর হাত ইশারায় শুধালো
“এই খরগোশ কোথায় পেলি তুই?
মায়ের এহেন ইশারায় কপাল কুঁচকে রোদ শুধায়
“বাবা আনেনি?
চুপকথা ঝটপট মাথা নাড়ায়।এমন সময় রুদ্র ফিরে আসে বাসায়।বরফে ঢেকে গেছে চারপাশ।শীতে বাইরে টেকা মুশকিল।শরীর আর আগের মতো শক্তপোক্ত নেই।বয়সের সাথে সাথে অল্প নুইয়ে পড়েছে।নয়তো সেদিনের সেই শক্তিশালী দাম্ভিক পুরুষ রুদ্ররাজ আজ অল্পতেই এমন হাঁপিয়ে উঠে কেনো?
“গুড মর্নিং মামনি,
রুদ্রের ভারী গলার আওয়াজে মা মেয়ে দুজনেই পেছনে তাকায়।রোদের কোলে খরগোশ দুটো দেখে রুদ্রের ভ্রু উঁচু হয়ে আসে।সে দৃঢ় পায়ে মেয়ের সম্মুখে এসে আঙ্গুল তুলে শুধায়
“এই বিলুপ্ত খরগোশ মাম্মা গিফট করেছে বুঝি?
রোদের সব কিছু কেমন তালগোল পাকিয়ে যায়।রুদ্র মাফলার স্পর্শ করে বলে
“নাইস নেক মাফলার, বাট তোমার মা কুশী কাটার কাজ কবে কবে শিখলো?এটা তো হতে বানানো!
চুপকথা মাথা নাড়লো।সে এসব কিছুই করেনি।রুদ্র বিস্মিত হলো।এরই মাঝে একটা খরগোশ ঝাঁপিয়ে পড়লো রোদের কোল থেকে।ডার্ক উডের মেঝেতে এদিক সেদিক গুটি গুটি পায়ে ছুটতে লাগলো সেটি।রুদ্র খেয়াল করলো খরগোশের পায়ে একটা কিছু বাধা।হিংস্র ঈগলের ন্যয় সেই খরগোশ ধরে পা থেকে ছাড়িয়ে নিলো তা রুদ্র।অতঃপর খুললো হলুদ রঙের কাগজ খানা।কাগজ খুলতেই কিছু টানা হাতের লিখা নজর কাড়লো
“I see you,even when you don’t…
I fell you,even when you’re far….
somewhere, quaitly…..
“Happy birthday dear sunrise…..
…… someone…….
চিঠির লিখা গুলো পড়ে রুদ্রের চোখের কোনে রক্ত জমলো।কেউ তার মেয়েকে ফুসলে চলেছে,এটা ভাবতেই শরীরের রক্তে টর্নেডো বইলো।এত বড় সাহস কার?তার বুকের পাটা এবং কলিজার আকার দুইই পরিমাপ করার জন্য আগ্রাসী হয়ে উঠলো সে।
স্বামীর মুখের অভিব্যক্তি দেখে ভয়ে শিউরে উঠলো চুপকথা।বহুদিন এই ভয়ানক চেহারা দেখা হয়নি।তবে আজ কেন?কি এমন লেখা আছে ওই রঙিন চিরকুটে?
মায়ের ভীত চোখ দেখে ভয়ে টলমল করলো রোদের চোখ।তার বাবার একটা পাশ খুব কোমল আরেকটা ভয়ংকর।সচরাচর সেই ভয়ংকর রূপটা প্রকাশ করে না রুদ্র।কিন্তু যখন করে তখন সামলানো দায় হয়ে পড়ে।
মায়ের ইশারায় খরগোশ ফেলে সটকে পড়লো রোদ।রুদ্র উন্মাদের ন্যায় পকেট হাতড়ে ফোন বের করলো।ফোনে রিচেক দিতে আরম্ভ করলো গত রাতের ক্যামেরা ফুটেজ।কোত্থাও কিচ্ছু নেই।রুদ্র দাঁত পিষে চোখ বুজে ফেললো।এই লিখা সে আগেও দেখেছে কিন্তু কোথায়?
চোখ বুজে পুরোনো স্মৃতি তালাশ করতেই মুখের রঙ পাল্টালো।চোখে মুখে অবিশ্বাস্য আভা ফুটে উঠলো।ঠোঁট কামড়ে কিছু ভাবলো রুদ্র।অতঃপর স্ত্রীকে আদেশ দিলো
“খরগোশ দুটো ওকে দিয়ে এসো।গিফট এসেছে এগুলো।
চুপকথা চমকিত ভয়ে খরগোশ দুটো নিয়ে ধীর পায়ে মেয়ের কক্ষের দিকে অগ্রসর হলো।রুদ্র তপ্ত শ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলে উঠলো
“তোমার ছেলের জন্য দু, দু’বার বাসা চেন্জ করলাম তবুও ঠিকানা পেয়েই গেলো।তোমার মতোই জেদি বানিয়েছো দেখছি ছেলেকে সারফরাজ শাহজাইন!তাই বলে হাতের লিখাটাও কপি!
