কাছেআসারমৌসুম!__(৭০)
নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি
সৈয়দ নিবাসের সুখ-শান্তিতে কেউ কালোজাদুর মন্ত্র পড়েছে বোধ হয়। নাহলে এত দুঃখ কেন সবার? নিশ্চিন্ত মন নিয়ে একটা দিনও কেউ কেন ঘুমোতে পারে না? কেন একের পর এক অশান্তি লেগেই থাকে এখানে! জানা নেই, উত্তর আসলে নেই কারো কাছে।
মানুষের জীবনটাই তো এরকম। সুখের চেয়েও দুঃখের সফর লম্বা হেথায়। তনিমা বুঝতে পারলেন না,তার কপালের দূর্ভোগ আদৌ কোনোদিন কাটবে কিনা! বিয়ের পর থেকে সইতে সইতে আজ এত দূর এসেছেন। সন্তানেরা বড়ো হলে সুখ পাব,এই ভেবে এতগুলো ভোর কাটিয়ে দেয়া রমনী আজ যখন দাঁড়ালেন এই পরিস্থিতির মুখে,শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন তিনি। বাকিদেরও ঐ একই দশা আজ। শওকত থেকে বাড়ির সবচেয়ে ছোটো মিন্তুটা অবধি বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে গেছে। এইত অয়ন, কিছু দিন আগেই হেসে হেসে বলছিল,
“ ফেলোশীপের অফার ক্যান্সেল করে দেবো,বাবা। বাড়ি ছেড়ে থাকা আমার পোষাবে না। এত ডিগ্রী দিয়ে কী হবে? যদি জীবনের সুন্দর সময় গুলোই আপনজনদের ছাড়া চলে যায়!”
সেই অয়ন হুট করে এমন একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো? তাও আবার বলল,বরাবরের জন্যে? মানে কী? ও কি আর ফিরবে না এখানে? খাবারে সবে হাত ডুবিয়েছিল সার্থ,এক লোকমাও খায়নি,ওইভাবেই সব ছেড়ে উঠে এলো সে। ভাইয়ের কনুই টেনে ফেরাল নিজের দিকে। সবার নীরবতা ভাঙল ওর একেকটি ছোড়া প্রশ্নে,
“ দেশ ছাড়বি মানে! দেশ ছাড়বি কেন? দেশ ছাড়ার মতো কী এমন হয়েছে?”
অয়ন মুখ শক্ত করে আরেক দিক চেয়ে রইল। জবাব দিলো না,দেখলও না ওকে। এড়িয়ে গেল প্রতিটি কথা। সাইফুল বললেন,
“ কী ছেলেমানুষি করছিস, অয়ন! বরাবরের মতো দেশ ছাড়বি? আমরা,আমরা তোকে ছাড়া থাকব কীভাবে বাবা?”
তুশির বুক শুকিয়ে গেছে। চিন্তায়,উদ্বেগে-উত্তেজনায় হাঁসফাঁস করে ইউশার দিকে চাইল ও। খাবার টেবিলের কাঠের পুতুলের মতো বসে আছে মেয়েটা। যা দেখে মুখটা আরো বিবর্ণ হয় তুশির। ছটফট করে ভাবে, ” আল্লাহ,ইউশা এই আঘাত সইবে কেমন করে? অয়ন ভাই চলে গেলে তো ও পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে।”
সার্থ
ভাইয়ের গাল ছুঁয়ে মোলায়েম স্বরে বলল,
“ অয়ন,তাকা আমার দিকে। অয়ন!”
অয়ন তাকাল না,উলটে হাতটা ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে দিলো। থমথমে গলায় বলল,
“ তুমি আমার সাথে কথা না বললেই আমি খুশি হব।”
সার্থর চেহারার রং বদলে গেল। কোমল চোখদুটি ছলকাল সামান্য। তবে বলল না কিছু।
তনিমা ভেজা চোখে ছেলের মুখটা দেখলেন কিছুপল। থেমে থেমে শুধালেন,
“ আমাদের ছেড়ে তুই থাকতে পারবি,অয়ন?”
