#অ্যাঞ্জেল_অ্যাঞ্জেলিনা
[পর্ব ৭৯]
#লেখিকা_ফারহানা_নিঝুম
( দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয়।)
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)
[দ্বিতীয় খন্ড]
রুম জুড়ে পিনপতন নীরবতা, সে নিরবতায় নত মস্তকে অপরাধী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাইসা। ওষ্ঠো কাঁপছে কন্যার। হাতে হাত কচলে চলেছে।
প্রাণ যায় যায় অবস্থা! সেই পিনপতন নিরবতা ভেঙ্গে গেল জুতোর শব্দে। এদিক সেদিক পায়চারী করতে লাগলো ইদ্রান। তার পায়চারী করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।এই যে রাইসা এমন অদ্ভুত একটা কান্ড করে বসলো যা তার করাই উচিত হয়নি! এই কাজের বিষয়টা যদি কোনো ভাবে আফরিদ জানতে পারে তাহলে কি হতে পারে সেটার ধারণা নেই মেয়েটার।
“তোমার ধারণা আছে এই বিষয়টা আফরিদের কানে গেলে কি হবে?”
রাইসা আরো একবার কেঁপে উঠলো, মাথা নুইয়ে নিলো আরো। অপরাধীর ন্যায় বলল,
“আসলে… আমি বুঝতে পারিনি এমন কিছু হয়ে যাবে। হঠাৎ করেই সবটা ঘটেছে তাই….
“তাই তুমিও ভুলটা করে ফেললে তাইতো? ওয়াও এত বুদ্ধি রাখো কোথায় রাইসা? আমি তোমাকে বুদ্ধিমতি ভাবতাম কিন্তু তুমি তো নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিলে!”
রাইসা অসহায় এই মূহুর্তে। সেও কল্পনা করেনি এমন কিছু হবে বলে! সত্যি তো একবারও ভাবেনি আফরিদ এহসান জানতে পারলে ঠিক কি হতে পারে! যদি ভাবতো তাহলে এমন কিছু করার সাহস করতো না!
রাইসা আকাশসম সাহস সঞ্চয় করে কষ্টেসৃষ্টে বলে,
“এখন কি হবে ইদ্রান ভাইয়া?”
ইদ্রান দুহাত কোমড়ে তুলে চিন্তিত পায়ে এদিক সেদিক করে চলেছে।
“আই ডোন্ট নো কি হবে! বাট আই নো আফরিদ জানলে খুব বাজে কিছু হবে।”
অগোচরে শুষ্ক ঢোক গিলল রাইসা।
“আফরিদ এখনো মঞ্জিলে আছে, বিকেলে আসবে বলেছে মিস্টার আলবার্টের সঙ্গে দেখা করতে। দেখা যাক কী হয়!”
ইদ্রানের কথায় চিন্তা বেড়েই চলেছে রাইসার। ভুল করে ফেলেছে সে, খুব বড় ভুল। উচিত হয়নি তার এটা করা।
পরণে একটা বাথরোব জড়িয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েছে মাইমুনা এহসান। ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে তৈরি হতে লাগলেন। প্রতিদিনের মতো মুখে ক্রিম লাগালেন, গলায় পারফিউম স্প্রে করে কাবার্ড থেকে গাঢ় সবুজ রঙের একটা সিল্কি শাড়ি বের করে আনেন। শাড়িটা পরণে সময় লাগল মাত্র দশ মিনিট। একদম তৈরি হয়ে বেরুতেই যাবেন ওমনি দরজার সম্মুখে এসে দাঁড়ায় ন্যান্সি।
“তুমি এখানে?”
