Golpo romantic golpo অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা

অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৮৩


অ্যাঞ্জেল_অ্যাঞ্জেলিনা

[পর্ব ৮৩]

লেখিকাফারহানানিঝুম

(
দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয়।)
(
কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)
(
নিচের নোট অবশ্যই পড়বেন।)
[দ্বিতীয় খন্ড]
বোর্ডটি সমুদ্রতটে স্পর্শ করতেই রাইফেল কেসটি হাতে নিয়ে ধীর, পরিমিত পদক্ষেপে অগ্রসর হতে লাগল শার্পশুটার। দৃষ্টি আড়াল করে রেখেছে কৃষ্ণবর্ণ সানগ্লাস। সর্বাঙ্গ আবৃত অন্ধকারের মতো নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল স্যুটে; দূর থেকে তাকে মানুষ নয়, চলমান ছায়া বলেই মনে হচ্ছিল।
হাঁটতে হাঁটতেই কানে লাগানো ব্লুটুথ ডিভাইসটিতে আঙুল ছুঁইয়ে সক্রিয় করল সে। কণ্ঠে ছিল নিঃস্পৃহ শীতলতা, যেন সদ্য একটি প্রাণঘাতী মিশন সম্পন্ন করেও তার স্নায়ুতে বিন্দুমাত্র আলোড়ন নেই।
“মাই পেমেন্ট অন টাইম। নো ডিলেইস। অ্যান্ড আফটার টুডে, ইয়োর রোড অ্যান্ড মাইন উইল নেভার ক্রস এগেইন। গুডবাই।”
শেষ শব্দটি উচ্চারণ করেই কোনো প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা করল না। ব্লুটুথ ডিভাইসটি কর্ণ থেকে খুলে নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তাল সমুদ্রের বুকে নিক্ষেপ করল। ক্ষুদ্র যন্ত্রটি মুহূর্তেই ঢেউয়ের অতল গহ্বরে বিলীন হয়ে গেল যেন তার সঙ্গে ডুবে গেল এই মিশনের সমস্ত যোগাযোগ, সমস্ত চিহ্ন।
অগ্রসর হতে হতে শরীরে জড়ানো ট্যাকটিক্যাল জ্যাকেটটিও খুলে উল্টো দিকে ছুড়ে ফেলল সে। নিমেষেই বদলে গেল তার অবয়ব; কয়েক সেকেন্ড আগের পেশাদার ঘাতকের পরিবর্তে এখন সে যেন একেবারেই সাধারণ পথচারী।
কিছুটা দূরে অপেক্ষমাণ গাড়িটির দরজা খুলে নির্বিকার ভঙ্গিতে ভেতরে প্রবেশ করল। পরমুহূর্তেই ইঞ্জিন গর্জে উঠল।
এক ঝটকায় গাড়িটি সামনে ছুটে গেল। চোখের পলকে দিগন্তরেখায় মিলিয়ে গেল সেই রহস্যময় শার্পশুটার।


জ্ঞান হারানোর পর আর গোপন রইল না কিছুই। এহসান মঞ্জিলের প্রতিটি মানুষ জেনে গেল ন্যান্সি মাতৃত্বের প্রথম অধ্যায়ে পদার্পণ করেছে। যে সংবাদটি সে প্রাণপণে আড়াল করে রাখতে চেয়েছিল, সেটাই যেন মুহূর্তের মধ্যে বিস্ফোরিত হয়ে সমগ্র মঞ্জিলে ছড়িয়ে পড়ল। বহুদিন যত্নে লুকিয়ে রাখা গোপনীয়তা যেন এক নিমিষেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
মাইমুনা এহসানের ক্ষোভ ছিল ভাষাতীত। ক্রোধ, উৎকণ্ঠা আর অভিমানের মিশেলে তিনি ন্যান্সিকে কঠোর ভর্ৎসনা করলেন। এমন দুঃসময়ে নিজের শরীরের এত বড় পরিবর্তনের কথা গোপন রাখার দুঃসাহস কোনোভাবেই মেনে নিতে পারলেন না তিনি।
কিন্তু ন্যান্সি অনড়। কাঁপা কণ্ঠে, অথচ অবিচল দৃঢ়তায় সে শুধু একটি কথাই বারবার বলল,
“প্লিজ,আফরিদ যেন কিছুতেই জানতে না পারে। সে এখন নিজেই মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। এই অবস্থায় যদি জানতে পারে সে বাবা হতে চলেছে, তাহলে এক মুহূর্তও ওখানে থাকবে না। নিজের শরীরের কথা ভুলে তড়িঘড়ি দেশে ফেরার চেষ্টা করবে। আমি তাকে চিনি সে এমনটাই করবে।”