অয়ন চুপ করে রইল। সাইফুল,রেহণূমা সবাই উৎকণ্ঠিত হয়ে কত কী বোঝালেন! কেউ রাজি নয় তার সিদ্ধান্ত নিয়ে। মত নেই কারো! শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন শওকত। বললেন,
“ থাক, যেতে যখন চাইছে,যাক। আটকিও না।”
তনিমা আর্তনাদ করে উঠলেন অমনি,
“ না,কী বলছো তুমি? কেন আটকাব না? এক ছেলে হারিয়েছি,এখন আরেক ছেলে গিয়ে ঐ বিদেশ বিঁভুইয়ে পড়ে থাকবে? কেন?
তুশির বিরহে যাচ্ছিস তুই? তুশিই সব হয়ে গেল,আর এত গুলো মানুষ তারা তোর কেউ না?”
অপরাধ বোধ আর লজ্জায় তুশি আজ মরে যেতে পারল না। ঠোঁট টিপে মুখ নত করতেই চোখের জলটা গড়িয়ে পড়ল গালে।
সার্থ বলল,
“ তোর দেশ ছাড়ার কারণ আমি হলে, যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই অয়ন। আমি আর তুশিই বরং বাড়ি ছেড়ে আলাদা হয়ে যাব।”
অয়ন হেসে ফেলল এবার। বিদ্রুপ করে বলল,
“ খুব উপকার করবেন আলাদা হয়ে। কিন্তু এত উপকারের আমার কোনো প্রয়োজন নেই। অবশ্য আপনি আর আপনার বউ কী করবেন সেটা আপনাদেরই ব্যাপার। আমার প্রতি এত দরদ না দেখালেও চলবে। আমি ঠিক করেছি যখন যাব,যাবই।”
অয়ন সব ছেড়ে,মায়ের কান্নাকাটি মাড়িয়ে ফের এপ্রোন হাতে তুলে হাঁটা ধরল ঘরে। কী ভেবে থামল আবার। এক পা পিছিয়ে এসে দাঁড়াল তুশির সামনে। সবার মাঝেই স্পষ্ট গলায় বলল,
“ আমি খুব করে চাইব,আমাকে ঠকানোর শাস্তিটা আল্লাহ যেন তোমাকে কোনোদিন না দেয়। ঠকবাজদের শাস্তি অনেক ভয়ানক তো,তুমি ছোট মানুষ, সইতে পারবে না।”
তুশির চিবুক যেন বুকে ঢুকে গেল। মাথা তুলে তাকাতে পারল না। এক চোখের পানিটা গাল বেয়ে গলায় নেমে এলো আস্তে। অয়ন চলে যায় শব্দ করে। ফেরে না কারো দিকে। তনিমা দু পা পেছনে ছুটলেন, ডাকলেন অস্থির হয়ে
“ অয়ন,বাবা শোন,শোন বাবা শোন আমার কথা।”
অয়ন থামে না। দুদিনেই ছেলেটা কেমন নিষ্ঠুর
হয়ে গেল। শওকত আগলে ধরলেন স্ত্রীকে। বুঝিয়ে-শুনিয়ে ঘরে নিয়ে চললেন। মিন্তু ছলছল চোখে বাবার কোমর প্যাঁচিয়ে বলল,
“ অয়ন ভাই চলে যাবে আব্বু? সত্যি চলে যাবে?”
সাইফুল জবাব দিতে পারলেন না। তবে রেহণূমা ফুঁসে উঠলেন তুশির ওপর,গিয়েই নিস্তব্ধ মেয়েটার এক হাত টান মেরে বললেন,
“ এবার মন ভরল মা? এবার শান্তি পেলি?”
সাইফুল বললেন,
“ আহ, আবার ওকে কেন…”
“ বলতে দাও আমাকে।
হ্যাঁ রে তুশি, যার সংসার আগে থেকেই টলছিল,দুলছিল তার সংসারটা এবার ডুবিয়েই ছাড়লি তুই। মজা পেলি তো?”
তুশি মাথা নুইয়ে ফুঁপিয়ে উঠল। সার্থ জবাব দিতে চাইল,থামল ইউশার কথা শুনে। পেছন থেকে ধীরুজ পায়ে হেঁটে এসে দাঁড়াল মেয়েটা। স্বীকার করল শান্ত গলায়,
“ তুশি কিছু করেনি মা,তোমার যা বলতে হলে আমাকে বলো।”
রেহণূমা অবাক হয়ে ফিরলেন। চোখেমুখে প্রশ্ন নিয়ে বললেন,
“ তুই কী করেছিস?”