মাইমুনা এহসান গম্ভীর কন্ঠে বললেন, ওনার তীক্ষ্ণ চাহনিতে ভয় পেলো ন্যান্সি। সে এমন একজন মায়ের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে যার সন্তানের খু’নি সে! নিজের হাতে শেষ করে দিয়েছে ওই নরপশুকে। ন্যান্সি সামান্য ঢোক গিলে বলল,
“আমার আপনার সাথে কথা ছিলো,মা।”
মাইমুনা এহসান মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তীব্র রাগ নিয়ে বলেন,
“তোমার সাথে আমার কোনো কথা নেই। নিঃসন্দেহে এমন কারো সাথে আমি কথা বলতে চাইনা যে আমার বুক খালি করে আমার ছেলেকে কেড়ে নিয়েছে।”
বুকের ভেতর হুহু করে কেঁদে উঠলো ন্যান্সির। সে নিজের নির্দোষ হওয়ার দাবি করে বলল,
“আপনার ছেলে কোনো মহা পুরুষ ছিলোনা মা।সে আমার পরিবারকে আ’গুনে জ্বালিয়ে মে’রে ফেলেছে।”
মাইমুনা এহসান ন্যান্সির কথায় ভীষণ রেগে গেলেন। বাজখাঁই কন্ঠে চিৎকার করে বলেন,
“চুপ,একদম চুপ। মিথ্যেবাদী মেয়ে কোথাকার। এতক্ষণে তোমাকে আমি শেষ করে ফেলতাম, তুমি এখনো বেঁচে আছো শুধুমাত্র আফরিদের কারণে। আফরিদ মাঝখানে না এলে তোমার অস্তিত্ব এই পৃথিবীতে আর কেউ খুঁজে পেতো না!”
ন্যান্সি মাইমুনা এহসানের এই রাগের সাথে পরিচিত নয়। কেঁপে উঠে দুকদম পিছিয়ে গেল সে।চোখ ভিজে ওঠে তার।মাইমুনা এহসান আগের ন্যায় বলেন,
“আফরিদ। শুধুমাত্র আফরিদ আছে বলেই তুমি আছো। আমার সন্তানকে কেড়ে নিয়ে কি ভেবেছ যা বলবে তাই আমি বিশ্বাস করে নেব? উঁহু কখনো নয়। কি প্রমাণ আছে তোমার কাছে আমার নীলাদ্রি তোমাকে পালিত পরিবারকে শেষ করেছে?”
ন্যান্সি প্রত্যুত্তরে কিছু দেখাতে পারল না।
“আমার সামনে থেকে দূর হয়ে যাও ইলহাম নয়তো খুব খারাপ কিছু হবে বলে দিলাম।”
ন্যান্সি নড়ল না উল্টো জিজ্ঞেস করল।
“কাল রাতে আপনি কোথায় ছিলেন?”
কপালে ভাঁজ গাঢ় হলো মাইমুনা এহসানের।
“মানে? কোথায় আর থাকব বাড়িতে ছিলাম! কি আশ্চর্য তুমি আমাকে এসব জিজ্ঞেস করার সাহস কোথা থেকে পাচ্ছো?”
ন্যান্সি দ্বিধাহীন চিত্তে বলে ওঠে,
“আপনিই আমাকে শেষ করতে চেয়েছিলেন তাইনা,মা? তাইতো ছদ্মবেশ ধারণ করেছিলেন!”
মাইমুনা এহসান তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বললেন,
“তোমার কি মনে হয় ইলহাম? তোমাকে মারতে হলে আমাকে ছদ্মবেশ নিতে হবে? আমি এহসান? এহসানের একজন! আমি মুস্তাক এহসানের স্ত্রী মাইমুনা এহসান! আমার হাতে এতটুকু ক্ষমতা অবশ্যই আছেন যাতে তোমাকে সবার সামনে ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে পারি। তারজন্য আমার কোনো ছদ্মবেশের প্রয়োজন হয় না!”
প্রতিটি গর্জনে গায়ের রোমকূপ দাঁড়িয়ে গেল ন্যান্সির! দৃষ্টি হলো ঝাপসা। মাইমুনা এহসান ক্ষান্ত হননি আজ! হুংকার ছাড়লেন,
“আফরিদ? আফরিদ বেটা, কোথায় তুমি?”
মাইমুনা এহসানের হাঁকডাক শুনে ফোনালাপ রেখে ত্রস্ত পায়ে ছুটে এলো আফরিদ। ন্যান্সি আর মাইমুনা এহসান কে একত্রে দেখে চিবুক শক্ত হয়ে এলো তার।
“হোয়্যাট হ্যাপেন্ড মম?”