ন্যান্সির প্রতিটি শব্দ গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলল মাইমুনা এহসানকে। তিনি নিজের বড় ছেলেকে অন্য সবার চেয়ে ভালো করেই চেনেন। আফরিদ এহসান আবেগের বশবর্তী হয়ে কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে, সে বিষয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র সংশয় নেই।
দীর্ঘ নীরবতার পর অবশেষে তিনি এক গভীর নিঃশ্বাস ফেললেন।
“ঠিক আছে,আপাতত ওকে কিছুই জানানো হবে না। ও সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ফিরুক, তারপর সব জানবে।”
কথাটি উচ্চারণ করলেও তাঁর অন্তরে অদৃশ্য এক আশঙ্কা দানা বাঁধল। কারণ তিনি জানেন সত্যকে বেশিদিন আড়াল করে রাখা যায় না। কোনো না কোনোভাবে সে একদিন নিজেই আলোয় এসে দাঁড়ায়।
বেশ সময় নিয়ে উঠে দাঁড়ালো ন্যান্সি। জামাকাপড় নিয়ে ওয়াশ রুমে ফ্রেশ হয়ে ওজু করে বেরিয়ে এলো,
রজনীর এশার প্রহর। নীরব ইবাদতকক্ষে নতজানু হয়ে বসে ন্যান্সি। এ কক্ষ যেন তার ব্যক্তিগত তাওবার আশ্রয়স্থল যেখানে পার্থিব কোলাহলের কোনো প্রবেশাধিকার নেই; আছে শুধু সিজদাহর প্রশান্তি, অশ্রুসিক্ত ইস্তিগফার আর রবের সান্নিধ্যের নিবিড় প্রশান্তি।
বাইরে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ বাতাস জানালার কাচে নিরবচ্ছিন্ন অভিঘাত হানছে। অথচ সেই তাণ্ডবের বিপরীতে কক্ষজুড়ে বিরাজ করছে এক অপার্থিব নীরবতা।
দ্বারপ্রান্তে এসে যে-ই দৃষ্টি নিবদ্ধ করুক, দেখতে পাবে ন্যান্সি সালাম ফিরিয়ে দু’হাত আকাশমুখী করে মুনাজাতে নিমগ্ন। সমগ্র সত্তা উজাড় করে সে তার রবের দরবারে নিজেকে সমর্পণ করেছে। অশ্রুভারে রঞ্জিত নয়নযুগল, কণ্ঠ বারবার রুদ্ধ হয়ে আসছে। স্বামীর রক্তাক্ত সংবাদ যেন তার বুকের প্রতিটি স্পন্দনকে বিদীর্ণ করে চলেছে।
অবশেষে কাঁপা কণ্ঠে নিজের হৃদয়ের সবচেয়ে গোপন স্বীকারোক্তিটি নিবেদন করল সে,
“ইয়া রব… আমি আপনার কাছেই স্বীকার করছি আমি আমার স্বামী, আফরিদ এহসানকে ভালোবাসি। তার ভালোবাসাকে আমি আমার অন্তরের গভীরতম স্থানে গ্রহণ করেছি। হয়তো কোনোদিন তাকে মুখে বলতে পারব না; কিন্তু আপনি তো অন্তর্যামী। আপনি তো আমার বুকের প্রতিটি গোপন আর্তি জানেন।
আমি জানি, সে অন্ধকার জগতের একজন মানুষ। তবুও আমার হৃদয় তাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারেনি। আমি তাকে ভালোবাসি, ইয়া রব খুব ভালোবাসি।
আপনি তাকে আমার কাছে সুস্থ-সালামত ফিরিয়ে দিন। তার সব গুনাহের বিচার আপনি করুন, কিন্তু তার প্রাণটুকু কেড়ে নেবেন না। আমার ভাগ্যে যদি কোনো পরীক্ষা লিখেই থাকেন, সেই পরীক্ষার ভার আমার ওপর দিন তার ওপর নয়।
আমার গর্ভে যে ছোট্ট আমানত আপনি দান করেছেন, তাকে যেন তার বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হতে না হয়। আমার সন্তানের মাথার ওপর থেকে পিতার ছায়া সরিয়ে নেবেন না, ইয়া আরহামার রাহিমীন।”