ইউশা টলমল নয়ন তুলে তুশির দিকে চাইল। অমনি উদগ্রীব হয়ে দুপাশে মাথা নেড়ে মানা করল মেয়েটা। বোঝাল- না বলতে।
ইউশা শুনল না। চোখের পানি মুছে বলল,
“ তুশি বিয়ে করতে চায়নি। আমি তো আগে থেকে জানতাম অয়ন ভাই ওকে পছন্দ করে,আবার মেজো ভাইয়াও ওকে স্ত্রীর স্বীকৃতি দিতে চাইছিল না, তাই সব মিলিয়ে আমি ওকে কসম দিয়েছিলাম। বলেছিলাম অয়ন ভাইকে বিয়ে না করলে আমি সুইসাইড করব।”
ইউশার কথা শেষ হলো,সঙ্গে সঙ্গে গাল কাঁপিয়ে একটা চড় মারলেন রেহণূমা। ঝরঝর করে কেঁদে উঠল মেয়েটা। ভদ্রমহিলা চিৎকার করে বললেন,
“ মরে যা,তোরা দুই বোন এসব কাহিনী না করে একবারে মরে যা, আর শান্তি দে আমাকে। আমি এখন আপার সাথে চোখ মেলাব কীভাবে? কীভাবে তাকাব আপার দিকে? আল্লাহ, তুমি আমাকে এমন সন্তান কেন দিলে যারা আরেকজনের সংসার ভাঙার কারণ হয়!”
সার্থ চোখ বুজে চ সূচক শব্দ করল। একবার তাকাতেই চোখাচোখি হলো তুশির সাথে। নিশ্চুপ,তর্কে না জড়ানো মেয়েটা কিছু বলেনি,শোনায়ওনি,শুধু আধোভেজা কাতর চোখটা এমন ভাবে ফেলল,ওতেই বুক মুচড়ে উঠল সার্থর। কাঁটার মতো খোঁচা লাগল গায়ে! যেন মনে হলো তুশির এই কাতর দৃষ্টি বলে দিচ্ছে- সব কিছুর মূলে আপনি!
সার্থ আর স্থির থাকতে পারল না। পারল না দাঁড়াতে। টালমাটাল লম্বা পা টেনেটুনে ঘরে রওনা করল। সাইফুল পরিস্থিতি থামাতে স্ত্রীকে টেনে নিয়ে গেলেন। মিন্তুও রইল না। হাসনা,তুশি আর ইউশা বাদে বসার ঘর শূন্য এখন। আনত ইউশা মূক,মূর্তি বনে থাকে। যার বলার মতো কথা নেই,করার নেই কিছু। হঠাৎ টের পেলো কাঁধের ওপর নরম হাতের স্পর্শ। বিষণ্ণ মুখটা তুলে চাইল ও। তুশি বলল,
“ কেন বলতে গেলে? মানা করেছিলাম। আমাকে বলতো যা বলার।”
“ আমার আরো আগে বলা উচিত ছিল। তাহলে তোমাকে এত কথা শুনতে হতো না।”
“ আমার কথা শোনার অভ্যেস আছে,ইউশা। তোমার তো নেই।”
ইউশা ফুঁপিয়ে উঠল। যেন বাঁধ ভেঙে কোনো নদীর চড় ভেঙে পড়ল পানিতে।
তুশি বুঝল এই কান্না কীসের! অয়নের বিরহ,তার চলে যাওয়ার শোক! ওর দুবাহু ধরে বলল,
“ কেঁদো না ইউশা,এটা কান্নার সময় নয়। অয়ন ভাইকে আটকাও, যাও।”
ইউশা তুচ্ছ হাসে,
“ আমি আটকাব!”
পরপরই কান্নায় হুহু করে উঠল সে,
“ আমার কপালটা দেখলে তুশি, কিছু পাওয়ার আগেই কেমন তছনছ হয়ে যায়। এতদিন তাও একটু চোখের সামনে দেখতাম,নিঃশ্বাস শুনতে পেতাম,কথা বলতে পারতাম এখন নাকি তাও হবে না। অয়ন ভাই চলে যাবেন তুশি! আমি ওনাকে না দেখে বাঁচতে পারব বলো?”