মাইমুনা এহসান নিরেট স্বরে বললেন,
“তোমার ওয়াইফকে বলো আমার থেকে দূরে থাকতে। আমি কিন্তু…
“মম প্লিজ!”
কটমট দৃষ্টিতে তাকালেন মাইমুনা এহসান, চোখ ভিজে ওঠে ওনার।
“এই মেয়ে আমার কোথায় আ’ঘাত করেছে সে কি জানে? ওকে আমার থেকে দূরে থাকতে বলো আফরিদ। নয়তো চিরদিনের জন্য আমি এই বাড়ি ছেড়ে স্পেন চলে যাবো। এমনিতেও নিজের ছেলের খু’নির সাথে থাকার চেয়ে দূরে থাকা উত্তম।”
ন্যান্সি একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল, ন্যান্সি বুঝলো আরো কিছু। চার রমণীর চারটি রহস্য।
একটিও অতিরিক্ত শব্দ উচ্চারণ না করে ন্যান্সির কব্জি দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরল আফরিদ। দীর্ঘ পদক্ষেপে তাকে সঙ্গে নিয়ে করিডোর পেরিয়ে নিজের কক্ষের দিকে অগ্রসর হতে লাগল। তার চলার ভঙ্গিতে ছিল অদম্য কর্তৃত্ব, আর নীরবতায় লুকিয়ে ছিল দমিয়ে রাখা ক্রোধ।
ন্যান্সি ব্যথায় মুখ বিকৃত করে উঠল।
“ছাড়ুন… লাগছে আমার।”
আফরিদের চোয়াল আরও শক্ত হয়ে এলো। সংযত অথচ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“তুই এত অবাধ্য কেন? মমের থেকে দূরে থাকতে বলেছি তোকে। কতবার বলেছি? একটা কথাও কি তোর কানে যায়?”
কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই ন্যান্সি ঝটকা মেরে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল।
আফরিদের দৃষ্টি মুহূর্তেই কঠিন হয়ে উঠল।
ন্যান্সিও আর একচুল পিছু হটল না। দৃপ্ত কণ্ঠে বলে উঠল,
“আমি আপনার কথা শুনব কোন অধিকারে? আপনি কি কখনো আমার একটা কথাও শুনেছেন?”
প্রশ্নটা বিদ্যুতের মতো আ’ঘাত করল আফরিদকে। সে বুঝে গেল ন্যান্সি ঠিক কোন প্রসঙ্গের ইঙ্গিত করছে।
ধীরে ধীরে দুই হাত কোমরে রেখে দাঁড়াল সে। ওষ্ঠের কোণে দাঁত বসিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল ন্যান্সির মুখপানে।
ন্যান্সি তাচ্ছিল্যের ক্ষীণ হাসি হেসে বলল,
“এখন থেকে আমাকে কিছু বলার আগে ভেবে বলবেন। আমি আপনার বাধ্য নই যে আপনার প্রতিটি নির্দেশ মেনে চলব।”
কথা শেষ করেই পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্যত হলো সে।
কিন্তু পরমুহূর্তেই তার পদক্ষেপ থেমে গেল।
আফরিদের দৃঢ় বাহু তাকে আবারও নিজের দিকে ফিরিয়ে আনল। ক্ষণিকের ব্যবধানে দুজনের দূরত্ব মিলিয়ে গেল। উত্তেজনায় তার শ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে।
রুদ্ধ কণ্ঠে, সংযত ক্রোধে আফরিদ বলল,
“খুব সাহস বেড়েছে, তাই না?”