সকালে আজকে আর ব্রেকফাস্ট খাওয়া হলোনা রোদের।রুদ্রের ভয়ানক চেহারা তার রূহ পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিয়েছে।বাবার একমাত্র আদরের কন্যা সে।কিন্তু শাসনের বেলায় রুদ্র ভুলে যায় আদর নামক বিশেষনের কথা।তখন গর্জন আর চোখ রাঙানো ভূমিকম্পের ন্যয় কাঁপিয়ে তুলে সবকিছু।
ডিউটিতে যাবার আগে রুদ্র মেয়ের ঘরে এলো।সকালের ঘটনায় মেয়েকে জন্মদিন উইস করতে বেমালুম ভুলে গিয়েছে সে।মেয়ের ঘরের দরজায় কড়া নেড়ে ভেতরে ঢুকে শান্ত গলায় বলল
“হ্যাপি বার্থডে মা।
রোদের কোনো আনন্দ কাজ করলো না।সে অল্প ঠোঁট মেললো শুধু।আচমকা রুদ্রের মনে পড়লো মেয়ের ইউনিভার্সিটি ভর্তির লাস্ট ডেট আজ।এতদিন ব্যস্ততার জন্য যেতে পারেনি।ত্বরিত মেয়েকে তাগাদা দিয়ে বলে উঠলো
“তৈরি হয়ে নাও এডমিশনের জন্য যেতে হবে।
আর বাক্য খরচ করলো না।বেরিয়ে এলো মেয়ের ঘর থেকে।মিনিট পনেরো পরে বেরিয়ে এলো রোদ।গায়ে একটা ওভার কোট আর গলায় সেই মাফলার পেঁচিয়ে।পায়ে শীত নিবারনের বুট।
মেয়েকে একপলক দেখে আড়ালে হাসলো রুদ্র।মাফলার খানা মেয়ের মনে ধরেছে ভেবে।সেই সাথে মনে মনে ভাবলো রূপকথার গুণের কথা।মেয়েটির হাতে নিশ্চিত জাদু আছে।নয়তো এত সুন্দর বুনন কি করে সম্ভব?দেখেই ভালো লাগছে।
রোদ কে নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলো রুদ্র।হসপিটালে ইমারজেন্সি মিটিং আছে তার।মেয়ের ভর্তি শেষ করে তাকে হসপিটালে গিয়ে সেই মিটিংয়ে এটেন্ড করতে হবে।পার্কিং লট থেকে গাড়ি বের করে মেয়েকে পাশের সিটে বসিয়ে গম্ভীর গলায় শুধালো
“জানতে ইচ্ছে করছে কে পাঠিয়েছে খরগোশ গুলো?
ভয়ে রোদ হা না কিছুই বললো না।রুদ্র ও আর ঘাটালো না।বেশি ঘাটালে হিতের বিপরীত হবে।যা ঘটতে চলেছে রুদ্র তার বিপক্ষে।এটা কিছুতেই হয়না,হতে পারেও না।সে নিজে সারফরাজ দের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি করেছে।মিটিয়েছে সমস্ত সম্পর্কের ইতি।রূপকথা আর সারফরাজ এর সাথে তার জঘন্য কীর্তি মনে পড়লে আজো লজ্জায় গলায় ফাঁস নিতে ইচ্ছে করে।রূপকথা কিংবা সারফরাজ এর মুখোমুখি কস্মিন কালেও হতে চায় না সে।মায়া চৌধুরীর সাথে করা অন্যায় গুলো আজো তার রাতের ঘুম হারাম করে নিয়েছে।একদিন রূপকথাকে নিজ দখলে নিতে চেয়েছে সে।পাততে চেয়েছে সংসার।ভালোবাসার চাইতে জেদ ছিল সেখানে বেশি।জবরদস্তিতে রূপকথার শরীর ছুঁয়েছে ।সেখানে কি করে সারফরাজ এর সাথে নতুন করে আত্মীয় পাতবে সে?দরকার পড়লে ভালো ছেলে দেখে যখন তখন মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেবে ।দুদিন বাদে ওই ছেলের মস্তিষ্ক থেকে রোদ নামাটা এমনিতেই হারিয়ে যাবে।বয়স কম আবেগে ভাসছে তাই।পরিণত পুরুষ হলে এসব আবেগকে নিছক টাইম পাস ভেবে হেসে উড়িয়ে দেবে।
ভাবনার সমাপ্তি না হতেই ভার্সিটির বিশাল গেটের সামনে এসে উপস্থিত হলো রুদ্ররাজ।আকস্মিক হুঁশে এসে কড়া ব্রেক কষতেই ঝাকুনি খেলো রোদ।রুদ্র নিজেকে সামলে ব্যতিব্যস্ত হয়ে রোদ কে শুধালো
“আর ইউ ওকে?
রোদ ঝলমলে চুলগুলো ঠিক করতে করতে মাথা উপর নিচ করলো।রুদ্র তপ্ত শ্বাস ফেলে বাইরে বেরিয়ে এলো সঙ্গে নামলো রোদ।
ভার্সিটির ভেতরে ঢুকতে না ঢুকতেই একটা কোল্ড ড্রিঙ্কস এর ক্যান ধেয়ে এলো রোদের দিকে।সহসাই ঝড়ের বেগে সেই ক্যান ক্যাচ করলো একটা ফর্সা শক্ত হাত।ভয়ে চোখ মুখ কুঁচকে মাথা নিচু করে ফেললো রোদ।রুদ্র হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো আগত ছেলেটির পানে।
অ্যালুমিনিয়াম এর ক্যানটি হাতে দুমড়ে মুচড়ে ব্যগ্র গতিতে সামনে এগিয়ে গেলো ছেলেটি।অতঃপর বাছবিচার ছাড়াই ক্যান সমতে বসালো শক্ত এক ঘুসি।ঘুসির তোড়ে হাসি আড্ডায় মেতে থাকা জন নামক ছেলেটির নাক ঠোঁট ফেটে মুহূর্তেই ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝড়লো।তাতে যেনো বিন্দু মাত্র দয়া হলো না ছেলেটির।ছেলেটি জনের গলা চেপে হিসহিস করে বলে উঠলো
“আজকের মতো ছেড়ে দিলাম।নেক্সট টাইম আ উইল টেইক ইউর লাইফ”
রুদ্র ছেলেটির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।একই চেহারার গড়ন,একই উচ্চতা,চোয়ালের তেজ ও তার মতন।চোখের দৃষ্টি ক্ষুধার্ত চিতার ন্যয়।গলার স্বর হিংস্রাত্বক,যেনো বুকের পুরোটাই বাপের মতো কলিজা।
ছেলেটা কে? তা ঠাহর করতে রুদ্রের এক মুহূর্ত সময় লাগলো না।চতুর কৌশলী মস্তিষ্ক আঙ্গুল দিয়ে নির্দেশ করে বলে উঠলো
“এটা সারফরাজ এর ছেলে।যার তীক্ষ্ণ নজর তোর মেয়ের উপর পরেছে।
রুদ্রের হাত খামচে ধরলো রোদ।এসবে তার ভয় লাগছে।সে আর এক মুহূর্ত দাঁড়াতে চাইছে না এখানে।কেমন দম বন্ধ অনুভূতি হচ্ছে।সেই সাথে ছেলেটার চোখের ভাষা আর বাঁকা ঠোঁটের হাসি কেমন হৃদপিণ্ড কাঁপিয়ে দিচ্ছে।স্বপ্নে দেখা সেই ছেলেটির অস্পষ্ট অবয়ব মনে পড়ছে বারবার।
রুদ্র মেয়ের অস্বস্তি বুঝতে পারলো।রোদকে আগলে নিলো নরম মমতায়।অতঃপর মেয়ের বাহু জড়িয়ে প্রিন্সিপাল এর রুমের দিকে অগ্রসর হতে হতে বললো
“এই ছেলের থেকে সব সময় একশত হাত দূরে থাকবে।কথা বলা তো দূর কখনো তার চোখে চোখ পর্যন্ত রাখবে না।সে তোমার জন্য পয়জন তুল্য।যদি কখনো দেখেছি এর সাথে তোমার কোনো যোগাযোগ সংঘটিত হয়েছে তবে পড়ালেখা বন্ধ করে ক্যালিফোর্নিয়া তোমার নানার কাছে পাঠিয়ে দেবো।বুঝেছো কি বলেছি?