“ ইউশা, ভেঙে পড়ো না। তোমার অয়ন ভাইকে আটকাতে হবে।”
“ ওই ক্ষমতা আমার নেই।”
“ আছে, ভালোবাসো না ওনাকে? সেই ভালোবাসার জোর দিয়ে আটকাতে হবে। নাহলে বুঝবে তোমার ভালোবাসায় কোনো দম-ই নেই। যাও, চোখের জল না ফেলে গিয়ে বোঝাও ওনাকে।”
ইউশার মৃত বুক আশায় ভরল একটু। ফিরল আলো নয়নে। কান্না থামিয়ে চেয়ে রইল সে। তুশি চোখ দিয়ে আশ্বাস দেয়,যেতে বলে। তুরন্ত ভেজা গাল মুছে দুরন্ত পাখির ন্যায় সিঁড়ির দিকে ছুটল মেয়েটা।
হাসনা খুব অবাক হয়ে বললেন,
“ ওয়, অয়ন বাইরে পছন্দ করে? অয়ন বাই জানে কতাডা?”
তুশি দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানাল,
“ নাহ!”
হাসনা কাঁধে হাত রাখলেন,
“ মায়ের কতায় মন খারাপ করছস বু?”
“ না। দাদি?”
“ ক,বু।”
“ আমি আজ তোমার সাথে ঘুমাই?”
হাসনা মানা করতে চাইছিলেন। নতুন বিয়ে হয়েছে আলাদা থাকবে কেন? কিন্তু তুশির চোখ ছাপিয়ে ভেসে ওঠা অনুনয় নাকচ করতে পারলেন না। মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“ আইচ্ছা। তয় নাতজামাই রাগ হইব না?”
তুশি অন্যমনস্ক হয়ে বলল,
“ হবে না। আজ বোধ হয় ওনাকে আমার একা ছাড়া উচিত!”
অয়নের ঘরের দরজা বন্ধ। ইউশা উদগ্রীব হয়ে ধাক্কা দিয়ে ডাকল,
“ অয়ন ভাই, অয়ন ভাই!”
ওপাশ থেকে উত্তর এলো না। দরজায় কপাল ঠেকিয়ে হুহু করে কেঁদে উঠল মেয়েটা। করুণ সুরে বলল,
“ অয়ন ভাই সাড়া দাও না! খোলো না দরজাটা!”
অয়ন এলো কী? নাহলে ইউশার বুকের গতিটা এমন বাড়ল কেন হঠাৎ ? মনে হলো এক অদ্ভুতুরে ছন্দে ও অয়নকে অনুভব করতে পারছে। যেন দরজার ঠিক ওইপাড়েই দাঁড়িয়ে আছে মানুষটা। ইউশার ব্যাকুল চিত্ত আরো আনচান করে ওঠে। হড়বড়িয়ে বলে,
“ অয়ন ভাই, অয়ন ভাই,শুনছো? ও অয়ন ভাই?”
এক সেকেন্ড পার হয়। ঠান্ডা হাওয়ায় ছুটে আসে জবাব,
“ কী বলবি ইউশা?”
ওই নিষ্প্রভ স্বরে ইউশার গায়ে কাঁটা দিলো,বুকের ছটফটানো বাড়ল। সেই সাথে মুখটা ঝলকাল একটু। অয়ন ভাই সাড়া দিয়েছে। শশব্যস্ত বলল,
“ ক-কেন যাবে আমা- আমাদের ছেড়ে?”
হৃদয়ের কোণ বা,গলার স্বরে বেজে পড়ল একটা কথা- আমাদের ছেড়ে। এটুকু বলতে পারল না বেচারি।
অয়ন উত্তর দেয়,
“ এই ব্যাপারে আমি কোনো কথা বলতে চাই না।”
“ অয়ন ভাই,এমন কোরো না। যেও না প্লিজ!”
“ বাচ্চামো না করে ঘরে যা, ইউশা।”
“ বড়োমার কথাটা অন্তত ভাবো। যেও না অয়ন ভাই। আমি তোমার পায়ে পড়ি।”
“ ঘরে যেতে বলেছি, ইউশা। ডোন্ট ডিস্টার্ব মি।”
কঠোর স্বরে ইউশার চোখে বিদ্যুৎ খেলে যায়, শুধায় কেমন করে,
“ আমি তোমায় বিরক্ত করছি?”
মুখের ওপর জবাব দিলো অয়ন,
“ হ্যাঁ।”
“ তুমি তো এমন পাথর ছিলে না, অয়ন ভাই।”
“ তুই যা এখান থেকে।”
“ একবার দরজাটা খোলো না।”
ধমকে উঠল অয়ন,
“ তোকে যেতে বলেছি না?”
এক ধমকে ইউশার বুক কেঁপে উঠল।
পরপর চোখদুটো ভেসে গেল জলে। ভেতরটা ধ্বসে পড়ল অসহায়ত্ব আর উপায়হীনতায়৷
এখন হাত কামড়ালেও যেন আর কোনো পথ নেই! সব ও ডুবিয়েছে। কেন ও বলে দেয়নি,
“অয়ন ভাই, তুশি মেজো ভাইয়াকে ভালোবাসে? তুমি এখানেই থেমে যাও।”
কেন ও আটকায়নি তাকে! কেন ও তুশিকে মিথ্যে বলে বলে রাজি করাল? এই কেন-র ভীড়েই আজ তলিয়ে গেল ইউশা। হারিয়ে গেল বেদনায়। দরজা ঘেঁষে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল ও। পিঠ রাখল সেখানে। তারপর কিছু সময় কাটল। সৈয়দ ঘর নিস্তব্ধ হলো পুরোপুরি। ইউশার ফোঁপানোর শব্দ যখন কমে আসবে আসবে,কানে এলো খুব কাছে বেজে ওঠা গিটারের শব্দ।
ভেজা নয়ন ঘুরিয়ে সতর্ক হয়ে বসল মেয়েটা। অয়ন ভাই গিটার বাজাচ্ছে?
এইপাশটায় যেভাবে ইউশা বসে আছে? ঠিক একইরকম ভাবে ওইপাড়ে দরজায় পিঠ রেখে ফ্লোরে বসেছে অয়ন। দুজনের মাঝখানে কেবল ওই একটা কাঠ! অয়ন
কোলের মাঝে গিটার নিয়ে ডিমবাতির নিয়ন আলোর পানে চেয়ে রইল দু সেকেন্ড। একটু থেমে আবার সুর তুলল। থামল আবার। আবার বাজাল,আবার থামল। চোখের পর্দায় ভেসে বেড়াল একটা শার্ট-প্যান্ট পরা মেয়ে হোচট খেয়ে রাস্তায় ছিটকে পড়েছে। মাথা ভরতি কোকড়া চুল। হাত ধরে তুলতে এসে যাকে প্রথম দেখেছিল অয়ন। চোখ দুটো বুজে নেয় ও। আঙুল দিয়ে গিটারের তারে তোলা টুং টাং শব্দটা বহাল রেখে
খুব আস্তে গেয়ে ওঠে,
“ রাত জাগা পাখি যায় ডেকে যায় দীর্ঘশ্বাস ,
জোনাকিরা জ্বলে গাছের পাতায় আলোর আভাস,
পাশে পড়ে থাকা কবিতার খাতা মিলছে আকাশ,
কলমের রং গুড়োগুড়ো হয়ে স্তব্ধ বাতাস!”
ইউশা নিস্পন্দ হয়ে বসে রইল। দরজায় এলিয়ে রাখল মাথাটা। অয়নের গানের প্রতিটা কথা ওর বুকের পাঁজর ছিঁড়ে আনা ব্যথার মতোন। দরজার দুপাশে দুটো মানুষ একইরকম কাঁদছে,কষ্ট পাচ্ছে,গুমড়ে মরছেও। অথচ দুজনের বিরহের সঙ্গা আলাদা,আলাদা ওদের যাতনা। অথচ কোথাও গিয়ে ভালোবেসে না পাওয়ার এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিচ্ছেদে দুজনেই নিঃশেষ যেন!
ইউশার চোখ বেয়ে ফের জল নামল। মাথা কাত করায় ভেসে গেল কানের লতিটাও।
শুনতে পেলো অয়ন গাইছে তখনো,
“ ঝড় বয়ে গেছে, পড়ে আছে শুধু ছেঁড়া মাস্তুল,
ফিকে হয়ে যাওয়া কুয়াশার পিছে উঁকি দেয় ভুল,
ছেঁড়া কবিতার পাতাগুলো সব আধো অক্ষর!
হৃদয়ের কোণে ভালোবাসার শেষ স্বাক্ষর!”
ফজরের আযান যখন পড়ল,নড়ে উঠল অয়ন। চোখ মেলে বুঝল, রাতে ও এভাবেই ঘুমিয়ে গেছে। এখনো পাশেই পড়ে আছে গিটার। অয়ন চোখ ডলে উঠে দাঁড়ায়। হাত-মুখে পানি দেয়। আজ দুপুরে ওর ফ্লাইট। গোছগাছ তেমন নেই। নিজের খুব দরকারি জিনিস ছাড়া কিছু নেবে না। তৈরি হলো অয়ন। এখন বেরিয়ে যাবে। নাহলে নিশ্চয়ই মামুনি আসবে ঘরে। দিদুন আসবে, কিংবা চাচ্চুও আসতে পারে। ও কারো মুখোমুখি হতে চায় না। চায় না এসব নিয়ে কারো সাথে আলোচনা করতে।
হাতে এপ্রোন তুলে দরজা টেনে খুলল অয়ন। বিহ্বলতায় চমকে উঠল অমনি। ইউশা জড়োসড়ো হয়ে ফ্লোরে ঘুমিয়ে আছে। বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ল অয়ন। মুখটা আরো অন্ধকার হয়ে গেল। ইস,এই মেয়েটাও না! কাল রাত থেকে এখানেই ছিল? ইউশা কি একটু বেশিই কষ্ট পেলো! অবশ্য ছোটো থেকে ওর সাথে সাথে থেকেছে, সময় কাটিয়েছে, ইউশার ভালো-মন্দ সবকিছুই তো দেখেছে অয়ন, সেজন্যেই বোধ হয় ওর এভাবে দেশ ছাড়াটা মেনে নিতে পারছে না। অয়ন হাঁটুমুড়ে বসল ওর সামনে। ইউশা কাত হয়ে থাকায় এলোমেলো চুল পড়ে আছে মুখে। কান্নাকাটিতে গালের ওপর সাদা দাগ পড়েছে। অয়নের বুকটা কেমন করে উঠল। ভিজে এলো গলবিল। চুলটা গুছিয়ে দিতে চেয়েও থেমে গেল কী যেন ভেবে! পরপর ফোস করে শ্বাস ঝেড়ে নিজেকে সামলাল অয়ন । ঝুঁকে গিয়েই এক ঝটকায় ইউশার নরম শরীরটা তুলে আনে বাহুতে।
ছুরি দিয়ে তরকারি কাটতে গিয়ে,তনিমার আঙুল কেটে গেছে। রান্নাঘর থেকে টেনেটুনে ওনাকে বের করে, সোফায় বসিয়ে গেছেন রেহণূমা। তনিমা হাতে লেগে থাকা স্যাভলনের দিক চেয়ে চোখদুটো মুছলেন। ভোর হতেই তিনি ছুটেছিলেন অয়নের রুমে। কিন্তু ছেলে নেই!
তনিমা বুঝলেন,অয়ন আসলে পণ করেছে কারো কথা শুনবে না। বড়ো হয়ে গেছে না? এখন কি আর মাকে লাগে!
বাড়িটা এখন নীরব! হইচই নেই,শোরগোল বন্ধ। সবার মুখ ভার। অয়ন বাড়ি ফিরল ঘড়িতে নয়টা বাজে তখন। এয়ারপোর্টের জ্যাম ঠেলে যেতে ঘন্টাখানেক লাগবে। সেখানেও ইমিগ্রেশনের অনেক কাজ থাকে। ও কারো দিকে তাকাল না,দেখলও না কাউকে! তনিমা কথা বলতে উদ্বেগী হলেও অবজ্ঞা করল যেন। সোজা ঘরে গেল,বেরিয়ে এলো দুটো ব্যাগ হাতে। একটা ভারি লাগেজ, অন্যটা পিঠের। নেমে আসতেই সাইফুল পথরোধ করলেন,
“ অয়ন,আরেকবার ভেবে দ্যাখ বাবা।”
“ ফ্লাইটের সময় হয়েছে,চাচ্চু। দেরি হচ্ছে আমার।”
শওকত বললেন,
“ তাহলে যাচ্ছোই?”