ন্যান্সি কোনো উত্তর দিল না। শুধু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার চোখের গভীরে। ভেতরে ঝড় উঠলেও মুখে সেই ঝড়ের ছাপ পড়তে দিল না এক বিন্দুও।
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা ঝুলে রইল দুজনের মাঝখানে।
তারপর আফরিদের চোখের আ’গুন যেন ধীরে ধীরে নিভে এল। ক্রোধের জায়গা দখল করল গভীর ক্লান্তি। বিদায়ের আগে সে আলতো করে ন্যান্সির কাঁধে একবার ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল কথাহীন, অথচ অসংখ্য অপ্রকাশিত অনুভূতির ভার নিয়ে।
এরপর আর একবারও ফিরে তাকাল না।
দীর্ঘ পদক্ষেপে করিডোর অতিক্রম করে অদৃশ্য হয়ে গেল সে।ন্যান্সি স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইল একই জায়গায়।
শূন্য করিডোরের দিকে নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে শুধু অনুভব করল কয়েক মুহূর্ত আগেও যে উপস্থিতি তাকে ঘিরে ছিল, তা এখন নিঃশব্দে মিলিয়ে গেছে। অথচ তার উষ্ণতার ক্ষীণ রেশ এখনো বাতাসে ভেসে রয়েছে।
_________________
রাশিয়া মস্কো…..
নিজের কেবিনে টেলিফোন নিয়ে অপেক্ষামাণ মিখাইল। সেই কখন থেকে প্রহর গুনছে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির ফোন আসবে বলে অথচ ফোন আসার নাম গন্ধ নেই।
বরফশীতল বাতাসে ঢেকে আছে শহর। আকাশ ঝুলে আছে ধূসর চাদরের মতো, সূর্যের আলো যেনো কুয়াশার আড়ালে বন্দি। দূরের গির্জার গম্বুজে জমে থাকা তুষার ম্লান আলোয় নীরব স্ফটিকের মতো ঝিকমিক করছে। রাস্তাঘাটে শীতের কামড়, জানালার কাঁচে জমে থাকা শিশিরে যেনো অদৃশ্য কোনো গল্পের আভাস।
এই নীরব, হিমেল বিকেলেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে হঠাৎ বেজে উঠল টেলিফোন।
ধাতব শব্দে যেনো চমকে উঠল ঘর।
মিখাইল ত্রস্ত হাতে রিসিভার তুলল কানে। তার শ্বাস ভারী, চোখে অস্থিরতার রেখা।
ওপাশ থেকে ভেসে এল এক রমণীর মৃদু হাসি নরম অথচ বিদ্রূপে মোড়া।
“এতক্ষণ ধরে বুঝি আমার অপেক্ষায় ছিলে?”
কণ্ঠে মখমলি সুর, কিন্তু ভেতরে ধারালো শলাকার মতো খোঁচা।
মিখাইলের চোয়াল শক্ত হলো।
“বাজে কথা ছেড়ে আসল কথা বলো।”
কথাগুলো ইংরেজিতে ছুড়ে দিল সে, যেনো প্রতিটি শব্দে বিরক্তির বি’ষ মিশে আছে।
ওপাশে নারীটি হেসে উঠল। ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক, হাসির সঙ্গে সঙ্গে উন্মোচিত হলো দুধসাদা দাঁতের সারি। সে ধীরে ধীরে টেবিলের উপর রাখা মার্বেলটি তুলে নিল। লম্বা নখের আঙুলে সেটিকে ঘুরিয়ে খেলতে খেলতে বলল,
“ওহ ডার্লিং, এতটা রেগে যাচ্ছো কেন?”
তার কণ্ঠে অলস প্রলেপ, অথচ চোখে নিশ্চয়ই অন্য কোনো খেলা। মার্বেলটি ঘুরতে ঘুরতে টেবিলের উপর মৃদু শব্দ তুলছে টিক টিক টিক যেনো সময়েরই প্রতিধ্বনি।
“তুমি জানো, এই মুহূর্তে আমি তোমাকে এমন একটি খবর দেব যা শুনে তুমি সত্যিই আমাকে চুমু খেয়ে বসবে।”
মিখাইলের কপালে রক্ত চড়ে উঠল।
“ইউ স্লাট! চুমু আর তোমাকে? আসল কথাটা বলবে?”
নারীটি এবার ফিসফিসিয়ে বলল,
“কাম ডাউন, ডার্লিং, এত উত্তেজিত হয়ো না। আচ্ছা, বলেই দিচ্ছি।”
তারপর সে ধীরে একটি স্ট্রবেরি তুলে ঠোঁটের ফাঁকে নিল। রসালো ফলটি দাঁতের নিচে চূর্ণ হলো, রক্তিম রস যেনো তার ঠোঁটের রঙের সঙ্গে মিশে একাকার।
“এই সপ্তাহের মধ্যে মাফিয়া কিং স্পেন যাচ্ছে। এটা কি তুমি জানো?”