সম্পূর্ণ একটি সপ্তাহ অতিক্রান্ত। এই সাতটি দিনে ন্যান্সি একবারের জন্যও আফরিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। অভিমানের প্রাচীর এতটাই উচ্চতায় পৌঁছেছে যে সমস্ত আকুলতা, সমস্ত টান সে জোর করেই নিজের অন্তরে অবরুদ্ধ করে রেখেছে।
অন্যদিকে বক্ষদেশে শক্ত ব্যান্ডেজ জড়ানো। ধীর পায়ে শয্যা ত্যাগ করতেই শীতল মার্বেলের স্পর্শে কেঁপে উঠল পদতল। মন্থর পদক্ষেপে ড্রেসিং টেবিলের সম্মুখে এসে দাঁড়াল আফরিদ। আয়নায় প্রতিফলিত নিজের প্রতিবিম্বকে দীর্ঘক্ষণ নিরীক্ষণ করল সে। বাঁ দিকের বক্ষদেশে গভীর ক্ষতের দাগটি স্পষ্ট।
পরমুহূর্তেই তার ওষ্ঠপ্রান্ত বক্র হয়ে উঠল। অকস্মাৎ অট্টহাস্যে ফেটে পড়ল সে। সেই হাসির অভিঘাতে প্রশস্ত, দুর্গসম বক্ষও হালকা দুলে উঠল।
“ইডিয়ট! গুলি চালাতে শিখেছিস ঠিকই, কিন্তু নিশানা এখনও শিশুদের মতো। ভেবেছিলি হৃদপিণ্ডে বিদ্ধ করবি? ব্যাড লাক, ডিয়ার! আমার হৃদয় তো বহু আগেই গাদ্দারি করে ডান পাশে গিয়ে বসেছে। মনে হচ্ছে তোদের শার্পশুটারটা বদলানোর সময় হয়েছে।”
নিজের রসিকতাতেই আবারও মৃদু হেসে উঠল আফরিদ। এলোমেলো কোঁকড়ানো কেশরাশি আঙুলে পেছনে ঠেলে দিয়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করল। মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা মেরে ফিরে আসতেই শয্যার ওপর পড়ে থাকা মোবাইলটি তুলে নিল।এক মুহূর্ত দেরি না করে তিতলির নম্বরে কল করল। এদিকে এহসান মঞ্জিলের রান্নাঘরে ব্যস্ত ছিল তিতলি। ফোনের স্ক্রিনে আফরিদের নাম ভেসে উঠতেই চারপাশে সতর্ক দৃষ্টি বুলিয়ে নিঃশব্দে রান্নাঘর ত্যাগ করল সে। দূরে ডাইনিং টেবিলে ন্যান্সি অন্যমনস্ক হয়ে বসে আছে। দৃষ্টি কোথাও নেই, অথচ দৃষ্টি যেন সর্বত্র।
তিতলি কণ্ঠ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“হ্যাঁ ভাইয়া,ইলহাম আপু এখানেই আছে। দাঁড়ান, আমি ভিডিও কল দিচ্ছি।”
ওপাশে আর কোনো শব্দ করল না আফরিদ। নিঃশব্দে অপেক্ষা করতে লাগল।কয়েক সেকেন্ড পর ভিডিও কল সংযুক্ত হতেই তিতলি কৌশলে ক্যামেরা ঘুরিয়ে ন্যান্সির দিকে ধরল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল সেই চিরচেনা মুখ।মুখশ্রী মলিন, নয়নদ্বয়ে ঘুমহীনতার ছাপ, অথচ তার সমস্ত সৌন্দর্যকে ম্লান করার সাধ্য যেন কারও নেই।আফরিদ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল।এমন এক দৃষ্টিতে, যেন সাত দিনের সমস্ত শূন্যতা এক নিমিষে পূরণ করে নিতে চায়।
তার মনে পড়ে গেল বহু বছর আগের সেই প্রথম দেখা। তখন তাদের সম্পর্কের কোনো নাম ছিল না। কোনো বন্ধন ছিল না। তবু অজ্ঞাত এক দুর্বলতা নিঃশব্দে দখল করে নিয়েছিল তার দুর্ধর্ষ হৃদয়কে।
আর আজ আজ এই নারী শুধু তার প্রিয়তমা নয় তার অর্ধাঙ্গিনী, তার অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তাকে ছেড়ে দেওয়া? অসম্ভব। বারো বছর আগে পারেনি আজ তো আরও নয়।
ওষ্ঠের কোণে এক অপার্থিব কোমল হাসি ফুটে উঠল। স্ক্রিনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়েই প্রায় নিঃশ্বাসের মতো ক্ষীণ স্বরে উচ্চারণ করল,
“আমার বাঘিনী!”