“ হুউউ।”
“ যাও,আটকাব না। শুধু বলব,একদম ভুলে যেও না বাবা-মাকে। এসো!”
অয়ন ঘাড় নাড়ল। নিচু হয়ে পা ছুঁলো বাবার। শওকত নিরাশ মুখে কাঁধ চাপড়ে দিলেন।
তনিমাকে রাতভর বুঝিয়েছেন তিনি! বলেছেন,এখন দুঃখ পেয়ে যাচ্ছে। ঠিক ফিরবে,কোনোদিন আমাদের ছাড়া থেকেছে ও? ফেলোশীপ শেষ করে আর টিকতে পারবে না দেখো। তবে এতে কাজ হয়েছে কিনা কে জানে! তিনি স্ত্রীর দিক চাইলেন আবার। তনিমার গাল ভেসে যাচ্ছে জলে। অয়ন কাছে যেতেই সেই কান্না বাড়ল। ছেলেকে জড়িয়ে হাউমাউ করে উঠলেন। বারবার বললেন,
“ আসবি তো, সময় পেলেই আসবি তো?”
অয়ন মাথা নাড়ল। বুঝ দিলো মাকে। তবে ও জানে,ও আর ফিরবে না।
তারপর জয়নবকে সালাম করতে গেলে, দিলেন না বৃদ্ধা। দুই বাহু ধরে আটকে রাখলেন। বললেন,
“ আরেকবার ভাবলে পারতে! তোমার জন্যে আমরা সবাই ছিলাম!”
অয়ন জবাব দিলো না। একে একে চাচা-চাচি সবাইকে সালাম করল। হাসনাকে ছুঁতে গেলে ছিটকে সরে গেলেন তিনি।
বিব্রত হয়ে বললেন,
“ আমারে ক্যান করতাছো ভাই,আমি কি তোমার সালামের যোগ্য!”
“ আমি কারো যোগ্যতা দেখে মূল্যায়ন করি না,দাদি। ভালো থাকবেন দোয়া করি।”
তারপর আড়চোখ ঘুরিয়ে সারাঘর দেখল ও। তুশি কোথাও নেই। না আছে সার্থ। অন্তত আজ যাওয়ার সময় একবার থাকলে পারতো না? এত স্বার্থপর! রেহণূমা এক ব্যাগ ভর্তি করে কিছু শুকনো খাবার এনেছেন। ওনার হাতে বানানো বিস্কিট,নাড়ু এসব। লাগেজের ওপরের পাউচে ভরে দিতে দিতে বললেন,
“ ওখানে গিয়ে যোগাযোগ করিস, বাবা। ভুলে যাস না কিন্তু!”
অয়ন নিরুত্তর। সাইফুল লাগেজ ধরতে যান,বলেন,
“ চল, এয়ারপোর্ট অবধি…”
পূর্বেই টেনে নিলো অয়ন,
“ না চাচ্চু, আমি একা যাব। এই সফর আমার একার!”
“ অয়ন!”
“ প্লিজ চাচ্চু!”
সাইফুল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
অয়ন সদর দোর অবধি হেঁটে গেল,কী ভেবে থামল হঠাৎ। ঝট করে ঘুরে চাইল পেছনে। গেস্টরুমের দরজা আগলে দাঁড়িয়ে ছিল তুশি। ও তাকাতেই একটু গুটিয়ে গিয়ে চটপট চিবুক নুইয়ে ফেলল। মেয়েটার চোখেমুখের গাঢ় অস্বস্তি ওখানে দাঁড়িয়েই যেন পড়ে ফেলল অয়ন। নিষ্প্রাণ চোখে নীরস হেসে ভাবল,
“ সুখী হও, তুশি। স্বামী,সন্তান নিয়ে তোমার সংসার ভরে উঠুক। আমার ভালোবাসা আমি চিরতরে আমার হৃদয়েই দাফন করে দিলাম!”
অয়ন পা বাড়ায়, এগিয়ে যায়। ঢোক গিলতে গিলতে ভাবে,
“ এই জন্মে তো আমার হলে না। অন্তত,
পরের জন্মে আমার হয়ে এসো।”
সহসা এই কথার বিরোধিতা এলো। ভেতরের অদৃশ্য সত্ত্বাটা হতাশ সুরে বলল,
“ পরজন্ম বলতে কিছু হয় না রে পাগল!”
অয়নের বুকে কামড় পড়ল। প্রহার ঠেকাতে আর দাঁড়াল না। তড়বড়িয়ে পায়ের গতি বাড়িয়ে বেরিয়ে গেল বাইরে। তুশির হঠাৎ খেয়াল পড়ল ইউশা কোথাও নেই। সে কী! অমনি বিদ্যুতের মতো গতিতে দোতলায় ছুটল মেয়েটা। ইউশার কেন যেন আজ ঘুম জেঁকে বসেছে। মরার মতো বিছানায় শুয়ে আছে মেয়েটা। তুশি হন্তদন্ত পায়ে দৌড়ে গিয়েই গা ঝাঁকিয়ে বলল,
“ ইউশা,ইউশা,
অয়ন ভাই চলে যাচ্ছে ইউশা!”
তড়াক করে চোখ মেলল মেয়েটা। থমকে চেয়ে রইল দু পল। তুশি তাগিদ দিলো ব্যস্ত হয়ে,
“ তাড়াতাড়ি যাও ইউশা,চলে যাচ্ছেন উনি।”
কথাটা মাথায় ঢুকতেই ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল মেয়েটা। পরপরই ঝোড়ো হাওয়ার বেগে ছুটল সেই পথে।
গাড়ি লনে ছিল। দরজা খুলে উঠতে গিয়েও থামল অয়ন। এক পল চাইল বাড়ির দিকে। ভ্রু কুঁচকে ভাবল,
“ ইউশা কোথায়? ওকে তো দেখলাম না! ঘুমোচ্ছে এখনো?”
ড্রাইভার বললেন,
“ স্যার, সময় হয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় যা জ্যাম!”
ফোস করে শ্বাস ফেলে উঠে বসল অয়ন। দরজা আটকে দিতেই ইঞ্জিন চালু হয় গাড়ির। তীব্র বেগ নিয়ে বাড়ির বিশাল গেইট পেরিয়ে যখনই ওটা বাইরে চলে গেল,বাড়ির ভেতর থেকে পাগলের মতো ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে এলো ইউশা। উদ্ভ্রান্তের ন্যায় হাত বাড়িয়ে ডাকল,
“ অয়ন ভাই,অয়ন ভাই!”
অয়ন ঐ ডাক শোনেনি। গাড়ির চাকা সমেত ধুলো উড়িয়ে মূহুর্তেই হাওয়া হলো সে।
ইউশা গেইট অবধি ছুটে যায়। পায়ে জুতো নেই। তাও কুলোতে পারল না। থেমে গেল ক্লান্ত দেহে। সাথে ঝনঝন করে ভেঙে পড়ল হৃদয়টা। অবসন্ন চোখদুটো নিথর হয়ে ভাবল,
“ নিজের দুঃখ ভুলতে আমাকে দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে গেলে,অয়ন ভাই?
এত কাঁদব বলেই কি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম!”
চলবে…
শুনুন, অয়ন এখানে সাইড নায়ক নয়। ও এখানে দ্বিতীয় নায়ক!
মানে দুজন নায়কের দ্বিতীয়জন। তাই ওর গল্পও আসবে,ওর কাহিনীও থাকবে। সার্থ-তুশির বাসরের জন্যেই গল্প কন্টিনিউ করা লোকজন প্লিজ আমার কমেন্টবক্সে আসবেন না। আই রিকুয়েষ্ট ইউ!
আর গল্প কত বড়ো হবে,এটা আমার ব্যাপার। লিখছি আমি,কষ্ট আমার হচ্ছে। আপনার এসব নিয়ে ভাবার তো দরকার নেই। আমি কথা দিয়ে রাখিনি গল্প কত পর্বে শেষ করব। আমার কাহিনী যতদূর অতদূর আমি যাব। আপনার কথায় শেষ করব না। আপনার জন্যে সর্বোত্তম পদক্ষেপ হবে,এই ভীষণ বাজে গল্পটা ইগ্নোর করে যাওয়া। লেখক আপনার কথায় চলবে না,এটুকু একজন বিচক্ষণ পাঠকের বোঝা উচিত! ভালোবাসা সব সময়! ❤️
Share On:
TAGS: কাছে আসার মৌসুম, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৭
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২৯(ক+খ)
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬৭
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫০(প্রথমাংশ+ শেষাংশ)
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৭ ক