মুহূর্তেই মিখাইলের চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। যেনো মস্কোর শীতল আকাশ হঠাৎ ভেঙে পড়েছে তার মাথার উপর।
“হোয়াট? তুমি কি বলছো? আর ইউ শিওর?”
নারীর চোখ জ্বলজ্বল করছে অন্ধকারে জোনাকির মতো, অথবা ষড়যন্ত্রের আগুনে প্রজ্বলিত শিখার মতো।
“ইয়েস, ডার্লিং। আমি যা বলি, তা শতভাগ নিশ্চিত হয়েই বলি।”
মিখাইল শুষ্ক ঢোক গিলল। বুকের ভেতর হিসেব-নিকেশের ঝড়। নারীর কণ্ঠ এবার নিচু, ভারী,
“এটাই সুযোগ, শেষ করে দাও।”
নীরবতা। রিসিভার হাতে দাঁড়িয়ে আছে মিখাইল। বাইরে বরফ পড়ছে ধীরে ধীরে নিঃশব্দ, শীতল, নির্মম। তার ধূর্ত মস্তিষ্ক জানে, ‘মাফিয়া কিং’ কোনো সাধারণ লক্ষ্য নয়। তাকে শেষ করা মানে দাবার বোর্ডে রাজাকে আক্রমণ একটি ভুল পদক্ষেপেই নিজের মৃ’ত্যু নিশ্চিত।
“তোমার কি মনে হয় সবটাই এত সহজ? যদি এতই সহজ বলে মনে হয় তাহলে তুমিই শেষ করে দাও।”
মিখাইলের ধারালো কথার তোপে অসন্তোষ দেখালো সেই নারীকে। বিরক্তিকর কন্ঠে বলে উঠে,
“ডার্লিং, আমি আজ বুঝতে পারছি আসলেই আফরিদ একটা চিজ, নয়তো তোমার থেকে এত ছোট হওয়া সত্বেও তুমি ভয় পাও?হা হা! তারমানে এই এহসান ঠিকই নিজের জায়গা তৈরি করে ফেলেছে।”
মিখাইলের মোটেও পছন্দ হলোনা এই প্রশংসার বাক্য! মুখের উপর ফোনটা কে’টে দিলো সে।
_______________
লাগেজের চেইন টেনে বন্ধ করছে আফরিদ এহসান। প্রতিটি পোশাক, প্রতিটি ফাইল, প্রতিটি প্রয়োজনীয় জিনিস সে নিখুঁতভাবে গুছিয়ে রাখছে। খুব শিগগিরই তাকে ফিরে যেতে হবে নিজের শহরে স্পেনের বার্সেলোনায়।
সেই শহর, যেখানে একদিন সে নিজের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান অধ্যায়গুলো হারিয়েছিল। যে নগরী তাকে ক্ষমতা দিয়েছে, আবার নির্মমভাবে কেড়েও নিয়েছে বহু আপনজন, বহু স্বপ্ন।
ঠিক তখনই ওয়াশরুমের দরজা খুলে বাইরে এলো ন্যান্সি। সদ্যস্নাত দেহে পানির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিন্দুগুলো এখনো ঝিলমিল করছে। ভেজা চুল তোয়ালে দিয়ে মুড়ে রেখেছিল সে।
কক্ষে পা রাখতেই আফরিদকে লাগেজ গোছাতে দেখে বিস্ময়ে ভ্রু কুঁচকে গেল তার।
“কোথায় যাচ্ছেন আপনি?”
এক মুহূর্তও দেরি না করে নির্বিকার স্বরে জবাব দিল আফরিদ,
“বিয়ে করতে।”
উত্তরটা শুনে ন্যান্সির বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। এই মানুষটা তাকে ছেড়ে অন্য কাউকে বিয়ে করবে? উহু তা হতেই পারেনা। জানে মেরে দেবে না ন্যান্সি? তবু মুখে সেই অনুভূতির ছিটেফোঁটাও প্রকাশ হতে দিল না।
বরং ঠোঁটের কোণে কৃত্রিম হাসি টেনে বলল,
“কংগ্র্যাচুলেশনস। তা কবে করছেন বিয়ে? দাওয়াত তো দিলেন না!”