“আমি এই দুনিয়ায় আসতে চাইনি। আমাকে এক প্রকার জোর করেই আনা হয়েছে।”
ইস্ক্রিয়াস রাইসার পাশেই বসে আছে।‌ সমুদ্রের ধারে দুজনেই। বাতাসে চুল গুলো অবাধ্য হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে কন্যার।‌ ইস্ক্রিয়াস একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে তার দিকে।
“তারপর?”
রাইসা পাশ ফিরে তার দিকে তাকালো। রাইসা জানে সে যা বলবে তারপর হয়তো সামনের মানুষটি তাকে ঘৃণা করবে! প্রচন্ড রকম ঘৃণা!
“আমার মা ছয় বছর বয়সে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। আমার বাবা মতিউর রহমান দ্বিতীয় বিয়ে করেন তার ঠিক পাঁচ মাস পর। সৎ মা রেশমি খুব একটা খারাপ ছিলো না।‌ বহু যুগ ধরে সৎ মায়েদের উপর লেগে আসা অরূপ অনুযায়ী আমিও তাকে খারাপ ভাবতাম। কিন্তু দিনকে দিন আমার চিন্তা ভাবনা বদলায়। সৎ মা ততটা খারাপ হয়নি, আমাকে ভালোবাসতো। কিন্তু মাঝে মাঝে বকাও দিতো,ওইযে আপন মায়েরা যেমন সন্তানকে শাসন করে ওরকম।”
এতটুকু বলে থামল রাইসা। ইস্ক্রিয়াস মুখিয়ে আছে তার অতীত জানার জন্য।
“আমি যখন আট বছর বয়সী তখন থেকে আমার বাবার মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। গরিব ছিলাম, টানাপোড়েনের সংসার আমাদের। নোন আনতে পান্তা ফুরায় এমন অবস্থা। এর মধ্যে সৎ মায়ের পরপর দু’টো ছেলে হয়ে মারা যায়। দু দুবার ডেলিভারিতে কাড়ি কাড়ি টাকা খসেছে বাবার। চারিদিকে ঋণ আর ঋণ।বাবা অতিষ্ঠ হয়ে গেছেন ঋণ শোধ করতে করতে। একসময় ক্লান্ত হয়ে বিছানায় পড়লেন। একেতো আমাদের অবস্থা খারাপ তার উপর বাবার ওমন অবস্থা।বুঝে উঠতে পারছিলাম না কি করব!
তারপর সৎ মা বাড়িতে বাড়িতে কাজ শুরু করলেন,আর আমি ঘর সামলাতে লাগলাম। মহিলা আমাকে বাইরে কাজ করতে দেননি। আমি বুঝে গেলাম পৃথিবীতে সকল সৎ মা খারাপ হয় না, মাঝে মাঝে তারা আপন মায়ের চেয়ে ঢের ভালো।”
ইস্ক্রিয়াস শুষ্ক ঢোক গিলল, উদগ্রীব হয়ে শুধোয়।
“তারপর?”
