কানুন ভিলা
দারোয়ান কখনো বাড়ির ভেতরে ঢোকে না৷ প্রায় বারো বছর পর আজ প্রথম সে আমার বেডরুমে ঢুকে পড়ল। সবে গোসল সেরে বিছানায় বসেছি। চুল দিয়ে পানি পড়ছে, পোশাক এলোমেলো। বিব্রত ভঙ্গিতে তার দিকে তাকালাম। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কথাবার্তা বলছে না। রাগে আমার শরীর জ্বলে গেল। ঝাঁঝালো গলায় বললাম, “আপনি এখানে কী করছেন? কোন সাহসে ঘরের ভেতরে চলে এসেছেন?”
“তেমন কিছু না আম্মা। আমার ছুটি হয়ে গেছে। তাই তোরে কিছু দিতে এলাম।”
তার কথা বুঝতে পারলাম না। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলাম। সে শার্টের ভেতর থেকে একটা খাম বের করে আমার হাতে দিলো। নিচু গলায় বলল, “এটা দেখে নিস মা। এই বাড়িতে আমার চাকরি শেষ। এখন চলে যাব। তোর সাথে আর দেখা হবে না।”
কথাগুলো বলে সে আমার মাথায় হাত রাখল। ভীষণ বিস্মিত হলাম। এতটাই যে তাকে কিছু বলা হয়ে উঠল না। সে আমার মাথা থেকে হাত নামিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। লোকটা ভীষণ বিশস্ত। বারো বছর ধরে চাকরি করছে। তার হঠাৎ এভাবে তার চলে যাওয়া কেমন অদ্ভুত লাগল। তার উপর খাম।
তোহা নিজের মনে কথাগুলো বলল। তারপরই খাম খুলে ভেতরে কী আছে দেখতে ব্যস্ত হয়ে রইল। খামের ভেতরে বেশ কিছু টাকা। প্রায় পঁচিশ হাজার। সামান্য একজন দারোয়ান তাকে এতো টাকা কেন দেবে– এ কথা চিন্তা করতে গিয়ে তার মাথা ধরে গেল। খামের ভেতরে শুধু টাকা না, আরও একটা খাম আছে৷ তোহা সেই খামটা খুলল। বেশ কিছু ছবি আর একটা মেমোরি কার্ড।
ছবিগুলো দেখে তোহার হাত পা কাঁপতে লাগল। স্বামীর সাথে তার ছবি, ঘনিষ্ঠ ধরনের। এর বাইরে তার একারও বেশ কিছু ছবি আছে। যেগুলো সে ঘুমন্ত অবস্থায় তোলা। তোহা কী করবে বুঝতে পারল না। কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে বসে রইল।
তার বিয়ের ৫ বছর ৪ মাস চলছে। স্বামী হিসাবে সোহেল খুব ভালো। খুব মানে খুবই। আদর্শ স্বামী যাকে বলে। সবসময় তোহার খেয়াল রাখে, সপ্তাহে দুই সপ্তাহে গিফট দেয়। অফিস থেকে ফেরার পথে ফুল, চকলেট এসব নিয়ে আসে। সেই মানুষ বাইরের লোকেদের এসব ছবি দেখিয়েছে– এ কথা সে বিশ্বাস করতে পারল না। এমন সম্ভব না।
তার সব রাগ দারোয়ানের উপর গিয়ে পড়ল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো সে-ই এসব ছবি তুলেছে। লোকটার বউ ছেলে-মেয়ে নেই। কে বলতে পারে! একা থাকতে থাকতে এমন কুৎসিত কাজ করার ইচ্ছে তৈরি হয়েছে। অসম্ভব কিছু না। তোহা বিছানার পাশে পড়ে থাকা ওড়নাটা মাথায় চাপিয়ে বাইরের দিকে হাঁটা শুরু করল। সদর দরজা পর্যন্ত যেতে মাঝারি ধরনের একটা ফুলের বাগান পার করতে হয়। বাগানে ফুল বলতে শুধু গোলাপ। সে গাছগুলোও এখন ম’র’তে বসেছে। মালির খোঁজ করা হচ্ছে। পেলে নতুন করে গাছ লাগানো হবে।
তোহা খুব জোরে হাঁটল, তবে দারোয়ানের দেখা পেল না। ছিপছিপে গড়নের নতুন একটা ছেলে তার দিকে এগিয়ে এসে বলল, “ম্যাডাম কিছু লাগবে?”
“দারোয়ান চাচা কোথায়?”
“সে তো চলে গেছে। স্যার তাকে ছুটি দিয়ে দিয়েছে। তার জায়গায় আমাকে রাখা হয়েছে। আপনার কিছু লাগলে আমাকে বলেন।”
“না, আমার কিছু লাগবে না। দারোয়ান চাচা কোথায় গিয়েছে সে ব্যাপারে কিছু জানা আছে?”
“না, নেই।”
“কোন ধারণা?”
“ম্যাডাম, আমি তার আত্মীয় না। বরং তার জায়গায় চাকরিতে ঢুকেছি। সম্পর্ক ভালো হবে এ আশা বোকামি।”
“আচ্ছা বেশ।”
সে হতাশ হয়ে রুমে ফিরে এলো। হঠাৎই তার খুব ক্লান্ত লাগছে। চোখে ঘুম জড়িয়ে আসছে। সে মোবাইল বের করে সোহেলের নম্বর ডায়াল করল। ব্যস্ত দেখাচ্ছে। তোহা চোখ বন্ধ করে লম্বা শ্বাস নিলো। বিছানার পাশে রাখা পানির বোতল থেকে পানি খেলো।
মোবাইল বাজছে। ফোনের স্কিনে সোহেলের নম্বর স্পষ্ট। সে কল রিসিভ করল। সোহেল বলল, “আমি মিটিংয়ে আছি। কিছু বলবে?”
“না, কিছু বলব না।”
“দুপুরে খেয়েছ?”
“এখনও খাওয়া হয়নি। তুমি খেলে?”
“মিটিং শেষ করে খাব। তুমি খেয়ে নাও। অনেক বেলা হয়েছে।”
কল কে’টে গেল। ঘড়িতে দু’টো বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিট। সেকেন্ডের কাঁটা চলছে। তোহা দারোয়ানের ব্যাপারটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইল। সে প্রায়ই সোহেলের সাথে বাড়ির মধ্যে ঘোরাঘুরি করে। বেলকনি, ছাঁদ, বাগান। হয়তো দারোয়ান সেই সময়ের সুযোগ নিয়ে এসব ছবি তুলেছে। সে ঠিক করল– সোহেল বাড়ি ফিরলে তাকে সবকিছু দেখাবে। দারোয়ানকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। তাহলেই দুধ কা দুধ, পানি কা পানি। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডাইনিং টেবিলে বসল।
দুপুরের আয়োজন ভালো। গরুর গোশতের কালা ভুনা, চাপিলা মাছের ঝোল, বেগুন ভর্তা। সকালের রান্না। বর্তমানে এই বাড়িতে তারা দু’জন থাকে। তোহার শ্বশুর শাশুড়ি গত মাসে সুইজারল্যান্ড গিয়েছে। তার ননদের কাছে সুরভি। সুরভি স্বামী সন্তান নিয়ে ওখানেই থাকে। মা বাবা কাছে পেয়ে এতদিনেও আসতে দেয়নি।
তোহা থালায় অল্প ভাত নিয়েছিল। সেটুকুও খেতে পারল না৷ ভাতের মধ্যে হাত ধুয়ে ফেলল। এক ধরনের অস্বস্তি তাকে ঘিরে ধরেছে। কোনভাবেই স্বস্তি পাচ্ছে না।
তোহা বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করল। সোহেল এখনও ফেরেনি। অন্যদিন এই সময়ের মধ্যে চলে আসে। আজ আসেনি। তোহা সোহেলকে কল করল।
“কোথায় তুমি? এখনও বাড়ি ফিরলে না দেখে কল দিলাম।”
“ওহ! তোহা। ভীষণ সরি। কিছু কাগজপত্র নিতে আমাকে ‘কাকুন ভিলায়’ আসতে হয়েছে। ফিরতে দেরি হবে।”
“আচ্ছা, সমস্যা নেই।”
কাকুন ভিলা তোহার শ্বশুর আফজাল হোসেনের অন্য একটা বাড়ি৷ দুই ছেলে মেয়ের জন্য তিনি দু’টো আলাদা বাড়ি করেছেন। ও বাড়িতে কেউ থাকে না। সুরভি দেশে ফিরলে হাতে গোণা দু’চার দিন থাকে। কেয়ারটেকার রাখা আছে৷ দেখেশুনে রাখে।
তোহা ভেবেছিল সোহেল ফিরলে তাকে সবকিছু বুঝিয়ে বলবে। সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করে থাকতে পারল না। তার মনের ভেতরে খচখচ করছে। ছবি, টাকা, তার মাথায় হাত রেখে ওভাবে চলে যাওয়া। সবকিছু মিলিয়ে সে ভীষণ ডিপ্রেসড। তোহা তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ল। কাকুন ভিলা খুব বেশি দূরে না। গাড়িতে গেলে মিনিট দশেক সময় লাগে। তোহা বাড়ির গাড়ি নিতে পারল না। ড্রাইভার নেই। অনেকবার কল করেও তার কোন খোঁজ পাওয়া গেল না। সে বিরক্ত মুখে রিকশায় উঠে বসল।
কাকুন ভিলা সতেরো কাঠার উপর তিনতলা বিশাল বাড়ি। সদর দরজা দিয়ে ঢুকে হল রুম। সোফা পাতানো আছে। তোহা বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। সদর দরজা খোলা। হল রুমের সোফায় আফজাল হোসেন বসে আছেন। তার সাথে সোহেল, সোহেলের মা।
সোহেলের মা বলল, “সোহেল, তুমি এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন হলে কীভাবে? পারফেক্ট হাতে সবকিছু হ্যান্ডেল করতে না পারলে কী হবে বুঝতে পারছ?”
“দারোয়ানটা এমন ঝামেলা করে বসবে বুঝতে পারিনি।”
“ছোটলোকেরা টাকার জন্য সবকিছু করতে পারে।”
আফজাল সাহেব তোহাকে দেখে ছেলে বউকে থামিয়ে দিলেন। ঠান্ডা গলায় বললেন, “তোহা, তুমি এখানে?”
তোহা অল্প হাসার চেষ্টা করল। যতদূর সে জানে তার শ্বশুর শাশুড়ি এখনও সুইজারল্যান্ড। গতকালকেও তার সাথে কথা হয়েছে। ফেরার কথা জিজ্ঞেস করতে বলেছে– তাদের কিছুদিন দেরি হবে। সুরভি ছাড়তে চাইছে না। তাহলে? তোহার একটা খটকা লাগল। সে দারোয়ানের প্রসঙ্গ তুলল না। হাসিমুখে কেমন আছে, শরীর কেমন এসব কথা জিজ্ঞেস করতে লাগল। ঠিক করল– দারোয়ানের ব্যাপারে সে নিজে খোঁজ খবর করবে।
চলবে
সূচনা পর্ব
কানুন_ভিলা
কলমে : #ফারহানাকবীরমানাল
পার্ট -২
https://www.facebook.com/share/p/1BZG8fiHFq/
Share On:
TAGS: কানুন ভিলা, ফারহানা কবীর মানাল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২৮
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৩০
-
তোমার হাসিতে সূচনা পর্ব
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৯
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২০
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১৮
-
তোমার হাসিতে গল্পের লিংক
-
তখনও সন্ধ্যা নামেনি পর্ব ২
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২৯
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১৪