রোদ মাথা পেতে নিলো।সে ঘাড় কাত করে রুদ্রের কথায় সম্মতি জানালো।রুদ্র নাক ফুলিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেলে একপল পেছনে তাকালো।রক্তাক্ত হাতে বুক ফুলিয়ে কাঁধ উঁচু করে কেমন দাঁড়িয়ে আছে সুঠাম দেহী সুগড়নের ছেলেটি।দেখলেই কিছু একটা ফিল হয়।যেনো সবটা কেড়ে নেবার জন্য মোহনীয় জাদু জানে সে।চোখে চোখ রাখলেই হ্যালুসিনেশন এর ফিল হয়।মানুষ এভাবেও নিজের বাবার কার্বন কপি হয়?কই তার মেয়ে তো তার মতো সাহসী হয়নি।বাবার সান্নিধ্যে থেকে মায়ের প্রতিটা আচরণ কিভাবে সে রপ্ত করেছে?মেয়েটা তার মতো সাহসী আর তপ্ত রক্তের হলে খুব ক্ষতি হত কি?সুবহান চৌধুরীর রক্তকে আদৌ এতোটা শান্ত মানায়?
এধারে রুদ্রের যাবার পানে তাকিয়ে ছেলেটি ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো।হাসতে হাসতে চোখ বুজে মাথা নিচু করে ফেললো।তার হাসির ধরনটাই এমন ।সবার চাইতে আলাদা।এই হাসিতে ভুবন ভোলানো সৌন্দর্য আছে।সঙ্গে মাথা ভর্তি ওলফ কাটিং এলোমেলো চুল।উপরের ঠোঁটের পাশে কুচকুচে একটা তিল।দেখতেই কেমন নেশালো আফিম।
রুদ্র আর রোদ চোখের আড়াল হতেই জনের রক্তে রাঙানো হাতটা ঝাঁকি দিয়ে গায়ের শার্টে মুছে পা বাড়ালো ক্লাস রুমের দিকে।এমন সময় ডেকে উঠলো বন্ধু নিনাদ
“শাহরান!ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস?মিউজিক ক্লাস আছে এখন।অলরেডি ফাইভ মিনিটস লেট।তাড়াতাড়ি চল।
নিনাদের ডাকে পেছন ফিরলো শাহরান।অতঃপর বললো
“আজ কোনো ক্লাসে এটেন্ড করবো না।
“কেনো?
“কারণ বেহায়া তৃষিত নয়ন আজ অপার্থিব সৌন্দর্য দর্শন করতে চাইছে বার বার।
নিনাদ ফিসফিস করে বললো
“ডক্টর রুদ্ররাজ চৌধুরীর মেয়ে সে।তার দিকে চোখ দেয়া মানা।
শাহরান তাচ্ছিল্য হেসে জবাব দিলো
“আমিও সারফরাজ শাহজাইনের ছেলে।নিষিদ্ধ জিনিসে আগ্রহটা একটু বেশীই বটে।কারন রক্তে জেদ টা একটু বেশি করে এড করে ফেলেছেন বিধাতা।
“ওই মেয়ে কখনো তোকে পাত্তা দেবে না
“পাত্তা চাইছে কে?
“পাত্তা না দিলে ভালোবাসা কিভাবে হয়?
“সব সময় দুই পক্ষ ভালোবাসবে এমন থিউরি কোথায় পেয়েছিস তুই?
এবার নিনাদ বেকায়দায় পড়লো।এই প্রশ্নের জবাব তার কাছে নেই।তবে?
শাহরান ব্যাগী জিন্সের পকেটে দুই হাত ঢুকিয়ে হাটতে হাটতে বললো
“একা একা বিরহে জ্বলে পুড়ে মরার মাঝে একটা পৈশাচিক আনন্দ আছে বুঝলি?আমি আজীবন এই আনন্দটা উপভোগ করতে চাই।
“এ কেমন আনন্দ আবার?
এবার শাহরান একটু অন্যমনস্ক হলো।বাইরের পাতা ঝড়া বার্চ গাছের দিকে দৃষ্টি স্থির করে কাতর চেহারা নিয়ে জবাব দিলো
“এটা সেই যন্ত্রণাদায়ক আনন্দ যেটা, সে আমাকে ভালোবাসবে না জেনেও তাকে ভালোবেসে আমি আমার বেঁচে থাকার কারন খুঁজে পাই।যেখানে না পাওয়াটাই বড় পাওয়া!
(লাইক কমেন্টস করবেন প্লিজ।নয়ত পরবর্তী পর্ব আর দেব না)
চলবে……?
Share On:
TAGS: চেকমেট সিজন ২, সারিকা হোসাইন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৪০(অন্তিম)
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২২
-
চেকমেট সিজন ২ পর্ব ১২
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৩
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৫
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৯
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২৪
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২০
-
চেকমেট সিজন ২ পর্ব ২
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১৯