আফরিদ আর নিজেকে সংযত রাখতে পারল না। অট্টহাসিতে ভরে উঠল ঘর। হাসির দোলায় তার কোঁকড়ানো চুলগুলোও হালকা দুলে উঠল। তার সন্নিকটে এগিয়ে এলো,
হাসি সামলে মৃদু স্বরে বলল,
“তাই নাকি? আমি যদি আরেকটা বিয়ে করি, তাহলে বুঝি তোর খুব আনন্দ হবে?”
ন্যান্সি ভেজা চুল থেকে তোয়ালেটা খুলে ধীরে ধীরে চুল ঝাড়তে লাগল। চোখে মুখে দুষ্টু হাসির আভা।
“অবশ্যই হবে। তখন না হয় সতিনকে হুকুম করব। সব কাজকর্ম ওকেই দিয়ে করিয়ে নেব। সঙ্গে পা টিপিয়ে নেব!”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আফরিদ কয়েক পা এগিয়ে এল। এক টানে ন্যান্সির সরু কটিদেশ নিজের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে নিল। ওই প্রশস্ত বুকে ধাক্কা খেল ন্যান্সি। ন্যান্সির চুল থেকে ভেসে আসা শ্যাম্পু ঘ্রাণ নাসারন্ধ্রে ধাক্কা দিচ্ছে আফরিদের।
সে নিচু স্বরে, দুষ্টুমিভরা কণ্ঠে বলল,
“রাত নামলেই যখন স্বামীর ভাগ নিতে চলে আসবে, তখন কী করবি?”
ন্যান্সি ভান করে হামি তুলল। তারপর নাটকীয় ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“আর কী করব? বলব যাও, যাও নিজের স্বামীর সঙ্গে সোহাগ রাত মানাও।”
কথাটা শেষ হতেই আফরিদের নাসারন্ধ্র ফুলে উঠল। ভান করা রাগে সে আলতো করে ন্যান্সির লালচে গালে কা’ম’ড় বসিয়ে দিল।
“উফ! সবসময় এমন করেন কেন?”
ব্যথায় মুখ কুঁচকে গেল ন্যান্সির।
পরমুহূর্তেই সেই স্থানেই স্নেহমাখা চুম্বনে ব্যথা মুছে দেওয়ার চেষ্টা করল আফরিদ।
তারপর গভীর, স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল,
“যদি বিয়ে করতেই হয়, তবে হাজারবার হলেও তোকে নিয়েই করব।”
ন্যান্সি ঈষৎ কপটতা দেখিয়ে বলল,
“প্রয়োজন নেই, এরচেয়ে সতিন নিয়ে আসুন। আমার জ্বা’লা কমবে!”
আফরিদ ধীরে ধীরে ঝুঁকে এলো। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস ছুঁয়ে গেল ন্যান্সির কর্ণমূল। নিম্ন, মাদকতামিশ্রিত স্বরে ফিসফিসিয়ে উচ্চারণ করল,
“ভেবে দেখ, আমি তোকে যেভাবে আগলে রাখি, যেভাবে ভালোবাসি ,রাতের আঁধারে যতটা পাগলামি করি সবটুকুই যদি অন্য কাউকে দিয়ে দিই? তখন কিন্তু হাজারবার ডাকলেও আমি আর ফিরব না, অ্যাঞ্জেলিনা।”
বাক্যগুলো ছিল মাত্র কয়েকটি, অথচ প্রতিটি শব্দ যেন ধা’রালো ফলার মতো বিদ্ধ করল ন্যান্সির অন্তরস্থলে।
পরমুহূর্তেই বিদ্যুৎগতিতে হাত বাড়িয়ে আফরিদের শার্টের কলার মুষ্টিবদ্ধ করল সে। দৃঢ় আঙুলের চাপে কাপড় কুঁচকে গেল। তার দৃষ্টি তখন কঠোর, তীক্ষ্ণ, অথচ গভীরে লুকিয়ে থাকা অধিকারবোধ লুকিয়ে আছে।
আফরিদ নিচু হয়ে সেই মুষ্টিবদ্ধ হাতের দিকে তাকাল। ওষ্ঠপ্রান্তে অজান্তেই এক প্রশান্ত হাসি ফুটে উঠল। অন্য কেউ হলে এই ঔদ্ধত্যের মূল্য হয়তো র’ক্ত দিয়েই চুকাতে হতো। কিন্তু এই স্পর্শের অধিকার কেবল একজনেরই তার ব্যক্তিগত নারী, তার অ্যাঞ্জেলিনার।
ন্যান্সি অবিচল স্বরে, প্রতিটি শব্দে আত্মমর্যাদার দৃঢ়তা মিশিয়ে বলল,
“আমি ইলহাম ন্যান্সি অ্যাঞ্জেলিনা। আফরিদ এহসানের সাম্রাজ্যের একমাত্র অধিষ্ঠাত্রী। সেই সাম্রাজ্য আলোয় নির্মিত হোক কিংবা অন্ধকারে তার একমাত্র রানি আমি। অতএব, আমার উপস্থিতিতে অন্য কোনো নারীর প্রসঙ্গ উচ্চারণ করার আগে শব্দ বেছে নেবেন। নয়ত প্রাণ দিতে প্রস্তুত থাকবেন।”
কথাগুলো শেষ হতেই কয়েক মুহূর্তের জন্য নিশ্চুপ হয়ে রইল আফরিদ।
যে হৃদয়কে নির্মমতা, ক্ষমতা আর র’ক্তাক্ত ইতিহাস পাথরের মতো কঠিন করে তুলেছিল, সেই হৃদয়ের গভীরেও যেন অদৃশ্য এক তরঙ্গ আছড়ে পড়ল। তার নীলাভ দৃষ্টিতে ধরা দিল মুগ্ধতার এক বিরল আভা।
সে ধীর ভঙ্গিতে ন্যান্সির ক্ষীণ কটিদেশে আলতো চাপ প্রয়োগ করে আরও খানিকটা নিজের সান্নিধ্যে টেনে আনল। চোখে চোখ রেখে আবেশঘন, অনুগত কণ্ঠে উচ্চারণ করল,
“জো হুকুম, ওয়াইফ।”
একটি মাত্র সম্বোধন। আর তাতেই ন্যান্সির কঠিন মুখাবয়বের প্রান্তে নিঃশব্দে গলে পড়ল সমস্ত অভিমান। চোখের কোণে নেমে এল অচেনা কোমলতার রেখা। অধরের কোণে ফুটে উঠল ক্ষীণ, তৃপ্ত এক হাসি।
এরপর ধীরস্থির ভঙ্গিতে সে আফরিদের বেষ্টনী থেকে নিজেকে মুক্ত করল। কিন্তু বিদায় নেওয়ার আগে একবার গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে যেন নীরব ভাষায় জানিয়ে দিল, এই মানুষটি যতই সমগ্র পৃথিবীর কাছে মাফিয়া কিং হোক না কেন, তার কাছে সে কেবল একজন স্বামী, আর সেই পরিচয়ের উপর অধিকার একমাত্র তারই।
ব্যালকনিতে গিয়ে ভেজা তোয়ালেটা মেলে রেখে আবার কক্ষে ফিরে এল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে পুনরায় প্রশ্ন করল,
“এবার সত্যিটা বলুন,কোথায় যাচ্ছেন আপনি?”
আফরিদ লাগেজের চেইন টেনে বন্ধ করল। তারপর ন্যান্সির চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করল,
“স্পেন।”
একটি মাত্র শব্দ।কিন্তু সেই শব্দটুকুই যেন মুহূর্তে ন্যান্সিকে বিস্ময়ের অষ্টম আকাশে নিক্ষেপ করল।
চলবে……………।
Share On:
TAGS: অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা, ফারহানা নিঝুম
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৫৮
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ১
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৩৭
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ১১
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৬৮
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৭১
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৯
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৫৬ শেষাংশ
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৪৮ {প্রথম অর্ধেক}
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৭৭