রাইসা অনূভুতিহীন কন্ঠে বলে উঠে,
“তারপর একদিন বাবা মা’রা যান। এত এত ঋণের সাগরে ডুবিয়ে নিজেই মুক্ত পাখির মতো উড়ে গেলেন। সেদিন সৎমা প্রচুর কেঁদেছেন। আমি দেখেছি সেই কান্না। এরকম ভাবেই চার পাঁচ মাস পেরিয়ে গেল। মায়ের বাড়ি থেকে ওনাকে আবার বিয়ে দেওয়ার জন্য জোর করা হচ্ছে। কিন্তু উনি বিয়ে করছেন না আমার জন্য। সন্তান নেই উনার, কেউ বাঁচেনি একমাত্র আমিই ছিলাম। তারপর বিয়ে করলেন শেষমেষ। আমাকে নিয়েই নতুন স্বামীর ঘরে বউ হয়ে গেলেন।‌ প্রথম প্রথম তারা আমাকে মেনে নিলেও পরে অবহেলা করতে শুরু করে। আড়ালে আবডালে মা’রধর পর্যন্ত করেছে। আমি এতিম মেয়ে, কাউকে মুখ ফুটে কিচ্ছুটি বলতাম না। স’হ্য করতাম। সৎমা স্বামীর পাশাপাশি আমারও খেয়াল রাখতেন। এরপর গ্রাম ছেড়ে চলে এলাম শহরে। ওখানে নতুন বাবা চাকরি শুরু করলেন। হঠাৎ করেই তার স্বভাব চরিত্র বদলে যেতে লাগল। মদ গাঁ’জা,এমন কি নেই যাতে সে আসক্ত হয়নি? সৎমা দিনকে দিন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। শেষমেষ সংসার চালাতে মানুষের বাড়িতে কাজ শুরু করলেন। দেখতে দেখতে আরো একটা বছর পেরিয়ে গেল। আমিও বড় হচ্ছি,চোখে লাগার মতো শরীর হয়েছে, তেমন সৌন্দর্য। মানুষের চোখেও পড়ি। তাদের অশালীন দৃষ্টি ভঙ্গি চিনতে শুরু করি, তারপর থেকে আর বাইরে তেমন একটা বের হইনা। মাঝে মাঝে আশেপাশের সমবয়সী মেয়েগুলোর সাথে মিশতাম তাদের সাথেও আর মিশি না। খেলার ছলে কেউ কেউ আমার গায়ে বাজে স্পর্শ করত, সেগুলো বুঝতে শুরু করেছি।”
এটুকু বলেই গলা ধরে এলো রাইসার। ইস্ক্রিয়াসের বুক কাঁপছে তার কথাগুলো শুনে। রাইসা দম নিয়ে ফের বলল,
” সৎমা গর্ভবতী হলেন, তার একটা মেয়ে হলো। মেয়েটা সুন্দর। আমার বোন তিশা। ছোট্ট একটা পরী এলো আমাদের জীবনে। ততদিনে সৎ বাবার আরো অধঃপতন হতে লাগলো। খারাপ হচ্ছে দিনকে দিন। এদিকে সৎমা বোনকে আমার কাছে রেখে কাজ করতেন। একা পুরোটা সংসার চালাতেন। সেই রাগে দুঃখে, কষ্টে মাঝে মাঝে আমাকে খুব কড়া কথা শুনিয়ে দিতেন। আমিও তা চুপচাপ শুনতাম। বড় হচ্ছিলাম তো তাই মায়ের কষ্টটা বুঝতাম। আমারো ইচ্ছে করতো কোনোভাবে তাকে সাহায্য করার কিন্তু পারতাম না। কি বা করে সাহায্য করতাম? একদিন রাতে মা বেশ দেরি করল ফিরতে। তখন সন্ধ্যা সবে নেমেছে। সৎ বাবা ফিরলেন ম’দ খেয়ে। বাবাকে আমি ভয় পেতে শুরু করেছি। হুটহাট মায়ের সাথে ঝগড়া করতেন, গায়ে হাত তুলতেন। সে-ই থেকেই ভয়টা গাঢ় হয়েছে। সেদিন বাবা অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তারপর?”
আবারো থেমে গেল রাইসা। তার হাতটা খামচে ধরে ইস্ক্রিয়াস। টুপ টুপ করে চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো অশ্রু কনা।
“আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম জানেন? আমার প্রচন্ড ব্যথা লেগেছিল শরীরে। আমি তো জানতাম সে আমার বাবা হয়।যতই সৎ হোক সে আমাকে কষ্ট দেবে না। কিন্তু আমার ভাবনাকে ভুল প্রমাণিত করেছে ওই লোকটা। আমি কেঁদেছিলাম। কান্নার শব্দে এতটাই বিরক্ত হয়েছিল যে আমার মুখ বেঁধে দিয়েছিল। বিশ্বাস করুন ইন্সপেক্টর এতটা কষ্ট হয়েছিল কাউকে বুঝাতে পারব না। তারপর রাতে মা ফিরল। আমার ঘরে এসে নিথর আমিটাকে পড়ে থাকতে দেখে যেন ওনার দম আটকে গেল। সে কি কান্না ওনার, অথচ যে লোকটা এসব করেছে তার বিন্দুমাত্র হেলদোল নেই। লোকটা উল্টো কি বলেছে জানেন? বলেছে “ও তো আমার নিজের মেয়ে না। ওর সঙ্গে র’ক্তের সম্পর্ক নাই,তাইলে বিছানায় নিতে সমস্যা কই?” সেদিন আমি আর থাকে বাবা বলে ডাকতে পারিনি। দিন পেরিয়ে গেল। আমিও ভয়ে সেঁধিয়ে গেলাম। লোকটা আমার মায়ের উপর অত্যাচার করতে লাগলো সাথে আমার উপরেও। তিশার মুখের দিকে তাকিয়ে মুখ বুজে স’হ্য করতে লাগলেন তিনি। একদিন হুট করে আমার হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে বললেন পালিয়ে যেতে। যেখানে ইচ্ছে পালিয়ে যেতে ওই জা’হান্নাম থেকে। একবারও ভাবলো না আমি কোথায় যাবো?কি করব? কিছুই বলে দেননি। একা একটা মেয়ে বেরিয়ে পড়লাম।জানিনা কি হবে এরপর!”
ইস্ক্রিয়াস বড় একটা ঢোক গিলে বলল,
“তারপর কি করলে?”
রাইসা ম্লান হেসে বলল,
“তারপর আবার আমার সাথে অন্যায় হলো। আমি যাদের বিশ্বাস করি তারাই ঠকিয়ে দেয়। আমি একটা গার্মেন্টসে কাজ নিলাম,ছোট ছিলাম এরচেয়ে বড় কিছু করা আমার দ্বারা সম্ভব ছিলোনা। এর মধ্যে পরিচয় হলো দুজনের সাথে। একটা মেয়ে আর একটা ছেলে। দু’জনের আমার ভালো বন্ধু হয়ে উঠল। আমি ওদের নিজের ভাই বোন মনে করতাম। কিন্তু আমি কি করে জানবো যা’কে ভাই মনে করতাম সে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ! জানতাম না, বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু বিশ্বাসের মূল্য আবারো নিজের সম্মান দিয়ে দিতে হয়েছিল। আমি আর ওই মেয়েটা যাকে বোন ভেবেছিলাম দুজনকে অমানবিক নির্যাতন করল। তারপর বিক্রি করে দিলো। মেয়েটা কোথায় জানিনা, কিন্তু আমার স্থান হলো স্পেন,এই দেশে। আমাদের দিয়ে খুব বাজে বাজে কাজ করানো হতো। এতটা নোংরা কাজ যা শব্দে ব্যাখা করতে পারব না ইন্সপেক্টর। কষ্ট হতো,খুব কষ্ট হতো। একটা সময় ভেবে নিয়েছিলাম এটাই বোধহয় আমার ভবিতব্য। ভেতরে ভেতরে চাপা রাগ হয়েছিল নিজের সৎ মায়ের উপর। আচ্ছা উনি চাইলে কি পারতেন না ওই লোকটার সংসার ত্যাগ করে আমাকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে? পারেননি কারণ আমি উনার আপন মেয়ে ছিলাম না। আমার জায়গায় যদি বোন হতো তাহলে বোধহয় সেটাই করতেন।
দিন পেরিয়ে যাচ্ছে,আমি একই কাজ করছি ‌। কোনো আশার আলো নেই ওই জায়গা থেকে বেরুনোর। হঠাৎ একদিন একটা লোক এলো। সুদর্শন সুপুরুষ বটে।তাকে দেখলাম। সবগুলো মেয়েকে তার সামনে দাঁড় করানো হলো কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় লোকটা কোনো রকম আগ্রহ প্রকাশ করেনি। মালিকের সাথে আলাপ করেছে কিছু একটা নিয়ে। তারপর একটা মেয়েকে সিলেক্ট করে ভেতরে পাঠানো হলো। মনে মনে ভাবলাম আবারো সেই সব কিছু ওর সঙ্গে হবে যা আমাদের সঙ্গে হয় রোজ। মেয়েটা দশ মিনিটের মাথায় বেরিয়ে এলো নত মস্তকে। তারপর আমাকে পাঠানো হলো। লোকটার সামনে দাঁড়ালাম। ভেবেছিলাম হয়তো বলবে কাপড় খুলতে অথচ উল্টোটা হলো। আমাকে জিজ্ঞেস করল।
“পুলিশের সাথে প্রেম করতে পারবে?”
আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মাত্রাতিরিক্ত সুদর্শন সেই পুরুষের গভীর নীল মণি জোড়া।কি সুন্দর সে। স্বীকার করতেই হবে তার মতো সুদর্শন পুরুষ আমি এর আগে দেখিনি। লোকটা বলল পুলিশের সাথে প্রেম করতে হবে। তথ্য দিতে হবে। একটু আগের মেয়েটা সব শুনে ভয়ে এগুতে পারেনি ,মানা করে দিয়েছে। কিন্তু আমার বড্ড লোভ হলো এখান থেকে বেরুনোর। আমি বাঁচতে চাইতাম। কিন্তু ভয় হচ্ছিল শুধু কি পুলিশের সাথে সম্পর্ক নাকি অন্য কিছু? লোকটা ভরসা দিলো। রাজি হয়ে গেলাম। চলে গেলাম। তারপর দেখা হলো একদিন পুলিশ অফিসারের সাথে। এর আগেই লুসিফার এলেন ইদ্রান আমাকে তার সম্পূর্ণ ডিটেইল দিয়েছিল। তাকে চিনতে পারলাম, সম্পর্কের সূচনা হয়, মিথ্যে ভালোবাসার নাটক করলাম।। মিথ্যে বললাম, তথ্য পাচার করলাম। সবশেষে ঠকালাম।”
শেষের কথাটা বলে ম্লান হাসলো রাইসা। ইস্ক্রিয়াস তাকিয়ে আছে তার দিকে। অকস্মাৎ তার এই নিরবতা ভেতর থেকে ছিঁড়ে দিচ্ছে রাইসাকে। চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছে। আমতা আমতা করে বলল,
“আমি খারাপ ছিলাম না।এই দুনিয়াটা আমাকে খারাপ বানিয়ে দিয়েছে। আমার শৈশব সব কেড়ে নিয়েছে। বদলে দিয়েছে অমানিশা!”
“মিথ্যে কথা। মিথ্যে বললে তুমি।”
মিথ্যে শুনে বুকের ভেতর ধক করে উঠল রাইসার।
কম্পমান ওষ্ঠো জোড়া ভিজিয়ে বলল,
“একফোঁটা মিথ্যে নেই এতে। আমি সত্যি বলছি।”
হালকা হাসলো ইস্ক্রিয়াস। হাত বাড়িয়ে ওই ভেজা আদল আঁজলায় তুলে নিল,
” আমাকে ভালোবাসা মিথ্যে ছিলো না তোমার। ভালোবেসেছিলে ‌,তবে কেন বললে নাটক?”
থমকে গেল রাইসা। পলকহীন চোখে চেয়ে আছে ধূসর রঙের চোখের দিকে।
সত্যি কি কাউকে ভালোবাসতে পারবে তার মতো অপবিত্র একটি মেয়ে? কখনোই না। তাকে তো কেউ ছুঁয়েও দেখবে না। ঘেন্নায় মুখ ফিরিয়ে নেবে।
চলবে………….।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply