Golpo romantic golpo কালারব্লাইন্ড

কালারব্লাইন্ড পর্ব ৮


#কালারব্লাইন্ড — ০৮

#সোফিয়া_সাফা 

আরিজ মাহতাবির দৃঢ় গলায় বললেন, “তুমিই ওর স্ত্রী। ও তা মানুক কিংবা না মানুক।”

আলতা আর তর্ক করতে পারল না। আর একটুও কথা বাড়ালে সে ভেঙে পড়বে; যা সে চাইছে না। চোখ দুটো ঝাঁপসা হয়ে আসার আগেই ত্রস্ত পায়ে শোরুমের ভারী কাচের দরজা ঠেলে বেরিয়ে গেল সে। আরিজ মাহতাবির স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর ক্ষণিকের জড়তা কাটিয়ে আলতার পিছু নিলেন। 

কোথায় যাচ্ছে, আলতা নিজেও জানে না। বুকের গহীনে শ্বাসরুদ্ধকর ভার চেপে বসেছে, যা থেকে রেহাই পেতে সে প্রায় দৌড়াচ্ছিল।

পিছিয়ে পড়া আরিজ মাহতাবির অবশেষে না পেরে চিৎকার করে উঠলেন, “আচ্ছা শোনো! আমি আর তোমাকে জোর করব না। নিতে হবে না ওগুলো… দাঁড়াও প্লিজ।”

কথাটা আলতার কানে পৌঁছাতেই তার পা দুটো থমকে গেল। এই অপরিচিত মানুষদের ভিড়ে হারিয়ে যেতে চায় না সে। এই পৃথিবীর মানুষ যে কতটা নিকৃষ্ট হতে পারে, তা তার চেয়ে ভালো আর কে জানে?

শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে চেপে ধরে দ্রুত চোখ দুটো মুছে নিল আলতা। তারপর ধীরে ধীরে পেছন ফিরে তাকাল। কয়েক গজ দূরে হাঁটুতে হাত রেখে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছেন আরিজ মাহতাবির। বুক ভরে বাতাস টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। একজন প্রবীণ মানুষকে নিজের জন্য এভাবে হাঁসফাঁস করতে দেখে আলতার ভেতরে অপরাধবোধ জেগে উঠল। অভিমান ভুলে সে কয়েক পা পিছিয়ে এসে শ্বশুরের সামনে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করল।

পকেট থেকে একখানা রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে আরিজ মাহতাবির সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন।

“বাইরে থেকে আমাকে বুড়ো না দেখালেও বয়স তো আর কম হলো না। বুঝলে বউমা? তোমার সাথে পাল্লা দিয়ে দৌড়ানোর স্ট্যামিনা আর নেই আমার।”

আলতা নিচু চোখে তাকিয়ে অনুতপ্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করল, “আপনি ঠিক আছেন তো?” 

আরিজ মাহতাবির এক হাতে কোমরের ব্যথাটা চেপে ধরে মুখে কষ্টেসৃষ্টে একটুখানি হাসি ফুটিয়ে বললেন,

“দেখতেই তো পাচ্ছ। আর দৌড়িও না, কেমন?”

আলতা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়ল। তার এই বাধ্য ভঙ্গি দেখে আরিজের মুখের মলিন ভাব খানিকটা দূর হলো।

গাড়ি ছুটল ‘মাহতাবির ক্যাসেল’-এর উদ্দেশ্যে। আলতার বিষণ্ন মনটাকে প্রফুল্ল করার আশায় পথে আরিজ মাহতাবির তাকে পাখির দোকানে নিয়ে যেতে চাইলেন। কিন্তু আলতা রাজি হলো না। সাফ জানিয়ে দিল, “আমার অন্য কোনো পাখি চাই না। আমি শুধু আমার জুবাকে ফেরত চাই।”

আরিজ আর কথা বাড়ালেন না। জানালার বাইরে শান্ত চোখে চেয়ে থাকা মেয়েটির দিকে একপলক তাকালেন। তিনি আলতাকে যেমন ভেবেছিলেন, মেয়েটা ততটা নিরাসক্ত নয়। প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করলে কিশোরীকে সামলানো কতোটা কঠিন তা তিনি ইতোমধ্যে আঁচ করতে পেরেছেন।

.

.

.

ঘড়ির কাঁটা তখন মাঝরাতের ঘর ছুঁয়েছে। দ্য ফল্টের আবহে রঞ্জক আজ আবারও নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছিল। বক্সিং ম্যাচ শেষে ক্লাব থেকে সে যখন বাইরে বেরিয়ে এলো, রাতের হিমেল হাওয়া তার গায়ে এসে লাগল। তখনই কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা অবয়বটি দেখে থমকে গেল রঞ্জক। 

তুষার!

রঞ্জককে দেখামাত্রই তুষার একপ্রকার ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। রঞ্জক তুষারের পিঠে হাত চাপড়ে তাকে আলতো করে সরিয়ে দিল। তারপর বলল, “কখন ফিরলি?”

উত্তরে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে তুষার বলল, “আরে দোস্ত! সন্ধ্যারাতেই ফিরেছি। তোকে সারপ্রাইজ দেবো বলে সোজা এখানে চলে এলাম।”

রঞ্জক চোখ উল্টে বিড়বিড় করল, “সত্যি বলতে, তোর এই হুটহাট সারপ্রাইজে আমি আর অবাক হই না।”

রঞ্জকের কাঁধে হালকা চাপড় মেরে তুষার জোর গলায় বলল, “ধুর! কী যে বলিস না! তোকে অবাক হতেই হবে, নইলে এতো কষ্ট করে সারপ্রাইজ দিয়ে কী লাভ বল তো?”

ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে রঞ্জক খোঁচা মেরেই বলল, “তা বিয়ের দাওয়াত খেয়ে চেহারা বেশ ফোলা ফোলা লাগছে দেখছি!”

“সত্যিই নাকি?” তুষার কপালে কয়েকটা ভাঁজ ফেলে চুলে হাত বোলাল, “তোকেও তো কতো করে নিয়ে যেতে চাইলাম কিন্তু গেলিই না।”

রঞ্জক দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে অস্ফুটস্বরে আওড়াল, “হ্যাঁ, তোর সাথে গেলেই বোধহয় এই যাত্রায় বেঁচে যেতাম।”

তুষার কান খাড়া করে জিজ্ঞেস করল, “কিছু বললি নাকি?”

​“উঁহু, কিচ্ছু না।”

তুষার এবার কাছে ঘেঁষে নিচু গলায় জানতে চাইল, “আচ্ছা দোস্ত, তোর আর কঙ্কালের মধ্যে কী হয়েছে বল তো?”

রঞ্জক শূন্যে দৃষ্টি ভাসিয়ে নির্বিকার গলায় উত্তর দিল, “কী আর হবে! ব্রেক-আপ করে ফেলেছি।”

তুষারের চোখদুটো বড় হয়ে গেল, “কী বলিস! কেন?”

“ওর সাথে রিলেশনে থাকার আর কোনো কারণ নেই।”

তুষারের চেহারায় এবার উদ্বেগের ছাপ ফুটে উঠল, “নমিনেশনের কী হবে?”

“আরিজ মাহতাবির ব্যবস্থা করে দেবেন।”

“ওহ আচ্ছা—দাঁড়া, কী বললি? উনি দেবেন? সত্যিই?”

“হ্যাঁ।”

“তাই বলে সঙ্গে সঙ্গে ব্রেক-আপ করে ফেলবি? জানিস, মেয়েটা গতরাত থেকে আমাকে ফোন করে পাগল বানিয়ে ফেলেছে। বলছে, তুই নাকি ওর কল রিসিভ করছিস না। ওর সবগুলো নম্বর ব্লক করে দিয়েছিস।”

রঞ্জক কাঁধ ঝাঁকাল, “এটাই কি স্বাভাবিক নয়? ব্রেক-আপের পর আর কী কথা থাকতে পারে ওর সাথে?”

“তাহলে তো তোর চাকরিটাও নিশ্চিত যাবে!”

“যাকগে, তাতে কী! আমি অলরেডি অন্য জায়গায় সিভি ড্রপ করে দিয়েছি।”

তুষার মাথায় হাত দিয়ে বলে উঠল, “নিজের বাবার কাছ থেকে নমিনেশন আদায় করে নিচ্ছিস, কঙ্কার সঙ্গে ব্রেক-আপ করে ফেললি, এতো কিছু হয়ে গেল আর তুই আমাকে কিচ্ছু বললি না?”

রঞ্জক সামনে পা বাড়িয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “সারপ্রাইজ!”

তুষার বেকুব বনে গেল। তার যে ফ্রেন্ড সারপ্রাইজ পছন্দই করে না, সেও নাকি আজকাল সারপ্রাইজ দিচ্ছে—ভাবা যায়? সে রঞ্জকের পায়ে পা মিলিয়ে বলল, “কোথায় যাবি এখন?”

“বাড়িতে।”

“চল, আজ তোদের বাড়িতে গিয়েই ঘুমাবো।”

রঞ্জক তেরছা চোখে তাকাল তার দিকে। তুষার হাসতে হাসতেই রঞ্জকের বাহু ধরে নিজের সঙ্গে টেনে নিল, “আমি তো জানি, তুই খুব মিস করেছিস আমাকে। আর গেস হোয়াট, আমি পাঁচ দিনের ছুটি নিয়েছিলাম। এখনো একদিনের ছুটি বাকি আছে। তাই আজকের রাতটা আর কাল পুরো দিন আমি তোর সাথেই থাকব। সবচেয়ে বড় কথা, তুই চাকরি ছাড়লে আমিও ছাড়ব। তুই যেখানে নেই, আমিও সেখানে নেই; কথা ক্লিয়ার।”

রঞ্জক চাইল না তুষারকে আজ বাড়িতে নিয়ে যেতে। কিন্তু মুখের ওপর বলেও দিতে পারল না। এর আগে সে কোনোদিনও তুষারকে নিয়ে যেতে আপত্তি জানায়নি, আজ হঠাৎ তাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে তুষার সন্দেহ করতে পারে। মনে মনে সে কী করবে না করবে ভাবছিল, এমন সময় তুষারের পকেটে রাখা ফোনটা টুং করে বেজে উঠল।

পকেট থেকে অলস ভঙ্গিতে ফোনটা বের করল তুষার। স্ক্রিনে চোখ বুলিয়ে চমকে উঠে বলল, “আরেব্বাস, তোর এক্স হুমকি দিয়েছে দেখ।”

রঞ্জক কপাল কুঁচকে তাকায়, “এক্স?”

“আরে ওই কঙ্কালের কথাই বললাম।”

রঞ্জক অনাগ্রহী কণ্ঠে বলল, “ব্লক করে দে।”

“শুনবি তো কী বলেছে।”

রঞ্জক ক্লান্ত চোখে তাকাতেই তুষার ডিসপ্লেতে চোখ রেখে পড়তে শুরু করল, “আমি পড়ে শোনাচ্ছি—ও লিখেছে, ‘তোমার বন্ধুকে বলো আমার নম্বর আনব্লক করে আমার সঙ্গে সবকিছু মিটমাট করতে। নইলে আমি দ্য ফল্টে গিয়ে সবাইকে বলে দেব রাউডি আসলে কে। তারপর একজন এমপি পদপ্রার্থীর আন্ডারগ্রাউন্ড ফাইটার পরিচয় নিয়ে মানুষ কী ভাববে, সেটা নিশ্চয়ই তোমাকে আমার বুঝিয়ে বলতে হবে না।”

কথাগুলো শেষ হতে না হতেই রঞ্জক এক থাবায় তুষারের হাত থেকে ফোনটা ছিনিয়ে নিল। নিজেই টাইপ করলো, “যা করার করো। শুধু আমার পেছনে লাগার আগে জেনে রাখো, মানুষজন কথায় নয় প্রমাণে বিশ্বাসী।”

মেসেজটা পাঠানোর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কঙ্কার পক্ষ থেকে রিপ্লাই এলো; তবে কোনো টেক্সট নয়, একটা ভিডিও ফাইল। রঞ্জক ভিডিওটা ওপেন করতেই এমন কিছু দেখল, যা দেখে তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।

তুষার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল, “এখন কী করবি? এই মেয়ে তো দেখছি আদাজল খেয়ে লেগেছে।”

কথাটা শুনে রঞ্জকের মেজাজ চড়ে যায়। হাতের মুঠোয় ফোনটা এত শক্ত করে চেপে ধরল যে তুষারের মনে হলো, আর একটু চাপ পড়লেই স্ক্রিনটা ভেঙে যাবে। নিজের ফোন বাঁচাতে আর্তনাদ করে ওঠে তুষার, “দয়া করে আমার ফোনের ওপর নিজের রাগ ঝাড়িস না ভাই, ওটা ফেরত দে!”

রঞ্জক তার ফোনটা ফিরিয়ে দিল ঠিকই কিন্তু আধমরা অবস্থায়। তুষার নিজের ফোনের অবস্থা দেখে মুখটাকে কাঁদো কাঁদো করে ফেলল, “এটা কী করলি তুই। পালোয়ান একটা!”

রঞ্জক তার কথায় পাত্তা না দিয়ে নিজের ফোন বের করে কঙ্কার নম্বর আনব্লক করল। তা দেখে তুষার বিস্মিত হলো, “তুই ওর হুমকিতে ভয় পেয়ে গেলি নাকি?”

“আমি কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছি না। আমাকে নির্বাচনে জিততেই হবে অ্যাট অ্যানি কস্ট।”

“ব্রেক-আপের কী হবে?”

“আমি ভেবেছিলাম কঙ্কার থেকে পিছু ছাড়ানো কঠিন হবে না। এখন তো দেখছি ও জোঁকের মতো লেগে থাকতে চাইছে। ভালোই তো… আই থিংক—”

“ইউ থিংক হোয়াট?”

“ও আমাকে ভালোবেসে ফেলেছে।” রঞ্জকের এমন মন্তব্যে তুষার হতবিহ্বল হয়ে গেল।

“এই তোর মাথা ঠিক আছে? কীসব আবোলতাবোল বকছিস? ওর মতো একটা বেয়ারা মেয়ে ভালোবাসার মতো জটিল অংক বোঝে নাকি?”

“হয়তো বুঝে ফেলেছে। তা-ই তো আমার সাথে সম্পর্ক রাখার জন্য এমন উঠেপড়ে লেগেছে।”

“তুই শুধুমাত্র চাপে পড়েই এসব বলছিস তাই না? দেখ চাপ নিস না, আমরা দুজন মিলে যেভাবেই হোক ওকে বাগে এনে ভিডিওটা ডিলিট করিয়ে ছাড়বো।”

রঞ্জক হালকা হেসে আক্ষেপের সুরে বলল, “জানিস তো, আমি আগে সবসময় ভাবতাম একদিন খুব স্পেশাল কেউ আসবে আমার জীবনে। তার অপেক্ষাতেই ওকে কখনো একসেপ্ট করতে পারিনি। কিন্তু সেই একজন আর কখনো আসবে না রে। তাই মিছেমিছি অপেক্ষা করে কী লাভ?”

তুষার বিষণ্ন গলায় আওড়াল, “দোস্ত, হঠাৎ কী হলো তোর? এতো ডিসাপয়েন্টেড হয়ে গেলি কেন? তোর বয়স তো কেবল ছাব্বিশ! আর বছর দুয়েক অপেক্ষা করেই দেখ না!”

“অপেক্ষাটা বরং তুই-ই কর, আমি তো কঙ্কাকেই একসেপ্ট করে নেবো। ধনী বাপের শিক্ষিত মেয়ে, আমার সমবয়সী, উচ্চতাও ঠিকঠাক। আমার পাশে তো ওকেই মানাবে।”

“কিন্তু চরিত্র?”

রঞ্জক তাচ্ছিল্যের সাথে হেসেই উড়িয়ে দিল, “হোক না চরিত্রহীন, এই জামানায় চরিত্রবতী কোত্থেকে পাবো? আজকাল তো নিম গাছেও ভূত থাকে।”

তুষার মাথায় হাত দিয়ে বলল, “ভাই রে ভাই! আমার তো মনে হচ্ছে তোর ঘাড়েই ভূত চেপেছে। সে-ই তোকে দিয়ে এসব বলাচ্ছে। নইলে তুই এসব বলবি, ইম্পসিবল।”

রঞ্জক তার কথায় কর্ণপাত করল না। ধীর কদমে আঁধার ঘেরা রাস্তার দিকে এগোতে লাগল। তুষারও মাথা চুলকাতে চুলকাতে এটা ওটা বলতে বলতে তাকে অনুসরণ করে চলল। কিছুক্ষণ পর বাইকে উঠেও তুষারের বকবকানি থামল না।

রঞ্জক আর তুষার মাহতাবির ক্যাসেলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাতের আঁধার কেটে ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়েছে। চতুর্থ ফ্লোরে উঠে নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল রঞ্জক। তুষার তখনও নিজের কাজিনের বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে বকবক করেই যাচ্ছে। রঞ্জক আদৌ শুনছে কী না কে জানে! রঞ্জকের পিছু পিছু তুষারও শোয়ার ঘরে ঢুকে পড়ল। খাটের ওপর হাত-পা ছড়িয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়তেই খাঁচা থেকে জুবার চিৎকার ভেসে এল, “জুবাআ খাবে! জুবাআ খাবে!”

হঠাৎ এমন চিৎকারে তুষার চমকে উঠে রঞ্জকের দিকে ছুটে গেল। রঞ্জক সবেমাত্র শাওয়ার নিতে ওয়াশরুমের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। তুষার গিয়ে তার পেছনে লুকিয়ে পড়ল, “আমি এইমাত্র কার কথা শুনলাম? কে ছিল?”

রঞ্জক বিরক্তিতে দাঁত চেপে আওড়াল, “তো? ঘরে কী আমি একা থাকি নাকি?”

“হোয়াট? আর কে থাকে? ও আচ্ছা, তোর মাছেদের কথা বলছিস? কিন্তু ভাই মাছেরা তো কথা বলতে পারে না। ও বাবা, সত্যি সত্যিই তোর সাথে ভূত চলে আসেনি তো?” একাধারে কথা বলেই যাচ্ছিল তুষার। 

“চুপ কর বাপ!” বলেই তার মুখ চেপে ধরল রঞ্জক। 

তারপর সেভাবেই টেনে নিয়ে গেল খাটের পাশে থাকা খাঁচাটার দিকে। 

“সি, এই হলো গিয়ে তোর কথা বলতে পারা ভূত।” 

জুবার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল তুষার। মুখ থেকে হাত সরিয়ে তুষারের শার্টেই হাতটা মুছে নিল রঞ্জক। ঘরের এককোণে রাখা মাঝারি আকারের রেফ্রিজারেটরের দিকে এগিয়ে গেল সে। দরজা খুলে ভেতর থেকে জুবার জন্য রাখা ফল আর সবজির মধ্যে থেকে মটরশুঁটির একটি ছোট বয়াম বের করে একটা প্লেটে ঢেলে নিল। অতঃপর প্লেট নিয়ে হাজির হলো জুবার সামনে। 

তুষার তখনও হাঁ করে তাকিয়ে আছে জুবার দিকে। জুবাও বারবার এদিক ওদিক ঘাড় বাঁকিয়ে দেখে চলেছে তাকে। এই ফাঁকে রঞ্জক খাঁচার দরজাটা সামান্য উঠিয়ে টুপ করে প্লেটটা ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। পরপরই জুবা মহানন্দে হামলে পড়ল প্লেটের ওপর। 

তুষারের স্থবিরতায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে রঞ্জক চলে গেল ওয়াশরুমে। মিনিট বিশেক পর গোসল সেরে বের হলো রঞ্জক। পরনে বাথরোব; ভেজা চুল আর অনাবৃত গলার রেখায় তাকে অস্বাভাবিক রকম সুদর্শন লাগছিল। চুল থেকে ঝরে পড়া পানি তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে ক্লোজেটের দিকে এগোতেই তুষার সামনে এসে দাঁড়াল। জুবার দিকে তর্জনী তাক করে বলল, “তুই এখন মৎস্য পালন বাদ দিয়ে উড়নচণ্ডী পালন শুরু করে দিয়েছিস?”

“নট লাইক দ্যাট। জাস্ট পাখিটা পছন্দ হয়ে গেল তাই ঘরে জায়গা দিয়েছি।”

“পছন্দ হয়ে গেল?”

রঞ্জক মাথা নাড়তে নাড়তে তাকে পাশ কাটিয়ে ক্লোজেটে চলে যায়। গায়ে আরামদায়ক পোশাক জড়িয়ে বেরিয়ে আসে ঘুমানোর নিয়তে। খাটের ওপর বসতেই তুষার বলে ওঠে, “কী দেখে পছন্দ হলো শুনি?”

রঞ্জক অবাক চোখে তাকাতেই তুষার তার পাশে বসল। জুবার দিকে তাকিয়ে বলল, “পাখিটার পালকগুলো চকচকে সবুজ। পছন্দ হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তুই তো সবুজ ও লাল রঙ দেখতেই পাস না।”

রঞ্জক চমকে তাকাল খাঁচার দিকে। জুবা তখনও আয়েশ করে খাবার খাচ্ছে। রঞ্জকের ঠোঁটের ফাঁক গলে বেরোয়, “সবুজ?”

“হ্যাঁ, পালকগুলো সবুজ।”

দৃষ্টি সরু হয়ে আসে রঞ্জকের। চোখে চশমা এঁটে ভালোভাবে দেখার চেষ্টা করে কিন্তু লাভ হয় না। তার চোখে কোনো পার্থক্য ধরা পড়ে না। পালকগুলোর রঙ তখনও মলিন, কালচে এক অচেনা ছায়া ছাড়া আর কিছু নয়। রঞ্জক একটুকরো শ্বাস ত্যাগ করল। 

“ওর বিশেষত্ব রঙে নয় অন্য কিছুতে।” রঞ্জকের কথায় জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তুষার। রঞ্জক নিজের বাক্য সম্পূর্ণ করল, “কথা বলতে পারাটাই ওর স্পেশালিটি।”

“ও আচ্ছা, তাই বল। হ্যাঁ, পাখিটা তো বেশ ভালোই কথা বলতে পারে শুনলাম। তা এই চুলবুলিকে কোথায় পেলি হুম? দেখে তো ওয়াইল্ড বার্ড মনে হচ্ছে।”

কথাটা এড়িয়ে গেল রঞ্জক। প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, “আমার মাছেদের খাবার দেওয়ার সময় হয়ে গেছে।”

“চল, আমিও সাহায্য করে দিচ্ছি।”

রঞ্জক চলে গেল নিজের অ্যাকোয়ারিয়াম ঘরে। খাবার দিতে দিতে তুষার বলল, “তোর এই রঙ বেরঙের মাছেদের স্পেশালিটি কী সেটাও বল। এরা তো কথাও বলতে পারে না।”

রঞ্জকের হাত থেমে গেল। খাবার ছিটানো থামিয়ে কিছু সময় নীরব রইল। অতঃপর বলল, “জানি না।”

তুষার নিশ্চুপ হয়ে গেল। সে বুঝেই উঠতে পারে না রঞ্জক কালারব্লাইন্ড হয়েও কেন এই রঙ বেরঙের মাছেদের প্রতি দুর্বল। অ্যাকোয়ারিয়ামের অন্যান্য মাছগুলো তাও সেন্স দিচ্ছে কিন্তু এই লাল রঙের মাছগুলো কেন পালন করছে সে? তার ওপর আবার ইনডোর গার্ডেন, যেখানে শুধু সবুজের সমারোহ। গাছগুলো রঞ্জককে ঠিক কীভাবে টানে সে তা বুঝে উঠতে পারে না।

রঞ্জক একমনে মাছেদের খাবার দিচ্ছিল। তখনই তার ফোনকল বেজে উঠল। রঞ্জক বেডরুমে গিয়ে ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখতেই দেখল, কঙ্কা কল দিচ্ছে।

“নে শুরু হয়ে গেল। এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্যানপ্যান করে আমাদের ঘুমের বারোটা বাজাবে।” তুষার বিড়বিড় করল।

রঞ্জক ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে বলল, “তুই ঘুমা, আমি গার্ডেনে গিয়ে কথা বলি।”

“হ, যা যা। তোর তো আর ঘুমানো লাগবে না।”

রঞ্জক কথাটায় কর্ণপাত করল না। ধীর পায়ে চলে এল গার্ডেনে। কলটা রিসিভ করে কানের কাছে নিল ঠিকই কিন্তু বলল না কিছুই। কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর কঙ্কাই কথা বলা শুরু করল, “আমি তোমার ফোনের অপেক্ষায় ছিলাম সোনা। কিন্তু তুমি তো একটা মেসেজ অবধি দিলে না।”

“এভাবে আমার মেক-আপের ভিডিও ব্যবহার করে আমাকে ব্ল্যাকমেইল করার মানে কী, কঙ্কা? এক্ষুণি ওটা ডিলিট করো।”

ওপাশ থেকে কঙ্কার হাসির শব্দ ভেসে এলো। রঞ্জকের চোয়ালের রেখা শক্ত হয়ে ফুটে উঠল। 

“ডিলিট করার জন্য তো আর এতো কষ্ট করে ভিডিও ধারণ করিনি সোনা। তবে কথা দিচ্ছি, যতদিন আমরা রিলেশনে থাকবো ততদিন ভিডিওটা লিক হবে না।”

দাঁতে দাঁত চেপে কঙ্কার কথাগুলো সহ্য করে নিল রঞ্জক। 

“তোমার এত খারাপ দিন এলো, কঙ্কা, যে জোর করে আমার সঙ্গে রিলেশনে থাকতে হচ্ছে? কেন করছো এমন? চাইছোটা কী?”

“তুমি বুঝতে পারছো না আমি কী চাইছি? আমাকে ব্রেক-আপের কথা বলার সাহস হলো কী করে তোমার? তোমাকে ঠিক ততদিন আমার সঙ্গে থাকতে হবে যতদিন আমি চাইবো।”

রঞ্জক আর তর্কে গেল না। আরও বেশ অনেকক্ষণ একতরফা কথা বলার পর অবশেষে কল কেটে দিল কঙ্কা। রঞ্জক আর শোয়ার ঘরে গেল না। গার্ডেনের বেঞ্চেই গা এলিয়ে দিল। শুয়ে পড়লেই সহজে ঘুম আসে না তার। তবে গার্ডেনের কৃত্রিম ঝর্ণার একটানা শব্দ তার অনিদ্রার অস্থিরতা কিছুটা কমিয়ে দেয়। 

দুপুরের সূর্য খাড়াভাবে আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে চারপাশে। আলতা বেশ কয়েকবার রঞ্জকের ঘরের দুয়ারে এসে ফিরে গেছে। একবারও নক করার সাহস পায়নি। আলতা অনুমান করে বলতে পারে রঞ্জক বেশ রাতে ঘরে ফিরেছে। কারণ সে রাত বারোটা পর্যন্ত তার ঘরের সামনে ঘোরাঘুরি করেছিল, দরজা খোলা পায়নি। রঞ্জক ঘরে থাকলে দরজা ভিড়িয়েই রাখে। বাইরে যাওয়ার আগে লক করে রেখে যায়। এই যেমন এখন; দরজাটা শুধু ভেজানো রয়েছে। কিন্তু আলতা ভেতরে ঢুকতে ইচ্ছুক নয়। সে শুধু নিজের জুবাকে ফেরত চায়।

ঘড়ির কাঁটা একটার ঘরে পৌঁছায়। আলতা এবার অতিষ্ঠ হয়ে দরজায় নক করেই বসে। তবে কোনো সাড়াশব্দ আসে না। আলতা আরও কয়েকবার নক করল। 

অনবরত করাঘাতে তুষারের ঘুম হালকা হয়ে আসে। সে চোখ ডলতে ডলতে উঠে বসে। বিছানার পাশ থেকে ফোন টেনে নিয়ে সময় দেখতেই ঘুম ছুটে যায়, তারপর মনে পড়ে আজ তার অফিস নেই। বিছানা ছেড়ে সে টলতে টলতে নিচে নামে। ঘরে চোখ বুলিয়ে কোথাও রঞ্জককে খুঁজে পায় না,

“পালোয়ানটা গেল কোথায়? আর দরজায় এমনভাবে ধুমধাম করছেই বা কে?”

তুষার হাই তুলতে তুলতে দরজা খুলতেই আলতার মুখোমুখি হয়ে গেল। দুজনেই চমকে উঠল তৎক্ষণাৎ। 

“আপনি কে?” আলতার প্রশ্নে তুষারের ঘোর কাটলো। 

“এই প্রশ্ন তো আমার করা উচিৎ। কে তুমি নন্দিনী?”

তুষারের ভাবভঙ্গি দেখে আলতা শাড়ির আঁচল মুঠোয় চেপে ধরল। তন্মধ্যে তুষারের পেছন থেকে ভারী পদক্ষেপের শব্দ এলো। চোখের পলকে রঞ্জক এসে তুষারকে একপাশে সরিয়ে দিল। 

আলতার উদ্দেশ্যে ধমক দিয়ে বলল, “হোয়াট আর ইউ ডুয়িং হেয়ার? যাও এখান থেকে।”

আলতার মস্তিষ্কের সব ভাবনা চিন্তা ওলট-পালট হয়ে গেল। কতোকিছু ভেবে যে সে এখানে এসেছিল। অথচ এখন মুখ ফুটে কিচ্ছু বলতে পারছে না।

“তুমি শুনতে পাওনি? আমি তোমাকে যেতে বলেছি।”

আলতা ভীষণ অপমানিত বোধ করল তুষারের সামনে। লোকটা বড় বড় চোখে তার দিকেই কেমন তাকিয়ে আছে। কিশোরী চাইলেও এই দৃষ্টির সমুখে দাঁড়িয়ে কিচ্ছুটি বলতে পারবে না। রঞ্জক যদি তুষারের সামনে রাগের মাথায় অযাচিত কিছু বলে ফেলে তাহলে লজ্জায় সে এখানেই মারা যাবে।

আলতা উল্টো ঘুরে পা বাড়াল চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। তার বুকটা ভারী হয়ে আসছে। বারবার তাকে খালি হাতেই ফিরে যেতে হচ্ছে। সে আর এসব সহ্য করতে পারছে না।

“মেয়েটা কে ছিল রে? আগে তো কখনো দেখিনি।” 

আলতার প্রস্থানের সঙ্গে সঙ্গেই তুষার প্রশ্ন করে বসল। ঠিক এই কৌতূহলটাই রঞ্জকের ভালো লাগল না। কেমন যেন তেতো স্বাদে মুখ ভরে উঠল। বিরসপূর্ণ গলায় আওড়াল, “এএম এর বন্ধুর মেয়ে।”

“তাই নাকি? ভালোই তো। এমন মুখ ফুলিয়ে বলার কী আছে? তোর বাবার বন্ধুর মেয়ে মানে তোরও বন্ধু।”

রঞ্জক তির্যক নয়নে তাকাতেই তুষারের ঠোঁটের বাঁক প্রসারিত হলো। একহাতে রঞ্জকের গলা জড়িয়ে ধরে বলল, “সরি বন্ধু নয় বান্ধবী হবে। আর তোর বান্ধবী মানে তো আমারও বান্ধবী।”

রঞ্জক এক ঝটকায় তুষারকে সরিয়ে দিল। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “স্টপ টকিং ননসেন্স। ওই মেয়েটা আর আমার বান্ধবী? নট পসিবল!”

“আচ্ছা তোর পসিবল না হলে আমিই বানিয়ে নিচ্ছি। বন্ধু হিসেবে তোর না হওয়া বান্ধবীকে নিজের বান্ধবী বানাতে আমার কোনো আপত্তি নেই।”

বলেই নাটকীয় ভঙ্গিতে আলতার চলে যাওয়া পথ ধরে এগোতে নিল তুষার। কিন্তু পেছন থেকে তাকে আকস্মিক টেনে ধরল রঞ্জক। দাঁতে দাঁত পিষে বেজায় রুক্ষ স্বরে শুধাল, “কোথায় যাচ্ছিস?”

“আরে নতুন বান্ধবীর নামটাই তো জানা হয়নি। ছাড়, টুক করে জেনে আসি গিয়ে।”

“দেখ তুষার, নিজের সীমার মধ্যে থাক। আমার বাড়িতে এসে এমন বখাটেপনা কিন্তু আমি মোটেও বরদাস্ত করব না।”

এমন কথায় তুষারের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল, “তুই আমাকে বখাটে বলতে পারলি?”

“তো বখাটেদের মতো আচরণ করলে সাধুবাবা বলবো না নিশ্চয়ই?”

তুষার একদম শান্ত হয়ে গেল। তারা এরপর ফ্রেশ হয়ে এলো। রঞ্জক লাঞ্চ করতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো, তুষার খাটে বসে মিনমিনিয়ে বলল, “মেয়েটার নামটা অন্তত বল।”

“কোন মেয়েটা?”

“আরে ওই মেয়েটা। তোর বাবার বন্ধুর মেয়ে।”

রঞ্জক চুলে জেল দিচ্ছিলো। বন্ধুর কথায় এবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। তুষার খানিকটা ঘাবড়ে গেল তার চাউনিতে। জোরপূর্বক হেসে বলল, “মনে হয় তুইও জানিস না, ইটস ওকে।”

“আমি জানি কিংবা না জানি। তোর জানার দরকার নেই।”

তুষারের মুখটা ছোট হয়ে গেল। কপালে ভাঁজ ফেলে বলল, “এমন করছিস কেন? আমি কখনো তোর বোনেদের দিকে তাকিয়েছি বলতে পারবি?”

“তাকাসনি বলেই এখনো চোখদুটো অক্ষত আছে।”

“আরে আমি বোঝাতে চেয়েছি যে আমি খারাপ কিংবা বখাটে নই। শুধু ওই মেয়েটার প্রতি কিউরিয়াসিটি জাগছে।”

রঞ্জক এবার সিরিয়াস হলো। ব্যাপারটা খতিয়ে দেখতেই হচ্ছে। সে এগিয়ে এসে দুহাত কোমরে রেখে তীক্ষ্ণ গলায় শুধালো, “কোন বিষয়ে কিউরিয়াসিটি জাগছে শুনি? কী এমন বিশেষত্ব আছে মেয়েটার মধ্যে যা তোকেও বখাটে বানিয়ে ছাড়লো?”

“দোস্ত, ওর চোখদুটো…” বলতে বলতেই তুষার কোথায় যেন হারিয়ে গেল।

রঞ্জকের ভ্রু কুঁচকে এল, “কী আছে ওর চোখে?”

তুষার কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। তারপর ঠোঁটের কোণে চওড়া হাসি ফুটিয়ে বলল, “তুই বুঝবি না।”

রঞ্জকের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙার উপক্রম হলো। তুষারের ওপর সামান্য ঝুঁকে এসে তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “কী এমন জিনিস আছে, যা আমি বুঝব না?”

তুষার শুকনো ঢোক গিলল। রঞ্জকের চোখের চাহনিই বলে দিচ্ছে, তার মেজাজ ভালো নেই।

অবশেষে সে বলল, “ওর দুটো পান্নার মতো সবুজ চোখ আছে। তুই তো সবুজ রঙ দেখতে পাস না, তাই বুঝতে পারবি না।”

রঞ্জক আচমকা সোজা হয়ে দাঁড়াল।

“পান্না?”

“হ্যাঁ ভাই।” তুষারের চোখে আবার সেই অন্যমনস্ক ভাব ফিরে এল। “সবুজ চোখ আরও দেখেছি, কিন্তু এমন ঝলমলে, প্রাণবন্ত চোখ আগে কখনো দেখিনি।”

রঞ্জকের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। এখন সে বুঝতে পারল কেন বাড়ির সবাই মেয়েটার দিকে ওভাবে তাকিয়ে থাকে।

তুষার নিজের খেয়ালেই বলে চলল, “ওর চুলগুলোও রক্তের মতো লাল। গালের ওপর টোকা দিলেই মনে হয় রক্ত—”

কথাটা শেষ করার সুযোগ পেল না তুষার। হঠাৎই রঞ্জকের মুঠোবদ্ধ হাত সজোরে এসে আঘাত করল তার চোয়ালের পাশের জ-লাইন বরাবর। প্রচণ্ড আঘাতে ভারসাম্য হারিয়ে তার শরীরটা একপাশে হেলে বিছানার ওপর আছড়ে পড়ল। কিছুক্ষণ সে হতভম্ব হয়ে সেভাবেই পড়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল রঞ্জকের দিকে।

রঞ্জকের কপালের শিরা ফুলে উঠেছে ততক্ষণে। আর এক মুহূর্তও তুষারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না সে। হনহনিয়ে চলে গেল পাশের রুমে। রুমটা অন্ধকার আশেপাশে চোখে পড়ার মতো খুব বেশি জিনিসপত্র নেই। রঞ্জক ঢুকেই ত্রস্ত হাতে দেয়ালের সুইচ টিপল। মুহূর্তেই ঘরজুড়ে হলদে আলো ছড়িয়ে পড়ল। ঘরের মাঝখানে ঝুলে থাকা বিশাল পাঞ্চিং ব্যাগটার দিকে কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে।

তারপর মুখে মাউথগার্ড বসিয়ে নিল। পরের মুহূর্তেই ঘরজুড়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল আঘাতের শব্দ।  ক্রমশ আঘাতের গতি বাড়তে লাগল। পাঞ্চিং ব্যাগটা প্রতিটি আঘাতে প্রচণ্ডভাবে দুলে উঠছে, অথচ রঞ্জকের মুখের কঠিন ভাবটুকু বদলাচ্ছে না।

চলবে… 

শব্দসংখ্যা: ৩২০০+

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply